মুসলিম বোন ও পর্দার হুকুম
লিখেছেন শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ   
Thursday, 19 June 2008

ভূমিকা

আল্লাহর কোন সৃষ্টিই বেপর্দা নয়। এই পৃথিবীর পর্দা নীল আকাশ, যাকে আমরা আসমান বলি। এই যমিনের বেষ্টনীতে আছে যত নদ-নদী, হাওর, সাগর-মহাসাগর তাতে আছে যত সম্পদ আর প্রাণী, নানা জাতের আর আকারের মাছ, তাদের ও আল্লাহ তায়ালা পর্দার মধ্যে রেখেছেন, পানির পর্দা দিয়ে। বনের জন্তু জানোয়ারকে রাব্বুল আলামীন বনের পর্দা দিয়ে রেখেছেন। কোন ফল এমন নেই যে ফলের পর্দা নেই। যে ফুল সুবাস ছড়ায় সেও তার সৌরভ লুকিয়ে রাখে কলিতে।

এভাবে গোটা সৃষ্টিই রয়েছে পর্দায় পরিবৃত। মানুষ নিশ্চয়ই নয় এর ব্যতিক্রম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাই নারী পুরষকে সম্ভ্রম আর নৈতিকতার পর্দার অনুভূতি দিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। চোখের পর্দা, শ্রবন শক্তির পর্দা, বিবেকের পর্দা ভাল মন্দ পরখ করার জ্ঞানের পর্দার ব্যবসা আল্লাহ পাক আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করে রেখেছেন। নারীর জন্য সে ব্যবসা দিয়ে তিনি সুষ্পষ্ট নির্দেশনাও দিয়েছেন। সেই পর্দার চমৎকার বর্ণনা রয়েছে এই পুস্তিকায়। আর প্রিয় ছাত্র শাহওয়ালী উল্লাহ পুস্তিকাটি তৈরী করে সময়ের একটি দ্বীনি ও সামাজিক চাহিদা পূরণ করলো। সে এরই মধ্যে-বেশ কয়েকটি এই প্রণয়ন ও কিছু মূল্যবান বইয়ের সার্থক তরজমা করেছে। আল্লাহ তায়ালা তাকে বিশেষ করে লেখনীর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের আরও বেশী খেদমতের তৌফিক দ্বিনী এবং দুনিয়া ও আখেরাতে এর বিনিময় দান করুন। আমিন।

সাইয়েদ কামালুদ্দিন জাফরী
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ
জামেয়া কাসেমিয়া নরসিংদি
সদস্য-সচিব
শরীয়া কাউন্সিল
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

নিবেদন

মানবজীবনে পর্দা একটি বাস্তব প্রয়োজন, বিশেষ করে নারী চরিত্রের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভূষণ।

আল্লাহ তায়ালা যেমন মেয়েদের প্রতি আবশ্যক করেছেন পর্দাকে তেমনি করেছেন পুরুষদের প্রতিও।

কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, নারীদের পর্দাই আজকে সবচেয়ে বেশী পরিত্যক্ত, উপেক্ষিত। আবার কোথাও কোথাও ঘৃণিত এবং সেকেলে হিসেবে কথিত।

অথচ পর্দা হলো

সকল সামাজিক বিধি-বিধানের একত্রিভূত এমন একটি ঠিকানা বা সূত্র যা দিয়ে মহিলা ও পুরুষ সবাই ইসলামী সমাজ ও জীবন ব্যবস্হার শৃঙ্খলা এবং বিধানের আওতাভূক্ত হতে আর সেই অনুযায়ী বাস্তব জীবন চালাতে বিশেষভাবে সক্ষম হয়।

মূলত, সমাজ ও জীবনকে নিস্কলুষ ঝামেলামুক্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার জন্যেই আল্লাহ তায়ালা এই পর্দা ব্যবস্হাকে অবধারিত করে দিয়েছেন।

আশা করি এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটুকু প্রকৃত অবস্হা অনুধাবন করতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে। তবেই সার্থক হবে আমাদের শ্রম। আল্লাহ আমাদের পর্দা করার তওফিক দিন। আমিন!!!

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুসলিম বোন ও পর্দার হুকুম

নিখিল বিশ্বের একমাত্র সৃজন, রক্ষণ, পালন এবং বিবর্ধন কর্তা মহান আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা জ্ঞাপন করছি, সাথে সাথে দরূদ ও সালাম পেশ করছি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল আম্বিয়াকূল শিরোমণি মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ এর প্রতি , তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবী ও অনুসারীগণের প্রতি।

মুসলিম বোন! কে তোমাকে পর্দার আদেশ দিয়েছেন?

অবাক হয়ো না---

* জনৈক ছাত্রী তার এক সহপাঠিনীকে পর্দাবিহীন (হিজাববিহীন) অবস্হায় মাষ্টার্সের মৌখিক পরীক্ষায় তার সাথে যেতে আহবান জানায়, যে পরীক্ষাটি ছিল শুধু পুরষ শিক্ষকদের সাথে। বান্ধবীর অনাগ্রহের আভাষ পেয়ে আহবানকারিনী বলে উঠল : “ওহে --- তুই কি জানিস না, আমরা তো বিংশ শতাব্দীর মানুষ!”

* জনৈক মহিলা ডাক্তার হাসপাতালে যখন ডাক্তারদের বিশেষ পোষাক পরিধান অবস্হায় ছিল, তখন মনে হচ্ছিল লজ্জা-শরম যেন অনেক আগেই তার থেকে পালিয়ে গেছে। সে তার কেশ সহ অবয়বকে খুলে দিয়েছিল এবং ক্রমেই নিজের পরিধেয় বস্ত্র গুটিয়ে নিচ্ছিল। সে যেন বুঝাতে চাচ্ছিল এটাও ডাক্তারী বিদ্যার জন্যে অপরিহার্য, যে ব্যক্তি তার দ্বীন থেকে দূরে সরে যাবে এবং মহিলারা তার লজ্জা নিবারণ ও ইযযত আবরু রক্ষার পর্দাকে দূরে নিক্ষেপ করবে।

* একবার কয়েকজন আত্মীয় আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছিলেন। যারা স্বভাবতই ছিলেন বিনয়ী এবং পর্দার ব্যাপারে উৎসাহী। কিন্তু হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখলাম, তাদের ড্রাইভার তাদের মধ্য এসে ঢুকলো এবং তাদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে বসে পড়লো। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা কোনই ভ্রক্ষেপ করলেন না। অবস্হা দেখে মনে হল, তারা ভাবেন এর সাথে পর্দার করার কোন প্রয়োজন নেই।

বোন হে,

তুমি কি ধারণা করতে পারো ঐ সমস্ত মহিলারা কি জানে, কেন তারা পর্দা করবে? উপরোল্লেখিত ঘটনাবলী এবং অনুরূপ ঘটমান অসংখ্য অবস্হা এটাই প্রমাণ করে যে, তাদের কেউ পর্দাকে বিশেষ সামাজিক কালচার বলে দেখেন, যা সামাজিক ভদ্রতার উত্তরাধিকার সূত্রেপ্রাপ্ত।

আবার কেউবা এটাকে তার পিতার কিংবা স্বামীর প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনার্থে ব্যবহার করেন যারা তাদের পর্দার নির্দেশ দেন। আবার কেউবা মনে করেন, যে এটা হলো একটি বিশেষ ঐতিহ্য এবং যুগ যুগ ধরে প্রতিপালিত হয়ে আসা একটি কাজ যার সংরক্ষন ও পালন জরুরী।

কিন্তু (বোন হে) ঐ সকল মহিলারা কি কখনও নিজেরদের প্রশ্ন করেছে যে, তারা কেন পর্দা করবে? পর্দা করাটা কার আনুগত্য?

তাহলে শুনে নাও, এটা হল সেই মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আনুগত্য যিনি তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদকে (সাঃ) সূরা আহযাবের ৫৯ আয়াতে এরশাদ করেছেন :

অর্থাৎ “হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মু’মিন মহিলাগণকে বলে দিন, তারা যেন উপর দিক থেকে (নিজেদের মুখমন্ডল ও বক্ষদেশের উপর) নিজেরদের চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়, এতে তাদের চেনা সহজতর হবে। ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্‌যাব, ৩৩ : আয়াত ৫৯)

উল্লেখ্য “তারা যেন নিজেদের উপর নিজেদের চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়” এর অর্থ হলো- চাদর দিয়ে যেন উপর থেকে ঢেকে নেয়। অন্যকথায় মুখমন্ডল ও বক্ষদেশ অনাবৃত রেখে যেন বের না হয়। অনুরূপ “এতে তাদের চেনা সহজতর হবে” এর অর্থ হলো- তাদেরকে এই সরল ও শালীন পোষাক পরিহিতা দেখে প্রত্যেকে এ কথা সহজেই বুঝে নেবে যে, তারা সম্ভ্রমশীলা মহিলা, তারা উচ্ছৃঙ্খল ও খেলাড়ি স্ত্রীলোক নয়। তাই যে কোন দূরাচার নিজের অন্তরের বাসনা তাদের দ্বারা পূর্ণ করার আশা করবে না।”

তদ্রূপ “তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না” এ মর্মার্থ হলো-তারা সম্ভ্রান্ত ও বিশেষ মূল্যবোধের অধিকারীনী বলে পরিচিত হওয়ায় অশালীন আমন্ত্রণের লক্ষ্য হবেনা।

বোন হে,

তারা কি জানে যে, এটা হলো তাদের সৃষ্টিকর্তা ও রিযক্বদাতার আদেশের বাস্তবায়ন। যিনি আকাশ ও যমীনের একমাত্র স্রষ্টা এবং নিয়ন্ত্রা। যিনি সর্বাধিক অবহিত কিসে তার সৃষ্টির কল্যাণ ও সংশোধন নিহিত আর কিসে নয়।

আল কোর’আনের ঘোষণা হলো :

“আকাশ ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর।” (সূরা বাক্বারা, ২: আয়াত ২৮৪)

বোন হে,

তিনি হলেন তাদের, তোমার এবং আমাদের, তথা সকলের স্রষ্টা, যে সম্পর্কে আল-কোর’আনের ঘোষণা :

“তিনিই তো আল্লাহ! তোমাদের সৃজন-রক্ষণ ও পালন ও বিবির্ধন কর্তা। তিনি ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কোন সত্তা (মা’বুদ) নেই। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা তারই ইবাদত (গোলামী) কর। আর তিনিই সব জিনিসের উপর দায়িত্বশীল (তত্ত্বাবধায়ক)।” (সূরা আল আন’আম, ৬ : আয়াত ১০২)

তিনি তোমার, তাদের তথা সকলের প্রতি নি’আমত দানকারী অনুগ্রহশীল।

আল কোর’আনের ভাষায় :

“তোমরা যে সকল অনগ্রহ ভোগ করা তা আল্লাহর নিকট হতেই এসেছে।”(সুরা নাহ্‌ল, ১৬ : আয়াত ৫৩)

তিনি সেই সত্তা যিনি তোমাকে তাদেরকে তথা সকলকে মৃত্যু দানকারী।

আল কোর’আনের ভাষায়-

“মৃত্যু যন্ত্রণা নিশ্চিতই আসবে। আর এ তাই, যা থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলে।” (সূরা ক্বাফ, ৫০ : আয়াত ১৯)

তিনি সেই পরাক্রমশালী সত্তা যিনি নিজেই আল কোর’আনে ঘোষণা করেছেন :

“সেই দিন দয়াময়ের কাছে পরহেজগার তথা মুত্তাকিদের অতিথিরূপে সমবেত করবো। আর অপরাধীদের তৃষ্ণাতুর অবস্হায় জাহান্নামের দিকে হাকিয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারইয়াম, ১৯ : আয়াত ৮৫-৮৬)

তিনি হলেন সেই ভয়াবহ পরিণাম দিবসের একমাত্র অধিকর্তা ও বিচারক। আল কোর’আনের ভাষায় সেই দিনের চিত্র হল :

“সেদিন তোমরা দেখতে পাবে যে, প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী (দুধ দানকারীনী) নিজের দুগ্ধপোষ্য সসন্তানকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর গর্ভ খসে পড়বে আর লোকদের দেখতে পাবে নেশাবিহীন অবস্হায়ই মাতাল সদৃশ উদভ্রান্ত। (এটাই হল কিয়ামতের সংক্ষিপ্ত চিত্র)। তবে জেনে রেখ, বস্তুত আল্লাহর শাস্তি খুবই কঠিন।” (সূরা হাজ্জ, ২২ : আয়াত২)

তিনি সেই পুত পবিত্র সুমহান সত্তা, যিনি; ঘোষণা করেছেন :

“সে দিন আমি জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবো, তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? সে বলবে আরও আছে কি? অপরদিকে জান্নাতকে মুত্তাকীদের অতি নিকটে উপস্হিত করা হবে। কোন দূরত্ব ছাড়াই। ” (সূরা ক্বাফ, ৫০ : আয়াত ৩০ ও ৩১)

মুসলিম ভগ্নি হে,

তুমি কি কখনও আল্লাহর সেই ঘোষণা শুনেছ বা পাঠ করেছ? আল কোর’আনের ভাষায়-

“হে মুহাম্মদ (সা:)! মু’মিন স্ত্রী লোকদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং নিজেদের যৌনাঙ্গের হিফাযত করে ও নিজেরা সাজসজ্জা প্রদর্শন না করে কেবল সেই সব জিনিস ছাড়া যা আপনা হতেই প্রকাশিত হয়ে পড়ে। আর অবশ্যই তারা তাদের গ্রীবা ও বৰদেশের উপর নিজেদের ওড়না (মাথার কাপড়) ফেলে রাখবে এবং অবশ্যই তারা তাদের স্বামী, পিতা শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, তাদের সতী সচ্চরিত্রবান বান্ধবীগণ এবং তাদের আপন দাসীগণ, যৌন কামনামুক্ত পুরষ এবং নারীদের যৌনাঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারও কাছে স্বীয় সৌন্দর্য প্রদর্শনের লক্ষে নিজ আবরণ প্রকাশ না করে এবং তারা যেন তাদের গোপন অঙ্গ আর সাজসজ্জা প্রকাশার্থে জোরে জোরে না হাঁটে। হে মু’মিনগণ! তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা নূর, ২৪: আয়াত ৩১)

ইমাম বুখারী (রহ:) আয়িশা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ্‌ তা’আলা প্রথমেই মুহাজিরা মহিলাদের প্রতি রহম করবেন, কেননা তারা যখনই আল্লাহ্‌র এই ঘোষণা, “আর অবশ্যই তারা তাদের গ্রীবা ও বৰদেশের উপর নিজেদের ওড়না (মাথার কাপড়) ফেলে রাখবে”, শুনতে পেয়েছে তখন থেকেই নির্দ্বিধায় এর উপর ‘আমল শুরু করে দিয়েছে এবং সে জন্যে নিজেদের ওড়নাকে করছে অনেক লম্বা ও প্রশস্ত।

বোন হে,

তুমি বলবে কি, আমরা তাদের থেকে কত দূরে আছি?

যদি সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও সংকল্পের সাথে বাসৱব কাজে আমরাও অবতীর্ণ হই, তাহলে আমাদের সমাজও পরিণত হবে তাদের সমাজের মত ফিৎনা ও ফাসাদহীন সুখী সুন্দর সমাজে। এর এটা আশ্চর্যের কোন বিষয় নয় বরং কবি এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে বলেছেন :

অর্থাৎ-ভাল লোকের মত না হতে পারলেও হতাশ হয়ো না বরং তাদের সদৃশ হওয়ার চেষ্টা কর। কেননা ভাল হওয়ার চেষ্টাটাই কল্যাণের দরজা খুলে দেয়।

বোন হে,

রাসূলুল্লাহ‌ (সা:) এর স্ত্রীগণ তথা উম্মাহাতুল মু’মিনীনগণের ব্যাপারে আল্লাহ্‌র সেই ঘোষণা কি তুমি শুনেছো? যা বিশ্বের সকলের জন্যে শিৰা স্বরূপ এবং অবশ্য পালনীয়। আল্লাহ্‌ তা আলা বলেন :

“তোমরা নবীর সহধর্মীনীগণের নিকট কোন কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাদের অনৱরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ।” (সূরা আহ্‌যাব, ৩৩: আয়াত ৫৩)

বোন হে,

অধিকতর পবিত্রতার কারণ কাদের অন্তরের জন্যে?

পবিত্রতার কারণ, অতি পুত-পবিত্র আত্মা তথা নবী কারীমের (সা:) স্ত্রীগণের জন্যে। যারা হলেন-সকল মু’মিন-মু’মিনাদের মাতৃতুল্য বা উম্মাতুল মু’মিনীন। যারা ছিলেন আল্লাহ্‌র রাসূল মুহাম্মদ (সা:) এর অতি পুত-পবিত্র সচ্চরিত্রশীল সাহাবীগণের অন্তর্ভূক্ত। এই উম্মাতের মদ্যে আমাদের নবীর পরেই যারা সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারিনী।

এবার চিন্তা কর। বর্তমান যুগে আমাদের অন্তরাত্মার অবস্হান কোথায়? আমরা ও আমাদের সমাজ কোথায় আছে?

যিনি নিজে স্রষ্টা। তার চাইতে কি সৃষ্টির পবিত্রকরণের পন্থা সম্পর্কে অন্য কেউ অধিক অবহিত হতে পারে?

ওহে মু’মিন বোনটি,

আল্লাহ্‌ তা’আলা পবিত্র কোর’আনে তার প্রিয় নবী মুহাম্মদকে (সা:) উদ্দেশ্যে বলেন : “হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মু’মিনদের মহিলাগণকে বলে দিন-তারা যেন (উপর দিক থেকে) নিজেদের (মুখমন্ডল ও বক্ষদেশের) উপর নিজেদের চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে। ফলে, তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা আহ্‌যাব, ৩৩ : আয়াত ৫৯)

রাইসুল মাফাচ্ছেরীন আবদুল্লাহ্‌ বিন আব্বাস (রা:) বলেছেন: (উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ্‌ তা’আলা) ঈমানদার মহিলাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, যখনই তারা বিশেষ কোন প্রয়োজনে বাইরে বের হবে, তখন যেন তারা নিজেদের চাদর দিয়ে উপর থেকে নিজেদের মুখমন্ডলকে ঢেকে দেয়, এমন ভাবে যাবে করে বক্ষদেশও আবৃত হয়।

আল আল্লাহ্‌ সুবহানানু ওয়া তা’আলা ঈমানদার মহিলাকে এমন নির্দেশ এ জন্যই দিয়েছেন যাতে করে তাদের পোশাক-হিযাব বা বোরকাই তাদের সাধ্বী ভদ্র ঐতিহ্যময়ী মহিলা বলে পরিচয় করে দেয় এবং খারাপ ও দুষ্ট লোকদের মনে এটে দেয় হতাশার ছায়ায় আবৃত নিরাশা যাতে করে তারা ইচ্ছায় অনিচ্ছায় বাধ্য হয় তাদের সম্মান ও মর্যাদা করতে।

এবার আল্লাহ্‌র কালাম ও দুনিয়ার বাস্তবতার দিকে লক্ষ করে দেখুন। যারা রাস্তায় মসকারী, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, ছিনতাই ও ব্যাভিচারের সম্মুখীন হয়, তারা একমাত্র রূপ-সৌন্দর্যের প্রদর্শনকারীণীরাই। তাদের বেহায়পনা ও উচ্ছৃংখলাতাই এ জন্য দায়ী।

নিম্নোদ্ধৃত আল্লাহ্‌র ঘোষণার উপর একটু চিন্তা কর। আল্লাহ্‌ তা’আলা আল কোর’আনে এরশাদ করেছেন: “বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না তারা যদি নিজেদের চাদর খুলে রাখে, তাহলে তাদের কোন (অপরাধ) গুণাহ্‌ হবে না। তবে শর্ত হলো, তারা স্বীয় রূপ-সৌন্দর্যের প্রদর্শনকারিণী হিসেবে তা খুলতে পারবে না। তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। আর আল্লাহ্‌ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা নূর, ২৪ আয়াত ৬০)

সুমহান, পূত-পবিত্র সত্তা, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন উল্লেখিত আয়াতে আমাদের সামনে এই ঘোষণা দিচ্ছেন যে, যে সকল মহিলা যৌবনকাল অতিবাহিত করে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে এবং বার্ধক্যের কারণেই বিবাহের আর কোন আশাও করে না। অর্থাৎ, পুরষদের আকৃষ্ট করার মত কোন কিছুই আর তাদের কাছে অবশিষ্ট নেই, তারা কখনও স্বীয় রূপ-সৌন্দর্য প্রকাশার্থে গায়ের মুহরেমের (যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ) সামনে স্বীয় চাদর খুলে রাখবে না। যদিও সাধারণভাবে চাদর খুলে রাখার অনুমতি এবার বলত, আমাদের অবস্হাটা কি?

হে বোন,

তুমি তোমার মা, উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা (রা:) এর কথার দিকে একটি মনোযোগ দাও এবং শুন, যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্‌কে (সা:) প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মেয়েরা নিজেদের কাপড়কে (পোষাক বা বোরকা) কতটুকা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিবে?’

তখন তার উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছিলেন, ‘তারা স্বীয় পদতালুর সামনে অর্থাৎ, গোড়ালীর নিচে রেখে কাপড় পরবে। ‘ উম্মুল মু’মিনীন পুন: প্রশ্ন করলেন যে, যখন তারা লম্বা কদমে হাঁটবে? (তখন কাপড় তো উঠে যাবে, সে সময় কি করবে?) উত্তরে রাসূল (সা:) বললেন, ‘তারা কখনও এক হাতের বেশী লম্বা কদমে হাঁটবে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)

(সুবহানাল্লাহ্‌!!)।

উম্মুল মু’মিনীনগণ সর্বদাই নিজেকে আবরম্ন রাখার জন্যে স্বীয় কাপড় লম্বা করে পরার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। কিন্তু আমাদের মহিলারা শুধু খাট করে পরাতেই ব্যস্ত, আর এ ব্যাপারে কোন ভ্রক্ষেপই নেই।

প্রকাশ থাকে যে, হিজাব অর্থ হলো ছতরের ঢাকানা, বোরকা বা শরীরের আচ্ছাদন।

কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে হিজাব হলো, সকল সামাজিক বিধি-বিধানাবলীর একত্রিভূত এমন একটি ঠিকানা বা সূত্র যা মহিলা ও পুরষ সবাইকে ইসলামী সমাজ ও জীবন ব্যবস্হার শৃঙ্খলা এবং বিধানের আওতাভূক্ত হতে এবং থাকতে সবচেয়ে বেশী সাহায্য করে। সমাজ ও জীবন ব্যবস্হাকে নিষ্কলুষ ঝামেলামুক্ত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার জন্যেই আল্লাহ্‌ তা’আলা এই পর্দা ব্যবস্হাকে অবধারিত করে দিয়েছেন।

কেননা, এরই মাধ্যমে মহিলারা থাকতে পারে সকল প্রকার সামাজিক ফিৎনা-ফাসাদ ও বিশৃংখলার উর্ধ্বে এবং তাদের থেকে উপযুক্ত শিক্ষা নিয়ে বের হতে পারে আমূল উৎকৃষ্ট একটি জাতি। তাই কবি আল্লামা আবদুর রহমান আল-কাশগরী (রা:) বলেছেনঃ সন্তানের চরিত্রের ভাল মন্দ যাচাই হয়
তার জন্ম দানকারিনী মাতার চরিত্রের ভিত্তিতে।
সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছেন : Give me a good mother,I shall give you a good nation. ‘আমাকে একটি ভাল মা দাও, আমি তোমাকে একটি ভাল জাতি উপহার দেব।’

উল্লেখ্য, এমন আমূল উত্তম জাতি দিয়ে সারা বিশ্বে বিজয়ী হতে পারে ইসলাম ও মুসলিম জাতি আর বিশ্ব পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে সুখ, শান্তি, পারষ্পরিক নিরাপত্তা ও স্হিতিশীলতায়। ফলে কায়েম হবে পারষ্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি। আর এভাবেই হয়ে উঠতে পারে এই মর্তের পৃথিবীটা একটি জান্নাত হিসাবে।

কবি তাই বলেছেন :

“প্রীতি ও প্রেমের পূন্য বাঁধনে সবে মিলি পরষ্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুড়ে ঘরে।”

পথ নির্দশাবলী

বোন হে,

যারা পর্দার তথা হিজাবের ব্যাপারে আল্লাহ্‌র সিদ্ধান্তের পর নিজস্ব পান্ডিত্ব প্রকাশ করতে চান, তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হল আল কোর’আনের ভাষায় : “আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ের নির্দেশে কিংবা ফায়সালা করে দিলে কোন ঈমানদার পুরষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার নেই। আর যে, কেউ আল্লাহ্‌ ও তার রাসূলের আদেশ অমান্য (নাফারমানী) করবে সে প্রকাশ্যে পথভ্রাষ্টতায় পতিত হবে।” (সূরা আহ্‌যাব, ৩৩ : আয়াতা৩৬)

অনুরূপ যারা নিজেদের বিচার বুদ্ধি, স্বকীয়তা এবং আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের (সা:) আনুগত্যের প্রতি কোনরূপ গুরত্ব না দিয়ে ঢালাওভাবে অন্যের অনুসরণ করে সত্য পত বিচ্যুতবস্হায় জীবন পরিচালনা করতো এবং করে তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা:) এরশাদ করেছেনঃ

“তোমাদের কেউ যেন এরকম সেবাদাস না হয় যে, সে বলবে আমি চলছি মানুষদের সাথে। সুতরাং মানুষ যদি ভাল কাজ করে, তাহলে আমি ভাল কাজ করব আর মানুষ যদি খারাপ কাজ করে তাহলে আমিও খারপ কাজ করব। বরং তোমরা নিজেরা নিজেদের এমনবাবে প্রস্তুত করে নাও যে, তোমরাই মানুষদের নিয়ে ভাল কাজ করবে। আর যদি কেউ খারাপ কাজ করতে চায় তখন নিজেরা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে।”

এবার তার উদ্দেশ্যে বলতে চাই। “যিনি বলেন যে, যদি আমি এই আধুনিক সমাজে হিজাব পরি, তাহলে লোকেরা আমার দিকে তাকাবে ঠাট্টা-বিদ্রপ ও হাসি-তামাসার দৃষ্টিতে। কিন্তু যদি না পরি, তাহলে আমিও হয়ে গেলাম আধুনিক! আর তখনই মানুষ আমাকে এমনটা করবে না, কেননা আমি তো তাদের মতই”।

হে জ্ঞানী গুণী ও বিদূষী মহিলা! জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আধুনিক সমাজে ইসলামী বৈশিষ্ট্যে নিজেকে গুছাতে গিয়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্হা থেকে ব্যতিক্রম হওয়াটাই হল ঈমান এবং ঈমানের দাবি। যে দিকে তোমাকে আহবান করছেন, তোমার পুত-পবিত্র রব তথা সৃজন-রক্ষণ-পালন ও বিবর্ধন কর্তা। আল্লাহ নিজে পর্দার তথা হিজাবের ব্যাপারে হুকুম করার পরে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত কোন অভিমত খাটানো কোন মুসলিমের পক্ষে জায়েয নয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী

বোন হে,
যারা আধুনিকতা তথা পশ্চিমা ইয়াহুদি-নাছারাদের আচার-আচরণের সামনে নিজেদের পরাজিত বলে মেনে নিয়েছে। তাদের বলো যে, তারা পশ্চিমা আধুনিকতাকে তথা ইয়াহুদী উদ্দেশ্য করে বলুক, হে আমাদের মুনিবেরা! আমরা তোমাদের থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেছি, তোমাদের থেকেই আমরা হয়েছি ডাক্তার, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আর তোমাদের থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে আমরা সর্বাগ্রে উপেক্ষা করে চলেছি ইসলামী বিধি নিষেধ, এমনকি চাল-চলনে আমরা এতদূর এগিয়েছি যে, আমাদের মধ্যে কে পুরষ ও কে মহিলা তার ভেদাভেদও উঠে গেছে। তবুও কি তোমরা আমাদের প্রতি সন্তষ্ট?

কোর’আনে কারীমে এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে :

“ইয়াহুদী ও খৃষ্টানগণ কখনো তোমার প্রতি সন্তষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর।” (সূরা বাকারা, ২ : আয়াত ১২০)

অর্থাৎ তারা উত্তরে বলবে, আমরা তোমাদের প্রতি একারণেই সবচেয়ে কম সন্তষ্ট যে, তোমরা ধর্মাদর্শে এ পর্যন্ত মুসলিম। পক্ষন্তরে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সংস্কৃতি, চাল-চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, চিন্তা-চেতনা এমনকি দুনিয়ার সামগ্রিক বিষয়ে তোমরা আমাদের অনুসরণ অনুকরণ করতে পার। তবে তোমাদের প্রতি আমাদের পরিপূর্ণ সন্তষ্টির একটি শর্ত, তোমরা আমাদের ধর্মাদর্শ গ্রহণ করা।

বলা যায়, কারো শিল্প, সংস্কৃতি, চাল-চলন, পোষাক-পরিচ্ছদ, চিন্তা-চেতনা এমনকি দুনিয়ার সামগ্রিক বিষয়াবলীতে অনুসরণ ও অনুকরণ করলে অনতিবিলম্বে তার ধর্মাদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণ হয়ে যায়। এটি হলো স্বতঃসিদ্ধ কথা।

আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন :

তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের ধর্মাদর্শকে এমনভাবে আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে, এক হাত এক হাত করে অনুসরণ অনুকরণ করবে শেষ পর্যন্ত তারা যদি হিংস্র জন্তুর গুহায়ও প্রবেশ করে তাহলে তোমরাও তাতে প্রবেশ করবে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন: হে আল্লাহর রাসূল ! পূর্ববর্তী জাতি বলতে কি ইয়াহুদী নাছারা? রাসূলুল্লাহ‌ (সা:) উত্তরে বললেন: এরা ছাড়া আর কারা? (মুসলিম)

বোন হে,

তোমার জন্যে একান্ত কর্তব্য যে, তুমি কোর’আন ও হাদীস থেকে জীবন পরিচালনার সামগ্রিক বিষয়ে সঠিক জ্ঞান আহরণ করবে এবং বাস্তবে এই জ্ঞানের স্বাদ আস্বাদন করবে। আর অতি গুরত্ব দিবে তোমার পোষাক-পরিচ্ছদের দিকে যাতে করে তোমার জীবনের কোন স্তরে বা কোন পর্যায়ে আল্লাহ্‌র আইন ও আদেশ লংঘিত না হয়। তাহলেই তুমি হয়ে উঠবে একটি উসওয়া বা আদর্শ নমুনা। কবি এই বিষয়ের উৎসাহ দিতে গিয়ে খুব সুন্দর ভাষায় বলেছেন?

“হে দেহের চাকর কত কষ্ট করবে তুমি দেহের লাগিয়া।
যেখানে সার্বিক ক্ষতি, সেখানে কি করবে তুমি লাভ জানিয়া।
রুহের দিকে এগিয়ে আস পূর্ণ কর তার সফলতা
রুহ‌ দিয়েই তুমি মানুষ হও, শুধু দেহ দিয়ে মানুষ নও।”

বোনটি আমার,

তুমি আল্লাহ্‌র দ্বীনের জন্যে নিজের জ্ঞান এবং মাল অকাতরে বিলিয়ে দেয়ার ব্যাপারে খাদিজাতুল কুবরা (রা:) এর অনুসরণ করবে। আর দ্বীনের জ্ঞান আহরণ, অন্বেষণ ও বিলিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আয়েশা সিদিদকাহ্‌ (রা:) এর অনুসরণ করবে। আর আল্লাহ্‌র দ্বীনের উপর অটল থাকার শক্তি, সাহসিকতার ব্যাপারে অনুসরণ করবে আলে ইয়াসিরকে। (আম্মার বিন ইয়াসির তথা সুমাইয়্যা (রা:) এর পরিবার যিনি ইসলামে প্রথম মহিলা শহীদ)

তাহলেই জীবনের সর্বশ্রেষ্ট সোপানে পৌঁছতে সক্ষম ও সার্থক হবে।

হে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের মাতা! কবির কথার উপর একটু চিন্তা কর :

“মা হল একটি শিক্ষা নিকেতন। যখন তুমি তাকে তেমন করে গঠন করবে। তাহলে গঠন করলে এমন একটি জাতি যারা মূলতই উৎকৃষ্ট বা উৎকৃষ্ট ধমনী দিয়ে গঠিত।

মা হল একটি কানন যদি তাকে সুশিক্ষা লজ্জা ও শালীনতা রসে সিঞ্চিত ও সংরৰণ করো তাহলে সে সত্যিই (সন্তান-সন্ততি নিয়ে) পত্র পল্লবে আচ্ছাদিত ও সুশোভিত বাগানের ন্যায় ফুটে উঠবে। মা হল সকল শিক্ষকের প্রথম শিক্ষক। যার গুণপনা ও কৃর্তিকলাপই যুগ-যুগান্তর ধরে জগতে সুখ্যাতি অবশিষ্ট রেখেছে।”

মুসলিম বোনটি,
যদি তোমার এমন একটি ছবি থাকে যেটা তোমার মূল আকৃতি ও গঠনের সাথে বিপরীত অর্থাৎ কুৎসিত অথবা তুমি হয়ে পড় বয়স্কা ও বৃদ্ধা। তাহলে কি তোমার সেই ছবিটি বা এই অবস্হার একটি ছবি দিয়ে আধুনিকতার ধ্বজাধারীরা পত্রিকার প্রচ্ছদ দিতে রাজি হবে এই বলে যে, তুমি একজন সংস্কৃতি-মনা মহিলা?

অনুরূপ তুমি যদি হও হিজাব পরিহিতা একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা, তাহলে কোন দিন কি তোমাকে কেউ বিমান বালার চাকুরী দিবে?

অনুরূপ ভাবে তুমি যদি হও চেহারার দিক থেকে একটু কুৎসিৎ তাহলে কি কেউ তোমাকে একটু মডেলিং এর জন্যে আহ্বান জানাবে?

কখনো নয় বরং মোদ্দা কথা হল, বর্তমান বিশ্বের আধুনিকতার ধ্বজাধারীরা আধুনিকতার নামে চায় তোমার সুন্দর চেহারা, পেতে চায় একটু পরিতৃপ্তি, চায় তোমার সুন্দর ও মধুর কন্ঠ।

তবে শুনে রাখ, যখন থেকে তোমার চেহারা ও মধুর কণ্ঠ তাদের পরিতৃপ্তি ও আত্মতৃপ্তি দানে ব্যর্থ হয়ে পড়বে, তখন হয়ে পড়বে তুমি নিঃস্ব অসহায় ও নিঃসম্বল।

সুতরাং আগে থেকেই নিজকে সংরক্ষণ কর এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সূর্যকে নিজের জীবনে আলো দানের সুযোগ করে দাও, তবেই হবে সফলকাম।

সাবধান

রাসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করেছেন :

“আমার পরে মহিলা ফিৎনাই পুরষদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্হ করবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

বহু চিন্তা, গবেষণা ও পর্যবেক্ষনের পর ইসলামের শত্ররা এই সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছে যে, মহিলাদের চরিত্র ধ্বংসের মাধ্যমেই গোটা সমাজকে ধ্বংস করে দেয়া যায়।

তাই মানবতার শত্রু ইয়াহুদীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক রাব্বী বলেছেন যে : “এমন যন্ত্র আছে, যা উম্মতে মুহাম্মাদীকে ধ্বংসের ব্যাপারে এক হাজার কর্মীর চেয়েও অধিক কার্যকর তা হল চরিত্রহীন মহিলা। সুতরাং এদের ধ্বংস করতে হলে প্রবৃত্তির অনুসরণের দিকে ঠেলে দাও।

আরেক রাব্বী এমনও বলেছেন যে : “আমাদের উচিত আধুনিকতার নামে মেয়েদের নগ্নতা, বেহায়পনা ও চরিত্রহীনতার দিকে ঠেলে দেয়া। কেননা যে দিন আমরা এদের উলঙ্গ করে চরিত্রহীন অবস্হায় ছেড়ে দিতে পারব, তখন তারাই হবে এমন এক দুঃসাহসী বিজয়িনী সৈনিক, যারা উম্মতে মহাম্মাদীকে ধ্বংস করে সার্থক বিজয় নিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে।”

ভয়াবহ পরিণতি

যারা চায় আকর্ষিতা হয়ে সমাজ-বিধ্বংসী বোমায় পরিণত হতে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ পাকের ঘোষণা, যা কোর’আনের ভাষায় :

“যারা চায় বা কামনা করে যে, ঈমানদার লোকদের মধ্যে নির্লজ্জতা (ব্যভিচার) বিস্তার লাভ করুক। নিশ্চয়ই তাদের জন্যে দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েচে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির। আর আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।” (সূরা নূর, ২৪: আয়াত ১৯)

বোন হে,
একটু চিন্তা কর, আল্লাহর এই ঘোষণা হল শুধু তাদের জন্যে, যারা মনে মনে চায় বা আকাঙ্খা করে, কিন্তু বাস্তবে যারা মু’মিনদের মধ্যে এই ব্যভিচার বিস্তারে ব্যস্ত ও তৎপর তাদের পরিণতি কি হবে?

(একদল জাহান্নামী, যাদের আল্লাহর রাসূলও (সা:) দেখেন নি, কিন্তু আমরা দেখছি।)

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুলস্নাহ (সা:) এরশাদ করেছেন :

“দুই দল নিকৃষ্ট জাহান্নামী, যাদের আমিও দেখিনি, এদের একটি হল এমন একদল লোক, যাদের হাতে সর্বদাই থাকে চাবুক যা দেখতে গরুর লেজের ন্যায় দেখায়, যা দিয়ে তারা মানুষকে প্রহার করে। (অর্থাৎ যারা সর্বদাই অন্যায়ভাবে মানুষদের প্রতি যুলুম করে চলে)। আর অপর দলটি হল এমন মহিলা যারা অর্ধনগ্ন অবস্হায় কাপড় পরিধান করে। ফলে তারা লোকদের আকৃষ্ট ও আকর্ষণ করে এবং তারাও হয় দুষ্ট লোকদের দ্বারা আকর্ষীতা এবং ব্যাভিচারের শিকার। তাদের মাথা যেন উঁচু কুঁজ বিশিষ্ট চলনৱ উটের ন্যায়। এরা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি জান্নাতের গন্ধও পাবে না। পরিশেষে রাসূলুল্লাহ (সা:) জাহান্নামে এদরে অবস্হানের দূরত্বের আধিক্য বুঝাতে বলেছেন : “জান্নাতের সুঘ্রাণ এত এত দুরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।”

উল্লেখিত হাদীস শরীফে রাসূল (সা:) দুষ্ট-লম্পট চরিত্রহীনা ও অসভ্য মহিলাদের এক পরিচিতি তুলে ধরেছেন।

আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেছেন, তারা হল :

“পোষাক পরিহিতা উলঙ্গ অর্থাৎ এমনভাবে কাপড় পরে, যাতে তাদের অর্ধনগ্ন দেখায় অথবা এমন কাপড় পরে যাতে তার শরীরের সকল অঙ্গ-প্রতঙ্গ এমনিতেই ষ্পষ্ট দেখা যায়।।”

আল্লাহ্‌র আনুগত্য থেকে বিমুখ এবং আকৃষ্টকারিণী, যে লজ্জা শরম কি তা বুঝেই না এবং পর্দার ধারে কাছেও আসে না বরং সর্বদা নিজের প্রবৃত্তিকেই অনুসরণ করে চলে।

আকৃষ্ট বা আকর্ষিতা। যে চলাফেরা ও কাজকর্মের দ্বারা পরপুরষ কর্তৃক আকৃষ্ট হয়, ব্যভিচারিত হয়। কিন্তু সে এতে কোন অপমান বোধতো করেই না বরং এটাই সে চায়।

অর্থাৎ, তাদের মাথা হল উঁচু কুঁজ বিশিষ্ট চলন্ত উটের ন্যায়। এই সমস্ত মেয়েরা নিজেদের চুলকে উপর দিকে দাঁড় করিয়ে বাঁধে এবং হাটার সময় মাথাটাকে উন্মুক্ত করে উটের ন্যায় অগ্রসর হয়।

প্রত্যেক পিতার উদ্দেশ্য

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ঘোষণা হলো :

“হে ঈমানদার লোকেরা, নিজেকে এবং স্বীয় পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয় কঠোর স্বভাব ফেরেশতাগণ। আল্লাহ্‌ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা তারা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই তারা করে।: (সূরা তাহ্‌রীম, ৬৬ : আয়াত ৬)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলী বিন আবি তালিব (রাঃ) বলেছেন, ‘তাদের আদব-কায়দা তথা ইসলামী শিষ্টাচার এবং দুনিয়ার সুষ্ঠ জীবন যাপনের (পরিচালনার) প্রয়োজনীয় জ্ঞান শিক্ষা দাও।’

কাতাদাহ (রা:) বলেছেন : ‘তোমরা তাদের (তোমাদের পরিবার-পরিজনকে) আল্লাহ্‌র আনুগত্যের নির্দেশ দাও এবং তাঁর নিষেধাবলী থেকে বেঁচে থাকার উপদেশ প্রদান করো।

ওহে পিতা,
ইঞ্জিনিয়ার যদি তোমাকে তোমার নির্মাণাধীন বাড়ি সম্পর্কে বলে : ‘তোমারে দালানে ভিত্তি মজবুত হয়নি সুতরাং এটাকে আরো বড় করার পূর্বেই ঠিক করে নেয়া উচিত। নতুবা এটা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।’ তখন তুমি কি করবে?

অবশ্যই তুমি তোমার সর্বশক্তি দিয়ে একে ভেঙ্গে ফেলে ভিত্তিটা মজবুত করে গড়ে তুলবে এবং এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবে।

সত্য এমনটি নয় কি?

যদি তাই হয়। তাহলে তুমি তোমার আগামী উত্তরাধিকারী বা বংশধর নামক দালানের ভিত্তি অর্থাৎ তোমার কন্যার ব্যাপারে কি করবে ও করেছ? অথচ এই সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ্‌ তোমাকে নির্দেশ দিয়েছেন সর্বশক্তি দিয়ে তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে।

সুতরাং তুমি তোমার পক্ষ থেকে তার জন্যে কি পেশ করেছ?

ওহে পিতা,
ঐ সমস্ত নির্লজ্জ যুবতীরা, যারা আল্লাহ্‌র আদেশ-নিষেধের প্রতি কোনরূপ ভ্রক্ষেপ করে না বরং স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরনেই নিজেরা মত্ত তারা কি আসমান থেকে পতিত হয়েছে? না যমীনে নীচ থেকে অংকুরিত হয়ে ফুটে উঠেছে?

কোনটিই নয় বরং তারা বের হয়েছে তোমার ঘর থেকে এবং তোমার অন্য মুসলিম ভাইয়ের ঘর থেকে।

সুতরাং হে পিতা,
তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমার কন্যার ব্যাপারে দুনিয়া-দারীর চেয়েও বেশী গুরত্ব দাও। আর তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না, যাদের সম্পর্কে রাসূলুলস্নাহ্‌ (সা:) এরশাদ করেছেন :

‘দাইউস ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ সাহাবায়ে কেরাম (রা:) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহ্‌র রাসূল! দাইউস কে? উত্তরে রাসুলূলস্নাহ (সা:) বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পরিবারে আল্লাহ্‌র আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোন তৎপরতা অবলম্বন করে না বরং উপেক্ষা করে চলে।’

অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, ‘দাইউস হল সে, যে তার পরিবারে বেহায়পনার বাস্তবায়নে সন্তষ্ট ও পরিতুষ্ট।’ (আহমদ)

অভিবাদন ও সুসংবাদ

ঐ সকল মুসলিম বোনের প্রতি, যারা শত্রুদের অজস্র কৌশলের সামনেও নিজেকে পরাজিত হতে দেয়নি। বিক্রি করে দেয়নি আল্লাহ্‌ কর্তৃক তাকে প্রদত্ত অমূল্য সম্পদ, ইয্‌যত ও আবরু। বরং সে তার সর্বশক্তি দিয়ে মাড়ির দাঁতের ন্যায় আঁকড়ে ধরে রেখেছে নিজের ব্যক্তিত্ব, সতীত্ব ও সম্ভ্রমকে। আর জাহেলিয়াতের মহা প্লাবনের মুখেও সে পালন করেছে আল্লাহ্‌র নির্দেশাবলীকে এবং বিরত রয়েছে নিষেধাবলী থেকে।

এভাবেই সে স্বীয় অস্তিত্বের সাথে ধারণ করেছে আল্লাহ্‌র কিতাব ও রাসূলের (সা:) সুন্নাহএক এবং সমুন্নত রেখেছে ইসলামের পতাকাকে এই বলে যে : “আমার হাতে আছে চির সমুন্নত সংবিধান আল কোর’আন ও রাসূল (সা:) সুন্নাহ্‌ যা আমাকে রক্ষা করবে সকল বিপদ থেকে। আর আমার হিজাব হল আমার ইয্‌যত, এ দুয়ের বদৌলতেই আমি হব বিশ্ব সভায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন।

তার জন্যই তার নবীর পক্ষ থেকে সুসংবাদ। যে সম্পর্কে আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন সাহাবায়ে কিরামকে উদ্দেশ্য করে :

“নিশ্চয়ই তোমাদের পর এমন দিনকাল আসবে, যখন আল্লাহ্‌র দেয়া জীবন ব্যবস্হার সার্থক অনুসারীকে হতে হবে খুবই ধৈর্য্য ও সহনশীল। আর তাদের প্রতিদান হবে পঞ্চাশ জনের প্রতিদানের সমান ও অনুরূপ। তখন সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করলেন: হে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা:)! তাদের থেকেই নাকি? উত্তরে রাসূলুলস্নাহ্‌ (সাঃ) বললেন : না, বরং তোমাদের মধ্যে থেকে (পঞ্চাশ জনের সমান ও অনুরূপ)।” (তিরমিযী, আবু দাউদ)।

তাদের প্রতি আরো সুসংবাদ হল যে, রাসূলুলস্নাহ্‌ (সা:) এরশাদ করেছেন:

“ইসলামের যাত্রা শুরু হয়েছিল অপরিচিত অবস্হায়। অচিরেই সে তার যাত্রাকালের অবস্হায় ফিরে আসবে। তবে গুরাবাদের জন্যে চরম সুখ ও শুভ সংবাদ।” সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করলেন গুরাবা কারা? হে আলস্নাহ্‌র রাসূল (সা:)! উত্তরে রাসূলুলস্নাহ্‌ (সা:) বললেন : “তারা হল ওরাই, যারা অধিকাংশ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে গেলেও নিজেরা সত্যকে সার্বিক জীবন ব্যবস্হায় আঁকড়ে ধরে রাখে, সৎ কর্ম পরায়ণতার সাথে।” (তিরমিযী)

উল্লেখ্য মুহাদ্দীসীনে কিরামের কেউ কেউ বলেছেন তুবা’ই হল জান্নাতের একটি গাছের নাম। মিথ্যা, অন্যায়, অনাচার ও বিভ্রান্তিকে উপেক্ষা করে শত বাঁধা বিপত্তির বেড়াজালকে ছিন্ন করে অতি ধৈর্য্যের সাথে যিনি আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের (সা:) আদেশ নিষেধাবলীকে যথাযথ ভাবে পালন করেছেন, তার জন্যে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে অভিবাদন।

পবিত্র কোর’আনের ভাষায় :

“তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। যেহেতু তোমরা দুনিয়ায় ধৈর্য্য ধারণ করেছ। আর তোমাদের এই আখিরাতের নিবাস কতই না চমৎকার ও উত্তম।” (সূরা রা’দ, ১৩ : আয়াত ২৪)

শরীয়াতের দৃষ্টিতে পর্দার (হিজাবের) শর্তাবলী

ইসলামী শরীয়াহ্‌র পৰ থেকে মেয়েদের (হিজাব) পর্দার ব্যাপারে কিছু শর্তাবলী রয়েছে। সেগুলো হলোঃ

১. হিজাব (পর্দা) হবে তার গোটা শরীরটাকে আবৃতকারী।

আলস্নাহ্‌র ভাষায় :

অর্থাৎ তারা যেন (উ‌পর দিক থেকে) নিজেদের (মুখমন্ডল ও বক্ষদেশের) উপর নিজেদের চাদরের আচল ঝুলিয়ে দেয়। (যাতে আপাদমস্তক ঢেকে যায়)।

প্রকাশ থাকে যে, অর্থ হল, এমন লম্বা কাপড়, যা মহিলার সমগ্র শরীরটাকেই ঢেকে দেয়। অতএব এটা সুষ্পষ্ট যে, হিজাব হল এমন পর্দা যা গোটা শরীরটাকে ঢেকে ফেলে।

২. হিজাব (পর্দাটা) হালকা কাপড়ের হতে পারবে না। যার মধ্য দিয়ে মেয়েলি শরীরের কোন কিছু দেখা যায়। বরং এটা হতে হবে মোটা কাপড়ের যার মধ্যদিয়ে কোন কিছু দেখার বা বুঝবার কোন আশঙ্কা থাকবে না। কেননা, হিজাবের মূল উদ্দেশ্যই হল আবৃত রাখা। অন্যের দৃষ্টি থেকে এমন কি অন্যের উপলব্দি শক্তি থেকেও।

৩. হিজাবের (পর্দার) কাপড় হবে সাধারণ, কারুকার্য বিহীন। অর্থাৎ হিজাব এমন কারুকার্য সম্বলিত নয়নাভিরাম রং-রেংয়ের হতে পারবে না, যাতে অতি সহজেই অন্যের দৃষ্টি কাড়ে। কেননা আল্লাহ্‌ তা’আলা নিজেই ঘোষণা করেছেন যে :

“তারা যেন নিজেদের সাজসজ্জা প্রকাশিত না করে কেবল তাছাড়া, যা আপনা হতেই প্রকাশিত হয়ে যায়।” (সূরা নূর, ২৪ : আয়াত ৩১)

এখানে যা এমনিতেই প্রকাশিত হয়ে যায় বলতে বুঝানো হয়েছে, যা হিজাব পরিহিতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বাভাবিক ভাবেই প্রকাশিত হয়ে যায়।

সুতরাং যদি হিজাবই হয় নয়নাভিরাম, কারুকার্য সম্বলিত, তাহলে তাদ্বারা পর্দা করা জায়েয হবে না। কেননা হিজাব মানেই হল অপর থেকে বা পর পুরুষ থেকে নিজের সৌন্দর্যকে ঢেকে রাখা এবং অন্যের চোখে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে না উঠা।

৪. হিজাব সংকীর্ণ বা চিকন হবে না বরং হিজাব হবে প্রশস্ত ও মোটা যাতে করে হিজাব পরিহিতার শরীরের গঠন আকৃতি পরিলক্ষিত না হয়।

কেননা হিজাব যদি সংকীর্ণ বা চিকন হয়, তাহলে মহিলার অঙ্গাকৃতি হিজাবের উপর দিয়েই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে এবং এতে করে ফিৎনা ফাসাদ ছড়ানোর বেশী আশঙ্কা দেখা দিবে।

৫. হিজাব অধিক সুগন্ধিময় হতে পারবে না, যাতে করে সুঘ্রাণ পুরুষের মনকে আকৃষ্ট করে হিজাব পরিহিতাকে তাদের আলোচনার বস্তুতে পরিণত করে। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করেছেন :

মেয়েরা যখন সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করে পুরুষদের কোন সমাবেশের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন পুরষরা (স্বাভাবিকভাবেই) বলাবলি শুরু করে দেয় যে, এই মহিলাটা এমন, এমন, এমন। অর্থাৎ সুঘ্রাণ ব্যবহারকারিনী, সুন্দরী ইত্যাদি।

(আসহাবে সূনান, তিরমিযী বলেছেন, এই হাদিসটি হাসান, সহীহ্‌।

মহিলা যখন আতর (সুগন্ধী) ব্যবহার করতঃ কোন গোত্রের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে এবং এর সুঘ্রাণ গোত্রবাসীদের কাছে পৌঁছায়, তখন তারা বলাবলি করতে থাকে যে, মহিলাটি তো খুবই সুগন্ধময়ী, সুঘ্রাণ ব্যবহারকারিনী ইত্যাদি।

৬. হিজাব পুরুষদের ব্যবহৃত পোশাকের অনুরূপ হতে পারবে না। যার প্রমাণ পেশ করে আবু হুরায়রা (রা:) কর্তৃক বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীস :

আল্লাহ্‌র রাসূল (সা:) ঐ সকল পুরুষদের উপর অভিসম্পাদ (লা’নত) করেছেন, যারা স্ত্রীলোকদের পোশাক পরিধান করে। অপরদিকে ঐ সকল মেয়েলোকদের উপরও অভিসম্পাত (লা’নত) করেছেন, যারা পুরুষদের পোশাক পরিধান করে। (আবু দাউদ, নাসায়ী)

অন্য হাদীসে বলা হয়েছে :

আল্লাহ্‌ তা’আলা অভিসম্পাত (লা’নত) করেছেন ঐ সব পুরুষদের প্রতি যারা মেয়েদের আকৃতি-প্রকৃতি, পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করে, অপরদিকে ঐ সকল মেয়েলোকদের প্রতিও অভিসম্পাত (লা’নত) করেছেন যারা পুরুষদের আকৃতি-প্রকৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করে। (বুখারী)

খুবই পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের এই বর্তমান যুগেই আধুনিকতার নামে অসংখ্য মেয়ে লোকেরা পুরুষদের আকৃতি-প্রকৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছদকে নিজেদের ভূষণ হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছে। অনুরূপ অনেক পুরুষও আছে যারা এই আধুনিকতার দোহাই দিয়ে মেয়েদের আকৃতি-প্রকৃতি ও পোশাক-পরিচ্ছদকে নিজেদের ভূষণ বলে গ্রহণ করে থাকে। আমরা আল্লাহ্‌র কাছে এর থেকে পানাহ্‌ চাই এবং নিরাপত্তা চাই তার অভিসম্পাত থেকে। (আমীন!!!)

হে আমার মু’মিন বোনটি! পরিশেষে তোমার সামনে পেশ করছি, অমূল্য উপদেশাবলী থেকে এগারটা উপদেশ। এই আশায়, তুমি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে দুনিয়ার জীবন অতিবাহিত কর এবং আখিরাতের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে যাও চির প্রশংসিতা হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে।

তাহলে শোন উপদেশাবলী

০১. তুমি একমাত্র আল্লাহ্‌র (গোলামী) ইবাদত করবে পবিত্র কোর’আন ও সুন্নায় বর্ণিত সঠিক ও সহজ পন্হায়।

০২. ধর্ম বিশ্বাস তথা ‘আকিদাহ্‌ ও ইবাদতের ব্যাপারে এমনকি সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র সাথে শির্‌ক নেক ‘আমলকে ধ্বংস করে দেয় এবং মানুষকে চরম ক্ষতিতে নিক্ষিপ্ত করে।

০৩. ‘আক্বীদাহ্‌ ও ইবাদত তথা সকল ক্ষেত্রেই বিদ’আত (দ্বীনে নতুন সৃষ্ট বিষয়) থেকে অনেক দূরে থাকবে। কেননা, বিদ’আত হল বিভ্রান্তি। আর বিভ্রান্তিতে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামের ইন্ধন।

০৪. সালাতকে পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করবে। (যথাসময়ে নিয়মিতভাবে আদায় করে নিবে)। কেননা, যে কেউ সালাতকে সংরক্ষণ করে এবং সালাতের ব্যাপারে সংরক্ষণশীল হয়, তার সকল কাজই হয় যথাযথ ও সংরক্ষনশীলতার ভিতর দিয়ে। পক্ষান্তরে যে কেউ এর সংরক্ষণ করে না, তার সকল কাজই হয় অরক্ষণশীল ও অপরিপূর্ণ।

উল্লেখ্য সালাতের ব্যাপারে প্রথমেই হয়ে যাবে পবিত্রা। তারপর প্রশান্ত আত্মার অধিকারিণী অতঃপর স্বস্তির সাথে খুশু-খুজুর সাথে প্রথম ওয়াক্তেই একে আদায় করে নিবে। জেনে রেখ, যার সালাত (নামাজ) ঠিক তার সবই ঠিক। আর যার সালাত ঠিক নয়, তার সবই বরবাদ।

০৫. তুমি বিবাহিতা হলে সর্বদাই তোমার স্বামীর আনুগত্য থাকবে। তার কোন চাওয়াকে প্রত্যাখ্যান করবে না এবং তার আদেশ-নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করবে না, যতৰণ পর্যন্ত না, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা:) কোনরূপ বিরদ্ধাচরণ করে।

০৬. তুমি তোমার স্বামীর উপস্হিতি। অনুপস্হিতিতে তথা গোপন-প্রকাশ্য সর্বাবস্হায় তার ধন-সম্পদসহ তোমার নিজেকে সংরক্ষণ করে রাখবে এবং এই ব্যাপারে মুহুর্তের জন্যেও গাফিল হবে না।

০৭. তুমি সর্বদাই তোমার প্রতিবেশীদের প্রতি ইহ্‌সান (দয়া প্রদর্শন) করবে, তোমার মুখের, সুন্দর, প্রাঞ্জল ও মিষ্টি মধুর কথাবার্তা এবং উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে। আর তোমার ভালবাসার কোমল হাতকে সম্প্রসারিত করবে তাদের যে কোন আপদ-বিপদ ও বালা-মুসবতের মুহুর্তে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করেছেন :

‘যে কেই আল্লাহ্‌ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন তার প্রতিবেশীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তাদের অধিকার প্রদানে সচেষ্ট থাকে।’ (বুখারী)

০৮. সর্বদাই তুমি তোমার পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও পরিবেশকে শুভ্র-সুন্দর ও আদর্শময় করে ঘরে তুলতে থাকবে সচেষ্টময়ী, কর্মচঞ্চলা ও প্রাণোদীপ্তা। তবে বিশেষ কোন প্রয়োজন ছাড়া তুমি এর সীমানার বাইরে যাবে না। কিন্তু যখনই ঘর থেকে বাইরে বের হবে তখন এমনভাবে বের হবে, যাতে কেউই তোমাকে অনুভব করতে না পারে।

০৯. তুমি সর্বদাই থাকবে তোমার মাতা-পিতা ও শশুর-শাশুরীর প্রতি অতি যত্নবান এবং খাদিম। তুমি তাদের সাথে উত্তম বাক্যালাপ করবে আর দরীভূত করবে তাদের সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট, বেদনা ও যন্ত্রণাদায়ক বিষয়বস্তুকে তোমার উত্তম সাহচর্যের মাধ্যমে। তবে এর সবটাই হবে আল্লাহর আনুগত্যের অধীনে।

১০. তুমি তোমার সন্তান-সন্ততিকে সুশিক্ষায় ও সচ্চরিত্রে চরিত্রবান করে গড়ে তোলার জন্যে সর্বাধিক খেয়াল রাখবে। কেননা, তুমিই হলে তোমার সন্তান-সন্ততির প্রথম শিক্ষক। তোমার থেকেই তারা পাবে উত্তম চরিত্র। উন্নত শিক্ষা ও সর্বোত্তম নৈতিকতায় গড়ে উঠে দেশ ও দশের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার অনুপম মহত্ব। তাই সর্বদাই তুমি তাদের ভাল ও সৎ কাজের প্রতি করবে উৎসাহিত এবং মন্দ ও খারাপ কাজ থেকে করবে বিমুখ ও নিরুৎসাহিত। আর ইসলামের জীবন ব্যবস্হার নিরিখে জীবন-যাপনে করে তুলবে আজন্ম অভ্যস্ত। যখন তোমার সন্তানের বয়স সাত বছর তখন থেকেই তাদেরকে সালাত আদায় করার জন্য অনুপ্রাণিত করবে। এবং দশ বছর বয়সে সালাত সহ ইসলামী জীবন ব্যবস্হায় তাদের উপযোগী কোন কিছু পরিত্যাগ করলে করবে মৃদু প্রহার।

আরো শুনে নাও, শিরীয় সাহিত্যিক চিন্তাবিদ হাফেজ ব্রাহিম বলেছেন : মা হল একটা শিক্ষা নিকেতন যখন তুমি তাকে তেমন করে গঠন করবে। তাহলে গঠন করলে এমন একটা জাতি যারা মূলতই উৎকৃষ্ট ধমনী দিয়ে গঠিত। মা হল একটি কানন যদি তাকে সশিক্ষা লজ্জা ও শালীনতা রসে সিঞ্জিত এবং সংরক্ষণ করো। তাহলে সে সত্যিই (সন্তান-সন্তুতি নিয়ে) পত্র-পল্লবে আচ্ছাদিত ও সুশোভিত বাগানের ন্যায় ফুটে উঠবে। মা হল সকল শিক্ষকের প্রথম শিক্ষক। যার গুণপনা ও কৃতিকলাপই যুগ-যগান্তর ধরে জগতে সুখ্যাতি অবশিষ্ট রেখেছে।

১১. সর্বাবস্হায় আল্লাহ্‌র আদেশ ও নিষেধাবলীকে যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সর্বাধিক আল্লাহ্‌র যিক্‌রে মত্ত থাকবে এবং বেশি বেশি দান-খয়রাত করবে (তবে তোমার সামর্থ্য অনুযায়ী) আমার এই উপদেশাবলী গ্রহণ করার ও সে অনুযায়ী বাস্তবে ‘আমল করা এবং এই বইটিকে ভালভাবে অধ্যয়ন করা এর অন্তর্নিহিত ভাব হৃদয়ঙ্গম করা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনার ক্ষমতা দানের জন্যে মহান আল্লাহ্‌ তা’আলার দরবারে তোমার জন্যে সাহায্য কামনা করছি। (আমীন!!!)

বোন হে আমার ! আলস্নাহ্‌ আমাদের সবাইকে সকল প্রকার ৰয়ৰতি ও খারাবী থেকে রৰা করম্নন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যু দিন আর কিয়ামতে বেহিসাবে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করন। (আমীন!!!)।

সর্বশেষ আপডেট ( Monday, 01 December 2008 )