প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা একান্ত কর্তব্য
লিখেছেন মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আত্‌তামীমী   
Saturday, 13 June 2009

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা

একান্ত কর্তব্য

মুল: আশ্‌শাইখ মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আত্‌তামীমী (রাহ:)

গ্রন্থনা: শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইবরাহীম আল কারআওয়ী।

ভাষান্তর : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া মজুমদার

ভূমিকা

সর্বপ্রথম আমি আল্লাহর প্রশংসা আদায় করছি, যিনি আমাকে সঠিক পথ দিয়েছেন, সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরুদ পেশ করছি, যার অনুসরনের মধ্যেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। আল্লাহ তা‘আলার খাস রহমাত যে তিনি তাঁর এ বান্দাকে দ্বীনি ইলম শিক্ষা করার তৌফিক দিয়েছেন তার জন্য বলি আলহামদুলিল্লাহ্। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের তাওফীক হওয়া যেমনি সৌভাগ্যের ব্যাপার তেমনি তা দায়িত্বও বটে। আমার জাতি যারা বাংলা ভাষাভাষি তারাই আমার গুরুত্বের বেশী হকদার। তাদের হিদায়াতের জন্য কিছু করা উচিত। পৃথিবীর এক বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এ ভাষায় কথা বলে। তাদের সংখ্যা একশত নব্বই মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। তাদের মধ্যে রয়েছে সঠিক আক্কীদা চর্চার অভাব। তাই এ বইটি তাদের সামনে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। যা আয়তনে ছোট হলেও আক্কীদার মৌলিক বিষয়সমুহে সমৃদ্ধ।

হিজরী ১৪১৪ সালেই প্রথম এর অনুবাদ করি, এবং নিজস্ব প্রচেষ্টায় আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজানের লাইব্রেরী থেকে ছাপানো এবং বিনামুল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করি।

ইতিমধ্যে এর সমস্ত কপি নিঃশেষ হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মত ছাপানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি, এবং উদ্যোগ গ্রহণ করি। পূর্বের সংস্করণের চেয়ে বর্ধিতভাবে বর্তমান সংস্করণে এর মধ্যকার আয়াত সমুহকে সুরার দিকে নির্দেশ করি, আর হাদীসসমুহকে যে সমস্ত মুল গ্রন্থ থেকে তা নেওয়া হয়েছে তার দিকে নির্দিষ্ট করি। আর কিছু বানানগত ভুল - ত্রুটি শুদ্ধ করি। আল্লাহ তা‘আলা আমার এ প্রচেষ্টা কবুল করুন, এবং হাশরের মাঠে আমার জন্য নাজাতের ওসীলা বানান। আমীন ॥

-আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

তিনটি মূলনীতি

যা জানা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর একান্ত কর্তব্য

মুলনীতিগুলো হলো :

প্রত্যেকে ১। রব বা পালন কর্তা সম্পর্কে জানা।

২। দ্বীন সম্পর্কে জানা।

৩। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানা।

রব কে জানার পদ্ধতি :

যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব বা পালনকর্তা কে?

তখন উত্তরে বলবে আমার রব হলেন আল্লাহ, যিনি আমাকে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতকে তার অনুগ্রহে লালন করছেন, তিনিই আমার একমাত্র উপাস্য,তিনি ব্যতিত আমার অপর কোন মা’বুদ বা উপাস্য নেই।

দ্বীন জানার পদ্ধতি:

যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার দ্বীন কি?

উত্তরে বল : আমার দ্বীন হলো ইসলাম, যার মানে - আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নিয়ে সম্পূর্নভাবে তাঁর কাছে আত্নসমর্পণ করা, তাঁর নির্দেশ অনুসরণের মাধ্যমে স্বীকার করা, এবং আল্লাহর ইবাদতে অন্য কিছুর অংশীদারীত্ব করা থেকে মুক্ত থাকা এবং যারা তা করে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানার পদ্ধতি:

যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয় তোমার নবী কে?

উত্তরে বল, তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম, যার পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং দাদার নাম আবদুল মোত্তালি, প্রপিতামহের নাম হাশিম। আর হাশিম কোরাইশ গোত্রের, কোরাইশগন আরব, যারা ইব্রাহীম আলাইহিস্‌ সালাম এর পুত্র ইসমাঈলের বংশধর।

দ্বীন এর বুনিয়াদ বা ভিত্তি

দ্বীন এর বুনিয়াদ বা ভিত্তি দুটি বিষয়ের উপর :

এক : আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের নির্দেশ দেয়া, এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করা, যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা, এবং যারা তা ত্যাগ করে তাদেরকে কাফির মনে করা।

দুই : আল্লাহর ইবাদাতে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা থেকে সাবধান করা, এ ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করা, এবং যারা তাঁর সাথে শির্ক করে তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা এবং যারা শির্ক করবে তাদেরকে কাফির মনে করা।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (কালেমা তাইয়্যেবা) মেনে চলার শর্তাবলী

এক : কালেমা তাইয়্যেবার অর্থ জানা।

অর্থাৎ এ কালেমার দুটো অংশ রয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে জানা।

সে দুটো অংশ হলো:

1. কোন হক্ক মা’বুদ নেই

2. আল্লাহ ছাড়া (অর্থাৎ তিনিই শুধু মা’বুদ)

দুই : কালেমা তাইয়্যেবার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।

অর্থাৎ সর্ব প্রকার সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকা ।

তিন : কালেমার উপর এমন একাগ্রতা ও নিষ্ঠা রাখা, যা সর্বপ্রকার শিরকের পরিপন্থী।

চার : কালেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা, যাতে কোন প্রকার মিথ্যা বা কপটতা না থাকে।

পাঁচ : এ কালেমার প্রতি ভালবাসা পোষণ এবং কালেমার অর্থকে মনে প্রাণে মেনে নেয়া ও তাতে খুশী হওয়া।

ছয় : এই কালেমার অর্পিত দায়িত্ব সমূহ মেনে নেয়া অর্থাৎ এই কালেমা কর্তৃক আরোপিত ওয়াজিব কাজসমূহ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই সন্তুষ্টির নিমিত্তে সমাধান করা।

সাত : মনে-প্রাণে এই কালেমাকে গ্রহণ করা যাতে কখনো বিরোধিতা করা না হয়।

কালেমা তাইয়্যেবার যে সমস্ত শর্ত বর্ণিত হলো, তার সমর্থনে কোরআন ও হাদীস থেকে দলিল প্রমাণাদি:

প্রথম শর্ত: কালেমার অর্থ জানা। এর দলিল : আল্লাহর বাণী:

﴿فَاعْلَمْ أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ﴾

‘জেনে রাখুন নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ক মা‘বুদ নেই।” [সূরা মুহাম্মাদঃ ১৯] আল্লাহ আরো বলেন:

﴿وَلا يَمْلِكُ الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ الشَّفَاعَةَ إِلَّا مَنْ شَهِدَ بِالْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ﴾

“তবে যারা হক্ক (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) এর সাক্ষ্য দিবে এমনভাবে যে, তারা তা জেনে শুনেই দিচ্ছে অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।” [সূরা আয যুখরুফ: ৮৬]

এখানে জেনে শুনে সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হলো তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে তাদের অন্তর তা সম্যকভাবে জানে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মারা যায় যে সে জানে আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই সে জান্নাতে যাবে।” [মুসলিম(১/৫৫) হাদীস নং (২৬)]

দ্বিতীয় শর্ত : কালেমার উপর বিশ্বাসী হওয়া। এর প্রমাণাদি:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “নিশ্চয়ই মুমীন ওরাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছে , অত:পর এতে কোন সন্দেহ-সংশয়ে পড়েনি এবং তাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী।” [সুরা আল হুজরাতঃ (১৫)]

এ আয়াতে আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান যথাযথভাবে হওয়ার জন্য সন্দেহ সংশয়মুক্ত হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, অর্থাৎ তারা সন্দেহ করেনি, কিন্তু যে সন্দেহ করবে সে মুনাফিক, ভন্ড (কপট বিশ্বাসী)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ বা উপাস্য নেই, আর আমি আল্লাহর রাসূল। যে বান্দা এ দুটো বিষয়ে সন্দেহ - সংশয় মুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [মুসলিম (১/৫৬), হাদীস নং (২৭০)]

আর এক বর্ণনায় এসেছে : “কোন ব্যক্তি এ দু'টো নিয়ে সন্দেহহীন অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে জান্নাতে যাওয়ার পথে তার কোন বাধা থাকবেনা।” [মুসলিম (১/৫৬), হাদীস নং (২৭০)]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে অপর এক হাদীসের বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছিলেনঃ “তুমি এ বাগানের পিছনে এমন যাকেই পাও, যে মনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস এর সাথে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ নেই তাকেই জান্নাতের শুসংবাদ প্রদান করবে।” [মুসলিম (১/৫৯)]

তৃতীয় শর্ত : এ কালেমাকে ইখলাস বা নিষ্ঠা সহকারে স্বীকার করা।

এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“তবে জেনে রাখ দ্বীন খালেছ সহকারে বা নিষ্ঠা সহকারে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই।” [সূরা আয্‌যুমারঃ ৩]

আল্লাহ আরো বলেন: “তাদেরকে এ নির্দেশই শুধূ প্রদান করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের দ্বীনকে আল্লাহর জন্যই খালেস করে সম্পূর্ণরুপে একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়ে তারই ইবাদাত করবে।” [সূরা আল বাইয়েনাহঃ ৫]

হাদীস শরীফে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তিই বেশী সৌভাগ্যবান হবে যে অন্তর থেকে একনিষ্ঠভাবে বলেছে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্যিকার উপাস্য নেই।” [বুখারী , হাদীস নং ৯৯]

অপর এক সহীহ হাদীসে সাহাবী উৎবান বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ( لا إله إلا الله) বা আল্লাহ ছাড়া হক্ক কোন মা’বুদ নেই বলেছে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।” [মুসলিম ১/৪৫৬, হাদীস নং- ২৬৩, বুখারী, হাদীস নং ৪২৫]

ইমাম নাসায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “দিন রাত্রির জিক্‌র” নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মনের নিষ্ঠা সহকারে এবং মুখে সত্য জেনে নিম্নোক্ত কলেমা সমুহ বলবে আল্লাহ সেগুলির জন্য আকাশকে বিদীর্ণ করবেন যাতে তার দ্বারা জমীনের মাঝে কে এই কালেমাগুলি বলেছে তার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আর যার দিকে আল্লাহর নজর পড়বে তার প্রার্থিত ও কাংখিত বস্তু তাকে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব। সে কালেমাগুলি হলো:

)لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير(

অর্থাৎ : “শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া হক্ক কোন মা’বুদ নেই, তার কোন শরীক বা অংশীদার নেই, তার জন্যই সমস্ত রাজত্ব বা একচ্ছত্র মালিকানা, তার জন্যই সমস্ত প্রশংসা আর তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান”। [নাসায়ী , আমালুল ইয়াওমে ওয়াল্লাইলা, হাদীস নং- ২৮]

চতুর্থ শর্ত : কলেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা। এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ “আলিফ-লাম-মীম, মানুষ কি ধারণা করেছে যে, ঈমান এনেছি বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে আর তাদের পরীক্ষা করা হবেনা? আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি যাতে আল্লাহর সাথে যারা সত্য বলেছে তাদেরকে স্পষ্ট করে দেন এবং যারা মিথ্যা বলেছে তাদেরকেও স্পষ্ট করে দেন।” [সূরা আলআনকাবুতঃ ১-৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন : “মানুষের মাঝে কেউ কেউ বলে আমরা আল্লাহ এবং পরকালের উপর ঈমান এনেছি, অথচ তারা ঈমানদার নয়, তারা (তাদের ধারণামতে) আল্লাহ ও ঈমানদারদের সাথে প্রতারণা করছে, অথচ (তারা জানেনা) তারা কেবল তাদের আত্মাকেই প্রতারিত করছে কিন্তু তারা তা বুঝতেই পারছেনা। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি, ফলে আল্লাহ সে ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর মিথ্যা বলার কারণে তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।” [সূরা আল বাকারাঃ ৮-১০]

তেমনিভাবে হাদীস শরীফে মুআ’য বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে কোন লোক মন থেকে সত্য জেনে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত হক্ক কোন মা’বুদ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।” [বুখারী , হাদীস নং- ১২৮, মুসলিমঃ ১/৬১]

পঞ্চম শর্ত : এ কালেমাকে মনে প্রাণে ভালবাসা।

এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “কোন কোন লোক আল্লাহ ছাড়া তার অনেক সমকক্ষ ও অংশীদার গ্রহণ করে তাদেরকে আল্লাহর মত ভালবাসে, আর যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে অত্যন্ত বেশী ভালবাসে” । [সূরা আল বাকারাঃ ১৬৫]

আল্লাহ আরো বলেন : “হে ঈমানদারগণ তোমাদের থেকে যদি কেহ তার দ্বীনকে পরিত্যাগ করে তবে আল্লাহ এমন এক গোষ্ঠীকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করে আনবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসেন, যারা মুমীনদের প্রতি নরম- দয়াপরবশ, কাফেরদের উপর কঠোরতা অবলম্বনকারী; তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করেনা।” [সূরা আল মায়েদাঃ ৫৪]

তেমনিভাবে হাদীস শরীফে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যার মধ্যে তিনটি বস্তুর সমাহার ঘটেছে সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে: (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত বা ভালবাসা অন্য সবকিছু থেকে বেশী হবে। (দুই) কোন লোককে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসবে। (তিন) কুফরী থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেয়ার পর সে কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করবে।” [বুখারী, হাদীস নং- ৪৩, মুসলিমঃ ১/৬৬]

ষষ্ট শর্ত: কালেমার হকসমুহ মনে প্রাণে মেনে নেয়া

এর দলীল: আল্লাহর বাণী: “আর তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে ফিরে যাও, এবং তাঁর কাছে আত্নসমর্পণ করো।” [সূরা আয্‌যুমারঃ ৫৪]

আল্লাহ আরো বলেন: “আর তারচেয়ে কার দ্বীন বেশী সুন্দর যে আল্লাহর জন্য নিজেকে সমর্পণ করেছে, এমতাবস্থায় যে, সে মুহসীন”, [সূরা আন্‌নিসাঃ ১২৫] মুহসীন অর্থ : নেককার, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত অনুযায়ী আমল করেছে।

আরও বলেন: “আর যে নিজেকে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ করে আত্নসমর্পন করেছে আর সে মুহসীন”, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত অনুযায়ী আমল করেছে “সে মজবুত রশিকে আঁকড়ে ধরেছে” [ সূরা লুকমানঃ ২২] অর্থাৎ : لا إله إلا الله বা আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ক মাবুদ নেই এ কালেমাকেই সে গ্রহণ করেছে।

আরও বলেন: “তারা যা বলছে তা নয়, তোমার প্রভূর শপথ করে বলছি, তারা কক্ষনো ঈমানদার হবেনা যতক্ষণ আপনাকে তাদের মধ্যকার ঝগড়ার নিষ্পত্তিকারক (বিচারক) হিসাবে না মানবে, অত:পর আপনার বিচার- ফয়সালা গ্রহণ করে নিতে তাদের অন্তরে কোন প্রকার অভিযোগ থাকবেনা এবং তারা তা সম্পূর্ন কায়মনোবাক্যে নির্দ্বিধায় মেনে নিবে।” [সূরা আন্‌নিসাঃ ৬৫]

অনুরুপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমাদের মাঝে কেউই ঐ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবেনা যতক্ষন তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসারী হবে।” [হাদীস খানি খতিব বাগদাদী তার তারিখে বাগদাদের ৪/৩৬৯, এবং বাগাভী তার সারহুছছুন্নার ১০৪ নং এ বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ শুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ আছে।] আর এটাই পূর্ণ আনুগত্য ও তার শেষ সীমা।

সপ্তম শর্ত: কালেমাকে গ্রহণ করা।

এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর এমনিভাবে যখনই আপনার পূর্বে আমি কোন জনপদে ভয় প্রদর্শনকারী (রাসূল বা নবী) প্রেরণ করেছি তখনি তাদের মধ্যকার আয়েসী বিত্তশালী লোকেরা বলেছে : আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে একটি ব্যবস্থায় পেয়েছি, আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবো। (ভয় প্রদর্শনকারী) বলল: আমি যদি তোমাদের কাছে বাপ-দাদাদেরকে যার উপর পেয়েছ তার থেকে অধিক সঠিক বা বেশী হেদায়েত নিয়ে এসে থাকি তারপরও? (তোমরা তোমাদের বাপ-দাদার অনুকরণ করবে?) তারা বলল: তোমরা যা নিয়ে এসেছ আমরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছি, ফলে আমি (আল্লাহ) তাদের থেকে (এ কুফরীর) প্রতিশোধ নেই, সুতরাং আপনি মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণামফল কেমন হয়েছে দেখে নিন।” [সূরা আযযুখরুফঃ ২৩-২৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “নিশ্চয়ই তারা অযথা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতো যখন তাদেরকে বলা হত যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ক মা’বুদ নেই, এবং বলতো: আমরা কি পাগল কবির কথা শুনে আমাদের উপাস্য দেবতাগুলিকে ত্যাগ করবো?” [সূরা আস্‌সাফ্‌ফাতঃ ৩৫-৩৭]

অনুরুপভাবে হাদীসে শরীফে আবু মুসা আশআ’রী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হচ্ছে এমন মুষলধারার বৃষ্টির মতো যা ভূমিতে এসে পড়েছে, ফলে এর কিছু অংশ এমন উর্বর পরিষ্কার ভূমিতে পড়েছে যে ভূমি পানি চুষে নিতে সক্ষম, ফলে তা পানি গ্রহণ করেছে, এবং তা দ্বারা ফসল ও তৃণলতার উৎপত্তি হয়েছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে গর্তওয়ালা ভূমিতে (যা পানি আটকে রাখতে সক্ষম) সুতরাং তা পানি সংরক্ষন করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে আল্লাহ এর দ্বারা মানুষের উপকার করেছেন তারা তা পান করেছে, ভূমি সিক্ত করিয়েছে এবং ফসলাদি উৎপন্ন করতে পেরেছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে এমন অনুর্বর সমতল ভূমিতে যাতে পানি আটকে থাকেনা, ফলে তাতে পানি আটকা পড়েনি, ফসলও হয়নি। ঠিক এটাই হলো ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দ্বীনকে বুঝতে পেরেছে এবং আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হতে পেরেছে, ফলে সে নিজে জেনেছে এবং অপরকে জানিয়েছে। (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীর ভূমি)। এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে এই হিদায়েত এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের দিকে মাথা উঁচু করে তাকায়নি, ফলে আল্লাহ যে হিদায়েত নিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন তা গ্রহণ করেনি। (তৃতীয় শ্রেনীর ভূমি) ।” [সহীহ বুখারী, ১/১৭৫ হাদীস নং ৭৯, সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২২৮২]

ইসলাম বিনষ্টকারী বস্তু সমুহ

ইসলামকে বিনষ্ট করে এমন বস্তু দশটি :

এক: আল্লাহর ইবাদাতে কাউকে শরীক বা অংশীদার করা। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ ইবাদাতে তার সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার মানাকে ক্ষমা করবেন না, এতদ্ব্যতীত যা কিছু আছে তা যাকে ইচ্ছা করেন ক্ষমা করবেন” । [সূরা আন্‌নিসাঃ ১১৬]

আরও বলেন : “নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে তার উপর আল্লাহ তা‘আলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, তার আবাস হবে জাহান্নামে, আর অত্যাচারী (শির্ককারী) দের কোন সাহায্যকারী নেই “। [সূরা আল মায়িদাঃ ৭২]

আর এই শির্ক হিসাবে গণ্য হবে কবর অথবা মূর্তির জন্য কোন কিছু জবেহ করা।

দুই : যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার মাঝে কোন মাধ্যম নির্ধারণ করে তাদের কাছে কিছু চাইবে ও তাদের সুপারিশ প্রার্থনা করবে এবং তাদের উপর ভরসা করবে সে ব্যক্তি উম্মতের সর্বসম্মত মতে কাফের হয়ে যাবে।

তিন : যে কেহ মুশরিকদের “যারা আল্লাহর ইবাদতে এবং তার সৃষ্টিগত সার্বভৌমত্বে অন্য কাউকে অংশীদার মনে করে তাদেরকে) কাফের বলবেনা বা তাদের কাফের হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে অথবা তাদের দ্বীনকে সঠিক মনে করবে, সে উম্মতের ঐক্যমতে কাফের বলে বিবেচিত হবে।

চার: যে ব্যক্তি মনে করবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদর্শিত পথের চেয়ে অন্য কারো প্রদর্শিত পথ বেশী পূর্নাঙ্গ, অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাসন প্রণালীর এর চেয়ে অন্য কারো শাসন প্রণালী বেশী ভাল, যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচার পদ্ধতির উপর তাগুতী শক্তির (আল্লাহদ্রোহী শক্তির) বিচার ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেয় তাহলে সে কাফেরদের মধ্যে গণ্য হবে।

পাঁচ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে আদর্শ নিয়ে এসেছেন এর সামান্য কিছুও যদি কেহ অপছন্দ করে তবে সে কাফের হয়ে যাবে, যদিও সে (অপছন্দ করার পাশাপাশি) তার উপর আমল করে থাকে। [এর প্রমাণ কোরআনের বাণীঃ “আর এটা (জাহান্নামে যাওয়া) এ জন্যই যে তারা আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা অপছন্দ করেছে , ফলে তিনি তাদের কর্মকান্ড নষ্ট করে দিয়েছেন”। [সূরা মুহাম্মাদঃ ৯]

ছয়: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বর্ণিত দ্বীনের (জীবন বিধানের) সামান্যতম কিছু নিয়ে যদি কেহ ঠাট্টা করে, বা দ্বীনের কোন পুণ্য বা শাস্তি নিয়ে ইয়ার্কি করে তবে সেও কাফের হয়ে যাবে।

তার প্রমাণ: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “বলুন: তোমরা কি আল্লাহ ও তাঁর আয়াত (শরয়ী বা প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী) এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ঠাট্টা করছ? তোমরা কোন প্রকার ওজর পেশ করোনা, কারণ তোমরা ঈমান আনার পরে কাফের হয়ে গিয়েছ” । [সূরা আত্‌-তাওবাঃ ৬৫, ৬৬]

সাত: যাদু, বান, টোনা এর দ্বারা সম্পর্ক বিচ্যুতি ঘটান বা সম্পর্ক স্থাপন করানো। যদি কেউ এ গুলি করে বা করতে রাজী হয় তবে সে কাফের হয়ে যাবে।

এর প্রমাণ কোরআনের বাণী : “তারা দু’জন (হারুত মারুত) কাউকে তা (যাদু) শিক্ষা দেওয়ার পূর্বে অবশ্যই বলে যে, আমরা তো কেবল ফিৎনা বা পরীক্ষা স্বরূপ । সুতরাং তোমরা কুফরী করো না” । [সূরা আল বাকারাঃ ১০২] আট: মুশরিকদের (যারা আল্লাহর ইবাদতে বা সার্বভৌমত্বে কাউকে অংশীদার বানায় তাদের) কে মুসলমানদের উপর সাহায্য সহযোগীতা করা।

এর দলীল আল্লাহর বাণী: “তোমাদের থেকে যারা তাদের (মুশরিকদের)কে মুরুব্বী বা বন্ধু মনে করবে তারা তাদের দলের অন্তর্ভুক্ত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা অত্যাচারী কোন জাতিকে সঠিক পথের দিশা দেন না বা অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছান না” । [সূরা আল মায়িদাঃ ৫১]

নয়: যে একথা বিশ্বাস করবে যে, যেমনিভাবে খিজির আলাইহিস্‌সালাম এর জন্য মুসা আলাইহিস্‌সালাম এর শরীয়তের বাইরে থাকা সম্ভব হয়েছিল তেমনিভাবে কারো কারো জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রবর্তিত শরীয়ত থেকে বাইরে থাকা সম্ভব, সেও কাফের বলে গন্য হবে।

দশ: আল্লাহর দ্বীন থেকে বিমুখ হওয়া, দ্বীন শিখতে বা দ্বীনের আদেশ নিষেধ অনুসারে কাজ করার ব্যাপারে গুরুত্বহীন থাকে।

এর দলীল আল্লাহর বাণী: “তার চেয়ে কে বেশী অত্যাচারী যাকে আল্লাহর আয়াত সমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর সে তা এড়িয়ে গেল, নিশ্চয়ই আমি পাপিষ্ঠদের থেকে প্রতিশোধ নেব ”। [সূরা আস্‌সাজদাহঃ ২২]

এ সমস্ত ঈমান বিনষ্টকারী বস্তু ঠাট্টা করেই বলুক আর মন থেকে বলুক অথবা ভয়ে ভীত হয়েই বলুক, যে কোন লোক এ সমস্ত কাজের কোন একটি করলে কাফের বলে বিবেচিত হবে। তবে যাকে জোর করে এ রকম কোন কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে তার হুকুম আলাদা।

এ সবগুলোই অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অত্যধিক হারে সংগঠিত হয়ে থাকে। সুতরাং মুসলিম মাত্রই এগুলো থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা ও এ গুলো থেকে বেঁচে থাকা বাঞ্ছনীয় ।

আমরা আল্লাহর কাছে তার আজাব-গজবে পড়া ও তাঁর কঠিন শাস্তিতে নিপতিত হওয়া থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।

তাওহীদ বা একত্ববাদ এর তিন অংশ

এক: তাওহীদুর রাবুবিয়্যাহ: “সৃষ্টি জগতের সৃষ্টিতে, নিয়ন্ত্রনে, লালন পালনে, রিজিক প্রদানে, জীবিত করণে, মৃত্যু প্রদানে, সার্বভৌমত্বে, আইন প্রদানে আল্লাহকেই এককভাবে মেনে নেয়া।” এ প্রকার তাওহীদ বা একত্ববাদকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সময়কার কাফেরগণ স্বীকার করে নিয়েছিল, কিন্তু শুধু এ গুলোতে ঈমান থাকার পরেও তারা ইসলামে প্রবেশ করতে পারেনি, বরং এগুলোর স্বীকৃতি থাকার পরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, এবং তাদের জানমালকে হালাল বা বৈধ করে দিয়েছিলেন। এই প্রকারের তাওহীদ বা একত্ববাদ বলতে বুঝায় আল্লাহর কার্যসমূহে আল্লাহকেই একক কার্য সম্পাদনকারী হিসাবে মেনে নেয়া। তাওহীদ এর এ অংশ মক্কার কাফিরগণও যে স্বীকার করত তার প্রমাণ কোরআনের বাণী: “বলুন: আসমান ও জমীনের কে তোমাদেরকে রিজিক বা খাদ্য যোগান দেয়? অথবা কে তোমাদের শ্রবণেন্দ্রীয় ও দৃষ্টিশক্তির সার্বভৌমত্বের অধিকারী? আর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করে? ও জীবিতকে মৃত থেকে বের করে? এবং কে কার্যাদীর সূক্ষাতিসূক্ষ নিয়ন্ত্রন করে থাকে? তারা অবশ্যই বলবে: আল্লাহ, সুতরাং বলুন: তোমরা কি তাকে ভয় পাওনা ? ” [সূরা ইউনুসঃ ৩১] কোরআনের আরও বহু আয়াতে এ কথার প্রমাণ রয়েছে।

দুই: তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ: “অর্থাৎ সর্বপ্রকার ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য সম্পাদন করা, আর ইবাদতের প্রকার সমূহের মধ্যে রয়েছে : (১) দোয়া (২) সাহায্য চাওয়া (৩) আশ্রয় চাওয়া (৪) বিপদমুক্তি প্রার্থনা করা (৫) জবেহ করা (৬) মান্নত করা (৭) আশা করা (৮) ভয় করা (১০) ভালবাসা (১১) আগ্রহ ও (১২) প্রত্যাবর্তন করা, ইত্যাদি” তাওহীদের এ অংশেই যত বিভেদ পূর্বকাল থেকে শুরু করে বর্তমানেও চলছে। এই অংশের অর্থ হলো, বান্দার ইবাদত কার্যাদিতে এককভাবে আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করা। যেমন: দোয়া মান্নত, পশু জবেহ, আশা, ভরসা, ভীতি, আকাংখা, প্রত্যাবর্তন ইত্যাদিতে তাঁকেই উদ্দেশ্য করা। আর এ সবগুলোই যে আল্লাহর ইবাদত তার দলিল পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।

তিন: তাওহীদুজ্জাত ওয়াল “আসমা” ওয়াছ “ছিফাত”: “আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস এবং তার নাম ও গুণাবলীসমূহে তাকে একক স্বত্বাধিকারী মনে করা।” আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “বলুন: তিনি আল্লাহ একক স্বত্বা, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি জন্ম দেননি, আবার তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি, আর কেহ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেনা” । [সূরা আল ইখলাস]

তিনি আরও বলেন: “আর সুন্দর যাবতীয় নামগুলো আল্লাহরই, সুতরাং তোমরা তাকে সেগুলো দ্বারা আহবান করো, আর যারা তার নামসমূহকে বিকৃত করে তোমরা তাদের ছেড়ে দাও, অচিরেই তাদেরকে তাদের কার্যাদির পরিণামফল দেয়া হবে” । [সূরা আল-আরাফঃ ১৮০]

তিনি আরও বলেন: “তাঁর মত কোন কিছু নেই, তিনি সর্ব শ্রোতা দর্শক।” [সূরা আস্‌শুওরাঃ ১১]

তাওহীদের বিপরীত হলো শির্ক

(একত্ববাদের বিপরীতে অংশীদারিত্ব)

শির্ক তিন প্রকার : ১। বড় শির্ক, ২। ছোট শির্ক, ৩। গোপন শির্ক।

১। বড় শির্ক :

যা আল্লাহ কক্ষনো ক্ষমা করবেননা। এ শির্ক এর সাথে অনুষ্ঠিত কোন সৎ কাজ আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেননা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করবেননা, তবে শির্ক ব্যতিত [শির্কের ছেয়ে নিচু পর্যায়ের] যত গুনাহ আছে তা তিনি যাকে ইচ্ছা করেন ক্ষমা করে দেবেন। আর যে আল্লাহর সাথে শির্ক করলো সে পথভ্রষ্টতায় অনেকদুর এগিয়ে গেল” (বেশী বিপথগামী হলো)। [সূরা আন্‌-নিসাঃ ১১৬]

তিনি আরও বলেন: “অথচ মসীহ [ঈসা আলাইহিস্‌সালাম] বলেছেন: হে ইস্রায়েলের বংশধরগণ! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, যিনি আমার প্রভূ, তোমাদের প্রভূ, নিশ্চয়ই যদি কেহ আল্লাহর সাথে শরীক করে পরিণামে আল্লাহ তার উপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, তার আস্তানা হবে জাহান্নাম, আর অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই” । [সূরা আল মায়িদাঃ ৭২]

তিনি আরও বলেন: “আর আমি তারা যা আমল করেছে সেগুলোর দিকে ধাবিত হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণায় রুপান্তরিত করে দিয়েছি” । [সূরা আল ফুরকানঃ ২৩]

আরও বলেন: “আপনি যদি শির্ক করেন তবে অবশ্যই আপনার আমলকে নষ্ট করে দেব এবং নিশ্চয়ই আপনি ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবেন।” [সূরা আয্‌যুমারঃ ৬৫]

আরও বলেন: “যদি তারা শির্ক করে তবে অবশ্যই তারা যা আমল করেছে তা নষ্ট হয়ে যাবে।” [সূরা আল-আনআমঃ ১৮৮]

বড় শির্ক এর প্রকারাদি

বড় শির্ক চার প্রকার :

এক: দোয়ায় শির্ক করা : এর দলীল আল্লাহর বাণী : “অত:পর যখন তারা নৌকায় চড়ে তখন দ্বীনকে নিষ্ঠা সহকারে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে তাঁকে ডাকতে থাকে কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে ডাঙ্গায় নিয়ে পরিত্রাণ দেন তখনি তারা তার সাথে শির্ক (অংশীদার) করে।” [সূরা আল আনকাবুতঃ ৬৫]

দুই: নিয়্যাত ও সংকল্পে শির্ক করা : এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “যারা পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য পেতে চায় আমি তাদেরকে তাদের কার্যাদির প্রতিফল তাতেই (পার্থিব জীবনেই) পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেব, তাদের এতে কম দেয়া হবেনা, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই থাকবেনা, তারা দুনিয়ায় যা করেছে তা নষ্ট হয়ে গেছে, আর যে সমস্ত [নেক] কার্যাদি তারা করেছে তা বাতিল হয়ে যাবে।” [সূরা হুদঃ ১৫,১৬]

তিন: আদেশ, নিষেধ প্রতিপালন বা বশ্যতায় শির্ক করা : এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী: “তারা আল্লাহ ছাড়া তাদের “আরবাব” তথা আলেম, “আহবার” তথা আবেদদের [পীর-দরবেশদের] কে তাদের জন্য হালাল হারামকারী বানিয়ে নিয়েছে এবং মরিয়ম পুত্র মসিহ্‌কেও, অথচ তাদেরকে শুধু এক মা’বুদ এর ইবাদত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তিনি ব্যতিত আর কোন হক্ক মা’বুদ নেই, তার সাথে যাদের শরীক করছে তাদের থেকে তিনি কতইনা পবিত্র।” [সূরা আত্‌তাওবাঃ ৩১]

“আরবাব” শব্দের তাফসীর বা ব্যাখ্যা হলো আলেমদেরকে পাপ কাজে অনুসরণ করা, এর অর্থ তাদেরকে ডাকা নয়; কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রখ্যাত সাহাবী আদী বিন হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রশ্নের উত্তরে এ প্রকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ তিনি যখন বললেন : আমরা তাদের ইবাদত (উপাসনা) করিনা, উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : “তাদের উপাসনা হলো পাপ কাজে তাদের আদেশ নিষেধ মান্য করা।” [তিরমিযী তার সুনানে, হাদীস নং ৩০৯৪. হাদীসটি হাসান।]

চার: ভালবাসায় শির্ক করা: এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “আর মানুষের মাঝে এমনও আছে যারা আল্লাহ ছাড়া তার অনেক সমকক্ষ (সমপর্যায়ের ভালবাসা পাওয়ার অধিকারী, ভালবাসার পাত্র) নির্ধারণ করে সেগুলোকে আল্লাহর ন্যায় ভালবাসে, অথচ যারা ঈমানদার তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে।” [সূরা আল্‌বাকারাহঃ ১৬৫]

২।

ছোট শির্ক :

আর তা’হলো (সামান্য) লোক দেখানোর নিয়তে নেক কাজ করা। এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “সুতরাং যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে সে যেন নেক কাজ করে এবং তাঁর প্রভূর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে শরীক না করে।” [সূরা আল কাহাফঃ ১১০]

৩।

গোপন (সুক্ষ্ণ) শির্ক:

এর প্রমাণ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী : “এ [মুসলিম] জাতির মধ্যে শির্ক অন্ধকার রাত্রিতে কালো পাথরের উপর কালো পিপড়ার বেয়ে উঠার মতই সূক্ষ্ম, বা গোপন।” [হাদীসটি ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। সনদটি হাসান।]

শির্ক থেকে বাঁচার দোয়া:

নিম্নের দোয়া (অর্থ বুঝে বিশ্বাস সহকারে) পাঠ করলে শির্ক গুনাহের কাফ্‌ফারা হয়ে থাকে।

اللَّهُمَّ إنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْئاً وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ مِنَ الذَّنْبِ الَّذِيْ لا أَعْلَمُ.

অর্থাৎ : “হে আল্লাহ আমি জেনে শুনে তোমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আর আমার অজ্ঞাত গুনাহরাজি থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।” [হাদীসটি ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে ১/৭৬ এ বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন।]

কুফরীর প্রকারভেদ

কুফরী দু’ প্রকার :

এক: যা করলে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়, নিম্নলিখিত পাঁচটি কারণে এ প্রকার কুফরী হয়ে থাকে:

১। মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে কুফরী : এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী: “আর তার চেয়ে কে বেশী অত্যাচারী যে আল্লাহর উপর মিথ্যার সম্বন্ধ আরোপ করেছে, অথবা তার কাছে হক্ক (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া সঠিক কোন উপাস্য নেই এ কালেমা) আসার পর তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, জাহান্নাম কি কাফেরদেরই বাসস্থান নয়?” [সূরা আল আনকাবুতঃ ৬৮]

২। সত্য জেনেও অহংকার ও অস্বীকার করার কারণে কুফরী : এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী : “আর স্মরণ করুন যখন আপনার প্রভু আদমকে সিজদা করার জন্য ফিরিস্তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন ইবলীস ব্যতিত সবাই সিজদা করেছিল, সে অস্বীকার করেছিল, এবং অহংকার বোধে গর্ব করেছিল আর কাফেরদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছিল।” [সূরা আল বাকারাঃ ৩৪]

৩। সন্দেহ করার দ্বারা কুফরী করা, আর তা হলো অসার ধারণার বশবর্তী হয়ে কুফরী করা : এর প্রমাণ কোরআনের বাণী : “আর সে তার বাগানে প্রবেশ করল এমতাবস্থায় যে সে তার আত্মার উপর অত্যাচার করছে, একথা বলে যে, আমি মনে করিনা যে , এটা (বাগান) কখনো ধ্বংশ হয়ে যাবে, এবং কোনদিন কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে বলেও মনে করিনা, আর যদি তা হয়েও যায় এবং আমাকে আমার প্রভূর কাছে ফিরে নেয়াও হয় তথাপি আমি তার কাছে ফিরে এর (বাগানের) চেয়ে আরো ভাল (বাগান) পেয়ে যাব। তার সাথী তাকে বলল: তুমি কি সেই স্বত্বার সাথে কুফরী করছ যিনি তোমাকে প্রথমে মাটি ও পরে বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং এরপর পূর্ণ মানুষরূপে তোমাকে অবয়ব দান করেছেন, কিন্তু আমি (বলছি) সেই আল্লাহই আমার রব ও পালণকর্তা, তার সাথে কাউকে শরীক করিনা।” [সূরা আল কাহফঃ ৩৫-৩৮]

৪। এড়িয়ে যাওয়ার (বিমুখ হওয়ার) কারণে কুফরী : এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “আর যারা কুফরী করেছে তারা যে সমস্ত বস্তুর ভয় তাদেরকে দেখান হয়েছে সেগুলো থেকে বিমুখ হয়েছে [এড়িয়ে গেছে] ।” [সূরা আল আহকাফঃ ৩]

৫। মুনাফেকী করার কারণে কুফরী : এর প্রমাণ আল্লাহর পবিত্র কালামে এসেছে : “এটা এ জন্য যে, তারা ঈমান এনেছে অত:পর কুফরী করেছে ফলে তাদের অন্তরের উপর সীল মেরে দেয়া হয়েছে সুতরাং তারা বুঝছেনা, বুঝবেনা।” [সূরা আল মুনাফিকুনঃ ৩]

দুই : দ্বিতীয় প্রকার কুফরী :

আর তা হলো ছোট কুফরী , যা করলে গুনাহ হলেও ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবেনা, আর তা’ হলো আল্লাহর নেয়ামত এর সাথে কুফরী করা।

এর প্রমাণ : কোরআনের বাণী : “আল্লাহ্ তাআলা উদাহরণ দিচ্ছেন কোন নিরাপদ, শান্ত স্থির জনপদের যার জীবিকা চতুর্দিক থেকে অনায়াসে আসছিল, তখন তারা আল্লাহর নেয়ামতের সাথে কুফরী করলো, ফলে আল্লাহ তা‘আলা সে জনপদকে তাদের কার্যাদির শাস্তি স্বরূপ ক্ষুধা ও ভয়ে নিপতিত রাখলো” । [সূরা আন্‌নাহ্‌লঃ ১১২]

মুনাফেকীর প্রকারভেদ

মুনাফেকী দু’প্রকার :

১। বিশ্বাসগত মুনাফেকী।

২। আমলগত (কার্যগত) মুনাফেকী।

এক : বিশ্বাসগত মোনাফেকী : এ প্রকার মুনাফেকী ছয় প্রকার, এর যে কোন একটা কারো মধ্যে পাওয়া গেলে সে জাহান্নামের সর্বশেষ স্তরে নিক্ষিপ্ত হবে।

১। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মিথ্য প্রতিপন্ন করা।

২। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তার সামান্যতম অংশকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।

৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ঘৃণা বা অপছন্দ করা।

৪। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নিয়ে এসেছেন তার সামান্যতম অংশকে ঘৃণা বা অপছন্দ করা।

৫। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দ্বীনের অবনতিতে খুশী হওয়া।

৬। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দ্বীনের জয়ে অসন্তুষ্ট হওয়া ।

দুই : কার্যগত মুনাফেকী : এ ধরণের মুনাফেকী পাঁচ ভাবে হয়ে থাকে: এর প্রমাণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বানী : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “মুনাফিকের নিদর্শন হলো তিনটি:

১। কথা বললে মিথ্যা বলা।

২। ওয়াদা করলে ভঙ্গ করা।

৩। আমানত রাখলে খিয়ানত করা। [বুখারী ১/৮৩, মুসলিম ১/৭৮, নং ৫৯]

অপর বর্ণনায় এসেছে :

৪। ঝগড়া করলে অকথ্য গালি দেয়া।

৫। চুক্তিতে উপনীত হলে তার বিপরীত কাজ করা।” [বুখারী ১/৮৪, মুসলিম ১/৭৮, নং ৫৮]

তাগূত এর অর্থ এবং এর প্রধান প্রধান অংশ

একথা জানা প্রয়োজন যে, আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির উপর সর্ব প্রথম যা ফরজ করেছেন তা হচ্ছে তাগূতের সাথে কুফরী এবং আল্লাহর উপর ঈমান।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসূল পাঠিয়েছি এ কথা বলে যে, তোমরা শুধু আল্লাহর উপাসনা কর এবং তাগূতকে পরিত্যাগ কর।” [সূরা আন্‌-নাহলঃ ৩৬]

তাগূতের সাথে কুফরীর ধরণ হলো : আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর উপাসনা (ইবাদত) বাতিল বলে বিশ্বাস করা, তা ত্যাগ করা, ঘৃণা ও অপছন্দ করা, এবং যারা তা করবে তাদের অস্বীকার করা, তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা।

আর আল্লাহর উপর ঈমানের অর্থ হলো : আল্লাহ তা‘আলাই কেবলমাত্র হক্ক উপাস্য ইলাহ, অন্য কেহ নহে, এ কথা বিশ্বাস করা, আর সবরকম ইবাদতকে নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট করা। যাতে এর কোন অংশ অন্য কোন উপাস্যের জন্য নির্দিষ্ট না হয়। আর মুখলিস বা নিষ্ঠাবানদের ভালবাসা, তাদের মাঝে আনুগত্যের সম্পর্ক স্থাপন করা, মুশরিকদের ঘৃণা ও অপছন্দ করা, তাদের শত্রুতা করা।

আর এটাই ইবরাহীম আলাইহিস্‌সালাম এর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন বা মিল্লাত, যে ব্যক্তি তার থেকে বিমুখ হবে সে নিজ আত্মাকে বোকা বানাবে, আর এটাই হলো সে আদর্শ (أسوة) বা (Model) যার কথা আল্লাহ তা‘আলা তার বাণীতে বলেছেন : “অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে ইবরাহীম ও তার সাথীদের মাঝে সুন্দর আদর্শ, যখন তারা তাদের জাতিকে বলেছিল: আমরা তোমাদের এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের অপরাপার উপাস্য দেবতাদের থেকে সম্পূর্ন সম্পর্কমুক্ত, আমরা তোমাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলাম, আর আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও ঘৃণার সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে পড়ল, যে পর্যন্ত তোমরা শুধু এক আল্লাহর উপর ঈমান স্থাপন না করছ।” [সূরা আল-মুমতাহিনাঃ ৪]

তাগূত : শব্দটি ব্যাপক, এর দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা ব্যতিত যা কিছুর ইবাদত বা উপাসনা করা হয়, এবং উপাস্য সে উপাসনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে এমন সবকিছুকে অন্তর্ভূক্ত করে, চাই কি তা দেবতা, বা নেতা, বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণের বাইরে অন্য কারো অনুসরণই হোক, ঐসবগুলোকেই তাগূত বলা হবে ।

আর এ তাগূত এর সংখ্যা অত্যধিক তবে প্রধান প্রধান তাগূত হলো পাঁচটি :

এক: শয়তান :

যে আল্লাহর ইবাদত থেকে মানুষকে অন্য কিছুর ইবাদতের দিকে আহবান করে।

এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী : “হে আদম সন্তান, আমি কি তোমাদের থেকে শয়তানের ইবাদত না করার অঙ্গিকার নেইনি? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু ।” [সূরা ইয়াসিনঃ ৬০]

দুই: আল্লাহর আইন (হুকুম) পরিবর্তনকারী অত্যাচারী শাসক : এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আপনি কি তাদের দেখেননি যারা মনে করে আপনার কাছে এবং আপনার পূর্ববর্তীদের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছে, তারা তাগূতকে বিচারক হিসাবে পেতে আকাংখা করে অথচ তাদেরকে এর (তাগূতের) সাথে কুফরীর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আর শয়তান তাদেরকে সহজ সরল পথ থেকে অনেক দুর নিয়ে যেতে চায়।” [সূরা আন্‌নিসাঃ ৬০]

তিন : আল্লাহ কতৃক অবতীর্ণ (আইনের) হুকুমের বিপরীত হুকুম প্রদানকারী : আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচার করেনা তারা কাফের।” [সূরা আল মায়িদাঃ ৪৪]

চার : আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন গায়েবের খবর রাখার দাবীদার : আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “তিনি গায়েবের জ্ঞানে জ্ঞানী সুতরাং তার অদৃশ্য জ্ঞানকে কারও জন্য প্রকাশ করেন না, তবে যে রাসূল এর ব্যাপারে তিনি সন্তুষ্ট তিনি তাকে তার সম্মুখ ও পশ্চাৎ থেকে হিফাজত করেন।” [সূরা আল-জিনঃ ২৬,২৭]

অন্য আয়াতে বলেন : আর তার কাছেই সমস্ত অদৃষ্ট বস্তুর চাবিকাঠি, এগুলো তিনি ছাড়া আর কেহ জানে না, তিনি জানেন যা ডাঙ্গায় আছে আর যা সমুদ্রে আছে। যে কোন (গাছের) পাতাই পতিত হয় তিনি তা জানেন, জমীনের অন্ধকারের কোন শষ্য বা কোন শুষ্ক বা আর্দ্র বস্তু সবই এক প্রকাশ্য গ্রন্থে সন্নিবেশিত আছে।” [সূরা আল আনয়া’মঃ ৫৯]

পাচ : আল্লাহ ছাড়া যার ইবাদত করা হয় এবং সে এই ইবাদতে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট: আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর তাদের থেকে যে বলবে : আল্লাহ ব্যতিত আমি উপাস্য, তাকে আমি জাহান্নাম দ্বারা পরিণাম ফল প্রদান করব, এভাবেই আমি অত্যাচারীদের পরিণাম ফল প্রদান করে থাকি” । [সূরা আল আম্বিয়াঃ ২৯]

মনে রাখা দরকার : কোন মানুষ তাগূতের উপর কুফরী ছাড়া ঈমানদার হতে পারেনা, আল্লাহ বলেন : “সুতরাং যে তাগূতের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনে সে এমন মজবুত রজ্জুকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে যার কোন বিভক্তি বা চিড় নেই, আর আল্লাহ সর্ব শ্রোতা ও সর্ব জ্ঞানী।” [সূরা আল বাকারাঃ ২৫৬]

এ আয়াতের পূর্বাংশে আল্লাহ বলেছেন যে, “বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন পথ, ভ্রষ্ট পথ থেকে স্পষ্ট হয়েছে” বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন পথ বলতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দ্বীনকে, আর ভ্রান্ত পথ বলতে আবু জাহলের দ্বীন, আর এর পরবর্তী আয়াতের মজবুত রশি বা রজ্জু দ্বারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (বা আল্লাহ ছাড়া হক্ক কোন উপাস্য নেই) এ সাক্ষ্য প্রদানকে বুঝিয়েছেন।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এ কলেমা কিছু জিনিসকে নিষেধ করে, এবং কিছু বস্তুকে সাব্যস্ত করে, সকল প্রকার ইবাদতকে আল্লাহর ছাড়া অন্যের জন্য হওয়া নিষেধ করে। শুধুমাত্র লা-শরীক আল্লাহর জন্য সকলপ্রকার ইবাদতকে নির্দিষ্ট করে।

“আল্লাহর জন্যই সমস্ত শোকর যার নেয়ামত ও অনুগ্রহেই যাবতীয় ভাল কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে।”

সমাপ্ত

সূচীপত্র

 ভূমিকা

 তিনটি মুলনীতি যা জানা আবশ্যক

 দ্বীনের মুল ভিত্তি দু’টি বিষয়ের উপর

 “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর শর্তাবলীর দলীল সমুহ

 ইসলাম বিনষ্টকারী বস্তু সমুহ :

 তাওহীদের অংশ সমুহ :

 শির্কের প্রকার সমুহ :

চার প্রকার বড় শির্ক :

ছোট শির্ক :

গোপন শির্ক :

 কুফরীর প্রকারভেদ :

বড় কুফরী পাঁচ প্রকার :

ছোট কুফরী :

 মুনাফেকীর প্রকার সমুহ :

বড় মুনাফেকী ছয় প্রকার :

কার্যগত মুনাফেকীর প্রকারাদি :

 তাগূত কি?

 প্রধান প্রধান তাগূত পাঁচটি :

সুচীপত্র

অনুবাদক পরিচিতি ও অন্যান্য তথ্য :

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া মজুমদার

এম এম, (ঢাকা), লিসান্স, মাষ্টার্স, পি-এইচ.ডি. (সৌদী আরব)

সহকারী অধ্যাপক, আল-ফিক্‌হ বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

বাংলাদেশ

প্রচারে

ইমাম ইবনে তাইমিয়া ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।

প্রকাশক:

Invitation to Islam

p.o.box 7325, Walthamstow E17 9tx

স্প্যামবটের হাত থেকে এই ইমেল ঠিকানা সুরক্ষিত আছে। পড়ার জন্যে জাভাস্ক্রিপ্ট অন করুন।

www.invitationtoislam.com

সর্বশেষ আপডেট ( Tuesday, 10 November 2009 )