ইসলামের দন্ডবিধি
লিখেছেন ড. আব্দুলহামিদ আহমদ আবুসোলাইমান   
Thursday, 19 June 2008

ভূমিকা

এ গবেষণামূলক নিবন্ধটি গুরুত্বের দাবীদার। কারণ এত ইসলামের স্হায়ী বিষয়গুলো সম্পর্কে ইসলামের সমকালীণ বিধান আলোচিত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর আদর্শিক ও তমদ্দুনিক গঠন প্রকৃতিই এমন যে, এ সব স্হায়ী বিষয়গুলো যদি মুসলিম উম্মাহ তার বাস্তবֽজীবনে এবং সামাজিক ও তমদ্দুনিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে মোলিকভাবে যথার্থরূপে এবং কার্যকরভাবে অনুসরণ ও পরিচালনা না করে তাহলে তার উন্নতি অগ্রগতি,ও জাগরণ সম্ভব হবে না। এ বিষয়টি যেহেতু আজকে বিশ্বের সকল পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় মুসলিম উম্মহ ও ইসলামী সভ্যতার উন্নতি, পুনর্জাগরণ ও পূর্নগঠনের প্রধান ও পূর্ব শর্ত সেহেতু জাতির বিবেক আলেম-ওলামা ও মুসলিম চিন্তাবিদগণের দায়িত্ব হচ্ছে এসব স্হায়ী বিধানসমূহকে ঘিরে, উম্মাহর কস্টে কারণ উপলব্ধি করা, এদিকে মনোযোগী হওয়া এবং এসবের শব্দ ও মর্ম ভাল করে অনুধাবন করার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া।

এ লক্ষ্যে তাদের অতন্ত্র প্রহরীর মত সর্বাত্মক চেষ্টা করা প্রয়োজন এবং পরিতৃপ্ত হওয়ার পর কার্যকর কর্মতৎপরতা শুরু করা এবং তাদের জীবন ও সামাজিক কর্মকান্ডে তা অনুসরণ করা তাদের একান্তֽ কর্তব্য।

ইসলামের দন্ডবিধি

ড. আব্দুলহামিদ আহমদ আবুসোলাইমান
অনুবাদ
ড. মোহাম্মদ আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশনায়
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট (বিআইআইটি)
প্রথম প্রকাশ
মার্চ ২০০৭
চৈত্র ১৪১৩
রবিউল আউয়াল ১৪২৮
ISBN: ৯৮৪-৮২০৩-৪৭-৪
মুদ্রণে
আলফালাহ প্রিন্টিং প্রেস, ঢাকা
মূল্য : ২০.০০ টাকা, ডলার : ২.০০

প্রকাশকের কথা

ইসলামী শরীয়তের লক্ষ হচ্ছে ফিৎনা-ফাসাদ ও বিশৃঙ্খলা থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করা। সামাজের সঠিক শান্তির নিশ্চয়তা বিধান করা। সামাজের শান্তি নিশ্চয়নের জন্য ধরনের বিধি বিধানের প্রয়োজন এবং সে বিধিবিধানের প্রয়োগ কেমন হওয়া উচিৎ তার ব্যাপারে বিশ্বখ্যাত দার্শনিক, ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আব্দুল হামিদ আহমদ আবু সোলাইমান স্বল্প পরিসরে বক্ষমান পুস্তকে আলোচনা করেছেন। ইসলামী বিধানে ও আধুনিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে শাস্তি প্রয়োগ কেমন হবে এবং কেমন হওয়া উচিৎ, শাস্তি বিধান পদ্ধতি কেমন হলে সমাজের শৃঙ্খলার কোন বিঘ্ন ঘটবে না এ ব্যাপারে লেখক এখানে প্রাঞ্জলভাবে আলোচনা করেছেন। বিষয়টি ফকিহ্‌, শিক্ষাবিদ, আইনের ছাত্রদের কাছে আনন্দদায়ক হতে পারে। সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় পুস্তকটি বেশ ভূমিকা রাখবে।

এম জহুরুল ইসলাম এফসিএ
নির্বাহী পরিচালক

ভূমিকা

এ গবেষণামূলক নিবন্ধটি গুরুত্বের দাবীদার। কারণ এত ইসলামের স্হায়ী বিষয়গুলো সম্পর্কে ইসলামের সমকালীণ বিধান আলোচিত হয়েছে। ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর আদর্শিক ও তমদ্দুনিক গঠন প্রকৃতিই এমন যে, এ সব স্হায়ী বিষয়গুলো যদি মুসলিম উম্মাহ তার বাস্তবֽজীবনে এবং সামাজিক ও তমদ্দুনিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে মোলিকভাবে যথার্থরূপে এবং কার্যকরভাবে অনুসরণ ও পরিচালনা না করে তাহলে তার উন্নতি অগ্রগতি,ও জাগরণ সম্ভব হবে না। এ বিষয়টি যেহেতু আজকে বিশ্বের সকল পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় মুসলিম উম্মহ ও ইসলামী সভ্যতার উন্নতি, পুনর্জাগরণ ও পূর্নগঠনের প্রধান ও পূর্ব শর্ত সেহেতু জাতির বিবেক আলেম-ওলামা ও মুসলিম চিন্তাবিদগণের দায়িত্ব হচ্ছে এসব স্হায়ী বিধানসমূহকে ঘিরে, উম্মাহর কস্টে কারণ উপলব্ধি করা, এদিকে মনোযোগী হওয়া এবং এসবের শব্দ ও মর্ম ভাল করে অনুধাবন করার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া।

এ লক্ষ্যে তাদের অতন্ত্র প্রহরীর মত সর্বাত্মক চেষ্টা করা প্রয়োজন এবং পরিতৃপ্ত হওয়ার পর কার্যকর কর্মতৎপরতা শুরু করা এবং তাদের জীবন ও সামাজিক কর্মকান্ডে তা অনুসরণ করা তাদের একান্তֽ কর্তব্য।

এসব স্হায়ী বিষয়গুলোতে ইসলামের সমকালীণ বিধান ও মুসলিম উম্মাহর সামষ্ঠিক ও ব্যক্তিগত জীবনে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ত্রুটি রয়েছে। যার ফলে অনেক স্হায়ী বিধান বাস্তবায়নে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে চিন্তামূলক ও নেতিবাচক মনোভাব আমরা লক্ষ করছি। আমরা যখন মুসলিম উম্মাহর জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিস্তৃতি,জ্ঞান ও চিন্তার জগতে ত্রুটি, সাংস্কৃতিক দূষণ, মনমানসিকতায় রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও গোলামী মানসিকতার প্রভাব বুঝাতে পারব তখন সমসাময়িককালে ইসলামের বিধানে যে বিকৃতিই সমসাময়িককালে সামাজিক জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে ও বাস্তবকর্মকান্ডে মুসলিম উম্মাহর রুগ্ন অবস্হা ও বিরক্তির কারণ।

ইসলাম একটি পরিপূর্ন জীবন ব্যবস্থা। ইসলামী শরীয়তের শাস্তি বিধান পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ যে কোন স্হিতিশীল বিধানের প্রতি পুনঃ লক্ষ রেখে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিধানকে সুবিন্যস্ত রূপে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মহাজগত সম্পর্কিত প্রতিনিধিত্বকারী মার্জিত ও সুন্দর ইসলামী দর্শনের আলোকে জ্ঞানের প্রতিটি বিভাগকে ইসলামীকরণ করার কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে এ গবেষণার প্রয়াস।

এ গবেষণা ফলপ্রসূ তখন-ই হতে পারে যখন কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামী শরীয়তের সকল বিধান মানুষের যাবতীয় বাস্তব প্রয়োজন পূরণসহ কল্যাণকর মানব সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বাস্তবায়ন করার পুনঃপুনঃ প্রচেস্টা চালানো হয়।

এ গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো উম্মাহর সংস্কারমূলক চিন্তার গুরুত্ব উপলব্দি এবং সূদৃঢ় ইসলামী বিজ্ঞান ভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে স্হিতিশীল বিধানগুলো সম্পর্কে উম্মাহর আলোচনা সমূহে পুনঃ দৃস্টি দেয়ার লক্ষ্যে এলম, সমাজ ও চিন্তাবিদগণের আহ্বান। যা মন-মানসিকতা ও বিবেক পরিতৃপ্ত করবে এবং মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হবে।

বাস্তব বিধান সস্মত এবং ইসলামী মূলনীতির ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সংস্কার আলোচনা, পদ্ধতি ও চিন্তার সংস্কার এবং দর্শন সংস্কার ব্যতীত উম্মাহর কখনো পুনঃজাগরণ সস্ভব নয়।

বরং ঊম্মাহর চরম অধঃপতনের মধ্যে সার্বক্ষনিক নিমজ্জিত থাকার সমূহ সস্ভাবনা রয়েছে।

এ অবস্হা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ইসলামী সভ্যতার পুনরুথ্থানসহ উম্মাহকে পুনঃজাগরণের জন্য কাঙ্খিত চিন্তা ও অনুভূতি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য চিন্তাশীল ও সংস্কারবাদীদের ভূমিকাকে আরো ত্বরান্বিত করতে হবে, উন্নত করতে হবে।

পরিশেষে মহান আল্লাহর নিকট সাহায্য ও হেদায়েত কামনা করছি।

ইসলামের স্হায়ী ও পরিবর্তনশীল বিধানের সমকালীন সংস্কার : ইসলামের দন্ডবিধি-একটি নমুনা

ইসলামী দন্ডবিধির বিশেষ গুরুত্ব

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ইসলামের প্রতিটি বিধান, মূলনীতি ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় রয়েছে প্রতিটি মানুষের জন্য কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তা আর ইসলামের সেই বিধান, মূলনীতি ও মূল্যবোধ ততক্ষণ পর্যন্তֽ অনুধাবন করা সস্ভব নয় যতক্ষন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামিক শাস্তিবিধান এবং বিশেষ করে ইসলামী দন্ডবিধির ভয় ভীতির প্রভাব সম্পর্কে অনুভূতি না আসবে। কারণ বর্তমান সময়ে ইসলামিক মূল্যবোধ ও তার বিধান সাধারণ মানুষের এবং বিশেষ করে কিছু সংখ্যক মুসলমানকে প্রভাবিত করতে পারছে না।

মানুষ স্বভাবগতভাবে যৈবিক তাড়ণা ও মানবিক দুবর্লতার কারণে আবেগের বশবর্তী হয়ে যে সকল অন্যায় ও অপরাধসমূহ করে থাকে এবং বিশেষ করে আমাদের যুবসমাজ ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া, সিনেমার অশ্লীল ও যৌন-উত্তেজনাকর চিত্র প্রদর্শনী এবং সামাজিকভাবে বিভিন্ন পরিস্হিতির স্বীকার হয়ে যে সকল অবৈধ যৌন অপরাধ করে থাকে তৎসম্পর্কে ইসলামের কঠোর ভীতি ও ভয়ংকর শাস্তি বিধান সম্পর্কে অনেকেরই মনে নানা ধরণের প্রশ্নের উম্মেষ ঘটে যে, ইসলাম এ সকল অন্যায় ও অপরাধের সমাধান আরো সহজতর উপায়ে দিতে পারত। সুতরাং এটা অসম্ভব নয় যে, কোন এক সময় হয়তো গবেষকদের গবেষণার ফলে ইসলামের সেই শাস্তির বিধান ও বিশেষভাবে দন্ডবিধির এমন সমাধান বেরিয়ে আসবে যা সকলের কাছে গ্রহণীয় ও বোধগম্য হবে এবং ইসলামের প্রতিটি বাণী ও নির্দেশ সহজভাবে বুঝতে পারবে এবং মাথা পেতে মেনে নেবে।

যেমন, যেনা ও ব্যভিচারের অপরাধ অকাট্যভাবে প্রমাণ ও শাস্তি প্রয়োগের ইসলামী শরীয়ত চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অকাট্য সাক্ষ্যে শর্তারোপ করেছে। অথচ ׂকেসাস׃ এবং হত্যার মত অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেএ দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য যথেস্ঠ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।

সুতরাং এখানে স্বাভাবিক ভাবে অনেকগুলো প্রশ্নের উদ্ভব হয় যে, ধর্ষণ ও ব্যভিচারের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষী প্রয়োজন কেন হলো? তিনজন অথবা পাঁচজন হলো না কেন? চারজন সাক্ষীতে কি বিশেষ ধরণের কোন দিকনির্দেশনা রয়েছে? নাকি এটি উদ্দেশ্যবিহীন খামখেয়ালী মাত্র? এমনকি আমরা বলতে পারি না যে, ধর্ষণ অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক জামাত সাক্ষীর প্রয়োজন। আর জামাতে তিনজন-পাঁচজন থেকে তৎউত্তর সংখ্যার মাধ্যমে হতে পারে। তদুপরি চারজন সাক্ষী নির্ধারিত করা হলো কেন? ইত্যাদি নানা ধরনের প্রশ্ন উথ্থাপিত হয়।

পদ্ধতিগত সমস্যা

উপর্যুক্ত প্রশ্নাবলীর মতো আরো অনেক প্রশ্ন ইসলামী শাস্তিবিধান ও ইসলামী দন্ডবিধি সম্পর্কে পাঠকের মনে উথ্থাপিহয়। যার সঠিক সমাধান স্হান কাল পাত্রভেদে বিশেষ গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া দেয়া সস্ভব নয়।

আর আমি যখন ঐ সকল প্রশ্নও সমস্যাবলী এবং তার সঠিক সমাধান নিয়ে চিন্তা করি তখন আমার মনে হয় যে ত্র সকল প্রশ্নও সমস্যার সমাধান সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুবিন্যস্ত এবং ব্যাপক ধরণের সঠিক নীতিমালা নির্ধারণের মাধ্যমেই সস্ভব। আর সেই নীতি নির্ধারণ করতে হবে মানুষের ব্যক্তিগত, স্বভাবগত ও সমাজগত দিকগুলো বিবেচান করে, ইল্‌মে ওহী, বিবেক ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধন করার মাধ্যমে। (আর জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎস ইল্‌মে ওহী, বিবেক ও প্রকৃতি এবং ইসলামিক নীতিমালা সম্পর্কে আমি ইতোপূর্বে অনেক লেখালেখি করেছি)।

আর বিশেষ করে মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা আমাকে ইল্‌মে ওহী, বিবেক এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের মধ্যেকার বৈষম্যতা দূর করে এগুলোর মধ্যে এবং স্হান কাল পাত্রভেদে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ধরণের ঘটনা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে সমন্নয় সাধন করতে সহায়তা করেছে।

ইসলামী দন্ডবিধির ক্ষেত্রে ছাত্রাবাস কক্ষে ছাত্র সংখ্যা নির্ধারণের সমস্যার সমাধানে আধুনিক দৃস্টিভঙ্গি

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে গুমবাক উপকন্ঠে বিশ্ববিদ্যালয় শহরে অবস্হিত আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উন্নয়ন এবং নুতন ক্যাম্পাস তৈরির পরিকল্পনা প্রণয়নের একমাএ কারণ ছিল সাধারণ ছাত্রাবাস ও বিশেষ ভাবে মুসলিম ছাত্রাবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যাবদানে ছাত্রদের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ, স্বভাব-চরিএর সংশোধন, সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার মাধ্যমে সহজভাবে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকরা।

আর এরই বাস্তবায়ন ও সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ ও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দেখা যায় যে, ইসলামী শরীয়তের নির্দেশনার প্রতি এবং বিশেষ করে ইসলামী দন্ডবিধি যেমন-ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষীর অকাট্য সাক্ষের শর্তারোপ এবং চারজনের কম হলে বা অকাট্যভাবে সাক্ষ্য না দিলে সাক্ষীদের উপর শাস্তি প্রয়োগ এবং চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রক্তাপাত ইত্যাদি অপরাধ প্রমাণের জন্য মাএ দু’জন সাক্ষীর সাক্ষী গ্রহণ এবং ধর্ষণ, ব্যভিচারের শাস্তি ও সাক্ষী এবং চুরি ডাকাতি, হত্যা ও রক্তপাতের শাস্তি ও সাক্ষীর মধ্যে পার্থক্যকরণ ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক দৃস্টি ও সঠিক রহস্য উদ্‌ঘাটন ছাড়া ছাএদের ব্যক্তিগত, সমস্টিগত ও স্বভাবগত সমস্যার সমাধান সস্ভব নয়। তেমনিভাবে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান সহ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান অধ্যয়নের ফলে যে নতুন জ্ঞান ও নতুন দিক উম্মোচনের মাধ্যমে যে সকল আধুনিক প্রশ্ন ও সমস্যার সৃস্টি হয় তার সঠিক সমাধান ইসলামী শরীয়তের ঊদ্বৃতি সমূহের শাব্দিক ও বাহ্যিক অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ ইসলামী শরীয়ত শুধুমাএ অর্থ গ্রহণ করে শুধু শুধু আতঙ্ক সৃস্টি ও ভয়-ভীতি প্রদর্শনের জন্য আসেনি। বরং ইসলামী শরীয়ত এসেছে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার জন্য। আর তা তখনই সম্ভব হবে যখন ইসলামী শরীয়তের নির্দেশাবলীর ভাব অর্থ, মহাত্ম রহস্য ও হেকমত ইত্যাদি উদ্‌ঘাটন করা যাবে। আর রহস্য ও হেকমত তখনই উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হবে যখন ইসলামী শরীয়তের দিক নির্দেশগুলো মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, প্রকৃতিবিজ্ঞান ও আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সমন্বয়ে সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত ভাবে গবেষণা করা যাবে। আর তখনই সকল প্রশ্ন ও সমস্যার সমাধান দেয়া যাবে। আর এটিই হচ্ছে ইল্‌মে ওহী, জ্ঞান ও প্রকৃতির পরিপূর্ণতা ও সমন্বয় সাধন এবং এটিই হচ্ছে জ্ঞানের ইসলামীকরণ।

আর ছাত্রাবাসের সমস্যাবলীর মধ্যে সর্ব প্রথম যে সমস্যাটির সম্মুখীন হতে হয় তা হচ্ছে ছাএদের আবাসন সমস্যা অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের এক একটি কক্ষে সর্বোচ্চ কতজনের আবাসন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে মালয়েশিয়ার মত দেশে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বয়সের একাধিক ছাএদের আবাসন ব্যবস্থা একটি কক্ষে করা হয়। যা অনেক সময় মতনৈক্য ও বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এ সমস্যা নিরসণের জন্য ছাএদের স্বভাবগত, ব্যক্তিগত, সমস্টিগত ও সমাজগত দিকগুলো বিবেচনা করে একটি কক্ষে সর্বোচ্চ কতজন ছাত্রের আবাসনের ব্যবস্থা করা যায় তার পরিপূর্ন সমাধানের পথ খুঁজে বের করা উচিৎ।

সুতরাং আমি যখন ছাত্রদের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এর সঠিক সমাধানের পথ খুঁজতে লাগলাম তখন আমার কাছে প্রথমে মনে হলো যে, ছাত্রাবাসের এক একটি কক্ষে একজন ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা করাই ভাল ও উপযোগী হবে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন আমি অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলাম তখন আমি দেখলাম যে, সেখানে মালয়েশিয়ার মতো দেশে সীমিত পরিমাণ অর্থ দিয়ে অধিক সংখ্যক ছাএদের শিক্ষা ব্যবস্থা করতে হচ্ছে এবং একটি কক্ষে একাধিক ছাত্রের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। সেখানে একটি কক্ষে একজন ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা করা অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় সম্ভব নয়। তেমনিভাবে যখন আমি ছাএদের স্বভাবগত, ব্যক্তিগত ও সমাজগত দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করলাম তখনও আমার কাছে মনে হলো যে, একটি কক্ষে একজন ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা করা উচিৎ হবে না।

কারণ সাধারণত ইন্টারমিডিয়েট ও অনার্স লেবেলের ছাএদেরকে অল্প বয়সে জীবনের সর্বপ্রথমেই বাবা-মা, ভাই-বোন আত্মীয় স্বজনের ভালবাস, স্নেহ-মমতা থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন স্হান ও নতুন পরিবেশে আসতে হয় যার সম্পর্কে তাদের পূর্বের কোন ধারণা ও অভিজ্ঞতা ছিল না। এমতাবস্হায় যদি তাদেরকে একটি কক্ষে সম্পূর্ণ একা একা থাকতে দেয়া হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে দৈনন্দিন কাজ, আহার বিহার ও বাসস্হান ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে এবং নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে না।

অতএব, এ সকল যৌক্তিকতার আলোকে একটি কক্ষে একজন ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা করা যাবে না। বরং যৌথভাবে একাধিক ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে একে অন্যের সহযোগিতায় নতুন ছাএরা পারিবারিক আদর যন্ত, স্নেহ-মমতা ভুলে গিয়ে নিজেকে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে এবং নিজের কাজ নিজেই করতে পাবে।

অতএব উপর্যুক্ত দিক বিবেচনায় একটি কক্ষে একাদিক ছাএদের আবাসন ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু এক কক্ষে কতজনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তখন দু’জনের ব্যাপারে চিন্তা করলাম। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো যে দুױজনের ব্যবস্থাও করা যাবে না। কারণ এত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও চারিএক দিক বিবেচনায় এজন্য সম্ভব নয় যে, সীমিত অর্থ দিয়ে অধিক সংখ্যক ছাএর শিক্ষার ব্যবস্হা করতে হয়। তেমনি ভাবে চারিএক দিক বিবেচনায় দুױজন ছাএ একসাথে থাকবে তখন তাদের মধ্যে চারিএক অবনতি হতেই পারে। তেমনিভাবে ব্যক্তিগত ও স্বভাবগত কারনে এ জন্য সম্ভব নয় যে, তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি, কথাকাটাকাটি ও মনোমালিন্যতা হতেই পারে। তখন তৃতীয় আরেকজন ছাড়া তাদের মধ্যে সমঝোতা ও বিভেদ মিমাংসা সম্ভব নয়।

অতএব উপর্যুক্ত কারণ বিবেচনায় একটি কক্ষে দু’জনের আবাসন ব্যবস্থা করা যাবে না। তারপর আমি তিনজনের কথা চিন্তা করলাম। তখনও আমার কাছে মনে হলো যে, তাও করা যাবে না। কারণ এতেও এমন কিছু সমস্যা রয়েছে যার সমাধান সম্ভব নয়। যেমন, মানুষের স্বভাবই হচ্ছে পক্ষপাতিত্ব অবলম্বন করা এবং কোন এক পক্ষে ঝুকে পড়া। আর যখন কোন একটি কক্ষে তিন ছাএর আবাস হবে, তখন একে অপরের সাথে তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে ফিস ফিস, কানাকানী, সংগোপনে আলাপ ও কথাবার্তা বলতেই পারে। তখন তৃতীয় জনের মনে দুর্বলতা, সংশয় সন্দেহ আসাটাই স্বাভাবিক। এজন্যই রাসূল (সাঃ) তৃতীয় জনের অনুপস্হিতিতে দুױজনে ফিসফিস ও সংগোপনের আলাপ করা থেকে নিষেধ করেছেন। এতে তাদের মধ্যে সংশয় সন্দেহ ইত্যাদির জন্ম নিয়ে এক সময় বড় আকারের বিভেদ বেধে যাওয়ার সস্ভাবনা থাকে। অতএব উপর্যুক্ত বিবেচনায় একটি কক্ষে তিনজনের আবাসন ব্যবস্থা করা সস্ভব নয়। সুতরাং আমাকে চারজনের আবাসনের ব্যাপারে চিন্তা ও বিবেচনা করতে হলো। অবশেষে আমার কাছে মনে হলো একটি কক্ষে চাজনের আবাসন ব্যবস্থা করাটাই অধক যুক্তিযুক্ত। কারণ চার সংখ্যাটি এমন একটি সংখ্যা যার মাধ্যমে স্বভাবত, ব্যক্তিগত ও সমস্টিগত ভাবে পরস্পর পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। এবং তাদের মাঝে মানবিক ও সামাজিক ভারসাম্যতা বজায় থাকে। তেমনিভাবে চারজনের মাধ্যমে এমন একটি দল বা জামাত গঠিত হয় যা উপরে বর্ণিত অর্থাৎ একজন, দু’জন ও তিনজনের আবাসনে যে সকল নেতিবাচক প্রভাব রয়েচে তা থেকে মুক্ত থাকে। এমনকি চারজনের আবাসনের অনেকটা ইতিবাচক প্রভাব ও কল্যাণ রয়েছে। যেমনঃ আমরা দেখতে পাই যে, যখন কোন বিষয়ে চারজনে দুױজন অথবা তিনজন এক অপরকে সমর্থন করে বা ঐক্যমত পোষণ করে তখন অনায়াসে অপরজন তাদের কে সমর্থন করবে। এবং তাদের মধ্যে মানবিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নতি হবে এবং একে অন্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করবে।

তেমনি ভাবে তাদের দুױজনের মাঝে কোন ধরণের মনোমালিন্য বা বিবাদ সৃস্টি হলে অপর দুজন তাদের মধ্যে মিমাংসা করার চেস্টা করবে এবং তাদের মাঝে শান্তি ও শালীনতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। অতএব এ সকল ইতিবাচক প্রভাবের কারণে একটি কক্ষে চারজনের আবাসন ব্যবস্থা করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

আর ছাত্রাবাসের এই সমস্যা সমাধানের চেস্টার মধ্য দিয়ে আমার আরেকটি বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন হলো যে, চারজনের মাধ্যমে গঠিত দল বা জামাতের মানবিক এবং সামাজিক বিশেষ দিক নির্দেশ রয়েছে। আর তারই মধ্যে দিয়ে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও আকস্মিকভাবে দিবালোকের নায় আরেকটি বিষয় পরিস্কার হয়ে যায় যে, ধর্ষণ ও ব্যভিচারের অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অকাট্য সাক্ষের শর্তারোপ নিছক কোন খামখেয়ালির বিষয় নয়। আর তা হতেও পারে না। বরং স্বাভাবিক, মানবিক ও সামাজিক দিক থেকে তার বিশেষ দিক নির্দেশনা ও বিশেষ গুরুত্ত্ব রয়েছে।

তেমনিভাবে ধর্ষণের ব্যাপারে চারজন সাক্ষির শর্তারোপের উপর যে সকল প্রশ্ন ও সংশয়ের উদ্ভব হয়েছিল তার সঠিক সমাধান হয়ে গেছে। এমনিভাবে চারজন সাক্ষীর হয়ে তার চেয়ে কম সংখ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে এমন কি তিনজন হলেও এবং তারা অকাট্য সাক্ষ্য দিলেও ধর্ষণকারী বা ব্যভিচারীর উপর শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে না বরং তার বিপরীতে যাদের উপর ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী শাস্তি প্রয়োগ করার কারণও আমার কাছে পরিস্কার।

আর তা হচ্ছে সমাজে আশ্লীলতা, বেহায়পনার প্রচার-প্রসার এবং ফেৎনা ফাসাদ রোধ করা। মানুষের সস্মান, মর্যাদা আক্ষুন্ন রেখে সামাজিক অধিকার প্রতিজ্ঞা করা এবং যথাসাধ্য আশ্লীলতার ও বেহায়াপনার গোপনীয়তা রক্ষা করা। কারণ ইসলামী শরীয়ত মানুষের স্বভাগত ও মানবিক দুর্বলতা এবং জৈবিক তাড়ণার বশবর্তী হয়ে যে সকল অপরাধ করে তার শাস্তি শুধুমাএ তাদের এ গর্হিত কাজের জন্য নির্ধারণ করেনি বরং এ শাস্তি নির্ধারণ করেছে তাদের গোপনীয়তা ফাস বেহায়াপনা প্রচার ও প্রসারের কারণে।

অতএব, তাদের গোপনীয়তা ফাঁস না করে তাদের মানবিক দুর্বলতা ও স্বভাবকে নিয়ন্ত্রনের পথ খুঁজে দেয়া উচিৎ। আর মানুষের স্বভাব, মানবিক দুর্বলতা ও জৈবিক কামনা বাসনা নিয়ন্ত্রণের উপায় হচ্ছে তা’লীম তারবিয়াত ও আত্নশুদ্ধির মাধ্যমে নেতিবাচক মানবিক স্বভাব সমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা।

চারজন সাক্ষীর সামাজিক প্রমাণ

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শহরে ছাত্রাবাসে অবস্হানকালে আমি যখন পর্যায়ক্রমে ছাত্রাবাসের মানবিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করছিলাম, তখন আমার কাছে এ সকল ফলাফল বেরিয়ে আসলো যে, চারজন সাক্ষী নির্ধারণের ক্ষেত্রে চার সংখ্যাটির মানবিক এবং সামাজিক বিশেষ গুরুত্ব ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। আর সেটি হচ্ছে যে, এ চারজনের মধ্যে মানবিক প্রয়োগ পূরণ এবং সামাজিক/সামস্টিক ভারসাম্যতার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণভাবে একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ চার সংখ্যাটি হচ্ছে সর্বনিম্ন সংখ্যা যার মাধ্যমে সামাজিক ইতিবাচক ভারসাম্য রক্ষা করে পূর্ন একটি জামাত বা দল গঠন করা যায়।

এ জন্যই ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণ ও সাব্যস্তের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষীর অকাট্য সাক্ষ্যের শর্তারোপ করা হয়েছে। আর চারজন একসাথে অকাট্য সাক্ষ্য দেওয়ার মানেই হচ্ছে এ চারজনের সামনে প্রকাশ্যে এ কাজটি ঘটেছে। আর চারজনের কাজ জওয়ার মানেই হচ্ছে পুরো একটি জামাতের সামনে কাশ্যে কাজটি ঘটেছে। এ জন্যই ইসলামী শরীয়ত সর্বনিম্ন জামাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিন অথবা পাঁচ নির্ধারণ না করে চার সংখ্যাটি নির্ধারণ করেছে।

অতএব, এ চারজন সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারণের রহস্য ও দিক নির্দেশনার মধ্য দিয়ে বুঝতে পাললাম যে, চার সংখ্যাটি নিছক খামখেয়ালী বা ঊদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়নি বরং তার বিশেষ ধরনের গুরুত্ব রয়েছে। আর তা হচ্ছে সমাজকে এ কথা বুঝানো যে, ত্র ধরনের সমাজে প্রকাশ্যভাবে হয়েছে।

আর এ ধরনের অশ্লীল কাজগুলো যখন সমাজে প্রকাশ্যভাবে ঘটতে থাকবে, তখন সমাজে ফিতনা ফাসাদ সৃস্টি হবে। মানুষের স্বাধীনতা ও সামাজিক অধিকার নস্ট হবে। নতুন প্রজন্মের আখলাক চরিত্র ধ্বংস করে বিপদের দিকে ঠেলে দেবে। এ জন্য মহান আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন, ׂআল্লাহ কোন মন্দ বিষয় প্রকাশ করা পছন্দ করেন না।׃ (সুরা আল্‌ নীসা:১৪৮) এবং রাসূল (সা:) এরশাদ করেন, ׂযখন তোমরা কোন পাপ কাজ করে ফেল তখন তা গোপন রাখ׃

আর যদি সাক্ষীর সংখ্যা চারজনের কম হয় এমনকি তিনজনও হয় আর তারা অকাট্যভাবে সাক্ষী দেয় অথবা চারই হয়। কিন্তু অকাট্যভাবে সাবক্ষী না দেয় তাহলে তাদেরকে ইসলামী শরীয়তে শাস্তি দেয়ার বিধান রেখেছে। আর তাদের এ শাস্তির বিধান শুধুমাত্র তাদের এ অপরাধের জন্য নয় বরং তাদের শাস্তির বিধান এ জন্যই করা হয়েছে যে, তা একজন মানুষের মানবিক দুর্বলতার কারণে আবেগের বশবর্তী হয়ে অত্যন্ত গোপনে কৃত অপরাধকে তারা গোপন রাখার বদলে এবং তাকে নসিহত ও তাওবার প্রতি আহবান ও সঠিক পথে ফিরে আসার উপদেশ দেওয়ার পরিবর্তে তাকে লজ্জিত, অপমাণিত এবং সামাজিক ও মানসিকভাবে তার মর্যাদা ক্ষুন্ন করার জন্যই তারা এ কাজটি করেছে এবং এরই মধ্যে দিয়ে তারা সমাজে ফেৎনা ফাসাদ সৃস্টি করেছে এবং অশ্লীলতার ও বেহায়পনার প্রসার ঘটিয়েছে। এজন্যই ইসলামী শরীয়ত তাদের শাস্তির বিধান রেখেছে। যাতে সমাজে ফিৎনার সৃস্টি না হয়।

সুতরাং আমাদের উচিৎ যে, আমরা যে, আমরা যে ইসলামী শরীয়তের চারজন সাক্ষীর অকাট্য সাক্ষ্যর শর্তারোপের প্রতি সজাগ দৃস্টি রাখব যে ইসলামী শরীয়ত শুধু মাত্র তাদের অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি সাব্যস্তের জন্য এ শর্তারোপ করেনি বরং সামনে অশ্লীলতা ও বেহায়পনার প্রসার রোধ এবং ফিৎনা ফাসাদ সৃস্টি বন্ধ করার জন্য করেছে। কারণ ইসলামী শরীয়ত যদি শুধুমাত্র অপারাধ প্রমাণ ও শাস্তির সাব্যস্তের কারণে করত তাহলে চুরি, ডাকাতি, হত্যা ইত্যাদির অপরাধসমূহের ন্যায় শুধুমাত্র দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে ‘রজস” অথবা ‘বেত্রাঘাতের” হুকুম দিয়ে দিত। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত তা করেনি বরং অকাট্যভাবে চারজনের সাক্ষীর শর্ত দিয়েছে যাতে মুসলামান সমাজে অশ্লীলতা বেহায়াপনার প্রসার ও ফিৎনা ফাসাদের সৃস্টি না হয়। এ জন্যই মহান আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন, ׂযারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি রয়েছে׃ (সূরা আল নূর:১৯)।

আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ׂযারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর তাদের স্বপক্ষে চারজন সাক্ষী উপস্হিত করে না তাদের কে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। এরাই নাফারমান। কিন্তু অত:পর যারা তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম মেহেরবান׃ (সূরা আন নূর:৪-৫)।

আল্লাহ আরো এরশাদ করেন,যারা কখনও কোন অশ্লীল করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃত কর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনেশুনে তাই করে না। তাদের জন্য প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবন যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান׃ সূরা আল-ইমরান:১৩৫-১৩৬)।

প্রশ্ন: আমরা এ ধরনের গর্হিত কাজ সম্পর্কে কি বলব? কিভাবে আমরা তার প্রতিরোধ করব? এবং কিভাবে সমাজ তার প্রতিরোধ করবে?

যাতে করে আমরা ইসলামী শরীয়তের বিধান সমূহের মূল লক্ষ্য ঊদ্দেশ্য সমূহ ভালভাবে বুঝতে পারি। কেননা আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, এ ধরণের নিকৃস্ট অণ্যায় ও গর্হিত কাজগুলো মানুষের স্বভাবগত ভাবে মানসিক দুর্বলতা ও জৈবিক তাড়নার সাথে সম্পর্কিত। আর ঐ সকল কাজ মানুষ চারিত্রিক, সামাজিভাবে তালিম তারবিয়াত না থাকার কারণে এবং কিভাবে নিজের সতীত্ব রক্ষা করবে এবং এ ধরণের পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাদেরকে এবং বিশেষ করে যুবসমাজকে আখলাক-চরিত্র শিক্ষা দিয়ে তাদের মধ্যে মানুবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মধ্য দিয়ে তাদেরকে লালন পালন ও প্রতিস্ঠা করা।

আর এ বিষয়টি আমরা রাসূল (সা:) এর ঊত্তম আদর্শ ও শিক্ষা থেকে গ্রহণ করতে পারি যে, রাসূল (সা:) কিভাবে একজন টগবগে যুবককে হেকমত অবলম্বন করে উপদেশ ও স্বচরিত্র শিক্ষাদানের মাধ্যমে এ ধরণের অপমানজনক গর্হিত কাজ থেকে বিরত রেখেছেন।

একদিন রাসূল (সা:) এর খেদমতে একজন টগবগে যুবক উপস্হিত হয়ে যেনা করার অনুমতি চাইল। রাসূল (সা:) তখন তাকে কোন ধরণের ধমক বা কঠোরতা অবলম্বন না করে তার এ যৌন শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে এ ধরণের গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য হেকমতের পথ অবলম্বন করলেন। তিনি তাকে তাড়িয়ে না দিয়ে ভালবাসা ও দয়ার নজরে তাকে কছে টেনে নিলেন এবং প্রথমেই তাকে এ ধরণের কাজের শাস্তির কথা না জানিয়ে একজন মানুষের মর্যাদা ও একজন যুবকের করণীয় সম্পর্কে উপদেশবাণী তুলে ধরলেন। আর বললেন, দুনিয়ার নারী সমাজ হয়তোবা কারো মা হবে, না হয় কারো বোন হবে, না হয় কারো ফুফু বা খালা অথবা ফুফু? অতএব কিভাবে সে অন্যের ইজ্জতকে কলুষিত করতে পছন্দ করবে। আর তোমার জন্য যা পছন্দ করা না তা অন্যের জন্য কিভাবে পছন্দ করতে পাবে। তখন যুবকটির অন্তরে মানবিক মূল্যবোধ ও সচ্চরিত্রের অনুভুতি জাগ্রত হয় এবং একজন মানুষের মর্যাদা ও একজন যুবকের করণীয় বিষয়ে অবগত হয়। আর এ ধরণের গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকে। অতএব একজন প্রকৃত মানুষ সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে না তা অন্যের জন্য কখনও পছন্দ করতে পারে না। রাসূল (সা:) শুধুমাত্র একজন যুবককেই এ ধরণের নিকৃস্ট কাজ থেকে বিরত রেখেই শেষ করেননি বা থেমে জাননি বরং গোটা জাতিকে তাদের যৈবিক কামনা বাসনা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে তাদের সতীত্ব রক্ষা এবং অশ্লীলতা থেকে বাঁচার সহজ উপায় বের করে দিয়েছেন। তিনি মুসলিম জাতিকে নিজেদেরকে পূত পবিত্র রাখার জন্য বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। রাসূল (সা:) এরশাদ করেন, ׂহে যুবসমাজ তোমাদের মধ্যে যারা সার্বিক ভাবে বিবাহের সামর্থ রাখ তারা যেন বিয়ে কর। আর যারা বিয়ে করার সামর্থ রাখ না তারা যেন রোজা রাখ। কেননা রোজা যৌনশক্তি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে׃ (আল হাদিস)।

আললাহ কুরআনে এরশাদ করেন, ׂআর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ׃ (সূরা বনি ইসরাঈল: ৩২)। আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ׂহে ঈমানদারগণ তোমরা শয়াতনের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, তখনতো শয়তান নির্লজ্জতা ও মন্দ কাজেরই আদেশ করবে׃ (সূরা আন নূর: ২১)।

আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, (হে রাসূল) ׂমুমিনদেরকে বলে দিন তারা যেন তাদের দৃস্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা সম্পর্কে অবহিত আছেন׃ (সূরা আন নূর: ৩০)। আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ׂ (হে রাসূল) আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিস্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামাজ কায়েম করুন। নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেস্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর׃ (সূরা আনকাবুত: ৪৫)। আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ׂযারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবে? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে-শুনে তাই করতে থাকে না। তাদের জন্য প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে প্রস্রবন- যেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। যারা কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান׃ (সূরা আল ইমরান : ১৩৫)।

এভাবে উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, মানুষের যৈবিক তাড়না এবং স্বভাব ও মানবিক দুর্বলতার কারণে কৃত অপরাধ যেমন-নেশা, যেনা ও ব্যভিচার ইত্যাদি প্রমাণ ও শাস্তির ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের শাস্তির কঠোর নীতি অবলম্বনের কারণ। উদ্দেশ্য হচ্চে সমাজে বেহায়পনা অশ্লীলতার প্রসার বন্ধ করা এবং ফিৎনা ফাসাদ রোধ করা।

এ জন্যই হজরত উমর (রা:) যখন একটি বাড়ির দেওয়ালের আড়ালে মদ্যপানের আসর সম্পর্কে অবহিত হলেন। তখন তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। কিন্তু ঐ লোকগুলো হযরত উমরের সাথে অভিযোগ ও জেরা করতে লাগল যে তারা নির্জনে কোন একটি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এতে সমাজে কোন ধরণের ফিৎনা ফাসাদ সৃস্টির কোন উদ্দেশ্য ছিল না। তখন হযরত উমর (রা:) তাদের সম্পর্কে তথ্য নেয়া এবং শাস্তি প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকলেন। অতএব, এ হচ্ছে যেনা ও ব্যভিচারের শাস্তির ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের কঠোর নীতি অবলম্বনের কারণ ও লক্ষ্য ঊদ্দেশ্য।

আর তারই বিপরীতে চুরি, ডাকাতি, হত্যা ও কেসাস ইত্যাদি ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের শাস্তি বিধানের ঊদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের সরাসরি এ ধরণের জঘন্য কাজ থেকে বিরত রাখা এবং মানুষের জান মালের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান ও মানুষের মৌলিক অধিকার যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। এজন্যই ইসলামী শরীয়ত চুরি, ডাকাতি ও হত্যাকান্ডের অপরাধ প্রমাণ ও তার শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে মাত্র দূজনের আদেল সাক্ষীর সাক্ষ্যে মাধ্যমে এবং পারিপার্শিক অবস্হার আলোকে শাস্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছে। যাতে মানুষ অন্যায়ভাবে অপরের অধিকার ও তার জান মালের উপর বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন না করতে পারে। সুতরা যেনা ব্যভিচারের অপরাধ প্রমাণ ও শাস্তি প্রয়োগ, চুরি, ডাকাতি ও হত্যার অপরাধ ও তার শাস্তির উপর কিয়াস করা যাবে না।

ইসলামিক দন্ডবিধির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাকরণ

উপরের সমাধানমূলক আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামী শরীয়তে শাস্তি বিধানের হেকমত ও রহস্য হচ্ছে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিস্ঠা করা এবং সার্বিকভাবে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষকে ফিৎনা ফাসাদ, অশ্লীলতা, বেহায়পনা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি ও অন্যায়ভাবে মানুষের জান-মালের উপর যুলুম ও অত্যাচার থেকে রক্ষা করা।

সুতরাং মানুষ তার স্বভাবগতভাবে মানুবিক দুর্বলতার কারণে যৈবিক তাড়নায় যে সকল অন্যায় ও পাপ কাজ করে থাকে, তার উপর ইসলামী শরীয়ত যে শাস্তির নির্দেশ দিয়েছে তা শুধু ঐ অন্যায় ও পাপ কাজের জন্যই দেয় নি। বরং তার ঐ পাপ কাজটি সমাজে প্রকাশ্যভাবে করে সমাজে অশ্লীলতা বেহায়পনার প্রসার ও ফিৎনা ফাসাদ সৃস্টি করার কারণে ইসলামী শরীয়ত এ ধরণের কঠোর শর্তের মাধ্যমে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করেছে যাতে সমাজে অশ্লীলতার প্রসার, ফিৎনা ফাসাদের সৃস্টি না হয়। কারণ কোন মানুষই তার দীর্ঘ জীবন ও যৌবনে এ ধরণের কাজ থেকে নিশ্চিতভাবে বিরত থাকার সিকিউরিটি দিতে পারে না। আবার কোন মানুষই সন্তস্টচিত্তে সেচ্ছায় এ ধরণের নিষিদ্ধ ও গর্হিত কাজ কতেও পারে না।

এ জন্যই একজন মানুষ যখন নির্দিধায় প্রকাশ্যভাবে এ ধরণের কাজ লোক চক্ষের সামনে করতে পারল তখন তাকে শুধুমাত্র একজন অপরাধী হিসেবে বা পাপকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না। বরং তাকে সমাজে ফিৎনা ফাসাদ সৃস্টিকারী এবং অশ্লীল ও গর্হিত কাজের প্রসারের মাধ্যমে সমাজের মানুষের আখলাক-চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তার উপর ইসলামী শরীয়তের সে কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে।

উপর্যুক্ত সমাধানমূলক আলোচনার দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, একজন মুসলমান তথা মুসলমান জাতিকে বুঝতে হবে যে, ইসলামী দন্ডবিধি মানুষের ভয়ভীতি ও আতঙ্ক সৃস্টি করার জন্য আসেনি, বরং ইসলামী বিধান আসবে সমাজে শাস্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য।

আর যখন একজন মুসলিম বা কোন একটি আদিবাসী সমাজ ইসলামিক বিধান বিশেষভাবে মানুষের স্বভাব ও মানুবিক দুর্বলতাবশত যৈবিক তাড়নার কৃত অপরাধের শাস্তির হেকমত ও রহস্য (অর্থাৎ সমাজে অশ্লীলতা প্রসারকারী এবং ফেৎনা ফাসাদকারীকে প্রতিহত করা এবং ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বিশেষ করে নিউ জেনারেশনের আখলাক, চরিত্র হেফাজত করা) সম্পর্কে অনুধাবন করতে পাবে। তখন সে বুঝতে পারবে যে, ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহ বিশেষ করে শাস্তি/দন্ডবিধি সমূহ শুধুমাত্র অপরাধীকে ঐ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য আসেনি। সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষের মাঝে শান্তির আভা ফিরিয়ে আনা এবং তাদের জান মাল ইজ্জত সন্মান আখলাক-চরিত্র ইত্যাদির যথাযথ হেফাজত করা।

উপর্যুক্ত আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রকাশ্যভাবে দিন দুপুর জনসম্মুখে এ ধরণের অশ্লীল ও গর্হিত কাজের কঠোর শাস্তি প্রয়োগের কারণ হচ্ছে কল্যাণের ভিত্তিতে সাধারণ জনগণ ও বিশেষভাবে প্রত্যক্ষদর্শীদের ইজ্জত সন্মান, মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা। আর তাদের কৃত কাজের উপর এ ধরণের কঠোর শাস্তির প্রয়োগই হচ্ছে তাদের এ ধরণের কাজ ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের উপর নিকৃস্টতম প্রভাবকারী জঘন্যতম অপরাধের দলিল। সুতরাং মানুষের সন্মান মর্যাদা ধ্বংসকারী ও মৌলিক অধিকার হরণকারী এবং বিশেষ ভাবে সমাজের দুর্বল শ্রেনী নারী সমাজ ও বালক-বালিকাদের আখলাক চরিত্র বিধ্বংসকারী জঘন্যতম অপরাধ তার চেয়ে নিকৃস্ট ও জঘন্য আর কি হতে পারে। এমন কি অনেক সময় এ ধরণের অপমানজনক অপরাধ সমাজে হিংসা, হানাহানি, বিদ্বেষ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভিন্ন ধরণের অপরাধের কারণ হতে পারে। এজন্যই আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন, ׂআর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়োনা। নিশ্চয় এটি অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ׃ (সূরা আল ইমরান: ৩২)। আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ব্যভিচারকারী নারী এবং পুরুষ তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করলে তাদের প্রতি তোমাদের মনে যেন দয়ার উদেদ্ধগ না হয়। যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখ׃ (সূরা আন নূরঃ ২)।

ইসলামী শরীয়ত এবং ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার গুরזত্বপূর্ণ একটি বৈশিস্ট্য হচ্ছে মানুষের মানবিক স্বাধীনাতার অর্থ ও তাৎপর্য এবং তার পরিধি সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান। আর ইসলামের এ দিক নির্দেশনা বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থার মত নয়। কারণ বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মানবিক স্বাধীনতার সঠিক অর্থ ও পরিধি এবং সামাজিক নিয়ম নীতি ও ব্যবস্থাপনার সঠিক তাৎপর্য স্হান পায়নি। যার কারণে বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থা মানুষের মানবিক সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে মানুষের সমাজ ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যার বাস্তব চিত্র আমরা অতীতের অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে দেখতে পাই। অথচ প্রাকৃতিক জগত, প্রাণি জগত, জড়জগত ও মানবজগত তথা সৃস্টিজগতের সবকিছুই কিছু মূলনীতি ও সিস্টেমের উপর প্রতিস্ঠিত। আর এ মূলনীতি ও সিস্টেমের রয়েছে কিছু তাৎপর্য, বিধি-বিধান ও তার সীমা-পরিধি সেই সিস্টেম ও মুলনীতি বহির্ভূত নতুন কিছু নয় অতএব সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিৎ সমাজের সেই পরিধির আওতায় থেকে সামাজিক নিয়ম নীতি ও বিধি বিধানকে মান্য করে জীবন যাপন করা। অন্যথায় সেই সমাজ অবশ্যই ধ্বংস ও অধঃপতনে পতিত হবে। যার বাস্তব উদাহরণ আমরা মানবিক ও আত্মিক মূল্যহীন বৈষয়িক সমাজ ব্যবস্থার উপর পরিচালিত অনেক সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে দেখতে পাই। যেকানে ব্যক্তি পরিবার এবং সমাজে নৈতিক অবয়ের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। যেভাবে ধ্বংস হয়েছে পূর্ববর্তী অনেক জাতি ও সমাজ।

অপরদিকে আমরা দেখতে পাই যে, যে সকল অপরাধ মানুষের মাল-সম্পদ এবং হত্যাকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত যেমন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকান্ড ইত্যাদি অপরাধের শাস্তি, মানুষের মানবিক দুর্বলতা ও যৈবিক তাড়নায় কৃত অপরাধের শাস্তির চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। আর তার কারণ হচ্ছে চুরি, ডাকাতি ও হত্যা ইত্যাদি অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ করে সরাসরি অপরাধীকে ঐ ধরণের শাস্তযোগ্য অপরাধ থেকে বিরত রাখা এবং মানুষের জান মালের হেফাজতের জন্য। সমাজে অশ্লীলতা আর গোপনীয়তা প্রকাশ করার জন্য নয়। এ জন্যই চুরি, ডাকাতি ও হত্যাজনিত অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ সাধারণ সরল সোজা মানুষের মনে ভীতি সঞ্ঝা করে না। কারণ সাধারণ সরল সোজা মানুষের অন্তরে কখনও চুরি, ডাকাতি ও অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা এবং নিস্পাপ মানুষকে হত্যা করার ইচ্ছা ও কল্পনা থাকে না। কিন্তু সাধারণ সরল সোজা মানুষের মনে সাধারণত: এ ভয় ও আতঙ্ক সবসময়ই থাকে যে, যেকোন সময় তার মাল-সম্পদ চুরি বা ডাকাতি হয়ে যেতে পারে এবং যেকোন সময় তার উপর কেউ আক্রমন করে বসতে পারে। এ জন্যই যখন চুরি, ডাকাতি বা ইত্যাদির শাস্তি প্রয়োগ করা হয় তখন সে তার পক্ষে সাড়া দেয়। কারণ তাতে মানুষের জান-মাল ও সম্পদের নিরাত্তা হয় এবং সমাজে শান্তি প্রতিস্ঠা হয়।

শাস্তি প্রয়োগের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অপরাধ দমন, প্রতিশোধ গ্রহণ নয়

ইসলামী শরীয়তের মূল লক্ষ্যও উদ্দেশ্য হচ্ছে ফিৎনা ফাসাদ এবং বিশৃঙ্খলা থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের নিরাত্তা প্রদান করা। শাস্তি প্রদান ও প্রতিশোধ গ্রহণ ইসলামী শরীয়তের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নয়। বরং সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করাই মূল লক্ষ্য অর্থাৎ শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠা হয় সেই পরিমাণ শাস্তি প্রয়োগই হচ্ছে শরীয়তের কাম্য। এ জন্যই ইসলামী শরীয়ত নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদেরকে রক্তপণ ক্ষমা করে দেয়ার অনুমতি দিয়েছে এবং ক্ষমা করাকে উৎসাহিত করেছে। কারণ ক্ষমা বিষয়টি মানুষের ক্ষমতা থাকা সত্তেও শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার জন্যই করে থাকে এবং তাতে প্রতিশোধের কোন ধরণের অবকাশও থাকে না।

এ জন্যই রাসূল (সা:) এরশাদ করেন, ׂসন্দেহের কারণে তোমরা যতদূর সম্ভব হুদুদ (শাস্তি) কে দূর কর׃ (তিরমিজি, ইবনে মাযা, বায়হাকী ও অন্যান্য গ্রন্হ)। ইবনুল মুনজির বলেন, সকল আলেমদের মত, সন্দেহের কারণে শরীয়তের হুদুদ (শাস্তি) রহিত হয়ে যায়। (রাওজুন মুরাব্বা এর টিকা, খন্ড: ৭, পৃ: ৩২০)

ইসলামী শরীয়তের সর্বনিম্ন কাম্য শাস্তি প্রয়োগের উপর ভিত্তি করে একথা বলা যাবে না যে, এ ধরণের শাস্তি প্রয়োগ ইসলামী শরীয়তের বিধি বিধান বাস্তবায়নে শিথিলতার নামান্তর। যা ইবাদত, যিকির-আযকারের ক্ষেত্রে ও অবহেলিত ও শিথিলতা সৃস্টি করবে। কারণ শাস্তি প্রয়োগের বিধান আর ইবাদত ও যিকির আজকারের বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইবাদত ও যিকির আযকার ফরজ করা হয়েছে আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক সৃস্টি করে দেয়ার জন্য। আর প্রত্যেকটি মানুষ বেশি করে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃস্টি করার মুখাপেক্ষী। এ জন্যই ইসলামী শরীয়ত অতিরিক্ত ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তস্টি অর্জন ও তার নৈকট্য লাভের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যেমন, সুন্নত, নফল, তাহাজ্জুদ, তারাবির নামাজ, ইতেকাফ, শাওয়ালের ৬টি রোজা মহাররমের নবম, দশম তারিখের রোজা এবং প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজাসহবিভিন্ন ধরনের নফল ইবাদত ও যিকির আযকারের প্রতি উৎসাহিত করেছে। যাতে মানুষ তাদের সাধ্যানুযায়ী এ সকল নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও তার সাথে সম্পর্ক সৃস্টি করতে পারে। সুতরাং ইসলামে সর্ব নিম্ন কাম্য শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যখন অপরাধ দমন হচ্ছে তখন তা ইবাদত, যিকির আযকারের বিধি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে না। কারণ ইবাদত, যিকির আযকার মানুষের উপর ফরজ করা হয়েছে, যাতে মানুষ ফরজ কাজগুলো যথাযথ ভাবে আদায় করে তার সাথে সাধ্যানুযায়ী অতিরিক্ত ও নফল ইবাদত ও যিকির আজকারের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে।

তেননিভাবে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কাম্য শাস্তি বিধান এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে সর্বোনিম্ন বিধান যদিও এক নয়, তথাপি তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একটা সামঞ্জস্যতা রয়েছে। আর তা হচ্ছে ইসলামী দন্ডবিধি অপরাধীকে শাস্ত প্রদান এবং তার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আসে নি। বরং অপরাধ দমন এবং প্রতিবন্ধকতা সৃস্টি করার জন্য এসেছে। আর ইবাদতের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার তৌফিক কামনার প্রতি অনুপ্রেরণা প্রদান করা। এ জন্যই ইসলামী শরীয়ত মানুষের উপর ইবাদতের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বিধান ׂফরজ׃ এর দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এবং অশ্লীলতা, বেহায়পনা, পাপাচারিতা, যুলুম, নির্যাতন ইত্যাদি থেকে নিজেকে হেফাজত করে সাধ্যানুযায়ী ভাল, সৎ ও উত্তম কাজ এবং বেশী করে নফল কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তস্টি ও নৈকঠ্য লাভের প্রতি উৎসাহিত করেছে।

আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন, ׂহে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর এবং সকাল বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা কর। তিনিই তোমাদের প্রতি রহম করেন এবং তার ফেরেশতাগণ ও তোমাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন; অন্ধকার থেকে তোমাদেরকে আলোকে বের করার জন্য। তিনি মুমিনদের প্রতি পরম দয়ালূ (সূরা আহযাব ; ৪১-৪৩)।

আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, ׂআর নামাজ কায়েম কর। নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেস্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা যা কর׃ (সূরা আল আনকাবুত : ৪৫)

আল্লাহ আরো এরশাদ করেন, আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বিচার দিবসকে মিথ্যা বলে? সে সেই ব্যক্তি যে এতীমকে গলা ধাক্কা দেয়। এবং মিসকীনকে অন্ন দিতে উৎসাহিত করে না। অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজীর। যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে বে-খবর। যারা লোক-দেখানোর জন্য করে এবং নিত্য ব্যবহার্য বস্ত্ত সামগ্রী অন্যকে দেয় না।׃ (সূরা মাঊন :১-৭) হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্নিত; তিনি বলেন, অনেক রোজাদার আছেন, যাদের রোজা শুধুমাত্র উপবাস থাকা ছাড়া আর কিছু নয়। এবং অনেক তাহাজ্জুদগুজার আছেন, যাদের তাহাজ্জুদ শুধুমাত্র রাত্রি জাগরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। (সুনানে নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ)।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা ইসলামী শরীয়তের শাস্তি বিদানের ধরণ ও স্বভাব সম্পর্কে জানতে পারলাম, আরো জানতে পারলাম যে, ইলমে অহীর দিক নির্দেশনার সাথে প্রকৃতি ও স্বভাবের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তের দন্ডবিধির প্রদান লক্ষ্য উদ্দেশ্য অনুধাবন করা যাবে। আর তারই ফলশ্রুতিতে ইসলামী শরীয়তের শাস্তি বিধান, শান্তিֽ নিরাপত্তার উৎস স্হলে পরিণত হবে।

অপরদিকে ইসলামী শরীয়তের প্রধান লক্ষ্য উদ্দেশ্য না বুঝে তাকে বিকৃত করে ভয়ংকর আকারে আংশিকভাবে উপস্হাপন, সাধারণ মানুষের মন থেকে শান্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতিকে হারিয়ে ভয়ভীতি আর আতংকের সৃস্টি করবে। যার ফলশ্রুতিতে বুঝে হউক আ না বুঝে হউক তাদেরকে তাদেরই ধর্মের উপর আস্হাশীল হয়ে সে ধর্মের উপরই অবিচল থাকার প্রতি উৎসাহিত করে। আর এর ভয়াবহতা ও ক্ষতিকারক দিক সমূহ একজন পাঠকের সামনে পরিস্কার। আর ইসলামী শরীয়তের শাস্তি বিদানের ক্ষেত্রে আমার এ ধারণা নিছক ইসলামী শরীয়তের উদ্ধৃতি সমূহের উপর গবেষণা ও চিন্তা ভাবনার দ্বারাই সৃস্ট নয়। বরং বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক স্বভাব সমূহের উপর গভীর গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। যা আমাকে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো বিবেচান করে ইসলামী শরীয়তের শাস্তি বিধানের উদ্ধৃতি সমূহের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে সহায়তা করেছে।

আর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিষয়াবলী নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐক্য, অনৈক্য ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকা সত্ত্বেও আমার এ গবেষণা ও চিন্তা ভাবনা একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা। যা স্হান-কাল-পাত্রভেদে পরিবেশ, প্রকৃতি ও স্বভাবগত দিক অনুধাবন করে তাদের মধ্যে এবং ইলমে ওহীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের একটি নতুন রূপদান করতে সক্ষম হয়েছে।

সর্বোপরি আমার এ গবেষণা ও চিন্তা ভাবনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হচ্ছে যে, এ গবেষণা ইসলামী শরীয়তের দন্ডবিধি তাৎপর্য অনুধাবন ও তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এমন একটি পদ্ধতি তৈরী করতে সক্ষম হযেছে, যার প্রতি সাধারণ মানুষের উপর চাপানো ভয়ভীতি ও আতঙ্ক দূরীভূত করে তাদের অন্তরে শান্তি ও সমাজে নিরাপত্তা প্রতিস্ঠার জন্য খুবই প্রয়োজন।

আর আশা করা যায় যে, স্হান-কাল পাত্রভেদে সর্বদিক বিবেচনা করে ইলমে ওহী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ ব্যাপক ধরণের কারিকুলামটি যেভাবে মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কারিকুলাম ও পাঠ্যসিলেবাস বাস্তবায়ন করার চেস্টা করছে, তেমনিভাবে যদি সমাজের সর্বক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা যেত। তাহলে সমাজে বিরাজমান বৈষয়িক নৈতিবাচক প্রভাব ও জটিল সমস্যাবলী দূরীভূত করে সমাজের সভ্যতা সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাবের মাধ্যমে একটি আদর্শ শক্তিশালী সমাজ গঠন করা সম্ভব হত।

কারিকুলামগত আলোচনা

ছাত্রাবাস সমস্যা সমাধান সম্পর্কে সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনার ফলে ইসলামী শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের দিক নির্দেশনা এবং তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। যার কারণে এ গবেষণা, সামাজিক ব্যবস্থাপান এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে একটি দিক নির্দেশনামূলক মূলনীতিতি পরিনত হয়েছে। এজন্য লেখক আশা করেন যে, এ গবেষণা পদ্ধতিটি যেন কার্যকর হয়। এবং মুসলিম সমাজের সামাজিক বিভিন্ন দিক ও বিভিন্ন বিষয়ে অনুশীলন করা হয়। যাতে আবারও সামাজিক ভিত্তির পুন: গঠন, নতুন শক্তির সঞ্ঝার এবং সামাজিক প্রতিনিধিত্বমূলক উন্নয়ন সম্ভব হয়। এবং পরিপূর্ণ ইসলামী নির্দেশাবলী ও তার স্হায়ী বিধানাবলীর ভিত্তিতে সমকালীন বিষয়াদির প্রতি আবারও দৃস্টি দেওয়া করা যায়। যাতে ইসলামী শরীয়তের উদ্ধৃতি সমূহ ও যথার্থ পদ্ধতির আলোকে সমকালীন ঘটনাবলী ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জসমূহ অনুধাবন করে এর সঠিক সমাধান মূলক বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। তা হলেই ইসলাম ও ইসলামী শরীয়ত এবং তার বিধানাবলী উম্মাহর জন্য নতুন করে হেদায়েতের সঠিক প্রদীপ হিসেবে পরিণত হবে। এমনকি মানব জগতে নতুন করে প্রতিনিধিত্বমূলক ও কল্যাণকর মানব সভ্যতার বিকাশ সাধন করবে।

ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহের মধ্যে কোনটি পরিবর্তনশীল আর কোনটি পরিবর্তনশীল নয় সেটি বড় বিষয় নয়। বরং সবেচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কিভাবে ইসলামী শরীয়তের বিধান সমূহকে অনুধাবন করে মানুষের সমাজে উপস্হাপন করা যায় এবং কিভাবে সেই বিধানগুলোর মাধ্যমে সভ্যতা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে জাতির লক্ষ্য উদ্দেশ্যগুলো বাস্তবায়ন করা যায়।

লেখকের মতে, তার এ অভিজ্ঞতার বিশেষ ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটদের গঠন ও তাদের সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে। তাতেই রয়েছে লেখকের অভিজ্ঞতা ও সফলতার বাস্তব ও জীবন্ত উদাহরণ। যার রূপদান করেছিল সবকিছুর সমন্বয়ে গঠিত বাস্তব ভিত্তিক ইসলামিক সেই কারিকুলাম। যার কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল ইসলামিক জ্ঞানের উৎসের এককত্ব অর্থাৎ ইলমে ওহী ও জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের ভিত্তি করে এবং যার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল ন্যায় নীতির ভিত্তিতে, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিস্ঠা মধ্য দিয়ে একটি আদর্শ ও শক্তিশালী সমাজ গঠন করা।

সর্বশেষ আপডেট ( Saturday, 07 November 2009 )