মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি
লিখেছেন সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী   
Saturday, 06 June 2009

মুসলমানদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি

[এটি মাওলানা মওদূদীর (রঃ) সেই ভাষণ, যা তিনি ১৯৫১ সালের ১১ ই নভেম্বর করাচীতে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্মেলনে প্রদান করেছিলেন।]

এর আগে আমি আমার বক্তৃতায় মুসলমানদের সামগ্রিক অবস্থার বিস্তারিত পর্যালোচনা করে এ কথা বলেছি যে, এখন আমাদের জীবনের এক একটি বিভাগে কি কি দোষ-ত্রুটি পাওয়া যায় এবং সে সবের কারণই বা কি। আজকের বক্তৃতায় আমি এ কথা বলবো যে, আমাদের কাছে কোন্‌ কর্মসূচি রয়েছে যার থেকে আমরা স্বয়ং এ আশা পোষণ করতে পারি এবং আপনাদেরকেও আমি এ আশ্বাস দিতে পারি যে, সে কর্মসূচি সংস্কার-সংশোধনের ফলপ্রসূ ও কার্যকর উপায় হতে পারে।

একটি ভুল ধারণা খণ্ডন

কিন্তু এ কর্মসূচি বয়ান করার আগে আমি একটি ভুল ধারণা দূর করে দিতে চাই যা এ ব্যাপারে সৃষ্টি হতে পারে। আমি যদি বর্তমান সময়ের দোষ-ত্রুটিগুলো এবং তার বর্তমান কারণগুলো উল্ল্লেখ করার পর নিজস্ব কর্মসূচি পেশ করি আর তার দ্বারা আপনাদেরকে সংশোধনের আশ্বাস দিই, তো এর থেকে আপনারা এ ধারণা যেন না করেন যে, এ সব লোক সম্ভবতঃ এ ধরনের কিছু সাময়িক ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের জন্যে একত্র হয়েছে এবং পুরাতন অট্টালিকায় এ ধরনের কিছু মেরামত কাজ করাই তাদের উদ্দেশ্য। এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের একটি স্থায়ী ও বিশ্বজনীন উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তা হলোঃ

এমন প্রতিটি জীবনব্যবস্থা নির্মূল করতে হবে যা খোদাদ্রোহিতা এবং আখেরাত ও নবীগণের হেদায়েতের প্রতি চরম অবহেলা-ঔদাসীন্যের ভিত্তিতে রচিত। কারণ তা মানবতার জন্যে ধ্বংসকর। উক্ত ব্যবস্থা নির্মূল করে তার স্থানে এমন জীবন ব্যবস্থা বাস্তবে কায়েম করতে হবে যা আল্লাহর আনুগত্য, আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস এবং নবীগণের পদাঙ্ক অনুসরণের ভিত্তিতে রচিত হবে। কারণ এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে মানবতার কল্যাণ। আমাদের যাবতীয় চেষ্টা-চরিত্রের প্রকৃত লক্ষ্য এটাই এবং আমাদের প্রতিটি কর্মসূচি তা কোনো সীমিত সময় ও স্থানের জন্যে হোক না কেন, ঐ লক্ষ্যপথের কোনো না কোনো স্তর অতিক্রম করার জন্যেই হয়ে থাকে। আমরা সর্বপ্রথম এ বিপ্ল্লব স্বয়ং আমাদের জন্মভূমিতে আনতে চাই যেন এ দেশ দুনিয়ার সংস্কার সংশোধনের উপায় হতে পারে। আমাদের দেশ পাকিস্তানের বর্তমান দোষ ত্রুটির আলোচনা আমরা এজন্যে করছি যে, তা আমাদের উদ্দেশ্যের পথে প্রতিবন্ধকস্বরূপ। অতএব আপনারা এ ধারণা করবেন না যে, এসব ত্রুটি বিচ্যুতির সংশোধনই আমাদের চরম লক্ষ্য অথবা আমরা একটি বিকৃত, অধঃপতিত সমাজ ব্যবস্থার নিছক সংস্কার করতে চাই। না, তা নয়, বরঞ্চ আমি বলছি যে, যদি এ সব ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদ্যমান নাও থাকতো, তথাপিও আমরা সেই উদ্দেশ্যের জন্যেই কাজ করতাম, যা প্রথম দিন থেকেই আমাদের সামনে রয়েছে। আমাদের সে উদ্দেশ্য একটি স্থায়ী, শ্বাশ্বত ও বিশ্বজনীন উদ্দেশ্য এবং সকল অবস্থায় তার জন্যে আমাদের কাজ করতে হবে। দুনিয়ার কোনো স্থানে সাময়িকভাবে এক ধরনের সমস্যার উদ্‌ভব হোক কিংবা অন্য কোনো ধরনের, আমাদের আসল উদ্দেশ্যে কাজ করে যেতেই হবে।

বিগত ইতিহাসের পর্যালোচনা

এ বিশ্লেষণের পর আমি প্রয়োজন বোধ করছি যে, যেভাবে আমাদের জাতির অনাচার ও দোষ-ত্রুটির পর্যালোচনা করা হলো, সেভাবে আমাদের অতীত ইতিহাসেরও পর্যালোচনা করে দেখা যাক যাতে ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, এ সব দোষ-ত্রুটি কি হঠাৎ আকস্মিকভাবে আমাদের সমাজে আত্মপ্রকাশ করলো, না তার গভীরে কোনো মূল কারণ এবং তার পশ্চাতে কার্যকারণের কোনো দীর্ঘ ধারাবাহিকতা আছে। এ দিক দিয়ে ব্যাপারটি কোন্‌ ধরনের তা ভালোভাবে বুঝতে পারা না গেলে বর্তমান দোষ-ত্রুটির ভীষণতা, ব্যাপকতা ও গভীরতা সুস্পষ্টরূপে ধরাও পড়বে না এবং সংস্কার সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও পুরোপুরি অনুভূত হবে না। আর এ কথাও বুঝতে পারা যাবে না যে, আমরা এখানে আংশিক সংস্কারের প্রচেষ্টাকে কেন অর্থহীন মনে করি এবং কিসের ভিত্তিতে আমরা এ অভিমত পোষণ করি যে, অক্লান্ত প্রচেষ্টা, একটি সার্বিক সংস্কারমূলক কর্মসূচি এবং একটি সৎ ও সুসংহত জামায়াতের মাধ্যমে যতোক্ষণ পর্যন্ত এখানে জীবন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন সূচিত করা না যাবে, ততোক্ষণ কোনো সুফল ছোট-খাটো চেষ্টা-তদবীরের দ্বারা লাভ করা যাবে না।

আমাদের ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তকর ঘটনা এই যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে অর্থাৎ বিগত শতাব্দীতে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আগত একটি অমুসলিম জাতি আমাদের দেশের উপর চেপে বসেছিল এবং মাত্র তিন-চার বছর পূর্বে তাদের গোলামী থেকে আমরা পরিত্রাণ লাভ করেছি। এ ঘটনাটি আমাদের নিকটে কয়েক দিক দিয়ে প্রণিধানযোগ্য। প্রথম কথা এই যে, আমাদের অনুসন্ধান করে দেখতে হবে যে, এ ঘটনা কেন ঘটলো। এ কি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিলো যে এমনি বিনা কারণে তা আমাদের উপর এসে পড়লো? বিনা দোষে প্রকৃতির পক্ষ থেকে কি আমাদের উপর জুলুম করা হয়েছে? আমরা কি সঠিক পথেই চলছিলাম, কোনো দুর্বলতা, কোনো দোষ-ত্রুটি কি আমাদের ছিলো না? অথবা প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের মধ্যে বহুকাল যাবত কিছু দুর্বলতা এবং কিছু দোষ-ত্রুটি লালন-পালন করছিলাম যার শাস্তিস্বরূপ আমাদেরকে অবশেষে একটি বিদেশি জাতির গোলামীর শিকল পরিয়ে দেয়া হলো? প্রকৃত ঘটনা যদি এই হয় যে, আমাদের মধ্যে কিছু দুর্বলতা ও কিছু দোষ-ত্রুটি ছিলো, যা আমাদের অধঃপতনের কারণ, তা হলে তা কি ছিলো? আর সে সব কি এখন আমাদের মধ্য থেকে দূরীভূত হয়েছে, না তার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন আছে?

দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, বাইরে থেকে যে বিপদটি আমাদের উপর এসে পড়েছিল, তা কি শুধু একটি গোলামীর বিপদই ছিলো না নৈতিকতা, চিন্তাধারা, সভ্যতা সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতির অন্যান্য বহু বিপদও সাথে করে এনেছিল? কোন্‌ কোন্‌ দিক দিয়ে সেগুলো আমাদেরকে কতোটা প্রভাবিত করেছিল? আর তাদের বিদায় গ্রহণের পর আজ তাদের কোন্‌ কোন্‌ প্রভাব আমাদের মধ্যে বিদ্যমান?

তৃতীয় প্রশ্ন এই যে, এ সব বিপদের মুকাবিলায় আমাদের প্রতিক্রিয়া কি ছিলো? একই প্রতিক্রিয়া ছিলো, না বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন ছিলো? যদি বিভিন্ন থেকে থাকে, তাহলে সে সবের মধ্যে প্রত্যেকের কি কি ভালো এবং মন্দ প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনে দেখতে পাওয়া যায়?

আমি এ তিনটি প্রশ্নের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করবো যাতে করে আমাদের বর্তমান দোষ-ত্রুটিগুলোর মূল উৎস আপনারা জানতে পারেন। আপনারা আরও জানতে পারেন যে, প্রতিটি দোষ-ত্রুটিগুলোর মূল কারণ কি, তার শিকড় কতোদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে এবং কোন্‌ কোন্‌ উপকরণ থেকে পুষ্টিলাভ করছে। তারপরই আপনারা সেই গোটা স্কীম উপলব্ধি করতে পারবেন, যা প্রতিকার ও সংস্কারের জন্যে আমাদের সামনে রয়েছে।

আমাদের গোলামীর কারণসমূহ

বিগত শতাব্দীতে যে গোলামী আমাদের উপর চেপে বসেছিল, তা ছিলো প্রকৃতপক্ষে আমাদের কয়েক শতাব্দীর ক্রমাগত ধর্মীয়, নৈতিক ও মানসিক অধঃপতনেরই পরিণাম ফল। বিভিন্ন দিক দিয়ে আমরা দিন দিন অধঃপতনের দিকে ছুটে চলেছিলাম। আমরা অধঃপতনের এমন এক চরম সীমায় পৌঁছেছিলাম, যেখানে আপন শক্তিবলে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের জন্যে সম্ভব ছিলো না। এমন অবস্থায় কোনো না কোনো প্রকারের বিপদ আমাদের উপর পতিত হওয়ারই কথা এবং প্রকৃতির বিধান অনুযায়ী সে বিপদ আমাদের উপর এসে পড়ে।

দ্বীনি অবস্থা

এ অবস্থা জানতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের তৎকালীন দ্বীনি অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা উচিত। কারণ আমাদের জন্যে আমাদের দীনের গুরুত্ব সর্বাধিক। এ দ্বীনই আমাদের জীবনের প্রাণশক্তি। এটিই আমাদেরকে একটি জাতি ও মিল্লাতে পরিণত করেছে। তার বলেই আমরা দুনিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি এবং দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।

আমাদের অতীত ইতিহাস এ কথার সাক্ষী যে, এদেশে ইসলাম কোনো সংগঠিত প্রচেষ্টার ফলে প্রসার লাভ করেনি। সিন্ধু প্রদেশে ইসলামের প্রাথমিক বিজয় ও তার পরের একটি শতাব্দী আলোচনা বহির্ভূত রাখা যেতে পারে। এছাড়া পরবর্তী কালের কোনো যুগেই এমন কোনো সংগঠিত শক্তি ছিলো না, যা এখানে এক দিকে ইসলামের প্রসার ঘটাতো এবং যেখানে যেখানে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে সেখানে তাকে সুসংহত ও সুদৃঢ় করার চেষ্টা সাথে সাথে চালাতো। একেবারে অসংগঠিত পন্থায় কোথাও কোনো ইসলামী জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি এসে পড়লেন এবং তাঁর প্রভাবে কিছু লোক মুসলমান হয়ে গেলো কোথাও কোনো ব্যবসায়ী এলেন এবং তাঁর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের কারণে কিছু লোক কালেমা পড়ে ফেললো। কোথাও কোনো নেক ব্যক্তি ও আল্লাহ প্রেরিত বুযুর্গ আগমন করলেন এবং তাঁর উন্নত চরিত্র ও পূত-পবিত্র জীবন দেখে অনেকেই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করলো। কিন্তু এ সব বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে এমন কোনো উপায়-উপাদান ছিলো না যে, যাদেরকে তাঁরা ইসলামে দীক্ষিত করছিলেন, সাথে সাথে তাদের শিক্ষা-দীক্ষারও ব্যবস্থা করতে থাকবেন। আর না সমসাময়িক শাসন কর্তৃপক্ষের মনে এ ধরনের কোনো চিন্তা ছিলো যে, আল্লাহর অন্যান্য বান্দাহদের প্রচেষ্টায় যেখানে ইসলাম প্রসার লাভ করছিল, সেখানে নও মুসলিমদের শিক্ষা-দীক্ষার কোনো ব্যবস্থাপনা তারা করে দেবেন।

এ অবহেলার কারণে আমাদের জনসাধারণ সূচনা থেকেই অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত রইলো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উপকৃত হয়ে থাকলে হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী অথবা উচ্চ শ্রেণী। জনসাধারণ ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে ছিলো বেখবর এবং তার সংস্কারমূলক সুফল থেকে বহুল পরিমাণে বঞ্চিত। তার পরিণাম আমরা এই দেখতে পাই যে, অমুসলিম জাতির মধ্য থেকে গোত্রের পর গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের মধ্যে জাহেলিয়াতের বহু প্রথাই বিদ্যমান রয়েছে, যা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাদের মধ্যে প্রচলিত দেখা যেতো। শুধু তাই নয়, বরঞ্চ তাদের চিন্তাধারা পর্যন্ত পুরোপুরি বদলে যায়নি। তাদের মধ্যে আজও বহু মুশরেকী আকীদাহ-বিশ্বাস ও মুশরেকী কুসংস্কার বিদ্যমান, যা তাদের অমুসলিম পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। মুসলমান হওয়ার পর পার্থক্য বড়োজোর এই হয়েছিল যে, তাদের পুরাতন দেব-দেবীর স্থানে কিছু নতুন দেবতা স্বয়ং ইসলামের ইতিহাস থেকে খুঁজে বের করেছে এবং প্রাচীন মুশরেকী কর্মকাণ্ডের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী পরিভাষার মধ্য থেকে কিছু নতুন নাম অবলম্বন করেছে। আমল যেমন তেমনই রয়ে গেছে। শুধুমাত্র বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন হয়েছে।

এর প্রমাণ যদি আপনারা চান, তাহলে কোনো অঞ্চলে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন, সেখানকার জনগণের ধর্মীয় অবস্থাটা কি। তারপর ইতিহাসে তালাশ করে দেখুন, ইসলাম আগমনের পূর্বে ঐ অঞ্চলে কোন্‌ ধর্ম প্রচলিত ছিলো। আপনারা দেখতে পাবেন আজও সেখানে সেই পূর্ববর্তী ধর্মের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আকীদাহ-বিশ্বাস ও আমল অন্য এক রূপে প্রচলিত আছে। যেমন ধরুন, যেখানে পূর্বে বৌদ্ধ ধর্ম ছিলো, সেখানে কোনো এক সময় বৌদ্ধের নির্দশনাবলীর পূজা করা হতো। কোথাও তাঁর দাঁত সংরক্ষিত রাখা হতো, কোথাও তাঁর কোনো অস্থি রাখা হতো, কোথাও তাঁর অন্যান্য পবিত্র স্মৃতিগুলোকে আকর্ষণের কেন্দ্রস্থল করে রাখা হতো। আজ আপনারা দেখতে পাবেন সে অঞ্চলে ঐ একই আচরণ চলছে নবী করীমের (সঃ) কেশ মুবারক ও পদচিহ্নের সাথে এবং অন্যান্য বুযুর্গানে দীনের স্মরণীয় নিদর্শনাদির সাথে। এভাবে আপনারা প্রাচীন মুসলিম গোত্রগুলোর বর্তমান রসম রেওয়াজের পর্যালোচনা করে দেখুন। তারপর অনুসন্ধান করে দেখুন, এ সব গোত্রের অমুসলিম শাখাগুলোর মধ্যে কি কি রেওয়াজ প্রচলিত আছে। উভয়ের মধ্যে (কয়েক যুগের নওমুসলিম গোত্রগুলো এবং তাদেরই গোত্রীয় অমুসলিমগণ) আপনারা খুব কম পার্থক্যই দেখতে পাবেন। এটা এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, বিগত শতাব্দীগুলোতে যারা মুসলমানদের সামগ্রিক ব্যাপারে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তারা সাধারণত আপন দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা করেছেন। তাঁরা ইসলাম প্রচারকারী বুযুর্গানের সাথে কোনো প্রকার সহযোগিতা করেননি। অসংখ্য অগণিত মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কিন্তু যাঁরা ছিলেন ইসলামগৃহের ব্যবস্থাপক ও মুতাওয়াল্লী, তাঁরা এ আল্লাহর বান্দাহদের শিক্ষা-দীক্ষা, মানসিক সংস্কার-সংশোধন এবং জীবন পরিশুদ্ধ করার কোনোই ব্যবস্থা করেননি। এ কারণেই এ জাতি মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের বরকত এবং তাওহীদের নিয়ামত থেকে সুফল লাভ করতে পারেনি। ফলে শিরক ও জাহেলিয়াতের অনিবার্য পরিণাম থেকে বাঁচতে পারেনি।

আবার দেখুন যে, এ বিগত শতাব্দীগুলোতে আমাদের আলেমদের কি অবস্থা ছিলো। কতিপয় মহান বুযুর্গ ব্যক্তিত্ব প্রকৃতপক্ষে এ দীনের অসাধারণ খেদমত করেছেন যার প্রভাব আগেও লাভজনক ছিলো এবং এখনও লাভজনক প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু সাধারণভাবে ওলামায়ে দ্বীন যেসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তা হচ্ছে এই যে, ছোটো-খাটো বিষয় নিয়ে তারা কলহ-বিগ্রহ করেছেন। তাঁরা তিলকে তাল করেছেন এবং বড়ো বড়ো গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়গুলো মুসলমানদের অগোচরে রেখেছেন। মতবিরোধকে দল-উপদল সৃষ্টির স্থায়ী বুনিয়াদ বানিয়েছেন এবং দল-উপদল গঠনকে ঝগড়া-লড়াইয়ের মল্ল্লভূমিতে পরিণত করেছেন। তর্কশাস্ত্র শিক্ষাদানের কাজে সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কুরআন-হাদিসের প্রতি না নিজেদের কোনো অভিরুচি ছিলো আর না লোকের মধ্যে তা সৃষ্টি করেছেন। ফেকাহ শাস্ত্রে কোনো অনুরাগ প্রদর্শন করে থাকলে ছোটো-খাটো বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খু বিতর্কই করেছেন। দ্বীন সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞা (تفقه فى الدين) সৃষ্টি করার প্রতি কোনো মনোযোগ দেননি। তাঁদের প্রভাব যেখানেই বিস্তার লাভ করেছে, সেখানে মানুষের চক্ষু ‘অনুবীক্ষণ’ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে বটে, কিন্তু ‘দূরদর্শী’, ‘বিশ্বদর্শী’ হতে পারেনি। বংশানুক্রমিক সূত্রে প্রাপ্ত এ (ঝগড়া-বিবাদের) উত্তরাধিকার ঝগড়া-বিবাদ, তর্ক-বিতর্ক, দলাদলি এবং ক্রমবর্ধমান ফেৎনার (কোন্দল-কোলাহলের) বাড়ন্ত ফসলস্বরূপ আমাদের বংশে এসেছে।

তাসাওউফ পন্থীদের অবস্থা পর্যালোচনা করলে আপনারা জানতে পারবেন যে, কয়েকজন পুণ্যপূত ব্যক্তিত্ব অবশ্যি ইসলামের সত্যিকার তাসাওউফ স্বয়ং অনুশীলন করেছেন এবং অপরকেও তা শিক্ষা দিয়েছেন। অবশিষ্ট সকলে এমন এক তাসাওউফের শিক্ষক ও প্রচারক ছিলেন যার মধ্যে প্রাচ্য, বেদান্ত, যরথুষ্ট্র প্রভৃতি দর্শনের সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এ তাসাওউফের মধ্যে যোগী-ঋষি, বৈরাগ্যবাদ ও প্লেটো দর্শনের ক্রিয়াকলাপের এমন সমাবেশ ঘটেছিল যে, ইসলামের মূল আকীদাহ-বিশ্বাস ও ক্রিয়াকলাপের সাথে তার খুব কমই সামঞ্জস্য রয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর পথ লাভ করার জন্যে মানুষ সেদিকে ধাবিত হতো এবং তাঁরা তাদেরকে অন্য পথ দেখাতেন। তারপর পরবর্তীগণ যখন পূর্ববর্তীগণের সাজ্জাদানশীন বা স্থলাভিষিক্ত হলেন, তখন তাঁরা উত্তরাধিকারের অন্যান্য সম্পদের সাথে তাদের পীর সাহেবানের মুরীদবর্গও লাভ করলেন। অতঃপর পীর-মুরীদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার পরিবর্তে নযর-নিয়াযের সম্পর্কই শুধু অবশিষ্ট রইলো। এসব মহলের সকল প্রচেষ্টা আগেও এই ছিলো এবং এখনও এই রয়েছে যে, যেখানেই তাদের পীরী-মুরীদীর প্রভাব পৌঁছেছে, সেখানে দীনের সঠিক জ্ঞান কিছুতেই পৌঁছেনি। কারণ তাঁরা ভালোভাবে জানতেন যে, জনগণের উপর তাঁদের খোদায়ীর জাদু ততোক্ষণ পর্যন্তই কায়েম থাকতে পারে, যতোক্ষণ তাঁরা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে।

নৈতিক অবস্থা

এ ছিলো আমাদের ধর্মীয় অবস্থা, যা আমাদেরকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গোলামীর তিলক পরিয়ে দিতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে এবং এ স্বাধীনতার সূচনা প্রভাতে সেই অবস্থাই তার দোষ-ত্রুটিসহ আমাদের সামনে রয়েছে।

এখন নৈতিক দিক দিয়ে পর্যালোচনা করলে আপনারা জানতে পারবেন সে, সাধারণত যে সময়ে জাতির মেরুদণ্ড আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী ক্রমাগত নৈতিক অধঃপতনের কারণে ভাড়াটিয়া হয়ে রইলো। তাদের নীতি এই ছিলো যে, যেই আসুক সে তাদের কাছ থেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ নেবে এবং যে কাজে খুশি সে কাজে লাগাবে। আমাদের লক্ষ লক্ষ লোক ভাড়াটিয়া সিপাহী হওয়ার জন্যে তৈরি ছিলো, যাদের প্রত্যেককে মনিব-চাকর হিসাবে যাদের বিরুদ্ধে চাইতো যুদ্ধ করাতে পারতো। এমন লোকও ছিলো, যাদেরকে পারিশ্রমিক দিয়ে প্রত্যেক বিজয়ী তার আইন-শৃঙ্খলার কাজ চালিয়ে নিতে পারতো। এমন কি তার রাজনৈতিক চালবাজীতেও ব্যবহার করতে পারতো। আমাদের এ নৈতিক দুর্বলতার সুযোগ আমাদের প্রত্যেক দুশমন গ্রহণ করেছে তা সে মারাঠা হোক, শিখ হোক, ফরাসী হোক বা ওলন্দাজ হোক। অবশেষে ইংরেজ এসে স্বয়ং আমাদের সিপাহীদের তরবারি দ্বারা আমাদের উপর বিজয়ী হয়েছে এবং আমাদের হস্ত ও মস্তিষ্কের সাহায্যে আমাদের উপর শাসন চালিয়েছে। আমাদের নৈতিক অনুভূতি এতোটা ভোঁতা হয়ে পড়েছিল যে, এ গর্হিত কাজ উপলব্ধি করা তো দূরের কথা, উল্টো এর জন্যে তারা গর্ববোধ করতো। আমাদের কবি এটাকে এভাবে বংশীয় গৌরব বলে গণ্য করতো।

“বিগত একশ’ পুরুষ থেকে যুদ্ধ করাই আমাদের পেশা।” পেশাদার সিপাহী হওয়া এবং এ বিষয়ে কোনো সম্পর্ক রাখা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যেই লজ্জাকর ব্যাপার, গৌরবের ব্যাপার নয়। সেই বা কোন্‌ ধরনের মানুষ, যার মধ্যে হক ও বাতিল এবং আপন ও পরের পার্থক্য বোধ নেই। পেটের আহার এবং পরনের কাপড় কেউ দিলেই সে তার জন্যে শিকারে নামতে প্রস্তুত হয়। সে মোটেই দেখে না যে, কার উপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এ নৈতিক অবস্থা যাদের ছিলো, তাদের কারো মধ্যে বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, কোনো স্থায়ী আনুগত্য ও নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য পাওয়া বড়ো দূরের কথা। তারা যখন আপন জাতির দুশমনের কাছে নিজেকে বিক্রি করতে পারে, তখন তাদের মধ্যে কোনো পূত-পবিত্র ও শক্তিশালী বিবেকের অস্তিত্ব থাকতেই পারে না। এ জন্যেই তারা ঘুষ ও আত্মসাৎকে, ‘গায়েবী মদদ ও খোদার ফযল’ নামে আখ্যায়িত করতো। তারা সুবিধাবাদী ও শক্তিপূজারী হয়ে পড়েছিল। তাদের মধ্যে এ গুণ সৃষ্টি হয়েছিল যে, যার কাছ থেকে তারা বেতন লাভ করতো, তার জন্যে নিজের ঈমান ও বিবেকের বিরুদ্ধে সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলো। এর থেকে আপনারা আন্দাজ করতে পারেন যে, আমাদের চাকুরিজীবী শ্রেণীর অধিকাংশ আজকাল যেসব গুণপনা প্রদর্শন করছে, তা কোনো আকস্মিক দুর্বলতা নয় যে, তা হঠাৎ তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। বরঞ্চ তার শিকড় আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের গভীরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। দুঃখ শুধু এতোটুকু যে, আমাদের দুশমন তাদেরকে অবৈধভাবে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতো, আর আজ তাদেরকে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। প্রকৃতপক্ষে তাদের হওয়া উচিত ছিলো জাতির ব্যাধির চিকিৎসক, তাদের রোগের সুযোগ গ্রহণ করা উচিত ছিলো না।

আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এসব দুর্বলতায় আমাদের আলেমগণও অংশীদার ছিলেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে যেমন মুষ্টিমেয় সংখ্যক মহান ও সুদৃঢ় চরিত্রের লোক ছিলেন, তেমনি আলেমদের মধ্যেও কতিপয় এমন মহান ব্যক্তিত্বও ছিলেন, যাঁরা তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন এবং জীবনের বাজি রেখে তা পালন করেন। দুনিয়ার কোনো সম্পদ তাঁদেরকে খরিদ করতে পারেনি। কিন্তু সাধারণত যে নৈতিক অবস্থা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছিলো, তা আলেমদেরও ছিলো। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বেতনভুক্ত। কোনো না কোনো বাদশাহ, আমীর অথবা পরিষদের সাথে তাঁরা সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়তেন। তার বেতন ভোগ করে তার ইচ্ছামত দ্বীন ও দ্বীনি আইন-কানুনের ব্যাখ্যা-বিশ্ল্লেষণ করা, আপন স্বার্থকে দীনের দাবির উপর অগ্রাধিকার দেয়া, আপন প্রভুর খাতিরে সত্যনিষ্ঠ আলেমদেরকে দাবিয়ে রাখার জন্যে ধর্মের অস্ত্র ব্যবহার করা ছিলো তাদের অভ্যাস। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতেন অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করে চলতেন। প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন ও দরিদ্র লোকদের ব্যাপারে তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতি এতো প্রখর ছিলো যে, মুস্তাহাব, মাকরূহ্‌ এবং ছোটখাটো বিষয়েও তারা মার্জনার যোগ্য ছিলো না। আর এসব বিষয় নিয়ে তাঁরা বিরাট ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তারা সম্পদশালী ও শাসন কর্তৃপক্ষের বেলায়, তারা মুসলমান হোক অথবা কাফের একেবারে আপোসকামী ছিলেন এবং ছোটখাটো ব্যাপার কেন, একেবারে মৌলিক বিষয়েও তাদেরকে প্রশ্রয় দিতেন।

এখন রইলেন আমাদের আমীর-ওমরা। দু’টি জিনিসের প্রতিই তাঁদের আগ্রহ-অনুরাগ কেন্দ্রীভূত ছিলো। একটি উদরপূজা ও অপরটি কামরিপু চরিতার্থকরণ। এ দু’টি বস্তু ব্যতীত তাঁদের দৃষ্টিতে অন্য কোনো কিছুর গুরুত্ব ছিলো না। সকল চেষ্টা-চরিত্র ও শ্রম-সাধনা ঐ দু’টির খেদমতের জন্যেই নিবেদিত ছিলো। এ দু’টির পরিপোষণের লক্ষ্যে জাতীয় সম্পদ দ্বারা এ পেশা ও শিল্পের উৎকর্ষ সাধন করা হতো। এ পেশা পরিত্যাগ করে কোনো আমীর যদি তার ধন-দৌলত ও শক্তিসামর্থ কোনো মহান উদ্দেশ্যে ব্যয় করতো, তাহলে অন্যান্য সকল আমীর মিলিত হয়ে থাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করতো এবং তার বিরুদ্ধে আপন জাতির দুশমনদের সাথে চক্রান্ত করতেও দ্বিধাবোধ করতো না।

মানসিক অবস্থা

এরপর যখন আমরা মানসিক চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের পর্যালোচনা করি, তখন জানতে পারি যে, কয়েক শতাব্দী যাবত আমাদের এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও তত্ত্বানুসন্ধানের কাজ প্রায় বন্ধ ছিলো। আমাদের যাবতীয় শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদান প্রাথমিক জ্ঞানচর্চা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ ধারণা বদ্ধমূল ছিলো যে, অতীত মনীষীগণ যে কাজ করে গেছেন, তা জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার চূড়ান্ত ফল ছিলো। তার অতিরিক্ত কিছু করা যেতে পারে না। জ্ঞানানুশীলন বড়জোর এতোটুকু হতে পারে যে, পূর্ববর্তীগণের লিখিত গ্রন্থাবলীর ব্যাখ্যা ও টিকা লেখা যেতে পারে। এসব লেখার কাজে আমাদের গ্রন্থকারগণ এবং তা পড়াবার কাজে আমাদের শিক্ষকগণ নিমগ্ন আছেন। কোনো নতুন চিন্তা, কোনো নতুন গবেষণা এবং কোনো নতুন আবিষ্কার সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে আমাদের নজরে পড়ে না। এ কারণে এক পরিপূর্ণ স্থবিরতা আমাদের মন-মানসিকতা ও চিন্তা-চেতনার অঙ্গনে বিরাজ করছে। এ কথা সত্য যে, যে জাতির এ দুরবস্থা হয়, সে বেশি দিন তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। তাকে অনিবার্যরূপে এমন এক জাতির দ্বারা পরাভূত হতে হয়, যারা কর্মতৎপর, গতিশীল ও অগ্রগামী; যারা জনসাধারণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে। যাদের লোকজনের মধ্যে দায়িত্ববোধ পাওয়া যায়, যা কিছুই তারা দায়িত্ব বলে মনে করুক না কেন; যারা জ্ঞানীগুণী ও সুধী ব্যক্তিগণ গবেষণায় নিয়োজিত এবং নতুন নতুন শক্তির উদ্‌ভাবক, যার যোগ্য ব্যবস্থাপকগণ নতুন উদ্‌ভাবিত শক্তিগুলোকে জীবনের বিভিন্ন কাজে প্রয়োগ করে এবং যে জাতি সভ্যতা-সংস্কৃতির বিভিন্ন বিভাগে ও দিকে ক্রমাগতভাবে উন্নতির সাথে অগ্রসর হয়। এ ধরনের কোনো জাতির মুকাবিলায় একটি স্থবির, দুর্বল চরিত্র এবং অজ্ঞ ও পশ্চাৎপদ জাতি কতোদিন টিকে থাকতে পারে? অতএব, এ কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিলো না, বরং প্রকৃতির দাবিই এই ছিলো যে, আমরা পাশ্চাত্যের জাতিসমূহের কোনো একটি গোলামে পরিণত হই।

পাশ্চাত্য সভ্যতার বুনিয়াদ

এখন আমাদের দেখা উচিত যে, যে পাশ্চাত্য জাতির দ্বারা পরাজিত ও পরাভূত হয়ে আমরা গোলামীর শিকল পরলাম, তারা কী সাথে করে এনেছিল। তাদের মতবাদ, ধর্ম ও দর্শন কী ছিলো? তাদের নীতি-নৈতিকতা কী ছিলো? তাদের সভ্যতার রূপ কী ছিলো? তাদের নীতির বুনিয়াদ কী ছিলো? তাদের এসব কিছু কিভাবে এবং কতোটা আমাদেরকে প্রভাবিত করেছিল।

ধর্ম

যে সব শতাব্দীতে আমরা ক্রমাগত অধঃপতনের দিকে ছুটেছিলাম, ঠিক ঐ শতাব্দীগুলোতেই ইউরোপ নতুন রেনেসাঁ আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরুত্থান লাভ করছিল। এ আন্দোলনের সূচনাকালেই মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টধর্মের সাথে তার সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সংঘর্ষ এমন এক দুঃখজনক পরিণাম ডেকে আনে যা শুধু ইউরোপের জন্যেই নয়, বরং সারা দুনিয়ার জন্যে মারাত্মক প্রমাণিত হয়। প্রাচীন খ্রিষ্টীয় দার্শনিকগণ তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসের এবং সৃষ্টিজগত ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেলের ধারণার গোটা প্রাসাদ নির্মাণ করে রেখেছিল গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের মতবাদ, দলীল-প্রমাণ ও তথ্যাদির উপর। তাদের ধারণা এই ছিলো যে, এ বুনিয়াদগুলোর যে কোনো একটির উপর সামান্য আঘাত লাগলেই গোটা প্রাসাদ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আর সেই সাথে ধর্মও শেষ হয়ে যাবে। সে জন্যে তাঁরা এমন কোনো সমালোচনা-গবেষণা সহ্য করতে তৈরি ছিলেন না, যা গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের সর্বস্বীকৃত বিষয়গুলোর প্রতি সন্দেহ আরোপ করে। এমন কোনো দার্শনিক চিন্তাধারাও তাঁরা বরদাশত করতে পারতেন না, যা ঐ সর্বস্বীকৃত মতবাদের পরিপন্থী যার কারণে গির্জা কর্তৃপক্ষকে তাদের যুক্তি-প্রমাণ পুনর্বিবেচনা করতে হতো। তাঁরা এমন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণার অনুমতিও দিতে পারতেন না, যার ফলে বিশ্বজগত ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেল প্রদত্ত ও দার্শনিকগণ কর্তৃক গৃহীত মতবাদের কোনো অংশ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। এ ধরনের প্রতিটি বিষয়কে তাঁরা ধর্মের জন্যে এবং ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত তামাদ্দুনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যে আশঙ্কাজনক মনে করতেন। পক্ষান্তরে যাঁরা নতুন রেনেসাঁ আন্দোলনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমালোচনা, গবেষণা এবং তথ্যানুসন্ধানের কাজ করছিলেন, তাঁরা পদে পদে ঐ দর্শন ও বিজ্ঞানের দুর্বলতা উপলব্ধি করছিলেন, যার উপর নির্ভর করে ধর্মীয় বিশ্বাস ও যুক্তি-প্রমাণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাঁরা যতোই সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন গির্জা কর্তৃপক্ষ ততোই তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে। নীতি-নৈতিকতা কী ছিলো? তাদের সভ্যতার রূপ কী ছিলো? তারা দিন দিন অধিকতর কঠোরতার সাথে তাঁদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিলেন। সর্বস্বীকৃত তথ্য ও তত্ত্বের বিপরীত বহু কিছু নজরে পড়ছিল। তথাপি গির্জা কর্তৃপক্ষদের জিদ ছিলো এই যে, ঐসব সর্বস্বীকৃত তথ্য ও তত্ত্ব পুনর্বিবেচনা করে দেখার পরিবর্তে সমালোচকদের চক্ষুই উৎপাটিত করা হোক। ঐসব মতবাদের মধ্যে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি নজরে পড়ছিল, যাকে পূর্বে কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের অকাট্য দলীল-প্রমাণ মনে করা হয়েছিল। কিন্তু গির্জা কর্তৃপক্ষ বলেন যে, ঐ সব যুক্তি-প্রমাণ বারবার চিন্তাভাবনা করার পরিবর্তে যারা এমন চিন্তা করে, তাদের মত-মস্তিষ্কই চূর্ণ করে দেয়া উচিত।

এ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের প্রথম পরিণাম ফল এই হলো যে, নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের জাগরণের সূচনা থেকেই ধর্ম ও ধার্মিকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ-প্রতিহিংসা সৃষ্টি হলো। অতঃপর যতোই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ কঠোরতা প্রদর্শন করতে থাকে, ততোই এ বিদ্বেষ-প্রতিহিংসা বাড়তে ও প্রসার লাভ করতে থাকে। এ প্রতিহিংসা শুধু খ্রিষ্টবাদ ও গির্জা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রইলো না, বরং স্বয়ং ধর্মই তার শিকারে পরিণত হলো। নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নতুন সভ্যতার পতাকাবাহীগণ উপলব্ধি করলেন যে, ধর্ম একটি প্রতারণা মাত্র। কোনো যুক্তিবাদিতার পরীক্ষায় তা টিকে থাকতে পারে না। এর বিশ্বাস কোনো যুক্তিতর্কের উপর নয়, বরং অন্ধ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। ধার্মিকদের ভয় ছিলো এই যে, জ্ঞানের আলো বিস্তার লাভ করলে তাদের গুমর ফাঁক হয়ে যাবে। অতঃপর জ্ঞান-বিজ্ঞানের অঙ্গন থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে এ সংঘাত-সংঘর্ষ যখন রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়লো এবং গির্জা কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর নতুন সভ্যতার পতাকাবাহীদের নেতৃত্বে এক নতুন জীবন ব্যবস্থার প্রাসাদ গড়ে উঠলো, তখন তার আরও দু’টি পরিণাম ফল দেখা গেলো, যা ভবিষ্যতের সমগ্র মানব ইতিহাসের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করলো।

প্রথমতঃ নতুন জীবন ব্যবস্থার প্রতিটি বিভাগ থেকে ধর্মকে কার্যতঃ উৎখাত করা হলো এবং তার পরিসীমা ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও কাজ পর্যন্ত সীমিত করে রাখা হলো। এ কথা নতুন সভ্যতার মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত করা হলো যে, রাজনীতি, অর্থনীতি, নৈতিকতা, আইন-কানুন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলা মোটকথা সামাজিক জীবনের কোনো বিভাগেই ধর্মের হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। তা নিছক মানুষের এক ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ তার ব্যক্তিগত জীবনে খোদা ও নবীকে মানতে চাইলে মানবে এবং তাদের নির্দেশ মেনে চলতে চাইলে চলবে। কিন্তু সামাজিক জীবনে সমুদয় স্কীম রচিত ও কার্যকর করা হবে এ কথার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করেই যে, ধর্ম এ বিষয়কে কি নির্দেশনা দান করে এবং কি করে না।

দ্বিতীয়তঃ এ নতুন সভ্যতার শিরা-উপশিরায় খোদাবিমুখতা ও ধর্মহীনতার মানসিকতা সন্নিবিষ্ট হয়ে গেলো। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের যা কিছু সমৃদ্ধি হলো, তার মূলে সেই বিদ্বেষই সর্বদা বিদ্যমান ছিলো, যা বৈজ্ঞানিক জাগরণের সূচনায় ধর্ম এবং তৎসংশ্ল্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ের বিরুদ্ধে সৃষ্টি হয়েছিল। এ চিন্তাধারা প্রসূত সভ্যতা যেখানেই পৌঁছলো, সেখানে এ ধারণা সৃষ্টি করলো যে, ধর্ম যা কিছু পেশ করে, তা খোদা, আখেরাত এবং ওহীর প্রতি বিশ্বাস হোক অথবা কোনো নৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতি, তা সর্বাবস্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার সত্যতার প্রমাণ পেশ করা উচিত। নতুবা তা অস্বীকার করতে হবে। পক্ষান্তরে পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানের পণ্ডিতবর্গ যা উপস্থাপিত করবেন, তাই গ্রহণযোগ্য যতোক্ষণ না তা ভ্রান্ত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়। এ ধারণা-পদ্ধতি পাশ্চাত্যের গোটা চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল। তা শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যকেই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বিবর্জিত করেনি। বরঞ্চ সে চিন্তাধারার ভিত্তিতে রচিত সমাজ দর্শন ও সমাজ ব্যবস্থা খোদা ও আখেরাতের ধারণারও পরিপন্থী ছিলো।

জীবনদর্শন

এ তো ছিলো ধর্ম সম্পর্কে বহিরাগত বিজয়ী সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি। এখন দেখুন যে, তার জীবনদর্শন কি ছিলো। যা সে ধর্মকে অস্বীকার করে অবলম্বন করেছিল।

এ একেবারে একটি জড়বাদী দর্শন। পাশ্চাত্যের চিন্তানায়কগণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যের অতীত কোনো অদৃশ্য সত্যকে বিশ্বাস করতে না প্রস্তুত ছিলো আর না যে ওহী ও ইসলামকে তারা অস্বীকার করতো, তা ব্যতীত অদৃশ্য সত্যগুলো জানবার এবং তা উপলব্ধি করার জন্য অন্য কোনো উপায় ছিলো। অতঃপর বৈজ্ঞানিক মেজাজ-প্রকৃতিও এ কথা মানতে রাজি ছিলো না যে, নিছক অনুমানের ভিত্তিতে অদৃশ্য সত্যাবলী সম্পর্কে কোনো ধারণা-মতবাদের প্রাসাদ তৈরি করা হোক। এর চেষ্টা যদিও করা হয়েছিল, তথাপি বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনার মুকাবিলায় তা টিকে থাকতে পারেনি। অতএব, অদৃশ্য সম্পর্কে যখন তারা সন্দেহ ও অনুপলব্ধির স্থান অতিক্রম করতে পারলো না, তখন এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় রইলো না যে, দুনিয়া এবং জীবন সম্পর্কে যে অভিমতই তারা কায়েম করবে, তা শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিশ্বাসের ভিত্তিতেই করবে। ফলে, তাদের গোটা জীবনদর্শন বস্তুতান্ত্রিক হয়ে পড়ে। তারা মনে করে যে, মানুষ এক প্রকারের পশু, যা এ পৃথিবীতে পাওয়া যায়। সে না কারো অধীন আর না কারো কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তার জীবন বিধান রচনার জন্যে উপর থেকে কোনো হেদায়াতও সে লাভ করে না। এ হেদায়াত বা পথ-নির্দেশনা নিজের থেকে গ্রহণ করতে হবে। এ হেদায়াতের কোনো উৎস থাকলে তা হচ্ছে প্রাকৃতিক আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতি, জীব জগতের তথ্যাবলী অথবা মানবের অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতা। তারা মনে করেছিল, এ দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন। তার সাফল্য ও স্বাচ্ছন্দ্যই কাম্য। তার ভালো ও মন্দের পরিণামই একমাত্র বিচার্য। তারা মনে করেছিল, মেজাজ-প্রকৃতির দাবি পূরণ এবং প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ ব্যতীত জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তারা মনে করেছিল, পরিমাপযোগ্য বস্তুই একমাত্র সত্য এবং তারই মূল্য ও গুরুত্ব আছে। তা ছাড়া আর যা কিছু তা অবাস্তব ও মূল্যহীন। তার পেছনে লেগে থাকা সময়ের অপচয় মাত্র। আমি এখানে ঐসব দর্শনভিত্তিক জীবন ব্যবস্থার উল্ল্লেখ করছি না, যা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে রচিত হয়েছিল, যা বই-পুস্তকে লিখিত হয়েছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়া হতো ও পড়ানো হতো। বরং পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিশ্ব প্রকৃতি, মানুষ ও পার্থিব জীবন সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করে আছে এবং সাধারণ মানুষের মনে যা বদ্ধমূল হয়ে আছে, তাই আমি এখানে উল্লেখ করছি। তার সারাংশ তাই, যা আমি আপনাদের সামনে পেশ করছি।

এ সব ছাড়াও তিনটি এমন বড়ো বড়ো দার্শনিক মতবাদ রয়েছে যা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে আত্মপ্রকাশ করে, যখন আমরা পাশ্চাত্যের অধীন গোলামীর জীবন যাপন করছিলাম। তা খুঁটিনাটি বিষয়াদি ছাড়াই শুধু মূল ভাবধারার দিক দিয়ে গোটা সভ্যতার উপর বিস্তার লাভ করে। মানব জীবনের উপর এর এমন এক সার্বিক প্রভাব পড়ে, যা সম্ভবতঃ অন্য কিছুর পড়েনি। তাই এখানে বিশেষ করে এসবের উপরে কিছু আলোকপাত করবো।

হেগেলের ঐতিহাসিক দর্শন

এ সবের মধ্যে প্রথম মতবাদটি হচ্ছে হেগেলের, যা তিনি মানব ইতিহাসের বিশ্ল্লেষণ প্রসঙ্গে উপস্থাপিত করেন। তার সারমর্ম এই যে, ইতিহাসের এক অধ্যায়ে মানবীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির যে ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে, তা তার যাবতীয় বিভাগ ও কাঠামোসহ কিছু বিশেষ চিন্তাধারার উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকে। তার ফলেই একটা সভ্য যুগের সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার যুগটি যখন পাকাপোক্ত হয়ে যায়, তখন তার দুর্বলতা প্রকাশ হতে থাকে এবং তার মুকাবিলায় কিছু নতুন চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটতে থাকে, যা বিরাজমান সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্ব-সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এ সংঘাত-সংঘর্ষের ফলে এক নতুন সভ্যতা যুগের সূত্রপাত হয়। এর মধ্যে পূর্ববর্তী সভ্যতা যুগের সদগুণাবলী রয়ে যায় এবং কিছু নতুন গুণাবলীও ঐসব চিন্তাধারার ভিতর থেকে আত্মপ্রকাশ করে যার আকস্মিক আক্রমণে পরাজিত হয়ে পূর্ববর্তী যুগের বিজয়ী চিন্তাধারা শেষ পর্যন্ত আপোস করতে বাধ্য হয়। অতঃপর এ সভ্যতার যুগও পরিপক্কতা লাভ করার পর তার গর্ভ থেকেই কিছু বিপরীতমুখী চিন্তাধারার জন্ম নেয়। অতঃপর আবার দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয় এবং উভয়ের মধ্যে এক সমঝোতার ভিত্তিতে এক তৃতীয় যুগের সূচনা হয়। এতে পূর্ববর্তী যুগের গুণাবলী নিজেদের মধ্যে ধারণ করে এবং সেই সাথে নতুন চিন্তাধারার আমদানীকৃত গুণাবলীও তার মধ্যে অভিনিবিষ্ট করা হয়। এভাবে হেগেল মানবীয় সভ্যতার যে ক্রমবিকাশের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সাধারণতঃ তার দ্বারা মনের মধ্যে এ প্রভাব বদ্ধমূল হয় যে, অতীতে প্রতিটি সভ্যতার যুগ আপন আপন সময়ে নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতার কারণে শেষ হয়েছে এবং নিজেদের গুণাবলী প্রতিটি পরবর্তী যুগের জন্য ছেড়ে গেছে। অন্য কথায়, যে সভ্যতার যুগ আমরা অতিক্রম করছি তা যেন ঐসব উত্তম অংশাবলীর সারবস্তু, যা অতীত সভ্যতা যুগের মধ্যেও পাওয়া যেতো। ভবিষ্যত উন্নতির কোনো সম্ভাবনা থাকলে তা রয়েছে ঐসব নতুন চিন্তাধারায়, যা বর্তমান সভ্যতা যুগের বুনিয়াদী চিন্তাধারার সাথে দ্বন্দ্ব-সংগ্রামের জন্যেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অতীত যুগগুলোর মধ্যে এমন কিছু নেই, যার থেকে কোনো দিক-নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে, যার জন্যে পেছনে ফিরে দেখার কোনো প্রয়োজন আছে। কারণ তাদের যেসব অংশাবলী পরবর্তী যুগে সংশ্ল্লিষ্ট করা হয়নি, সেগুলো পরীক্ষা করার পর ত্রুটিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় পূর্বাহ্নেই তা পরিত্যক্ত হয়েছে। আমাদের ঐতিহাসিক রুচি-মানসিকতা তাদের কোনো জিনিসের যদি মর্যাদা দিতে চায় তাহলে এদিক দিয়ে দিতে পারে যে, তা আপন যুগে এক মর্যাদার বস্তু ছিলো এবং মানবীয় সভ্যতার ক্রমবিকাশে সে তার স্বীয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বর্তমান যুগে তা কোনো মর্যাদার যোগ্য নয় এবং ভ্রূক্ষেপযোগ্যও নয়। কারণ ইতিহাস তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করে ফেলেছে।

এখন একটু চিন্তা করে দেখুন যে, এ প্রকৃতপক্ষে কোন্‌ ধরনের বিপজ্জনক দর্শন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এ ধারণা যার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হবে, আপনি কি আশা করতে পারেন যে, তার মনে এসব সভ্যতা যুগের প্রতি কোনো প্রকার শ্রদ্ধা বাকি থাকতে পারে, যেসব যুগে ইবরাহীম (আ), মুসা (আ) এবং মুহাম্মদ (সা) তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন? সে কি কখনো নবী-যুগ এবং খেলাফতে রাশেদার শরণাপন্ন হবে কোনো হেদায়াত ও পথ-নির্দেশনার জন্যে? আসলে এ এমন এক যুক্তিপূর্ণ ও সুসংহত দার্শনিক মতবাদ, যা একবার মানসপটে আঘাত হানলে সেখান থেকে দ্বীন সম্পর্কিত চিন্তাধারার মূল উৎপাটিত হয়ে যাবে। (টিকা: এখানে এ ইতিহাসের দর্শন খণ্ডন করার কোনো সুযোগ নেই। এর ত্রুটি-বিচ্যুতি যদি কেউ উপলব্ধি করতে চান, তাহলে তাফহীমাত ২য় খণ্ড এবং তাফহীমুল কুরআনের সূরা মায়েদার ৩৫ নং টীকা পড়ে দেখতে পারেন।)

ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদ

উনবিংশ শতকে যে দার্শনিক মতবাদ মানুষের মন-মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, তা ছিলো ডারউইনের ক্রমবিকাশবাদ দর্শন। এখানে তার তাত্ত্বিক জীববিদ্যা সম্পর্কিত (biological) দিক আলোচনার বিষয় নয়। ডারউইনের যুক্তি-পদ্ধতি এবং তার পরিণামস্বরূপ যে সবং দার্শনিক চিন্তা-চেতনা বৃহত্তর সামাজিক চিন্তাধারার রূপ পরিগ্রহ করেছে, আমি শুধুমাত্র সেই দার্শনিক প্রভাব সম্পর্কেই কিছু আলোচনা করবো। সাধারণ মানুষের মন ডারউইনের বিবরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে তা ছিলো এই যে, এ বিশ্বজগত একটি সংগ্রামক্ষেত্র। জীবনের স্থিতিশীলতার জন্যে এখানে প্রতি মুহূর্তে চারদিকে এক চিরন্তন সংগ্রাম বিদ্যমান।

বিশ্ব-প্রকৃতির ব্যবস্থাটাই এমন এক ধরনের যে, এখানে কেউ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইলে তাকে দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম ও প্রতিরোধ করতে হবে। এখানে বেঁচে থাকার জন্যে শক্তি ও ক্ষমতার প্রমাণ যে দিতে পারবে বাঁচার একমাত্র অধিকার তারই এটাই প্রকৃতির মেজাজ-প্রকৃতি হয়ে পড়েছে। এ নির্মম প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অধীনে যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, সে এই জন্যে ধ্বংস হয় যে, সে দুর্বল এবং তার ধ্বংস হওয়াই উচিত। যে টিকে থাকে, সে এ জন্যে টিকে থাকে যে, সে শক্তিমান এবং তার টিকে থাকাই উচিত। যমীন, তার পরিবেশ এবং তার জীবন যাপনের উপায়-উপাদান মোট কথা সব কিছুই শক্তিমানের অধিকারভুক্ত, যে জীবিত থাকার যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। এ সবের উপর দুর্বলের কোনো অধিকার নেই। শক্তিমানের জন্যে তাকে স্থান করে দিতে হবে। শক্তিমান যদি দুর্বলকে সরিয়ে অথবা নির্মূল করে তার স্থান দখল করে, তাহলে সে সত্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত বলতে হবে।

চিন্তা করুন, বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে এরূপ ধারণা যদি হৃদয়ে বদ্ধমূল হয় এবং প্রকৃতির ব্যবস্থাকে যদি সে দৃষ্টিতেই দেখা হতে থাকে, তাহলে মানুষ মানুষের জন্যে কতো ভয়াবহ হয়ে পড়বে। এ জীবনদর্শনে সহানুভূতি, ভালোবাসা অনুগ্রহ, অনুকম্পা, ত্যাগ এবং এ ধরনের অন্যান্য মহান মানবীয় ভাবধারার কোনো স্থান হতে পারে কি? এতে ইনসাফ ও সুবিচার, বিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসপরায়নতা, সততা ও সত্যবাদিতার কোনো অবকাশ থাকতে পারে কি? এখানে অধিকার বলতে তা বুঝায় না, যা একজন দুর্বল লাভ করতে পারে। এখানে জুলুম এ অর্থে ব্যবহৃত হয় না, যার জন্যে কখনো শক্তিধরকে অপরাধী ঠাওরানো যেতে পারে। লড়াই-ঝগড়া মানুষ অতীতেও করেছে। কিন্তু তাকে ফেৎনা-ফাসাদ মনে করা হতো। কিন্তু এখন এ একেবারে প্রকৃতির দাবিতে পরিণত হয়েছে। কারণ বিশ্ব-প্রকৃতি তো একটি রণক্ষত্র বৈ কিছু নয়। জুলুম অতীতেও দুনিয়ায় হতো। কিন্তু পূর্বে তা জুলুমই ছিলো। কিন্তু এখন তার জন্যে এ যুক্তি পাওয়া গেছে যে, এ হচ্ছে শক্তিমানের অধিকার। এ দর্শনের ফলে ইউরোপ অন্যান্য জাতির উপর যে সব জুলুম করেছে, তার জন্যে তারা এক মজবুত যুক্তি পেয়ে গেছে। তারা যদি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার আদিম অধিবাসীদের নির্মূল করে থাকে এবং দুর্বল জাতিগুলোকে তাদের গোলাম বানিয়ে থাকে, তাহলে এ যেন তাদের অধিকার ছিলো, যা তারা প্রকৃতির আইন অনুযায়ীই লাভ করেছে। যারা নির্মূল হয়েছে তারা নির্মূল হওয়ারই যোগ্য ছিলো এবং তাদের স্থান যারা অধিকার করেছে, তাদের এটা করারই অধিকার ছিলো। এ সম্পর্কে পাশ্চাত্যবাসীর মনে এ যাবত যদি কোনো দ্বিধা-সংকোচ থেকেও থাকে, ডারউইনের দর্শনের অকাট্য যুক্তি-প্রমাণ তা দূর করে দিয়েছে। বিজ্ঞানে এ মতবাদটির মর্যাদা যাই হোক না কেন (টিকা: এর বুদ্ধিবৃত্তিক দিকটির সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হয়েছে আমার তাফ্‌হীমাত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে-গ্রন্থকার।) সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অঙ্গনে এ মানুষকে মানুষের জন্যে হিংস্র পশুতে পরিণত করেছে।

মার্কসের বস্তুবাদী ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা

ডারউইনের সমকালে তাঁর দর্শনের অনুরূপ আর একটি দর্শন জন্মলাভ করে মার্কসের বস্তুবাদী ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার গর্ভ থেকে। তার খুঁটিনাটি বিবরণ ও যুক্তিতর্কের আলোচনা আমি এখানে করতে চাই না। (টিকা: এ দর্শনের সংক্ষিপ্ত সমালোচনা করা হয়েছে আমার তাফ্‌হীমাত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে-গ্রন্থকার।) তার বুদ্ধিবৃত্তিক দিকেরও সমালোচনা করতে চাই না। আমি এখানে শুধু এতোটুকু বলতে চাই যে, মার্কস মানুষের মনে দুনিয়ার জীবন সম্পর্কে সে ধারণাই সৃষ্টি করেছেন, যা ইতঃপূর্বে হেগেল এবং ডারউইন করেছেন। হেগেল চিন্তার জগতকে একটি রণক্ষেত্র বলে পেশ করেন। ডারউইন বিশ্বজগত ও প্রকৃতির ব্যবস্থাকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে দিয়েছেন। মার্কস স্বয়ং মানব সমাজেরই সে চিত্র বানিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এ দৃশ্যপটে আমরা মানুষকে আবহমানকাল থেকে সংগ্রামরত দেখতে পাই। তার স্বভাব-প্রকৃতির দাবিই এই যে, সে তার আপন সুযোগ সুবিধা ও স্বার্থের জন্যেই স্বজাতির সাথে সংগ্রাম করবে। মানুষ শুধু ব্যক্তি স্বার্থের জন্যেই বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। শুধু আপন স্বার্থের জন্যেই এ সব শ্রেণীর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ চলে আসছে। মানব ইতিহাসের যাবতীয় ক্রমবিকাশ এ স্বার্থ ভিত্তিক শ্রেণী সংগ্রামের বদৌলতেই হয়েছে। জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ তো দূরের কথা, একই জাতির বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের যে চিত্র আমরা পাই, তা প্রকৃতির দাবি বলেই দেখতে পাওয়া যায়। আমরা দেখতে পাই যে, মানুষের যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে, তাহলে সে সম্পর্ক স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা ভোগের ঐক্য ব্যতীত আর কিছুই নয়। যাদের দ্বারা অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটবে, স্বার্থের ভিত্তিতে সমস্বার্থের লোকদের সাথে মিলিত ও একমত হয়ে তাদের সাথে লড়াই করা একেবারে ন্যায়সংগত তারা হোক না স্বজাতীয় অথবা স্বধর্মীয়। এ লড়াই করা নয়, বরঞ্চ না করাটাই প্রকৃতির পরিপন্থী।

চরিত্র

এটাই হলো সে দর্শন, আকীদা বিশ্বাস ও চিন্তাধারা, যা বিজয়ী সভ্যতার সাথে এসে আমাদের উপরে চেপে বসেছে। এখন দেখুন বহিরাগতদের সাথে নৈতিক চরিত্রের ব্যাপারে কোন্‌ ধরনের মতবাদ ও কর্ম পদ্ধতি আমাদের দেশে এসেছে। আল্লাহ ও আখেরাতকে উপেক্ষা করার পর নৈতিকতার জন্যে বৈষয়িক ও পার্থিব মূল্যবোধ ব্যতীত কোনো মূল্যবোধ এবং পরীক্ষামূলক বুনিয়াদ ব্যতীত কোনো বুনিয়াদ আর বাকি থাকে না। এ ব্যাপারে যদি কেউ মনে করে যে, ধর্ম যে নৈতিক মূল্যবোধ দান করেছে, তা ধর্ম ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে কায়েম থাকবে এবং আম্বিয়া (আঃ) থেকে যে চারিত্রিক মূলনীতি মানুষ শিক্ষা লাভ করেছে তা ঈমান ব্যতিরেকে অন্য কিছুকে অবলম্বন করে মানব জীবনে চলতে থাকবে, তাহলে তা কিছুতেই সম্ভব হবে না। এ জন্যে পাশ্চাত্যবাসীদের মধ্যে যিনিই এ চেষ্টা করেছেন, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ধর্মহীনতা ও আখেরাতের প্রতি অবিশ্বাসজনিত পরিবেশে বাস্তবে যে নৈতিক দর্শন বিকাশ লাভ করেছে এবং কার্যতঃ পাশ্চাত্যবাসীদের জীবনে যা প্রচলিত হয়েছে, তা হচ্ছে উপযোগবাদ দর্শন (utilitarianism) তার সাথে মিশ্রিত হয়েছে ভোগবাদের (epicureanism) সরল বস্তুবাদী ভাবধারা। এর উপরেই পাশ্চাত্যের গোটা তামাদ্দুন এবং জীবনের সমগ্র কর্মকাণ্ডের ভিত্তি রচনা করা হয়েছে। বই পুস্তকে উপযোগবাদ ও ভোগবাদের যে ব্যাখ্যা বিশ্ল্লেষণ করা হয়েছে, তা যাই হোক না কেন, পাশ্চাত্য সভ্যতা এবং স্বভাব চরিত্রে তার যে সারমর্ম প্রতিফলিত হয়েছে তা এই যে, যে জিনিসের দ্বারা আমার নিজের কোনো উপকার ও সুযোগ সুবিধা লাভ হবে, তাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ অথবা আমার ব্যক্তিসত্তার ধারণাকে প্রসারিত করলেই সে সুযোগ সুবিধা আমার জাতির হবে। এখানে সুযোগ সুবিধা বলতে তা পার্থিব সুযোগ সুবিধা কোনো আরাম আয়েশ, কোনো ভোগ সম্ভোগ অথবা কোনো বৈষয়িক উপকারিতা। যে বস্তুর সাহায্যে এ ধরনের কোনো সুযোগ সুবিধা আমার হোক অথবা আমার জাতির, তা পুণ্য কাজ, মর্যাদার যোগ্য, বাঞ্ছিত ও অভীষ্ট। তার জন্যেই সকল চেষ্টা চরিত্র নিয়োজিত করা যেতে পারে। এমনটি যা নয়, যার থেকে এ দুনিয়ায় আমার জন্যে অথবা আমার জাতির জন্যে অনুভূত ও পরিমাপযোগ্য কোনো উপকার বা মঙ্গলকারিতা লাভ করা যায় না, তা ভ্রুক্ষেপযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে যা কিছু পার্থিব দিক দিয়ে ক্ষতিকর, অথবা যা পার্থিব সুযোগ-সুবিধা ও ভোগ-সম্ভোগ থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে, তাই অসৎ কাজ ও পাপ। তার থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। এ নৈতিক দর্শনে ভালো ও মন্দের কোনো স্থায়ী মানদণ্ড নেই। স্বভাব-চরিত্র ও আচার-আচরণের সৌন্দর্য ও কদর্যতার কোনো স্থায়ী মূলনীতি নেই। প্রতিটি বস্তু আপেক্ষিক, অস্থায়ী ও সাময়িক। ব্যক্তিগত ও জাতীয় স্বার্থের জন্যে যে কোনো মূলনীতি প্রণয়ন করা যায় এবং ভঙ্গ করা যায়। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে নিকৃষ্টতম পন্থা অবলম্বন করা যায়। সুযোগ-সুবিধা ও ভোগ-সম্ভোগের জন্যে যে কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায়। আজ যা কিছু ভালো আগামীকাল তা মন্দ হতে পারে। সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড এক এক জনের জন্যে এক এক ধরনের। হালাল ও হারামের মধ্যে যে চিরন্তন পার্থক্য, যা মেনে চলা দরকার এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে যে স্থায়ী পার্থক্য, যার কোনো পরিবর্তন হয় না, এসব এমন ধারণা যা সেকেলে এবং অপ্রচলিত (out-dated)। উন্নতির অগ্রযাত্রা তাকে বহু পশ্চাতে ফেলে এসেছে।

রাজনীতি

যে নীতি-নৈতিকতার ধারণাসহ বিজয়ী সভ্যতা তার পরাক্রম সহকারে এদেশে আগমন করে আমাদের শাসক হয়ে বসলো, তা উল্লেখ করা হলো। এখন সে রাজনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলবো, যা এখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং পাশ্চাত্যের প্রভুদের নির্দেশে যার উন্নতি ও বিকাশ লাভ ঘটে। তিনটি মূলনীতির উপর তার বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ তথা ধর্মহীনতা, জাতীয়তাবাদ তথা জাতিপূজা এবং গণতন্ত্র তথা জনগণের সার্বভৌমত্ব। প্রথম মূলনীতির মর্ম এই যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকর্মের সাথে ধর্ম, খোদা ও তার শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। দুনিয়াবাসী দুনিয়ার বিষয়াদি স্বয়ং নিজের বিবেক-বিবেচনা অনুযায়ী পরিচালনা করার অধিকারী। যেভাবে খুশি তা পরিচালনা করবে এবং তার জন্যে যে মুলনীতি, আইন, মতবাদ ও পদ্ধতি ভালো মনে করবে, তা বানাবে। খোদার এসব ব্যাপারে না বলার কোনো অধিকার আছে আর না আমাদের তাঁকে একথা জিজ্ঞেস করার কোনো প্রয়োজন আছে যে, তিনি কি পছন্দ করেন এবং কি পছন্দ করে না। অবশ্যি কোনো বিরাট বিপদের পাহাড় যদি আমাদের উপর ভেঙে পড়ে, তাহলে এটা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী হবে না বিপদের সময় সাহায্যের জন্যে তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করায়। এ অবস্থায় আমাদের সাহায্য করা আল্লাহর কর্তব্য হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় মূলনীতির মর্ম এই যে, যে স্থান থেকে খোদাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সেখানে জাতিকে সমাসীন করা। জাতিকেই দেবতার আসনে বসানো হয়। জাতির স্বার্থই হয়ে পড়ে ভালো ও মন্দের মানদণ্ড। জাতিরই উন্নতি এবং তার মর্যাদা ও অপরের উপরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই হয়ে পড়ে বাঞ্ছিত ও অভীষ্ট। জাতির জন্যে জনগোষ্ঠীর ত্যাগ ও কুরবানী ন্যায়সঙ্গত হয় এবং অপরিহার্যও হয়। সেই সাথে বহিরাগত প্রভুগণ জাতীয়তাবাদের যে ধারণা আমদানি করেছেন, তা ধর্মহীন ও দেশভিত্তিক জাতীয়তার ধারণা। তার সাথে মিশ্রিত হয়ে জাতীয়তাবাদ তথা জাতি-পূজার ধারণা অন্তত আমাদের জন্যে তো একবারে হলাহল স্বরূপ হয়ে পড়েছে। কারণ যে দেশের অধিবাসীর তিন-চতুর্থাংশ অমুসলিম, সেখানে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের সুস্পষ্ট দু’টি অর্থ হতে পারে। হয় আমরা সহজভাবে নয়, বরঞ্চ এক ভাবাবেগে অমুসলমান হয়ে যাব, অথবা জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিতে কাফের তথা দেশদ্রোহী বলে অভিহিত হবো। তৃতীয় মূলনীতির মর্ম এই যে, জাতীয় রাষ্ট্রে যে স্থান থেকে ধর্মকে বেদখল করা হয়েছে, সেখানে জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতকে তার স্থানভিত্তিক বানানো হবে। ধর্মকে পাশ কাটিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ যাকে সত্য বলবে, তাই সত্য এবং যাকে মিথ্যা বলবে, তাই মিথ্যা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের তৈরি মূলনীতি, আইন ও নিয়ম-পদ্ধতি জাতির দ্বীন তথা জীবন ব্যবস্থা হয়ে পড়বে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু এ জীবন ব্যবস্থার রদবদল করতে পারবে।

বিজয়ী সভ্যতার প্রভাব

উপরে বর্ণিত এ ছিলো রাজনীতি-নৈতিকতা, দর্শন এবং ধর্ম সম্পর্কে ধারণা, যা আমাদের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় পর্যায়ে বাইরে থেকে আমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। সে সময়ে আমরা যে সব দুর্বলতার শিকার হয়ে পড়েছিলাম, তা আপনারা ইতঃপূর্বে শুনেছেন। এসব লোক যে সভ্যতা আমদানী করেছিল তার চিত্রও আপনাদের সামনে পেশ করেছি। এ কথা পরিষ্কার যে, মুষ্টিমেয় ভ্রমণকারী অথবা পর্যটক এ সভ্যতা এখানে নিয়ে আসেনি। এ সভ্যতা ছিলো তাদের, যারা এখানে শাসকের বেশে এসেছিল। এদেশের সামগ্রিক জীবনের উপর তাদের এমন প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা ইতঃপূর্বে কোনো শাসকের হয়নি। এদেশের অধিবাসীদের উপর তাদের যতোটা মানসিক ও বৈষয়িক প্রভাব পড়েছিল, ততোটা আর কারো পড়েনি। প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারের প্রচুর উপায়-উপাদান তাদের হাতে ছিলো। আইন-আদালতের মজবুত হাতিয়ারও তাদের হাতে ছিলো। সেই সাথে জীবিকার্জনের সকল চাবিকাঠিও তাদের শাসন-কর্তৃত্বের অধীন ছিলো। এসব কারণে তাদের সভ্যতা আমাদের উপর সার্বিক প্রভাব বিস্তার করেছিল, যার থেকে আমাদের জীবনের কোনো একটি বিভাগও মুক্ত থাকতে পারেনি।

শিক্ষার প্রভাব

তারা তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং জীবিকা অর্জনের চাবিকাঠি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দরজায় লটকিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার অর্থ এই যে, এখন জীবিকা তারাই পাবে, যারা এ শিক্ষালাভ করবে। এই চাপে পড়ে আমাদের প্রতিটি বংশধর পূর্বাপেক্ষা অধিকতর উৎসাহ-উদ্যম সহকারে এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এখানে তারা ঐ সব মতবাদ ও কর্মকাণ্ড শিক্ষা লাভ করে, যার মূল ভাবধারা ও বাহ্যিক কাঠামো আমাদের সভ্যতার একেবারে বিপরীত। যদিও তারা আমাদের লাখের মধ্যে একজনকেও প্রকাশ্যভাবে কাফের বানাতে পারেনি, কিন্তু চিন্তা, মতবাদ, রুচি ও মননশীলতা, স্বভাব-চরিত্র ও আচার-আচরণে সম্ভবত শতকরা দু’জনকেও সত্যিকার মুসলমান থাকতে দেয়নি। এ ছিলো সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি, যা তারা আমাদের করেছে। কারণ, তারা আমাদের মন-মস্তিষ্কে আমাদের সভ্যতার শিকড় বিনষ্ট করে তথায় এক বিপরীত সভ্যতার শিকড় লাগিয়ে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব

তারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তাদের অর্থনৈতিক দর্শন ও মতবাদসহ আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে জীবন-জীবিকার দুয়ার তাদের জন্যেই উন্মুক্ত হয়েছে, যারা এ অর্থব্যবস্থার মূলনীতি মেনে নিয়েছে। এ ব্যবস্থা প্রথমে আমাদেরকে হারামখোর বানিয়েছে। অতঃপর ক্রমশ আমাদের মন থেকে হালাল ও হারামের পার্থক্য মিটিয়ে দিয়েছে। তারপর অবস্থার এতোটা অবনতি ঘটিয়েছে যে, যে ইসলামের শিক্ষা পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কর্তৃক ঘোষিত হালালকে হারাম বলে, আমাদের মধ্যে থেকে বিপুল সংখ্যক লোক সে শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

আইনের প্রভাব

তারা তাদের আইন আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। এর দ্বারা তারা আমাদের তামাদ্দুনিক ও সামাজিক ব্যবস্থার রূপ-কাঠামোই শুধু পরিবর্তন করে দেয়নি, বরং আমাদের সামাজিক ধারণা, মতবাদ এবং আইন সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি বহুলাংশে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আইন সম্পর্কে যিনি কিছুটা জ্ঞান রাখেন তিনি জানেন যে, চরিত্র ও সমাজের সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যখন কোনো আইন রচনা করে, তার পশ্চাতে চরিত্র, সমাজ ও সংস্কৃতির এক বিশেষ রূপরেখা থাকে যার উপর সে মানব জীবনকে ঢেলে সাজাতে চায়। এভাবে যখন সে কোনো আইন বাতিল করে, তখন তার অর্থ এই হয় যে, সে সেই নৈতিক মতবাদ ও তামাদ্দুনিক দর্শনকেই বাতিল করে দেয়, যার উপর তার পূবের্র আইন রচিত হয়েছিল। অতএব, আমাদের ইংরেজ শাসকগণ এখানে এসে যখন এদেশের প্রচলিত সকল শরীয়তের আইন রহিত করে, সে স্থলে নিজেদের আইন প্রবর্তন করে, তখন তার অর্থ শুধু এ ছিলো না যে, একটি আইনের স্থলে অন্য আইন প্রবর্তিত হলো, বরং তার অর্থ এই যে, একটি নৈতিক ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা রহিত করে সে জায়গায় অন্য একটি নৈতিক ও তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলো। এ পরিবর্তনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তারা এখানকার আইন কলেজগুলোতে নিজস্ব আইন শিক্ষা চালু করলো। এ শিক্ষা মনের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি করলো যে, পূর্ববর্তী আইন ছিলো সেকেলে, জরাজীর্ণ এবং আধুনিক যুগ-সমাজের জন্যে মোটেই উপযোগী নয়। এ নতুন আইন-পদ্ধতি প্রণয়ন তার মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে অধিকতর সঠিক এবং অধিকতর উন্নত। শুধু তাই নয়, বরং আইন প্রণয়নের অধিকার একমাত্র যে আল্লাহ তা’লার আমাদের এ বুনিয়াদী আকীদাহ-বিশ্বাসকেও তারা ভেঙে দিয়েছে। তারা লোকের মনে এ কথা বদ্ধমূল করে দেয় যে, আল্লাহর এ ব্যাপারে করার কিছু নেই এ কাজ আইনসভার। সে যাকে খুশি ফরয, ওয়াজেব অথবা হালাল নির্ধারিত করবে, এবং যাকে খুশি তাকে অপরাধ অথবা হারাম গণ্য করবে। অতঃপর এসব আইন আমাদের চরিত্র ও তামাদ্দুনের উপর যে কতোটা প্রভাব বিস্তার করেছে, তা অনুমান করতে এতোটুকুই যথেষ্ট হবে যে, এসব আইনই ব্যভিচার, জুয়া, মদ এবং অনেক অবৈধ জিনিসকে হালাল করে দিয়েছে। এসব আইনের ছত্রছায়ায় আমাদের এখানে বিভিন্ন ধরনের অশ্ল্লীল ক্রিয়া-কর্ম ও পাপাচার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আইনের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে বহু সৎগুণাবলী নির্মূল হতে থাকে, যা পতনযুগ পর্যন্ত আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে এতোটা নিস্তেজ করে ফেলেছে যে, আমাদের বড়ো বড়ো ধার্মিক ও খোদাভীরু লোক পর্যন্ত এ আইন ব্যবস্থার অধীন ওকালতি করা এবং বিচারকের পদে চাকুরী করাকে দূষণীয় মনে করেন না। বরং অবস্থা এই হয়েছে যে, যারা এ সব আইনের মুকাবিলায় হুকুম-শাসন একমাত্র আল্লাহর এ মূলনীতি পুনর্জীবিত করতে চাইলো, তাদেরকে ‘খারেজী’ নামে অভিহিত করা হলো।

চরিত্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রভাব

শাসকগণ তাদের চারিত্রিক দোষত্রুটি এবং সামাজিক রীতি-পদ্ধতি আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়। এভাবে চাপিয়ে দেয় যে, চরিত্র ও সামাজিকতার ক্ষেত্রে তাদের সমমনা যারা ছিলো, তারাই তাদের নৈকট্য লাভের ও সম্মান-শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে পড়লো। এটাই তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, আর্থিক সাচ্ছল্য এবং বৈষয়িক উন্নতির নিশ্চয়তা দান করলো। এজন্যে ক্রমশ আমাদের উচ্চশ্রেণী এবং তারপর মধ্যবিত্ত শ্রেণী শাসকদের রঙে নিজেদেরকে রঞ্জিত করতে লাগলো। অবশেষে ছায়াছবি, সিনেমা, রেডিও এবং নেতৃস্থানীয় লোকদের জীবন্ত দৃষ্টান্ত মারাত্মক ব্যাধির আকারে জনগণের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে থাকলো। এরই পরিণামে এক শতাব্দীর মধ্যেই আমাদের এতোখানি অধঃপতন হলো যে, এখন সহশিক্ষার প্রচলন মেনে নেয়া হচ্ছে, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়েরা নাচ, গান ও মদ্যপানে লিপ্ত হচ্ছে, চিত্র-তারকা ও অভিনেত্রী সেজে এমন নির্লজ্জতা প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা আমাদের দেশের বারাঙ্গনারা করতেও লজ্জা পেতো। হাজার হাজার লোকের সমাবেশে নিজেদের ভগ্নি ও মেয়েদের প্যারেড করতে দেখে তাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। সে অবস্থা বেশি দূরে নয়, যখন আমাদের মধ্য থেকে পাশ্চাত্যবাসীদের মতো এ প্রশ্ন উত্থাপিত হবে যে, কুমারী মাতা এবং অবৈধ সন্তানে দোষটা কোথায়? সমাজে কেন তাদেরকে বিবাহিতা মাতার এবং বৈধ সন্তানের মর্যাদা দেয়া যাবে না? পাশ্চাত্যবাসীও একদিনে অধঃপতনের এ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল না। যেসব পর্যায় অতিক্রম করে আমরা চলছি তারাও তাই চলছিল।

রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব

তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক মতবাদ ও প্রতিষ্ঠান আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়, যা আমাদের দ্বীন ও দুনিয়ার জন্যে অন্যান্য বিষয় থেকে কম মারাত্মক প্রমাণিত হয়নি। তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আমাদের দ্বীন সম্পর্কিত ধারণার শিকড় বিনষ্ট করে দিয়েছে। তাদের জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্র ক্রমাগত এক শতাব্দী যাবত আমাদেরকে এতোটা নিষ্পেষিত করেছে যে, শেষ পর্যন্ত আমাদের জাতির অধীনের নিয়মে লক্ষ লক্ষ জীবন কুরবানী করে এবং অগণিত নারীর সম্ভ্রম-সতীত্ব বিসর্জন দিয়ে তাদের স্বৈরশাসনের যাঁতাকল থেকে জাতির শুধু অর্ধাংশকে রক্ষা করার জন্যে আমাদেরকে তৈরি হতে হয়েছে। এ সব নির্মম নির্বোধেরা এক মুহূর্তের জন্যেও একথা চিন্তা করে দেখেনি যে, ভারতের মুসলমান, হিন্দু, শিখ ও অছ্যুৎ মিলে নতুন রাজনৈতিক অর্থে কি করে এক জাতি হতে পারে। যার মধ্যে গণতন্ত্রের এ মূলনীতি কার্যকর হতে পারে যে, জাতির সংখ্যাগুরু আইন প্রণেতাও শাসক হবে এবং সংখ্যালঘু জনমত গঠন করে সংখ্যাগুরু হবার চেষ্টা করবে। তারা কখনো একথা বুঝবার চেষ্টা করেনি যে, এখানকার সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু প্রকৃতপক্ষে জাতীয় সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু, নিছক রাজনৈতিক নয়। তাদের উপর পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব অর্পিত হলো। কিন্তু তারা একথা উপলব্ধি করার জন্যে এক মুহূর্তও ব্যয় করেনি যে এ সব বিভিন্ন জাতির সমষ্টিকে এক জাতি মনে করে এখানে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র কায়েমের অর্থ এ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না যে, তাদের মধ্যে একটি বিপুল সংখ্যাগুরু জাতি অন্যান্য জাতির ধর্ম, সভ্যতা ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য বলপূর্বক নির্মূল করে দেবে। তারা চোখ বন্ধ করে তাদের নিজস্ব মূলনীতি, মতবাদ ও বাস্তব কর্ম-পদ্ধতি একটি সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশে চাপিয়ে দিতে থাকে। ভারতের প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জ যুগ যুগ ধরে মজলুমের খুন এবং লোমহর্ষক সংঘাত-সংঘর্ষের জন্যে বিলাপ করে করে একথাই বলছিল যে, এ একেবারে একটি ভ্রান্ত ব্যবস্থা, যা এখানকার অধিবাসীদের মেজাজ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর প্রতি কোনো কর্ণপাত কেউ করেনি। একই প্রাচীরের দু’পাশের প্রতিবেশী একে অপরের রক্ত-পিপাসু হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তাদের পলিসি পুনর্বিবেচনা করার প্রয়োজনবোধ করেনি। অবশেষে অবস্থা যখন এই দাঁড়ালো যে, দেশ বিভক্তি ব্যতীত অন্য কোনো উপায় নেই, তখন তারা এমন পদ্ধতিতে বিভক্ত করে বিদায় গ্রহণ করলো, যার ফলে খুনের দরিয়া এবং মৃত লাশের পাহাড় ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্তের রূপ ধারণ করলো। এ বিভাগের অতীতের বিবাদ-বিসম্বাদের মীমাংসা হওয়ার পরিবর্তে নতুন নতুন বিবাদের ভিত্তি রচিত হলো। জানি না, এসব বিবাদ কতোকাল এ উপমহাদেশের লোকদেরকে পারস্পরিক শত্রুতা ও সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত রাখবে।

অবশ্যি আমি স্বীকার করি যে, এ বহিরাগত শাসকগণ কিছু ভালো কাজও করেছেন। তাদের বদৌলতে এখানে যে বৈষয়িক উন্নতি সাধিত হয়েছে, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের কল্যাণকর দিকগুলো থেকে আমরা যে উপকৃত হয়েছি, তার গুরুত্ব আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু তাদের শাসন-কর্তৃত্বের দরুন আমাদের যে অগণিত নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বৈষয়িক ক্ষতি হয়েছে, তার সাথে ওসব কল্যাণের কোনো তুলনা হয় কি?

আমাদের প্রতিক্রিয়া

এখন আমাদের পর্যালোচনা করে দেখতে হবে এ বিজয়ী সভ্যতার আগ্রাসনে আমাদের মধ্যে কি কি আকারে প্রতিক্রিয়া হয় এবং আজ তার কি ভালো ও মন্দ প্রতিক্রিয়া আমাদের জাতীয় জীবনে দেখতে পাই। সামগ্রিকভাবে আমাদের এখানে এ সভ্যতার মুকাবিলায় দু’টি বিপরীত-মুখী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, যার গভীর প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রথমে আমি এ দুটোর পৃথক পৃথক পর্যালোচনা পেশ করবো এবং পরিণাম ফলও সামনে রাখবো।

অপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া (passive reaction)

আমাদের মধ্যে এক শ্রেণীর প্রতিক্রিয়া এই ছিলো যে, এ শক্তিশালী ও উন্নত জাতি যেহেতু আমাদের শাসক হয়ে পড়েছে, সে জন্যে তাদের সকল প্রভাব গ্রহণ করা উচিত। তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে জ্ঞান লাভ করা, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করা এবং তাদের আইন-কানুন মেনে নেয়া উচিত। তাদের উপস্থাপিত সমাজ ব্যবস্থার রঙে নিজেদের রঞ্জিত করা এবং তারা যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করছে, তাও মেনে নেয়া উচিত।

এ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে প্রথম থেকেই ভীতি ও পরাজয়ের মনোভাব বিদ্যমান ছিলো। এর মূলে এ ধারণাই ছিলো যে, পরাজিত ও শাসনাধীন হওয়ার পর প্রতিরোধ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। তা করলে ক্ষতিরই সম্মুখীন হতে হবে। অতএব, এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই যে, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে জীবন-জীবিকা ও উন্নতির যে সব সুযোগ এসেছে, তা গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু এ যুক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের মধ্যে যারা এ পথে চলা শুরু করলো, তাদের প্রথম বংশধরদের মধ্যে সে সব ক্ষতি ও অকল্যাণ সুস্পষ্ট হতে থাকলো, যা একটি বিপরীতমুখী সভ্যতার মুকাবিলায় নতি স্বীকারের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে কোনো জাতির হয়ে থাকে। অতঃপর পরবর্তী বংশধর পূর্ববর্তী বংশধর থেকে অধিকতর ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকলো। অতঃপর মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক ব্যতীত সমগ্র মধ্যবিত্ত শ্রেণী এ সংক্রামক ব্যাধির শিকার হয়ে পড়লো এবং বড়দের অনুকরণে জনসাধারণের মধ্যে এ বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়লো।

ধর্ম সম্পর্কে পাশ্চাত্যবাসীদের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো আমাদের নব্য শিক্ষিত শ্রেণীর অধিকাংশই তা হুবহু গ্রহণ করলো। তারা একথা পর্যন্ত অনুভব করলো না যে, পাশ্চাত্যবাসী ধর্মের জ্ঞান ইসলাম থেকে গ্রহণ করেনি, করেছিল খৃস্টবাদ ও গির্জার কর্তৃপক্ষদের প্রতিবাদে ধর্ম ও তৎসংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে যে চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের নব্য শিক্ষিত দল তাই গ্রহণ করলো। তারা মনে করছিল ইসলাম ও তার প্রতিটি বস্তু সন্দেহ-সংশয়ের যোগ্য। তার জন্যে দলীল-প্রশানেরও প্রয়োজন আছে। কিন্তু পাশ্চাত্যের কোনো দার্শনিক, বিজ্ঞানী অথবা দক্ষ সমাজ বিজ্ঞানী শিক্ষার নামে যা কিছু পেশ করেছেন তার জন্যে যুক্তি-প্রমাণের কোনো প্রয়োজন নেই। তারা পাশ্চাত্যের এ ধারণা বিনা দ্বিধায় মেনে নেয় যে, ধর্ম একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং সামষ্টিক সামাজিক জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ধারণা তাদের মনে এমনভাবে বদ্ধমূল হয়েছে যে, আজ তারা না বুঝেই বহুল প্রচলিত “ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান” কথাটি বার বার আওড়ায়, তারাও সর্বদা তাদের কর্মপদ্ধতির দ্বারা এ কথা প্রমাণ করে যে, ইসলাম শুধু একটি ব্যক্তিগত ধর্ম- সমাজ জীবন সম্পর্কে তার কাছে পথ নির্দেশনা গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। বলতে গেলে তাদের অনেকের জন্যে ইসলাম একটি ‘ব্যক্তিগত ধর্মও’ আর থাকেনি। কারণ ইসলামের শুধু স্বীকৃতি এবং খাৎনা ও বিয়ে-শাদীতে ইসলামের অনুসরণ ছাড়া তাদের ব্যক্তি-জীবনে ইসলামের কোনো নৈতিক অথবা বাস্তব ক্রিয়াকলাপের কোনো চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় না। তাদের মধ্যে আবার যাদের ধর্মের প্রতি কিছু অনুরাগ রয়ে গিয়েছিল অথবা পরে সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের অনেকেই এ পন্থা অবলম্বন করলো যে, পাশ্চাত্য এবং তার দর্শন, মতবাদ ও কর্মনীতিকে সত্যের মানদণ্ড মেনে নিয়ে ইসলাম, তার আকীদাহ-বিশ্বাস, তার জীবন-ব্যবস্থা এবং ইতিহাসকে তারা মেরামত করা শুরু করলো। সেই সাথে এ চেষ্টাও করতে থাকলো যাতে করে ইসলামের প্রতিটি জিনিসকে ঐ মানদণ্ডেই ঢেলে সাজানো যায়। যা ঢেলে সাজানো যাবে না তাকে ইসলামের রেকর্ড থেকে মুছে ফেলতে হবে। আর তাও করতে না পারলে দুনিয়ার কাছে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে হবে।

তাদের বিপুল সংখ্যক লোক পাশ্চাত্যের জীবন-দর্শন এবং তার সভ্যতার দার্শনিক বুনিয়াদকে হুবহু গ্রহণ করেছে, তার কোনো সমালোচনা-পর্যালোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি। যে শিক্ষা তাদেরকে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসা ও কলেজগুলোতে দেয়া হয়েছিল, এ ছিলো তারই অনিবার্য পরিণাম ফল। ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন এবং অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞান তারা যে পদ্ধতিতে শিক্ষালাভ করেছিল, তার থেকে সেই মানসিকতাই তৈরি হতে পারতো, যা ছিলো তাদের পশ্চিমা শিক্ষকদের। দুনিয়া ও তার জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিকোণ তাই হওয়া সম্ভব ছিলো, যা ছিলো পাশ্চাত্যবাসীদের। আল্লাহ ও আখেরাতকে অবশ্যি অতি অল্প লোকই অস্বীকার করেছে। কিন্তু এ শিক্ষার দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার পর তাদের মধ্যে এমন কতোজন আছে, যারা বস্তুবাদী মানসিকতা এবং আখেরাতের চিন্তাবিবর্জিত জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতবাদ পোষণ করে না? কতোজন এমন আছে, যারা অদৃশ্য ও অনুভূত সত্যকে সত্য বলে মনে করে? যাদের দৃষ্টিতে বৈষয়িক মূল্যবোধ থেকে উন্নততর আধ্যাত্মিক মূল্যবোধেরও কি কোনো মর্যাদা আছে? যারা দুনিয়াটাকে ব্যক্তি-স্বার্থের একটা নির্মম সংঘাত সংঘর্ষের ক্ষেত্র মনে করে না?

নৈতিকতার ব্যাপারে এ অপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ার পরিণাম অধিকতর খারাপ হলো। আমাদের পতন যুগে আমাদের চরিত্রের শিকড় তো পূর্ব থেকেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল।

আমাদের আমীর-ওমরা ও ধনবান শ্রেণী পূর্ব থেকেই আরামপ্রিয় ছিলো। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রথম থেকেই ভাড়াটিয়া সৈন্য বা ভাড়া করা টাট্টুর কাজ করে আসছিল। আমাদের মধ্যে কোনো স্থায়ী এবং ঐকান্তিক বিশ্বস্ততা আগেও ছিলো না। অতঃপর তার সাথে পাশ্চাত্যের নৈতিক দর্শন যোগ হওয়ার পর এখানে সেই ধরনের চরিত্রই তৈরি হতে থাকলো, যার মধ্যে পাশ্চাত্য চরিত্রের সকল দোষ-ত্রুটির সমাবেশ ঘটলো এবং তার অধিকাংশ উজ্জ্বল দিকগুলোর অভাব রয়ে গেলো। উপযোগবাদ, ভোগবাদ এবং নীতিহীনতায় আমাদের এখানকার পাশ্চাত্যমনাদের চরিত্র পাশ্চাত্যের চরিত্রের সমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কিন্তু তাদের জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আছে, যার জন্যে কঠোর পরিশ্রম ও জীবন উৎসর্গ করা হয়ে থাকে এখানে জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে জানা নেই। ওখানে এমন বিশ্বস্ততা আছে, যার মধ্যে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা আছে। যা বেচাকেনা করা যায় না। এখানে সব কিছুই বিক্রয়মান। এখানে প্রত্যেক জিনিসের বিনিময় অর্থ ও ব্যক্তি-স্বার্থের দ্বারা হতে পারে। ওখানে শুধু ভিন্ন জাতির মুকাবিলায় কিছু নীতিবিগর্হিত কার্যকলাপ নির্দিষ্ট আছে, যা আপন জাতির জন্যে করাটা চরম অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু এখানে মিথ্যা, প্রতারণা, ওয়াদা ভঙ্গ, স্বার্থপরতা, ষড়যন্ত্র, প্রলোভন ও ভীতি প্রদর্শন প্রভৃতির হাতিয়ার আপন লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে কোনো দোষ নেই। ইংল্যান্ড অথবা আমেরিকায় কেউ এ ধরনের আচরণ করলে তার বেঁচে থাকাই মুশকিল হবে। এখানে বিরাট বিরাট দল এসব চরিত্রসহ আত্মপ্রকাশ করে এবং প্রসার লাভ করে। যারা এসব কাজে দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে নেতৃত্ব দানের ব্যাপারে তাদেরকেই উপযুক্ত মনে করা হয়।

সমাজ, অর্থনীতি ও আইন সম্পর্কে পাশ্চাত্য শাসনের যে প্রভাবের বর্ণনা আমি আপনাদের সামনে একটু আগে পেশ করলাম, তার সবই যারা মেনে নিয়েছে এবং জাতির মধ্যে তার প্রচার-প্রসার যারা করছে, তারা ঐসব লোকই যারা এ অপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ার কর্মপন্থা অবলম্বন করেছে। তথাপি তার মধ্যে কোনো কিছুই এতোটা বিস্ময়কর নয়, যতোটা বিস্ময়কর ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া। এ দলের সবচেয়ে বড়ো গর্ব ছিলো তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পর্কে। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা সবচেয়ে বেশি অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের উপর ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বুনিয়াদ স্থাপন করা হয়েছে এবং যার উপর ঊনবিংশ শতাব্দির শেষার্ধ থেকে যে ব্যবস্থার ক্রমাগত ক্রমবিকাশ ঘটেছিল, তা যদি হিন্দুগণ গ্রহণ করে থাকে, তাহলে সেটা এক স্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ তার প্রতিটি অংশ তাদের জন্যে কল্যাণকর। কিন্তু মুসলমানদের জন্যে তার প্রতিটি অংশ ছিলো মারাত্মক। অতএব, এ রাজনৈতিক ব্যবস্থার বুনিয়াদী মূলনীতি তাদের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ না করাটা এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, তাদের নব্য শিক্ষিত লোক রাজনীতি যতোই পড়ে থাকুক না কেন, তা মোটেই বুঝতে পারেনি। তারা পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বারা এতোটা ভীত-বিহ্বল যে, যা কিছুই সেখান থেকে আসতো, তাকে তারা আসমানী ওহী মনে করে মেনে নিতো এবং কোনো বিষয়কে সমালোচনার কষ্টি পাথরে যাচাই করে দেখারই সাহস তাদের ছিলো না। এ পরাজিত মানসিকতার সাথে তারা রাজনীতির পাঠ অধ্যয়ন করে। তার ফল এই হয় যে, তারা সকল দৃষ্টিভঙ্গি চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে থাকে। তাদের এতোটুকু বুদ্ধিও ছিলো না যে, সে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। আর এতোটা সাহসও তাদের ছিলো না যে, বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে ঐসব বুনিয়াদ চ্যালেঞ্জ করে প্রভুদেরকে এ কথা বলতো যে, এ মূলনীতি এ দেশে চলতে পারে না। তারা তো যুদ্ধে ঐ দিনই অর্ধেক পরাজয় বরণ করে, যে দিন তারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের ঐসব মূলনীতিকে সত্য বলে মেনে নেয়। তারপর না রাজনৈতিক ক্রমধারায় জাতি এবং দেশবাসীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রতিরোধকল্পে তাদের পলিসি কোনো কাজে লাগলো, আর না এ পলিসি তাদের সফলকাম হলো যে, এ পরিপূর্ণ ভ্রান্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মুসলমানগণ এমন রক্ষা কবজ লাভ করবে, যার মারাত্মক পরিণাম ফল থেকে তাদেরকে বাঁচানো যাবে। অবশেষে যখন এ রাজনৈতিক ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়ে পূর্ণত্ব লাভ করলো, তখন আমাদের অগত্যা রাজি হতে হলো যে, আমাদের মধ্যে অর্ধেক কবরস্থ হবো এবং অর্ধেক বেঁচে যাবো। এর পরেও আমাদের রাজনৈতিক নেতাগণ এখনো এ কথা বুঝতে পারেননি যে, যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলো, তার বুনিয়াদগুলোতে কি সব ত্রুটি রয়েছে। অথচ আজো তাঁরা ঐ ব্যবস্থাকে ঐসব বুনিয়াদসহ অবিকল ঠিক রেখেছেন এবং তার পরিবর্তনের কোনো অনুভূতিই তাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। এখন একজন বির্বোধ ছাড়া কি এ কথা বিশ্বাস করতে পারে যে, রাজনীতির অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সৃষ্টি করেছে। এতে সন্দেহ নেই যে, এ নিশ্চেষ্ট প্রতিক্রিয়ার মধ্যে শুধু অকল্যাণই ছিলো না, এর মধ্যে কল্যাণের দিকও ছিলো। এতে আমাদের অতীত জড়তা ভেঙে গেছে। আধুনিক যুগের উন্নতি-অগ্রগতির সাথে আমরা পরিচিত হয়েছি। আমাদের দৃষ্টিকোণে প্রশস্ততা সৃষ্টি হয়েছে। শুধুমাত্র অমুসলিমদের আধুনিক শিক্ষা লাভ করে এবং সরকারের আইন-শৃঙ্খলায় প্রবেশ করে যে বিরাট ক্ষতি হতো তাঁর থেকে আমরা বেঁচে গেছি। আমাদের অনেকেরই সরকারের বিভিন্ন বিভাগের অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধার কোনটিই আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেই সাথে এটাও বাস্তব ঘটনা যে, এর দ্বারা আমাদের দ্বীন সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন হয়েছে, নৈতিকতার ধারণারও পরিবর্তন হয়েছে। জীবন দর্শন বদলে গেছে। আমাদের মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটেছে। আমাদের ব্যক্তি-চরিত্র এবং সামগ্রিক সভ্যতার বুনিয়াদ দুর্বল হয়েছে। আমরা পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ থেকে বেরিয়ে অপরের পথভ্রষ্ট ও চরিত্রহীন অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছি, যারা আমাদের দীনের দিক দিয়েও ধ্বংস করেছে এবং পার্থিব দিক দিয়েও ধ্বংস করেছে।

নিষ্ক্রিয় প্রতিক্রিয়া

আমাদের মধ্যে একটি দ্বিতীয় দলের প্রতিক্রিয়া ছিলো এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম দল আগত প্ল্লাবনে প্রবাহিত হয়ে গেলো এবং দ্বিতীয় দল তার সামনে নিষ্ত্র্নিয় পাথরের মতো বসে রইলো। এ দলটি চেষ্টা করলো যে, শিক্ষা, ধর্ম, নৈতিকতা, সামাজিকতা এবং ঐতিহ্যের যে সমগ্র উত্তরাধিকার অষ্টাদশ শতাব্দীর লোক ছেড়ে গিয়েছিল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর লোক তা লাভ করেছিল, তার সঠিক ও ভ্রান্ত অংশগুলোসহ তাকে হুবহু অক্ষুণ্ন রাখতে হবে এবং বিজয়ী সভ্যতার কোনো প্রভাবই গ্রহণ করা হবে না। তা উপলব্ধি করার জন্যে সময় নষ্টও করা যাবে না। পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে প্রথম সংঘাতের মুহূর্তে এ দলের লোক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের যে আচরণ অবলম্বন করেছিল, আজ পর্যন্ত তার কোনরূপ পরিবর্তন ও পুনঃপরীক্ষা ব্যতিরেকেই তার উপর অটল আছে। তারা এক মুহূর্তের জন্যেও গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেনি যে, পূর্ববর্তীদের উত্তরাধিকার পর্যালোচনা করে দেখা যাক যে, তার কতোটুকু পরিবর্তন করা যায়। তারা এ বিষয়েও চিন্তাভাবনা করে দেখেনি যে, আগত সভ্যতা যা কিছু এনেছে তার কোন্‌টা গ্রহণযোগ্য এবং কোন্‌টা পরিত্যাজ্য। তারা একথা বুঝবারও ন্যায়সঙ্গত চেষ্টা করেনি যে, আমাদের চিন্তা ও কাজের মধ্যে এমন কি ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিলো, যা আমাদের পরাজয়ের কারণ হয় এবং হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আগত একটি জাতির নিকটে জ্ঞান ও কর্মের কোন্‌ শক্তি রয়েছে, যা তাদের বিজয় সূচিত করে? এসব বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়ার পরিবর্তে তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পূর্বাবস্থা বহাল রাখার জন্যে এবং আজ পর্যন্ত তাদের সে চেষ্টাই চলছে। তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্য তালিকা তাই রয়েছে, যা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ছিলো। তাদের কার্যকলাপ, সমস্যাদি, চিন্তার ধরন, কর্মপদ্ধতি এবং তাদের পরিবেশের বৈশিষ্ট্য আগে যা ছিলো, তাই আছে। তার মধ্যে যা কিছু ভালো ছিলো, তা যেমন সংরক্ষিত আছে, তার মন্দগুলোও সেভাবে সংরক্ষিত আছে।

আমি অবশ্যি এ কথা স্বীকার করি যে, এ দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়ায় কল্যাণেরও একটা মূল্যবান দিক ছিলো ও আছে। তা যতোটা শ্রদ্ধার যোগ্য, তার জন্যে ততোটুকু শ্রদ্ধা আমার অন্তরে আছে। আমাদের এখানে কুরআন, হাদিস ও ফেকাহর যতোটুকু ইলম অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তা তারই বদৌলতে। আমাদের বুযুর্গ মনীষীগণ দ্বীন ও আখলাকের যে উত্তরাধিকার ছেড়ে গেছেন, সৌভাগ্যের বিষয় যে কিছু লোক তা অক্ষুণ্ন রেখেছেন এবং ভবিষ্যত বংশধরদের জন্যে তা স্থানান্তরিত করেছেন। আমাদের সভ্যতার যেসব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিলো, কেউ যে তা সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন এবং বিরুদ্ধ পরিবেশে অল্প-বিস্তর তা যে অক্ষুণ্ন রেখেছেন এ এক মুল্যবান খেদমত বটে।

আমি এ কথাও স্বীকার করি যে, যাঁরা এ প্রতিক্রিয়ার সূচনা করেন তাঁরা অপারগ ছিলেন, যে সময়ে বিরোধী সভ্যতার প্ল্লাবন হঠাৎ এসে পড়ে, তখন সম্ভবত তাদের এ ছাড়া আর করার কিছু ছিলো না যে, গৃহের যতোটুকু সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব, তা রক্ষা করা যাক। এ ব্যাপারে তাদের অপারগতা প্রথম প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকারী দলের অপরাগতা থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা প্রথম দলের প্রাথমিক নেতাদেরকেও এ অনুমতি দেই যে, বহিরাগত শাসন কর্তৃত্বের প্ল্লাবনের প্রথম আগ্রাসনে স্বজাতিকে পরিপূর্ণ ধ্বংস থেকে এবং নিম্নশ্রেণীর জাতিতে পরিণত করা থেকে রক্ষা করার পন্থা তারা অবলম্বন করবেন। কারণ এ ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা তারা করতে পারতেন না। এ ধরনের অনুমতি লাভের যোগ্য দ্বিতীয় দলও। তারা সংঘর্ষের সূচনায় আপন ধর্ম এবং সভ্যতার শেষ সম্বলটুকু বিনষ্ট হওয়া থেকে বাঁচার চিন্তা করেন। কিন্তু প্রকৃতির আইনে ওজর-আপত্তি ও অনুমতিতে কোনো লাভ হয় না। এতে যদি ক্ষতির কোনো উপকরণ থাকে, তা হলে ক্ষতি অবশ্যই হবে। আর বাস্তবে যে ক্ষতি হয়েছে, তাকে ক্ষতি বলে স্বীকার করতে হবে।

এর প্রথম ক্ষতি এই যে, পূর্ববর্তী অবস্থার সংরক্ষণের প্রচেষ্টা দ্বীন ও তৎসংশ্ল্লিষ্ট মর্যাদাসম্পন্ন বিষয়গুলোর সাথে সাথে ঐসব দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতিরও সংরক্ষণ করে, যা আমাদের পতন যুগের ধর্মীয়-ধারণা বিশ্বাসে ও ধর্মীয় দলগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। এ ভেজাল উত্তরাধিকার অবিকল আমাদের অংশে এসেছে। এখন এ একটি সঠিক ইসলামী বিপ্লবের পথে ঠিক তেমনি প্রতিবন্ধক হয়ে পড়েছে, যেমন আমাদের পাশ্চাত্য শ্রেণীর মানসিকতা প্রতিবন্ধক হয়ে পড়ছে।

এর দ্বিতীয় ক্ষতি এই যে, আমাদের দ্বীন, আখলাক এবং সভ্যতার প্রকৃত ভাবধারার সংরক্ষণ যেমন হওয়া উচিত ছিলো, এর দ্বারা তা হতে পারেনি। বরং দিন দিন তার অবনতি ঘটেছে। এ কথা ঠিক যে, প্ল্লাবনের মুকাবিলা প্ল্লাবনই করতে পারে, প্রস্তর খণ্ড করতে পারে না। এখানে এমন কোনো শক্তি ছিলো না, যা পাশ্চাত্য সভ্যতার প্ল্লাবনের মুকাবিলায় ইসলামী সভ্যতার কোনো প্ল্লাবন আনতে পারতো, এখানে ‘পুরাতনের সংরক্ষণই’ যথেষ্ট মনে করা হয়েছে, এই ‘পুরানের’ মধ্যে সংরক্ষণযোগ্য জিনিসের সাথে এমন বহু জিনিস শামিল করা হয়েছে, যা না বেঁচে থাকার কোনো শক্তি রাখতো আর না এমন ছিলো, যার সংরক্ষণ করা যায়। এগুলোকে শামিল করে এ আশাও করা যেতো না যে, একটি বিরোধী সভ্যতার মুকাবিলায় তার দ্বারা ইসলামের কোনো মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকবে। এটাই হলো কারণ, যার জন্যে আমরা যখন বিগত ষাট-সত্তর সালের ইতিহাসের উপর দৃষ্টিপাত করি তখন আমরা দেখি এ সময়ের মধ্যে ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতার অগ্রগতি হয়নি বরং অধোগতি হয়েছে। প্রতি বছর, প্রতি মাস ও প্রতি দিন তা দলিত ও সংকুচিত হতে থাকে। অপরদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রসার লাভ করতে থাকে। প্রতিটি দিনের আগমন এভাবে হতো যে, পাশ্চাত্যের মানসিক বিকৃতি, নৈতিক আবর্জনা এবং প্রকাশ্য ধর্মদ্রোহিতা আমাদের জীবনের কিছুটা অতিরিক্ত অঞ্চল অধিকার করে ফেলেছে এবং আমাদের দ্বীন, আখলাক ও সভ্যতা কিছু অতিরিক্ত অঞ্চল হারিয়ে ফেলেছে। প্রাচীন পদ্ধতির সংরক্ষকগণ এক মুহূর্তের জন্যেও এ গতি রোধ করতে পারেননি।

তৃতীয় ক্ষতিটা এই হয়েছিল যে, আমাদের ধর্মীয় দলটি ইসলামী ও অনৈসলামী প্রাচীনত্বের যে যৌগিক পদার্থ সংরক্ষণ করছিল, তাতে চিন্তা ও কাজ উভয় দিক দিয়ে আমাদের বিত্তশালী ও চিন্তাশীল শ্রেণীর মধ্যে সামান্য আকর্ষণই রয়ে গিয়েছিল। বরং আকর্ষণ দিন দিন কমেই যাচ্ছিলো। একদিকে বিরোধী সভ্যতা মন-মস্তিষ্ক বশীভূতকারী, মন জয়কারী এবং চোখ ঝলসানো সাজ-সরঞ্জাম ও উপকরণসহ অগ্রসর হচ্ছিলো, অপরদিকে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে এমন সব আলোচ্য বিষয়, সমস্যা কায়কারবার ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়াদির অবতারণা করা হচ্ছিলো, যা মন-মস্তিষ্ককে নিশ্চিন্ত করতে পারতো না। মনে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারতো না এবং চোখেও ভালো লাগতো না। ফলে যারা বৈষয়িক উপায়-উপাদান ও মানসিক যোগ্যতার অধিকারী ছিলো, তারা দীনের প্রতি তাদের শেষ আকর্ষণটুকুও হারিয়ে ফেলছিল এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলো। অতঃপর ধর্মীয় উত্তরাধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব ক্রমশ এমন সব শ্রেণীর জন্যে নির্দিষ্ট হয়ে রইলো, যারা বৈষয়িক, মানসিক ও সামাজিক দিক দিয়ে নিকৃষ্টতর ছিলো। এর ক্ষতি শুধু এতোটুকুই হলো না যে, ধার্মিকতার ফ্রন্ট (অগ্রভাগ) ক্রমশ দুর্বল এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার ফ্রন্ট ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। বরং এর চেয়ে অধিকতর ক্ষতি এই হয়েছিল যে, জ্ঞান, বিবেক, ভাষা ও চরিত্র সব দিক দিয়েই ইসলামের প্রতিনিধিত্বের মান নিম্নগামী হতে থাকে। অবশেষে দ্বীনদারী রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এ পলিসি অবলম্বন করার ফলে সবচেয়ে বড়ো যে ক্ষতি হয়েছিল তা এই যে, দ্বীনদার লোক মুসলমানদের নেতৃত্ব থেকে বেদখল হয়ে পড়েন এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতি সকল ব্যাপারে মুসলমানদের নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব ঐসব লোকের উপর এসে যায়, যারা না দ্বীন সম্পর্কে কোনো জ্ঞান রাখতেন আর না দীনের আলোকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন অনুভব করতেন। তারা সকল শিক্ষা পাশ্চাত্য ধরনেরই লাভ করেন। পাশ্চাত্যের রঙেই রঞ্জিত। পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ ও মূলনীতির ভিত্তিতে তাদের চরিত্র তৈরি হয়। তারা পাশ্চাত্যের আইন কলেজ থেকে শরীয়ত শিক্ষালাভ করেন এবং তার উপরেই আইন ব্যবসা করেন। রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ ও চক্রান্ত প্রভৃতির নীতি-কৌশল তারা পাশ্চাত্য প্রভুদের থেকে শিক্ষালাভ করেন। গোমরাহীর এ উৎস থেকে তারা যে পথ-নির্দেশনা লাভ করেন, তাই অনুসরণ করে চলেন এবং গোটা জাতিকে পরিচালিত করেন। জাতিও পূর্ণ আস্থাসহ তাদের পেছনে চলে। দ্বীনদার শ্রেণীর করার কিছু থাকলে ব্যস্‌ চুপচাপ শিক্ষা-দীক্ষা দান, যিকির, তাসবীহ্‌ প্রভৃতিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। অথবা জাতীয় নেতৃত্বে যারাই সমাসীন হন, তাদের জন্যে দোয়াকারীর ভূমিকা পালন করতে থাকেন। আর রাজনীতির ক্ষেত্রে এসে থাকলে কোনো নেতার পেছনে প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন তল্পিবাহক হিসাবে চলেন। কংগ্রেস অথবা মুসলিম লীগে যতোই যোগদান করেন অনুসারী হিসাবেই যোগদান করেন। কোনো পলিসি নির্ধারণে তাদের কোনো হাত ছিলো না। বিরাট গোমরাহীও তারা রুখতে পারেননি, না তার বিরুদ্ধে টু শব্দ করতে পেরেছেন। তাদের কাজ এ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না যে, দ্বীনবিমুখ অথবা দ্বীনবিরোধী নেতা যে পলিসি নির্ধারণ করতেন, তার প্রতি তারা বরকত দান করতেন এবং মুসলমানদেরকে আশ্বাস দিয়ে বলতেন যে এটাইতো কুরআন-হাদিসে লেখা আছে। অন্ততপক্ষে দীনের দিক দিয়ে কোনো আশঙ্কার কারণ নেই। এ রোগ বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ধর্মনিরপেক্ষতা পর্যন্ত আমাদের অনেক ধর্মপ্রাণ বুযুর্গের বরকত লাভ করে। এসব প্রভাবহীন লোকের দ্বীনি অনুভূতি এতো তীব্র যে, দাড়ি দীর্ঘতায় একটু খাটো হলে সকল দ্বীনদারী একবারে নস্যাৎ হয়ে যায় এবং কুরআন-হাদিস থেকে প্রমাণিত নয় ফেকাহর এমন কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ে কেউ মতভেদ করলে তাকে দ্বীন ভঙ্গকারী বলে অভিহিত করা হয়। কিন্তু গোটা জাতি যাদেরকে জিন্দাবাদ ধ্বনি দেয় অথবা যারা একবার রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্টিত হন, তারা সকল প্রকার কাজের রুখসত বা সুযোগ-সুবিধার অধিকার হয়ে যান তাদের হাতে দীনের প্রাসাদ ভেঙে পড়ার উপক্রমই হোক না কেন, তাতে কোনো ক্ষতি নেই।

আমরা কি চাই

আমাদের অতীত ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার এ হলো বিস্তারিত পর্যালোচনা। এ পর্যালোচনা কাউকে ভৎসনা করার জন্যে করা হয়নি, বরং এ জন্যে করা হয়েছে যাতে করে আপনারা বর্তমান পরিস্থিতি ও তার ঐতিহাসিক কারণগুলো চিহ্নিত করতে পারেন এবং এ অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের সংস্কারের জন্যে আল্লাহর উপর ভরসা করে যে কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করেছি তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন। কারণ এ কর্মসূচি আমরা গ্রহণ করেছি ইসলামী রেনেসাঁর পতাকাবাহী হিসাবে।

আমার এসব কথায় আপনারা জানতে পেরেছেন যে, অনিষ্ট-অনাচারের পরিধি কত প্রশস্ত এবং তা আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি বিভাগে বিস্তার লাভ করে আছে। আমার এ বক্তৃতায় আপনারা এটাও জানতে পেরেছেন যে, যেসব অনাচার এখন দেখা যাচ্ছে, তার প্রতিটি কি কি কারণে বিকাশ লাভ করে ক্রমশ এ অবস্থায় পৌঁছেছে এবং তার শিকড় আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও রাজনীতির কতো গভীরে প্রোথিত রয়েছে এবং বিভিন্ন বিভাগের এ সব অনাচার কিভাবে একটি অপরটির সহায়ক হয়েছে। এর পরে আংশিক কোনো সংস্কারের কাজ যে ফলপ্রসূ হবে না, আমি মনে করি না যে, কোনো দূরদর্শী ব্যক্তি এ কথা বুঝতে কোনো ইতস্তত করবেন। আপনারা দ্বীনি মাদ্রাসা খুলে কালেমা ও নামাযের তাবলীগ করে, অনাচার-পাপাচারের বিরুদ্ধে ওয়ায-নসীহত করে অথবা পথভ্রষ্ট দলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বড়জোর যা করতে পারেন, তা এতোটুকু যে, দ্বীন যে গতিতে অধঃপতনের দিকে ছুটছে, সে গতিতে কিছুটা শিথিল করে দিতে পারেন এবং দ্বীনি জীবনের শ্বাস গ্রহণে কিছু অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু এসব পন্থা অবলম্বনে আপনারা আশা করতে পারেন না যে, আল্লাহর কালেমা বুলন্দ হয়ে যাবে এবং তার মুকাবিলায় জাহেলিয়াতের কালেমা দমিত হয়ে থাকবে। কারণ এ যাবত যে সব উপায়-উপকরণ আল্লাহর কালেমাকে দমিত এবং জাহেলিয়াতের কালেমা সমুন্নত করে আসছে, তা যথাযথ বিদ্যমান আছে। এভাবে যদি আপনারা চান যে, বর্তমান ব্যবস্থা তো ঐসব বুনিয়াদের উপরই কায়েম থাক, কিন্তু নৈতিকতা, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, আইন-শৃংখলা অথবা রাজনীতির বর্তমান অনাচারগুলোর মধ্যে কোনটার সংস্কার হয়ে থাক, তাহলে এটাও কোনো ক্রমে সম্ভব হবে না। কারণ এর প্রতিটি বর্তমান জীবন ব্যবস্থার বুনিয়াদী অনাচার কর্তৃক সৃষ্ট ও লালিত-পালিত এবং প্রতিটি অনাচার অন্যটির সহায়তা লাভ করে। এমন অবস্থায় একটি সার্বিক অনাচার নির্মূল করার জন্যে একটি সার্বিক কর্মসূচি অপরিহার্য যা মূল থেকে শুরু করে শাখা-প্রশাখা পর্যন্ত পরিপূর্ণ ভারসাম্যসহ সংস্কারের কাজ অব্যাহত রাখবে।

সে কর্মসূচি কি হবে? আমাদের নিকটেই বা তা কি? এর উপরেই আমি কিছু আলোচনা করতে চাই। এ আলোচনার পূর্বে একটি প্রশ্নের জবাব প্রয়োজন। প্রশ্ন এই যে, আপনারা চান কী? সঠিকভাবে বলতে গেলে আপনাদের মধ্যে কে কী চান?

একাগ্রতার প্রয়োজন

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমরা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যে, ক্রমাগত অভিজ্ঞতায় একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের এ যৌগিক পদার্থ, যা এখন পর্যন্ত আমাদের জীবন ব্যবস্থা হয়ে রয়েছে বেশি দিন চলতে পারে না। যদি চলতে থাকে, তাহলে দুনিয়াতেও তা পরিপূর্ণ ধ্বংসের কারণ এবং আখেরাতেও। এ কারণে আমরা এ অবস্থায় রয়েছি।

“ঈমান বুঝে রুকে হ্যায় তো খেঁচে হ্যায় মুঝে কুফর”। অর্থাৎ ঈমান আমাকে বাধা দিচ্ছে তো কুফর আমাকে টানছে।

না আমরা আমেরিকা, রাশিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো একাগ্রচিত্তে দুনিয়া বানাতে পারি, কারণ যে ঈমান ও ইসলামের সাথে আমাদের সম্পর্ক, তা এ পথে গড্ডলিকা প্রবাহে চলতে দেয় না, আর না আমরা সত্যিকার মুসলমান জাতির মতো নিজেদের আখেরাত বানাতে পারি, কারণ জাহেলিয়াত আমাদেরকে এ কাজ করতে দেয় না যার অগণিত ফেৎনা আমরা আমাদের মধ্যে পোষণ করে রেখেছি। এ দু’মনা হওয়ার কারণে কোনটাই আমরা যথাযথ করতে পারছি না। না দুনিয়া-পরস্তির কাজ আর না খোদাপরস্তির কাজ। এ কারণে আমাদের প্রতিটি কাজ পার্থিব হোক অথবা পারলৌকিক হোক, দু’বিপরীতমুখী চিন্তা ও প্রবণতার রণক্ষেত্র হয়ে থাকে। তার প্রত্যেকটি অপরটির প্রতিরোধ করে এবং কোনো চিন্তা ও প্রবণতার দাবি পূরণ হয় না। এ অবস্থার শীঘ্রই অবসান হওয়া দরকার। আমরা যদি আমাদের নিজেদেরই দুশমন না হয়ে থাকি, তাহলে আমাদেরকে একাগ্রচিত্ত হতে হবে।

এ একাগ্রতা দুটো পন্থাই সম্ভব। এখন আমাদের কে কোনটা পছন্দ করেন, তাই দেখতে হবে। একটি পন্থা এই যে, আমাদের পূর্ববর্তী শাসকগণ এবং তাদের বিজয়ী সভ্যতা যে পথে এ দেশকে এনে ফেলেছিল, তাই অবলম্বন করতে হবে এবং তারপর আল্লাহ, আখেরাত, দ্বীন, দ্বীনি তাহযীব ও নৈতিকতা পরিহার করে এক একটি খাঁটি জড়বাদী সভ্যতার উন্নতি সাধন করতে হবে যাতে করে এ দেশটিও একটি দ্বিতীয় রাশিয়া অথবা আমেরিকা হতে পারে। এ পথ ভ্রান্ত, সত্যের পরিপন্থী এবং ধ্বংসাত্মক এবং আমি বলব যে, পাকিস্তানে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ জন্যে যে, এখানকার মনস্তত্ত্ব ও ঐতিহ্যে ইসলামের জন্যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা এতো গভীরে প্রোথিত যে, তার উৎপাটন করা মানুষের সাধ্যের অতীত। তথাপি যারা এ পথে চলতে চায়, তারা আমার এ ভাষণের দ্বিতীয় পুরুষ নয়। তাদের সামনে আমরা আমাদের কর্মসূচি নয়, সংগ্রামের চরমপত্রই (ultimatum) পেশ করতে চাই।

একাগ্রতার দ্বিতীয় পথ এই যে, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সেই পথ বেছে নেবো, যা কুরআন ও নবীর সুন্নত আমাদেরকে দেখিয়েছে। এটাই আমরা চাই এবং আমরা মনে করি দেশের লোকসংখ্যা হাজারের মধ্যে ৯৯৯ জন তাই চায়। আল্লাহ ও রসূলকে যারা মানে এবং মুতৃøর পরবর্তী জীবনের প্রতি যারা বিশ্বাস রাখে, তাদের প্রত্যেকের এটাই চাওয়া উচিত। কিন্তু যাঁরাই এ পথ পছন্দ করেন, তাঁদের ভালো করে উপলব্ধি করা উচিত যে, যে অবস্থার ভেতর দিয়ে আমরা চলে আসছি এবং বর্তমানে যে অবস্থার আমরা সম্মুখীন সে অবস্থায় একমাত্র ইসলাম এবং বিশুদ্ধ ইসলামকে পাকিস্তানের জীবনদর্শন ও বিজয়ী জীবন-বিধানরূপে প্রতিষ্ঠিত করা কোনো সহজ কাজ নয়। এর জন্যে প্রয়োজন কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য ইসলাম ও জাহেলিয়াতের রক্ষণশীলতার যে ভেজাল তৈরি করে তাকে সুদৃঢ় করে রেখেছে তার বিশ্লেষণ করা এবং রক্ষণশীলতার উপাদানগুলোকে আলাদা করে বিশুদ্ধ ইসলামের সেই মূল উপাদান বা সারাংশ গ্রহণ করা, যা কুরআন ও সুন্নাহর কষ্টিপাথরে ইসলামের সারবস্তু হিসাবে প্রমাণিত হয়। এটা সুষ্পষ্ট যে, এ কাজ আমাদের ঐ শ্রেণীর কঠিন প্রতিবন্ধকতা ব্যতিরেকে হতে পারে না, যারা রক্ষণশীলতার কোনো না কোনো অংশের সাথে গভীরভাবে সংশ্ল্লিষ্ট।

এর জন্যে এটাও প্রয়োজন যে, আমরা পাশ্চাত্যের প্রকৃত সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি-অগ্রগতিকে তার জীবনদর্শন এবং চিন্তা, নৈতিকতা ও সমাজ ব্যবস্থার গোমরাহী থেকে মুক্ত করবো। প্রথমটিকে গ্রহণ করবো এবং দ্বিতীয়টিকে আমাদের চিন্তা-চেতনা থেকে একেবারে দূর করে দেবো। একথা সুস্পষ্ট যে, এটাকে সেই শ্রেণী বরদাশত করবে না, যারা বিশুদ্ধ পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে অথবা ইসলামের কোনো না কোনো পাশ্চাত্য সংস্করণকে নিজেদের দ্বীন বানিয়ে রেখেছে।

এ কাজের জন্যে এমন লোকেরও প্রয়োজন, যারা ইসলামী মন মানসিকতাসহ গঠনমূলক কাজের যোগ্যতাসম্পন্ন মজবুত স্বভাব-প্রকৃতি, নিষ্কলুষ চরিত্র, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী এবং সংগঠিত ও সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করবে। এটা ঠিক যে, এ ধরনের লোক আমাদের এখানে এমনিতেই কম। তারপর এমন দুর্দান্ত সাহসী লোক সহজে পাওয়া যায় না, যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আঘাত সহ্য করবে, ফতোয়ার গোলাবর্ষণও বরদাশত করবে এবং মিথ্যা অপবাদের চতুর্মুখী হামলারও মুকাবিলা করতে থাকবে অসীম ধৈর্য সহকারে।

এ সব শর্ত ছাড়াও প্রয়োজন এই যে, ইসলামকে একটি বিজয়ী শক্তিতে পরিণত করার আন্দোলন এক সার্বিক প্ল্লাবনের মতো চলতে থাকবে যেভাবে এ দেশে পাশ্চাত্য সভ্যতা প্ল্লাবনের আকারে এসেছিল এবং জীবনের প্রতিটি বিভাগের উপর বিস্তার লাভ করেছিল। এ সার্বিকতা এবং প্ল্লাবনের গতিধারা ব্যতীত এটা সম্ভব নয় যে, পাশ্চাত্য সভ্যতাকে তার প্রাধান্য ও কর্তৃত্ব থেকে অপসারিত করা যাবে, আর না এটা সম্ভব যে, শিক্ষা ব্যবস্থা, আইন ব্যবস্থা, অর্থ ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বিশুদ্ধ ইসলামের বুনিয়াদের উপর একটি দ্বিতীয় সংস্কৃতি গড়ে তোলা যাবে।

আমরা তো এ সবই চাই। এ উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রাচীন জাতীয় সভ্যতার পুনর্জীবন নয়, ইসলামী পুনর্জীবনই আমাদের লক্ষ্য। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তার দ্বারা যে উন্নতি-অগ্রগতি হয়েছে, আমরা তার বিরোধী নই। কিন্তু আমরা ঐ সভ্যতা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করছি, যা পাশ্চাত্য জীবন-দর্শন ও নৈতিক-দর্শন থেকে জন্মলাভ করেছে। আমরা দু’চার আনার চাঁদার সদস্য সংখ্যাবৃদ্ধি করে কোনো রাজনৈতিক খেলা খেলতে চাই না বরং জাতির মধ্য থেকে বেছে বেছে এমন সব লোককে সংগঠিত করতে চাই, যারা জরাজীর্ণ রক্ষণশীলতা ও নতুনত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত। আমরা জীবনের কোনো একটি অংশ অথবা কিছু অংশে কিছু ইসলামী রঙের প্রলেপ দেয়ার পক্ষপাতী নই। বরং আমাদের সংগ্রাম এ জন্যে যে, সমগ্র জীবনের উপর ইসলামের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক। ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্রে, পারিবারিক জীবন পদ্ধতিতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, আইন-আদালতে, রাজনীতি ও পার্লামেন্টে আইন-শৃঙ্খলা বিভাগে এবং অর্থনীতির ক্ষেত্রে উৎপাদন ও বণ্টন নীতিতে ইসলামের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক। ইসলামের এ সার্বিক শাসন-কর্তৃত্বের দ্বারাই এ সম্ভব হতে পারে যে, পাকিস্তান একাগ্রচিত্ত ও একমুখী হয়ে ঐসব আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে, যা রাব্বুল আলামীন প্রদত্ত হেদায়াতের উপর চলার অনিবার্য ও স্বাভাবিক ফলশ্রুতি। অতঃপর এর থেকেই আশা করা যায় যে, এ দেশটি সমগ্র মুসলিম দেশগুলোর জন্যে কল্যাণের দিকে আহ্বানের এবং সমগ্র দুনিয়ার জন্যে হেদায়াতের কেন্দ্র হয়ে পড়বে।

আমাদের কর্মসূচি

আমাদের এ উদ্দেশ্য উপলব্ধি করার পর আমাদের কর্মসূচি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এর চারটি বড়ো বড়ো অংশ রয়েছে, যা আমি পৃথক পৃথক আলোচনা করতে চাই।

১। এর প্রথম অংশ চিন্তার পরিশুদ্ধি ও চিন্তার গঠন। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ চিন্তার পরিশুদ্ধি ও গঠন এ উদ্দেশ্যে করতে হবে যাতে করে একদিকে জাহেলিয়াতের জরাজীর্ণ চিন্তাধারার আবর্জনা পরিষ্কার করে মূল ও প্রকৃত ইসলামের সরল সঠিক রাজপথ দৃশ্যমান করে তোলা যায় এবং অপরদিকে পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলাদি এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির সমালোচনা পর্যালোচনা করে বলে দেয়া যায় যে, এর মধ্যে কি কি ভ্রান্ত ও পরিত্যাজ্য বিষয় রয়েছে এবং কি কি গ্রহণযোগ্য। অতঃপর সুস্পষ্ট করে দেখিয়ে দিতে হবে যে, ইসলামের মূলনীতি বর্তমান যুগের সমস্যাদির সাথে সুসামঞ্জস্য করে কিভাবে একটি সত্যনিষ্ঠ সংস্কৃতি গঠন করা যায় এবং এতে জীবনের একটি বিভাগের চিত্র কি হবে। এভাবে চিন্তাধারার পরিবর্তন হবে এবং তার পরিবর্তনের ফলে জীবনের এক নতুন দিক শুরু হবে এবং পুনর্গঠনের কাজে মন চিন্তার খোরাক লাভ করবে।

২। কর্মসূচির দ্বিতীয় অংশ হলো সৎ লোকের সন্ধান, সংগঠন ও তারবিয়াত। এর জন্যে প্রয়োজন যে, জনপদগুলো থেকে ঐসব নারী-পুরুষকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে, যারা প্রাচীন ও নতুন অনাচার থেকে মুক্ত অথবা এখন মুক্ত হওয়ার জন্যে প্রস্তুত এবং যাদের মধ্যে সংশোধনের প্রেরণা বিদ্যমান। যারা সত্যকে সত্য বলে স্বীকার করে সময়, অর্থ ও শ্রম কুরবাণী করতে প্রস্তুত। তাঁরা আধুনিক অথবা প্রাচীন শিক্ষায় শিক্ষিত হোন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে হোন অথবা বিশিষ্ট শ্রেণীভুক্ত, দরিদ্র হোন, ধনী হোন অথবা মধ্যবিত্ত, তাতে কিছু যায় আসে না। এ ধরনের লোক যেখানেই পাওয়া যাবে, তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে বের করে সংগ্রাম ক্ষেত্রে আনতে হবে। এভাবে আমাদের সমাজে যে কিছু সৎলোক রয়ে গেছে কিন্তু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত থাকার কারণে অথবা আংশিক সংস্কার-সংশোধনের ইতস্তত চেষ্টা-চরিত্রের কারণে কোনো সুবিধাজনক ফল লাভ করতে পারছে না, তারা একটি কেন্দ্রে একত্র হবে এবং একটি বিজ্ঞতাপূর্ণ কর্মসূচি অনুযায়ী সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্যে চেষ্টা-চরিত্র চালাবে।

অতঃপর এ ধরনের একটি দল গঠনই যথেষ্ট হবে না। বরং সাথে সাথে তাদের মানসিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের কাজ করতে হবে যাতে করে তাদের চিন্তাধারা অধিকতর পরিশুদ্ধ হয়। তাদের চরিত্র অধিকতর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন মজবুত এবং নির্ভরযোগ্য হয়। এ সত্য আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, ইসলামী জীবন ব্যবস্থা শুধু কাগজের নক্‌শা এবং মৌখিক দাবির উপরে কায়েম করা যায় না। তার প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন নির্ভর করে এ বিষয়ের উপর যে তার পেছনে গঠনমূলক যোগ্যতা এবং সৎ ব্যক্তিচরিত্র বিদ্যমান আছে কি না। কাগজের নকশায় কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে আল্লাহর সাহায্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় তা সব সময়ই দূর করতে পারে। কিন্তু যোগ্যতা ও সততার অভাব থাকলে কোনো অট্টালিকা নির্মিতই হতে পারে না এবং নির্মিত হলেও তা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।

৩। এর তৃতীয় অংশ হচ্ছে সমাজ সংস্কার। সমাজের সকল শ্রেণীর তাদের অবস্থার দিক দিয়ে সংস্কার এ অংশের অন্তর্ভুক্ত। এ কাজ যারা করবে, তাদের উপায়-উপকরণ যতো বেশি হবে এ কাজের পরিধি ততো বিস্তৃত হবে। এ উদ্দেশ্যে কর্মীবৃন্দকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বণ্টন করে দেয়া উচিত। তাদের মধ্যে কেউ শহরবাসীর মধ্যে কাজ করবে, কেউ গ্রামবাসীর মধ্যে। কারো কাজ হবে কৃষকদের মধ্যে, কারো শ্রমিকদের মধ্যে। কেউ দাওয়াতী কাজ করবে উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে, কেউ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে। কেউ চাকুরিজীবীদের সংস্কারের জন্যে কাজ করবে, কেউ ব্যবসায়ী ও শিল্পকারখানায় কর্মচারীদের সংস্কারের চেষ্টা করবে। কেউ মনোযোগ দেবে প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে এবং কেউ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। কেউ স্থবিরতার দুর্গ ধ্বংস করার কাজে লেগে যাবে। কেউ নাস্তিকতার প্ল্লাবন প্রতিরোধ করার কাজে। কেউ কাজ করবে কবিতা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে, কেউ গবেষণার ক্ষেত্রে। যদিও এ সবের কর্মক্ষেত্র পৃথক পৃথক, কিন্তু তাদের সকলের সামনে একই উদ্দেশ্য ও স্কীম থাকবে, যার দিকে জাতির সকল শ্রেণীকে পরিবেষ্টন করে আনার চেষ্টা করবে। তাদের লক্ষ্য হবে মানসিক, নৈতিক ও বাস্তব নৈরাজ্য নির্মূল করা, যা প্রাচীন রক্ষণশীল ও নতুন সক্রিয় প্রবণতার কারণে সমগ্র জাতির মধ্যে প্রসার লাভ করেছে। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সঠিক ইসলামী চিন্তাধারা ইসলামী আচার-আচরণ এবং সত্যিকার মুসলমানের মতো বাস্তব জীবন গঠন করাও তাদের লক্ষ্য হবে। এসব কাজ শুধু ওয়ায-নসীহত, প্রচার- প্রোপাগান্ডা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আলাপ-আলোচনার দ্বারাই হওয়া উচিত নয়। বরং বিভিন্ন দিকে রীতিমতো গঠনমূলক কর্মসূচি তৈরি করে সামনে অগ্রসর হতে হবে। যেমন ধরুন, এ কাজের কর্মীগণ যেখানেই কিছু লোককে দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে সমমনা বানাতে সক্ষম হবে, সেখানে তারা সকলকে মিলিয়ে একটা স্থায়ী সংগঠন কায়েম করবে। অতঃপর তাদের সাহায্যে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। সে কর্মসূচির মধ্যে থাকবেঃ

বস্তির মসজিদের সংস্কার, সাধারণ লোকদেরকে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দান করা, বয়স্কদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। অন্তত একটি পাঠাগার কায়েম করা, জুলুম-নিপীড়ন থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টা, বাসিন্দাদের সাহায্য-সহযোগিতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষার কাজ করা। বস্তির এতিম, বিধবা, অকর্মণ্য ও দরিদ্র ছাত্রদের তালিকা তৈরি করা এবং যেভাবে সম্ভব তাদের সাহায্য করা, সম্ভব হলে কোনো প্রাইমারী স্কুল, হাইস্কুল অথবা দ্বীনি ইলম শিক্ষাদানের জন্যে এমন মাদ্রাসা কায়েম করা, যেখানে শিক্ষার সাথে চরিত্র গঠনেরও ব্যবস্থা থাকবে।

ঠিক এমনিভাবে যারা শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করবে, তারা তাদেরকে সমাজতন্ত্রের হলাহল থেকে রক্ষা করার জন্যে শুধু প্রচার-প্রচারণাতেই সন্তুষ্ট থাকবে না। বরং কার্যত তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করবে। তাদের এমন শ্রমিক সংগঠন কায়েম করাও উচিত, যাদের উদ্দেশ্য হবে সুবিচার কায়েম করা, উৎপাদনের উপায়-উপকরণ জাতীয় মালিকানাভুক্ত করা নয়। শ্রেণী সংগ্রামের পরিবর্তে তাদের কাজ হবে বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করা। ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপের পরিবর্তে তাদের কর্মপন্থা হবে নৈতিকতার ভিত্তিতে এবং আইনসম্মত। তাদের লক্ষ্য শুধু আপন অধিকার আদায় নয়, দায়িত্ব পালনও। যে সব শ্রমিক অথবা কর্মী তাদের মধ্যে সামিল হবে, তাদের উপর এ শর্ত আরোপিত হওয়া উচিত যে, তারা ঈমানদারী সহকারে নিজের অংশের করণীয় কাজ অবশ্যই করবে। তারপর তাদের কর্মের পরিধি শুধু আপন শ্রেণীর স্বার্থেই সীমিত থাকা উচিত হবে না, বরং যে শ্রেণীর সাথেই এ সংগঠন সংশ্ল্লিষ্ট থাকবে তার নৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্যেও চেষ্টা করতে হবে। এ সাধারণ সংস্কার-সংশোধনের কর্মসূচির মূলনীতি এই যে, যে ব্যক্তি যে মহলে ও শ্রেণীর মধ্যে কাজ করবে সেখানে ক্রমাগত এবং সংগঠিত উপায়ে করবে এবং আপন চেষ্টা-চরিত্র ফলবতী না হওয়া পর্যন্ত কাজ ছেড়ে দেবে না। আমাদের কর্মপন্থা এ হওয়া উচিত নয় যে, আকাশের পাখি এবং ঝড়-তুফানের মতো বীজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যেতে থাকবে। পক্ষান্তরে আমাদেরকে ঐ কৃষকের মতো কাজ করতে হবে, যে কিছু ভূমিখণ্ড নির্দিষ্ট করে নেয় তারপর জমি তৈরি করা থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত ক্রমাগত কাজের দ্বারা নিজের শ্রমকে সাফল্যমণ্ডিত করে ক্ষান্ত হয়। প্রথম পন্থা অবলম্বন করলে জমিতে জঙ্গল ও আগাছা জন্মায় এবং দ্বিতীয় পন্থায় রীতিমত ফসল তৈরি হয়।

৪। এ কর্মসূচির চতুর্থ অংশ শাসন ব্যবস্থার সংস্কার। আমরা মনে করি জীবনের বর্তমান অধঃপতন দূর করার কোনো চেষ্টা-তদবীরই সফল হতে পারে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত সংস্কারের অন্যান্য চেষ্টার সাথে শাসন ব্যবস্থা সংস্কারের চেষ্টা করা না হয়েছে। এ জন্যে যে শিক্ষা, আইন-আদালত, আইন-শৃঙ্খলা এবং জীবিকা বণ্টন প্রভৃতি শক্তির মাধ্যমে যে অনাচার-নৈরাজ্য জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তার মুকাবিলায় শুধু ওয়াজ-নসীহত ও তাবলীগের মাধ্যমে কোনো গঠনমূলক কাজ সম্ভব নয়। অতএব, প্রকৃতপক্ষেই যদি আমরা আমাদের দেশের জীবন ব্যবস্থাকে পাপাচার ও পথ-ভ্রষ্টতার পথ থেকে সরিয়ে দীনে হকের, সিরাতুল মুস্তাকীমের উপর চালাতে চাই, তাহলে ক্ষমতার মসনদকে পাপাচারমুক্ত করে তথায় সততা, গঠনমূলক উপাদান ও ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা আমাদের জন্যে অপরিহার্য হবে। এ কথা ঠিক যে, কল্যাণকামী ও সংস্কারধর্মী লোক ক্ষমতা লাভ করলে, শিক্ষা, আইন-কানুন এবং আইন-শৃঙ্খলার পলিসির আমূল পরিবর্তন করে মাত্র কয়েক বছরেই তারা এমন কিছু করে ফেলতে পারবেন, যা অরাজনৈতিক চেষ্টা-তদবীরে এক শতাব্দীতে করাও সম্ভব হবে না।

এ পরিবর্তন কিভাবে হতে পারে? একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার একটি মাত্র পথ রয়েছে এবং তা নির্বাচনের পথ। জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করতে হবে, জনগণের নির্বাচনের মান বদলাতে হবে, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। অতঃপর এমন সব সৎ লোককে ক্ষমতায় বসাতে হবে, যারা দেশকে খাঁটি ইসলামী বুনিয়াদের উপর দেশের শাসন ব্যবস্থা গঠনের ইচ্ছা ও যোগ্যতা রাখে।

আমাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অনিষ্টের মূল কারণ হলো নির্বাচন পদ্ধতির দোষত্রুটি। নির্বাচনের মওসুম যখন আসে, পদমর্যাদার অভিলাষী লোক তখন নির্বাচনের জন্যে উঠে পড়ে লেগে যায়। কোনো দলের মনোনয়ন লাভ করে অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাজ করা শুরু করে। এ কাজে তারা না কোনো নৈতিক চরিত্রের আর না কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে। মিথ্যা, প্রতারণা, চক্রান্ত, বলপ্রয়োগ এবং অতি জঘণ্য ও অবৈধ কাজ করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। প্রলোভনের মাধ্যমে কারো ভোট পাওয়া সম্ভব হলে তারা ভোটারকে প্রলুদ্ধ করে এবং ভয় প্রদর্শন ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করেও ভোট সংগ্রহ করা হয়। ধোঁকা-প্রবঞ্চনার মাধ্যমে ভোট সংগ্রহ করা গেলে সে পন্থাই অবলম্বন করা হয়। কাউকে কোনো কুসংস্কার অথবা গোঁড়ামির ভিত্তিতে আকৃষ্ট করা সম্ভব হলে সেভাবেই তার ভোট প্রার্থনা করা হয়। এ নোংরা খেলার ময়দানে সমাজের কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি প্রথমে তো নামতেই চান না। আর কখনো ভুল করে অথবা অজ্ঞতাবশত যদি নেমেও পড়েন, তবে প্রথম পদক্ষেপের পরই ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যান। তারপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু তাদের মধ্যেই হয় যাদের না আল্লাহর ভয় আছে, না কোনো লজ্জা-শরম, আর না কোনো নিকৃষ্ট ধরনের খেলা খেলতে কোনো ভয়। অতঃপর তাদের মধ্যে বিজয়ী সে ব্যক্তিই হয়, যে সব মিথ্যাকে মিথ্যার দ্বারা এবং সকল জালিয়াতিকে জালিয়াতির দ্বারা পরাজিত করে। যাদের ভোটে এ সব লোক জয়ী হয়, তারা না কোনো নীতি-নৈতিকতা, আর না কোনো কর্মসূচি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। তারা স্বভাব-চরিত্র এবং যোগ্যতাও দেখে না। তাদের থেকে জালিয়াতি করে যে যতো ভোট নিতে পারবে, সেই বাজিমাত করবে। এখন তো প্রকৃত ভোটের সংখ্যাধিক্যেরও কোনো মূল্য নেই। ভাড়াটিয়া জাল ভোটার এবং অসৎ ও অসাধু পোলিং অফিসার আপন হাতের কৃতিত্বে ঐসব লোককে হারিয়ে দেয়, যাদের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রকৃত ভোটারদের আস্থা থাকে। অনেক সময় নির্বাচনের কোনো সুযোগই আসে না। কখনো একজন বিবেকহীন ম্যাজিস্ট্রেট ব্যক্তিগত স্বার্থে অথবা কারো ইঙ্গিতে একজন ব্যতীত সকল নির্বাচনপ্রার্থীকে এক কলমের খোঁচায় নির্বাচনের ময়দান থেকে সরিয়ে রাখে অর্থাৎ তাদের নমিনেশন পেপার নাকচ করে দেয়। ফলে আনুকূল্যপ্রাপ্ত প্রিয় ব্যক্তিটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গোটা নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধি হয়ে যায় সে প্রকৃত প্রতিনিধি হোক বা না হোক। যে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি এ অবস্থা থেকে অনুমান করতে পারেন যে, যতোদিন এ নির্বাচন পদ্ধতি প্রচলিত আছে, ততোদিন জাতির কোনো সম্ভ্রান্ত, সৎ ও ঈমানদার ব্যক্তির জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ নির্বাচন পদ্ধতির স্বভাব-প্রকৃতিই এই যে, জাতির নিকৃষ্টতম ব্যক্তিই নির্বাচিত হতে এবং যে ধরনের চরিত্রহীনতার মাধ্যমে সে নির্বাচনে জয়লাভ করে, তার ভিত্তিতেই সে দেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করবে।

এ নির্বাচন পদ্ধতি একেবারে পরিবর্তন করতে হবে। তার স্থলে কি পদ্ধতি হতে পারে যার মাধ্যমে উৎকৃষ্ট মানের লোক নির্বাচিত হতে পারে? তার এক সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা আমি আপনাদের সামনে পেশ করছি। তারপর আপনারা বিবেচনা করে দেখুন যে, এ পদ্ধতিতে শাসন ব্যবস্থার সংস্কার-সংশোধন আশা করা যায় কিনা।

প্রথম কথা, এই নির্বাচন হবে নীতিভিত্তিক ব্যক্তি, অঞ্চল অথবা গোত্রীয় স্বার্থে হবে না।

দ্বিতীয়ত, মানুষকে এ তারবিয়ত দিতে হবে যাতে করে তারা একথা বুঝার যোগ্য হয় যে, একটি সংস্কারমূলক কর্মসূচি কার্যকর করতে হলে কোন্‌ ধরনের লোক উপযোগী হতে পারে এবং তাদের মধ্যে কি কি নৈতিক গুণাবলী ও মানসিক যোগ্যতা থাকা উচিত।

তৃতীয়ত, স্বয়ং প্রার্থী হওয়া এবং অর্থ ব্যয় করে ভোট সংগ্রহ করার পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে। কারণ এভাবে শুধু স্বার্থপর ব্যক্তিই নির্বাচিত হয়ে আসবে। তার পরিবর্তে এমন কোনো পদ্ধতি হওয়া উচিত, যার দ্বারা প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় সম্ভ্রান্ত ও বিবেকসম্পন্ন লোক একত্রে সমবেত হয়ে কোনো উপযুক্ত লোকের সন্ধান করবে। অতঃপর তাকে তাদের প্রতিনিধি হওয়ার জন্যে আবেদন জানানো হবে। তারপর নিজেরা চেষ্টা-চরিত্র করে, অর্থ ব্যয় করে তাকে বিজয়ী করার চেষ্টা করবে। এভাবে যারা নির্বাচিত হবে, তারাই নিঃস্বার্থভাবে দেশের কল্যাণের জন্যে কাজ করবে।

চতুর্থত, এভাবে কোনো পঞ্চায়েত তাদের এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে যার নাম প্রস্তাব করবে, তার কাছ থেকে জনসাধারণের সামনে এ শপথ নিতে হবে যে, সে পঞ্চায়েত কর্তৃক গৃহীত ঘোষণাপত্র (মেনিফেস্টো) মেনে চলবে; সংসদে গিয়ে ঐসব লোকের সাথে মিলে-মিশে কাজ করবে, যারা ঐ মেনিফেস্টো কার্যকর করার জন্যে ঐ একই পন্থায় অন্য এলাকা থেকে বিজয়ী হয়ে সংসদে এসেছে। আর যখনই পঞ্চায়েত তার প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করবে, তখন সে সদস্য পদে ইস্তফা দান করবে।

পঞ্চমত, এবং শেষ কথা এই যে, যেসব কর্মী সে ব্যক্তিকে বিজয়ী করার জন্যে চেষ্টা করবে, তাদের কাছ থেকে এ শপথ নিতে হবে যে, তারা নৈতিকতা এবং নির্বাচন-বিধি পুরোপুরি মেনে চলবে। কোনো কুসংস্কার বা গোঁড়ামির নাম করে ভোটের জন্যে আবেদন জানাবে না। কারো জবাবে মিথ্যা, অপবাদ এবং জালিয়াতির আশ্রয় নেবে না। কারো ভোট পয়সা দিয়ে খরিদ করতে অথবা চাপ সৃষ্টি করে হাসিলের চেষ্টা করবে না। কোনো জাল ভোট রেকর্ড করাবে না, জয় হোক বা পরাজয় হোক। মোট কথা, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা নির্বাচনী যুদ্ধ সততা এবং বিশ্বস্ততার সাথে একেবারে নীতিসম্মত উপায়ে পরিচালনা করবে।

আমার ধারণা এই যে, যদি এদেশের নির্বাচনে পাঁচটি পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাহলে গণতন্ত্রকে প্রায় পরিচ্ছন্ন করা যাবে। প্রথম প্রচেষ্টায় যে এর সুফল পাওয়া যাবে, তা জরুরি নয়। তবে একবার নির্বাচন যদি এ পথে পরিচালনা করা যায়, তাহলে গণতন্ত্রের স্বভাব-প্রকৃতি একেবারে পরিবর্তন করে দেয়া যেতে পারে। হয়তো এ পদ্ধতিতে শাসন ব্যবস্থার সত্যিকার পরিবর্তন সাধনে পঁচিশ-ত্রিশ বছর লাগবে অথবা তার বেশি। কিন্তু আমি মনে করি, পরিবর্তনের এটাই সুদৃঢ়পন্থা হবে।

বন্ধুগণ! আমি আমার এ ভাষণে রোগ ও রোগের কারণ ব্যাখ্যা করে আপনাদের সামনে পেশ করছি। এর প্রতিকারও বয়ান করেছি। সেই সাথে সেই উদ্দেশ্যও পেশ করেছি, যার জন্যে আমরা প্রতিকারের এ চেষ্টা করছি। এখানে আমার মতামত কতোটা গ্রহণযোগ্য, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আপনাদের কাজ।

সমাপ্ত

সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 08 November 2009 )