| আল্লাহর খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি |
| লিখেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম | |
| Wednesday, 12 July 2006 | |
সৃষ্টি জগতে মানুষের মর্যাদাআল্লাহ তাআলা বিশাল সৃষ্টি জগতে যত প্রাণী সৃষ্টি করেছেন এর মধ্যে মানুষ, জিন ও ফেরেশতাকেই শুধু ভাল ও মন্দের বিচার-বিবেচনার যোগ্যতা দান করেছেন। এর মধ্যে ফেরেশতাকে মন্দ কাজ করার এখতিয়ার দেননি। তাদেরকে আল্লাহর হুকুম পালনের দায়িত্ব দিয়েছেন; হুকুম অমান্য করার কোন ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাই ফেরেশতারা তাদের কাজের পুরস্কার পাওয়ার অধিকারীও নয়, শাস্তি পাওয়ার যোগ্যও নয়। পুরস্কার ও তিরস্কার শুধু মানুষ ও জিন জাতির জন্য। এ দু’প্রকার প্রাণীকেই শুধু ভাল ও মন্দ উভয় রকম কাজ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। মন্দ কাজের ক্ষমতা থাকা সত্তেও মন্দ না করে ভাল কাজ করার কারণে তারা পুরস্কার পাওয়ার অধিকারী। তেমনি ভাল কাজ করার ক্ষমতা থাকা সত্তেও মন্দ কাজ করার কারণে তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। মানুষ এবং জিনের মধ্যে একটি বিরাট বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলা মানুষের উপর পৃথিবীতে আল্লাহর খিলাফত কায়েমের দায়িত্ব দিয়েছেন। জিন জাতিকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। নবী-রাসূলগণকে খিলাফত কায়েমের দায়িত্ব দিয়েই পাঠানো হয়েছে। জিন জাতির মধ্যে কোন নবী-রাসূল পাঠানো হয়নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, মানুষই সৃষ্টির সেরা—আশরাফুল মাখলূকাত। আল্লাহর একচ্ছত্র রাজত্বআল্লাহ তাআলা সূরা আলে ইমরানের ৮৩ নং আয়াতে দাবি করেছেন যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই বাধ্য হয়ে আল্লাহর বিধান মেনে চলে। আয়াতের শুরুতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মানুষকে আল্লাহর বিধান মানতে বাধ্য করেননি বলেই কি মানুষ আল্লাহর বিধান (দীন) ছাড়া অন্য বিধান তালাশ করে? আল্লাহ তাআলা তাঁর ছোট-বড় সকল সৃষ্টির জন্যই বিধি-বিধান তৈরি করেছেন। এটম থেকে সূর্য পর্যন্ত, ঘাস থেকে বৃক্ষ পর্যন্ত, পিঁপড়া থেকে হাতি পর্যন্ত সকল জড় পদার্থ ও জীবজন্তুর উপযোগী নিয়ম-কানুন তৈরি করেছেন। এ সব নিয়ম-বিধান তিনি নবীর মাধ্যমে জারি করেন না। তিনি নিজে সরাসরি প্রতিটি সৃষ্টির উপর ঐ সৃষ্টির উপযোগী বিধান চালু করেন। উপরিউক্ত আয়াতে এ কথাটিকে আল্লাহ যে ভাষায় প্রকাশ করেছেন তা হল: অর্থ: আসমান-যমীনে যত কিছু আছে সবই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। এখানে اَسْلَمَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ ইসলাম গ্রহণ করেছে বা আত্মসমর্পণ করেছে। সকল সৃষ্টিই বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। কোন সৃষ্টিই স্বাধীন নয় এবং আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে নিজের মর্জিমত চলতে সক্ষম নয়। গোটা সৃষ্টিলোকে আল্লাহর আরোপিত বিধানের কঠোর রাজত্ব কায়েম রয়েছে। বিজ্ঞানের যত উন্নতি হচ্ছে ততই এ কথা প্রমাণিত হচ্ছে। প্রকৃতির জগতে যে নিয়ম চিরন্তনভাবে চালু আছে তা আল্লাহরই রচিত, মানুষের রচিত নয় – এ কথা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। ঐ আয়াতের মর্ম অনুযায়ী ইসলামের সংজ্ঞা দাঁড়ায় নিম্নরূপ: “সৃষ্টির জন্য স্রষ্টার রচিত বিধানই ইসলাম।” যে সৃষ্টির জন্য যে বিধান দেওয়া হয়েছে, সেটাই ঐ সৃষ্টির ইসলাম। প্রত্যেক সৃষ্টি আল্লাহর বিধান মেনে চলছে বলেই বলা যায় যে, প্রত্যেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছে। অবশ্য তারা বাধ্য হয়েই ইসলাম গ্রহণ করে থাকে। মানুষের ইসলামমানুষের জন্য আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা মেনে চলার জন্য তাদেরকে বাধ্য করেননি। মানুষের জন্য রচিত ইসলামই নবীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিধান মানব সমাজে চালু করার দায়িত্বও নবী ও নবীর প্রতি বিশ্বাসীদের উপর অর্পণ করা হয়েছে। অন্যান্য সৃষ্টির জন্য রচিত ইসলাম আল্লাহ স্বয়ং সরাসরি জারি করেন। কিন্তু মানুষের জন্য রচিত ইসলাম তিনি সরাসরি চালু না করার সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। তাই মানুষের ইসলাম নবীর মাধ্যমে পাঠিয়েছেন এবং তা জারি করার দায়িত্বও নবী ও নবীর অনুসরণকারীদের উপরই অর্পণ করেছন।বিধানটি আল্লাহর। তাঁর পক্ষ থেকে সে বিধান কায়েমের দায়িত্ব পালন করাটাই খিলাফতের দায়িত্ব। খলিফা মানব প্রতিনিধি। প্রতিনিধি নিজে মালিক বা মনিব নয়। যাঁর প্রতিনিধি তিনিই মালিক। প্রতিনিধির দায়িত্বই হল মনিবের পক্ষ থেকে তাঁরই মর্জীমত কাজ করা। অর্থাৎ নবীর নিকট যে ইসলাম পাঠানো হয়েছে তা আল্লাহ নিজে চালু করবেন না বলেই তাঁর পক্ষ থেকে যাঁরা তা চালু করার চেষ্টা করে তাঁরাই খলীফার দায়িত্ব পালন করল। খিলাফতের দায়িত্বটা কীওহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট মানব জাতির জন্য যে জীবন বিধান পাঠিয়েছেন তা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবে চালু করেছেন। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্ যন্ত সকল ক্ষেত্রেই তিনি আল্লাহর বিধান চালু করে দুনিয়ার অসভ্যতম জাতিকে মানব সভ্যতার শিক্ষকে পরিণত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতের ২৩ বছর যা করেছেন, এর সবটুকুই খিলাফতের দায়িত্ব। তিনি একটি আদর্শ মানব সমাজ কায়েম করে দেখিয়ে দিয়ে গেলেন যে, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হলে তা সকল দিক দিয়ে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দুনিয়াতে যতটুকু সুখ-শান্তি মানুষের পাওয়া সম্ভব তা একমাত্র আল্লাহর বিধানের মাধ্যমেই পেতে পারে। মানব রচিত কোন বিধানের মাধ্যমে তা পাওয়ার উপায় নেই।খিলাফতের দায়িত্বের বিভিন্ন দিকমানুষ গড়ার দায়িত্বআল্লাহ তাআলা মানুষকে নৈতিক জীব হিসেবে দেখতে চান। মানুষকে যে দেহ দান করা হয়েছে তা আসল মানুষ নয়; আসল মানুষ হল রূহ। দেহ বস্তুগত উপাদান দিয়ে তৈরি বলে বস্তুজগতের প্রতি এর প্রবল আকর্ষণ রয়েছে। দেহের সকল দাবিকে নাফস বলা হয়। নাফসের কোন নৈতিক চেতনা নাই। আল কুরআনের ১২ নং পারার প্রথম আয়াতে আছে:অর্থ: নিশ্চয়ই নাফস অবশ্যই মন্দের হুকুমদাতা। (সূরা ইউসুফ: ৫৩) রূহই হল নৈতিক চেতনা, যাকে বিবেক বলা যায়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষনা করেছেন যে, আদম সৃষ্টির পর সকল মানুষের রূহ একই সাথে পয়দা করে তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছেন: অর্থ: আমি কি তোমাদের রব নই? তারা বলল, অবশ্যই আমরা এ কথার সাক্ষ দিচ্ছি। (সূরা আল আ’রাফ: ১৭২) ভাল-মন্দ বিচারবোধ সম্পন্ন সৃষ্টি হিসেবে রূহই আসল মানুষ। এ মানুষকে আল্লাহ তাআলা দুটো জিনিস দিয়েছেন। একটি হল সৃষ্টি-জগৎ এবং অপরটি হল জগৎকে কাজে লাগাবার যোগ্য হাতিয়ার। দেহটিই ঐ হাতিয়ার। يا ايها الناس(হে মানব জাতি!) বলে আল্লাহ যাদেরকে সম্বোধন করেন তারা মানুষের দেহ নয়; রূহ। মানুষের জন্য যে বিধান (ইসলাম) পাঠিয়েছেন তা মেনে চলার দায়িত্ব এ রূহকেই দেওয়া হয়েছে। তাই এ বিধান মানার যোগ্য হতে হলে রূহকে দেহের উপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করার যোগ্য হতে হবে। দেহটি যদি রূহের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয় তাহলে ঐ দেহ পশুর চেয়েও অধম বলে কুরআনে বলা হয়েছে। তাই সত্যিকার মানুষ হতে হলে রূহকে এতটা শক্তিশালী হতে হবে, যাতে দেহকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। মানুষ গড়ার আসল কাজ এটা। আল্লাহ তাআলা চান যে, মানুষ এ মানে গড়ে উঠুক। গড়বার নিয়ম আল্লাহই দিয়েছেন। কিন্তু এ কাজটি আল্লাহ নিজে করেন না। তাঁর পক্ষ থেকে তাঁরই দেওয়া নিয়মে যারা এ কাজটি করে তারা খিলাফতের দায়িত্ব পালন করল। মানুষ গড়ার পদ্ধতিমানুষ গড়ার আল্লাহর শেখানো পদ্ধতিটি কী তা জানা জরুরি। মানুষ গড়া মানে মানুষের মন, মগজ ও চরিত্র গড়ে তোলা। মনের সাথে ঈমানের সম্পর্ক, মগজের সাথে ইলমের সম্পর্ক এবং চরিত্রের সাথে আমলের সম্পর্ক।উন্নত নৈতিক জীব হিসেবে মানুষকে গড়তে হলে মনে খাঁটি ঈমান, মগজে নির্ভুল শিক্ষা এবং চরিত্রে মানবিক গুনাবলি সৃষ্টি করতে হবে। এ উদ্দেশ্য ঈমান, ইলম ও আমল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। ১. ঈমান ঈমান অর্থ বিশ্বাস। বিশ্বাস জিনিসটা কী? বিশ্বাসের সহজ সংজ্ঞা : যে বিষয়ে সরাসরি বা প্রত্যক্ষ (Direct) জ্ঞান নেই, অথচ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, তখন পরোক্ষ (Indirect) জ্ঞানের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ সিদ্ধান্তই বিশ্বাস। বাস্তব জীবনে পদে পদে মানুষকে এভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ বিশ্বের কোন স্রষ্টা আছে কিনা এবং মৃত্যুর পরে আবার জীবিত হতে হবে কিনা, এ সব বিষয়ে সরাসরি কোন ধারণা মানুষের নেই। এ সব প্রশ্নের সঠিক জওয়াব দেবার জন্য কারো কাছেই প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। কুরআনে এ সব বিষয়ে বিপুল পরোক্ষ জ্ঞান দান করা হয়েছে। ঐ সব জ্ঞানে এমন বলিষ্ঠ যুক্তি রয়েছে, যার ভিত্তিতে এক বিশেষ ধরনের বিশ্বাস জন্মে-এরই নাম ঈমান। কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে তাকে:
২. ইলম ইলমের দিক দিয়ে গড়ে উঠতে হলে জানতে হবে:
৩. আমল বা চরিত্র
|
|
| সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 15 August 2010 ) |