মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ সা.
লিখেছেন নঈম সিদ্দিকী   
Wednesday, 04 December 2013
১. পূর্ব কথা

'মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্' সা. গ্রন্থখানা মুলত এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদ নঈম সিদ্দীকির উর্দু ভাষায় রচিত 'মুহসিনে ইনসানিয়াত' এর বাংলা অনুবাদ। গ্রন্থখানা Human Benefactor শিরোনামে ইংরেজী ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে।

এ গ্রন্থখানা চিরায়ত পন্থায় রচিত রসূলুল্লাহ্ সা. - এর কোন জীবনী গ্রন্থ নয়। এ গ্রন্থে মুলত রসূলে পাক সা. যে অনুপম সমাজ বিপ্লব সংঘঠিত করেছিলেন এবং সুনিপন কারিগরের মতো যে অনন্য সাধারন মানব দল ও মানব সমাজ নির্মাণ করেছিলেন, সেই নির্মাণ কাজেরই এক অপূর্ব বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষনীয় চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাই এটি একাধারে রসূলে পাকের সীরাত এবং ইসলামী সমাজ বিপ্লব সংঘটনের প্রতিবেদন। ইসলামী সমাজ গড়ার সাধ যারা পোষোণ করেন, এটি তাদের জন্যে খুবই উপকারী গ্রন্থ।

 

আগমনের উদ্দেশ্য আহ্বান এবং ঐতিহাসিক অবস্থান

মহানবী সা.- এর জীবন চরিত অধ্যনের আগে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। যে মহান কাজটি সুসম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে বিশ্ব মানবতার এই মহোপকারী বন্ধু পৃথিবিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যভেদী সংগ্রামের সফল সমাপ্তি সাধনের জন্যে গোটা জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই কাজটি কী ছিল, তা আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আসলে রসূলের সা. জীবনেতিহাস একটি আন্ত মানবীয় কর্মসূচী বাস্তবায়নের অক্লান্ত সংগ্রামের ইতিহাস। রসূলের জীবন কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শের বাস্তব ও কর্মময় বিশ্লেষণ। রসূলের জীবন হজরত আদম আ. ইব্রাহিম আ. মুসা আ. ঈসা আ. ও অন্যান্য নবীগণ নিজ নিজ যুগে যে পবিত্র বাণীর মশাল জ্বালিয়েছিলেন সেই বাণীরই পরিপূরক। মহানবীর কাজের ধরন ও প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও তার পরিমণ্ডলের বিশালতাকে দৃষ্টিপথে না রেখে আমরা নবী জীবনকে সুসংবদ্ধ করতে পারিনা, নবী জীবনে সংঘটিত ঘটনাবলীর মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করতে পারিনা, তাঁর জীবন চরিত অধ্যয়নের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে পারিনা এবং তাঁর জীবন চরিত থেকে যা কিছু অর্জন করা দরকার তা অর্জন করতেও পারিনা।

 

মানব জাতির ত্রাণকর্তা

সমগ্র মানব জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা সেখানে নানা রকমের সংস্কারকের সাক্ষাত পাই। দেখতে পাই অনেক মিষ্টভাষী অথবা অনলবর্ষী বক্তা, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ, বিশাল সাম্রাজ্যের স্থপতি, রাজা মহারাজা ও সম্রাট, বিগ্বিজয়ী বীর, বড় বড় দল ও সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, মানব সভ্যতার আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহানায়ক, সমাজ কাঠামোতে বারবার তোলপাড় সৃষ্টিকারী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বিপ্লবী, সভ্যতার রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত নিত্য নতুন ধর্মমতের প্রবর্তক এবং নৈতিক সংস্কারক ও আইন প্রণেতা। কিন্তু যখন তাঁদের শিক্ষা, তাঁদের রেখে যাওয়া কীর্তি ও অবদান এবং তাঁদের চেষ্টা সাধনা ও তৎপরতার সার্বিক ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দেই, তখন কোথাও কোন পূর্ণাংগ কল্যাণ ও সুফল দেখতে পাইনা। যেটুকু কল্যাণ ও সুফল চোখে পড়ে তা নিতান্তই আংশিক একপেশে ও ক্ষণস্থায়ী। সেই সুফলগুলো জীবনের কোন একটা অংশে দৃশ্যমান হয়, অতঃপর তার সাথে নানা ধরনের কুফলের মিশ্রণ ঘটে। নবীগণের ব্যক্তিত্ব ব্যতীত ইতিহাসে আর কোন উপকরণ ও উপাদান এমন দেখা যায় না, যা সমগ্র মানব সমাজকে ভেতর থেকে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। মসজিদ থেকে বাজার পর্যন্ত, বিদ্যালয় থেকে আদালত পর্যন্ত এবং গৃহ থেকে রণাঙ্গণ পর্যন্ত সমগ্র সমাজ ও সভ্যতাকে আল্লাহর একই রং এ রঞ্জিত করা এবং সমগ্র মানব সমাজের ভিতর থেকে আমূল পরিবর্তন সাধন করাই ছিল মুহাম্মাদুর রসুল সাঃ -এর দাওয়াতের সাফল্য। আর তাঁর জীবনের আসল কৃতিত্ব এটাই। তার দাওয়াতে মানুষের মনমগজ বদলে গেল, চিন্তাধারা পাল্টে গেল, দৃষ্টিভঙগী বদলে গেল, রীতিপ্রথা ও আদত অভ্যাস পরিবর্তিত হয়ে গেল, অধিকার ও কর্তব্যের বণ্টন রীতি পাল্টে গেল, ন্যায় ও অন্যায় এবং হালাল ও হারামের মানদণ্ড বদলে গেল, নৈতিক মূল্যবোধের রূপান্তর ঘটালো, আইন ও সংবিধানের পরিবর্তন ঘটলো, যুদ্ধ ও সন্ধির নিয়ম কানুনের রদবদল হলো, বিয়েশাদী ও সমাজ পদ্ধতি পাল্টে গেল। মোটকথা সভ্যতার এক একটি অংগের ও এক একটি প্রতিষ্ঠানের আমূল পরিবর্তন সাধিত হলো। এই সর্বাত্মক পরিবর্তনের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও কল্যাণ ও মংগল ছাড়া আর কিছু দৃষ্টিগোচর হয়না। এর কোন অংশেই অকল্যাণ নেই, কোন অংগনে দুষ্কৃতি নেই, নেই কোথাও কোন বিকৃতি। সর্বত্র কেবল কল্যাণ, চতুর্দিকে কেবল গঠনমূলক তৎপরতা এবং উন্নতি ও প্রগতি। প্রকৃত পক্ষে মহানবীর হাতে সাধিত হয়েছিল মানব জাতির সর্বাত্মক পুনরুত্থান ও পুনরুজ্জীবন। সত্য ও ন্যায়ের এক স্বর্ণোজ্বল প্রভাতের অভ্যুদয় ঘটিয়ে তিনি সভ্যতার আকাশকে করেছিলেন মেঘমুক্ত। তিনি উদ্বোধন করেছিলেন ঐতিহাসিক যুগের। বিশ্ব ইতিহাসে এটা এত বড় কীর্তি ও কৃতিত্ব, যার কোন নজীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

মানব জাতির ত্রাণকর্তা বিশ্বনবীর সা. আবির্ভাব ঘটেছিল এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন সমগ্র মানবজাতি ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কোথাও চলছিল পাশবিকতা ও হিংস্রতার যুগ। কোথাও শেরক ও পৌত্তলিকতার অভিশাপ সভ্য জীবনের সর্বনাশ সাধন করছিল। মিশর, ভারত, ব্যাবিলন, নিনোভা, গ্রিস ও চীনে সভ্যতা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র রোম ও পারস্যে সভ্যতার পতাকা উড়ছিল। সেই রোমক ও ইরানী সভ্যতার বাহ্যিক জাঁকজমক চোখ ঝলসে দিত। অথচ সেসব নয়ানাভিরাম প্রাসাদের অভ্যন্তরে চলতো লোমহর্ষক যুলুম ও নির্যাতন। জীবনের ক্ষতস্থান থেকে বেরুত উৎকট দুর্গন্ধ। রাজা ও সম্রাটগণ শুধু খোদার অবতারই ছিল না, বরং তারাই খোদা হয়ে জেঁকে বসেছিল। তাদের সাথে আঁতাত করে জনগণের ওপর প্রভুত্ব চালাতো ভূমি মালিক ধর্মযাজক শ্রেণী। রোম ও ইরান উভয় সাম্রাজ্যের এই নিদারুণ শোষণ নিষ্পেষণে সাধারণ মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরতে বসেছিল। তারা জনগনের কাছ থেকে মোটা মোটা দাগের কর, খাজনা, ঘুষ ও নজরানা আদায় করত। উপরন্তু তাদেরকে পশুর মতো খাটনী খাটতে বাধ্য করা হতো। অথচ এদের অভাব অভিযোগ, দুঃখ কষ্ট ও বিপদ মুসিবত নিয়ে না ছিল তাদের কোন ভাবনা, না ছিল কোন সহানুভূতি, আর না ছিল এ সবের সমাধান বা প্রতিকার। এই সব কর্তৃত্বশীল শ্রেণীর ভোগ বিলাস ও প্রকৃতিপূজা তাদের নৈতিক সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। রাজা বাদশাহদের ক্ষমতার পালাবদল ও উত্থান-পতন, নিত্যনতুন বিজেতাদের আবির্ভাব এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধবিগ্রহের কারণে পরিস্থিতির যে সাময়িক পরিবর্তন ঘটতো, তাতেও সাধারণ মানুষের জন্য কোন মুক্তির পথ উন্মুক্ত হতোনা। প্রত্যেক পরিবর্তনের পর সাধারন মানুষ আরো বেশী করে শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হতো। যে শক্তিই ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হতো, সে সাধারণ মানুষকেই শোষণের হাতিয়ার বানিয়ে, তাদেরই রক্তকে পুঁজি করে এবং তাদের শ্রমকে কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতো এবং বিজয় ও কর্তৃত্ব অর্জনের পর সে পূর্বসুরীদের চেয়েও বড় যুলুমবাজ ও বড় শোষকে পরিণত হতো। স্বয়ং রোম ও ইরান সাম্রাজ্য দ্বয়ের মধ্যেও ক্রমাগত সংঘাত-সংঘর্ষ লেগে থাকতো। বিভিন্ন অঞ্চল কখনো এক সাম্রাজ্যের দখলে যেত কখনো আরেক সাম্রাজ্য তাকে গ্রাস করতো। কিন্তু প্রতিবার বিজয়ী শক্তি প্রজাদের কোন না কোন গোষ্ঠীকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করতো। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ইরানী সাম্রাজ্যভুক্ত কোন জায়গা রোম সাম্রাজ্যের পদানত হলে সেখানকার অগ্নিকুণ্ডগুলো নিভিয়ে তদস্থলে গির্জা নির্মাণ করা হতো আবার রোম সাম্রাজ্যভুক্ত কোন জায়গা ইরানীদের দখলে গেলে সেখানকার সমস্ত গির্জা পর্যবসিত হতো অগ্নিকুন্ডে। দুনিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল থাকতো অরাজকতার কবলে। প্রতিনিত যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘাত সংঘর্ষ ও বিদ্রোহ সংঘটিত। ধর্মীয় উপদলগুলো পরস্পরের রক্ত ঝরাতো। আর এইসব দাংগা হাংগামায় দলিত মথিত হত মানুষের মানবিক মর্যাদা। লাঞ্ছিত ও ভূলুণ্ঠিত হতো তার মানুষত্ব। অমানুষিক পরিশ্রম করেও সে জীবনের নুন্যতম প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হতোনা। শত জুলুম নির্যাতনের মুখেও সে সামান্য প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারতোনা। চরম তিক্ত অনুভূতিও তাঁকে নীরবে হজম করতে হতো। বিবেক ও মন এমন কঠিন দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতো যে, টু শব্দটি করার স্বাধীনতাও তার থাকতো না। কি সাংঘাতিক লোহার খাঁচায় সে আবদ্ধ থাকতো এবং কত হতাশা ও ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাসে যে তার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে থাকতো, কে তার খোঁজ রাখতো। সেই লোহার খাঁচায় কুনো দিকে একটি জানালাও খোলা ছিল না এবং মানুষের সামনে ক্ষীণতম আশার আলো বয়ে আনার কোন মতবাদ বা দর্শনের একটি জোনাকীও জ্বলতনা। তার আত্মা আর্তনাদ করতো। কিন্তু কোন দিক হতে সেই আর্তনাদে কেউ সাড়া পর্যন্ত দিত না। কোন ধর্ম তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসতো না। কেননা নবীদের শিক্ষা বিকৃতি ও আপব্যবহারে অতল তলে তলিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল। ধর্মের নামে আর যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাকে ধর্মীয় মহল ব্যবসায়ের পণ্যে পরিণত করেছিলো। সমকালীন যালেম ও শোষক মহলের সাথে তারা গাঁটছড়া বেঁধে নিয়েছিল। গ্রিস দর্শনের কথাই বলুন। কনফুসিয়াস ও মনুসংহিতার কথাই বলুন কিংবা বেদ বেদান্ত, বৌদ্ধ ধর্ম বা জষ্টীনান ও সোলুনের আইনের কথাই বলুন, সবই হয়ে পড়েছিল নিষ্প্রাণ ও নিষ্ক্রীয়। কুনো দিক থেকে কোন আলোক রশ্মি দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলনা। পৃথিবীর কোথাও যখনই এমন অবস্থা হয় যে, মানুষ একটা লোহার খাঁচায় আবদ্ধ হয়ে যায় এবং কোন দিক থেকেই কোন আশার আলো পরিদৃষ্ট হয় না, তখন সমাজ ব্যবস্থায় সংকট ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়ে যায়। [মানবজাতির এই ঐতিহাসিক অবস্থা সম্পর্কে কুরআন অতি সংক্ষেপে পর্যালোচনা করেছে, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না : “পৃথিবীর জলভাগে ও স্থলভাগে বিপর্যয় এসেছে শুধু মানুষের কৃতকর্মের কারণে। এভাবে আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কিছুটা কর্মফল ভোগ করাতে চান। হয়তো তার সৎপথে ফিরে আসবে। (রুম-৪১)] তাই যখন সারা বিশ্ব জুড়ে ইতিহাসের ভয়াবহতম বীভৎসতম অরাজকতা দেখা দিল, তখন সেই অরাজকথার ঘুটঘুটে অন্ধকারে আকস্মিকভাবে জ্বলে উঠল মানবতার শ্রেষ্ঠতম বন্ধু বিশ্বনবীর আলোর মশাল। সে মশাল সমকালীন সামাজিক বিপর্যয়ের অন্ধকারের বুক চিরে চতুর্দিক করলো উদ্ভাসিত।

আরবের নিকটতম অঞ্চল রাসুল সাঃ এর প্রাথমিক কর্মক্ষেত্র। সেখানে যে কি সাংঘাতিক অবস্থা বিরাজ করছিল টা ভাবলেও গা শিউরে উঠে। আদ ও সামুদ আমলে কিংবা সাবা ও ইয়েমেনের সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের আওতায় এক সময় খানিকটা সভ্যতার আলোকচ্ছটা যদি বা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু তাও নিবে গিয়েছিলো বহুকাল আগে। আববের বাদবাকী অঞ্চলগুলো তখনো প্রাগ-সভ্যতার প্রগার অন্ধকারে ডুবেছিল। সভ্যতার সূর্য তখনো ওঠেনি এবং মানবজাতী আদিম জাহেলিয়াতের ঘুম থেকে তখনো জেগে ওঠেনি। চার দিকে বিরাজ করছিল প্রবল উত্তেজনা। মানুষে মানুষে সংঘাত সংঘর্ষ, যুদ্ধ ও লুটপাটের তাণ্ডব চলছিল। মদ, ব্যভিচার ও জুয়ার সমন্বয়ে জাহেলি সংস্কৃতি তুংগে উঠেছিল। কুরাইশরা শেরক ও পৌত্তলিকতাযুক্ত ধর্ম নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিল পবিত্র কা’বার মোতাওয়াল্লিগিরীর রমরমা ব্যবসায়। ইহুদিরাও পাল্লা দিয়ে বিকৃত ধর্ম ব্যবসায়ের দোকান খুলে রেখেছিল। বাদবাকি আরবরা ডুবেছিল চিন্তার নৈরাজ্যে। মক্কা ও তায়েফের মহাজনরা সুদী ব্যবসার জাল পেতে রেখেছিল। দাস ব্যবসার অভিশপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মহা ধুমধামের সাথে চলছিল। মোটকথা, মানুষ প্রবৃত্তির গোলামীর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গিয়ে হিংস্র হায়েনা ও চতুষ্পদ জন্তুর মত জীবন যাপন করছিল। [কুরআনের সূরা ফুরকানে বলা হয়েছেঃ তারা যেন পশুর মত, বরং পশুর চেয়েও বিপথগামী।”(আয়াত-৪২)] শক্তিমানরা দুর্বলদেরকে ছাগল ও ভেড়ার পালের মত নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতো। দুর্বলেরা শক্তিমানদের পদতলে লুটিয়ে থাকতো।

এহেন পরিস্তিতিতে মুহাম্মদ সাঃ আমূল ও সর্বাত্মক পরিবর্তনের আহ্বান নিয়ে একাকী ময়দানে নামলেন। এমন হতাশা ব্যঞ্জক পরিবেশে আর কেউ হলে হয়তো লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে যেত। অতীতে অনাচারকে ঘৃণা করার মত সৎ ও সংবেদনশীল লোক যে পৃথিবীতে পাওয়া যায়নি তা নয়। বিপুল সংখ্যায় পাওয়া গেছে। কিন্তু অনাচারের মোকাবেলা করা ও প্রতিকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তারা নিজ নিজ জীবনের নিরাপত্তার জন্য সমাজ ও লোকালয় ছেড়ে বনে জংগলে ও পর্বতগুহায় আশ্রয় নিত এবং যোগী সন্যাসী হয়ে যেত। কিন্তু রসূল সাঃ বিপন্ন মানবতাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে নিজের জীবন বাঁচানোর চিন্তা করেননি। বরং অন্যায় ও দুষ্কৃতির সাথে লড়াই করে সমগ্র মানব জাতির জন্য মুক্তির পথ খুলে দিয়েছিলেন। সভ্যতার নৌকার হাল ধরে তাকে সঠিক গন্তব্যের পথে চালিত করেছিলেন। রোম ও ইরানের দুই যুদ্ধমান পরাশক্তি তৎকালে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছিল, তা ভাংগার জন্য তিনি তৃতীয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হলেন। ধীরে ধীরে এই তৃতীয় শক্তি যখন নিজ পায়ের ওপর দাঁড়ালো, তখন তা রোম ও ইরান উভয় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করলো। উভয়ের পরাক্রমশালী নেতৃত্বকে ক্ষমতাচুত্য করলো এবং জনগণকে বিভীষিকাময় সভ্যতার খাঁচা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন পরিবেশে বিচরণের সুযোগ করে দিল [এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদীস উল্লেখের দাবী রাখে: “আমাকে আদম সন্তানদের রকমারি যুগের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ যুগে পাঠানো হয়েছে,” (বুখারী) “আল্লাহ ইসমাঈলের বংশধরের মধ্য থেকে কিনানাকে, কিনানার বংশধরের মধ্য থেকে কুরাইশকে, কুরাইশের মধ্য থেকে বনু হাশেমকে এবং বনু হাশেম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন” (মুসলিম) “আল্লাহ যখন জগত সৃষ্টি করেন তখন আমাকে শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর, অতঃপর গোত্রের অতঃপর শ্রেষ্ঠ পরিবারের অন্তর্ভূক্ত করেন। তাই আমি ব্যক্তি হিসাবেও শ্রেষ্ঠ এবং পরিবার হিসাবেও শ্রেষ্ঠ”। (তিরমিযী)]। আদম সন্তানদের সামনে একটি মুক্তির পথ উন্মুক্ত হলো এবং ডাকাতদের দ্বারা পরিবেষ্টিত মানুষের কাফেলাটি উন্নতি ও সমৃদ্ধির মঞ্জিলের দিকে রওয়ানা হয়ে গেল।

মোটকথা রসূল সাঃ সমগ্র জগতবাসীর জন্য মুক্তিদূত ও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন।

 

আবির্ভাবের স্থান কাল মানবীয় উপাদান

মানবজাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য মহান আল্লাহ একদিকে যেমন রসূল সা. এর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বকে বাছাই করলেন, অপরদিকে তেমনি সেকালের নিকৃষ্টতম পরিস্থিতির বিরাজ করা সত্ত্বেও রাসুল সাঃ এর জন্য উৎকৃষ্টতম সময়, দাওয়াতের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান এবং প্রথম সম্বোধন করার জন্য সর্বোত্তম জাতিকেও নির্বাচিত করলেন।

সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে সময়টাকে এই হিসাবে সবচেয়ে উপযোগী মনে করা যায় যে, তখন গোত্রীয় সমাজ ব্যবস্থার সময় শেষ হয়ে আন্তর্জাতিকতার যুগ আসন্ন হয়ে উঠেছিলো। ইতিহাস অল্প কয়েকটা বাঁক ঘুরতেই বিজ্ঞানের যুগে পদার্পন করতে যাচ্ছিল। রসূল সাঃ এর আবির্ভাবের যুগটি ছিল আসলে উল্লিখিত দুটো যুগের মাঝে সীমানা চিহ্নিতকারী। ভবিষ্যতের ব্যপকতর ও উজ্জ্বলতর যুগের উদ্ধোধন করার জন্য পূর্ববর্তী নবীদের দাওয়াতকে পূনর্ব্যক্ত করা, তার প্রাণশক্তিকে তুলে ধরা, আল্লাহর আনুগত্য ভিত্তিক সভ্যতার ভিত্তি মজবুতভাবে স্থাপন করা এবং ইসলামের সাম্য ও ন্যায় বিচার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাকে পূর্ণাংগভাবে উপস্থাপন করা জরুরী হয়ে পড়েছিল, যাতে করে রসূল সাঃ -এর এই কীর্তির আলোক রশ্মিতে পরবর্তী যুগগুলি আলোকিত হয়ে যেতে পারে। এই যুগটা এ হিসাবেও সবচাইতে উপযোগী ছিল যে, মানুষের সামনে আর কোন আশা ভরসার স্থল অবশিষ্ট ছিল না, তাই তাদের পক্ষে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হওয়া সহজতর ছিল।

দাওাতের স্থানের দিকে যদি দৃষ্টি দেই, তবে দেখতে পাই আরব একটা উষর মরুময় দেশ হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন সভ্য দুনিয়ার কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত ছিল। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও উত্তর দিক থেকে আগত সকল বাণিজ্যিক পথগুলো আরব ভুখন্ডের সাথে এসে মিলিত হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের মাঝে যতটা বহির্বাণিজ্য চলতো, তা আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই চলতো। আম্মান ও ইয়েমেন, সানা ও মক্কা, জেদ্দা ও ইয়াম্বু, এবং মদিনা ও দুমাতুল জান্দালের মাঝে বাণিজ্যিক কাফেলার আনাগোনা ছিল। এসব কাফেলা আরব নেতৃবৃন্দ তথা কুরাইশদের অনুমতি ও গুরুত্বপূর্ণ গোত্রগুলোর ছাড়পত্র ছাড়া নিরাপদে চলাচলই করতে পারতোনা। এভাবে আরব ভূখণ্ড, বিশেষত মক্কা, তায়েফ, মদিনা ইয়াম্বু ও দুমাতুল জান্দালের যোগাযোগ ভারত, চীন, ইরান, ইরাক, মিশর, রোম ও ইথিওপিয়ার সকল অঞ্চলের সাথে ছিল। এখানে কোন সামষ্টিক দাওয়াত ও প্রচারের কেন্দ্র অন্য যে কোন অঞ্চলের চেয়ে বেশী সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হতো। তা ছাড়া আরব বিশ্বে মক্কা ও মদিনার গুরুত্ব ছিল সর্বোচ্চ। ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে তাদের নেতৃত্ব ও কর্তিত্ব ছিল অপ্রতিরোধ্য।

আরব জাতীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে অনগ্রসরতা, উচ্ছৃংখলতা ও নৈরাজ্য এবং অর্থনৈতিক দুরাবস্থার দরুণ যদিও কয়েকটা সম্যসার সৃষ্টি হয়েছিলো, কিন্তু এর একটা মস্ত বড় উপকারিতাও ছিল। সেটি হলো, আরব দেশ বহিরাগত আধিপত্য থেকেও অনেকাংশে মুক্ত ছিল। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ পর্যায়েও এমন ক্ষমতা কারো ছিল না যে, সারা দেশের উপর নিয়মতান্তিক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং তারপর ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, আইন ও শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে একটা বিশেষ কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে পারে। এমন ক্ষমতাবান কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থাকলে সে ইসলামী আন্দোলনকে খতম করে দিতে পারতো, যেমন অতীতের বিভিন্ন জালেম বাদশা নবীদের দাওয়াতকে পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছার আগে থামিয়ে দিত। কুরাইশদের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল এবং তারা সর্বশক্তি নিয়ে বাধা দিয়েছেও বটে। তবে কুরাইশদের সমগ্র আরবের ওপর কোন নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিলনা। তাদের ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক প্রভাব যতই গভীর হক না কেন তারা কখনো একটা সুসংগঠিত সরকারের বিকল্প হওয়ার মত ছিলনা।

ধর্মীয় দিক থেকে দেখলে দেখা যায়, এ ভূখণ্ডের চারদিকে পূর্ববর্তী নবীদের দাওয়াতের স্মৃতি ছিল অম্লান। সেকালের জাতীগুলোর যে পরিণতি হয়েছিলো, তার আলামতগুলিও সবার চোখের সামনে বিরাজ করতো। উত্তরে ছিল হজরত ইব্রাহিমের জন্মস্থান উর। তারই কাছে ছিল হজরত নুহ, হজরত লূত ও হজরত সালেহ আ. –এর অঞ্চল। বনী ইসরাঈলের উত্থান পতন ও ঈসা (আ)-এর দাওায়াতের স্থান ফিলিস্তীন এবং জেরুজালেমও পার্শ্বেই অবস্থিত ছিল। দক্ষিণে ছিল আ’দ ও সামুদের বাসস্থান এবং মারেব বাঁধের এলাকা ও সাবার রাজ্য। সাগরের ওপারে রয়েছে মিশর। সেখানে ইব্রাহিব ও ইসমাঈল তাওহীদের কেন্দ্রকে শক্তিশালী করেন ও সুসংহত করেন। সেখানে তাঁরা ইবাদত ও আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। আল্লাহর আনুগত্য, তাওহীদ ও মানবতার সংস্কার ও বিকাশের জন্যে এর চেয়ে উত্তম এলাকা আর কোনটা হতে পারতো? এখানে ইসলামের দাওয়াতের আওয়ায তুললে সহজেই মানুষের মনে সাবেক নবীগণের রেখে যাওয়া নিদর্শনাবলী পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেখা দেবার মতো অবস্থা বিরাজ করছিল।

মানবীয় উপাদানও আরবে যা ছিল, তা ছিল সর্বোত্তম।এ উপাদানটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট ছিল এই যে, এর ক্ষমতা ও যোগ্যতার উৎস তখনো পর্যন্ত অব্যবহৃত ও সুরক্ষিত ছিল। রোম ও ইরানের পাশবিক সভ্যতা যেসব ধ্বংসাত্মক রোগের জন্ম দিয়েছিলো, আরবরা তা থেকে তখনো মুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে হিংস্র জীবন যাপন পদ্ধতি জনিত দোষত্রুটি বিদ্যমান থাকলেও তার ভালো গুনাবলীও নেহাত কম ছিল না। বেদুইন হওয়ার কারণে তাদের মেজাজে ছিল স্বভাবসুলভ সরলতা। কৃত্রিমতা থেকে তারা ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রাকৃতিক নিদর্শবলী কে তাদের খুব নিকট থেকে দেখার সুযোগ ছিল। তাই বিশ্ব চরাচরে মহাসত্যের নিদর্শনাবলী উপলব্ধি করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। গরম আবহাওয়া, মরুঝড়ের ঝাপটা, রাত দিনের কষ্টকর সফর, ক্ষুধা ও পিপাসার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদিনকার হত্যা ও লুটতরাজের কারণে তাদের মধ্যে দুর্ধর্ষতা ও দুঃসাহসিকতার জন্ম হতো এবং তা বীরত্বের প্রেরণা উজ্জীবিত করার কাজে সহায়ক হতো। একটা দুনিয়া জোড়া আন্দোলন পরিচালনার কাজে যে ধরনের একদল সাহসী বীরের প্রয়োজন ছিল, তারা ঠিক তেমনি ছিল। তাদের মধ্যে দানশীলতা বিদ্যমান ছিল। এত বড় কাজ করার জন্য কৃপন ধরনের মানুষ মানানসই হতোনা। আরবদের স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। নিজেদের বংশ পরম্পরাতো বটেই এমনকি তাঁরা তাদের ঘোড়ার বংশ পরম্পরাও মুখস্ত রাখতো। একটি জীবন ব্যবস্থার নীতিমালাকে গ্রহণ করা এবং তা অন্যদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এ ধরনের লোকেরাই সর্বোত্তম কর্মী হতে সক্ষম ছিল। তাদের মধ্যে আত্মসম্ভ্রমবোধ পুরোমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। এজন্য আত্মমর্যাদা রক্ষার কাজটি সমাধান করা তাদেরই আয়ত্বাধীন ছিল। তাদের ভাষাও ছিল একটা উচ্চমানের, বিশাল ও বিকাশমান ভাষা। সে ভাষার লালিত্য ও অলংকার অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল। তাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের কাজে তারা সহজেই সামনে অগ্রসর হতে পারতো। অন্যদেরকে একটা বিপ্লবী বক্তব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত করতেও তারা অধিকতর সফলকাম হতো।

আরবরা ছিল সংকল্পে দৃঢ় ও অনমনীয়। এমনকি অন্যায় পথে চললেও তারা মনের পরিপূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য ও বিবেকের অটুট প্রত্যয় নিয়েই চলতো। সব রকমের বাধা ও বিরোধিতা মোকাবিলা করে তারা অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেত। তবে তাদেরকে ন্যায় ও সত্যের পথে পরিচালিত করা হলে সে ক্ষেত্রেও তারা হতো অবিচল ও নির্ভীক। এ ধরণের আরো অনেক বৈশিষ্ট্য তাদের ছিল। যার ভিত্তিতে স্বীকার না করেই পারা যায়না যে, রাসূল সা. নিজে ব্যক্তিগতভাবে যেমন লক্ষ্য অর্জনের ব্যাপারে শ্রেষ্ঠতম নেতা ও আহ্বায়ক ছিলেন, তেমনি সর্বোত্তম মানের জনশক্তিও তাকে সরবরাহ করা হয়েছিল।

শুধু তাই নয়, এই মানব সম্পদ সকল দিক দিয়ে উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জনে ব্যাকুল ছিল। জাহেলী আরব সমাজের মেধাবী ও চিন্তাশীল লোকদের মধ্যে ধর্মীয় দিক দিয়েও অস্থিরতা ও অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ মহাসত্যের সন্ধান ও বিশ্ব বিধাতার নির্দেশনা লাভের জন্য ব্যাগ্র ও উদগ্রীব হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক দিক দিয়েও তাদের মধ্যে নবচেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। মক্কা ও মদীনার মত শহরগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল। কোন না কোন পর্যায়ের গণতান্ত্রিক চরিত্র সম্পন্ন একটা নগররাষ্ট্রের খানিকটা অগোছালো রূপরেখা তৈরী হচ্ছিল। তাছাড়া আরবের অর্থনৈতিক উপায় উপকরণের স্বল্পতার দরুণ জনসংখ্যা মরু এলাকার বাইরে সম্প্রসারিত হতে বাধ্য হচ্ছিল। চলমান সভ্যতায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলে এবং নেতৃত্ব নিস্ক্রীয় হয়ে পড়লে নতুন কোন যাযাবর গোষ্ঠীকে সভ্যতার চালকের মসনতে বসানো আল্লাহর স্বতসিদ্ধ চিরাচরিত নীতি। এই নীতি অনুসারেই আল্লাহ ফেরাউনী শক্তির পতন ঘটিয়ে তার স্থলে বনী ইসরাঈলকে ক্ষমতাসীন করেছিলেন।

এসব দিক বিবেচনা করলে আরবরাই ছিল তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জনশক্তি। মানব সমাজে একটা মৌলিক ও সর্বাত্মক বিপ্লব সংঘটিত করার জন্যে এই জনশক্তিই সবচেয়ে উপযোগী।

 

বিপ্লবী কালেমা

এ কথা ভাববার কোনই অবকাশ নেই যে, বিশ্বনবী সা. কোন আকীদা-বিশ্বাস, মতাদর্শ, বা পরিকল্পনা ছাড়াই সংস্কার ও বিনির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। তিনি নিছক একটা অস্পষ্ট চেতনা, লক্ষ্যহীন আবেগ এবং অপরিপক্ক উন্মাদনা দ্বারা তাড়িত হয়ে এ কাজ শুরু করেননি। বরং তিনি মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যের মশাল হাতে নিয়ে ময়দানে নেমেছিলেন। তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল মন নিয়ে বছরের পর বছর ধরে জীবনের সমস্যাবলী নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। হেরা গুহার নির্জন প্রকোষ্ঠে দীর্ঘকাল ব্যাপী নিজের অন্তর্জগত ও বহির্জগত নিয়ে ধ্যান করেছেন। সভ্যতার কল্যাণ ও অকল্যাণ কিসে হয়, তার নীতিমালা বুঝবার জন্য তিনি অনেক মাথা ঘামিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ পাক তাঁর হৃদয়কে সত্যের আলোকে উদ্ভাসিত করে দিয়েছেন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য তাঁর সামনে উদঘাটিত হয়েছে। সেই শ্রেষ্ঠতম সত্য হলো, মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা ও প্রভূ আছেন এবং মানুষ তাঁরই গোলাম ও দাস। এই সত্য কলেমাই ছিল বিশ্বনবীর সূচিত বিপ্লবের বীজ। এই বীজ থেকেই জন্ম নিয়েছিলেন সৎ জীবন ও নিষ্কলুষ সভ্যতার সেই পবিত্র বৃক্ষ, যার শেকড় মাটির অনেক গভীরে উপ্ত এবং যার ডালপালা উচ্চ আকাশে বিস্তৃত।

বিশ্বনবীর ঘোষিত এই কলেমা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিপ্লবাত্মক কলেমা। আমরা সবাই জানি, এই কলেমা হলো ‘‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’’। শাব্দিকভাবে এটা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কিন্তু অর্থের দিক দিয়ে অত্যন্ত গভীর। ‘‘এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তিনিই একমাত্র ইলাহ’’। ইলাহ সেই শক্তি বা সত্তাকে বলা হয়, যার গোলামী করা যায়, যার জন্য মানুষ নিজেকে ও নিজের যথাসর্বস্বকে অকাতরে উৎসর্গ করতে পারে, যার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে উপাসনা করে, যার সর্বাত্মক প্রশংসা, গুণগান, পবিত্রতা ঘোষণা ও বন্দনা করে। যার জন্য মান্নত মনে, যার কাছে সর্ব প্রকারের কল্যাণের আশা করে, যার পাকড়াওকে ভয় করে, যার কাছে সৎকাজের পুরস্কারের আশা ও অসৎকাজের শাস্তির আশংকা করে, যাকে নিজের নিরংকুশ মালিক মোখতার মনে করে, যাকে শাসক ও আইনদাতা মানে, যার আদেশ অনুযায়ী কাজ করে ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকে, যার দেয়া নীতিমালাকে নিজের জীবনের মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করে, যার হালাল ও হারামের বিধিকে বিনা বাক্য ব্যয়ে কার্যকরী করে, যাকে নিজের জন্য হেদায়াতের উৎস মনে করে, যার ইচ্ছা ও মর্জী অনুযায়ী জীবন বিধান তৈরী করে, যার প্রিয়জনদেরকে সম্মান ও বিরোধীদেরকে প্রত্যাখ্যান করে, এবং যার সন্তুষ্টি অর্জন তার জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়। একটি মাত্র শব্দ ইলাহের মধ্যে এই ব্যাপক তাৎপর্য নিহিত ছিল।

মানব সমাজ ইলাহ্র এই অধিকারগুলোকে এক আল্লাহর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ভাগ বাটোয়ারা করে রেখেছিল। ফলে সমাজ ও সভ্যতার বিভিন্ন স্তরে জেঁকে বসেছিল অসংখ্য ইলাহ। মানুষের নিজের প্রকৃতি ও তার কামনা বাসনা, পরিবার ও গোত্রের রসম রেওয়াজ, বর্ণ, বংশ ও জাতিগত সংঘবদ্ধতার ঐতিহ্য, জমীদার ও ধর্মযাজকদের আধিপত্য, রাজপরিবার ও পরিষদবর্গের দাম্ভিকতা, ইত্যাদি তাদের ইলাহ হয়ে বসেছিল। এসব ইলাহ্র নাম নিয়ে সমাজের এক শ্রেণী অপর শ্রেণীকে শাসন শোষণ করতো, লুটে পুটে খেত। ‘‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ (‘‘আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই’’।) কথাটা এই সমস্ত খোদার খোদায়ীর ওপর একই সাথে প্রচন্ড আঘাত হানতো। এই কলেমার উচ্চারণকারী প্রকারান্তরে এ কথাই ঘোষণা করতো যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন প্রভূত্ব আমি মানিনা, কারো কর্তৃত্ব ও আধিপত্য মানিনা, কারো রচিত আইন কানুন আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারো অর্জিত অতিমানবীয় অধিকার বৈধ নয়, কারো সামনে মাথা নোয়ানো হবেনা, কারো সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি তোয়াক্কা করা হবেনা, কারো আংগুলের ইশারায় জীবন চলবেনা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সকল খোদায়ী ভেংগে চুরমার করে দেয়া হবে। বস্তুত, এই কলেমা ছিল মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা।

এই কলেমার দ্বিতীয় অংশে এই মর্মে অংগীকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যে, মানবজাতির হেদায়াত তথা মুক্তি ও কল্যাণের পথে সন্ধান দান এবং সভ্যতা ও সংস্কার সংশোধনের একমাত্র পথ হলো আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রসূলগণের দেখানো পথ। জীবনের প্রয়োজনীয় আসল ও নির্ভুল জ্ঞানের একমাত্র উৎস হলো ওহী। এ থেকেই মানবীয় বিবেক চিন্তা করার মূলনীতি কী জানতে পারে। মুহাম্মদ সা. রিসালাতের এই ধারাবহিকতার পূর্ণতাদানকারী সর্বশেষ নবী ও রসূল। জীবনের সঠিক পথের সন্ধান তাঁর কাছ থেকেই নিতে হবে এবং তাঁর নেতৃত্বেই বিশ্ব মানবতা কল্যাণ ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম।

এই কলেমার এই গুরুত্বের কারণেই তার স্বীকৃতি ইসলাম গ্রহণের পয়লা শর্তে পরিণত হয়েছে। এই কলেমাকে মায়াযযিনগণ আযান দেয়ার সময় উচ্চ স্বরে পাঠ করে থাকে এবং তাকে শ্রেষ্ঠ যিকর বলে আখ্যায়িত ও নামাযের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোট কথা, এ কলেমা সর্ব দিক দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের শ্লোগানে পরিণত হয়েছে।

রসূল সা.-এর এই বিপ্লবাত্মক কলেমা যার অন্তরেই প্রবেশ করেছে, তার ভেতরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এ কলেমা যার জীবনেই ঢুকেছে, তার নকশা পাল্টে গেছে। এ বীজ থেকে নতুন মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে এবং লালিত পালিত ও বিকশিত হয়েছে।

 

সমাজ সংস্কারে রসূল সা. এর লক্ষ্য

রসূল সা.-এর জীবনী থেকে যথার্থ উপকারিতা অর্জনের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটার জবাব জানা জরুরী, তা হলো, রসূল সা. এর সামনে ইপ্সিত পরিবর্তনের পরিধি কতদূর এবং তাঁর কাজের মানদণ্ড কী ছিল? সমাজ ব্যবস্থায় তিনি কি কোন আংশিক পরিবর্তন চাইতেন, না সর্বাত্মক পরিবর্তন? তাঁর দাওয়াত কি নিছক ধর্মীয় ও নৈতিক সংস্কারের মধ্যে সীমিত ছিল, না রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্নও ছিল? অন্য কথায়, সামাজিক পরিমণ্ডলে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য কী ছিল?

এ প্রশ্নের জবাব খোদ কুরআনে খুব সুষ্ঠুভাবেই দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভংগীতে বারবার ইসলামী দাওয়াতের উদ্দেশ্য জানানো হয়েছে। এখানে আমি শুধু দুটো আয়াতের উল্লেখ করছি। এক জায়গায় সকল নবী ও রসূলকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে এভাবেঃ

﴿لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ ۖ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ﴾

‘‘আমি আমার রসূলগণকে কেবলমাত্র এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি এবং তাদের ওপর কিতাব ও মানদন্ড নাযিল করেছি, যাতে মানবজাতি ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা আল হাদীদঃ ২৫)

কথাটা একেবারে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেয়া হয়েছে। ইসলামের দাওয়াতের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানব জীবনকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং সমাজ ব্যবস্থায় কার্যকরভাবে ভারসাম্য ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা। একই উদ্দেশ্যে লোহার অস্ত্র-শস্ত্র ব্যবহার করার ইংগিত আয়াতের পরবর্তী অংশে রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী বিধিব্যবস্থার বাস্তবায়ন, সংরক্ষণ ও বিকাশ সাধনের জন্য সামরিক শক্তিও অনিবার্য।

স্বয়ং মুহাম্মদ সা. নবী হিসাবে আবির্ভাবের উদ্দেশ্য আরো স্পষ্ট ভাষায় একাধিকবার বলা হয়েছে। যেমনঃ

﴿هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ﴾

‘‘তিনিই আল্লাহ, যিনি স্বীয় রসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এই সত্য দ্বীনকে অন্য সমস্ত ধর্মমত ও জীবন ব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করে দিতে পারেন। চাই তা মোশরেকদের কাছে যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন।’’ (সূরা আস সফঃ ৯)

অর্থাৎ কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য মোশরেকরা তো নিজেদের জাহেলী জীবন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেই। জাহেলিয়াতের বিরুদ্ধে যে আওয়াজই তোলা হোক, তা তাদের কাছে অপসন্দ হবেই। কিন্তু এইসব পসন্দ অপসন্দের তোয়াক্কা না করে এবং তাদের বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে রসূল সা. কে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের কাজটা সুসম্পন্ন করতেই হবে। ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য যদি এটা না হতো, তাহলে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, জেহাদ ও হিজরতের অবকাশ কোথা থেকে হতো? জান ও মালের কুরবানীর আহ্বান কেন জানানো হলো? কী উদ্দেশ্যে ‘‘আল্লাহর সাহায্যকারী হয়ে যাও’’ এই উদাত্ত আহ্বান জানানো হলে? কী উদ্দেশ্যে ‘‘আল্লাহর দল’’ গঠিত হয়? কোন্ লক্ষ্যে শহীদদেরকে বাছাই করা হয়? বস্তুত ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য অন্তরে বদ্ধমূল না করে কুরআন ও সীরাত এই দুটোর কোনটাই বুঝা যাবেনা।

এবার আসুন, রসূল সা.-এর জীবনেতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় পর্যালোচনা করে অনুসন্ধান চালানো যাক যে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্য কী ছিল?

রসূল সা. প্রাথমিক স্তরেই বনু হাশেম গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের একটি বৈঠক আহ্বান করেন নিজের দাওয়াত পেশ করার জন্য। সেখানে তিনি সংক্ষেপে বলেন যে, এই দাওয়াত দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। এর অনেক দিন পরে এক কুরাইশ প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনা করার সময় তিনি ঐ বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেনঃ

(আরবি*****************************)

‘‘আমি যে দাওয়াত পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করে নাও, তাহলে তাতে তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম জিল্দ, পৃঃ ৩১৬)

‘দুনিয়ার কল্যাণ’ এই সহজ সরল শব্দ দুটিকে কোন আংশিক কল্যাণের অর্থে গ্রহণ করা একেবারেই অযৌক্তিক। আংশিক কল্যাণ তো প্রত্যেক দাওয়াতেই থাকে। প্রত্যেকটা খারাপ ব্যবস্থায়ও কিছু না কিছু ভালো জিনিস থাকে। আসলে দুনিয়ার কল্যাণের অর্থ হলো দুনিয়ার জীবনটা সর্বাঙ্গীন সুন্দর হওয়া। সমাজ ব্যবস্থাটা নিষ্কলুষ ও নিখুঁত হওয়া। ন্যায় বিচারের স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং পবিত্র ও নির্মল জীবনের অধিকারী হওয়া।

কুরাইশদের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে আরো একবার রসূল সা. এর সাথে তাদের আলাপ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এবারেও তিনি বলেনঃ

(আরবি***************************)

‘‘একটি মাত্র কথা যদি তোমরা আমাকে দাও, তবে তা দ্বারা তোমরা সমগ্র আরব জাতির ওপর আধিপত্য লাভ করবে এবং যত অনারব জাতি পৃথিবীতে আছে তারা সব তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম জিলদ, পৃঃ ৩১৬)

প্রতিটি মেলা ও হজ্জের সময় আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিভিন্ন গোত্রের শিবিরে শিবিরে গিয়েও তিনি এই বক্তব্য প্রত্যেক গ্রোত্রপতির কাছে রাখতেন। তাদেরকে বলতেন, ‘‘আমাকে সাথে নিয়ে চলুন। আমাকে কাজ করার সুযোগ দিন এবং আমার সাথে সহযোগিতা করুন, যেন আমি সেই বার্তাটা জনগণের কাছে স্পষ্ট করে পেশ করতে পারি, যার জন্য আমাকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে।’’ [বনু আমের গোত্রের যারা হজ্জ করতে গিয়েছিল, তারা ফিরে এসে জানিয়েছেঃ ‘‘মুহাম্মদ (সা) আমাদেরকে অনুরোধ করেছিল আমরা যেন তার নিরাপত্তা বিধান করি, তার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং আমাদের এলাকায় তাকে নিয়ে আসি।’’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় জিলদ, পৃঃ ৩৪)] এই বক্তব্য শুনে ও রসূল সা. এর আবেগ উদ্দীপনা দেখে বনু আমের গোত্রের গোত্রপতি বুখাইয়া বিন ফিরাস এত অভিভূত হলেন যে, তিনি নিজের ঘনিষ্টজনদের কাছে বললেনঃ এই যুবককে হাতে পেলে আমি সমগ্র আরবকে গ্রাস করে ফেলতে পারবো।’’ রসূল সা.-এর দাওয়াতের লক্ষ্য ও তাঁর তৎপরতার সম্ভাব্য ফলাফল এই বিচক্ষণ আরব সরদার বুঝে ফেলেছিলেন। তাই তিনি রসূলের সাথে একটা দর কষাকষি করতে চাইলেন। তিনি রসূল সা. কে জানালেন যে, তিনি একটি শর্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। সেটি হলো, আপনি যখন আপনার বিরোধীদের ওপর বিজয় লাভ করবেন এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন, তখন আপনার পরে আমরা ক্ষমতাসীন হব।’’ বুখাইরা যে অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রসূল সা. যদি সংকীর্ণ অর্থে নিছক ধর্মীয় প্রচারক ও ওয়ায নসীহতকারী হতেন, এবং কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য তাঁর একেবারেই না থাকতো, তাহলে পরিষ্কার বলে দিতেন যে, আরে ভাই, আমি তো আল্লাহ ওয়ালা মানুষ। ক্ষমতার বখরা দিয়ে আমার কী কাজ? রাষ্ট্র ও সরকারের সাথে আমার কিসের সম্পর্ক? কিন্তু রসূল সা. এভাবে জবাব দেননি। তিনি বললেন”

‘‘ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব আল্লাহর হাতে। ওটা তিনি যাকে দিতে চান তাকেই দেবেন।’’

এ কথা বলেই তিনি বুখায়রার শর্ত ও ক্ষমতা ভাগাভাগির বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করে দিলেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় জিল্দ পৃঃ ২৩)

রাসূল সা. এর নেতৃত্বে আন্দোলন চলাকালে “আরব ও অনারবদের ওপর কর্তৃত্ব লাভ”- এর বিষয়টি এত খ্যাতি লাভ করে যে, ওটা যেন ইসলামী আন্দোলনের শ্লোগানে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। শিশুরা পর্যন্ত ওটা বলাবলি করতো। বিরোধীরা এটাকে একটা উপহাসের ব্যাপার হিসাবে গ্রহণ করেছিল। দাস ও দরিদ্র শ্রেণীর যে সব যুবক ইসলাম গ্রহন করতো এবং কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতনে পিষ্ট হতো, তাদেরকে দেখলেই কুরাইশরা তাদের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে দিয়ে বলতোঃ “ এই হুজুরদের কথা কি আর বলবো, এরাঁ নাকি আরব-আজমের শাসক হবেন!”

বিদ্রুপ, উপহাস, বিরোধীতা ও প্রতিরোধের মাত্রা যতই বাড়ুক, কুরাইশ গোত্রের বিচক্ষণ লোকেরা অন্তরের অন্তস্থল থেকে নির্ঘাত উপলব্ধি করছিল যে, এ আন্দোলন কোন মামুলী জিনিস নয়, বরং এর অত্যন্ত সুদূর প্রসারী ফলাফল দেখা দিতে বাধ্য। একবার মক্কার শীর্ষ স্থানীয় কুরাইশ নেতারা উতবাকে রাসুলুল্লাহর সা. সাথে আলাপ আলোচনার জন্য পাঠালো। উৎবা সরকারী পদ, ধন-সম্পদ ও দুনিয়াবী স্বার্থ সংক্রান্ত সম্ভাব্য সব রকমের লাভজনক জিনিস দেয়ার প্রলোভন দেখালো, যাতে রসূল সা. কোন রকমে এই বিপ্লবী কর্মকান্ড পরিত্যাগ করতে রাজী হয়ে যান। তবে রাসূল সা. উৎবাকে সুরা হা-মীম এর প্রথম কয়েকটি আয়াত শুনিয়ে দিলেন। এর ফলে উৎবার চেহারাই বিবর্ণ হয়ে গেল। সে গিয়ে বললোঃ এ দাওয়াত তো একটা বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিতবহ। একটা বিপ্লব ঘনিয়ে আসবে এবং সমাজ জীবনের সব কিছু ওলট পালট হয়ে যাবে। তাই সে পরামর্শ দিল যে, মুহাম্মদকে (সা.) তোমরা কিছু বলো না। সে যা করছে তা করতে দাও। বাধা দিও না। আরবের জনগণ যদি তাকে মেরে ফেলে, তাহলে তোমরা তার থেকে এমনিতেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে। আর যদি সে বিজয়ী হয়, তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব হবে, তার মর্যাদা তোমাদেরই মর্যাদা হবে, এবং তোমরা বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী হবে।’ অথ্যাৎ কিনা উৎবার মত লোকও বুঝে ফেলেছিল যে, এই আন্দোলনের পশ্চাতে একটা সাম্রাজ্য লুকিয়ে রয়েছে। এবং এর পরণতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া আর কিছু নয়। সে যখন টের পেয়েছে, তখন রাসুল সা. ও তার সংগী সাথীরা কিভাবে টের না পেয়ে থাকবেন? (সীরাতে ইবনে হিসাম, ১ম জিল্দ, পৃঃ ৩১৪)

একবার যখন মুসলমানরা প্রচন্ড সহিংসতা ও নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন রাসূল সা. –এর সাথীরা তাঁর কাছে তাদের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করলেন এবং ঐ অবস্থা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য দোয়া চাইলেন। রাসূল সা. প্রথমে তো তাঁদের বুঝালেন যে, আল্লাহর দ্বীনকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে পদে পদে কঠিন বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অতীতে যারা এ দায়িত্ব পালন করেছে তাদেরকে অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে। অতঃপর পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে তাদেরকে সুসংবাদ শুনালেন যে, “আল্লাহর কসম, এ কাজে আল্লাহ একদিন অবশ্যই চূড়ান্ত সাফল্য দান করবেন।’ অতঃপর এই সাফল্যের বর্ণনা দিয়ে বলেনঃ

“এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ একাকী সানা থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত সফর করবে, অথচ আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয়ে সে ভীত থাকবেনা।” [সীরাতে ইবনে হিসাম – প্রথম খন্ড, পৃঃ ৩১৪ (মুল আরবী পুস্তক)] অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন এক ইনসাফপূর্ন সমাজ ও কল্যাণময় যুগ প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা চালূ হবে যে, আজ যেখানে ডাকাতি, রাহাজানি হত্যা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে, যেখানে মানব সন্তানকে দিনে দুপুরে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবং প্রকাশ্যে নারীর সতীত্ব পর্যন্ত লুন্ঠিত হচ্ছে, সেখানে একজন ভ্রমণকারী সম্পূর্ণ একাকী নিশ্চিন্তে ও নির্ভয়ে যত্রতত্র ভ্রমণ করতে পারবে। কেউ তার জান মাল ও মান সম্ভ্রমকে স্পর্শ করার দুঃসাহস দেখাবে না। আর একবার রসূল সা. বলেছিলেন যে, এমন একটা যুগ প্রায় আসন্ন, যখন লোকেরা নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই মক্কায় যাতায়াত করবে। [শিবলী নোমানঃ সীরাতুন্নবী, ২য় খন্ড, ৩ পৃষ্ঠা]

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেরূপ পরিষ্কার ও উজ্জল ধারনা এখানে ব্যক্ত করা হয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।

একবার রসূল সা. কা’বার চাবির রক্ষক উসমান বিন তালহাকে কা’বার দরজা খুলে দিতে অনুরোধ করলে উসমান সে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলো। সে সময় দৃশ্যত চরম নৈরাজ্যজনক ও প্রতিকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। তথাপি রসূল সা. বললেন, 'সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন এই চাবি আমাদের হাতে থাকবে এবং আমরা যাকে দিতে চাইবো দিবো। [আল মাওয়াহিবুল লাদুনীয়া, কাসতালানী, ১ম খন্ড, পৃ: ১৫৮]

আকাবা নামক স্থানে মদীনার আনসারদের কাছ থেকে যে ঐতিহাসিক অংগীকার বা বায়আত নেয়া হয়েছিল, তা অধ্যয়ন করলে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ইসলামের প্রচারজনিত বিরোধ ও সংঘাত যে কত ব্যাপক ও সুদূর প্রসারী হয়, তা আনসাররাও উপলব্ধি করেছিলেন। তারা এটাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই বিরোধের চূড়ান্ত ফয়সালা পরবর্তীতে যুদ্ধের ময়দানেই হবে। এই অংগীকারের মধ্য দিয়ে একদিকে আনসারগণ রাসূল সা. এর সমর্থনে প্রয়োজনে সারা বিশ্বের সাথে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দেন এবং নিজেদের সরদারদের ধ্বংশ ও জানমালের বিনাশকেও স্বাগত জানান। অপরদিকে রাসুল সা. এর কাছে থেকেও তারা প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে, আল্লাহ যখন আপনাকে বিজয়ী করবেন, তখন যেন আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না। এই যে যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি, ত্যাগ ও কুরবানীর সংকল্প এবং বিজয়ের স্বপ্ন- এ সবের মধ্যে কি রাসূলের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। [সীরাতে ইবনে হিসাম (আরবী), ২য় খন্ড, পৃ: ৫০, ৫১, যাদুল মায়াদ (আরবী) ১ম খন্ড, পৃ: ৫০,৫১]

হিজরতের জন্য যাত্রা শুরু করার আগে তাকে যে দোয়া শেখানো হয় তার শেষাংশ হলো, ”আর তোমার পক্ষ থেকে কোনো রাষ্ট্র শক্তিকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও” [সুরা বণী ইসরাঈণ, আয়াত ৮০]

এ আয়াতে তাঁকে ’সহায়ক শক্তি’ প্রার্থনা করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। অথার্ৎ এই পবিত্র মিশনের পৃষ্ঠপোষকতা ও এই মহতী লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শাসন ক্ষমতার প্রয়োজন বিধায় শাসন ক্ষমতা প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

চাচা আবু তালেবের ওপর রাসূল সা. – এর সাফল্য ও সমর্থন পরিত্যাগ করার জন্য যখন চাপ সৃষ্টি করা হলো, তখন তিনি রসূল সা. কে বললেন, আমার জন্য সমস্যার সৃষ্টি করো না। এই সময়ে রাসূল সা. যে জবাব দেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ’ওরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি আমার এ লক্ষ্য পরিত্যাগ করবো না।” তার জবাবের শেষ কথাটা ছিল এই- ”হয় আল্লাহ আমার এই লক্ষ্যকে বিজয়ী করবেন, নচেৎ এ কাজ করতে করতেই আমি মৃত্যু বরণ করবো।” [সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড ২৭৮]

এখানে তিনি 'বিজয়ী করবেন’ বলেছেন, 'সম্পূর্ণ করবেন’ বলেননি। 'বিজয়ী' শব্দটার মধ্যেই দ্বন্দ-সংঘাতের ধারনা বিদ্যামান। আর তাঁর শেষ বাক্যটি থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, এই দ্বন্দ-সংঘাতের তীব্রতা ছিল জীবনের ঝুকি পর্যায়ের।

হিজরতের পর আদী ইবনে হাতেম রাসূল সা.-এর কাছে এসে তার ব্যক্তিত্ব পরখ করতে লাগলেন। তিনি তারঁ দাওয়াতের ধারণা কী জানতে চেষ্টা করলেন এবং সমালোচকের দৃষ্টিতে তার চলন বলন পর্যবেক্ষন করলেন। আর এ কাজ করতে গিয়েই তার হৃদয় হয়ে পড়লো অভিভূত ও মুগ্ধ। আগন্তুকের চিন্তাধারার সাথে সংগতি রেখে তিনি তাকে জানালেন যে, ভবিষ্যতে বাবেলের সাদা ভবনগুলো ইসলামের অধীনে চলে আসবে, এখানে বিপুল ধনসম্পদ বিরাজ করবে এবং মুসলমানরা অসাধারন ক্ষমতা ও প্রতাপের অধিকারী হবে। সেই সাথে তিনি তাকে ইসলামী ইনসাফপূর্ণ সমাজব্যবস্থার এই বৈশিস্ট সম্পর্কেও অবহিত করলেন যে, অচিরেই তুমি দেখবে- এক মহিলা সুদূর কাদেসিয়া থেকে একাকী একটি উঠে সওয়ার হয়ে এই মসজিদ অভিমুখে রওনা হয়েছে এবং সম্পূর্ন নিরাপদে এখানে এসে পৌছেছে। বাহ্যত একেবারেই নিস্ব অবস্থায় হিজরতের সফরে যে নবীর দৃষ্টি সুরাকার হতে পারস্য সম্রাটের কংগন শোভা পেতে দেখেছে, তাঁর সম্পর্কে এ কথা কিভাবে বলা যায় যে, নিজের আন্দোলনের শেষ পরিনতি ও নিজের সূচিত নতুন সমাজ ব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন না? এ কথা কিভাবে কল্পনা করা সম্ভব যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, তার জন্য প্রস্তুতি ও সংগ্রাম করা হয়নি এবং তা নিছক পুরস্কার হিসাবে আকস্মিকভাবে রাসূল সা. এর সংগঠন কে দেওয়া হয়েছে? বলতে চাইলে বড়জোর এতটুকু বলা যায় যে, কেবল পার্থিব স্বার্থ ও ব্যক্তিগত প্রতাপ ও পরাক্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি রাষ্ট্র ও সরকার কায়েম করতে চাননি। কিন্তু আল্লাহর দ্বীনকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করা, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম করা, মানবতার মুক্তি নিশ্চিত করা এবং সমাজ গঠনের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র কাম্য ছিল না, একথা কেমন করে বলা যায়?

আসলে শুধু আকীদাগত ও নৈতিক বিপ্লব সাধনই রাসূল সা. এর উদ্দেশ্য ছিল না, বরং সেই সাথে পূর্ণ গুরুত্ব সহকারে রাজনৈতিক বিপ্লব সাধনও তাঁর লক্ষ্য ছিল। ব্যক্তির সংশোধনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কারও তার কাম্য ছিল। অন্য কথায় বলা যায়, রাসূল সা. মানুষকে একটা সামষ্টিক সত্তা বা সমাজবদ্ধ জীব হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। এবং তার সকল সামাজিক সম্পর্ক সহ তাকে সংশোধন করতে চেয়েছিলেন। রাসূল সা. মানুষকে সমাজ থেকে বিছিন্ন করে শুধু ব্যক্তি হিসাবেও বিবেচনা করেননি। এবং তার দাওয়াতকেও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখেননি। এই বিষয়টি যদি স্বরণ রাখা হয় এবং রসূল সা. এর আগমনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে যদি তার সমস্ত ব্যাপকতা সহকারে অন্তরে বদ্ধমূল করা হয়, তাহলে সীরাতের ঘটনাবলীতে পরিপূর্ণ ধারাবাহিকতা পরিলক্ষিত হবে এবং প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতিটি উদ্যোগের ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। অন্যথায় সীরাতের রহস্যও উদ্ঘাটিত হবে না, এবং পবিত্র কোরআনের বক্তব্যও স্পষ্ট হবে না।

 

একটি দীন একটি আন্দোলন

দর্শনের গন্ডী যতখানি, চিন্তার গন্ডীও ঠিক ততখানি। জীবনের বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এবং ইতিহাসের চড়াই উতরাই-এর সাথে দার্শনিকের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকেনা। দার্শনিক ঘটনাবলী ও পরিস্থিতি- পরিবেশের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন বটে; কিন্তু ঘটনাবলী ও পরিস্থিতির মোড় ঘুড়িয়ে দেয়ার জন্য কোন কার্যকর চেষ্টা-সাধনা ও সংগ্রামে অংশ গ্রহন করেন না। প্রচলিত সংকীর্ণ অর্থে ধর্ম বলতে যা বুঝানো হয়, তার গন্ডী আরো একটু প্রশস্ত এবং তার দৌড় আরো একটু দীর্ঘ। সে কিছু আকীদা-বিশ্বাস দেয়ার সাথে সাথে ব্যক্তিকে সমাজ থেকে আলাদা করে একটা নৈতিক শিক্ষাও দেয়। তবে ধর্মের পথ সমাজ ব্যবস্থার বাইরে-বাইরে দিয়ে অতিক্রান্ত হয়। সে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে যেমন মাথা ঘামায়না, তেমনি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কোন ব্যাপক পরিবর্তন চায়না, এবং চলমান শাসনব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করে না। ধর্মের দাওয়াত সব সময় ওয়ায নসিহত ও উপদেশ দানের পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে। একজন ওয়ায়েয মিষ্টি মধুর কিছু উপদেশ দিয়েই বিদায় গ্রহন করেন। তাঁর শ্রোতারা কোন সংকটজনক পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে আছে কিনা, ইসলাম বিদ্বেষী কুচক্রী মহল কোন আপত্তিকর তৎপরতা দ্বারা তাদের মানসিকতা ও চরিত্রকে বিকৃত ও বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে কিনা, দৈনন্দিন ঘটনাবলী ও পরিস্থিতি তাদের চরিত্রে কোন বিরূপ প্রভাব ফেলেছে কিনা, তাঁর সদুপদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে কি কি মতাদর্শ ও চিন্তাধারা কোন কোন দিক থেকে কতখানি প্রভাব ফেলছে, তাঁর দেয়া ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত পরম ধর্মপ্রান ও খোদাভীরু লোকগুলো কোন অনৈসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার অঙ্গীভূত হয়ে আছে কিনা,- সে সব বিষয় নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা থাকেনা। তাঁর মধ্যে কোন সামষ্টিক লক্ষ্য থাকে না। পরিবর্তনের কোন পরিকল্পনা থাকেনা। রাজনৈতিক ও নেতাসূলভ প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির কোন প্রয়োজন অনুভূত হয় না। জীবনের একটা ক্ষুদ্র অংশে আংশিক সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা সৃষ্টি করার জন্য যা কিছু করা সম্ভব, তা করা হয়। তারপর অবশিষ্ট বিস্তীর্ণ ময়দানে বাতিল ও অপশক্তি মহানন্দে আপন পতাকা ওড়াতে থাকলো কিনা, তা নিয়ে তারা আর মাথা ঘামায় না।

রাসূল সা. একজন দার্শনিক ছিলেন না যে, স্রেফ উচ্চাংগের কিছু ধ্যান ধারনা পেশ করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং বাস্তব অবস্থা নিয়ে কোন চিন্তাভাবনা তাকে করতে হবে না। তিনি নিছক একজন ওয়ায়েযও ছিলেন না যে, সর্বব্যাপী নৈরাজ্য ও উচ্ছৃংখলতা থেকে একেবারে চোখ বুজে কেবল ব্যাক্তিগতভাবে মানুষকে সম্বোধন করবেন, মিষ্টি মধুর উপদেশ বিতরন করবেন এবং তার পরিনতি কী হতে পারে, তা আদৌ ভেবেই দেখবেন না। মানবজাতির ত্রানকর্তা এই মহামানব পরিপূর্ণ সমাজ সচেতনতা সহকারে মানব জীবনের আমূল পরিবর্তন সাধনকেই নিজের ব্রত হিসাবে গ্রহন করেন। এ জন্য তিনি সামষ্টিক জীবনকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে, এমন প্রতিটি শক্তির সাথে পরিচিত হয়েছেন। জাহেলী সমাজ ও সভ্যতার চালক নেতৃবৃন্দের ওপর নজর রেখেছেন। যুক্তিপ্রমাণ সহকারে তাদেরকে চ্যালেঞ্জ পর্যন্ত করেছেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতার ওপর দৃষ্টি রেখেছেন। ঘটনা প্রবাহ ও পরিস্থিতির প্রতিটি তরঙ্গের প্রতি লক্ষ্য রেখেছেন। প্রতিটি ঘটনাকে নেতাসূলভ অন্তর্দৃষ্টি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে যাচাই ও পরখ করেছেন যে, তা কোন দিক দিয়ে সংস্কারের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ও কোন দিক দিয়ে ক্ষতিকর? সমাজের সকল ধরনের মানুষের যোগ্যতা ও গুনাগুণ জানতে চেষ্টা করেছেন এবং তার আলোকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন যে, দাওয়াতের কাজে কখন কার কাছ থেকে কী সাহায্য আশা করা যায়। তিনি নিজের শক্তি ও গতিকে প্রতিপক্ষের শক্তি ও গতির সাথে তুলনা করতেন। প্রত্যেকটি পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় ধৈর্যের সাথে প্রহর গুনতেন। উপযুক্ত সময়টা এসে যাওয়া মাত্রই সাহসের সাথে পদক্ষেপ নিতেন। জনমতের ওঠানামা কিভাবে হয়, তা যথাযথভাবে বুঝতেন এবং বিরোধীদের প্রতিটি অপপ্রচারের মোকাবিলা করে তাদের প্রভাব খর্ব করতেন। যখন দেখলেন, ইসলাম বিরোধী কবিতা ও বক্তৃতার একটা আসর তৈরী হয়ে গেছে, তখন তার পাল্টা আসর গড়ে তুললেন ইসলামী কবি ও গণবক্তাদের দ্বারা। ইসলামী নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন বটে, তবে চোখ বুঝে নয়। বরং পরিস্থিতি ও পরিবেশের দিকে দৃষ্টি রাখতেন, সময়ের চাহিদা বুঝতেন এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করতেন। যেখানে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাওয়া যেত, এগিয়ে যেতেন। এগিয়ে যাওয়া সমীচিন মনে না হলে অগ্রাভিযান থেকে বিরত থাকতেন। এক সাথে দুটো বিপদের সম্মুখীন হলে একটা থেকে আত্মরক্ষা করে অপরটার মোকাবিলা করতেন। সামরিক ব্যবস্থা গ্রহনের প্রয়োজন দেখা দিলে নিঃসংকোচে গ্রহন করতেন। সন্ধির সুযোগ সৃষ্টি হলে অকুন্ঠ চিত্তে সন্ধির হাত বাড়িয়ে দিতেন। সর্বোপরি, এই সব চেষ্টা সাধনায় আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও আনুগত্য এবং নৈতিক মূল্যবোধকে শুধু সংরক্ষণই করতেন না, বরং তার ক্রমাগত উন্নয়ন ও বিকাশ সাধন করতেন। এই গোটা কার্যক্রম ও কর্মপদ্ধতিকে যদি কোরআন ও সীরাত (মুহাম্মদ সা.-এর জীবনের ইতিহাস)-এর পাতা থেকে একত্রিত করে সামনে রাখা হয়, তাহলে ব্যক্তিগত পূজা উপাসনা, জপতপ ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ প্রচলিত পরিভাষার ‘ধর্ম’এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের আনুগত্য বোধক ‘আদ-দ্বীন’-এর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যাবে। জানা যাবে-ওয়ায নসিহত ও বৈপ্লবিক আহবানের মধ্যে এবং ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে কি বিরাট ব্যবধান!

যেহেতু রসূল (সাঃ) একটি পূর্নাঙ্গ ও সর্বাত্মক জীবন বিধান বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন, তাই তিনি এক এক করে সেই সব ব্যক্তিকে অনুসন্ধান করেছিলেন যারা স্বভাবগতভাবে সৎ। তারপর যার হৃদয়ে সত্যের আলো জ্বলে উঠেছে, তাকেই একটা সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন,তাকেই প্রশিক্ষণ দিয়ে দিয়েছেন, তাকে নিজের সাথে অগ্নি-পরীক্ষায় অংশীদার করেছেন। তারপর যেই স্তরে যতটুকু সংঘবদ্ধ শক্তি অর্জিত হয়েছে, তাকে আপন নেতৃত্বে বাতিল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইতে শামিল করেছেন। এ লড়াই যেমন চলেছে চিন্তার ময়দানে তেমনি চলেছে রাজনৈতিক ময়দানে এবং সর্বশেষ রণাঙ্গনেও। রসূল (সাঃ) এর পার্শ্বে যারা সমবেত হন, তাদের কে তিনি সুফি ও দরবেশ বানিয়ে দেননি। যোগী সন্যাসী রুপে গড়ে তুলেননি, তাদের মধ্যে দুষ্কৃতি থেকে কেবল নিজেকে রক্ষা করা, বিজয়ী বাতিল শক্তির ভয়ে ভীত থাকা, এবং ক্ষমতাধর ও বিত্তশালীদের ভড়কে যাওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি করেননি। তারা নির্বোধ পর্যায়ের সরল ও ছিলেন না ,নিষ্ক্রিয় পর্যায়ের দুনিয়া ত্যাগিও ছিলেন না। তারা ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী। সচেতন ও প্রাজ্ঞ, আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ও আত্ম অভিমানি, সুচতুর ও বিচক্ষণ, কর্মঠ ও নিরলস এবং অগ্রগামী ও দ্রুতগামী। তারা পাদ্রী ও সাধুদের মতন কর্মবিমুখ ছিলেন না। বরং সদা করমচঞ্চল ছিলেন ও সব রকমের সদগুণাবলী ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। এভাবে সর্বোত্তম স্বভাবের মানুষ গুলো উৎকৃষ্টতম প্রশিক্ষণ পেয়ে, উৎকৃষ্টতম সাংগঠনিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এবং সর্বোত্তম নেতৃত্বের অধীনে সমবেত হয়ে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিনত হন। এ কারনেই তারা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যা লঘু হয়েও সমগ্র আরবের বিপুল সংখ্যা গুরু জনতাকে নিজেদের অধীনে সংঘবদ্ধ করতে সমর্থ হন। মক্কায় যখন ইসলামী সংগঠনের লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ জন, তখন মক্কা ও তার আশেপাশের গোটা জনপদে তারা এক সার্বক্ষণিক চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনার জোয়ার সৃষ্টি করেন। এর পর বছরের পর বছর ব্যাপি ঘরে ঘরে অলিতে গলিতে সবচেয়ে বহুল আলোচিত বিষয় যদি কিছু হয়ে থাকে,তবে তা ছিল রসূল (সাঃ) ও তার সঙ্গিদের দাওয়াতি তৎপরতা। মদিনায় গিয়ে যখন ইসলামি আন্দোলনের নিশানবাহীদের সংখ্যা কয়েকশোর বেশি হয়নি, এবং অমুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তখনই ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা হোল। রসূল (সাঃ) ও তার ইসলামী সংগঠনের নীতি এরূপ ছিল না যে,আগে সমগ্র আরব সমাজ ইসলাম গ্রহন করুক অথবা অধিকাংশ লোকের চরিত্র সংশোধন সম্পন্ন হোক, তার পর ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেয়া যাবে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এরকম ছিল না যে আগে দাওয়াতের কাজ চলতে থাকুক, এবং চিন্তা ও আকীদা বিশ্বাসের সংস্কার ও সংশোধন হতে থাকুক। অবশেষে একদিন ইসলামী রাষ্ট্র সমাজ ব্যবস্থা আপনা আপনিই তৈরি হয়ে যাবে, অথবা পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ তায়ালা ইসলাম কে বিজয়ী করে দেবেন। সেখানে ইতিহাসের এই চিরায়ত সত্যকে অনুসরণ করা হয়েছিল যে, জনগনের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ চিরদিনই অজ্ঞ ও নিষ্ক্রিয় থাকে এবং সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশই থাকে সক্রিয়। এই সক্রিয় অংশের একভাগ সংস্কার ও বিপ্লবের দাওয়াত নিয়ে মাঠে নামে আর অপর অংশ তাতে বাধা দেয়। সমাজের সক্রিয় অংশের এই দুই ভাগের মধ্যেই চলে আসল দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। এই সংঘাতের যখন ফয়সালা হয়ে যায়, তখন জনগন আপনা আপনি সক্রিয় হয়ে উঠে। তারা জানতেন যে, জনগনের পথে যতক্ষণ কোন ভ্রষ্ট নেতৃত্ব বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,এবং তাদের জীবন কে বিকৃত করার অপচেষ্টা চলতে থাকে,অথবা অন্তত পক্ষে তাদের অজ্ঞতা ও নিষ্ক্রিয়তার অন্ধকারে ফেলে রাখে, ততক্ষণ তারা ব্যাপকভাবে কোন দাওয়াত কে গ্রহন করতেও পারে না এবং নিজেদের বাস্তব জীবনে কোন পরিবর্তন আনতেও সক্ষম হয়না। এমন কি যারা দাওয়াত কে গ্রহন করে, তাদের পক্ষেও সম্ভব হয় না যে, তারা বিকারগ্রস্থ নেতা ও শাসকদের তৈরি করা নোংরা পরিবেশে নিজেদের জীবনকে পরিপূর্নভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলবে। বরঞ্চ পরিবর্তন আনতে যদি অনেক বেশি দেরি হয়ে যায় তবে অনেক সময় সেই মান বজায় রাখাও কঠিন হয়ে দাড়ায়, যে মানে সত্যের আহবায়করা দীর্ঘদিনের চেষ্টা সাধনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে পৌছতে পেরেছিলেন। কেননা প্রতিকূল পরিবেশ মানুষকে পেছনে ঠেলে দিতে ক্রমাগত শক্তি প্রয়োগ করে থাকে। সুতরাং কোন সামাজিক আন্দোলনের স্বাভাবিক কর্মপন্থা এতটাই হয়ে থাকে যে, সমাজের সক্রিয় অংশ থেকে সৎ স্বভাবের লোকগুলোকে বাছাই করে যত বেশি সম্ভব শক্তি সঞ্চয় করে নিতে হয়, এবং সেই শক্তিকে সংঘর্ষে নিয়োজিত করে প্রতিপক্ষের নেতৃত্বের জোর চূর্ণ করে দিতে হয়। ইতিহাস সাক্ষী যে, এযাবৎকাল সংঘঠিত প্রতিটি বিপ্লব সক্রিয় সংখ্যা লঘুদের হাতেই সংঘটিত হয়েছে। যেহেতু যে কোন সংস্কার ও গঠনমূলক আহবান সমাজের সক্রিয় অংশের মধ্যে থেকে কেবল সৎ স্বভাব সম্পন্ন লোকদেরকেই আকৃষ্ট করে থাকে, তাদের মধ্যে একটা ইতিবাচক আবেগ ও প্রেরনার সৃষ্টি করে, এবং তাদের কে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের নৈতিক বল বাড়িয়ে দেয়, তাই প্রতিপক্ষ প্রচুর শক্তি, প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষেত্র বিশেষ সংখ্যাধিক্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মোকাবেলায় পরাজিত হয়ে থাকে। এর একটা উল্লেখযোগ্য ও অকাট্য প্রমান হচ্ছে বদরের যুদ্ধ। সুতরাং যখন রসূল (সাঃ) এর চারপাশে আরবিও সমাজের সক্রিয় সৎস্বভাব সম্পন্ন লোকের এত অধিক সংখ্যা একত্রিত হয়ে গেল যে, তারা নৈতিক শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে জাহেলী নেতৃত্ব ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম, তখন তিনি নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য অভিমুখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্রও কুণ্ঠিত হলেন না। মক্কা বিজয়ের তাৎপর্য এটাই যে, এর মাধ্যমে জাহেলী নেতৃত্ব সম্পূর্ণরূপে উৎখাত ও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর মাধ্যমে জনসাধারনের মাঝ থেকে সকল বাধা অপসারিত হওয়ায় তারা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে এগিয়ে আসে। ইতিহাসের একটি দৃষ্টান্তও এমন নেই যে, সত্যভ্রষ্ট নেতৃত্বের অধীনে কোন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছে এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছাড়াই নিছক ওয়াজ-নসিহত, তাবলীগ ও ব্যক্তিগত সংশোধনমূলক কাজ দ্বারা বিপ্লব সংঘটিত হয়ে যেতে পেরেছে। নচেৎ বিগত তেরো শতাব্দীতে খেলাফতে রাশেদার পর ওয়াজ-নসিহত, তাবলীগ প্রচার এবং তা’লীম ও আত্মশুদ্ধির নামে মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ সমূহের আওতায় প্রচুর চেষ্টা সাধনা চলেছে এবং আজও আলেম, সূফী পীর মাশায়েখ মাদ্রাসা শিক্ষক ও লেখকগণ মুখ ও লেখনির মাধ্যমে এত ব্যাপক ও বিপুল পরিমান প্রচার কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন, যা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইপ্সিত সংখ্যক লোকের আত্মশুদ্ধিও হতে পারলনা। সমাজ সংস্কারের কাজও এতটা এগুলোনা যে, এর কল্যাণে সমাজ ব্যাবস্থাটা পাল্টে যাবে এবং রসূল (সাঃ) এর বিপ্লবের পূনরাবৃত্তি হবে। পরিষ্কার বুঝা যায় যে এ যাবতকার চিন্তাধারা, কর্মপদ্ধতি ও বিপ্লবী মতাদর্শে বড় রকমের কোন খুঁত ছিল। আর সেই খুঁত এই যে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাত এড়িয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু লোককে সামগ্রিক সমাজ ব্যাবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাওয়াত দেয়া ও সংশোধন করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। কেউ কেউ বলে যে, দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করাটা আসল লক্ষ্য ছিল না, বরং আকস্মিকভাবে আল্লাহর পুরস্কার হিসেবে এসে গিয়েছিল। কিন্তু তারা যখন এ কথাটা বলে, তখন রসূল (সাঃ) এর কৃতিত্বপূর্ণ অবদান ও প্রানান্তকর সংগ্রামের শুধু অবমূল্যায়নই করেনা, বরং কালিমা লেপন করে। একটু ভাবুন ত এই মহান ব্যক্তিত্ব কত কষ্ট করে মদীনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেদেরকে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একটা সাংবিধানিক চুক্তির আওতাভুক্ত করে ফেললেন, কত কাঠখড় পুড়িয়ে মদিনার পার্শ্ববর্তী গোত্র সমূহের সাথে মিত্রতা ও সখ্যতার সম্পর্ক স্থাপন করলেন। কত দক্ষতার সাথে মুষ্টিমেয় সংখ্যক মুসলমানদেরকে নিয়ে একটা দুর্ভেদ্য সামরিক বাহিনী গড়ে তুললেন এবং নিয়মিত সামরিক টহলের ব্যাবস্থা করলেন। কত চেষ্টা সাধনা দ্বারা কোরাইশদের বানিজ্যিক পথ অবরোধ করলেন। কত দৃঢ়তার সাথে কোরাইশদের আগ্রাসী আক্রমণ প্রতিহত করলেন। কেমন চাতুর্যের সাথে ইহুদি ও মোনাফেকদের ষড়যন্ত্র নস্যাত করলেন। কত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সাথে হুদাইবিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করলেন। কি দুরন্ত সাহসিকতা নিয়ে ইহুদিদের যোগসাজশের সব কটি ঘাটি একে একে সমূলে উৎপাটন করলেন এবং কেমন সজাগ মস্তিষ্ক নিয়ে তিনি অসংখ্য দুর্ধর্ষ গোত্রের আঞ্চলিক বিদ্রোহের অবসান ঘটালেন। এই সব পদক্ষেপ তাঁর রাষ্ট্রনায়ক সূলভ অন্তর্দৃষ্টি ও প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দক্ষতা ও বিচক্ষণতা ও সুণিপুন কর্মকুশলতার যে বিস্ময়কর নজীর বিদ্যমান, তা কেমন করে এই সব লোকের দৃষ্টি এড়ায়, বুঝে আসে না। এই সব কিছুকে আল্লাহর পুরস্কার বলা সম্পূর্ণ সত্য কথা। কেননা প্রত্যেক ভাল জিনিসই আল্লাহর পুরস্কার হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ কোন পুরস্কার তখনি পায় যখন সে তার জন্য চেষ্টা সাধনা যথাসাধ্য বুদ্ধিমত্তা ও অন্তর্দৃষ্টি সহকারে করে দেখায়। দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে আল্লাহর পুরস্কার বলার মাধ্যমে কেউ যদি রসুল(সাঃ) এর সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা, কুশলতা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতাকে অস্বীকার করতে চায়, তবে সে মস্ত বড় অবিচার করে। দুর্ভাগ্যবশত, রসূল (সাঃ) এর রাজনৈতিক দিকটা এত অস্পষ্ট রয়ে গেছে যে আজ তাঁর দাওয়াত ও লক্ষ্য সম্পর্কে সঠিক ধারনা পোষণ করা কঠিন হয়ে গেছে। অথচ এই দিকটা সমগ্র নবী জীবনী অধ্যয়নের সময় সামনে না থাকলে ধর্মের প্রচলিত সংকীর্ণ ধারনা ও দ্বীনের সর্বব্যাপী ধারনার মধ্যে যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে সেটা বুঝা সম্ভব নয়। রসুল(সাঃ) একটা পুর্নাঙ্গ জীবন বিধান বা দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন, সেই সত্য ও নির্ভুল দ্বীনের ভিত্তিতে সমগ্র জীবনের কার্যবিধি ও আচরণবিধি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, এবং আল্লাহর আইনকে বাস্তবায়িত ও কার্যকরী করতে এসেছিলেন। কাজেই আমাদের এটা উপলব্ধি করা চাই যে রসুল(সাঃ) পুর্নাঙ্গ ও সর্বাত্মক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের আন্দোলন চালাতে এসেছিলেন। আর এই আন্দোলন চালানোর জন্য তাঁর মধ্যে ছিল সর্বোত্তম‌‍ রাষ্ট্রনায়ক সুলভ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, মনীষা, অন্তর্দৃষ্টি এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক চেতনা ও বুদ্ধিমত্তা। অন্য কোন দিক দিয়ে যেমন রসূল (সাঃ) এর সমকক্ষ কেউ নেই, তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তাঁর সমতূল্য কেউ নেই। তিনি জীবনের প্রতিটি ব্যাপারেই যেমন অনুকরনীয় আদর্শ, তেমনি রাজনৈতিক সংগ্রাম ও চেষ্টা সাধনায়ও একমাত্র তাঁর জীবনই আদর্শ। রসুল(সাঃ) এর কীর্তি ও অবদান এই যে, তিনি সততার দাওয়াত দিয়েছেন, সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়েছেন এবং একটা পুর্নাঙ্গ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। ধর্মের সীমিত ও সংকীর্ণ ধারনার মধ্যে এত বড় ও বিশাল কাজের স্থান সংকুলান হতে পারে না। সুতরাং এটা ছিল দ্বীন তথা পুর্নাঙ্গ জীবনবিধান, নিছক ধর্ম নয়। এটা ছিল এক সর্বাত্মক আন্দোলন- নিছক কোন আধ্যাত্মিক যোগ সাধনা নয়।

 

জীবনের অবিভাজ্য পুর্নাঙ্গতা

মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মহান আন্দোলন এক অনন্য বিপ্লব সংঘঠিত করার মাধ্যমে যে সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, তার বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তার মূল কলেমার চেতনা ও প্রেরনা জীবনের প্রতিটি বিভাগে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। গোটা সমাজ ব্যবস্থায় পরিপুর্ণ একাত্মতা ও সমন্বয় বিরাজ করত। সকল প্রতিষ্ঠান ছিল এক এ রঙে রঞ্জিত ও একই ভাবধারায় উজ্জীবিত। মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে যে আল্লাহর এবাদত করা হতো, সেই আল্লাহরই আনুগত্য করা হতো বাজারে ও ক্ষেত খামারে। যে কোরআন নামাযে পড়া হতো, সেই কোরআনেরই আইন আনুসারে মোকদ্দমার ফয়সালা হতো আদালতে। যে নৈতিক নীতিমালা সীমিত পারিবারিক পরিবেশে কার্যকর ছিল, আন্তর্জাতিক কর্মকান্ডেও অনুসৃত হতো সেই একই নীতিমালা। যে সত্য ঘোষিত হতো মসজিদ মিম্বর থেকে, সেই একই সত্য অনুসারে চলত সরকারি প্রশাসন। যে আকীদা বিশ্বাস প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে বদ্ধমূল করানো হতো, সেই আকীদা বিশ্বাসই কার্যকর থাকতো সামগ্রিক অবকাঠামোতে। যে চিন্তাধারা শিক্ষা ব্যবস্থায় সক্রিয় থাকতো সে অনুসারেই রূপায়িত হতো সমগ্র সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড। আল্লাহর সন্তুষ্টি যেমন নামায রোযায় কাম্য থাকতো, তেমনি রনাঙ্গনেও অসি চালনা ও তীরবিদ্ধ হওয়ার সময় সক্রিয় থাকতো সেই একই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এ ছিল এমন এক সমন্বিত বিধান, যার আওতায় সমগ্র মানব জীবন একই খোদায়ী নির্দেশ দ্বারা পরিচালিত হতো। জীবনের এক এক বিভাগে এক এক রকম মূল্যবোধ ও নির্দেশ চলতনা। এ বিধানে কোন স্ববিরোধীতা ছিল না। এর এক অংশ অপর অংশের সাথে সাংঘর্ষিক ছিলনা। এর বিভিন্ন অংশে কোন জটিলতা, অস্পষ্টতা জোড়াতালি বা জগাখিচুড়ি ছিলনা। এ জন্যই এর আওতায় মানব জাতি যেরূপ দ্রুত গতিতে উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল, ইতিহাসে তা নজিরবিহীন।

 

বিপ্লবের প্রাণশক্তি

মানবতার সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য সম্ভবত এটা যে, ইতিহাসে যখনই কোনো ব্যক্তি ক্ষমতার মসনদে আসীন হবার সুযোগ পেয়েছে- তা সে তরবারীর বলে, ষড়যন্ত্ররের মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে, কিংবা কোন আকস্মিক ঘটনা চক্রে, যেভাবেই হোক না কেন সে নিজেকে এরূপ ভাবতে শুরু করেছে যে, সে মানুষের শুধু শাসক নয়, বরং মানুষের শিক্ষক ও সমাজের সংস্কারকও বটে। এ ধরনের স্বকল্পিত শিক্ষক ও সংস্কারকের উপর যখন শাসন ক্ষমতা ন্যাস্ত হয় তখন সে সর্বেসর্বা ও সর্বময় ভাগ্য বিধাতা হয়ে জেঁকে বসে। নিজেকে সে পৃথিবীর সেরা চিন্তাবিদ ভাবে। সে জ্ঞানের প্রতিটি উৎসের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে এবং সমাজের সর্বোত্তম সচেতন ও প্রজ্ঞাবান লোকদের দূরে সরিয়ে রেখে নির্বিচারে এমন সব পদক্ষেপ গ্রহন করে থাকে, যে তার প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা সাব্যস্ত হয়ে থাকে। তারা সহিংস পদ্ধতিতে মানুষ কে প্রকৃত মানুষ বানাতে ও ডান্ডা মেরে সব কিছু কে ঠান্ডা করতে চায়। বিপ্লব ও সংস্কারের এই সব স্বঘোষিত দাবীদার অনেক সময় মানুষের জন্মগত স্বভাব প্রকৃতির খোঁজ খবরই রাখে না। জীবনের ভাঙ্গা গড়া কী কী কারণে অনিবার্য হয়ে উঠে, তার প্রাথমিক জ্ঞানও তাদের থাকে না। তারা কখনই জানতে চেষ্টা করে না যে, মানুষের মনুষ্যত্ব শেখানোর সঠিক পন্থা কী, বিকার ও বিভ্রান্তির উৎসটা কোথায়? তার সংশোধন ও প্রতিকারের কাজটা কোথা থেকে শুরু ও কোথায় গিয়ে শেষ হয়? তারা পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাকে কাজে না লাগিয়ে সম্পূর্ণ নতুনভাবে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে শুরু করে। তারা পরামর্শ ও সমালচনার দুয়ার বন্ধ করে দেয়, যাতে তাদের কোন হিতাকাংখী ও মানব প্রেমিক তাদের ধ্বংসাত্মক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে বাধা দিতে না পারে। সকল রোগের একটাই ধ্বন্বন্ডরি ঔষধ চিনে। সেটা হচ্ছে বলপ্রয়োগ ও সহিংসতা। অর্থাৎ কড়া কড়া আইন প্রনয়ন ও নিত্য নতুন কঠোর বিধি জারী করা। মানুষের চারপাশে গোয়েন্দা লাগিয়ে দেয়া এবং বার বার কঠোর শাস্তি দিয়ে তাদের ওপর গায়ের ঝাল ঝারা। মানবতার মুক্তিদুত বিশ্বনবী (সাঃ) যে বিপ্লব সংঘটিত করেন তার প্রানশক্তি হিংস্রতা ও বলপ্রয়োগ ছিল না, বরং হিত কামনা ও ভালবাসাই ছিল তার চালিকা শক্তি। তিনি মানুষের উপর যার পর নাই দয়ার্দ্র ছিলেন। আদম সন্তানদের প্রতি তাঁর ছিল সত্যিকার দরদ ও ভালবাসা। নিজের দাওয়াতকে তিনি এরূপ উদাহরণ দিয়ে বুঝানর চেষ্টা করেছেন যে, তোমরা পতঙ্গের মতন আগুনের গুহার দিকে এগিয়ে যাচ্ছ, আর আমি তোমাদেরকে ধরে ধরে টা থেকে বাচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ জন্যই কোরআন তাঁকে সারা বিশ্বের জন্য করুনা স্বরূপ বলে অভিহিত করেছেন। একটু ভেবে দেখুন তিনি এতবড় বিপ্লব সংঘটিত করলেন, অথচ তাতে বলপ্রয়োগ ও সহিংসতার একটি দৃষ্টান্তও খুঁজে পাওয়া যায় না। রসূল (সাঃ) যে দশ বছর মদিনায় কাটান, তার পুরটাই ছিল সাংঘাতিক রকমের জরুরী অবস্থার আওতাধীন। প্রতি মূহুর্তে আক্রমনের ভয় লেগেই থাকতো। কোরায়েশরা তিন তিনবার বড় ধরনের আক্রমন চালিয়েছে। এখানে সেখানে ছোট খাট যুদ্ধ ও সীমান্ত সংঘর্ষ তো নিত্যকার ব্যাপার হয়ে পরিনত হতে গিয়েছিল। মদিনার বাইরে বসবাসকারী বিভিন্ন গোত্র মদিনার উপর আক্রমন চালানোর জন্য নানা সময় নানা দিক থেকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো। টহল দেয়া বা উপদ্রব নির্মূল করার জন্য মদীনা থেকে ছোট ছোট সেনাদল পাঠানো হতো। রাতের বেলা সামরিক প্রহরা বসানো হতো। এক কথায় বলা যায়, সামরিক শিবিরের মতো জীবন যাপন করা হতো। তদুপুরি ইহুদী ও মোনাফেকদের নিত্য নতুন ষড়যন্ত্র জনজীবনকে করে তুলতো দুর্বিষহ। কখনো যুদ্ধ বাধানোর ষড়যন্ত্র, কখনো মুসলিম সমাজকে খন্ড বিখন্ড করা ও মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে সংঘাত লাগালোর ষড়যন্ত্র, কখনো রসূল সা; এর নেতৃত্বকে ব্যর্থ ও বিফল করার ষড়যন্ত্র এমনকি কখনো কখনো স্বয়ং রসূল সাঃ কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রও পাকানো হতো। এর চেয়ে মারাত্মক জরুরী অবস্থা আর কি হতে পারে? কিন্তু রসূল সাঃ কখনো একনায়কসুলভ ভূমিকাও পালন করেননি। কোন জরুরী অবস্থা জারী করেননি। কোন স্বেচ্ছাচারিতামূলক বিধিও চালু করেননি। কোন ব্যক্তিকে নিরাপত্তা আইনের অধীনে কারাগারেও পাঠাননি। জরুরী অবস্থাকালীন সংক্ষিপ্ত আদালতও বসাননি। চাবুক মেরে মেরে মানুষের চামড়াও তুলেননি। কারো উপর জরিমানাও আরোপ করেননি। কোন নাগরিকের উপর আল্লাহর আইনের অতিরিক্ত বোঝাও চাপাননি। সমালোচনা ও ভিন্নমত পোষণের অধিকারও হরণ করেননি এবং কারো উপর কোন বিধি নিষেধও আরোপ করেননি। এমনকি আবদুল্লাহ বিন উবাই এর মতো ভয়ংকর কুচক্রী গৃহশত্রুর বিরুদ্ধেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। নিজের দাওয়াতের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও নিজের চরিত্রের পবিত্রতার উপরই তিনি পুরোপুরি নির্ভর করতেন। না কাউকে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন, না কারো মনুষ্যত্বের উপর তাচ্ছিল্য প্রকাশ করেছেন, আর না অহংকার ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছেন। বরঞ্চ এমন লোকদের ঔদ্ধত্য ও অহংকারকে তিনি ধৈর্যের সাথে বরদাশত করেছেন, যারা বাহ্যত আস্ফালন করলেও আসলে ছিল দুর্বল ও অসহায়। এ কারনে শত্রুদের মনও তিনি অনায়াসে জয় করে ফেলতেন,সাথীরা যে কোন নতুন ও পুরাতন আইনকে স্বাগত জানাতে সদা প্রস্তুত থাকতেন এবং বিরোধীরা তাঁর সামনে নিজকে অত্যন্ত নীচ ও হীন মনে করতো। তারপর যখন তারা তাঁর সত্যবাদিতা ও নিষ্ঠার সামনে মাথা নত করে ইসলাম গ্রহণ করতো তখন তাদের মধ্যে সূচিত হতো সর্বোত্মক ও আমূল পরিবর্তন।

রসূল সাঃ এর অন্তরে যে খোদা প্রেম সক্রিয় ছিল , তারই আরেক রূপ ছিল প্রগাড় মানব প্রেম। তাঁর এই মানব প্রেমের সঠিক ধারনে লাভ করতে হলে এই কয়টি ঘটনা দ্বারাই তা লাভ করা যায়। তাহলো, মক্কাবাসী তাঁকে মদীনায় গিয়েও শান্তিতে বাস করতে দেয়নি। তারা যখন দুর্ভিক্ষ কবলিত হোল, তখন তিনি তাদেরকে খাদ্যশস্য পাঠিয়ে সাহায্য করলেন এবং পাঁচশো স্বর্ণ মুদ্রা নগদ পাঠালেন। বদরের যুদ্ধবন্দীদের ‘উহ’ ‘আহ’ শব্দ কানে যাওয়া মাত্রই তাঁর ঘুম হারাম হয়ে যাওয়া এবং তাদের বাঁধন ঢিলা করে দেয়ার ঘটনা থেকেও তাঁর মানব দরদী স্বভাব আচ করা যায়। বনু হাওয়াযেন গোত্রের ছয় হাজার যুদ্ধবন্দীকে যে মাত্র একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রসূল সাঃ এর নির্দেশে মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল, সেটিও ছিল তাঁর মহানুভবতার জ্বলন্ত উদাহরণ। এরপরও রসূল সাঃ এর আর কোন মানব দরদী পরিচয় যদি পেতে হয়, তবে মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর অভাবনীয় আত্মপ্রকাশ লক্ষ্য করুন। মানবতার এই মুক্তিদূত একজন পরিপূর্ণ বিজেতা হিসেবে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে যারা বিশ বছর ধরে লড়েছে তারা তাঁর সামনে একেবারেই অসহায়ভাবে দাঁড়িয়েছিল। অন্য কেউ হলে প্রতিটি আক্রমনের প্রতিশোধ নিত। ব্যাপক গণহত্যার নির্দেশ দিত এবং রক্ত গঙ্গা বইয়ে তবে ছাড়তো। লাশের স্তূপ না ফেলে কিছুতেই যেত না। আরব সমাজের সর্বজন স্বীকৃত রীতিপ্রথার কথাই বলুন , নৈতিকতার কথাই বলুন অথবা আইন কানুনের কথাই বলুন, সব কিছুর বিচারেই মক্কাবাসী ছিল ঘোরতর অপরাধী। ধর্ম ও রাজনীতি উভয় দিক দিয়ে তাদের ন্যায্য প্রাপ্য হয়ে গিয়েছিলো প্রাণদণ্ড। কিন্তু বিজয়ের মূহুর্তে রসূল সাঃ এর হৃদয় মানবপ্রেমে বিগলিত হয়ে গেলো এবং কোরায়েশদের অত্যাচার নির্যাতনের গোটা ইতিহাসকে ক্ষমার আওতাভুক্ত করে ঘোষণা করলেনঃ

“তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আর কোন অভিযোগ নেই। তোমরা যেতে পার। তোমরা মুক্ত ও স্বাধীন”

উপরন্তু তিনি তাদের মন জয় করতে তাদের ধন সম্পদ দান করলেন এবং তাদেরকে অপমান ও প্রত্যাখান করার পরিবর্তে বিভিন্ন দ্বায়িত্ব অর্পন করলেন ও বুকে টেনে নিলেন। রসূল সাঃ এর কাছে এটি সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল যে , যে বিপ্লব প্রতিশোধ নিতে আরম্ভ করে, তা আপনা থেকেই খতম হয়ে যায়। আর যে বিপ্লব ক্ষমা ও মহানুভবতা প্রয়োগ করে তা শত্রুকেও বশীভূত করে এবং প্রতিরোধকারীদেরকে সেবকে পরিণত করে।

শুধুমাত্র কোরায়েশদের বাড়াবাড়ির কারণেই রসূল সাঃ এতটুকু কঠোর পন্থা অবলম্বন করতে বাধ্য হন, যাতে তাদের রক্তপিপাসু তরবারির ধার ভোতা হয়ে যায়। তারা তাঁর কাধের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার পর তিনি ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজকে সুরক্ষিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তবে মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মহানবী (সাঃ) এমন সমরনীতি ও এমন প্রতিরক্ষা কৌশল উদ্ভাবন করেন, যাতে নুন্যতম প্রাণহানি ও নুন্যতম রক্তপাত হয় এবং রণাঙ্গনেও মনুষ্যত্বের মর্যাদা সমুন্নত থাকে।

মানব প্রেমের এমন উজ্জ্বল ও ব্যাপক দৃষ্টান্ত অন্য কোন বিপ্লবে পাওয়া যায়না। রসূল সাঃ এর বিপ্লব ছিল একটা নির্ভেজাল শিক্ষামূলক বিপ্লব এবং তার ভিত্তি ছিল মানবতার কল্যাণকামিতার উপর প্রতিষ্ঠিত।

 

নতুন মানুষ

অসংখ্য সংস্কারমূলক ,গঠনমূলক ও বৈপ্লবিক আন্দোলনের নজীর আমাদের সামনে রয়েছে। কিন্তু এর কোন একটি আন্দোলনই মানুষকে বদলায়নি। প্রতিটি আন্দোলনই যেমন আছে তেমন রেখে শুধু বাইরের পরিবেশটা বদলাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এমন প্রতিটা পরিবর্তন মানবজীবনের সমস্যাবলী সমাধানে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছে, যা মানুষের ভিতর থেকে পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিশ্বনবী সাঃ এর কৃতিত্বের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, মানুষ ভিতর থেকে বদলে গিয়েছিলো। শুধু বদলে যায়নি বরং তার জীবনে সংঘটিত হয়েছিল আমূল পরিবর্তন। মানুষের আকৃতিতে যে প্রবৃত্তি পূজারী পশুরা ঘুরে বেড়াত, একটি মাত্র কলেমার প্রভাবে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। সাথে সাথে তাদের ধ্বংস স্তূপ থেকে আবির্ভূত হোল আল্লাহভক্ত একদল সৎ মানুষ। এই নতুন মানুষের চরিত্রের ঔজ্জ্বল্য দেখলে চোখ ঝলসে যায়। হযরত ওমর(রাঃ), যিনি ছিলেন মক্কার এক উচ্ছৃংখল মদখোর যুবক - তাঁর জীবনে যখন পরিবর্তন এলো তা ভেবে দেখুনতো। ফুযালার মধ্যে যখন পরিবর্তন এলো, তখন সেটাইবা কেমন অভাবনীয় পরিবর্তন ছিল ভাবুনতো! যুল বিজাইদানকে দেখুন, কিভাবে নিজের বিলাসি জীবনের মুখে পদাঘাত করে দরবেশের জীবন যাপন করতে শুরু করলেন। হযরত আবু যরকে দেখুন, কি বিপ্লবী উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়ে কা’বার সামনে দাঁড়িয়ে জাহেলিয়াতকে চ্যালেঞ্জ করলেন এবং গণপিটুনি খেলেন। কা’ব ইবনে মালেক ও আবু খাসিমার অবস্থা দেখুন। লুবাইনা ও সুমাইয়ার মতো ক্রীতদাসির বৈপ্লবিক বীরত্ব ও মনোবল দেখুন। মাগের বিন মালেক আসলামি ও গামেদি গোত্রের মহিলাটির দিকে লক্ষ্য করুন। নাজ্জাশীর দরবারে জাফর তাইয়ারের বীরত্ব থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। ইরানী সেনাপতির দরবারে রবি’ বিন আমেরের বেপরোয়া আলাপচারিতা থেকে প্রেরণা অর্জন করুন। নক্ষত্ররাজির এই সমারোহের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে ঈমানী জ্যোতিতে ঝিকমিক করছেনা?

এহেন ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়েই সেই গোটা সমাজটা গড়ে উঠেছিলো এবং এহেন নেতা কর্মীদের নিয়েই সেই সৎ ও সত্যনিষ্ঠ রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, যার প্রতিটি নির্দেশ জারি হওয়া মাত্রই বাস্তবায়িত হতো। এদিকে মদ খাওয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, ওদিকে তৎক্ষণাৎ ঠোঁটে লাগানো পানপাত্র পর্যন্ত দূরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং উৎকৃষ্ট মানের মদের মটকা ভেঙ্গে রাজপথ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে নারীদের মাথা ও বুক ঢাকার নির্দেশ জারি হয়েছে , ওদিকে তৎক্ষণাৎ ওড়না বানিয়ে ব্যবহার করা শুরু হয়ে গেছে। এদিকে জেহাদের ডাক এসেছে, ওদিকে সঙ্গে সঙ্গেই অল্প বয়স্ক কিশোর পর্যন্ত পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে নিজের জেহাদে যাওয়ার যোগ্যতা প্রমান করার চেষ্টা শুরু করেছে। এদিকে জেহাদের জন্য সাহায্য চাওয়া হয়েছে, ওদিকে ওসমানের ন্যায় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পন্য বোঝাই গোটা উটের বহর এনে হাজির করেছেন, হযরত আবু বকরের ন্যায় ত্যাগী ব্যক্তিগণ গৃহের যাবতীয় সহায় সম্বল আন্দোলনের নেতার সামনে স্তূপ করে রেখে দিয়েছেন এবং এমনকি এক একজন দিন মজুর সারাদিনের শ্রমের মজুরী বাবদ প্রাপ্ত খেজুরগুলো এনে ঢেলে দিয়েছে। এদিকে মোহাজেরদের পুনর্বাসনের জন্য আনসারদের কে সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছে, ওদিকে তার সাথে সাথেই আনসারগণ নিজেদের ঘরবাড়ী, ক্ষেতখামার ও বাগবাগিচা আধা আধি বন্টন করে ভ্রাতৃত্বের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যখন দায়িত্বশীল পদ গুলোতে চাকুরির মনোভাবের উর্দ্ধে উঠে কাজ করার জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারিগণ কে আহ্বান করা হয়েছে, তখন দৈনিক এক দিরহাম ভাতার বিনিময়ে প্রাদেশিক শাসনকর্তার দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। যখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সেনাপতির কাছে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তখন তা এমন নিখুঁত ভাবে করা হয়েছে যে, প্রত্যেক সৈনিক একটা সূচ পর্যন্ত নিজ নিজ সেনাপতির কাছে জমা দিয়েছে। ইতিহাসে এ ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে যে, মাদায়েনের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের একটা অমূল্য রত্ন আমের নামক একজন সিপাহীর হস্তগত হলে তিনি তার কথা ঘুনাক্ষরেও কাউকে জানতে না দিয়ে রাতের আঁধারেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গোপনে নিজ সেনাপতির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এই সব লোকই সেই পুত পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে অপরাধ ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। রসূল সাঃ এর মক্কী জীবনের পুরো এক দশকে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র অভিযোগ আদালতে এসেছিল। এটি ছিল এমন এক নির্মল নিষ্কলুষ সমাজ, যেখানে কোন গোয়েন্দা পুলিশ নিয়োগ করা হয়নি, বরং মানুষের বিবেকই তাদের প্রহরী ও তত্বাবধায়ক রুপে নিয়োজিত ছিল। এই ছিল মুহাম্মদ সাঃ এর বিপ্লব। এ বিপ্লব শুধু বাইরের পরিবেশই বদলে দেয়নি বরং ভেতর থেকে মনমগজকেও পাল্টে দিয়েছে এবং নতুন চরিত্র গড়ে তুলেছে। তাই এই বিপ্লব ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের সমস্ত মৌলিক ও প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সফল হয়েছে এবং এর মাধ্যমে সমকালীন সভ্যতার সংকট থেকে মুক্তির পথ সৃষ্টি হয়।

 

বিশ্বনবীর অসাধারণ আত্মত্যাগ

এ বিপ্লব আরও এক দিক দিয়ে নজিরবিহীন। সেটা হোল, যিনি এই বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন, তিনি যদিও অবর্ণনীয় ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে পূর্ণতা সাধন করেছিলেন, কিন্তু তিনি এর জন্য কোনও পুরষ্কার ও প্রতিদান গ্রহণ করেননি। মানবতার কল্যানের জন্য নিজের সমস্ত সহায় সম্বল অকাতরে বিলিয়ে দিলেন, অথচ তার বিনিময়ে যতটুকু প্রতিদান গ্রহণ করা যুক্তি, আইন, নৈতিকতা ও সমাজরীতি – কোন দিক দিয়েই অন্যায় বা অবৈধ হতো না ,ততটুকু ও গ্রহণ করলেন না। এতবড় কীর্তি ও অবদান রাখার পর সামান্য কিছু বিনিময় গ্রহণ করলে স্বার্থপরতার বিন্দুমাত্র কলঙ্কও তাঁকে স্পর্শ করতোনা। তবু তিনি তা গ্রহণ করলেন না। এমন ত্যাগের তুলনা কোথাও আছে কি? প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটি বিবেচনা করা যাক। রসূল সাঃ নিজের লাভজনক ব্যবসা বানিজ্য কুরবানী করলেন, তা থেকে উপার্জিত সমস্ত পুঁজি এই মহৎ কাজের জন্য উৎসর্গ করলেন। আর যখন সাফল্যের যুগ এলো , তখন অঢের ধন সম্পদ স্বহস্তে বিলি বন্টন করলেন এবং নিজের জন্য ক্ষুধা দারিদ্র ও অনাড়ম্বর জীবন বেছে নিলেন। নিজের পরিবার পরিজনের জন্য একটু সঞ্চয় ও রেখে গেলেন না, এক টুকরো জমিও রেখে গেলেন না, তাদের কোন অর্থনৈতিক অধিকার ও প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন না, তাদের জন্য উত্তরাধিকার সুত্রে কোন স্থায়ী ক্ষমতার গদি রেখে গেলেন না এবং চাকর নকর, পাইক পেয়াদা, রঙ বেরঙের বাহন জন্তু ও বিলাসী সামগ্রী দিয়ে বাড়ী ভরে তুললেন না।

রাজনৈতিক দিক দিয়ে দেখলে দেখা যায় , তিনি নিজের জন্য কোন অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠা করেননি, কারো বিরুদ্ধে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘন করে কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করেননি, এবং নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে উঁচু করে তুলে ধরার জন্য স্বৈরাচারী আইন জারি করেননি। মদীনায় সবসময় তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করতো। ইহুদী ও মোনাফেকদের নিত্য নতুন চক্রান্তের মোকাবেলা করতে হতো। তবুও কাউকে তিনি গ্রেফতার করেননি। কারো চলাফেরার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করেননি। ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণকারী কোন আদেশ জারি করেননি। কোন সংক্ষিপ্ত আদালত বসাননি। আর বেত্রাঘাত করেও কারো চামড়া খসাননি। বরঞ্চ মানুষকে সমালোচনা করার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছেন, ভিন্ন মতো অবলম্বনের স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং তাঁর মহৎ পরামর্শকে গ্রহণ না করারও অধিকার দিয়েছেন। এসব অধিকার কেবল কাগুজে অধিকার ছিলনা। লোকেরা এসব অধিকারকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছে। অনেক সময় রসূল সাঃ নিজের মূল্যবান মত পরিত্যাগ করে ভিন্ন মতকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। কাউকে কোন স্বতন্ত্র সুযোগ সুবিধা দিতে চাইলে নিজের সহযোগীদের কাছে অনুমতি চেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে নিজের জামাই আবুল আস যুদ্ধবন্দী হয়ে এলে তার মুক্তিপণ হিসেবে যয়নব যে হার পাঠান, তা ছিল হযরত খাদিজার (রাঃ) স্মৃতি। ঐ হার ফেরত দেয়ার জন্য রসূল সাঃ সাহাবায়ে কেরামদের অনুমতি চান। অনুরূপভাবে আবুল আসের জিনিস পত্র গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী) হিসেবে হাজির করা হলে তাও তিনি সাহাবাদের অনুমতি নিয়ে ফেরত পাঠান। জা’রানা নামক স্থানে হোনায়েনের যুদ্ধবন্দীদেরকে মুক্ত করার আবেদন জানাতে একটি প্রতিনিধি দল এল এবং রসূল সাঃ এর দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে আবেদন জানালো। ততক্ষনে যুদ্ধবন্দীদের ভাগ বাটোয়ার সম্পন্ন হয়ে গেছে। রসূল সাঃ নিজ গোত্র বনু হাশেমের অংশের বন্দিদের মুক্তি দিতে সম্মত দিলেন। কিন্তু অবশিষ্টদের সম্পর্কে বললেন যে, সাহাবাদের প্রকাশ্য সমাবেশে তোমরা আবেদন জানাও। সাহাবাগণ যখন জানতে পারলেন রসূল সাঃ নিজ গোত্রের অংশের বন্দীদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন, তখন সবাই বন্দীদেরকে ছেড়ে দিলো। এরূপ ক্ষেত্রে তিনি কখনো চাপ প্রয়োগ বা জবরদস্তিমূলক ভাবে কাজ সম্পন্ন করতেন না।

সামাজিক ও বৈঠকি দিক দিয়ে দেখা যায়, তিনি নিজের জন্য সমানাধিকারই পছন্দ করতেন। কোন স্বতন্ত্র মর্যাদা পছন্দ করতেন না। পানাহার, পোশাক পরিচ্ছেদ ও বাসস্থানে নিজের জন্য কোন অসাধারণ বা অভিজাত সুলভ স্বাতন্ত্র সৃষ্টি করেননি। মজলিসে নিজের বসার জন্য কোন স্বতন্ত্র জায়গাও তিনি মনোনীত করেননি। লোকেরা তাঁর সামনে ভক্তি ভরে উঠে দাঁড়াক, কিংবা প্রভু বা স্যার ইত্য্যাদি বলে সম্বোধন করুক তাও তাঁর মনোপুত ছিলনা। যুদ্ধ কালে ও প্রবাসে ট্রেঞ্চ খনন ও মসজিদ নির্মানের জন্য সঙ্গীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাটি কাটা , মাটি তোলা , পাথর ভাঙ্গা ও কাঠ চেরাইয়ের কাজ তিনি স্বহস্তেই করতেন। পাওনা পরিশোধের জন্য তাঁর উপর কঠোর ভাষা প্রয়োগ করতে ঋণ দাতা যাতে কুন্ঠিত না হন, সে জন্য তাকে তিনি অনুমতি দিতেন। এমন কি প্রকাশ্য জনসমাবেশে নিজেকে প্রতিশোধ গ্রহনের জন্য উপস্থাপন করেন এবং বলেন, আমি কারো উপর কোন জুলুম করে থাকলে সে যেন এসে আমার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করে।

 

আমাদের অবস্থান কোথায়?

এই ছিল রসূল সাঃ এর সূচিত মহান বিপ্লব। আমাদেরকে এই বিপ্লবেরই প্রহরী ও তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়েছে। এটি ছিল সেই মহান বাণী, যার জন্য আমাদেরকে ‘মানবজাতির’ কাছে ‘সাক্ষী’ এবং ‘মধ্যমপন্থী উম্মাহ’ বানানো হয়েছে। এ পদটা হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ পদ। এই ছিল সেই সত্য কালেমা, যার দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। ন্যস্ত করার উদ্দেশ্য রসূল সাঃ এর প্রতিনিধি হিসেবে আমরা যেন কেয়ামত পর্যন্ত মানবতার মুক্তিদূত হই। যখনই মানব জীবন সমস্যা ও সংকটে পতিত হবে এবং মানব সভ্যতা ঘোরতর অরাজকতার কবলে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন যেন আমরা তার সহায়ক হই। কিন্তু কার্যত আমরা তা হতে পারিনি। এই সত্য কলেমার মশাল প্রজ্জ্বলিত রাখতে আমরা উদাসীনতা দেখিয়েছি এবং আমরা নিজেদের হাতেই এই সত্য বিধানের সর্বনাশ সাধন করেছি। এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, এ যুগের চিন্তাশীল মহল যখন বিপথগামী হতে আরম্ভ করলো, তখন আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করার যোগ্য থাকলাম না। আর আজ আমাদেরই অযোগ্যতা ও অক্ষমতার কারণে গোটা মানবজীবন সংকট ও অরাজকতার শিকার। পরস্পর বিরোধী বস্তুবাদী মতবাদ সমূহের সৃষ্ট দ্বন্দ্ব সংঘাত বিশ্ববাসীর মানসিক শান্তি বিনষ্ট করে চলেছে। বিশ্ব নেতৃত্ব আল্লাহ বিমুখ শক্তির হাতে নিবদ্ধ এবং আমরা এখন এই সব শক্তিরই মুখাপেক্ষী হয়ে গিয়েছি। প্রতিকূল অবস্থার সাথে প্রতিনিয়ত ঠোকর খেয়েও আমরা সম্বিত ফিরে পাইনি। ক্রমাগত অবমাননা ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েও আমাদের মধ্যে অনুতাপ ও অনুশোচনার সৃষ্টি হয়নি। মুসলিম বিশ্বের কলহ কোন্দল ও বিবাদ বিসম্বাদ এবং মানবতার শোচনীয় দুর্যোগ দুর্বিপাক দেখেও আমরা এই আসল করণীয় কাজটির প্রতি মনোযোগী হতে পারিনি।

আসুন বিচার বিবেচনা করে দেখি, মানব জাতি এখন ইতিহাসের কোন্ স্তর অতিক্রম করছে এবং আমাদের অবস্থানটা কোথায়?

আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনকালে নিজেকে, নিজের সন্নিহিত পরিবেশের মানুষকে এবং গোটা দুনিয়ার মানুষকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে এক ধরণের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা, সংকট ও ভীতি জনিত পরিস্থিতির শিকার দেখতে পেয়েছি। গৃহ থেকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ পর্যন্ত সর্বত্র অন্যের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ, উত্তেজনা, অবনিবনা, দ্বন্দ্ব কলহ, ও সংঘাতের পরিবেশ বিরাজ করতে দেখেছি। এই গোটা সময়টা জুড়ে আমার মনে হয়েছে যেন ইতিহাস জ্বলন্ত চুলোর ওপরের ফুটন্ত হাড়ির ন্যায় ক্রমাগত উদ্বেলিত হচ্ছে। এই হাড়িতে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ন্যায় আমিও যেন একটা ক্ষুদ্র চাল বা ডালের ন্যায় ওলট পালট হচ্ছি। আমাদের এই পৃথিবী পর পর দুটো বিশ্ব যুদ্ধে পিষ্ট হয়ে এবং অসংখ্য আঞ্চলিক যুদ্ধে দলিত মথিত হয়ে এখনো সামলে উঠতে পারেনি। অথচ আরো একটা প্রলয়ংকারী যুদ্ধের তরবারী তার মাথার ওপর ঝুলছে। এই ক্ষুদ্র সময়ে কত যে ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা চোখে পড়লো, কত যে অভ্যুত্থানের প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে যেতে দেখলাম, কত যে সম্রাজ্যের পতন ও আবির্ভাব ঘটতে দেখলাম, কত যে মতবাদের সংঘাত, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত হতে দেখলাম, কত দেশ ও অঞ্চলকে খন্ড বিখন্ড হতে এবং লক্ষ কোটি জনতাকে বাস্তুচ্যুত হতে দেখলাম,তার ইয়ত্তা নেই। খোদ এই উপমহাদেশে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে মাথার ওপর দিয়ে রক্তের সয়লাব বয়ে যেতে দেখেছি, আর এই সয়লাবে মানুষের জানমাল সম্ভ্রম এবং মূল্যবান ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে ভেসে যেতে দেখেছি।

বিশ্বব্যাপী চলমান জড়বাদী সভ্যতার জমকালো পর্দার আড়ালে উঁকি দিয়ে দেখলে মানবতার এমন শোচনীয় দৃশ্য চোখে পড়ে যে, মানুষ মাত্রেরই আত্মা কেঁপে ওঠে। সমগ্র মানবজাতি গুটিকয় কামনা বাসনার অক্টোপাস বন্ধনে আবদ্ধ। সর্বত্র সম্পদ ও গদির জন্য যুদ্ধ চলছে। মনুষ্যত্বের নৈতিক চেতনার দীপ শিখা নিভে গেছে। নগর সভ্যতার উন্নয়নের সাথে সাথে অপরাধ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বেড়ে চলেছে। মনস্তাত্বিক অস্থিরতা প্রবল হয়ে উঠেছে এবং মানসিক শান্তি একেবারেই উধাও হয়ে গেছে। মানুষের মনমগজে ও চরিত্রে এমন মৌলিক বিকৃতি জন্ম নিয়েছে যে, জীবনের কোন দিক এ ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। দর্শন থেকে সত্যের প্রাণশক্তি বেরিয়ে গেছে। আকীদা বিশ্বাস ও মতাদর্শগুলো ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আধ্যাত্মিক মূল্যবোধগুলোর বিলুপ্তি ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় আইন কানুনে ন্যায় বিচারের অস্তিত্ব নেই। রাজনীতিতে সেবামূলক মানসিকতার পরিবর্তে স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা ঢুকে পড়েছে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে শোষক ও শোষিত নামে দুটি শ্রেণী জন্ম নিয়েছে। ললিত কলায় সৌন্দর্যের যে সব বিচিত্র প্রকাশভংগি রয়েছে, তার সবগুলোকে যৌন সুড়সুড়ি ও অরুচিকর ভাবভংগি দিয়ে ভরে তোলা হয়েছে। সভ্যতার জগতে সর্বত্র পরস্পর বিরোধিতা ও সংঘাত বিরাজ করছে এবং গোটা ইতিহাস একটা ভয়াল নাটকে পরিণত হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিমানদের নির্বুদ্ধিতা এখনো আমাদেরকে নিদারুণ কষ্ট দিয়ে চলেছে। জ্ঞান বিজ্ঞানের কত নতুন নতুন শাখা আবিস্কৃত হচ্ছে। কিন্তু এর লালিত অজ্ঞতা ও মূর্খতা আদম সন্তানকে অতিষ্ট করে তুলেছে। অঢেল ধন সম্পদ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। অথচ মানুষ ক্ষুধা ও বঞ্চনার আযাব ভোগ করে চলেছে। হাজারো রকমের সংগঠন, রাজনৈতিক সংস্থা, আদর্শগত ঐক্য ও চুক্তিভিত্তিক বন্ধন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নেই, আছে কেবল হিংস্র জন্তু সুলভ সম্পর্ক। বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার উন্নয়নের পক্ষে অনেক গালভরা বুলি আওড়ানো হয়। অথচ নির্যাতন ও নিপীড়নের চরম হঠকারী ও ঘৃণ্য কৌশল মানব জাতির বিরুদ্ধে আজও বাস্তবায়িত হচ্ছে। গোটা পৃথিবী আজ এক মল্লযুদ্ধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। কোথাও সাম্রাজ্যবাদ ও স্বাধীনতা প্রেমিকদের মধ্যে, কোথাও কম্যুনিজম ও পুঁজিবাদের মধ্যে, কোথাও গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে, কোথাও ব্যক্তি ও সামষ্টিকতার মধ্যে এবং প্রাচ্যবাদ ও পাশ্চাত্যবাদের মধ্যে ঘোরতর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে।

এহেন পৃথিবীতে আমরা জীবন যাপন করছি। কৃত্রিম উপগ্রহ ও ক্ষেপণাস্ত্রের এই যুগে বিজ্ঞান আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের আজ্ঞাবহ জিনের মত মানুষের এক এক ইশারায় বস্তুগত শক্তি নতুন নতুন ভান্ডার প্রতিনিয়ত সরবরাহ করে চলেছে। স্মরণাতীত কাল থেকে অর্গলবদ্ধ প্রকৃতির গুপ্ত রহস্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চাবি দিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে। বিস্ময়কর দ্রুতগতি সম্পন্ন যানবাহন ও যোগাযোগ যন্ত্র মানুষকে স্থান ও কালের ওপর ব্যাপকতার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিচ্ছে। আনবিক শক্তি সর্বনাশা দানবদের এক বিরাট বাহিনীকে বশীভূত করে মানুষের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখছে। তারা কেবল একটা চোখের ইশারার অপেক্ষায় রয়েছে। অপর দিকে স্বয়ং মানুষের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে যে, সে শয়তানী শক্তি ও নাশকতাবাদী শক্তি সমূহের মুঠোর মধ্যে আগের চেয়েও বেশি অসহায় অবস্থায় রয়েছে। এই শক্তিগুলো তাকে বারবার নিজেরই বিরুদ্ধে লড়াই করতে উস্কে দিয়ে আসছে। এসব শক্তি যুগে যুগে তার বড় বড় কীর্তিগুলোকে এবং তার চমকপ্রদ সভ্যতাগুলোকে স্বয়ং তারই হাত দিয়ে ধ্বংস করিয়ে ছেড়েছে।

এমন একটা কাফেলার কথা কল্পনা করুন, যে কাফেলা একটা পাহাড়ের চূড়ার ওপর শিবির স্থাপন করেছে। জমকালো শামিয়ানার নীচে তারা পাহানারে, নাচগানে ও মদ্যপানে বিভোর। অধিকন্তু তাদের কাছে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য, নগদ অর্থ, যানবাহন ও গবাদিপশুও রয়েছে। অথচ তাদের শিবিরের মেঝের মাত্র কয়েক ফুট নীচে এক ভয়ংকর আগ্নেয়গিরি লাভা উদগীরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটু পরেই গোটা পাহাড় বিস্ফোরিত হবে এবং দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠে সব কিছুকে ভস্মীভূত করে দেবে। আমাদের বর্তমান সভ্যতার কাফেলাটির অবস্থা অনেকটা এ রকম। ইতিহাসের বর্তমান পর্যায়ে যে পাহাড়ের ওপর তার অবস্থান, তার অভ্যন্তরে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট ও দুর্যোগের লাভার উদগীরণ আসন্ন।

অদৃষ্ট আমাদেরকে এক বিরাট বিশ্ব সংকটের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। এ সংকট থেকে পাশ কাটিয়ে পেছনে পালানোর সুযোগ নেই। আর এ চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়ার যোগ্যতাও বর্তমান সভ্যতার ও তার নির্মিত মানুষের নেই। নতুন কোন দর্শনেরও উদ্ভব হচ্ছে না, যা অন্তত সাময়িক সান্ত্বনার উপায় হতে পারে। কোন দিকেই কোন পথ উন্মুক্ত হবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

অস্থিরতার এই ক্রান্তি লগ্নে আমি যখন চার দিকে দৃষ্টি দিই, তখন দেখি অন্ধকারের এক অথৈ সমুদ্র সর্বদিক থেকে আমাকে ঘেরাও করে রেখেছে। এই মহা সমুদ্রে অনেক দূরে, চৌদ্দ শো’ বছরের দূরত্বে, একটা উজ্জ্বল আলোর বিন্দু জ্বল্ জ্বল্ করতে দেখতে পাই।

এটা আর কিছু নয়-মানবতার সবচেয়ে বড় বন্ধু, সবচেয়ে বড় অনুগ্রাহক, এবং সবচেয়ে বড় ত্রাণকর্তা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর মশাল। এটা সেই প্রদীপ যার জ্যোতিকে আমরা তাঁর উম্মাত হয়েও নিজেদের উদভ্রান্ত চিন্তা ও উচ্ছৃংখল কর্মের আবর্জনার মধ্যে হারিয়ে বসে আছি।

 

সীরাত অধ্যয়নের দৃষ্টিভংগি

আমার মতে, রসূল সা. এ জীবনী অধ্যয়নের উদ্দেশ্য একটাই। সেটি হলো, রসূলের সা. বাণীর মশাল আর একবার আমাদেরকে ও সমগ্র বিশ্ববাসীকে আলোকিত করুক। মানব সমাজ এ যুগের অন্ধকারের মধ্যে সেই মুক্তিরে পথের সন্ধান পাক, যেমন পেয়েছিল খৃষ্ঠীয় ৬ষ্ঠ শতাব্দীর সংকট উত্তরণের পথ।

দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এই ইপ্সিত দৃষ্টিভংগী ও প্রেরণা নিয়ে রসূল সা. এর জীবনী অধ্যয়ন করতে খুব কমই সফল হচ্ছি। রসূলের জীবনী থেকে জীবন যাপনের একটা পদ্ধতি খুঁজে নিয়ে তদনুসারে জীবনকে গড়ে তুলতে হবে-এরূপ মনোভাব দ্বারা আমরা উদ্বুদ্ধ হচ্ছি না; বরং এর মাঝে অন্যান্য মনোভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং তা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।

এমন মুসলমানদের সংখ্যা নেহাত কম নয় যারা শুধু সওয়াব হাসিল করার জন্যই সীরাত তথা রসূলের সা. জীবনী চর্চার আগ্রহ পোষণ করে থাকে। (অবশ্য রসূল সা. এর নৈকট্য অর্জনের প্রতিটি চেষ্টাই যে আল্লাহর কাছে প্রিয় এবং তার জন্য সওয়াব পাওয়ার আশা করা উচিত, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এ ধরণের প্রতিটি চেষ্টার উদ্দেশ্য যে জীবনকে আরো সুন্দর করে সাজানোও হওয়া উচিত, তা কেমন করে অস্বীকার করা যায়?) খুবই ধুমধামের সাথে মীলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা এরূপ বিশ্বাসের ভিত্তিতে করা হয়ে থাকে যে, ঐ সব মাহফিলে রসূল সা. এর জ্যোতির্ময় আত্মা উপস্থিত হয় এবং ভক্তদের ভক্তি ও ভালোবাসার প্রকাশ দেখে প্রীত হয়। কোথাও মিষ্টি মন্ডা বিতরণ, কোথাও ফুলের ছড়াছড়ি, কোথাও আগরবাতি ও আতর-লোবানের মাত্রাতিরিক্ত ছড়াছড়ি, এবং কোথাও বিচিত্র আলোক সজ্জা দ্বারা উক্ত বিশ্বাসেরই অভিব্যক্তি ঘটে। মীলাদুন্নবী বা সীরাতুন্নবীর প্রতি এ ধরণের ভক্তির বাড়াবাড়িতে যে ভাবমূর্তি প্রতিফলিত হয়, তা কোন রক্তমাংসের তৈরী মানুষের ভাবমূর্তি নয়, বরং এক অতি মানবিক জ্যোতির্ময় সত্তার ভাবমূর্তি। এ সত্তার দেহের কোন ছায়া থাকেনা, তাঁর যাবতীয় কর্মকান্ড মোজেযা তথা অলৌকিক ও অতি প্রাকৃতিক, তাঁর সমস্ত কাজ ফেরেশতারা সমাধা করে, এবং তাঁর প্রতিটি জিনিস রহস্যময়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, রসূল সা. এর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা সমগ্র মানবজাতির চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাঁর জীবনে অতি প্রাকৃতিক অনেক কিছু ছিল, তাঁর বহু মোজেযাও ছিল। অনেক সময় ফেরেশতারাও তাঁর সাথে নানা কর্মকান্ডে শরীক হতো। কিন্তু এ কথা মানতেই হবে যে, তাঁর এই পুণ্যময় জীবন একজন মানুষেরই জীবন। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কারণই এই যে, মানুষ হয়েও তিনি এমন অতুলনীয় জীবনের নমুনা পেশ করেছেন। প্রাকৃতিক নিয়ম এবং সমাজ ও সভ্যতার রীতিনীতির আওতার মধ্যেই তাঁর যাবতীয় কাজ সম্পন্ন হতো। আর সাফল্যের পথের প্রতি ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে কুরবানী ও আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হতো। সে জীবন একজন মানুষের জীবন ছিল বলেই তা আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে রয়েছে এবং এই সুবাদেই তাঁর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় আদর্শ রয়েছে। তিনি আমাদের মত মানুষ ছিলেন বলেই তাঁর কাছ থেকে আমরা দৃঢ়তা ও সাহসিকতার শিক্ষা নিতে পারি, নীতি ও আদর্শের আনুগত্য এবং দায়িত্ব সচেতনতার শিক্ষা নিতে পারি, মানবতার সেবার প্রেরণা সঞ্চয় করতে পারি, এবং দুস্কৃতিকারী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য একটা জোরদার উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারি। রসূলের জীবনীকে যদি পুরোপুরি মোজেযায় পরিণত করা হয় এবং তাকে একটা অতিমানবিক কীর্তিতে রূপান্তরিত করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষদের জন্য তাতে আদর্শ কী থাকবে? এ ধরণের ব্যক্তিত্বের সামনে মানুষ হতবুদ্ধি ও অভিভূত হয়ে যেতে পারে, কিন্তু নিজের মধ্যে তার কোন প্রভাব প্রতিফলিত করতে পারেনা। তার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধা পোষণ করতে পারে, কিন্তু তার অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পারেনা। এ জন্যই দেখা যায়, যেখানে যেখানে এই বিশেষ ধরণের ভক্তির উদ্ভব হয়েছে এবং যেখানে এটা যত গভীর হতে থাকে, সেখানে বাস্তব জীবন নবীর অনুসরণ থেকে ততই মুক্ত হতে থাকে। এমনকি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে, জঘন্যতম সামাজিক অপরাধে যারা লিপ্ত, তারা এরূপ সস্তা ভক্তি মহড়া দেখিয়ে নিজেদের অস্থির চিত্তকে এই বলে খানিকটা সান্ত্বনা দেয় যে,

‘‘আমরা যা-ই হয়ে থাকিনা কেন, তোমার প্রিয় নবীর উম্মাতের অন্তর্ভু্ক্ত।’’

অপরদিকে আমাদের সমাজে পাশ্চাত্য থেকে আসা অন্য একটা প্রবণতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যাকে বলা হয় ব্যক্তিপূজা। এ প্রবণতা মূলত জাতীয়তাবাদী মনোভাব ও প্রেরণা থেকে উৎসারিত। এটা এক ধরনের জাতীয় অহমবোধের প্রকাশ, যা অন্যদের সামনে নিজেদের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের প্রদর্শনী করায়। এ প্রবণতার বক্তব্য হলো, দেখ, আমাদের কাছে কত বড় বড় ব্যক্তিত্ব রয়েছে, আমাদের ইতিহাসে কত বড় বড় মর্যাদাবান নেতা অতিক্রান্ত হয়েছেন, এবং তারা অমুক অমুক স্মরণীয় কীর্তি রেখে গেছেন, যা আমাদের গৌরবজনক উত্তরাধিকার। এই প্রবণতার আলামত হলো, এগুলো সব সময় অন্তসারশূণ্য হয়ে থাকে। এর আওতায় বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের জন্ম দিবস, মৃত্যু দিবস এবং অন্যান্য স্মরণীয় দিন অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে উদযাপন করে থাক। অথচ এ দিনগুলো কোথাও ঐ সব মহান ব্যক্তিত্বের জীবন থেকে জাতির শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ এনে দেয়না। মানবতার নমুনা স্বরূপ যে সব ব্যক্তিত্বকে অত্যন্ত গর্বের সাথে তুলে ধরা হয়, তাদের নীতি ও আদর্শের কোন ছাপ উদযাপনকারীদের জীবনে দেখা যায়না এবং এরূপ ছাপ গ্রহণ করার কোন আগ্রহও পরিলক্ষিত হয়না। এই প্রবণতার অধীন রসূল সা. এর স্মৃতি জাগরুক করার জন্য যেসব উৎসবাদি পালন করা হয়, সেখানেও সব সময় একই ধরণের কথাবার্তা বলা হয়ে থাকে। অথচ বক্তা ও উদ্যোক্তাদের জীবনে তার কোন প্রভাব চোখে পড়েনা।

তৃতীয় ভ্রান্ত দৃষ্টিভংগি হলো, রসূল সা.-এর বাণীকে একটা পূর্ণাংগ জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তে অন্যান্য ধর্মের ন্যায় একটা ধর্ম মনে করা। এই দৃষ্টিভংগী দ্বারা যারা প্রভাবিত, তাদের ধারণা হলো, রসূল সা. কেবলমাত্র কিছু আকীদা বিশ্বাস, কয়েক প্রকারের আনুষ্ঠানিক এবাদত, কিছু দোয়াকালাম, কিছু নৈতিক উপদেশ এবং কিছু আইনগত নির্দেশ পৌঁছিয়ে দেয়া বা শিখিয়ে দেয়ার জন্য এসেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন কিছু মানুষ তৈরী করা, যারা ব্যক্তিগতভাবে মুসলমান সুলভ বেশভূষা ধারণ করবে, অথচ যেখানে যত নোংরা সমাজ ব্যবস্থাই চালু থাকনা কেন, তারা তার সর্বোত্তম কর্মী সাব্যস্ত হবে। এ ধরণের লোকেরা রসূল সা. এর কাছ থেকে শুধু নামায, রোযা, নফল কাজ, যিকির, এবং ব্যক্তিগত চরিত্র ও আচরণের শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু সামষ্টিক জীবনের ব্যাপকতর কর্মকান্ডে তারা একেবারেই নির্দ্বিধায় প্রত্যেক বাতিল শক্তির সহায়ক হয়ে যায় এবং সবধরণের অপকর্মের সাথে সহযোগিতা করে। তারা রসূল সা. এর জীবনীর পবিত্র পুস্তকের অসংখ্য সোনালী অধ্যায়কে ভুলে কেবল একটি অধ্যায়ের মধ্যে এমনভাবে মনোনিবেশ করে যে, সেখানেই তারা হারিয়ে যায়। এই গোষ্ঠটি এ যাবত রসূল সা. এর অনুকরণের যে নমুনা পেশ করেছে, তা দেখে কোন অমুসলিম তো দূরের কথা, কোন শিক্ষিত মুসলিম যুবক পর্যন্ত ভাবতে পারেনা যে, রসূল সা. তাদের নেতা হতে পারেন এবং তাঁর কাছ থেকে সাম্প্রতিকতম কঠিন সমস্যাবলীর কোন সন্তোষজনক সমাধান পাওয়া যেতে পারে। এই দৃষ্ঠিভংগিও রসূল সা.-এর সত্তার সঠিক উপলব্ধি ও তার আদর্শের অনুসরণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব ভ্রান্ত দৃষ্ঠিভংগী টিকে থাকতে পারার একমাত্র কারণ হলো,পরিবেশ এরই অনুকূল। যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আমাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে, তার জন্য একটা বিশেষ ধরণের মানুষ প্রয়োজন। এটা এমন একটা কারখানা, যার জন্য বিশেষ ধরণের যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। এ সমাজ ব্যবস্থা তার সদস্যদের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের চরিত্র দেখতে চায়। এ কার্যকলাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের মানসিকতা ও চরিত্র সম্পন্ন লোকদের দ্বারাই সম্পন্ন হতে পারে। অন্যকথায় বলা যায়, এখনকার বাস্তব কর্মকান্ডে মানবতার সেই মডেলের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই, যা মুহাম্মাদ সা.-এর জীবন চরিতে প্রতিফলিত হয়। এখনকার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় সেই চিন্তা ও কর্মের কোনই চাহিদা নেই, যা রসূল সা. এর জীবন থেকে গৃহীত হয়ে থাকে। বর্তমান দুনিয়ার সামষ্টিক ব্যবস্থায় যে ধরনের মন্ত্রী, আমলা, বিচারক, উকিল, নেতা, সাংবাদিক, সেনাপতি, সৈনিক, কোতোয়াল, পেয়াদা, তহশীলদার, প্রশাসন, জমিদার, কৃষক, লেখক, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক মজুরের চাহিদা রয়েছে,তাদের মানবিক মান সেই মানুষদের মানবিক মানের সম্পূর্ণ বিপরীত, রসূল সা. যাদেরকে তৈরি করে ইতিহাসের মঞ্চে প্রদর্শন করেছিলেন। আজকের পিতামাতা ঘরে ঘরে যে সন্তান স্নেহে আদরে লালন পালন করে গড়ে তুলছে, তা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার চাহিদার আলোকেই গড়ে তুলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পনেরো বিশ বছর ধরে যে এক কোটি মানুষ তৈরি করছে, তা চলমান সমাজের প্রয়োজন মোতাবেকই তৈরি করছে। চলমান সমাজের দাবী অনুসারেই প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তি নিজের চরিত্র ও মানসিকতাকে একটা বিশেষ রুপ দানের কাজে সারা জীবন নিয়োজিত থাকে। এই সমাজ ব্যবস্থা যে যে জিনিসকে ভালবাসে, সেই সেই জিনিসই সমাজ তার সদস্যদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করতে থাকে। আর যে যে জিনিসকে সে অপসন্দ ও ঘৃণা করে, পরিবেশের সকল উপকরণ সর্বশক্তি দিয়ে তাকে উত্খাত ও নিশ্চিহ্ন করতে সচেষ্ট থাকে। চলমান সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যে ধরনের বুলি ভালবাসে, সে বুলি আপনা থেকেই সকলের মুখে মুখে চালু হয়ে যায়। সে যে পোষাক ভালবাসে, সে পোষাক স্বতস্ফূর্তভাবে সকলের পরিধানে শোভা পেতে থাকে। এর এক ইশারায় প্রাচীন লজ্জাশীল পরিবারের বৌ ঝিদের মুখমন্ডল থেকে পর্যন্ত নিকাব উঠে যায়। চলমান সমাজ যাকে সম্মানজনক আচরণ বলে চালাতে চায়, সেটাই সম্মানজনক বিবেচিত হয়। আর চলমান সমাজ যাকে অপসন্দ করে সেটাই বিবেচিত হয় অবাঞ্ছিত, অসম্মানজনক। যে শিল্প-কলাকে সে পসন্দ করে, সেটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে, আর যে সব কর্মকান্ডকে সে প্রত্যাখান করে, তা হয়ে যায় সবার উপেক্ষিত। এ সমাজ নিজের মূল্যবোধ নিজেই তৈরি করে এবং সকলকে তা মেনে নিতে বাধ্য করে। আর অন্যসব মূল্যবোধ ও এতিহ্য হয়ে যায় ম্রিয়মান ও নির্জীব। কিছু কিছু আত্মাভিমানী ব্যক্তি ও পরিবার পরিবেশের বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু অর্থনৈতিক বঞ্চনা সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ও হীনমন্যতার চাপ এত প্রবল হয়ে থাকে যে, কালক্রমে তারা নিস্তেজ হয়ে পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে থাকে। আর তারা আত্মসমর্পণ না করলেও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হতোদ্যম হয়ে পড়ে। এভাবে সচেতনভাবেই হোক কিংবা অবচেতনভাবেই, গোটা পৃথিবীটাই যখন পরিবেশের দাবী অনুসারে নিজের জীবন ও চরিত্র গঠনে নিয়োজিত, তখন সেই পৃথিবী যদি রসূলের জীবনী নিয়ে হাজারো বই পুস্তকও রচনা করে এবং ওয়ায নসিহতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও করে, তবে তাঁর সুমহান আদর্শ অনুসরণের উদ্দীপনা জনগণের মধ্যে আসবে কোথা থেকে?

প্রকৃত ব্যাপার হলো, যারা কোন অনৈসলামিক ব্যবস্থার সাথে আপোষ রফা করে নেয় এবং বাতিল শক্তির সাথে যাদের স্বার্থের ব্যাপারে সমঝোতা হয়ে যায়, তাদের জন্য রসূলের জীবনীতে কোন শিক্ষাই নেই। সীরাতের গ্রন্থাবলী পড়ে তারা হয়ত মাথা দোলাবে,মানসিক আনন্দ ও তৃপ্তি পাবে। তাদের জ্ঞানও হয়তো বাড়বে,কিন্তু রসূলের সীরাত বা জীবনীর আলোকে আপন জীবন গড়ে তোলার প্রেরণা তারা কোথা থেকে পাবে? তাদের জড়তা ও স্থবিরতা দূর হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু আমার বক্তব্য এই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন বৃত্তান্ত কোন সোহরাব রোস্তমের কাহিনী নয়, আরব্য উপন্যাসের উপাখ্যানও নয়, এবং কোন কিংবদন্তির নায়কের কল্পকাহিনীও নয়। তাঁর অবস্থান কখনো এত নিম্নে নয় যে,তাঁকে আমরা নিছক বিনোদনমূলক সাহিত্য চর্চা বা বিদ্যা চর্চার একটা উপকরণ বানিয়ে রাখবো। তাঁর মূল্য ও মর্যাদা এত উঁচু যে, তা আমাদেরকে নিছক মানসিক তৃপ্তি লাভের জন্য সীরাতকে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়না। তাঁর প্রতি আমাদের প্রগাঢ় ভক্তি ও শ্রদ্ধা, তাঁর জীবনেতিহাসকে নিছক জাতীয় গৌরব বোধের বাসনা চরিতার্থ করার মাধ্যম বানাতেও আমাদেরকে বাধা দেয়।

এই সব রকমারি ভ্রান্ত দৃষ্টিভংগী আমাদের সমাজে মিলিতভাবে সক্রিয় রয়েছে এবং এগুলো আসল লক্ষে উপনীত হবার পথে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। প্রতি বছর কত শত মীলাদুন্নবী ও সীরাতুন্নবীর সভা ও মাহফিল আমাদের দেশে অনুষ্ঠিত হয়, কে তার হিসাব রাখে? একমাত্র রবিউল আওয়াল মাসেই কত যে ওয়ায নসিহত ও বক্তৃতায় আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়, কত বইপুস্তক ও নিবন্ধ লেখা হয়, কত পত্র পত্রিকায় বিশেষ সংখ্যা এই বিষয়ে প্রকাশিত হয়, কবিরা কত বিপুল সংখ্যক কবিতা ও না’ত গযল লেখেন, গায়করা কত যে সভা-সমিতিতে কত না’ত, গযল ও কাওয়ালী গেয়ে বেড়ান, নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্রনায়কদের পক্ষ থেকে কত যে বানী ও বিবৃতি প্রচারিত হয়, কত মিষ্টি বিতরণ ও কত জাঁকজমকের ভোজের আয়োজন হয় এবং তোরণ নির্মাণ ও বর্ণাঢ্য মিছিল সমাবেশের আয়োজনে কত টাকা যে খরচ হয়, কে রাখে তার হিসাব? [কোন কোন অঞ্চলে রসূল (সা) এর মীলাদ ও সীরাত উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানাদিতে আমোদ উল্লাস ও বিনোদনের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এমনকি খোলাখুলি গুনাহর কাজ এবং হাংগামা ও হট্টগোল পর্যন্ত সংঘটিত হচ্ছে। এর অর্থ হলো সমাজ নবী জীবনের শিক্ষা ও আদর্শের ঠিক বিপরীত দিকেই যাত্রা শুরু করেছে।]

কিন্তু অন্যদিকে এটাও দেখা দরকার যে,একটা মহৎউদ্দেশ্যে শক্তি ও অর্থের এই বিপুল ব্যযের সত্যিকার ফল ও স্বার্থকতা কী দাঁড়াচ্ছে? পর্যালোচনার এক পাল্লায় প্রতি বছরের এই সব তৎপরতাকে রাখুন, আর অপর পাল্লায় অর্জিত ফলাফল রেখে যাচাই করুন যে, সঠিক ফল পাওয়া যাচ্ছে কিনা? এই সব মহৎ কর্মকান্ড দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নবী জীবনের অনুকরণে আপন জীবন গড়া ও তাতে পরিবর্তন ও সংশোধন আনার সাধনায় প্রতি বছর কতজন আত্মনিয়োগ করে থাকে? এক একটা সভা সমাবেশ, এক একটা প্রবন্ধ, ও এক একটা না’ত বা গযল দ্বারা যদি মাত্র এক একজন লোকের মধ্যেও পরিবর্তন আসতো, তাহলে অনুমান করুন যে, বিগত দুই-আড়াইশো বছরে আমাদের কতখানি সুফল অর্জিত হতে পারতো। সেই ইপ্সিত সাফল্য যদি অর্জিত না হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের চেষ্টায় কোন ত্রুটি অবশ্যই রয়েছে এবং সে ত্রুটি অত্যন্ত মৌলিক ধরনের। দু:খ শুধু এজন্য নয় যে, ইপ্সিত সুফল অর্জিত হয়নি। বরং আমাদের সমাজে রসূল সা. এর আদর্শ ও কীর্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী এক অশুভ প্রবণতার প্রাদুর্ভাব ঘটতে দেখে বিলাপ করতে ইচ্ছা হয়। আমাদের সমাজে আজ এমন মানুষও জন্ম নিচ্ছে, যারা রসূল সা. এর আদর্শকে এ যুগের জন্য অচল ও অকার্যোপযোগী বলে আখ্যায়িত করছে। রসূল সা. এর শিক্ষা নিয়ে উপহাস করছে, সীরাত, সুন্নাহ ও হাদীসের সমগ্র ভান্ডারকে বর্জন করার আহ্বান জানাচ্ছে। এ যারা কুরআন উপস্থাপনকারীর ২৩ বছর ব্যাপী অবিস্মরণীয় আন্দোলন ও সংগ্রাম থেকে কুরআনকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে এবং রসূল সা. এর সত্তাকে আদর্শ ও পূর্ণাংগ মানুষের একটি বাস্তব নমুনা হসাবে আমাদের দৃষ্টিপথ থেকে উধাও করে দিতে চাইছে। আরো পরিতাপের বিষয়, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, বাক স্বাধীনতা ও মুক্ত বুদ্ধি চর্চার নামে করআন ও হাদীসের প্রত্যক্ষ জ্ঞান থেকে বঞ্চিত এক শ্রেণীর ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীর পক্ষ থেকে রসূল সা. এর ব্যক্তিত্ত, আদর্শ ও অবদানকে চলমান বিকারগ্রস্ত সভ্যতার চিন্তাগত কাঠামোর সাথে সংগতিশীল প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে এবং প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব শক্তিসমূহের অভিরুচি অনুসারে রসূল সা. এর সম্পূর্ণ নতুন ভাবমূর্তি প্রস্তুত করার ধৃষ্ঠতা দেখানো হচ্ছে। আমি যতদূর পড়াশুনা ও চিন্তা গবেষণা করেছি তা থেকে আমার এই উপলদ্ধি জন্মেছে যে, আমরা সীরাত অধ্যযনের নির্ভূল মৌলিক দৃষ্টিভংগী হারিয়ে ফেলেছি এবং উপরোক্ত ভ্রান্ত দৃষ্টিভংগীই আমাদের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে। এ জন্যই রসূল সা. এর প্রতি অগাধ ভক্তি ও ভালবাসার অসংখ্য প্রমাণ ও আলামত থাকা স্বত্তেও এবং তাঁর জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে প্রচুর চিন্তা গবেষণা চালানো সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বের পূর্ব গগন থেকে সেই রকম নতুন মানুষের আবির্ভাব এখনও ঘটছেনা, যার পূর্ণাংগ নমুনা রসূল সা. জগদ্বাসীকে দেখিয়েছিলেন।

রসূল সা. এর জীবন চরিত আমাদের মধ্যে তার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পারে কেবল তখনই, যখন আমরা রসূলের সমগ্র জীবন যে মহান কাজ সমাধা করা ও যে লক্ষ্য বাস্তবায়নের সর্বাত্মক সংগ্রামে উৎসর্গিত ছিল, সেই একই লক্ষ্যে একই সংগ্রামে আমাদের জীবনকেও উৎসর্গ করতে পারবো। রসূল সা. যে ধরনের ইসলামী আন্দোলন ও সংগ্রাম পরিচালনা করে গেছেন, একমাত্র সে ধরনের আন্দোলন-সংগ্রামই রসূল সা. এর অনুসারী জীবন গড়ার একমাত্র উপায়। আর সে ধরনের অনুসারী ব্যক্তিত্ব দ্বারাই নতুন করে সফল ইসলামী আন্দোলন গড়া ও পরিচালনা করা সম্ভব।

মুহাম্মদ সা. এর জীবনী নিছক জনৈক ব্যক্তির জীবনী নয়, বরং তা হচ্ছে এমন এক ঐতিহাসিক শক্তির জীবন বৃত্তান্ত, যা একজন মানুষের আকারে আবির্ভূত হয়েছিল। এটা জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এমন কোন দরবেশের কাহিনী নয়, যিনি লোকালয়ের এক প্রান্তে বসে কেবল নিজের সংশোধন ও আত্মগঠনের কাজে নিয়োজিত। বরং এ হচ্ছে এমন এক ব্যক্তির জীবন কাহিনী, যিনি ছিলেন একটা সামষ্টিক আন্দোলনের চালিকা শক্তি। এটা শুধু একজন মানুষের নয়, বরং মানুষ গড়ার এক কারিগরের জীবন কাহিনী। এ জীবন কাহিনীতে রয়েছে এক নতুন বিশ্ব নির্মাতার কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের বিস্তারিত বিবরণ। বস্তুত বিশ্বনবীর জীবনকাহিনী হেরা গুহা থেকে নিয়ে সূর গুহা পর্যন্ত, পবিত্র কা’বার চত্তর থেকে নিয়ে তায়েফের বাজার পর্যন্ত, এবং উম্মুল মুমীনীনদের কক্ষ থেকে রণাঙ্গন পর্যন্ত চতুর্দিকে বিস্তৃত। তাঁর জীবন চরিত শুধু তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং অসংখ্য ব্যক্তির জীবনকে সুষমা মন্ডিত করেছে। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, আম্মার, ইয়াসার, খালেদ, খয়াইলিদ, বিলাল ও সুহাইব- সকলেই এই একই সীরাত গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়। তাঁরা সবাই একই বাগানের গাছ গাছালি, যারা প্রতিটি পত্রপল্লবে এই বাগানের মালির জীবর চরিত লিপিবদ্ধ রয়েছে।

পৃথিবীর এই মহত্তম ও শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বকে যদি জীবনী লেখাচ্ছলে নিছক একক একজন ব্যক্তি রুপে তুলে ধরা হয়, এবং জীবনী লেখার প্রচলিত পদ্ধতিতে তাঁর জীবনের প্রধান প্রধান কীর্তি, তাঁর উল্লেখযোগ্য অভিযান, এবং তাঁর স্বভাবচরিত্র ও আদত অভ্যাসের বিস্তৃত, পুংখানুপুংখ ও তারীখওয়ারি বর্ণনা দেয়া হয়, তবে এ ধরনের সীরাত লেখা দ্বারা সীরাতের সঠিক উদ্দেশ্য কখনো পূরণ হবেনা। রসূল সা. এর জীবন কোন পুষ্করিনীর স্থির পানির মতও নয় যে তার এক কিনারে দাঁড়িয়ে এক নজরেই তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। বরং এটা একটা বহমান নদী, যাতে বেগবান স্রোত রয়েছে, গতি ও সংঘাত রয়েছে, তরংগ ও ফেনা রয়েছে, ঝিনুক ও মুক্তা রয়েছে, এর পানির কল্যাণে মৃত ভূমি প্রাণ ফিরে পায় এবং এ নদীর রহস্য বুঝবার জন্য এর স্রোতের সাথে সাথে চলতে হয়। এ কারণে সীরাত বিষয়ক রকমারি গ্রন্থ পড়লে দূর্লভ তথ্যাবলি পাওয়া গেলেও পাঠকদের মধ্যে প্রেরণা ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়না, আবেগ জাগ্রত হয়না, সাহস ও সংকল্পে নতুন উদ্যমের জোয়ার আসেনা, কাজের অভিরুচিতে নতুন উত্তাপ ও নতুন প্রেরণার উজ্জীবন ঘটেনা এবং আমাদের জীবনের স্থবিরতা ও দূর হয়না। সীরাত বিষয়ক গ্রন্থ পড়ে ক্ষণিকের জন্য হৃদয়ে ভক্তির ঢেউ হয়তো ওঠে এবং চোখে অশ্রুর বানও হয়তো ডাকে, কিন্তু আকাংখার সেই স্ফুলিংগ আমাদের হস্তগত হয়না, যার উত্তাপ একজন নি:সংগ, নিসম্বল ও আশ্রয়হীন ব্যক্তিকে শত শত বছরের পুঞ্জীভূত বাতিল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আর ঈমানের সেই তেজ ও তীব্রতা আমরা অর্জন করতে পারিনা, যা একজন নি:স্ব এতীমকে সমগ্র আরব অনারব বিশ্বের ভাগ্য নিয়ন্তায় পরিণত করেছিল।

আসল কথা হলো, রসূল সা. প্রচলিত পরিভাষায় সীমিত অর্থে কেবল একজন ‘অসাধারণ’ ও ‘খ্যাতনামা’ ব্যক্তিই ছিলেন না এবং তাঁর সীরাত তথা জীবন চরিত কেবল এ ধরনের কোন ‘অসাধারণ’ ও ‘খ্যাতনামা’ ব্যক্তির জীবন বৃত্তান্তই নয়, যে ধরনের জীবন চরিত খ্যাতনামা ব্যক্তিগণের জন্য লিখিত হয়ে থাকে। মহানবীর সত্তা ও ব্যক্তিত্ব এ ধরনের অসাধারণ ও খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গের চেয়ে অনেক উর্দ্ধের।

পৃথিবীতে অসাধারণ মানুষ অনেক জন্মেছে এবং জন্মে থাকে, যারা কোন ভাল শিক্ষা ও কোন গঠনমূলক চিন্তা সমাজে উপস্থাপন করে। এদেরকে অসাধারণ মানুষ বলা হয়। যারা নৈতিকতা ও আইনের বিধান নিয়ে চিন্তা গবেষণা করে তাদেরকেও মহৎ ও অসাধারণ মানুষ বলা হয়। যারা সমাজ সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছে, তাদেরকেও অসাধারণ মানুষ বলা হয়। এই ‘অসাধারণ’ খেতাবটি সেই সব লোককেও দেয়া হয়,যারা দেশ জয় করেছে, বীরোচিত কীর্তির উত্তরাধিকার রেখে গেছে, যারা সম্রাজ্য পরিচালনা ও শাসন করেছে,যারা দারিদ্র ও অভাবের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং যারা বিশ্ববাসীর সামনে ব্যক্তিগত চরিত্রের অত্যন্ত উঁচুমানের মানদন্ড স্থাপন করেছে, তাদেরকেও। কিন্তু এ ধরণের অসাধারণ ও খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের জীবনী যখন আমরা অধ্যয়ন করি, তখন সাধারণত আমরা এটাই দেখতে পাই যে, তাদের সমস্ত শক্তি সামর্থ যেন জীবনের কোন একটা ভালই চুষে খেয়ে ফেলেছে, আর বাদবাকী সবগুলো ডালপালা যেন শুকিয়ে গেছে। তাদের জীবনের একটা দিক যদি খুবই উজ্জ্বল দেখা যায়, তবে তার অন্যদিক একেবারেই অন্ধকার প্রতীয়মান হয়। একদিকে চরম বাড়াবাড়ি, অপর দিকে চরম উদাসীনতা। কিন্তু রসূল সা. এর জীবনের প্রতিটি দিক অন্যান্য দিকের সাথে পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রতিটি দিক একই রকম পূর্ণতা ও উৎকৃষ্টতা দ্বারাও শোভিত। যেখানে গুরু গম্ভীরতার প্রতাপ রয়েছে সেখানে সৌন্দর্যের চমকও রয়েছে। সেখানে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি রয়েছে বৈষয়িকতার সমন্বিত অবদান। পরকালের চর্চার পাশে হাত ধরাধরি করে রয়েছে অর্থনৈতিক চিন্তাধারা। দ্বীনের সাথেই রয়েছে দুনিয়াও। এক ধরণের আত্মনিবেদিত ভাব থাকলেও সেই সাথে আত্মমর্যাদাবোধও রয়েছে অম্লান। আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীর পাশাপাশি বিরাজ করছে আল্লাহর বান্দাদের প্রতি স্নেহ মমতা ও তাদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। কঠোর সামষ্টিক শৃংখলার সাথে রয়েছে ব্যক্তির অধিকারের প্রতি সম্মানও। প্রগাঢ় ধর্মীয় চেতনা ও আবেগের সাথেই অবস্থান করছে সর্বাত্মক রাজনীতিও। জাতির নেতৃত্ব প্রদানে অষ্টপ্রহর ব্যস্ততা থাকলে ও সেই সাথে দাম্পত্য জীবনের কর্মকাণ্ডও সম্পাদিত হচ্ছে সুচারুভাবে। মজলুমদের সাহায্যের পাশাপাশি যালেমদের প্রতিরোধেরও ব্যবস্থা রয়েছে।

রসূলের জীবন চরিতরূপী এই পাঠশালা থেকে সমভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে একজন প্রশাসক, একজন শাসনকর্তা, একজন মন্ত্রী, একজন কর্মকর্তা, একজন মনিব, একজন চাকুরে, একজন ব্যবসায়ী, একজন শ্রমিক, একজন বিচারক, একজন শিক্ষক, একজন সিপাহী, একজন বক্তা, একজন নেতা, একজন সংস্কারক, একজন দার্শনিক এবং একজন সাহিত্যিকও। সেখানে একজন পিতা, একজন সহযাত্রী ও একজন প্রতিবেশীর জন্য একই রকম অনুকরণীয় আদর্শ রয়েছে। একবার কেউ যদি এই পাঠশালায় পৌঁছে যায়, তাহলে তার আর অন্য কোন পাঠশালায় যাওয়ার প্রয়োজন হয়না। মানবতার যে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম উৎকর্ষ অর্জন করা সম্ভব, তা এই একক, ব্যক্তিত্বেই পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান। এজন্যই আমি এই ব্যক্তিকে ‘‘শ্রেষ্ঠমানুষ’’ বা ‘‘মহামানব’’ বলে আখ্যায়িত করতে বাধ্য হয়েছি। সমগ্র মানবেতিহাসে ‘‘শ্রেষ্ঠমানুষ’’ কেবল এই একজনই। তাঁকে মশাল বানিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে উজ্জ্বল করতে পারি। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাঁর কাছ থেকে আলো গ্রহণ করেছে। অনেকে তাঁর কাছ থেকে জ্ঞানের ভান্ডার গড়ে তুলছে। আজ পৃথিবীর দিকে দিকে তাঁর বাণী গুঞ্জরিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সভ্যতা সংস্কৃতিতে তাঁর প্রদত্ত শিক্ষার গভীর প্রভাব রয়েছে। পৃথিবীর এমন কোন মানুষ নেই, যে এই শ্রেষ্ঠ মানুষ থেকে কোন না কোন পর্যায়ে উপকৃত হয়নি। কিন্তু তাঁর দ্বারা যারা উপকৃত, তাঁরা তাঁকে চেনেনা এবং তাঁর পরিচয় জানেনা।

রসূল সা. এর ব্যক্তিত্বের পরিচয় এবং তাঁর বাণীর বিশ্বময় প্রচার ও প্রসারতাঁর প্রতিষ্ঠিত দল তথা মুসলিম জাতিরই দায়িত্ব ছিল। কিন্তু এই জাতি নিজেই তাঁর ও তাঁর বাণী থেকে অনেক দূরে পড়ে রয়েছে। মুসলমানদের কাছে রক্ষিত ধর্মগ্রন্থের পাতায় পাতায় জীবনের সকল দিক সম্পর্কেই দিকনির্দেশনা রয়েছে, কিন্তু তাদের জীবনে এই মহামানবের জীবনীর কোন প্রভাব পড়ছে বলে মনে হয়না। এই জাতির ধর্মীয় জীবনে, রাজনীতিতে, সমাজ জীবনে, নৈতিকতায়, আইন ব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে নবী জীবনের আদর্শের খুব কমই ছাপ অবশিষ্ট রয়েছে। যা রয়েছে তাও অনেক নতুন নতুন ছাপের সাথে মিশে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। এই জাতির সামাজিক পরিবেশ পৃথিবীর কোন একটি ক্ষুদ্রতম অংশেও এমন অবস্থায় নেই, যা দ্বারা বুঝা যায় যে তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর নীতি, আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিনিধি। বরঞ্চ এ জাতি পৃথিবীর বিভিন্ন বিভ্রান্ত ও বাতিল ব্যবস্থার দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা চেয়ে বেড়াচ্ছে এবং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভয়ে নিজেদের গৌরবময় ঐতিহ্য সম্পর্কে লজ্জিত বলে মনে হয়। তারা কোরআনকে গেলাফ দিয়ে মুড়ে রসূল (সাঃ) এর সীরাতকে ফুলের তোড়া বানিয়ে তাকের ওপর তুলে রেখে দিয়েছে।

উপরন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) কে সংকীর্ণ অর্থে একজন ধর্মীয় ও জাতীয় নেতায় পরিণত করে নিজেদেরকে একটা ধর্মীয় ও জাতীয় সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করেছে। এভাবে এই বিশ্ব ব্যক্তিত্বের বাণী ও জীবনাদর্শকে গোষ্ঠীগত ও সাম্প্রদায়িক একচেটিয়া সম্পত্তি বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তিনি এসেছিলেন সমগ্র মানব জাতির নেতা হয়ে এবং সমগ্র মানব জাতির জন্য বাণী ও আদর্শ নিয়ে। তাঁর জীবনেতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা দরকার ছিল যে, মনুষ্যত্বের একটা নমুনা ও আদর্শ। মানুষ এর ছাঁচে ঢালাই হয়ে তৈরি হলে সে নিজের ও সমগ্র মানব জাতির কল্যানের উপকরণ হতে পারে এবং রকমারি সমস্যার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে একটা পবিত্র নিষ্কলুষ ও নিষ্কণ্টক জীবন অর্জন করতে পারে। রসূল (সাঃ) এর বাণী ও জীবনাদর্শ প্রকৃত পক্ষে সূর্যের কিরণ,বৃষ্টির পানি ও বাতাসের মত সার্বজনীন কল্যাণের উৎস। অথচ আমরা তাঁকে নিজেদের অজ্ঞতার দরুণ একটা গোষ্ঠীগত বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি। আজ প্লেটো, সক্রেটিস, ডারউইন, মেকিয়াভেলী, মার্কস, ফ্রয়েড ও আইনস্টাইন থেকেও সকল দেশ ও সকল ধর্মের লোকদেরকে কমবেশী উপকৃত হতে ও শিক্ষা গ্রহন করতে দেখা যায়। তাদের বিরুদ্ধে কোন জাতি বা গোষ্ঠীর অন্ধ বিদ্বেষ নেই। কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) এর জ্ঞান, আদর্শ ও নেতৃত্ব থেকে শিক্ষা গ্রহণে এত আপত্তি ও এত বিদ্বেষ যে,তার ইয়ত্তা নাই। লোকেরা ভাবে যে, মুহাম্মদ (সাঃ) তো মুসলমানদের নেতা। আর আমরা মুসলমানদের থেকে আলাদা এবং মুসলমানরাও আমাদের থেকে ভিন্ন জাতি। কাজেই মুসলমানদের নেতা ও পথ প্রদর্শকের সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? দুঃখের বিষয় হলো, এরূপ ধারনা সৃষ্টিতে এবং এর এতটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে উপনীত হওয়াতে আমাদের নিজস্ব কর্মকান্ডেরও যথেষ্ট হাত রয়েছে। সমগ্র মানবজাতির বন্ধু মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মত হয়েও আমরা তাঁর অনুকরণের অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি বলেই অমুসলিম জনগনের মধ্যে এরূপ চিন্তা ধারার জন্ম নিতে পেরেছে।

 

পাশ্চাত্য জগতের উদ্দেশ্যে

বিশ্বনবীর জীবনকাল মানবেতিহাসের দুটো প্রধান যুগের মাঝখানে অবস্থিত। যেদিন তিনি নবী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন, সেদিন থেকে পেছনের দিকে তাকালে আমরা সাক্ষাত পাই গোত্রবাদ, সামস্তবাদ, রাজতন্ত্র, পূর্বপুরুষ পূজা ও পৌত্তলিক সভ্যতার। আর সন্মুখের দিকে তাকালে দেখতে পাই আন্তর্জাতিক, গণতাস্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার-উদ্ভাবন ভিত্তিক সভ্যতার যুগ। এই বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির উদ্বোধনটা সম্পন্ন হয়েছিল স্বয়ং রসূল (সাঃ) এর হাতেই। সেই সাথে তাঁর হাতে বিশ্বমানবকে এমন মূলনীতি দেয়া হল, যা কেয়ামত পর্যন্ত কার্যোপযোগী। এই মূলনীতির সাথে সাথে এমন মানুষ তৈরী করে দেখিয়ে দেয়া হলো, যে ভবিষ্যত দায়িত্ব গ্রহনের যোগ্য হতে পারে। তাঁর মাধ্যমে সেই অনাগত যুগের চাহিদার আলোকে আত্মা ও দেহ, নৈতিকতা ও বস্তুতান্ত্রিকতা, ভাবাবেগ ও যুক্তি-বুদ্ধি, বিশ্বাস ও কাজ, ব্যক্তি ও দলের আকাংখা এবং বিরাজমান পরিস্থিতি ও চাহিদার মাঝে অকল্পনীয় ও অলৌকিক ধরনের ভারসাম্য স্থাপিত হলো। তাঁর হাতে দুনিয়া সম্পর্কে নির্মোহ অথচ দুনিয়ার শাসনকার্য পরিচালনাকারী একটি মানবগোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছিল। এই দল এক দিকে যেমন আল্লাহর আনুগত্যে জুড়িহীন, অপরদিকে তেমন বস্তুজগতের ওপর কার্য পরিচালনায়ও অগ্রগামী। তাঁরা একদিকে সত্যর সামনে পরম বিনয়ের সাথে মাথা নোয়ায়, অপরদিকে বাতিলের শক্তি খর্ব করার জন্য জানমালের সর্বাত্মক কুরবানী দিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। একদিকে তারা নিজেদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাছে সোপর্দ করে দিত, অপর দিকে প্রাকৃতিক শক্তিগুলো কে বশীভূত করে কাজে লাগাতে ছিল সুদক্ষ। ইতিহাসের রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করা মাত্রই এই দল জ্ঞান বিজ্ঞানের আলো জ্বালালো, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের দ্বারোদঘাটন করল এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের জন্য দ্রুত গতিতে তারা নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালালো। তাদের সকল তৎপরতা, উন্নতি জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তার, আবিষ্কার উদ্ভাবন এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির সকল কর্মকান্ডের আসল কৃতিত্ব মুহাম্মদ(সাঃ) এর ই প্রাপ্য।

পরিতাপের বিষয়, এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও গনতান্ত্রিক সভ্যতার নিয়ন্তা পাশ্চাত্যের জাতিসমূহ মুহাম্মদ (সাঃ), তাঁর বাণী ও তাঁর আনীত জীবন ব্যবস্থাকে বুঝতে পারলনা। যে মহান ব্যক্তির কৃতিত্বপূর্ণ অবদান পাশ্চাত্যের নব উত্থানের পিছনে উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে, যে সত্তা গনতন্ত্র ও আন্তর্জাতিকতাবাদের মূল উদ্গাতা এবং যিনি ধর্মীয় সংষ্কার ও আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন, তাঁকে ইউরোপের বুদ্ধিদীপ্ত মানুষরা দেখতেও পেল না, বুঝতেও পারল না। এর অনেক গুলো কারণ ছিল। এ কারণ গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা এখানে বাঞ্ছনীয় মনে করছিঃ

১। মুহাম্মদ(সাঃ) যখন নিজের বাণী নিয়ে আবির্ভূত হলেন, তখন তাঁকে ইহুদী ও খৃস্টান উভয় ধর্মের মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এই উভয় ধর্ম তখন চরম বিকৃতি ও অবক্ষয়ের যুগ অতিবাহিত করছিল। এই উভয় জাতি ঈমান ও নৈতিকতা থেকে বঞ্চিত একটা অনুষ্ঠান সর্বস্ব কাঠামোকে ধর্মীয় পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্য সহকারে বহন করে চলছিল। উভয় জাতির মধ্যে ধর্মীয় শ্রেণী ও উপদল সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল এবং তারা পুরপুরি ধর্মব্যবসায়ের দোকান খুলে বসেছিল। সুস্থ চিন্তা ও কর্মের আসল পন্য লুন্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। বাইরে কেবল চটকদার সাইনবোর্ড লটকানো ছিল। নিজেদের উপদল ও শ্রেণীগত অস্তিত্ব বহাল রাখার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করা হতো এবং নিজ নিজ গোষ্ঠীভুক্ত লোকজনকে ধরে রাখাই ছিল প্রত্যেক গোষ্ঠীর একমাত্র কাজ। মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ সাধন ও সমাজের সংষ্কার কারোই কাজ ছিল না। এরূপ পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে ইহুদী ও খৃস্টানদের মানসিকতা এত বিগড়ে গিয়েছিল যে, তারা মুহম্মদ(সাঃ) এর অমূল্য ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন এবং তাঁর বাণী ও তাঁর উপস্থাপিত জীবন ব্যবস্থার পর্যালোচনা করার পরিবর্তে তাঁর বিরুদ্ধে হিংসা, বিদ্বেষ ও হঠকারিতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখাতে থাকে। তারা তাঁর দাওয়াতে প্রতিরোধ ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে থাকে। তাঁর সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাঁর কৃত গঠনমূলক কাজকে নষ্ট করে দিতে চায়। এমনকি তাঁকে হত্যা করার চক্রান্তও চালায়। তারপর নিজেদের এই সব অপকর্মের স্বাভাবিক কুফল দ্বারা নিজেদের ও বংশধরদের জীবনকে কলঙ্কিত করে। ইতিহাসের বহমান স্রোতকে তারা নোংরা মানসিকতা ও ঘৃণ্য ধ্যান-ধারনার দ্বারা নষ্ট করে এবং এই নষ্ট পানি প্রবাহিত হয়ে পরবর্তী বংশধর পর্যন্ত গড়ায়। তারা ঘৃণা ও বিদ্বেষের এক বিশাল উত্তরাধিকার পরবর্তী ইহুদি ও খৃস্টানদের জন্য রেখে যায়। মুহম্মদ (সাঃ) এর সমকালীন ইহুদী ও খৃস্টানদের এই দুষিত ভাবাবেগ জড়িত প্রতিক্রিয়া আজ পর্যন্ত তাদের উত্তরসূরীদের মনমগজে প্রতিফলিত হচ্ছে।

২। ইসলামের অভ্যূদয়ের পূর্বেকার মনুষ্যজগতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় পরিমন্ডলে খৃস্টানদের ছিল সুস্পষ্ট প্রাধান্য ও দোর্দন্ড প্রতাপ। এই প্রাধান্য ও আধিপত্যকে সম্প্রসারিত করার আকাংখারও কমতি ছিলনা তা বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশও ছিল অনুকূল। কিন্তু ইসলামের অভ্যূদয় খৃস্টানদের চোখে একটা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির আবির্ভাব বলে প্রতীয়মান হয়। এই শক্তি ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে একটি কার্যকর বিশ্বশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিহিংসার দানা বাঁধে এবং তা ক্রমেই জোরদার হতে থাকে। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ইসলামী শক্তি যখন খৃষ্টানদের হাত থেকে কার্যত ক্ষমতা ও দখলদারী ছিনিয়ে নিতে থাকে, তখন তাদের প্রতিক্রিয়া আরো তীব্র আকার ধারণ করে। ইতিহাসের মুক্তমঞ্চে সমান দুই শক্তির প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব নিয়ে বিচার করার পরিবর্তে খৃষ্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিহিংসা লালন করতে লাগলো, পরোক্ষভাবে এ প্রতিহিংসা ছিল স্বয়ং রসুল(সাঃ) ও ইসলামের বিরুদ্ধে। এ প্রতিহংসা ও বিদ্বেষ ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে চরম আকার ধারন করে। এই যুগ পর্যন্ত পৌছতে পৌছতে যেহেতু খোদ মুসলমানদের মধ্যেই অধোপতনের বীজ বোনা সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল, তাই তাদের বিশেষ বিশেষ দুর্বলতা ও ভ্রষ্টতাকে তারা ইসলাম ও রাসুলুল্লাহর ওপর আরোপ করতে লাগলো। মুসলমানদের চরিত্র ও কর্মকান্ড দ্বারা তারা রসুল (সাঃ) এর ভাবমূর্তিকে বিকৃত করার অপচেষ্টা চালাতে শুরু করলো।

৩। ইসলাম ও খৃস্টবাদের মধ্যে সংঘটিত দ্বন্দ্ব সংঘাতের এই সুদীর্ঘ যুগের প্রথমাংশে যেহেতু খৃষ্টীয় ধর্মযাজকরা খৃষ্টান জনগণকে পুরোপুরিভাবে নিজেদের মুঠোর মধ্যে পুরে রেখেছিল, আর ইসলাম এই ধর্মযাজক শ্রেণীর গোষ্ঠী স্বার্থের ওপরই আঘাত হেনেছিল, তাই এই গোষ্ঠী রসুল(সাঃ) ও তাঁর বাণী সম্পর্কে একটা মিথ্যা ধারনা সৃষ্টি করে এবং তা সর্বত্র ছড়াতে থাকে। শত শত বছরের এই অপপ্রচার পাশ্চাত্যবাসীর মন মগজকে একেবারেই বিগড়ে দেয়। এই জন্যই আজ দেখা যায়, যারা আদৌ কোন ধর্ম মানেনা এবং খৃষ্টধর্মের প্রভাবমুক্ত হয়ে চিন্তাভাবনা করে, সেই বুদ্ধিজীবীরাও যখন ইসলাম ও মুহম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে তখন তারা আজ থেকে ছয়শো বছর আগেকার সংকীর্ণমনা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন পাদ্রীদের নীচ মানসিকতা থেকে একটুও উর্দ্ধে উঠতে পারেনা। প্রাচ্যবিদদের লেখা বইগুলোর দুচারটে পাতা ওল্টালেই দেখতে পাবেন যে তাতে কত ভ্রান্ত ও ত্রুটিপূর্ণ তথ্য কিরুপ ন্যাক্কারজনকভাবে সংযোজন করা হয়েছে এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষটির জীবনকে কত নির্বুদ্ধিতার সাথে চিত্রিত করা হয়েছে। দু-একটা ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলে সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু পাশ্চাত্যবাসীর সাধারন রীতির কথাই এখানে বলা হয়েছে।

৪। বিগত দুশো বছর ছিল পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের শয়তানী যুগ। এই যুগে মুসলিম জাতি গুলো ইসলাম থেকে বিচ্যুতি, আল্লাহর অবাধ্যতা ও মুহম্মদ (সাঃ)-এর আদর্শের প্রতি আনুগত্যহীনতার শাস্তি সরূপ একে একে পুঁজিবাদী পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী লালসার শিকার হয়েছে। পাশ্চাত্যের এই সাম্রাজ্যবাদী লালসা সর্বত্র মুসলমানদের পক্ষ থেকে এক দুরন্ত প্রতিরোধের সন্মুখীন হয়। এই প্রতিরোধের পিছনে সর্বক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিল ধর্মীয় প্রেরণা। ইসলাম তওহীদ তথা এক আল্লাহর গোলামির যে তত্ত্ব দিয়েছে তা স্বাধীনতা ও মানবীয় সাম্যের এমন শিক্ষা দেয়, যা ইসলামের অনুসারীদেরকে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো গোলামীতে সম্মত হতেই দেয়না। এই জন্যই দেখা যায়, মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যতগুলো আন্দোলন গড়ে উঠেছে তার সবগুলোর পেছনেই ইসলামী চেতনা ও উদ্দীপনা সক্রিয়। সর্বত্রই কোন না কোন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় এবং সর্বত্রই ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠার উদ্দীপনা সক্রিয় লক্ষ্য করা যায়। এভাবেই মুসলিম দেশগুলোর সকল স্বাধীনতা আন্দোলনে ধর্মীয় প্রেরণাকে প্রবলভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। আর এ কারণেই পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের মনে এই শক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে বিদ্বেষ ও আক্রোশ সৃষ্টি হয়। কেননা এ শক্তি পদে পদে তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল এবং এক দুর্জয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করছিল। আর এই আক্রোশের বশেই মুসলমানদের ধর্মপ্রীতিকে পাগলামি বলে আখ্যায়িত করা হয় এবং “মোল্লাতন্ত্র” কে একটি ভয়ংকর আপদ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এর পাশাপাশি মুসলমানদের ধর্মীয় প্রেরনা এত শক্তিমান প্রমাণিত হয় যে, তা পাশ্চাত্যের কৃষ্টি ও চিন্তাধারার কাছে পরাভব মানতে তো প্রস্তুত ছিলইনা, উপরন্তু তা প্রত্যেক দেশে তার মোকাবেলা করেছে। শিক্ষা, সাহিত্য ও প্রভাব প্রতিপত্তির সকল শক্তি প্রয়োগ করেও পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ বহু বছর পর মুসলিম জাতির মধ্যে থেকে কেবল মুষ্ঠিমেয় সংখ্যক লোককেই আপন তাবেদার বানাতে পেরেছে। অতঃপর তারা এ ধরনের তাবেদার গোষ্ঠীকে সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে এবং তাদেরকে মুসলমানদের ইসলামী চেতনার বিরুদ্ধে চিন্তাগত, কৃষ্টিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে ইসলাম ও রসুল(সাঃ)-এর সাথে পাশ্চাত্যের সংঘাত ক্রমেই বেড়ে গেছে।

৫। পাশ্চাত্যের জাতিগুলো যখন মুসলমানদেরকে গোলামে পরিণত করার চেষ্টায় সফল হলো, তখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভাবে তাদের চেয়ে হীনতর এই মুসলমানদের কাছ থেকে জীবন পদ্ধতি ও জীবন দর্শন সংক্রান্ত শিক্ষা গ্রহন করা তাদের পক্ষে দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একই রকম কঠিন হয়ে দাঁড়ালো ইসলামের উপস্থাপক ও প্রচারক রসূল (সাঃ)কে সম্মান করা। শুধু তাই নয়, তারা যখন মুসলমানদেরকে তাদের মানসিক গোলামিতে লিপ্ত এবং পাশ্চাত্যের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হবার যাবতীয় লক্ষণ তাদের মধ্যে প্রতিভাত দেখলো, তখন এই অবস্থাটা আরো বড় অন্তরায় সৃষ্টি করলো। তারা যখন প্রত্যক্ষ করলো যে, তাদের হাতে গড়া আধুনিকমনা মুসলমানগণ ইসলামকে পাশ্চত্যের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পরিবর্তন ও রদবদল করে নিতে শুরু করেছে, তখন আর যায় কোথায়। ইসলাম ও রসুল (সাঃ)-এর মর্যাদা তাদের চোখে আর কমে গেল। মুসলমানদের আত্মরক্ষামূলক দৃষ্টিভংগী ইসলামের ভাবমূর্তী ও মুহম্মদ (সাঃ) এর মর্যাদার বিরাট ক্ষতি সাধন করলো।

এই পাঁচটি কারনে মুহম্মাদ(সাঃ) ও পাশ্চাত্যের মানুষের মাঝে এক বিরাট লৌহপ্রাচীর দাঁড়িয়ে গেছে।

তাই আজ পাশ্চাত্য জগত গোটা মানবজাতির মুক্তিদূত মুহাম্মদ (সাঃ) কে কেবল মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক নেতা হিসেবে গ্রহন করে থাকে এবং তাঁর জীবন চরিতকে বুঝবার ও বুঝাবার দৃষ্টিভংগীর পরিবর্তে বিরুদ্ধচারণ ও আপত্তি তলার মনোভাব নিয়ে অধ্যয়ন করে থাকে। পাশ্চাত্য এই মহান সত্তার যে চিত্র তাদের সাহিত্যে অংকন করেছে,তা এমন একজন মানুষের ভাবমূর্তি তুলে ধরে, যে মানসিক ভারসাম্য ও সুস্থতা থেকে বঞ্চিত, যার যাবতীয় তৎপরতা অবচেতন মনের বুদ্ধিবিভ্রাটের ফল এবং যে এক রক্তপিপাসু তরবারী হাতে নিয়ে যে দিকে অগ্রসর হয় পাইকারী গণহত্যা করতে করতে এগিয়ে যায়। গোটা বিশ্ব যাকে আপাদমস্তক করুণা বলে জানে, তাঁকে তারা একজন দুনিয়া পূজারী ও উচ্চভিলাষী আগ্রাসী হানাদারের মর্যাদা দিয়েছে এবং তাঁর আন্তরিকতাপূর্ণ অবদানকে ধোকাবাজি ছলচাতুরী নামে আখ্যায়িত করেছে। তারা এও প্রমান করার চেষ্টা করেছে যে, ইসলামী আন্দোলনে যা কিছু ভাল, তা ইহুদি ও খৃস্টানদের কাছ থেকে ধার করা জিনিস। নচেত মুহম্মদ(সাঃ)-এর মধ্যে তেমন কোন নৈতিক যোগ্যতা ছিলনা। এও প্রকাশ করা হয়েছে যে, আধ্যাত্মিকতা ও ধার্মিকতা যাবতীয় কর্মকান্ড ছিল নিছক লোক দেখানো এবং কেবল নাটকীয় কলাকৌশল দ্বারা জনগণকে বশীভূত করে স্বার্থ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা দুনিয়ার যে কোন মানুষকে দুনিয়া পূজারী ও ধড়িবাজ বলুক, কিন্তু প্রশ্ন হলো, রসুলের সমগ্র জীবনীতে যে নিষ্পাপ ও নিষ্কলুক মহৎ চরিত্রের সন্ধান পাওয়া যায়, তথাকথিত ঐ ধড়িবাজ ও দুনিয়া পূজারী ব্যক্তিদের সাথে তার সমন্বয় কিভাবে সম্ভব?

এছাড়া তাঁর আরো যে ঘোরতর অবিচার করা হয়, তা হলো, রসুল (সাঃ)-এর দাওয়াতের মূল বাণীকে তার শেকড় থেকে নিয়ে শাখা-প্রশাখা ও পত্রপল্লব পর্যন্ত সর্বত্র সর্বব্যাপী দৃষ্টি দিয়ে অধ্যয়ন করা হয়না। বরং এর মৌল নীতিকে না বুঝে এবং এর চিন্তাধারার মূল দর্শনের নিগুঢ় তাৎপর্য উপলব্ধি না করে তার্কিক পাদ্রীদের নিয়মানুসারে কয়েকটা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তর্ক জুড়ে দেয়া হয়। যেমন বলা হয় যে, হযরত মুহম্মাদ (সাঃ) বহু বিবাহ বৈধ করেছেন, ধর্মের জন্য অস্ত্র ধারণ করেছেন, যুদ্ধবন্দীদেরকে দাসদাসী বানিয়েছেন, ইত্যাদি। অধ্যয়ন ও পর্যালোচনার এই একপেশে পদ্ধতিটা সব সময় বিদ্বেষপূর্ণ ও বিরুদ্ধভাবাপন্ন মানসিকতার বাহন হয়ে থাকে। এই মানসিকতা নিয়ে কোন জীবন ব্যবস্থাকে ও কোন দ্বীনকে বুঝা সম্ভব হয়না। বরং এর দ্বারা সব কিছু বুঝার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আসল বিবেচ্য বিষয় এবং জানা ও বুঝার আসল জিনিস হলো, মূল দর্শন বা মতাদর্শ। মূল দর্শন ও মতাদর্শ কতখানি সত্য ও সঠিক, তা দ্বারা জীবনের কতটা উপকার সাধিত হয় এবং জীবনের ক্ষয়ক্ষতি কতটা রোধ ও পূরণ করা যায়, সেটাই আসল প্রণিধানযোগ্য বিষয়। এরপর এই মূলতত্ত্ব ও মতাদর্শ থেকে যে নীতিমালা তৈরী হয়, যে নীতিমালার ভিত্তিতে জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়, সেগুলোকে বিবেচনা ও পর্যালোচনা প্রয়োজন। অতঃপর এই সব নীতিমালা থেকে নির্গত খুঁটিনাটি উপবিধি বা উপধারাগুলোকে দেখতে হয় যে, ওগুলো মূল আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যশীল কিনা। এক ব্যক্তি আপনার কাছে একটা জীবন দর্শন নিয়ে এলো। আপনি সেই জীবন দর্শনটা বিবেচনা না করে এমন কতগুলো উপবিধি নিয়ে তর্ক জুড়ে দিলেন, যার ব্যাপারে আপনার সমাজে একটা বিশেষ বদ্ধমূল ধারণা বিরাজমান এবং সেই ধারনার বাইরে এসে আপনি কোন চিন্তাভাবনা করতেই পারেন না। এর ফল দাঁড়ায় এইযে, আপনি নিজেও বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হন, এবং হাজার হাজার মানুষকেও বিভ্রান্তি ও সংকীর্ণতার মধ্যে নিক্ষেপ করেন। এক ব্যক্তি আপন সত্তার ভেতর মনুষ্যত্বের একটা নতুন পূর্ণাংগ মডেল বানিয়ে আপনার সামনে হাজির করলো। আপনি এই মডেলকে সামগ্রিকভাবে বুঝার আগে তার দুই একটা ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলেন এবং তার বৈধতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তা না করে যদি পুরো মডেলটাকে সামগ্রিকভাবে বুঝে নিতেন, তাহলে ঐ অংশগুলো আপনা থেকেই আপনার বুঝে আসতো। বিভিন্ন মতবাদ ও জীবন ব্যবস্থাকে বুঝার জন্য এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের পর্যালোচনার জন্য পাশ্চাত্য সাধারনভাবে যে সর্বোচ্চ বিজ্ঞান সম্মত পন্থা অবলম্বন করে থাকে, ইসলাম ও মুহাম্মদ সা. এর বেলায় সেই বিজ্ঞানসম্মত পন্থাটাকে একেবারেই শিকেয় তুলে রাখে। একটা বাগান সম্পর্কে কোন মত অবলম্বন বা সিদ্ধান্ত গ্রহনের জন্য পুরো বাগানটাকে পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করতে হয়। ঐ বাগানের একটি গাছের ডাল বা পাতা বা ফল ও ফুলকে পুরো বাগান থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণ করলে চলেনা। তেমনিভাবে মুহাম্মাদ সা. এর জীবনী ও আদর্শরূপী বিশাল বাগানকে দেখুন এবং তার সামগ্রিক অবকাঠামোটা বুঝে নিন। তাহলে তার ভেতরকার প্রতিটি ডালপালা, প্রতিটি ফলফুল ও কুড়ি পাঁপড়িকেও আপনা আপনিই বুঝতে পারবেন। কোন মতবাদ, মতাদর্শ, আন্দোলন বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে যদি কয়েকটা জিনিস আপনার রুচি এবং আপনার প্রিয় ঐতিহ্য ও রীতিনীতির বিরোধী হয়, তাহলে তার অর্থ এটা হতে পারেনা যে, ওখানে আর কোন ভাল জিনিস নেই, ঐ গোটা জিনিসটা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যানযোগ্য। আপনার রুচি বা পছন্দ-অপছন্দ কোন বিশ্বজোড়া বা ঐতিহাসিক মানদণ্ড নয়। এমনও হতে পারে, বরং হওয়ারই কথা যে, একটা বিশেষ মতাদর্শ, আন্দোলন বা একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব নিজের ভালো মন্দের মাপকাঠি নিজেই সাথে করে এনেছে এবং তার ভালমন্দের মানদণ্ড আপনার মানদণ্ড থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা। কাজেই সবার আগে যে জিনিসটা প্রয়োজন তা হলো, মানদণ্ড ও মাপকাঠিগুলোকে পাশাপাশি রেখে পরখ করতে হবে, এবং মানদণ্ড পরখের সাথে মূল তত্ত্ব এবং মতাদর্শের মান ও যাচাই বাছাই করতে হবে।

কুরআন, ইসলাম ও মুহাম্মাদ সা. সম্পর্কে খৃষ্টান জগত ও প্রাচ্যবিদগণ এ যাবত যে সাহিত্য তৈরী করেছেন, তা একাদিকে যেমন অজ্ঞতা ও ভুল বুঝাবুঝিতে পরিপূর্ণ, অপরদিকে তেমনি হঠকারীসুলভ একগুঁয়েমির বিষ তার শিরায় শিরায় সঞ্চালিত। এমনকি যারা উদার মনের পরিচয় দিয়ে সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে কিছুটা প্রশংসামূলক ভাষাও ব্যবহার করেছেন, তারাও জায়গায় জায়গায় সুচতুর শব্দের আড়ালে এমন মিছরির ছুরি বসিয়ে দিয়েছেন যে, পাঠক ধোঁকাবাজির দক্ষতা দেখে স্তম্ভিত না হয়ে পারেনা। দু’চারটে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এমন অবশ্যই পাওয়া যায়, যাতে রাসুল সা. এর বাণী ও কীর্তির আন্তরিক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে সব লেখক পাশ্চাত্যবাসীর কাছে খুব কমই কদর পেয়েছে। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের একটি উৎকৃষ্টমানের বই প্রকাশিত হলে তাকে “মুসলিম সমর্থক” (Pro-Muhammaden) আখ্যায়িত করে পাশ্চাত্যবাসীর চোখে তার মর্যাদা খাটো করার চেষ্টা চলছে। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, মুসলিম দেশগুলোর সাথে আজকাল পাশ্চাত্যের কূটনৈতিক স্বার্থ জড়িত হওয়া উপলক্ষে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সন্তুষ্টির জন্য কত চেষ্টা তদবির যে করা হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। অথচ এ যাবতকাল রসুল সা.-এর যে অবিচারটা করা হয়েছে, তার প্রতিকারের কথা কোথাও ভেবে দেখা হয়নি।

আপনি আপনার বিবেকের রায়ের বিরুদ্ধে রসুল সা.-এর উপস্থাপিত মতাদর্শ ও জীবন ব্যবস্থাকে সমর্থন করুন-এ দাবী আপনার কাছে করা হচ্ছেনা। বিবেকের রায় না পেলে আপনি অবশ্যই দ্বিমত পোষণ করুন এবং দৃঢ়তার সাথেই করুন। যে জিনিসটা আপনার কাছে দাবী করা হচ্ছে, সেটা হলো, ইতিহাস ও জীবনী রচনার জন্য আপনার নিজেরই প্রণীত এবং সমর্থিত নীতিমালা ও মাপকাঠি লঙ্ঘন করে তথ্য বিকৃত করবেননা। এমন সূত্র থেকে বর্ণনা গ্রহন করবেন না, যা একদিকে মুসলমানদের দৃষ্টিতে সর্বসম্মতভাবে অবিশ্বাস্য ও অগ্রহণযোগ্য এবং যা ঐতিহাসিক গবেষণার সর্বস্বীকৃত মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। আপনি একটি ঘটনার ভালো কার্যকারণগুলোকে বাদ দিয়ে তদস্থলে ইচ্ছাকৃতভাবে অবাঞ্ছিত কার্যকারণসমূহের উল্লেখ করবেননা। যুক্তি দিয়ে কথা বলুন, অসৎউদ্দেশ্য প্রণোদিত, অপমানজনক, অভদ্রোচিত, শ্লেষাত্মক ও বিদ্রুপাত্তক ভংগী অবলম্বন করবেন না।

এ আলোচনা দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য অপ্রীতিকর ভাবাবেগজনিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হলো এ যাবত যে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তার অবসান ঘটানো। এ উদ্দেশ্যের সফলতার পয়লা শর্ত হলো, পাশ্চাত্যকে ইসলাম কুরআন ও মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে আপন দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করতে হবে এবং একটা নতুন গঠনমূলক মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যা কেবল পাশ্চাত্যবাসী ও মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যমান ঐক্যমত্যকে উপলব্ধি করা দ্বারাই সম্ভব। যে সব বিষয়ে আমাদের ঐক্যমত্য রয়েছে তা নিম্নরুপঃ

- খৃষ্টান, ইহুদী ও মুসলমান এ তিনটে জাতিই আল্লাহর ইবাদত করে এবং আখেরাতে বিশ্বাস করে। এদের সকলেরই ইবাদতের পদ্ধতিতে সাদৃশ্য রয়েছে এবং সবারই মৌলিক নৈতিক মূল্যবোধ সমান।

- এই তিনটে জাতিরই ধর্মীয় শিক্ষার উৎস ওহী এবং মুসলমানরা সকল নবী ও রসূলকে একই ধর্ম ও একই মহাসত্যের পতাকাবাহী বলে বিশ্বাস করে।

পক্ষান্তরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পাশ্চাত্যবাসী ও মুসলমানদের মধ্যে নিম্মলিখিত বিষয়ে ঐক্যমত্য রয়েছেঃ

- পাশ্চাত্য সভ্যতা জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির যে সব ব্যবস্থা করেছে, মুসলমানদের নির্ভেজাল ধর্মীয় দৃষ্টিভংগী সেই উন্নতির সমর্থক। ইসলামী মতাদর্শ স্বীয় সমাজ ও সভ্যতায় আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এই বস্তুবাদকে (সীমিত পর্যায়ে) স্থান দিতে পারে, যদিও এ দিক দিয়ে পাশ্চাত্য উন্নতির উচ্চতম শিখরে আরোহণ করেছে। অন্যান্য ধর্ম যেখানে নিছক ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, ইসলাম সেখানে একটা পূর্ণাংগ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হওয়ার কারণে অপেক্ষাকৃত উদার।

- গণতন্ত্রের যে সব মূলনীতির ভিত্তিতে পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে গড়ে তুলেছে, মুসলমানদের চিন্তা চেতনায় তা আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। শুধু বিদ্যমান নয়, বরং ইসলামী সভ্যতাই সর্বপ্রথম সেগুলোকে পূর্ণাংগ রূপ দিয়েছে। [লেবান ও ব্রেফাল্ট অস্ফুট চিত্তে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, গনতন্ত্রের চেতনা ও প্রাণশক্তি মুসলমানদের কাছ থেকেই পাশ্চাত্যে পৌঁছেছে।] জনপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক বিষয়ে বিশেষ ও সাধারণ জনগনের সাথে পরামর্শ করা, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার এবং এ সব বিষয়ে সকল নাগরিকের সমমর্যাদা ও সমানাধিকারকে মুসলমানরা পাশ্চাত্যের অনেক আগে বাস্তবায়িত করেছে। যদিও তা করেছে সমকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখে। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও অস্থিরতার নিরীখে বিবেচনা করলে এ সমস্যার সমাধানেও মুসলমানদের সহযোগিতাই পাশ্চাত্যের সংস্কারবাদীদের জন্য অধিকতর মূল্যবান। এর কারণ দুটো : প্রথমতঃ পাশ্চাত্য যদি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে ভেবে দেখে, তাহলে দেখতে পাবে যে, বিশ্বশান্তির ব্যাপারে মুসলমানরা যতখানি সহযোগিতা করতে সক্ষম, ততখানি আর কেউ নয়। এ জাতির আকীদা বিশ্বাসে মানব প্রেমের শেকড় যত গভীরভাবে বদ্ধমূল এবং আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সংহতির নৈতিক ভিত্তি এ জাতির মর্মমূলে যত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত, ততটা আর কারো নয়। এ জাতির এই দুর্লভ ও অনন্য বৈশিষ্ট্যকে যদি পুরোপুরিভাবে কার্যে পরিণত হতে দেখা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান ঘটানো সম্ভব। এক কথায় বলা যায়, ভবিষ্যতের বিশ্বরাষ্ট্র গড়ার জন্য মূল্যবোধ ও নৈতিকতার উপাদান কেবল ইসলামই পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে পারে।

দ্বিতীয়তঃ বস্তুবাদের দুই চরম রূপ পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র—উভয়ের প্রতিরোধ করা এবং একটা মধ্যমপন্থী ন্যায়বিচারমূলক পথে মানবজাতিকে নিয়ে আসার কাজে ইসলাম ও তার অনুসারীদের কাছ থেকেই অধিকতর কার্যকর ভূমিকা আশা করা যায়।

চিন্তা-ভাবনার জন্য এই সর্বসম্মত বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করার পর আমরা এর আলোকে যে কথাটা বলতে চাই তা হলো, পাশ্চাত্যবাসী এখন মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে আপন দৃষ্টিভংগী বদলালে ক্ষতি কি? পাদ্রী ও ওরিয়েন্টালিস্টদের স্থাপিত বিদ্বেষের পর্দাকে ঠেলে ছিড়ে ফেলতে তাদের আপত্তি কোথায়? এ যাবত বস্তুবাদী মতবাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যাপকভাবে করা হয়েছে। এই পরীক্ষা নিরীক্ষাকে একইভাবে অব্যাহত রাখা সম্ভব নয় এবং এই বিজ্ঞ পাশ্চাত্য জনগোষ্ঠী এমন নতুন বংশধর জন্ম দিচ্ছেনা, যার আশায় বুক বেঁধে আরো কিছুদিন কাটিয়ে দেয়া যায়। অপরদিকে ইসলাম ছাড়া অন্য যে সব ধর্ম পৃথিবীতে রয়েছে, তার প্রত্যেকটিই এমন যে, ব্যক্তি জীবনের একটি ক্ষুদ্র অংশে গুটিশুটি হয়ে বসে থাকা পছন্দ করে। সেগুলো সামনে অগ্রসর হয়ে গোটা সভ্যতার লাগাম হাতে নিতে প্রস্তুত নয়। এক কথায় বলা যায়, মানবজাতি আদর্শগত দিক দিয়ে সমস্ত পুঁজি হারিয়ে একেবারেই দেউলে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটি মাত্র উৎস অবশিষ্ট রয়েছে, সেখান থেকে কিঞ্চিৎ আশার আলো ঠিকরে বেরুচ্ছে। মনের দরজা বন্ধ করে দিয়ে সেই আলো থেকেও যদি বঞ্চিত হয়ে যাই, তাহলে মঙ্গল গ্রহ থেকে তো কোন পথের দিশা আসবেনা।

তাই এখনো সময় আছে যে, আমরা মুহাম্মদ সা. কে একজন ইতিহাস স্রষ্টা, আর্ত মানবতার ত্রাণকর্তা, একটি সভ্যতার দিশারী এবং একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসাবে মেনে নেই। তাঁর কাছ থেকে যে আলো আসে তার জন্য মনমগজের বাতায়ন খুলে দেই। তাঁকে বৈজ্ঞানিক পন্থায় বুঝবার চেষ্টা করি। ইসলামকে নিছক খৃস্টবাদের প্রতিদ্বন্দ্বী একটা ধর্ম হিসাবে গ্রহন করা আমাদের পক্ষে সমীচীন হবেনা, বরঞ্চ তাকে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং অনুরূপ অন্যান্য আদর্শবাদী আন্দোলনগুলোর ন্যায় একটা আন্দোলন এবং এমন একটা জীবন ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, যা গোটা সমাজ ও সভ্যতাকে নিজের আয়ত্বে ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। আর মুহাম্মদ সা. কে এই আন্দোলনের নেতা ও এই সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে মেনে নিতে হবে এবং তাঁর এই কৃতিত্ব স্বীকার করে নিতে হবে যে, তিনি ইতিহাসের একটা অনন্য সাধারণ ও উজ্জ্বল যুগের উদ্বোধন করেছেন। তাঁর উপস্থাপিত আদর্শ ও মুলনীতিকে আমাদের এই হিসাবে বিবেচনা করতে হবে যে, তা একটা অত্যাধুনিক বিশ্বরাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা সহায়ক ও অপরিহার্য। তাঁর তৈরি করা মানবতার নমুনাকে আমাদের উদ্দেশ্যে যাচাই করে দেখতে হবে যে, তা একটা আদর্শ ও নিখুঁত সভ্যতার হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি হওয়ার জন্য কতখানি মানানসই।

আজ যখন আমাদের সামনে ঘুটঘুটে অন্ধকার বিরাজমান এবং দূর দুরান্তে কোথাও একটা স্ফুলিঙ্গ পর্যন্ত জ্বলতে দেখা যাচ্ছেনা, তখন পেছন ফিরে তাকিয়েই দেখি, রসুল সা. এর হাতে একটা মশাল জ্বলছে এবং তা বিগত চৌদ্দ শত বছর ধরে হাজারো ঝর ঝঞ্ঝায় একইভাবে জ্বলে আসছে। কেবল নিজের তৈরী করা বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষের কারণে এ মশাল থেকে আলো গ্রহন করতে অস্বীকার করা ও চোখে পট্টি বেঁধে নেয়ার ফল কি ভালো হতে পারে? মানবজাতিকে ও মানবসভ্যতাকে এই ভয়াল অন্ধকারে ধ্বংস হয়ে যেতে দেয়া কি সমীচীন হবে? খুব ভালো করে বুঝে নেয়া দরকার যে, বিরাজমান পরিস্থিতি আমাদের সামনে কী সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে এবং আমাদের মধ্যে এ চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়ার শক্তি আছে কিনা।

কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো, আসল অপরাধী স্বয়ং আমরাই। আমরাই রসুল সা. এর ব্যক্তিত্ব, বাণী ও কৃতিত্ব বিশ্ববাসীকেও জানতে দেইনি, নিজেরাও জানতে চেষ্টা করিনি। তাই আজ রসুল সা. কে নতুন করে পরিচিত করানোর প্রয়োজন। এ কাজতা সম্ভবত আনবিক শক্তি আবিস্কারের চেয়েও বড় ধরনের কীর্তি হবে।

 

এই গ্রন্থটি প্রসংগে দুটি কথা

রসুল সা. এর পবিত্র সীরাত বা জীবনীর ওপর উচ্চমানের গ্রন্থাবলী থাকা সত্ত্বেও আমি এই কঠিন কাজে নিজের অক্ষমতা সত্ত্বেও হাত দেয়ার সাহস করেছি শুধু এ জন্য যে, রসুল সা.-এর মহান সত্তা জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধির একমাত্র উৎস হিসাবে আর একবার পরিচিতি লাভ করুক। রসুল সা.-এর জীবনী সম্বলিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থাবলীতে ঘটনা সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যের সমাবেশ ঘটেছে। কিন্তু পাঠক কোথাও বর্ণনা সংক্রান্ত মতবিরোধে এবং কোথাও গভীর তাত্ত্বিক আলোচনায় আটকে যায়। কোথাও ঘটনাবলীর ধারাবাহিকতার যোগসূত্র তার কাছ থেকে ছিন্ন হয়ে যায়, কোথাও তার সামনে এমন সব খুঁটিনাটি তথ্য হাজির হয়, যার সুস্পষ্ট কোন তাৎপর্য ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা সে পায়না। কোথাও তাত্ত্বিক ও গবেষণালব্ধ তথ্যাবলী এবং সূত্রের আধিক্য দেখে সে আঁতকে ওঠে। অথচ ভলিউম ভলিউম বই পড়েও সে নিজের সামনে একটা উচ্ছ্বসিত আন্দোলন দেখতে পায়না। রসুল সা. এর দাওয়াতের দরুন যে সংঘাতময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, তার দৃশ্য সে দেখতে পায়না। সে নিজেকে রসুল সা. এর যুগে দেখতে পায়না। সীরাতের পুস্তক পড়ে তার এরূপ অনুভূতি হয়না যে, সেও রসুল সা. এর পরিচালিত আন্দোলনের একটা উত্তাল তরংগ এবং তার চারপাশে বিরাজমান পরিবেশের নোংরামির বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব তার ওপরও অর্পিত। রসুল সা. এর নিয়ে আসা মহাসত্যের জ্বলন্ত মশালকে উঁচু করে রাখা এবং তার আলোকে এতটা বিকশিত করাও তার দায়িত্ব যে, সভ্যতা ও সংস্কৃতির জগতে ঐ মশাল যেন একটা প্রদীপ্ত সূর্যে পরিণত হয়। এই অভাবটা পূরণের লক্ষ্যেই এই সামান্য রচনার কাজে হাত দিয়েছি।

ইতিহাস অধ্যয়নের জন্য আমি কুরআনের দৃষ্টিভংগী অবলম্বন করেছি। আমার দৃষ্টিতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা পৃথিবী একটা চঞ্চল ও গতিশীল পৃথিবী। ওটা একটা বৈচিত্র্যময় ও পরিবর্তনশীল পৃথিবী। সর্বোপরি তা একটা প্রতিদন্দিতা, দ্বন্দ্ব সংঘাত, জেহাদ ও লড়াই-এর পৃথিবী। এখানে আকর্ষণ বিকর্ষণ দুইই আছে। এখানে ক্রিয়ার সাথে প্রতিক্রিয়া, ভাংগার সাথে গড়া এবং আলোর সাথে অন্ধকারও রয়েছে। এখানে রাত ও দিন পরস্পরকে ধাওয়া করছে। জীবন ও মৃত্যু, আগুন ও পানি, শীত ও বসন্ত পরস্পরের সাথে যুদ্ধরত। মোট কথা, এই পৃথিবীর যে কোণেই এবং যে জগতেই দৃষ্টি দেবেন, পরস্পর বিরোধী জিনিসগুলোকে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত দেখতে পাবেন। এই মহাবিশ্বের একটা নগণ্য ও ক্ষুদ্র জায়গায় (অর্থাৎ পৃথিবী নামক গ্রহে) মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রণক্ষেত্র অবস্থিত। আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা একটা তরংগবিক্ষুব্ধ মহা সমুদ্র। এতে টেউ এর সাথে ঢেউ, বুদবুদের সাথে বুদবুদ ও বিন্দুর সাথে বিন্দু প্রতি মুহূর্তে টক্কর খাচ্ছে। এখানে হোক ও বাতিল, সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়, ভালো ও মন্দ, যুলুম ও ইনসাফ, পাপ ও পুণ্যের মধ্যে প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এক দীর্ঘ লড়াই চলছে। এ লড়াই-এর বাগডোর রয়েছে রূহ তথা আত্মা এবং নফস তথা কুপ্রবৃত্তির হাতে নিবদ্ধ। এর এই দুই উৎস থেকে রকমারি চিন্তা, বিশ্বাস ও মতবাদ একের পর এক উসারিত হচ্ছে এবং বিচিত্র ধরনের চরিত্র ও পরস্পর বিরোধী স্বভাবের সামষ্টিক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটছে। প্রতিটি ধ্যান-ধারনা, আকিদা বিশ্বাস, মতবাদ মতাদর্শ, চরিত্র ও ব্যবস্থা তার ঠিক বিপরীতমুখী সহোদরকে সাথে নিয়ে ভুমিষ্ট হচ্ছে। যে শক্তিই জন্ম নিচ্ছে, সে তার বিরোধী ও বিপরীত শক্তিকে সংগে নিয়েই জন্ম নিচ্ছে। এই বিরোধ ও বৈপরিত্য থেকে এমন এক সর্বগ্রাসী সংঘাতের উদ্ভব ঘটছে, যা মানব জাতির গোটা ইতিহাসকে একটা সংগ্রামের ইতিহাসে পরিণত করেছে। এই সংগ্রামের ইতিহাস আজ আমাদেরই রক্তে লেখা ইতিহাস হিসাবে আমাদের সামনে বিদ্যমান।

মানব সভ্যতার ঊষাকাল থেকেই যুগে যুগে দেশে দেশে চলে আসছে সার্বক্ষনিক ও সর্বাত্মক লড়াই। সে লড়াই কোথাও চলছে যুক্তির অস্ত্র দিয়ে, আবার কোথাও মারণাস্ত্র দিয়ে। এ লড়াইতে মানুষ দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে দুটি ভূমিকা পালন করে আসছে। একদিকে সে অরাজকতা, অন্যায় ও অসত্যের পতাকাবাহী। অপরদিকে সে ন্যায়, সত্য, সততা ও কল্যাণের নিশানবরদার। কখনো সে নাশকতা ও বিকৃতির খলনায়কদের সক্রিয় তল্পিবাহক হয়ে যায়। আবার কখনো গঠনমূলক কাজের আহবায়ক ও উদ্যোক্তাদের জোরদার সমর্থক হয়ে এগিয়ে আসে। মানবজীবনকে দুঃখ দুর্দশা ও বিপদমুসিবতে জর্জরিত করার অপচেষ্টায় আদাপানি খেয়ে লেগে যায় এক ধরনের মানুষরূপী শয়তান। অপরদিকে পৃথিবীকে সুখ শান্তি ও আনন্দে ভরা জান্নাত হিসেবে ঘরে তোলার জন্য এক শ্রেণীর মানুষ নিজেদের সমস্ত সহায় সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দেয়। জীবন যুদ্ধের একদল মরণপণ সৈনিক এমনও হয়ে থাকে, যাদের হাতে মিথ্যা, যুলুম ও অনাচারের সয়লাব বয়ে যায়। আবার এক শ্রেণীর আপোষহীন মুজাহিদ সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের বিজয় ডংকা বাজিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে যায়।

সত্য, ন্যায় ও ইনসাফের এই লড়াকু সৈনিকরাই পৃথিবীকে কিছুটা বাসযোগ্য ও মানব জীবনকে খানিকটা উপভোগ্য বানিয়েছে। সমাজে আজ যে ক’টি জিনিষ কিছুটা সমাদর পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হচ্ছে, তা ঐ সব মহৎ ব্যক্তিরই অবদান। তারা মানুষের সামনে আদর্শ জীবন পেশ করেছে। তাঁরা আমাদের সামনে স্থাপন করেছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটা মানদণ্ড ও মডেল। তাঁরা আমাদেরকে উপহার দিয়েছে জীবনের সুমহান লক্ষ্য ও চমৎকার নীতিমালা। ইতিহাসের শিরায় শিরায় তারা চিরঞ্জীব ও শাশ্বত ঐতিহ্যের রক্ত সঞ্চালিত করেছে। সভ্যতার আকাশে স্থাপন করেছে নৈতিক মূল্যবোধের জ্বলজ্বল নক্ষত্ররাজি। তারা মানুষকে দিয়েছে উৎসাহ, উদ্দীপনা, সাহস ও উচ্চাভিলাষ। উদ্দেশ্য ও নীতির জন্য তারা দিয়েছে ত্যাগ, কুরবানি ও সংগ্রামের শিক্ষা। এসব মহৎ ব্যাক্তির গৌরবোজ্জল কীর্তি ও অবদানের জন্যই ইতিহাস এত মুল্যবান হয়েছে যে, তার নিদর্শনাবলী সংরক্ষণের যোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকে এবং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য নিত্য নতুন কর্মপ্রেরণার উৎসরূপে সমাদৃত হতে থাকবে।

তাছাড়া যখনই যুলুমবাজ ও মিথ্যাচারী অপশক্তি ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের অক্টোপাস বন্ধনে মানুষকে বেঁধে অসহায় করে ফেলেছে এবং মানুষ হিম্মত হারিয়ে হতাশার গভীর খাদে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। তখন ইতিহাসের এই মহানায়কগণই মানব জাতির ত্রানকর্তা হয়ে এগিয়ে এসেছে। তারা ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়েছে, পতিত মানুষকে টেনে তুলেছে, কাপুরুষদেরকে বীরত্বের সঞ্জীবনী সুধা পান করিয়েছে, এবং অস্ত্র সমর্পনকারীদেরকে নতুন করে রণাঙ্গণের সামনের কাতারে দাঁড় করিয়ে নৈরাজ্যবাদী ও দুর্নীতিবাজ অপশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করেছে। অন্য কথায় বলা যায়, এই মহানায়কগণ ইতিহাসের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়েছে, সভ্যতার হীমায়িত সমুদ্রের বরফ গলিয়ে দিয়েছে, চিন্তা ও কর্মের স্থবির নদীতে নতুন প্রবাহের সৃষ্টি করেছে এবং ইস্পাত কঠিন স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করে মানুষের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পুনর্বহাল করেছে, এভাবে বিশ্বমানবের কাফেলা আত্মবিকাশের সরল ও সঠিক পথ ধরে নির্বিঘ্নে এগিয়ে গেছে।

মানব সমাজের যে পূণ্যবান শ্রেণীটি পৃথিবীতে সত্য ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং গঠন ও উন্নয়নের মহৎ কাজে অংশ নিয়েছে, তার প্রথম কাতারেই রয়েছে অনন্য মর্যাদার অধিকারী নবী ও রাসুলগন। এ ছাড়া সিদ্দিকীন (ইসলামের দাওয়াত পাওয়া মাত্রই যারা তা সর্বাস্তকরণে গ্রহণ করে), শহীদগণ ও সালেহীন তথা সৎ লোকগণ এই প্রথম কাতারের কৃতিত্বেরই অনুগামী এবং তাদেরই নেতৃত্বে কর্মরত। আর নবী ও রাসূলগণের পবিত্র কাতারটিতে যে মহান ব্যাক্তির ওপর সর্বাগ্রে অবারিত দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়, তিনি হচ্ছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইনি হচ্ছেন ইতিহাসের মানবতার সবচেয়ে বড় বন্ধু ও সবচেয়ে বড় উপকারী মহামানব। এই মহামানবকে যেদিক দিয়েই পর্যবেক্ষণ করুন, তাঁর রকমারি শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেবে। এই মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনা দিতে দিতে বিগত চৌদ্দ শতাব্দীতে কত মানুষ যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, তাঁর ইয়াত্তা নেই। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আজও পর্যন্ত তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের বিবরণ পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়নি। ভবিষ্যতে কে এই কাজকে পূর্ণতা দান করতে পারবে কেউ জানেনা। এই মহৎ কাজে শুধুমাত্র অংশগ্রহণের দুর্নিবার আকাংখা অতীতের লোকেরাও পোষণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও অনেকে পোষণ করবে। এই দুর্নিবার আকাংখা এক সময় আমাকেও পেয়ে বসলো। মন চাইলো রসুল সা. আর জীবনের এই দিকটা বিশেষভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরি যে, তিনি মানবতার কল্যাণ সাধন ও পুনর্গঠনের জন্য যখন ময়দানে নামলেন তখন তাকে কি ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হতে হলো, মানবতার এক অতুলনীয় সেবকের সেবার প্রতিদান কিভাবে সারা জীবন অন্ধ বিরোধিতা ও অত্যন্ত নিকৃষ্টমানের অসদাচরণ দ্বারা দেয়া হলো। আর অপরদিকে এত যুলুম নির্যাতন, বিরোধিতা ও অসদাচরণের তান্ডবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হবার সময় রসুল সা. কী ধরনের চরিত্রের পরিচয় দিয়ে যেতে লাগলেন। প্রিয় নবীর এই মর্মন্তুদ জীবন কাহিনীতে সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠাকামীদের জন্যও শিক্ষণীয় রয়েছে এবং সৎ লোকের শাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম প্রতিরোধকারীদের জন্যও শিক্ষণীয় রয়েছে।

মানব ইতিহাসের এই হলো মুহাম্মদ সা. এর স্থান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি সবচেয়ে বড় ইতিহাস স্রষ্টা ছিলেন।

মানব কল্যাণের এই সর্ববৃহৎ কাজ করার জন্য যখন রসুল সা. আবির্ভূত হলেন, তখন সকল নবী ও রসূলের ওপর বিভিন্ন যুগে যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সেই সমস্ত অত্যাচার নির্যাতনকে শয়তান একত্রিত করলো এবং এই এতিম ও অসহায় যুবককে চতুর্মূখী লড়াই চালাতে বাধ্য করলো। রসূল সা. এর জীবন কাহিনীর দৃশ্য অনেকটা এ রকম, যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে নৌকা বিহীন এক সাতারু পর্বত প্রমাণ ঢেউ এর সাথে ক্রমাগত লড়াই করে চলছে। সেখানে প্রচন্ড ঝড় বয়ে চলেছে এবং ঘোর কালো মেঘে আচ্ছন্ন আকাশে থেকে থেকে বিদ্যুতের চমকে চোখ ঝলসে যাচ্ছে। মেঘের গর্জনে কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। এর মধ্যে দিয়েও আপোষহীন সাঁতারু নিজের পথ ধরে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন মর্মান্তিক অত্যাচার ও নির্যাতন এবং এমন আপোষহীন অদম্য সংগ্রামের উদাহরণ ইতিহাসে আর কোথাও আছে কি?

হক ও বাতিলের এবং ন্যায় ও অন্যায়ের লড়াই এর নাটক যখনই মঞ্চস্থ হয়, তাঁর মৌলিক চরিত্র সব সময় একই থাকে। সময় বদলে যায়, ভৌগলিক পরিবেশ পাল্টে যায়, এবং নায়কদের নামও পরিবর্তিত হয়ে যায়। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা কখনো পাল্টে না। একটি ভূমিকা হয়ে থাকে দাওয়াত দাতার চরিত্র।

দ্বিতীয় চরিত্রের নায়ক থাকে সমাজের সেই নিখাদ নিষ্ঠাবান ও নিষ্কলুষ মানুষগুলো, যারা সত্য, ন্যায় ও সদাচারের আহবান শোনা মাত্রই সে আহবানকে নিজেদের সহজাত অভিরুচি দিয়েই চিনতে পারে। সে আহবানে তারা পুলকিত ও মুগ্ধ হয়, নির্দ্বিধায় ও সর্বান্তকরণে তা গ্রহন করে এবং ঐ আহবানের প্রথম অনুসারীর ভূমিকা অবলম্বন করে।

তৃতীয় ভূমিকা গ্রহন করে তারা যারা ভদ্রতার সাথে দ্বিমত পোষণ করে। তারা কথা শোনে, ও তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে। কিন্তু জ্ঞান ও চেতনার অভাব এবং কিছু মনস্তাত্মিক বাধার কারণে সত্যকে বুঝতে দেরি করে ফেলে।

চতুর্থ চরিত্রের নায়ক হয়ে থাকে অত্যন্ত কট্টর ও সোচ্চার দুশমনদের গোষ্ঠী, যারা নিজেদের স্বার্থ, পদমর্যাদা ও বিকৃত আদত অভ্যাসের কারণে প্রথম দিন থেকেই চরম হঠকারী পন্থায় বিরোধিতা শুরু করে দেয়। তাদের এই বিরোধিতা উত্তরোত্তর কেবল বাড়তেই থেকে। পঞ্চম ভূমিকা গ্রহণ করে থাকে দুর্বল জনসাধারণ, যারা সমাজের উচ্চতর শ্রেণীর দোর্দন্ড প্রতাপের কাছে এত অসহায় থাকে যে কোন সাহসী ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেনা। আবার মানসিকভাবেও কোন দাওয়াতের গভীরতম মর্ম উপলব্ধি করার যোগ্যতা রাখেনা। তাই তারা সাধারণত যুগ যুগ ধরে সত্যের আহবায়ক ও সত্যের শত্রুদের দ্বন্দ্ব সংঘাতে নীরব দর্শক হয়ে থাকে এবং কোন পক্ষের কী পরিণতি হয় তার অপেক্ষায় থাকে। যখন কোন এক পক্ষের জয় হয়, তখন জনতার এই প্লাবন বিজয়ী শক্তির পক্ষেই প্রবাহিত হয়। সুতরাং হোক ও বাতিলের যুদ্ধের নাটকটি দুটো চরিত্রের অভিনেতাদের ওপরই নির্ভরশীল অর্থাৎ সত্যের আহবায়ক ও তার অনুসারীদের ভূমিকা, এবং সক্রিয় ও কট্টর বিরোধীদের ভূমিকা। সত্যের দাওয়াতের নাটক মঞ্চস্থ হবে অথচ এই দুটো চরিত্রের অভিনেতারা পরস্পরের মুখোমুখি হবেনা- এটা একেবারেই অসম্ভব। আপনি সত্য ও ন্যায়ের আওয়ায তুলবেন, এর তার জবাবে অসত্য ও অন্যায়ের পক্ষাবলম্বনকারী শক্তিগুলো সমবেতভাবে রুখে দাঁড়াবেনা-এটা হতেই পারেনা। আপনি মানবতার কল্যাণ ও সেবার জন্য কাজ শুরু করবেন, আর গালিগালাজ, অপবাদ, অপপ্রচার, কুৎসা, ষড়যন্ত্র ও হিংস্রতার ভয়ংকর হাতিয়ারগুলো নিয়ে সমাজের সমস্ত অপশক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আপনার দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে আসবেনা – এটা অকল্পনীয়।

রসূল স.-এর বেলায়ও এটাই ঘটেছে। তিনি যদি কেবল কিছু ভালো ভালো কথা বলতেন, জনকল্যাণের বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন, নিজের পছন্দ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পন্থায় রুকু সিজদা ইত্যাদি করে আল্লাহর ইবাদত করেই জীবন কাটাতেন, নির্জনে নিভৃতে বসে যিকির তাসবীহ করতে থাকতেন, এমনকি ভালো ভালো ওয়ায নসিহতও যদি করতে থাকতেন, পীর-মুরীদীর একটা ফের্কাও গড়ে তুলতেন, এবং নিজের অনুসারীদের নিয়ে একটা অক্ষতিকর সংঘ ইতায়দি গঠন করেও ফেলতেন, তবে সমাজ তা বরদাশত করতো। কিন্তু তিনি তো সমগ্র জীবন ব্যবস্থাই পাল্টে ফেলতে চাইছিলেন। সমাজ ও সভ্যতার গোটা ভবন নতুন করে নির্মাণ করতে চাইছিলেন। গোটা সামষ্টিক ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিয়ে তাকে সর্বোত্তম নকশা অনুযায়ী নতুন করে নির্মাণ করতে তিনি আদিষ্ট ছিলেন। কায়েমী স্বার্থ ও অধিকারের মধ্যে যে অন্যায় অথচ অটুট সমঝোতা তৎকালীন সমাজে গড়ে তোলা হয়েছিল, তাকে তছনছ করে দিতে উদ্যত ছিলেন। তিনি মানুষকে একটি নতুন বিশ্বাসগত ও নৈতিক কাঠামো অনুযায়ী গড়ে তোলার জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। প্রথম দিন থেকেই তিনি এই কাজেরই দাওয়াত দেন এবং জনগণ তাঁর দাওয়াতের অর্থ বুঝেছিল প্রথম দিন থেকেই। এর এই অর্থ বুঝিছিল বলেই এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ দেখা দিয়েছিল জাহেলী সমাজের পাল্টা কর্মকান্ড।

সত্য ও ন্যায়ের সর্বব্যাপী আন্দোলনের বিরোধীদের পর্যালোচনা যে কোন যুগেই করা হোক, দেখা যাবে যে, তাদের নেতিবাচক কর্মকান্ডের কৌশল ও ধারাবাহিকতা সব সময় একই রকম ছিল। সর্বপ্রথম মামুলী ধরনের ঠাট্টা বিদ্রূপ করা হতো। এরপর পরবর্তী পর্যায়ে গালিগালাজ, মিথ্যা অপবাদ আরোপ, কুৎসা অপপ্রচার, এবং কলংকজনক উপাধি প্রদানের তান্ডব সৃষ্টি করা হতো। তারপর জনগনের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টির জন্য সুনির্দিষ্ট মিথ্যা প্রচারণা শুরু করা হতো। ব্যাপারটা যখন আরো বেড়ে যেত, তখন একদিকে জাতীয় স্বার্থ ও সংহতি বিপন্ন হবার দোহাই দেয়া হতো, আর অপর দিকে ধর্মীয় অজুহাতে অজ্ঞ জনসাধারণের মধ্যে উস্কানি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হতো। এরই ফাঁকে ফাঁকে যুক্তিতর্কের লড়াইও চলতো এবং প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে দাওয়াত দাতাকে নাজেহাল করার অভিযানও চলতো। যখন বুঝা গেল যে, একটা বিপজ্জনক আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হচ্ছে, তখন প্রলোভন দ্বারা রফা করার চেষ্টা চালানো হলো। সমস্ত ফন্দি ফিকির ব্যর্থ হতে দেখে হিংস্রতার অত্যন্ত ঘৃণা পন্থা অবলম্বন করা হলো। রসুল সা. ও তাঁর সহযোগীদেরকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করা হলো। জুলুম ও নির্যাতনের চক্রান্তও কার্যকর করা হলো। এমনকি শেষ পর্যন্ত রসুল সা. –কে হত্যার ষড়যন্ত্রও করা হলো। এরপরও সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে না পারায় যুদ্ধ ঘোষণা করে সম্মুখ সমরের আহবান জানানো হলো। রসুল সা.–এর জীবনে এই পর্যায়গুলোর সবই একে একে এসেছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রত্যেক পর্যায়েই গৌরবজনকভাবে সাফল্যমন্ডিত করেন। অবশেষে সমগ্র আরব রসুল সা.–এর পদতলে এসে যায়।

এ গ্রন্থে রসুল সা.-এর জীবনের ঘটনাবলীকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত সুত্রে এবং যথাযথ ধারাবাহিকতা সহকারে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, ইতিহাসের স্থবিরতা ভংগ করে সত্য ও অসত্যের এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের যে ভয়াবহ লড়াই রসুল সা. সংঘটিত করেন, তার দৃশ্য চোখের সামনে স্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে। এ লড়াইতে তাঁর গোটা জীবন অতিবাহিত হয়ে যায়। আশা করি এ পুস্তক পড়ার সময় পাঠক নিজেকে রসুল সা.–এর খুবই নিকটে আছেন বলে অনুভব করবেন। ঘটনা প্রবাহকে নিজের চোখের সামনেই সংঘটিত দেখতে পাবেন এবং ইসলামী আন্দোলনের উত্তাল তরংগমালাকে নিজের কল্পনার জগতে নৃত্য করতে দেখতে পাবেন। ফলে হক ও বাতিলের এই সংঘাতের নির্বিকার ও নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারবেন না। বরং তার মধ্যে ইতিবাচক চেতনার উন্মেষ ঘটবে এবং তিনি মানবেতিহাসে নিজের অবস্থান বর্তমানে কী এবং কী হওয়া উচিত, সে কথা ভেবে দেখতে বাধ্য হবেন।

আমার দৃঢ় প্রত্যাশা, এ পুস্তক থেকে সাহসিকতা ও বীরত্বের শিক্ষা অর্জন করা যাবে এবং কঠিনতম পরিস্থিতিতেও দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের প্রেরণা সঞ্চারিত হবে। অন্তরের সেই মহান ব্যক্তির প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা জন্ম নেবে, যিনি মানবতার সবচেয়ে বড় সেবক ছিলেন, এবং যিনি মানবতার সবচেয়ে বেশি উপকার সাধন করেছেন। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার অনুভুতিতে হৃদয় আপ্লুত হবে এবং তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসায় মন ভরে ওঠবে। ইসলাম এই জিনিসটাই কামনা করে। এ পুস্তক পড়ে বুঝা যাবে, আজ সত্যের যে আলোতে আমাদের অন্তরাত্মা উদ্ভাসিত, এই আলোর বাহক যিনি ছিলেন, তিনি কত কঠিন অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, কত মারাত্মক বিরোধিতার মোকাবিলা করে, কী কী ধরনের আক্রমন প্রতিহত করে এবং রক্ত ও অশ্রুর কত বড় বড় সাগর পাড়ি দিয়ে তা আমাদের কাছে পৌছাতে পেরেছেন। এ থেকে এই উপলব্ধিও আসবে যে, সত্য ও ন্যায়ের পতাকাবাহীদের পথ ও অত্যধিক কন্টকাকীর্ণ। এ পথ যখন মুহাম্মদ সা.-এর ন্যায় পুণ্যময় ব্যক্তিত্বের জন্যও কন্টকমুক্ত হয়ে কুসুমাস্তীর্ণ হয়নি, তখন তা আর কার জন্য কুসুমাস্তীর্ণ হবে? এমন আরামদায়ক সংক্ষিপ্ত পথ আর কার জন্য তৈরি হবে যে, মানুষ তার নিরাপদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে পায়ে ধুলোও না লাগিয়ে সোজা বেহেস্তে চলে যেতে পারবে? রসুল সা. এর জীবনেতিহাসের মর্মন্তুদ কাহিনীগুলো পড়লে সেই ভুল বুঝাবুঝি দূর হয়ে যায়। নতুবা মানুষ আল্লাহর আনুগত্যকে পরম আয়েশী কাজ মনে করে নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকে। রসুল সা. এর জীবন কাহিনীর আলোকে আমাদের ভাবতে হবে যে, কুরআন হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে যে সব অগ্নিপরীক্ষা, বিপদ মুসিবত, বাধাবিপত্তি আঘাত ও আক্রমন একজন সত্যিকার মুমিনের জীবনে অনিবার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তা যদি আমাদের জীবনে না আসে, তা হলে আমাদের চলার পথ, এবং গন্তব্য সঠিক আছে কিনা তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে, আমরা যাকে ইসলামের পথ মনে করছি, তা কুফর ও জাহেলিয়াতের পথ নয় তো? এ পুস্তক অধ্যয়ন করে প্রত্যেক মুসলমান আগে থেকে জানতে পারবে যে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কোন ব্যক্তি বা দল অবিকল রসুল সা. এর দাওয়াত ও আন্দোলন নিয়ে ময়দানে নামবে এবং হুবহু রসুল সা. এর অনুসৃত কর্মপদ্ধতি অনুসরন করবে। তখন তার বিরুদ্ধে ঠাট্টা-বিদ্রূপ, অপবাদ, অপপ্রচার, কুৎসা, ষড়যন্ত্র ও যুলুম নির্যাতন হিংসাত্মক আক্রমন ইত্যাদি না হয়েই পারেনা। কেননা এগুলো এ কাজের অনিবার্য পার্থিব প্রতিদান। এ সব দুর্যোগ ও বিপদ মুসিবতের পরিপূর্ণ পরিবেশে যে কোন যুগে কর্মরত সত্যের আহ্‌বায়ককে চেনা, তার কথাকে বুঝা এবং তা মেনে নেয়া সহজ কাজ নয়। এটা কেবল সেই সব ভাগ্যবান ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব, যারা কুরআন হাদীস ও রসূলের সীরাত অধ্যয়ন করে হক ও বাতিলের চিরন্তন লড়াই এর সঠিক ধারণা আগে ভাগেই লাভ করেছে। প্রত্যেক মুসলমানের জানা উচিত, যে বাতিল শক্তি রসূল সা.-এর ন্যায় নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ সত্তাকে ক্ষমা করেনি, এবং যারা পরবর্তীকালে রসূল সা.-এর অনুসারী ইমাম হোসাইন, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম আবু হানিফা, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী ও শাহ ওয়ালউল্লাহর ন্যায় মহান ব্যক্তিবর্গকেও অত্যাচার নির্যাতন থেকে রেহাই দেয়নি, তারা অন্য কাউকেও ছেড়ে দেবেনা। রসূল সা.-এর সীরাত অধ্যয়ন আমাদেরকে প্রত্যেক যুগে সত্যের আহ্‌বায়ক ও সত্যের শত্রুদের চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়। ইসলাম ও কুফরের সংঘাতে যারা সক্রিয় থাকে, তাদের পরিচয় আমি এ পুস্তকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি।

আমি আশা করি, রিসালাতের প্রতি ঈমান ও আমাদের বাস্তব জীবনে যে ভয়ংকর বৈপরিত্য ও স্ববিরোধিতার সৃষ্টি হয়ে গেছে, এই পুস্তক অধ্যয়নে আমরা সে সম্পর্কে সচেতন হতে পারবো। পৃথিবীতে আজ কোন একটা দেশও এমন অবশিষ্ট নেই, যেখানে রসূল সা. এর আনীত জীবন বিধান পুরোপুরি বিজয়ী ও কার্যকর। মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের জয়জয়কার, যা একাধারে প্রাচীন ও আধুনিক জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আমাদেরকে ডুবিয়ে রেখেছে। মানসিকভাবে আমরা আপাদমস্তক জাহেলিয়াতে নিমগ্ন। অর্থনৈতিকভাবেও আমরা পর্যুদস্ত। সাংস্কৃতিকভাবেও আমরা সারা বিশ্বে ভিখারীর জাতি হিসেবে পরিচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদীদের শোষণের শিকার। আমাদের ঈমানের সাথে আমাদের চরিত্রের বৈসাদৃশ্যের এই বিষময় পরিণামই আমরা ভোগ করে চলেছি।

এ গ্রন্থে আমি মূলত বিশ্বনবীর দাওয়াত পুণরুজ্জীবনের আহ্‌বান জানিয়েছি। হুবহু রসূল সা. প্রদর্শিত কর্মপন্থা অনুসারে আমরা যাতে আমাদের জীবনে পরিবর্তন সূচিত করতে পারি, এবং বিশ্ব মানবতার এই মহান নেতা কোরআন ও হাদীসের নীতিমালার আলোকে যে মহানুভবতা ও সুবিচারপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, সেই সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সেটাই আমার মূল উদ্দেশ্য। আজ সেই সময় সমাগত, যখন আমাদের ও আমাদের তরুণ সমাজের পাশ্চাত্য সভ্যতার মানসিক গোলামীর বোঝা মাথার ওপর থেকে ঝেড়ে ফেলা উচিত এবং এই বস্তুবাদী যুগের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে দেয়া উচিত। মুহাম্মদ সা.-এর জীবনীকে পুস্তকের পাতা থেকে বের করে নতুন করে বাস্তব জীবনের পাতায় লিখে দিতে হবে। তাঁর আদর্শকে একটা সমষ্টিক ব্যবস্থার আকারে সংকলিত করতে হবে এবং মুক্তির পথ প্রদর্শনকারী সেই তৃতীয় শক্তির অবস্থানে নিয়ে আসতে হবে, যার স্থান ইতিহাসে এখনো শূণ্য রয়েছে।

দয়াময় আল্লাহ আমার এ নগণ্য চেষ্টা কবুল করুন এবং এর মহৎ উদ্দেশ্য সফল করুন।

আমীন।

নঈম সিদ্দীকী, ১লা ডিসেম্বর, ১৯৫৯।

মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা.

 

এক নজরে ব্যক্তিত্ব

যখন বুলাই তার মুখমন্ডলে দু’চোখ,

সেযেনো বর্ষামুখী মেঘে বিদ্যুতের চমক। [জাহেলী যুগের এই বিখ্যাত আরব কবি এই কবিতাটি তার এক প্রীতিভাজন ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্য করে রচনা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে কোন এক প্রসংগে হযরত আয়েশা (রা) এটি রসূল (সা)এর ওপর যথার্থ প্রয়োগ করেন।]

- আবু কবীর হুযালী

এ চেহারা হতে পারেনা কোনো মিথ্যাবাদী লোকের।

- আবদুল্লাহ ইবনে সালাম

 

এক ঝলক

[প্রধানতঃ শামায়েলে তিরমিযীর আলোকে রচিত।]

পৃথিবীতে যারা বড় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, বিশেষত নবীগণ আ., তারা সর্বদাই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে থাকেন। আন্দোলনের নেতৃত্বদান এবং সভ্যতার পুননির্মাণে নেতৃত্বদানকারীদের শক্তির আসল উৎস হয়ে থাকে বিশেষ ধরণের চিন্তাধারা ও চরিত্রের সমন্বয়ে গঠিত তাঁদের ব্যক্তিসত্তা। রসূল সা.- এর ব্যক্তিত্বকে যথাযথভাবে হৃদয়ংগম করাও তাঁর সীরাত অধ্যয়নের একটা অন্যতম উদ্দেশ্য।

যেকোন ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করার ব্যাপারে তার দৈহিক সৌন্দর্য অনেক সাহায্য করে। মানুষের আপাদমস্তক দেহের গঠন এবং তার অংগ প্রত্যংগের সুঠামতা দ্বারা বুঝা যায় সে মানসিক, নৈতিক ও চেতনাগত দিক দিয়ে কোন স্তরের মানুষ। বিশেষত চেহারা বা মুখমন্ডলে মানবীয় চরিত্র ও কীর্তিকলাপের সমস্ত ইতিবৃত্ত লেখা থাকে। তার ওপর একটা দৃষ্টি দিলেই আমরা ওটা কোন্‌ ধরণের মানুষের চেহারা তা আঁচ করতে পারি।

আমরা যারা পরবর্তীকালে পৃথিবীতে এসেছি, তারা এদিক দিয়ে ভাগ্যাহত যে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষটির অনুপম চেহারা আমাদের সামনে নেই এবং তা চর্মচক্ষু দিয়ে এ জগতে দর্শনের সুযোগও পাবনা। আমরা রসূল সা. এর দৈহিক সৌন্দর্যের যেটুকু ঝলক দেখতে পাই, তা কেবল তাঁর বাণী ও কীর্তির দর্পণেই দেখতে পাই।

রসূল সা. এর কোন প্রকৃত ছবি বা মূর্তি নেই। স্বয়ং রসূল সা. ওসব বানাতে ও রাখতে নিষেধ করেছেন। কেননা ছবি এত বিপজ্জনক জিনিস যে তা শেরকে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি কোনভাবেই রোধ করেনা। রসূল সা. এর কোন ছবি যদি থাকতো, তাহলে তাকে যে কত অলৌকিক কর্মকান্ডের উৎস মনে করা হতো এবং নতুন নতুন কত মোজেযার কৃতিত্ব তাকে দেয়া হতো, তার ইয়ত্তা নেই। এর সম্মানে কত যে রং বেরং এর অনুষ্ঠানাদি অনুষ্ঠিত হতো তা কল্পনা করাও কঠিন। এমনকি তার পূজা শুরু হয়ে যাওয়ায় বিচিত্র ছিলনা। ইউরোপে রসূল সা. এর কাল্পনিক ছবি অনেক বানানো হয়েছে। কিন্তু এমন শিল্পী কে আছে যে, রসূল সা. এর চিন্তা ও কর্মের প্রতিটি দিকের সূক্ষ্ণ ব্যাপক ও পূর্ণাংগ ধারণা রাখে এবং সেই ধারণাকে রংতুলি দিয়ে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে? কাল্পনিক ছবি আর যারই হোক, মুহাম্মদ সা. এর নয়। কোন অনুমান সর্বস্ব ব্যক্তিত্বের ছবি বানিয়ে তাকে রসূল সা. এর নামে চালিয়ে দেয়া হয়ে থাকে। এ সব ছবি তৈরী করার সময় বিন্দুমাত্র সততার পরিচয় দেয়া হয়না। ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ছবি তৈরী করা হয়, যা দ্বারা এক দুর্বলও অসম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বের ধারণা জন্মে। সব ছবি তৈরী করার জন্য ব্যক্তিত্বের ধারণা নেয়া হয় পাশ্চাত্যেরই সেই সব বিদ্বেষপূর্ণ পুস্তকাদি থেকে, যা গোয়ার্তুমি, হঠকারিতা, বক্রচিন্তা ও অবাস্তব ধারণার ফলশ্রুতি। নবীগণ ও পূণ্যবান ব্যক্তিগণের ছবি বা চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষতি এটাই যে, তাদের আসল চরিত্র পর্দার আড়ালে হারিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু রসূল সা. এর সাহাবাগণ ন্যূনতম শব্দের মাধ্যমে তাঁর নিখুঁত ছবি এঁকে দিয়েছেন এবং সেই বর্ণনাগুলোকে বর্ণাকারীগণ অত্যন্ত সুরক্ষিত ও অবিকৃত অবস্থায় আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এখানে আমরা সেই শাব্দিক চিত্রগুলোকে তুলে ধরছি, যাতে পাঠকগণ এই মহামানবের চরিত্র অধ্যয়নের আগে তাঁর ব্যক্তিসত্তার একটা ঝলক দেখে নিতে পারেন। একে এক ধরণের সাক্ষাতও বলা যেতে পারে, কিংবা পরিচিতিও বলতে পারেন।

রসূল সা. এর পবিত্র মুখমন্ডল, তাঁর দৈহিক গঠন, চালচলন ও সৌন্দর্যের যে ছাপ চৌদ্দশো বছরের দূরত্ব পেরিয়ে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে তা এমন একজন মানুষের ভাবমূর্তি প্রতিফলিত করে, যিনি একাধারে অত্যন্ত উচ্চাংগের মেধাবী ও বুদ্ধিমান, সাহসী বীর, ধৈর্যশীল, আদর্শে অবিচল, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ, উদার ও মহানুভব, দাতা, দায়িত্ব সচেতন, বিনয়ী ও ভাবগম্ভীর এবং প্রিয়ভাষী ও শুদ্ধভাষী ছিলেন। আরো সঠিকভাবে বললে বলতে হয়, তাঁর দৈহিক কাঠামোতে নবুয়্যতের ছাপ অনেকটা লক্ষ্যণীয় ভাবে বিদ্যমান ছিল। তাঁর সুদর্শন দেহসৌষ্ঠব তাঁর উচ্চ মর্যাদার প্রতীক ছিল। এ প্রসংগে রসূল সা. এর একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেনঃ

‘‘খোদাভীতি মানুষের চেহারাকে উজ্জ্বল ও সুন্দর করে।’’

নবুয়্যত যখন ঈমান ও খোদাভীতির সর্বোচ্চ স্তর, তখন নবীর চেহারা আলোকময় না হয়েই পারেনা।

এবার আসুন, তাঁর সূর্য জ্যোতিসম চমকপ্রদ চেহারার একটু ঝলক দেখে নেয়া যাক।

 

দৈহিক সৌন্দর্য

‘‘আমি রসূল সা. কে দেখেই চিনে ফেলেছিলাম। তাঁর চেহারা একজন মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারেনা।’’ (আব্দুল্লাহ বিন সালাম) [ইনি ইহুদীদের একজন মস্ত বড় আলেম ছিলেন। তাঁর নাম ছিল হাসীন। রসূল সা. মদীনায় এলে ইনি তাঁকে দেখতে যান এবং দেখতে গিয়ে তার যে ধারণা জন্মে সেটাই তিনি এখানে বর্ণনা করেছেন। তিনি ঈমান আনলেন এবং তার ইসলামী নাম হলো আবদুল্লাহ। (সীরাতুল মুস্তাফা, মাওলানা ইদ্‌রীস কান্ধুলতী। প্রথম খন্ড, পৃঃ ৩৪১-৩৫০)]

‘‘আমি আমার ছেলেকে সাথে নিয়ে হাজির হলাম। লোকেরা দেখিয়ে দিল ঐ যে, আল্লাহর রসূল। কাছে গিয়ে বসা মাত্রই আমি মনে মনে বললাম, যথার্থই ইনি আল্লাহর নবী।’’-আবু রামছা তাইমী

‘‘নিশ্চিত থাকো, আমি এই ব্যক্তির পূর্ণিমা চাঁদের মত উজ্জ্বল চেহারা দেখেছি। তিনি কখনো তোমার সাথে লেনদেনে অসততা করতে পারেননা। এ ধরনের মানুষ যদি (উটের মূল্য ) না দেয়, তবে আমি নিজের কাছ থেকে দিয়ে দের।’’-জনৈক ভদ্র মহিলা। [একটি বানিজ্যিক কাফেলা এসে মদীনার উপকণ্ঠে যাত্রা বিরতি করেছিল। ঘটনাক্রমে রসূল (সাঃ) সেদিকে গিয়েছিলেন।তিনি একটা উট বাছাই করে দামদস্ত্তও ঠিক করলেন। অতপর এই বলে উটটা নিয়ে গেলেন যে,দাম পাঠিয়ে দিচ্ছি।পরে উট বিক্রেতাদের মনে খটকা লাগলো,একজন অচেনা লোককে বাকীতে উট দিয়ে কেমন কাজ করলাম।এসময় কাফেলার নেতার স্ত্রী তাদেরকে আশ্বসত্ম করার জন্য উপরোক্ত কথা বলে। এ ঘটনা ঐ কাফেলার সদস্য তারেক বিন আব্দুলস্নাহ বর্ণনা করেন।এর কিছুক্ষন পরই রসূল (সাঃ) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশী পরিমাণে খেজুর পাঠিয়ে দিলেন।(সীরাতুন্নবী,শিবলী নুমানী,২য় খন্ড,পৃঃ ৩৮০ আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া,১ম খন্ড,পৃঃ ২৪৪।)]

‘‘আমরা এমন সূদর্শন মানুষ আর দেখিনি। আমরা ওর মুখ থেকে আলো বিকীর্ণ হতে দেখেছি।’’ -আবু কারসানার মা ও খালা। [এই মহিলাদ্বয় আবু কারসানার সাথে রসূল সাঃ এর কাছে বায়আতের (অংগীকার প্রদান) জন্য গিয়েছিলেন। ফিরতি পথে তাঁরা এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, ১ম খন্ড,পৃঃ২৫৫)]

‘‘রসূল সাঃ এর চেয়ে সূদর্শন কাউকে আমি দেখিনি। মনে হতো যেন সূর্য ঝিকমিক করছে।’’-আবু হুরায়রা

‘‘তুমি যদি রসূল সাঃ কে দেখতে, তবে তোমার মনে হতো যেন সূর্য উঠেছে।’’-রবী বিনতে মুয়াওয়ায

“ রসূল সাঃ কে যে দেখতো, সে প্রথম দৃষ্টিতেই হতভম্ব হয়ে যেতো।’’- হযরত আলী

‘‘আমি একবার জ্যোৎসণা রাতে রাসূল সাঃ কে দেখছিলাম। তিনি তখন লাল পোশাকে আবৃত ছিলেন। আমি একবার চাঁদের দিকে আর একবার তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলাম।অবশেষে আমি এই সিদ্ধামেত্ম উপনীত হলাম যে, রসূল সাঃ চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’’-হযরত জাবের বিন সামুরা

‘‘আনন্দের সময় রসূল সাঃ এর চেহারা চাঁদের মত ঝকমক করতো।এটা দেখেই আমরা তার আনন্দ টের পেতাম। ’’-কা’ব বিন মালেক

‘‘তাঁর চেহারায় চাঁদের মত চমক ছিল।’’-হিন্দ বিন আবি হালা

 

মুখমণ্ডল

‘‘পূর্ণিমার চাঁদের মত গোলাকার।’’-বারা বিন আযিব

‘‘তাঁর মুখমণ্ডল পুরোপুরি গোলাকার ছিলনা।তবে প্রায় গোলাকার।’’-হযরত আলী

‘‘প্রশস্ত কপাল, বাঁকানো, চিকন ও ঘন ভ্রু, উভয় ভ্রু আলাদা, উভয় ভ্রুর মাঝখানে একটা উঁচু রগ ছিল, রাগান্বিত হলে এই রগ স্পষ্ট হয়ে উঠতো।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘কপালে আনন্দের চিহ্ন ফুটে উঠতো।’’-কা’ব ইবনে মালেক

 

বর্ণ

চুনের মত সাদাও নয়, শ্যাম বর্ণেরও নয়।গমের মত রং তবে একটু সাদাটে।’’-হযরত আনাস

‘‘লালচে সাদা।’’ -হযরত আলী

‘‘সাদা, তবে লাবন্যময়।’’ -আবুত তোফায়েল

‘‘সাদা দীপ্ত।’’- হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘শরীরটা যেন রূপার তৈরী।’’ - হযরত আবু হুরায়রা

 

চোখ

‘‘কালো চোখ, লম্বা পলক।’’ -হযরত আলী

‘‘চোখের মণি কালো, দৃষ্টি আনত, চোখের কিনার দিয়ে দেখার সলজ্জ প্রবণতা।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘চোখে সাদা অংশে লাল রেখা, লম্বা কোটর, জন্মগত সুর্ম মাখা।’’ -জাবের বিন সামুরা

 

নাক

‘‘খানিকটা উঁচু, তার ওপর জ্যোতির্ময় চমক-এ জন্য প্রথম দৃষ্টিতে বড় মনে হয়।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

 

গাল

‘‘হালকা ও সমতল, নীচের দিকে একটু মাংসল।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

 

মুখ

‘‘প্রশস্ত’’। -জাবের বিন সামুরা

‘‘প্রশস্ত’’। - হিন্দ বিন আবি হালা

 

দাঁত

‘‘চিকন, চকচকে। সামনের দাঁতে মোহনীয় ঔজ্জল্য।’’ -হযরত ইবনে আব্বাস

তিনি যখন কথা বলতেন,তখন দাঁত দিয়ে চমক ফুটে বেরুতো।’’ -হযরত আববাস

 

দাড়ি

‘‘মুখভরা ঘন দাড়ি।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

 

ঘাড়

‘‘পাতলা ও লম্বা যেন মূর্তির মত সুন্দরভাবে কেটে বানানো।’’

ঘাড়ের রং চাঁদের মত উজ্জ্বল ও মনোরম।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

 

মাথা

‘‘বড়-তবে সূষম মধ্যম আকৃতির।’’ - হিন্দ বিন আবি হাল

 

চুল

ঈষৎ কোঁকড়ানো।’’ -আবু হুরায়রা

‘‘একেবারে সোজাও নয়, খুব বেশী কোঁকড়ানোও নয়।’’ -কাতাদা

‘‘সামান্য কোঁকড়ানো’’ -হযরত আনাস

‘‘ঘন-কখনো কখনো কানের লতি পর্যমত্ম লম্বা।কখনো ঘাড় পর্যন্ত।’’ -বারা বিন আযেব

‘‘মাঝখানে দিয়ে সিথিঁ কাটা’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘শরীরে বেশী লোম ছিলনা। বুক থেকে নাভি পর্যমত্ম লোমের চিকন রেখা।’’ -হযরত আলী ও হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘ঘাড়, বাহু ও বুকের ওপরের অংশে সামান্য কিছু লোম।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

 

সামগ্রিক দেহ কাঠামো

‘‘শরীরটা ছিল মজবুত গঠনের। অংগ প্রত্যংগের জোড়ের হাড় বড়ও শক্ত।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘শরীর মোটা ছিলনা।’’ -হযরত আলী

‘‘শরীর বেশী লম্বাও নয়,খাটোও নয়, মধ্যম।’’ -হযরত আনাস(রাঃ)

‘‘শরীর কিছুটা লম্বা। অনেক লোকের মধ্যে দাঁড়ালে তাকে অধিকতর লম্বা মনে হতো।’’ -বারা বিন আযেব

‘‘পেট উঁচু ছিলনা।’’-উম্মে মা’বাদ

“পার্থিব সম্পদের প্রাচুর্যে লালিত লোকদের চেয়ে (ক্ষুধা ও দারিদ্র ভোগ করা সত্তেও) তরতাজা ও শক্তিশালী ছিলেন।’’ [এ ঘটনা সুবিখ্যাত যে, ওমরা করতে গিয়ে রসূল (সাঃ) একাই একশো উট হাকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তার মধ্য থেকে ৬৩টি স্বহসেত্ম জবাই করেন। বাকীগুলো হযরত আলীর (রাঃ) হাতে অর্পণ করেন। (আল মাওয়াহেব ১ম খন্ড ৩১০ পৃষ্ঠা )]

‘‘আমি রসূল (সাঃ) এর চেয়ে শক্তিশালী আর কা্উকে দেখিনি।’’-ইবনে উমার [মক্কায় রুকানা নামক একজন পেশাদার কুস্তিগীর ছিল। একবার রসূল (সাঃ) তার সাথে দেখা করে ইসলামের দাওয়াত দিলে সে নবুয়তের প্রমাণ চায়। রসূল (সাঃ) তার রুচি অনুযায়ী তার সাথে কুস্তি লড়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তার সাথে তিনবার কুস্তি হয় এবং তিনবারই তিনি তাকে হারিয়ে দেন। এ ছাড়া আবুল আসওয়াদ জুহমীসহ আরো কয়েকজনকেও তিনি কুস্তি লড়াইতে হারিয়ে দিয়েছেন। (হাকেম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও বায়হাকী, আল- মাওয়াহিবুল লাহন্নিয়া, প্রথম খ-,পৃঃ ৩০৩)]

 

কাঁধ ও বুক

‘‘বুক প্রশস্ত, বুক ও পেট সমতল।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘বুক প্রশস্ত।’’ -বারা বিন আযেব

‘‘দুই কাঁধের মধ্যবর্তী অংশ সাধারণ মাপের চেয়ে বেশী। -হিন্দ বিন আবি হালা, বারা বিন আযেব

‘‘দুই কাঁধের মধ্যবর্তী অংশ মাংসল।’’ -হযরত আলী

 

হাত ও বাহু

‘‘বাহু লম্বা, হাতের তালু প্রশস্ত, আংগুলগুলো মানানসই লম্বা।’’ -হিন্দ বিন আবি হালা

‘‘রেশমের পাতলা বা ঘন কাপড় বা অন্য কোন জিনিস এমন দেখিনি, যা রসূল (সাঃ) এর হাতের চেয়ে কোমল।’’-হযরত আববাস

 

পদযুগল

‘‘পায়ের থোড়া মাংসল ছিলনা,ছিল হালকা ও চুপসানো।’’-জাবের বিন সামুরা

“হাতের পাতা ও পায়ের পাতা মাংশল ছিল। পায়ের তলা কিঞ্চিত গভীর। পায়ের পাতা এত পাতলা যে, তাতে পানিই দাঁড়ায়না। ’’ – হিন্দ বিন আবি হালা

“পায়ের গোড়ালিতে গোস্ত খুবই কম।’’ –জাবের বিন সামুরা

 

একটা সামগ্রিক ছবি

যদিও রসূল (সাঃ) এর বহু সংখ্যক সাহাবী রসূল (সাঃ) সম্পর্কে অনেক চমকপ্রদ বিবরণ দিয়েছেন, কিন্তু উম্মে মা’বাদের বিবরণের কোন তুলনা নেই। সুর পর্বতের গুহা থেকে যখন রসূল (সাঃ) মদীনায় হিজরত করার জন্য রওনা দিলেন, তখন প্রথম দিনই খুযায়া গোত্রের এই মহিয়সী বৃদ্ধার বাড়ীতে যাত্রা বিরতি করেন। রসূল (সাঃ) ও তাঁর সাথীরা নিদারুণ তৃষ্ণা কাতর ছিলেন। আলস্নাহর বিশেষ মেহেরবানীতে বৃদ্ধার জরাজীর্ণ ক্ষুধার্ত বকরী এ সময় এত দুধ দিল যে,রসূল (সাঃ) ও তাঁর সাথীরা পেটপুরে খাওয়ার পর আরো খানিকটা দুধ অবশিষ্ট রইল। উম্মে মা’বাদের স্বামী বাড়ী ফিরে দুধ দেখে অবাক হয়ে গেল। সে জিজ্ঞাসা করলো, এ দুধ কোথা থেকে এল। উম্মে মা’বাদ সমসত্ম ঘটনা বর্ণনা করলো।তখন তার স্বামী বললো, এই করাইশী যুবকের আকৃতির বিবরণ দাও তো, সে সেই বহুল প্রত্যাশিত ব্যক্তি কিনা দেখি। তখন উম্মে মাবাদ চমৎকার ভাষায় তার একটি বিবরণ দিল। উম্মে মাবাদ তখন রাসূল (সাঃ) কে চিনতোনা, তার প্রতি হিংসা বিদ্বেষও পোষণ করতোনা। সে যা দেখেছে,হুবহু তা বর্ণনা করেছে। এই বর্ণনাটা আসল আরবীতে দেখে নেয়া উত্তম। [দেখুন যাদুল মায়াদ,১ম খন্ড,পৃঃ ৩০৭]। এখানে তার অনুবাদ দিচ্ছিঃ

‘‘পবিত্র ও প্রশসত্ম মুখমন্ডল,প্রিয় স্বভাব, পেট উঁচু নয়, মাথায় টাক নেই, সুদর্শন, সুন্দর, কালো ও ডাগর ডাগর চোখ, লম্বা ঘন চুল, গুরম্নগম্ভীর কণ্ঠস্বর। উঁচু ঘাড়, সুর্মা যুক্ত চোখ, চিকন ও জোড়া ভ্রম্ন, কালো কোকড়ানো চুল। নীরব গাম্ভীর্য,আন্তরিক, দূর থেকে দেখলে সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক। নিকট থেকে দেখলে অত্যন্ত মিষ্ট ও সুন্দর। মিষ্ট ভাষী, স্পষ্টভাষী, নিস্প্রয়োজন শব্দের ছড়াছড়ি থেকে মুক্ত কথাবার্তা। সমস্ত কথাবার্তা মুক্তার হারের মত পরস্পরের সাথে যুক্ত। মধ্যম ধরনের লম্বা, ফলে কেউ তাকে ঘৃণাও করেনা, তাচ্ছিল্যও করেনা। সুদর্শন, তরুন, সর্বক্ষণ সাহচর্য দানকারীদের প্রিয়জন। যখন সে কিছু বলে সবাই নীরবে শোনে, যখন সে কোন নির্দেশ দেয়, তৎক্ষণাত সবাই তা পালন করতে ছুটে যায়। সকলের সেবা লাভকারী, সকলের আনুগত্য লাভকারী, প্রয়োজনের চেয়ে স্বল্পভাষীও নয়; অমিতভাষীও নয়।’’ [যাদুল মায়াদ, ১ম খন্ড,পৃঃ ৩০৭]।

 

পোশাক

পোশাক দ্বারাও মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রস্ফুটিত হয়। পোশাকের সাইজ, দৈঘ্য, প্রস্থ, রং, মান পরিচ্ছন্নতা এবং অনুরূপ অন্যান্য বিশেষত্বের পোশাক পরিহিত ব্যক্তি কেমন চরিত্র ও মানসিকতার অধিকারী তা জানিয়ে দেয়। রসূল (সাঃ) এর পোশাক সম্পর্কে তাঁর সাহাবীগণ যে তথ্য দিয়েছেন, তা থেকে রসূল (সাঃ) -এর রুচি ও মানসিকতা অনেকটা প্রকাশ পায়।

রসূল (সাঃ) আসলে পোশাক সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতের বাস্তব ব্যাখ্যা পেশ করেছেনঃ

﴿يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا ۖ وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ ذَٰلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ﴾

‘‘হে আদম সন্তান, আমি তোমাদের জন্য তোমাদের লজ্জা স্থান আবৃতকারী এবং তোমাদেও সৌন্দর্য উৎপন্নকারী পোশাক নির্ধারণ করেছি। তবে খোদাভীতির পোশাকই উত্তম।’’ (সূরা আ’রাফঃ ২৬)

পোশাকের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সূরা আন নহলে বর্ণিত হয়েছে এভাবেঃ

سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيلَ تَقِيكُم بَأْسَكُمْ

‘‘তিনি তোমাদেরকে গরম থেকে বাঁচানো ও যুদ্ধে নিরাপদে রাখার জন্য জামা ও বর্ম সরবরাহ করেছেন।’’ (সূরা আন নহল)

সুতরাং রসূল (সাঃ) এর পোশাকের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এইযে, তা লজ্জা নিবারক ছিল, সৌন্দর্য উৎপন্নকারী ছিল এবং তাকওয়া তথা খোদাভীতি ও সততার পোশাক ছিল।এতে প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থাও ছিল, চারিত্রিক নীতিমালার আনুগত্যের নিশ্চয়তাও ছিল এবং ভদ্রজনোচিত রুচির প্রতিফলনও ছিল। রসূল (সাঃ) দাম্ভিকতা, জাঁকযমক, বিলাসিতা ও লোক দেখানোর মানসিকতা কঠোরভাবে এড়িয়ে চলতেন। তিনি বলেছেনঃ

‘‘আমি আল্লাহর একজন দাস মাত্র এবং বান্দাদের উপযোগী পোশাকই পরি।’’ [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া-১ম খ-, পৃঃ ৩২৮।] রেশম জাতীয় পোশাককে তিনি পুরূষদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। একবার উপহার স্বরূপ পাওয়া রেশমী জামা পরেছিলেন। কিন্তু অস্থিরতার সাথে তৎক্ষণাত তা খুলে ফেললেন। জামা, লুংগী ও পাগড়ী বেশী দীর্ঘ হওয়া অহংকারের আলামত ছিল এবং এ ধরনের পোশাক পরার প্রথা দাম্ভিক লোকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল বিধায় এটাকে তিনি প্রচন্ডভাবে ঘৃণা করতেন। [আবুদাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজা, তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ]।

অন্যান্য জাতির পোশাক বিশেষত তাদের ধর্মীয় যাজক শ্রেণীর নির্দিষ্ট ধরনের পোশাকের অনুকরণ করাকেও তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। [মুসনাদে আহমাদ, আবুদাউদ]। উম্মতের স্বকীয়তা ও আত্মমর্যাদাবোধ যাতে বহাল থাকে এবং পোশাক ও ফ্যাশনের অনুকরণ করতে গিয়ে চরিত্র ও আদর্শের অনুকরণও শুরু হয়ে না যায়, সে জন্যই তিনি এরূপ নিষেধজ্ঞা আরোপ করেছেন। এ জন্য তিনি ইসলামী সংস্কৃতির আওতাধীন বেশভূষা, ফ্যাশন ও কৃষ্টি সম্পর্কে সম্পুর্ণ নতুন এক রুচির প্রচলন করেন। পোশাকে আবহাওয়াগত নিরাপত্তা, লজ্জা নিবারণ, সরলতা পরিচ্ছন্নতা ও গাম্ভভীর্য কিভাবে রক্ষা করা যায়, সে দিকে রসূল সা. বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতেন। রসূল (সাঃ) এর পোশাককে আমরা যদি সমকালীন সাংস্কৃতিক ধারা, আরবের ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক ও আবহাওয়াগত প্রয়োজন এবং প্রচলিত রীতিপ্রথার প্রেক্ষাপটে দেখি, তাহলে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, ঐ পোশাক ছিল অত্যন্ত উঁচুমানের রুচির প্রতীক। এবারে আসুন দেখা যাক রসূল (সাঃ) এর পোশাক কেমন ছিল? [শামায়েলে তিরমিযী,যাদুল মায়াদ ও আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া দ্রষ্টব্য]।

তিনি জামা খুবই পছন্দ করতেন। জামার আসিত্মন (হাতা) বেশী চাপাও হতোনা, বেশী ঢিলাও হতোনা। মধ্যম ধরনের হতো।আসিত্মন (হাতা) কখনো কনুই পর্যমত্ম এবং কখনো কবজি পর্যমত্ম লম্বা হতো। প্রবাসে বিশেষত জেহাদেও সফরে যাওয়ার সময় যে জামা পরতেন, তার দৈর্ঘ্য ও আস্তিনের দৈর্ঘ্য অপেক্ষাকৃত কম হতো। সামনের দিকে বুকের ওপর জামার যে অংশটা থাকতো, তা আবহাওয়াগত প্রয়োজনে খোলাও রাখতেন এবং ঐ অবস্থায় নামাযও পড়তেন। জামা পরার সময় প্রথমে ডান হাত ও পরে বাম হাত ঢুকাতেন। সাহাবীগণকেও এটাই শিক্ষা দিতেন। ডান হাতের অগ্রাধিকার এবং ভালো কাজে ডান হাতের ব্যবহার রসূলের (সাঃ) শেখানো কৃষ্টির একটা গুরত্বপূর্ণ অংশ।

লুংগি সারা জীবনই ব্যবহার করতেন। এটা নাভির সামান্য নীচে রাখতেন এবং টাখনুর সামান্য ওপর পর্যন্ত পরতেন। সামনের অংশ ঈষৎ নামানো থাকতো।

পাজামা প্রথমে দেখেই পছন্দ করে ফেলেন। সাহাবীগণ ও পরতেন। একবার নিজে কিনেছিলেন। (পরেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে মতভেদ আছে।) সেটি তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল। পাজামা খরিদ করার ঘটনাটা বেশ মজার। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) কে সাথে নিয়ে রসূল(সাঃ) বাজারে গেলেন এবং পোশাক বিক্রেতাদের দোকানে উপস্থিত হলেন। চার দেরহাম দিয়ে পাজামাটা কিনলেন। বাজারে পণ্য দ্রব্যাদি মেপে দেখার জন্য একজন বিশিষ্ট ওযনকারী ছিল।তার কাছে পাজামাটা ওযন করাতে নিয়ে গেছেন এবং বললেনঃ‘‘এটি ঝুকিয়ে ওযন কর।’’(অর্থাৎ প্রকৃত ওযনের চেয়ে বেশী হয়, এমনভাবে ওযন কর।) ওযনকারী বললো,এমন কথা আমি আর কাউকে বলতে শুনিনি।হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেনঃ ‘তুমি কি তোমার নবীকে চেননা?’ লোকটি তৎক্ষণাত তাঁর হাতে চুমো খেতে এগিয়ে গেলে তিনি বাধা দিলেন এবং বললেনঃ এটা অনৈসলামিক পদ্ধতি।’’ যাহোক, তিনি পাজামাটা ওযন করিয়ে কিনে নিয়ে গেলেন।হযরত আবু হুরায়রা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কজিকি এটা পরবেন? তাঁর অবাক হওয়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, একেতো প্রাচীন অভ্যাসের এমন উলেস্নখযোগ্য পরিবর্তনে বিস্ময় বোধ হচ্ছিল। দ্বিতীয়তঃ পাজামা ছিল পারস্যদেশীয় পোশাক। অথচ রসূল (সাঃ) বিজাতীয় সবকিছু এড়িয়ে চলতেন। (অবশ্য অন্যান্য জাতির সংস্কৃতির ভালো উপাদানকে গ্রহন করতেন।) রসূল (সাঃ)বললেন ‘‘হাঁ, পরবো। স্বদেশে, বিদেশে, দিনে কিংবা রাতে-সর্বাবস্থায় পরবো। কেননা আমাকে ছতর ঢাকার আদেশ দেয়া হয়েছে এবং পায়জামার চেয়ে ভালো ছতর ঢাকা পোশাক আর কোনটাই নেই।’’। [আল মাওয়াহেবুল লাদুন্নিয়া,প্রথম খন্ড,পৃ ৩৩৬-৩৩৭]।

মাথায় পাগড়ি পরতে খুবই ভালোবাসতেন। পাগড়ি খুব বড়ও হতোনা, খুব ছোটও হতোনা। এক বর্ণনা অনুসারে পাগড়ি ৭ গজ লম্বা হতো। পাগড়ির লেজ পেছনের দিকে এক বিঘাত ছেড়ে দিতেন। কখনো কখনো রৌদ্রের তীব্রতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পাগড়ি এবং লেজ চওড়া করে মাথার ওপর ছড়িয়ে দিতেন। আবহাওয়ার প্রয়োজনে কখনো কখনো পাগড়ির শেষ বৃত্ত খুলে ঘাড়ের চার পাশে জড়িয়ে নিতেন। কখনো পাগড়ি না থাকলে একটা বড় রুমাল মাথায় বেঁধে নিতেন। [কারো কারো মতে,কেবল অসুস্থ অবস্থায়ই এরূপ করতেন, বিশেষত মাথা ধরলে ]। পরিচ্ছন্নতার খাতিরে পাগড়িকে তেলচিটা থেকে রক্ষা করার জন্য পাগড়ির নীচে চুলের ওপর একটা বিশেষ কাপড় ব্যবহার করতেন, যার আরবী নাম ‘কান্না’। আজ কালও অনেকে টুপির নীচে কাগজ বা সেলোলাইডের একটা টুকরা ব্যবহার করে থাকে। এই টুকরায় তেলচিটা লাগতো ঠিকই। কিন্তু পরিচ্ছন্নতার ব্যপারে এত সচেতন ছিলেন যে, বিভিন্ন বর্ণনা মতে এই টুকরাটাকে কেউ কখনো ময়লা দেখেনি। সাদা ছাড়া কখনো কখনো হলুদ, (খুব সম্ভবত মেটে রং বা ছাই রং) পাগড়িও পরতেন। মক্কা বিজয়ের সময় কালো পাগড়িও ব্যবহার করেছেন। পাগড়ির নীচে কাপড়ের টুপিও ব্যবহার করতেন এবং তা পছন্দ করতেন। কোন কোন বর্ণনা মতে, টুপির সাথে পাগড়ির এ ব্যবহার ইসলামী সংস্কৃতির বিশেষ স্টাইল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং রসূল (সাঃ) এ স্টাইলকে মোশরেকদের মোকাবিলায় বিশেষ ফ্যাশন বলে ঘোষণা করেন।

পাগড়ি ছাড়া কখনো কখনো শুধু সাদা টুপিও ব্যবহার করতেন। ঘরোয়া ব্যবহারের টুপি মাথার সাথে লেগে থাকতো। আর প্রবাসে যে টুপি পরতেন তা হতো অপেক্ষাকৃত উঁচু। ঘন সেলাই করা কাপড়ের সূচাঁলো টুপিও পরতেন।

চার গজ লম্বা ও সোয়া দুগজ চওড়া চাদর পরতেন। কখনো তা গায়ে জড়িয়ে নিতেন, কখনো একপাশ সোজা বগলের মধ্য দিয়ে বের করে উল্টো কাঁধের ওপর নিয়ে রাখতেন।এই চাদও দিয়ে কখনো কখনো বসা অবস্থায় পা জড়িয়ে রাখতেন, আবার কখনো কখনো তা ভা’জ করে মাথার নীচে বালিশের মত ব্যবহার করতেন। অভিজাত সাক্ষাত প্রার্থীদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যও কখনো কখনো চাদর বিছিয়ে দিতেন। জাবারা নামক ইয়ামানী চাদর খুবই পছন্দ করতেন। এতে লাল বা সবুজ ডোরা থাকতো। একবার রসূলের (সাঃ) জন্য কালো চাদর (সম্ভবত পশমী) বানানো হয়। সেটা পরলে ঘামের জন্য দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। তাই পরিচ্ছন্নতার জন্য তা আর পরেননি।

নতুন কাপড় সাধারণত শুক্রবারে আল্লাহর প্রশংসা ও শোকর সহকারে পরতেন। পোশাকের বাড়তি সেট বানিয়ে রাখতেন না। কাপড়ে তালি লাগাতেন, মেরামত করতেন। সতর্কতার জন্য মাঝে মাঝে গৃহে তল্লাশী চালাতেন যে, সাধারণ মানুষের সাথে ওঠাবসার কারণে কোন উকুন বা ছারপোকা চলে এলো কিনা। (নামাযের জামায়াতে এবং বৈঠককাদিতে মাঝে মাঝে অপরিচ্ছন্ন লোকেরাও আসতো। এই অপরিচ্ছন্নতার সাধারণ মানও একাধারে বহু বছর চেষ্টার পরই তিনি খানিকটা উন্নত করতে পেরেছিলেন।)

একদিকে দারিদ্র ও সরলতা তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল। অপর দিকে বৈরাগ্যবাদ প্রতিরোধ করাও তাঁর দায়িত্ব ছিল।আবার কোন এক সচ্ছল ব্যক্তিকে অতি মাত্রায় গরীবের মত জীবন যাপন করতে দেখেই বললেন,‘‘আল্লাহ তায়ালা তার বান্দার জীবনে তাঁর দেয়া নিয়ামতের প্রভাব প্রতিফলিত হোক-এটা ভালোবাসতেন। [তিরমিযী ও নাসায়ী]।

এই মূলনীতি অনুসারে রসূল সা. নিজে কখনো কখনো ভালো পোশাকও পরতেন। মধ্যম ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থায় বসা তাঁর নীতি ছিল এবং তিনি তাঁর উম্মতকে উগ্রতা ও চরম পন্থা থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তিনি চাপা আস্তিন বিশিষ্ট রোমীয় জুব্বাও একবার পরেছিলেন। লাল ডোরা বিশিষ্ট চমকপ্রদ সেটও পরেছেন। কখনো কখনো পারস্যেও রাজকীয় তাইলাসানী জুববাও পরেছেন। [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া]। একবার ২৭ উটনীর বিনিময়ে একসেট মূল্যবান পোশাক খরিদ করে পরেন এবং সেই অবস্থায় নামাযও পড়েন। এটা আসলে কুরআনের এই আয়াতের ব্যাখ্যা স্বরূপ ছিলঃ ‘‘বল, আল্লাহর দেয়া সৌন্দর্যোপকরণকে হারাম করেছে কে?’’(সূরা আরাফ) তবে সাধারণ নিয়ম ছিল এই যে, সরল ও অনাড়ম্বর পোশাকই তাঁর অধিকতর প্রিয় ছিল।

পোশাকের বেলায় সাদা রংই ছিল তাঁর সর্বাধিক প্রিয়। তিনি বলেছেনঃ তোমাদের জন্য আল্লাহর সামনে যাওয়ার সর্বোত্তম পোশাক সাদা পোশাক।’’ [আবু দাউদ,ইবনে মাজা]। তিনি আরো বলেছেনঃ সাদা কাপড় পর এবং সাদা কাপড় দ্বারা মৃতদের কাফন দাও। কেননা এটা অপেক্ষাকৃত পবিত্র ও পছন্দনীয়। [আহমদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ]।

সাদার পরেই তাঁর পছন্দনীয় রং ছিল সবুজ। তবে তাতে হালকা সবুজ ডোরা থাকা পছন্দ করতেন। একেবারে নির্ভেজাল লাল পোশাক খুবই অপছন্দ করতেন। (শুধু পোশাক নয়, বরং অন্যান্য জিনিসে লাল রং ক্ষেত্র বিশেষে নিষিদ্ধ করেছেন। তবে হালকা লাল রং এর ডোরাকাটা কাপড় তিনি পরতেন। অনুরূপ হালকা হলুদ (মেটে রং) এর পোশাকও পরেছেন।

রসূল (সাঃ) এর জুতা প্রচলিত আরবী কৃষ্টি অনুসারে চপ্পল বা খড়মের আকৃতি বিশিষ্ট ছিল। এর দুটো ফিতে থাকতো। একটা থাকতো পায়ের বুড়ো আংগুল ও তার পার্শববর্তী আংগুলের মাঝখানে। আর অপরটা থাকতো তার পার্শববর্তী দু’ আংগুলের মাঝে। জুতোর পশম থাকতোনা। অন্যান্য সাধারণ লোকদের জুতোর মত এটি এক বিঘত ২ আংগুল লম্বা হতো। কখনো দাঁড়িয়ে এবং কখনো বসে জুতো পরতেন। পরবার সময় প্রথমে ডান ও পরে বাম পা ঢুকাতেন। আর খোলার সময় প্রথমে বাম ও পরে ডান পা বের করতেন। মোজা পরতেন সাধারণ, মধ্যম ও উৎকৃষ্ট মানের। বাদশাহ নাজ্জাসী কালো মোজা উপহার দিয়েছিলেন। সেটি পরেছিলেন এবং তার ওপর মোসেহ করতেন। অনুরূপভাবে দিহয়া কালবীও মোজা উপহার দিয়েছিলেন এবং তিনি তা ছেড়ার আগ পর্যমত্ম পরেছেন।

রূপার আংটি ব্যবহার করেছেন।এতে রূপার ফলকও ছিল। কখনো হাবশী পাথরের ফলকও থাকতো। কোন কোন বর্ণনা মতে, লোহার আংটিতে রূপার পালিশ দেয়া থাকতো। অপর দিকে তিনি যে লোহার আংটি গহনা অপছন্দ করতেন তা সুবিদিত। আংটি সাধারণত ডান হাতেই পরতেন। তবে কখনো কখনো বাম হাতেও পরেছেন। মধ্যমা ও তর্জনী আংগুলে পরতেন না। মধ্যমার পার্শববর্তী আংগুলে পরাই পছন্দ করতেন। ফলক ওপরের দিকে নয় বরং হাতের পাতার দিকে রাখতেন। ফলকে ‘‘মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’’ খোদাই করা ছিল। এ দ্বারা তিনি চিঠিতে সিল দিতেন। ঐতিহাসিকগণের মতানুসারে এ আংটি সিলের প্রয়োজনেই বানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক পদমর্যাদার কারণে এর প্রয়োজন ছিল অপরিহার্য।

 

বেশভূষা ও সাজ সজ্জা

রসূল (সাঃ) চুল খুব সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতেন। প্রচুর তেল ব্যবহার করতেন। চিরম্ননী দিতেন, সিথি কাটতেন, ঠোটের বাড়তি পশম ছেঁটে ফেলতেন, দাড়িও লম্বায় চওড়ায় কাঁচি দিয়ে সমান করে রাখতেন। সাথীদেরকেও এ ব্যাপারে প্রশিক্ষন দিতেন। যেমন, এক সাহাবীকে এলোকেশী অবস্থায় দেখে খুবই ভৎর্সনা করলেন। এক সাহাবীর দাড়ির বাড়তি চুল নিজেই ছেঁটে দেন।বললেন, যে ব্যক্তি মাথার চুল বা দাড়ি রাখবে, তার সেটা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা উচিত। কাতাদাহকে বলেছিলেন, দাড়িকে সুন্দরভাবে রাখো। [আবু দাউদ]।

এ ব্যাপারে রসূল সা. তাকীদ করেছেন এ জন্য যে, অনেক সময় ধর্মীয় শ্রেণীর লোকেরা পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যায়। বিশেষতঃ বৈরাগ্যবাদী তাসাউফের প্রবক্তরা নোংরা থাকাকে উচ্চ মর্যাদার আলামত মনে করে থাকে। এই বিভ্রান্তি তিনি দূর করার ব্যবস্থা করেন। প্রবাসে বা গৃহে যেখানেই থাকুক, সাতটা জিনিস সব সময় কাছে ও বিছানার নিকট রাখতেনঃ তেলের শিশি, চিরুনী, সুর্মাদানী(কালো সুর্মা), কাচি, মেসওয়াক, আয়না এবং এক টুকরো হালকা কাঠ।

রাত্রে শোবার সময় প্রতি চোখে তিনবার করে সুর্মা নিতেন। শেষ রাতে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে ওযূ করতেন, পোশাক বদলাতেন, সুগন্ধী লাগাতেন। রায়হান নামক সুগন্ধী বেশী পছন্দ করতেন। মেহেন্দীর ফুলের সুগন্ধীও ভালোবাসতেন। সবচেয়ে বেশী প্রিয় ছিল মেশক ও চন্দনের সুগন্ধী।

বাড়ীতে সুগন্ধী দ্রব্যের ধুঁয়া ছড়াতেন। একটা আতরদানীতে উচ্চমানের সুগন্ধী থাকতো এবং ব্যবহৃত হতো। (কখনো কখনো হযরত আয়েশা নিজ হাতে সুগন্ধী লাগিয়ে দিতেন)। এ কথা সুপ্রসিদ্ধ যে, তিনি যে গলি দিয়ে হেঁটে যেতেন, সে গলি দীর্ঘ সময় সুবাসিত থাকতো। বাতাসই বলে দিত এখান দিয়ে একটু আগে চলে গেছেন সেই চিরবসন্তের বার্তাবাহক। কেউ সুগন্ধী দ্রব্য উপহার দিলে তা অবশ্যই গ্রহণ করতেন। কেউ যদি তাঁর সুগন্ধী উপহার গ্রহণ না করতো, তবে অসন্তুষ্ট হতেন। ইসলামী সংস্কৃতির বিশেষ অভিরুচি অনুযায়ী তিনি পুরুষদের জন্য এমন সুগন্ধী পছন্দ করতেন যার রং অদৃশ্য থাকে এবং সৌরভ চারদিকে ছড়ায়, আর মহিলাদের জন্য এমন সুগন্ধী পছন্দ করতেন, যার রং দেখা যায় এবং সৌরব ছড়ায়না।

 

চলাফেরা

রসূল (সাঃ) এর চলাফেরায় গাম্ভীর্য, আত্ম সম্মানবোধ, ভদ্রতা ও দায়িত্ববোধ প্রতিফলিত হতো। দৃঢ়ভাবে পা ফেলে চলতেন। অলসভাবে পা ঘসে ঘসে চলতেননা। চলার সময় দেহ থাকতো গুটানো। ডানে-বামে না তাকিয়ে পথ চলতেন। সামনের দিকে সতেজ পা তুলতেন। চলার সময় শরীর কিছুটা সামনের দিকে ঝুকে থাকতো। মনে হতো যেন ওপর থেকে নিচে নামছেন। হিন্দ বিন আবি হালার ভাষায়, ‘তাঁর চলা দেখে মনে হতো পৃথিবী তার চলার সাথে সাথে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কখনো দ্রুত চললে পা দূরে দূরে রাখতেন। তবে সাধারণত মধ্যম গতিতে চলতেন। কিন্তু হযরত আবু হুরায়রা রাঃ ভাষায় ‘আমাদের পক্ষে তাঁর সাথে চলাই কষ্টকর হতো।’ তাঁর চলার ধরন ছিল সূরা লুকমানের ‘যমীনের ওপর দিয়ে দম্ভভরে চলোনা।’ এই নির্দেশটির বাস্তব প্রতিফলন।

 

কথা বার্তা

কথাবার্তা মানুষের বিশ্বাস,চরিত্র ও মর্যাদাকে পুরোপুরিভাবে উন্মোচিত করে। কথাবার্তার বিষয় ও শব্দ চয়ন, বাক্যের গঠন, স্বরের উত্থান পতন, বলার ভংগী ও বর্ণনার তেজস্বীতা এই সব কিছু বুঝিয়ে দেয় বক্তা কোন পর্যায়ের ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

রসূল (সাঃ) এর দায়িত্ব ও পদমর্যাদা এমন ছিল যে, সেই গুরুভার অন্য কারো ওপর চাপানো হলে সে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে যেত এবং সে নির্জনে থাকা পছন্দ করতো। কিন্তু রসূল(সাঃ) এর অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল এই যে, একদিকে তিনি পাহাড় সমান গুরুদায়িত্ব ও চিন্তার বোঝা বয়ে বেড়াতেন এবং নানা রকম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর সময় কাটতো। অপর দিকে লোকজনের সাথে গভীরভাবে মেলামেশা করতেন এবং দিনরাত আলাপ আলোচনাও চলতো। মেযাজে গাম্ভীর্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল হাসি তামাসা ও রসিকতা। পরস্পর বিরোধী গুণাবলীতে তাঁর বিস্ময়কর ভারসাম্য ছিল। একটা বিশ্বজোড়া আন্দোলন, পুরো একটা সাম্রাজ্যের সমস্যাবলী, একটা সমাজ ও সংগঠনের নানা জটিলতা এবং নিজের একটা বিরাট পরিবারের দায়িত্ব তাঁর জন্য পাহাড় সমান বোঝা ছিল। এই বোঝা তাঁরই কাঁধে চাপানো ছিল।ইমাম হাসান (রঃ) তাঁর মামা হিন্দ বিন আবি হালার বরাত দিয়ে বলেন, ‘রসূলুল্লাহ (সাঃ) সব সময় নানা ধরনের ব্যস্ততায় থাকতেন। নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে কেবল ভাবতেন আর ভাবতেন। কখনো তিনি এক মুহূর্ত চিন্তামুক্ত থাকতে পারেননি। দীর্ঘ সময় ধরে চুপচাপ থাকতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। [শামায়েলে তিরমিযী, রসূল(সাঃ) এর কথা বলার ধরণ সংক্রান্ত অধ্যায়]।

কিন্তু তিনি একজন প্রচারক ও আহবায়ক এবং একটা আন্দোলনের নেতা ছিলেন। এ জন্য প্রচার, শিক্ষাদান, সংস্কার ও সংশোধন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত তৎপরতা চালানোর জন্য জনগণের সাথে যোগাযোগ অত্যাবশ্যক ছিল। আর এই যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন মাধ্যম ছিল কথা বলা। তাই সব রকমের আলাপ আলোচনায় অংশ গ্রহণ করাও ছিল তাঁর রীতি। হযরত যায়েদ বিন ছাবেত বলেনঃ ‘যখন আমরা দুনিয়াবী বিষয়ে আলোচনা করতাম, তখন রসূল (সাঃ) তাতেও অংশ নিতেন। যখন আমরা আখেরাতের বিষয়ে কথা বলতাম, তখন তিনিও সে বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন। আমরা যখন খানাপিনা সম্পর্কে কোন কথা বলতাম, তখন তিনিও তাতে যোগ দিতেন। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও রসূল (সাঃ) কসম খেয়ে বলেছেন যে, আমার মুখ দিয়ে সত্য কথা ও ন্যায্য কথা ছাড়া আর কিছুই বের হয়নি। কোরআনও সাক্ষ্য দিয়েছে যে, তিনি মনগড়া কিছু বলেননা।’

কথা বলার সময় প্রতিটি শব্দ ধীরে ধীরে ও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতেন যে, শ্রোতা তা সহজেই মুখস্ত করে ফেলতো, এমনকি শব্দগুলো বলার সাথে সাথে গণনাও করা যেত। উম্মে মা’বাদ তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, “তাঁর কথা যেন মুক্তোর মালা।” প্রয়োজনের চেয়ে কথা বেশীও বলতেন না, কমও বলতেন না। বেশী সংক্ষিপ্তভাবেও বলতেন না, অতিরিক্ত লম্বা করেও বলতেন না। কথার ওপর জোর দেয়া, বুঝানো এবং মুখস্থ করার সুবিধার্থে বিশেষ বিশেষ কথা ও শব্দকে তিনবার করে উচ্চারন করতেন। কোন কোন বিষয়ে স্পষ্টোক্তি সমীচীন মনে না করে আভাসে ইংগিতে কথা বলতেন। অশোভন, অশ্লীল ও নির্লজ্জ ধরনের কথাবার্তাকে ঘৃণা করতেন। কথাবার্তার সাথে সাধারণত একটি মুচকি হাসি উপহার দিতেন। আব্দুল্লাহ বিন হারিস বলেন, ‘আমি রসূল সা. এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসতে কাউকে দেখিনি।’ এ মুচকি হাসি তাঁর গাম্ভীর্যকে কঠোরতায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতো এবং সাথীদের কাছে আকর্ষণীয়তা বাড়াতো। কথা বলতে বলতে বারবার আকাশের দিকে তাকাতেন। বক্তব্য রাখার মাঝে কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার জন্য হঠাৎ হেলান দেয়া অবস্থা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসতেন এবং বিশেষ বাক্যকে বারবার উচ্চারণ করতেন। শ্রোতাদেরকে কোন বিষয়ে সাবধান করতে চাইলে কথার সাথে সাথে মাটিতে হাত দিয়ে থাপড়াতেন। কোন কথা বুঝানোর ব্যাপারে হাত ও আংগুলের ইশারা দিয়েও সাহায্য নিতেন। যেমন, দুটো জিনিসের একত্রে সমাবেশ বুঝাতে তর্জনী ও মধ্যমা আংগুলকে একত্র করে দেখাতেন। কখনোবা দুই হাতের আংগুলগুলোকে পরস্পরের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়ে দৃঢ়তা ও একাত্মতার ধারণা স্পষ্ট করতেন। কোন জিনিস বা কোন দিকে ইশারা করতে হলে পুরো হাতকেই নাড়াতেন। কখনো হেলান দিয়ে বসে জরুরী বিষয়ে আলোচনা করার সময় ডান হাতকে বাম হাতের পিঠের ওপর রেখে আংগুল যুক্ত করে নিতেন। বিস্ময় প্রকাশ করার সময় কখনো হাতের তালু উল্টে দিতেন। কখনো ডান হাতের তালু দিয়ে বাম হাতের বুড়ো আংগুলের মধ্যমাংশের ওপর আঘাত করতেন। কখনো মাথা দোলাতেন এবং ঠোঁটকে দাঁত দিয়ে চেপে ধরতেন। আবার কখনো হাত দিয়ে উরু চাপড়াতেন।

মক্কার কুরাইশ গোত্রের এক মার্জিত ভদ্র পরিবারের এই বিশিষ্ট ব্যক্তিটি বনু সা’দ গোত্রের পরিবেশে বেড়ে উঠে আরবের সবচেয়ে নির্ভুল ভাষা তো রপ্ত করছিলেনই, তদুপরি ওহীর প্রাঞ্জল ভাষা তাঁরা বাক্যালাপের মাধুর্যকে আরো পরিশীলিত করে দিয়েছিল। বস্তুত তিনি ছিলেন আরবের সর্বাপেক্ষা সুভাষী মানুষ। রসূল সা. এর ভাষার সাহিত্যিক মান যেমন উচ্চ ও উৎকৃষ্ট ছিল, তেমনি তা ছিল সহজবোধ্য এবং সরলও। সহজবোধ্য ভাষা ব্যবহার করলেও তিনি কখনো নিচুমানের ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করেননি, আর কোন কৃত্রিম ধরনের ভাষাও পছন্দ করতেননা। সত্য বলতে কি, রসূল সা. নিজের দাওয়াত ও নিজের লক্ষ্যের প্রয়োজনে একটা নিজস্ব ভাষা তৈরী করে নিয়েছিলেন এবং একটা স্বতন্ত্র বাচনভংগীও বানিয়ে নিয়েছিলেন। রসূল সা. এর একটি উক্তি ‘যুক্ত একটা কৌশল’ এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ছা’লাব বলেছেন যে, এটা রসূল সা. এর বিশেষ ভাষা। তিনি বহু পরিভাষা তৈরী করছেন। বহু নতুন বাগধারা, উপমা ও উদাহরণ উদ্ভাবন করেছেন। বক্তৃতার এক নতুন পদ্ধতি প্রচলন করেছেন, এবং প্রচলিত বহু শব্দ ও পদ্ধতি বর্জন করেছেন। একবার বনু নাহদ গোত্রের কয়েক ব্যক্তি এল এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা করলো। এই আলোচনার সময় আগন্তুকগণ অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে, ‘হে রসূলুল্লাহ, আপনি ও আমরা একই মা বাপের সন্তান এবং একই জায়গায় লালিত পালিত হয়েছি। তবুও আপনি এমন আরবীতে কথা বলেন, যার মর্মার্থ আমাদের অধিকাংশ লোকই বুঝতে পারেনা। এর রহস্যটা কী?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ্‌ স্বয়ং আমাকে ভাষা ও সাহিত্য শিখিয়েছেন, তাই সর্বোত্তম ভাশাই শিখিয়েছেন। তাছাড়া আমি বনু সা’দ গোত্রে পালিত হয়েছি। এটাই এর রহস্য।’ একবার জনৈক সাক্ষাতপ্রার্থীর সাথে কথা বলছিলেন এবং হযরত আবু বকর গভীর মনোযোগ দিয়ে তা শুনছিলেন। তিনি জিজ্ঞাস করলেন, ‘এই লোক আপনাকে কী বলেছে এবং আপনি কী বলেছেন?’ রসূল সা. বুঝিয়ে দিলেন। অতঃপর হযরত আবু বকর বলতে লাগলেন, ‘আমি সমগ্র আরবের আনাচে কানাচে ঘুরেছি এবং আরবের শ্রেষ্ঠ বাগ্মীদের বিশুদ্ধ ও সাবলীল বক্তব্য শুনেছি। কিন্তু আপনার চেয়ে মিষ্টিমধুর কথা আর কারো মুখ থেকে শুনিনি।’ এখানেও রসূল সা. একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন যে, আল্লাহ্‌ই আমাকে ভাষা শিখিয়েছেন এবং আমি বনু সা’দ গোত্রে লালিত পালিত হয়েছি। অনুরূপভাবে একবার হযরত ওমর রা. বললেন, হে রাসূল আপনিতো কখনো আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকেননি, তবু আপনি আমাদের সবার চেয়ে সুন্দর ও বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন কিভাবে? তিনি বললেন, ‘আমার ভাষা ইসমাঈল আ. এর ভাষা। ওটা আমি বিশেষভাবে শিখেছি। জিবরীল এ ভাষাই আমার কাছে নিয়ে এসেছে এবং আমার অন্তরে তা বদ্ধমূল করেছেন।’ অর্থাৎ রসূল সা. এর ভাষা সাধারণ আরবী ছিলনা, বরং বিশেষ নবীসুলভ ভাষা ছিল এবং তা হযরত ইসমাঈলের ভাষার অনুরূপ ছিল। আর জিবরীল যে ভাষায় কোরআন নাযিল করতেন তাও ছিল সেই নবী সুলভ ভাষা।

এখানে মনে রাখা দরকার যে, বড় বড় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, বিশেষতঃ নবীগণ, যারা একটি বিশেষ ব্রত ও লক্ষ্য নিয়ে এসে পরিবেশের সাথে দ্বন্দ্ব সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন এবং যাদের মধ্যে সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের আবেগ বিরাজ করে, তারা যখন কথা বলেন, তখন তাতে তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের মহত্ব গভীর তাৎপর্য ফুটিয়ে তোলে, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা তার সাহিত্যিক মানকে উন্নত করে এবং তাদের চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব তাকে পবিত্রতর করে।

রসূল সা. এর অন্যতম বিশিষ্ট ছিল এই যে, তাঁকে ‘জাওয়ামিউল কামিল’ দ্বারা ভূষিত করা হয়েছিল। তিনি নিজেই বলেছেন, [মুসলিমঃ আবু হুরাইয়রা (রা)] (আমাকে ‘জাওয়ামিউল কালিম’ দেয়া হয়েছে।) রসূল সা. এর সংক্ষিপ্ততম বাক্যগুলো ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে তাকেই বলা হয় ‘জাওয়ামিউল কালিম’। স্বল্পতম শব্দে ব্যাপকতম অর্থ বুঝানোতে রসূল সা. এর জুড়ি ছিলনা এবং একে তিনি আল্লাহ্‌র বিশেষ দান বলে গণ্য করেছেন।

এখানে তাঁর জাওয়ামিউল কালিমের কিছু উদাহরণ দেয়া যাচ্ছেঃ-

১। (*******) মানুষ যাকে ভালোবাসে, কেয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে।

২। (*******) মুসলিম হও শান্তিতে থাকতে পারবে। [রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নামে প্রেরিত দাওয়াত পত্রের অংশ।]

৩। (******) নিয়ত অনুসারে কাজের বিচার হবে।

৪। (******) যে কাজ করে, সে কেবল আপন নিয়ত অনুযায়ীই তার ফল পায়।

৫। (******) সন্তান যারা গৃহে ভূমিষ্ঠ হয়, তার। আর ব্যভিচারীর জন্য পাথর।

৬। (******) যুদ্ধ একটি কৌশল।

৭। (******) দেখা ও শোনা এক কথা নয়।

৮। (******) বৈঠকের জন্য বিশ্বস্ততা জরুরী।

৯। (******) খারাপ কাজ বর্জন করাও একটা ভালো কাজ।

১০। (******) জনগণের যিনি সেবা করেন, তিনিই তাদের নেতা।

১১। (******) প্রত্যেক সৌভাগ্যশালী ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা পোষণ করা হয়।

১২। (******) ভালো কথা বলাও সৎ কাজের শামিল।

১৩। (******) যে দয়া করেনা, সে দয়া পায়না।

সাধারণত ভাষা, বাচনভংগী ও বিষয়বস্তু দ্বারা রসূল সা. এর উক্তি চেনা যায়। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থাবলীতে রসূল সা. এর উক্তি সমূহ মুক্তার মত উজ্জ্বল। অল্প ক’টা শব্দ, শব্দগুলোর মধ্যে চমৎকার সমন্বয়, অর্থের গভীরতা ও হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী আন্তরিকতা রসূল সা. এর কথায় উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট। এ সব বৈশিষ্টে সমৃদ্ধ দু’ একটা কথা উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করছিঃ

আমি তোমাদেরকে সদা সর্বদা আল্লাহ্‌কে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। সামষ্টিক ব্যবস্থার জন্য নেতার আদেশ শ্রবণ ও অনুসরণের জোর আহ্বান জানাচ্ছি চাই সে নেতা কোন নিগ্রো ক্রীতদাসই হোকনা কেন। কেননা তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে বেঁচে থাকবে, তারা অসংখ্য মতভেদে লিপ্ত থাকবে। এমতাবস্থায় তোমাদের কর্তব্য আমার ও আমার সুপথপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের পথ অবলম্বন করা, তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং দাঁতের মাড়ি দিয়ে চেপে ধরা। সাবধান, ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন নিয়ম চালু করা থেকে বিরত থেকো। কেননা প্রত্যেক নতুন নিয়ম বেদয়াত। আর প্রত্যেক বেদয়াত গোমরাহী।২৪ [২৪. মিশকাত- বাবুল ইতিসাম বিন কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ ]।

আমর বিন আবাসা রা. রসূল সা. এর কাছে কিছু প্রশ্ন রাখেন এবং তিনি এগুলোর খুব সংক্ষিপ্ত ও ক্ষুদ্র জবাব দেন। এই ক্ষুদ্র সংলাপটি লক্ষ্য করুন !

- এই কাজে (ইসলামী দাওয়াত ও আন্দোলনে) প্রথম প্রথম আপনার সাথে কে কে ছিল?

- একজন স্বাধীন মানুষ (হযরত আবু বকর) এবং একজন ক্রীতদাস (হযরত যায়েদ)।

- ইসলাম কী?

- ভালো কথা বলা ও ক্ষুধার্তদের খাওয়ানো।

- ঈমান কী?

- ধৈর্য ও দানশীলতা।

- কার ইসলাম সর্বোত্তম?

- যার জিহ্বা ও হাতের বাড়াবাড়ি (অর্থাৎ মন্দ কাজ ও মন্দ কথা) থেকে মানুষ নিরাপদে থাকে।

- কার ঈমান উৎকৃষ্ট?

- যার চরিত্র ভালো তার।

- কি ধরনের নামায উত্তম?

- যে নামাযে বিনয়ের সাথে দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো হয়।

- কি ধরনের হিজরত উত্তম?

- তোমার প্রতিপালকের অপছন্দনীয় জিনিসগুলোকে চিরতরে পরিত্যাগ করা।

- কোন জেহাদ উত্তম?

- সেই ব্যক্তির জেহাদ, যার ঘোরাও রণাঙ্গনে মারা যায় আর সে নিজেও শহীদ হয়।

- কোন সময়টা (এবাদতের জন্য) সর্বোত্তম?

- রাতের শেষ প্রহর। [মেশকাত- কিতাবুল ঈমান।]

একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, প্রধানত কোন জিনিস মানুষের জন্য জাহান্নাম অনিবার্য করে তোলে? তিনি জবাব দিলেন, “মুখ ও লজ্জাস্থান।” [তিরমিযী- আবু হুরায়রা বর্ণিত।] মুখ দ্বারা বুঝানো হয়েছে কথা ও খাদ্য। আর লজ্জাস্থান দ্বারা বুঝানো হয়েছে অবৈধ যৌনাচার। অর্থাৎ খারাপ কথা, হারাম জীবিকা ও যৌন বিপথগামিতা মানুষের আখেরাতের ধ্বংসকারী সবচেয়ে বড় উপকরণ। অধিকাংশ যুলুম, নির্যাতন, দ্বন্দ্ব সংঘাতগুলোও এগুলো থেকেই জন্ম নেয়।

একবার হযরত আলী অনুরোধ করলেন, আপনি নিজের নীতি ব্যাখ্যা করুন। তিনি এর জবাবে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ এত অলংকার মণ্ডিত ভাষায় নিজের চিন্তাধারা, স্বভাব ও আধ্যাত্মিকতার এমন ব্যাপক চিত্র তুলে ধরলেন, যা মানুষের ভাষার ইতিহাসে এক অলৌকিক নিদর্শন। তিনি বললেনঃ

“আল্লাহ্‌র পরিচয় আমার পুঁজি, বুদ্ধি আমার দীনের মূল, ভালোবাসা আমার ভিত্তি। আকাংখা আমার বাহন, আল্লাহ্‌র স্মরণ আমার বন্ধু, আস্থা ও বিশ্বাস আমার সাথী, জ্ঞান আমার অঙ্গ, ধৈর্য আমার পোশাক, আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি আমার জন্য অতিবড় নিয়ামত, বিনয় আমার সম্মান, যোহাদ তথা পার্থিব সম্পদ নিস্পৃহতা আমার পেশা, প্রত্যয় আমার শক্তি (উচ্চারণ ভেদে অর্থ খাদ্য), সত্যবাদীতা আমার সুপারিশকারী। আনুগত্য আমার রক্ষাকবচ, জেহাদ আমার চরিত্র আর নামায আমার চক্ষু শীতলকারী।” [কাজী আইয়াযঃ আশ শিফা।]

উদাহরণ ও উপমার অনেক বিরল দৃষ্টান্ত রসূল সা. এর কথায় পাওয়া যায়। এগুলোর সাহায্যে তিনি বেদুইনদেরকে অনেক বড় বড় জিনিস বুঝিয়ে দিতেন। এখানে তার একটি উপস্থাপন করছিঃ

“আল্লাহ্‌ তায়ালা আমাকে হেদায়াত ও এলমের যে পুঁজি দান করেছেন, তার উদাহরণ এরূপ, যেন পৃথিবীতে মুষলধারে বৃষ্টি হলো। তারপর পৃথিবীর যে অংশটা সবচেয়ে উর্বর, তা পানিকে খুব চুষে নিল। এর ফলে ঢলে পড়া তরুলতা সব তরতাজা হয়ে গেল এবং নতুন নতুন গাছ গাছালি জন্ম নিল। এ ছাড়া ভূমির কিছু শক্ত অংশ এমনও ছিল, যা পানিকে তার ভেতরে সঞ্চিত করে রাখলো এবং আল্লাহ তাতে মানুষের জন্য বহু উপকার নিহিত রাখছেন। তিনি তা থেকে পানি সেচ করালেন। তারপর এই পানি তিনি অন্য একটা ভুখন্ডেও বর্ষালেন যা পাথরে পরিপূর্ণ ছিল। এই মাটি পানিকে সঞ্চয় করেও রাখলোনা, নিজের ভেতরে শুষে নিয়ে উর্বরতার লক্ষণও দেখালোনা। এর একটি হলো সেই সব লোকদের উদাহরণ যারা ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ আমাকে যে নির্দেশাবলী দিয়েছেন তা দ্বারা উপকৃত হয়। তারা নিজেরাও ইসলামের জ্ঞান অর্জন করে এবং অন্যদেরকেও শেখায়। দ্বিতীয় উদাহরণটা যারা আমার দাওয়াতকে এবং আমার মাধ্যমে আল্লাহ্‌র পাঠানো হেদায়াতকে গ্রহণ করেনি তাদের।”

রসূল সা. এর কথা বলার নীতিকে যদি কোন শিরোনাম দিতে হয়, তবে তা কোরআনের এই বাক্য দ্বারা দেয়া চলে যে, “মানুশকে আকর্ষণীয় ভাষায় আহ্বান জানাও।” রসূল সা. এর চিত্তাকর্ষক বাক রীতিতে সরলতার ভাব নিহিত ছিল, কৃত্রিমতা থেকে তিনি থাকতেন বহুদুরে। তিনি বলেনঃ

“তোমাদের মধ্যে যারা কেয়ামতের দিন আমার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী দূরে থাকবে তারা হলো ঐ সবলোক যারা অতিরঞ্জিত করে কথা বলে, বেশী কথা বলে এবং কথার মধ্যে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করে।”

তাছাড়া বাচালতাপূর্ণ ও অশ্লীল কথাবার্তাও তিনি খুবই অপছন্দ করতেন। তাঁর মজলিস সব সময় হাস্যোজ্জল থাকতো এবং তাঁর চেহারাই ছিল সবচেয়ে বেশী হাসিময়, যদিও কঠিন দায়িত্ব ও বিপদমুসিবতে প্রায় সর্বদাই ঘেরাও হয়ে থাকতেন।

 

বক্তৃতা

কথাবার্তারই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বক্তৃতা। রসূল সা. মানব জাতির জন্য একটা বিরাট ও মূল্যবান বার্তা বয়ে এনেছিলেন এবং সে জন্য বক্তৃতা ছিল অপরিহার্য। আরবরা এমনিতেও সুবক্তা হতো। বিশেষত কুরাইশগণ হতো অসাধারণ বক্তৃতা শক্তির অধিকারী। আরব ও কুরাইশদের বক্তৃতার পরিবেশ থেকে রসূল সা. অনেক ঊর্ধে থাকতেন। নেতাসূলভ কর্তব্যের তাগিদে কখনো বক্তৃতা দেয়ার প্রয়োজন হলে তিনি কাল বিলম্ব না করেই সময়োপযোগী ভাষণ দিতেন। তখন তার জিহ্বা কখনো ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসের মত, কখনো প্রবল স্রোতধারার মত এবং কখনো ধারালো তরবারীর মত সক্রিয় হয়ে উঠতো।

তবে তিনি বেশী ঘন ঘন বক্তৃতা ও ভাষণ দেয়া থেকে বিরত থাকতেন। সমাজের প্রয়োজন ও তার সার্বিক পরিবেশ অনুসারে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা দিতেন। মসজিদে বক্তৃতা দিলে নিজের লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাড়াঁতেন, আর যুদ্ধের ময়দানে ভাষণ দিলে কামানের ওপর হেলান দিয়ে দাড়াঁতেন। কখনো কখনো বাহন জন্তূর পিঠের ওপর বসে ভাষণ দিতেন। বক্তৃতার সময় শরীর ডান দিকে ও বাম দিকে ঈষৎ ঝুঁকে যেত। প্রয়োজনমত হাত নাড়তেন। বক্তৃতার মধ্যে কখনো কখনো ‘যার হাতে আমার প্রাণ, বা যার হাতে মুহাম্মদের জীবন তার শপথ’ এই বলে শপথ করতেন। তাঁর মনের ভাবাবেগ তাঁর স্বরে ও চেহারায় সমভাবে প্রতিফলিত হতো এবং শ্রোতাদের ওপরও তার প্রভাব পড়তো। এই মহামানবের ভাষণ মানুষের মনকে প্রচন্ডভাবে আলোড়িত করতো। এখানে আমি শুধু দুটো উদাহরণ দেবো। হোনায়ন ও তায়েফ যুদ্ধের পর রসূল সা. যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টন করার সময় কোরআনের সুস্পষ্ট বিধান মোতাবেক মাক্কার নওমুসলিম সরদারদেরকে বেশ বড় বড় অংশ দিলেন, যাতে তাদের মন আরো নরম হয় এবং তারা মহানুভবতার বন্ধন দ্বারা ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে আরো ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ হয়। আনসারগণের মধ্যে কেউ কেউ এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলেন। তারা বললেনঃ

“রসূল সা. কুরাইশদের অনেক পুরস্কার দিলেন, আর আমাদেরকে বঞ্চিত রাখলেন। অথচ আমাদের তলোয়ার থেকে এখনো রক্তের ফোঁটা ঝরছে’’ কেউবা বললেন‍ঃ

“বিপদাপদে আমাদের কথা মনে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ পেয়ে যায় অন্যরা।’’

এই সব কথাবার্তা রসূল সা. এর কানেও গেল। তখন একটা চামড়ার তাঁবু খাটিয়ে সেখানে আনসারদের সমবেত করা হলো। রসূল সা. তাদের জিজ্ঞাসা করলেনঃ “তোমরা কি এ সব কথা বলেছ?’’ জবাব দেয়া হলোঃ “আপনি যা শুনেছেন তা সত্যি। তবে এ সব কথা আমাদের দায়িত্বশীল লোকেরা বলেনি। কতক যুবক এ কথাগুলো বলেছে।’’ পুরো ঘটনার তদন্ত শেষে রসূল সা. নিম্নরূপ ভাষণ দিলেনঃ

‘এ কথা কি সত্য নয় যে, তোমরা প্রথমে পথভ্রষ্ট ছিলে, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের সুপথে পরিচালিত করলেন? তোমরা কতটা বিচ্ছিন্ন ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন? তোমরা দরিদ্র ছিলে, আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের স্বচ্ছল বানিয়েছেন? (প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে আনসারগণ বলছিলেন, নিসন্দেহে আমাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনেক দান রয়েছে।)

‘না, তোমরা বরং জবাবে এ কথাও বলতে পারতে যে, হে মুহাম্মদ, তোমাকে যখন সবাই প্রত্যাখ্যান করেছে, আমরা তখন তোমার ওপর ঈমান এনেছি। তোমাকে যখন লোকেরা বিতাড়িত করেছে, আমরা তখন তোমাকে আশ্রয় দিয়েছি। তুমি যখন নিসম্বল অবস্থায় এসেছিলে, আমরা তখন তোমাকে সাহায্যে করেছিলাম। তোমরা যদি জবাবে এসব কথা বল, আমি অবশ্যই বলবো যে, তোমাদের কথা সত্য। কিন্তু ওহে আনসারগণ! তোমাদের কি এটা পছন্দ নয় যে, অন্য সবাই উট ছাগল ইত্যাদি নিয়ে যাক, আর তোমরা মুহাম্মদ সা. কে নিয়ে ‍বাড়ী চলে যাও? (বোখারী)

কথার চড়াই উৎরাই দেখুন, নাযুক ভাবাবেগ দ্বারা শানিত বক্তৃতার তেজ দেখুন, ভাষণের প্রাঞ্জলতা দেখুন এবং তারপর ভাবুন যে, বক্তা কিভাবে শ্রোতাদের মধ্যে ইপ্সিত প্রেরণার সঞ্চার করলেন। আনসারগণ স্বতস্ফূর্তভাবে চিৎকার করে বলে উঠলেনঃ “আমরা শুধু মুহাম্মদ সা. কে চাই, আর কিছু চাইনা।’’

দাওয়াতের সূচনা পর্বে সাফা পর্বতের ওপর থেকে প্রদত্ত ভাষণ ছাড়াও তিনি একাধিকবার কুরাইশদের সামনে ভাষণ দিয়েছেন। এই যুগের একটা ভাষণের উদ্ধৃতি লক্ষ্যণীয়ঃ

“কাফেলার পথপ্রদর্শক কখনো কাফেলাকে ভুল তথ্য জানায়না। আল্লাহর কসম, আমি যদি অন্য সকলের সাথে মিথ্যা বলতে রাযীও হয়ে যেতাম, তবুও তোমাদের সাথে মিথ্যা বলতামনা। অন্য সবাইকে যদি ধোকা দিতাম, তবুও তোমাদের ধোকা দিতামনা। সেই আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া আর কেউ এবাদত উপাসনা পাওয়ার যোগ্য নেই, আমি তোমাদের কাছে বিশেষভাবে এবং সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে সামগ্রিকভাবে আল্লাহর রসূল। আল্লাহর কসম, তোমরা যেমন ঘুমাও ও ঘুম থেকে জাগো, তেমনি তোমাদের মৃত্যু ও মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবন সুনিশ্চিত। তোমাদের কাছ থেকে অবশ্যই তোমাদের কৃত কর্মের হিসাব নেয়া হবে এবং তোমাদেরকে ভালো কাজের ভালো প্রতিফলন ও মন্দ কাজের মন্দ পরিণাম তোমাদের ভোগ করতেই হবে। অতপর হয় চিরদিনের জন্য জান্নাত, নচেত চিরদিনের জন্য জাহান্নাম।’’

কত সরল ও সাবলীল বর্ণনাভংগী এবং কত যুক্তিপূর্ণ এবং আবেগপূর্ণ আবেদন। আহ্বায়কের হিতাকাংখা প্রতিটি শব্দের মধ্য দিয়ে নিসৃত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি বাক্য বিশ্বাস ও প্রত্যয় দ্বারা পরিপূর্ণ। এই ক্ষুদ্র ভাষণটিতে উদাহরণও দেয়া হয়েছে। তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাতের মৌলিক দাওয়াত এতে পরিপূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত।

রসূলের সা. আরো দুটো ঐতিহাসিক ভাষণ রয়েছে। একটা মক্কা বিজয়ের পর এবং অপরটি বিদায় হজ্জের সময় দিয়েছিলেন। এই ভাষণ দুটি একেবারেই বৈপ্লবিক প্রকৃতির এবং ঐ দুটোতে ঈমান, নৈতিকতা ও ক্ষমতা–তিনটেরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। বিদায় হজ্জের ভাষণ তো বলতে গেলে একটা নবযুগের উদ্ভোধনের ঘোষণা।

 

সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ

সাধারণত বড় বড় কাজ যারা করেন, তারা সর্বশ্রেণীর মানুষের সাথে যোগাযোগ করার সময় পান না এবং সব দিকে মনোযোগও দিতে পারেন না। উচুঁ স্তরের লোকদের অনেকের মধ্যে নির্জনতা প্রিয় ও মেযাজের রূক্ষতার সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ দাম্ভিকতায় লিপ্ত হয়ে নিজের জন্য স্বতন্ত্র এক ভূবন তৈরী করে নেয়। কিন্তু রসূল সা. ছিলেন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েও এবং ইতিহাসের গতি পরিবর্তনকারী কীর্তি সম্পন্ন করেও তিনি সর্বস্তরের জনগণের সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগ বজায় রাখতেন। সমাজের ব্যক্তিবর্গের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক রক্ষা করতেন। জন বিচ্ছিন্নতা, ধাম্ভিকতা বা রুক্ষতার নামগন্ধও তাঁর মধ্যে ছিলনা। আসলে তিনি যে ভ্রাতৃত্বমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তার অপরিহার্য দাবি ছিল জনগণ নিজেদের মধ্যে গভীর পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকুক। একে অপরের উপকার করুক এবং একে অপরের অধিকার সম্পর্কে অবগত থাকুক। আজকের পাশ্চাত্য জগতে যে ধরণের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির জন্ম হচ্ছে, তা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এ সংস্কৃতিতে কারো সাথে কারো কোন সম্পর্কে থাকেনা। এই সম্পর্কহীনতা এখন এক মানবতা বিধ্বংসী উপকরণে পরিণত হয়েছে। আজ ‍তাই মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে এই পরিবেশটাকে পাল্টে ফেলা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আসুন, রসূল সা. কে সাধারণ সামাজিক সংযোগের প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষণ করি।

তাঁর রীতি ছিল পথে যার সাথে দেখা হোক প্রথমে ছালাম দেয়া। কাউকে কোন খবর দিতে হলে সেই সাথে ছালাম পাঠাতে ভুলতেননা। তাঁর কাছে কেউ কারো ছালাম পৌঁছালে ছালামের প্রেরক ও বাহক উভয়কে পৃথক পৃথকভাবে ছালাম দিতেন। একবার এক শিশু কিশোরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ছালাম দিয়েছিলেন। মহিলাদের নিকট যাওয়ার সময় তাদেরকেও ছালাম দিতেন। বাড়ীতে প্রবেশকালে ও বাড়ী থেকে বেরুবার সময় পরিবার পরিজন ছালাম দিতেন। বন্ধুবান্ধবের সাথে হাতও মেলাতেন, আলিঙ্গনও করতেন। হাত মেলানোর পর অপর ব্যক্তি হাত না সরানো পযন্ত তিনি হাত সরাতেন না।

যখন বৈঠকাদিতে যেতেন, তখন সাহাবীগণ তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়াক, এটা পছন্দ করতেন না। বৈঠকের এক পাশেই বসে পড়তেন। ঘাড় ডিংগিয়ে ভেতরে ঢুকতেন না। তিনি বলতেনঃ ‘আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দা যেভাবে ওঠাবসা করে, আমি ও সেভাবেই ওঠাবসা করি।’ - হযরত আয়েশা কতৃক বণিত।

নিজের হাটু সংগীদের চেয়ে আগে বাড়িয়ে বসতেননা। কেউ তাঁর কাছে এলে তাঁকে নিজের চাদর বিছিয়ে বসতে দিতেন। ‍আগন্তুক নিজে না ওঠা পর্যন্ত তিনি বৈঠক ছেড়ে উঠতেন না।

কোন বৈঠকে অবান্তর বিষয়ে আলোচনার জন্য তুলতেননা। বরং যে বিষয়ে আলোচনা চলছে, তাতেই অংশ গ্রহণ করতেন। ফজরের জামায়াতের পর বৈঠক বসতো এবং সাহাবায়ে কেরামের সাথে অনেক কথাবার্তা বলতেন। কখনো জাহেলী যুগের কাহিনী এসে গেলে তা নিয়ে বেশ হাসাহাসি হতো। [জাবের বিন সামুরা (রা) কতৃক বণিত।] সাহাবীগণ কবিতাও পড়তেন। যে বিষয়ে বৈঠকের লোকদের মুখমন্ডলে বিরক্তি ও একঘেয়েমির চিহ্ন ফুটে উঠতো, সে বিষয় পরিবর্তন করতেন। বৈঠকের প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি মনোযোগ দিতেন, যাতে কেউ অনুভব না করে যে, তিনি তার উপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। কথার মাঝখানে কেউ অবান্তর প্রশ্ন তুললে তার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আলোচনা চালিয়ে যেতেন এবং আলোচনা শেষ করে ঐ ব্যক্তির দিকে মনোযোগ দিতেন। আলাপরত ব্যক্তির দিক থেকে ততক্ষণ মুখ ফেরাতেন না, যতক্ষণ সে নিজে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। কেউ কানে কানে কথা বললে সেই ব্যক্তি যতক্ষণ কথা শেষ না করে মুখ না সরায়, ততক্ষণ এক নাগাড়ে তার ‍দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে রাখতেন। নেহাৎ অন্যায় কথা না বললে কারো কথার মাঝখানে হস্তক্ষেপ করতেন না। এরূপ ক্ষেত্রে হয় ভুল ধরিয়ে দিতেন, নচেত ‍তার মুখমন্ডলে অসন্তোষের চিহ্ন ফুটে উঠতো, নয়তো উঠে চলে যেতেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করা পছন্দ করতেন না। অপ্রীতিকর বিষয়কে হয় এড়িয়ে যেতেন। নচেত আপত্তি জানানোর সাধারণ রীতি এই ছিল যে, সরাসরি নাম নিয়ে বিষয়টির উল্লেখ করতেন, বরং সাধারণভাবে ইংগিত করতেন কিংবা সামাজিকভাবে উপদেশ দিতেন। অত্যধিক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হলে, যা কেবল ইসলামী বিষয়ের ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হতো, বন্ধুবান্ধবকে সচেতন করার জন্য তিনি কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করতেন। হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাঁর কাছে এলে তার সালাম গ্রহণ করতেন না, কিংবা তার দিকে মনোযোগ দিতেন না। কোন অবাঞ্চিত লোক এসে পড়লেও ‍হাসিমুখে তাকে স্বাগত জানাতেন। একবার এমন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এল, ‍যাকে তিনি সংশ্লিষ্ট গোত্রের নিকৃষ্টতম ব্যক্তি বলে মনে করতেন। কিন্তু তিনি তার সাথে অমায়িকভাবে কথাবাতা বললেন। এটা দেখে হযরত আয়েশা বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি বললেনঃ আল্লাহর কছম, যে ব্যক্তির দুর্ব্যবহারের ভয়ে লোকেরা তার সাথে মেলামেশাই বন্ধ করে দেয়, কেয়ামতের দিন সে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি বলে গণ্য হবে। [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, পৃঃ ২৯১]

কারো সাথে সাক্ষাত করতে গেলে দরজার ডান দিকে বা বাম দিকে দাঁড়িয়ে নিজের উপস্থিতির কথা জানাতেন এবং ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেওয়ার জন্য তিনবার সালাম করতেন। সালামের জবাব না পেলে কোন রকম বিরক্ত না হয়ে ফিরে যেতেন। রাতের বেলায় কারো সাথে দেখা করতে গেলে এমন আওয়াযে সালাম করতেন যেন সে জাগ্রত থাকলে শুনতে পায়, আর ঘুমিয়ে গিয়ে থাকলে তার ঘুমের ব্যাঘাত না হয়।

তাঁর শরীর বা কাপড় থেকে কেউ ধূলি বা খড়কুটা সরিয়ে দিলে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলতেনঃ ‘আল্লাহ যেন কোন অপ্রীতিকর জিনিস তোমার কাছ থেকে দূর করে দেন।’ উপহার গ্রহণ করতেন এবং পাল্টা উপহার দেয়ার কথা মনে রাখতেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেউ তাঁর দ্বারা কষ্ট পেলে তাকে প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার দিতেন এবং কখনোবা তাকে বিনিময়ে কোন উপহার দিতেন। কেউ নতুন কাপড় পরে তাঁর সামনে এলে বলতেনঃ ****** ‘চমকার, চমৎকার, যত দীঘদিন পার ব্যবহার কর এবং পুরানো হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যবহার কর।’ খারাপ ব্যবহারের প্রতিশোধ খারাপ ব্যবহার দ্বারা নিতেন না। ক্ষমা করতেন। অন্যদের অপরাধ যখন ক্ষমা করতেন, তখন সেটা জানানোর জন্য প্রতীক স্বরূপ নিজের পাগড়ী পাঠিয়ে দিতেন। কেউ ডাক দিলে সব সময় ‘লাব্বাইক’ বলে ডাক শুনতেন, চাই সে নিজের পরিবারের লোক বা নিজের সাহাবীগণের মধ্য থেকে কেউ হোক না কেন।

রোগী দেখতে যেতেন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে। শিয়রে বসে জিজ্ঞেস করতেন তুমি কেমন আছ? রুগ্ন ব্যক্তির কপালে ও ধমনীতে হাত রাখতেন। কখনোবা বুকে, পেটে ও মুখমন্ডলে সস্নেহে হাত বুলাতেন। রোগী কি খেয়েছে জিজ্ঞেস করতেন। সে কোন কিছুর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করলে তা ক্ষতিকর না হলে এনে দিতেন। সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বলতেনঃ ‘চিন্তার কোন কারণ নেই, আল্লাহ চাহে তো অচিরেই তুমি রোগমুক্ত হবে।’ রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করতেন। হযরত সা’দের জন্য তিনবার দোয়া করেছিলেন। মোশরেক চাচাদেরও রোগব্যাধি হলে দেখতে যেতেন। একটা রুগ্ন ইহুদী শিশুকেও তিনি দেখতে গিয়েছিলেন। (শিশুাটি পরবর্তীতে ঈমান এনেছিল)। এ কাজের জন্য কোন দিন বা সময় নিদিষ্ট থাকতো না। যখনই খবর পেতেন এবং সময় পেতেন দেখতে যেতেন।

একবার হযরত জাবেরের অসুখ হলো। রসূল সা. হযরত আবু বকরকে সাথে নিয়ে পায়ে হেটে অনেক দূর পর্যন্ত গেলেন। (মদীনার জনবসতি ছড়ানো ছিটানো ছিল।) হযরত জাবের বেহুশ অবস্থায় ছিলেন। তিনি তাঁকে দেখে ওযু করলেন, পানি ছিটিয়ে দিলেন এবং দোয়া করলেন। এতে রোগীর অবস্থার উন্নতি হতে লাগলো। এমনকি হযরত জাবের কথাবার্তা বললেন এবং নিজের সম্পত্তি সম্পর্কে মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করলেন।

তিনি এতটা মানবদরদী ছিলেন যে, এমনকি মুনাফিকদের নেতা রোগাক্রান্ত আব্দুল্লাহ বিন উবাইকেও দেখতে গিয়েছিলেন।

কেউ মারা গেলে সেখানে চলে যেতেন। মুমূর্ষ অবস্থায় খবর পেলে বা ডাকা হলে গিয়ে তাওহীদের ব্যাপারে ও আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেয়ার ব্যাপারে নসিহত করতেন। মৃত ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনকে সমবেদনা জ্ঞাপন করতেন, ধৈর্যরে উপদেশ দিতেন এবং চিৎকার করে কাঁদতে নিষেধ করতেন। সাদা কাপড়ে কাফন দিতে তাগিদ দিতেন এবং দাফন কাফন দ্রুত সম্পন্ন করতে বলতেন। দাফনের জন্য লাশ নিয়ে যাবার সময় সাথে সাথে যেতেন। মুসলমানদের জানাযা নিজেই পড়াতেন এবং গুনাহ মাফ করার জন্য দোয়া করতেন। কোন লাশ যেতে দেখলে তৎক্ষণাত দাঁড়িয়ে যেতেন, চাই সে লাশ কোন অমুসলিমেরই হোক না কেন। (কোন কোন বর্ণনায় রসুল সা.) বসে থাকতেন এ কথাও বলা হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, দাঁড়ানোর রীতি রহিত হয়ে গিয়েছিল। (যাদুল মায়াদ ১৪৫ পৃঃ)। তিনি প্রতিবেশীদের উপদেশ দিতেন মৃতের পরিবারের জন্য খাবার ‍পাঠাতে। (আজকাল উল্টো মৃতের বাড়ীতে অন্যদের ভোজের আয়োজন হয়ে থাকে)। আনুষ্ঠানিক শোক সভা কয়েকদিন পর্যন্ত চলতে থাকাকে খুবই অপছন্দ করতেন।

প্রবাস থেকে ফিরে কে‌উ সাক্ষাত করতে চাইলে তার সাথে আলিঙ্গন করতেন, কখনো কখনো কপালে চুমু খেতেন। কাউকে প্রবাসে যাওয়ার সময় বিদায় জানাতে গেলে তাকে এই বলে অনুরোধ করতেনঃ দোয়া করার সময়ে আমাদের কথা মনে রেখ।

স্নেহ ও ভালোবাসার আতিশয্যে কারো কারো সাথে এত অমায়িক ও সহজ হয়ে যেতেন যে, প্রিয়জনের নাম সংক্ষেপ করে ডাকতেন। যেমন আবু হুরায়রাকে সংক্ষেপে ‘আবু হুর’ এবং হযরত আয়েশাকে কখনো কখনো ‘আয়েশ’ নামে ডাকতেন।

শিশুদের সাথে রাসূল সা. এর বড়ই মাখামাখি ছিল। শিশু দেখলেই তার মাথায় হাত বুলাতেন, আদর করতেন, দোয়া করতেন এবং একেবারে ছোট শিশু কাছে পেলে তাকে কোলে নিয়ে নিতেন। শিশুদের মন ভূলানোর জন্য চমক লাগানো কথা বলতেন। যেমন বলতেনঃ ‘টিকটিকিরা ভাই রাতে মশার চোখে ঘা মারে দাঁতে’। একবার এক নিষ্পাপ শিশুকে চুমু খেতে খেতে বলেছিলেনঃ শিশুরা আল্লাহর বাগানের ফুল। শিশুদের নাম রাখতেন। কখনো কখনো শিশুদেরকে লাইনে দাঁড় করিয়ে পুরস্কারের ভিত্তিতে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করাতেন যে, দেখবো কে আগে আমাকে ছুঁতে পারে। শিশুরা দৌড়ে আসতো। কেউ তার পেটের ওপর আবার কেউ বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তো। শিশুদের সাথে হাসি তামাশা করতেন। যেমন হযরত আনাসকে কখনো কখনো আদর করে বলতেনঃ ‘ও দুই কান ওয়ালা’। হযরত আনাসের ভাই আবু উমাইরের পালিত পাখির ছানাটি মরে গেলে সে উদাস ভাবে বসেছিল। রাসূল সা. তাদের বাড়ীতে এসে ডাক দিলেনঃ ‘ও আবু উমায়ের, কোথায় তোমার নুগায়ের (পাখির শাবক)? আর এক শিশু আব্দুল্লাহ বিন বশীরের মাধ্যমে তার মা রসূল সা. কে আংগুর পাঠালেন। আব্দুল্লাহ পথেই সব আংগুর খেয়ে ফেললো। পরে যখন বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেল, তখন রসূল সা. আদরের সাথে আব্দুল্লাহর কান ধরে বললেনঃ ‘يا غدر يا غدر ওরে ধোকাবাজ, ওরে ধোকাবাজ।’ প্রবাস থেকে আসার পথে যে শিশুকে পথে দেখতেন, সওয়ারীর পিঠে পিঠে চড়িয়ে আনতেন। শিশু ছোট হলে সামনে এবং বড় হলে পেছনে বসাতেন। মৌসুমের প্রথম ফসল ফলমূল আনা হলে তা বরকতের দোয়াসহ কোন শিশুকে আগে খেতে দিতেন। তিনি মনে করতেন এই শিশু ভবিষ্যতে ইসলামী আন্দোলনের নেতা হবে।

বুড়ো মানুষদের খুবই শ্রদ্ধা করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. নিজের অন্ধ প্রবীণ পিতাকে ইসলাম গ্রহণের জন্য যখন রসূল সা. এর কাছে নিয়ে এলেন, তখন তিনি বললেনঃ ওঁকে কষ্ট দিয়েছ কেন? আমি নিজেই তাঁর কছে চলে যেতাম।

মহানুভবতার এমন চরম পরাকাষ্টা দেখাতেন যে, মদীনার আধ পাগলী গোছের এক মহিলা যখন এসে বললো, আপনার কাছে আমার কিছু কথা নিভৃতে বলার আছে, তখন তিনি বললেন, বেশ চল, অমুক গলিতে অপেক্ষা কর, আমি আসছি। তারপর সেখানে গিয়ে তার অভাব অভিযোগের কথা শুনে আসলেন এবং তার প্রতিকারও করলেন। [আল মাওয়াহিবুল লাদুনিয়া, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৯৫।] এ ধরনের ঘটনা আদী ইবনে হাতেমও দেখেছিলেন এবং রসূল সা. এর মহানুভবতাকে নবূয়তের আলামত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।

রসূল সা. কত অমায়িক ছিলেন এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কত মধুর স্বভাবের পরিচয় দিতেন, হযরত আনাস রা. তার চমৎকার ছবি এঁকেছেন। তিনি বলেনঃ

‘আমি দশ বছর যাবত রসূলের সা. সেবায় নিয়োজিত থেকেছি। তিনি কখনো বিন্দুমাত্র বিরক্তি বা ক্রোধ প্রকাশ করেননি। কোন কাজ যেভাবেই করে থাকি, কখনো বলেননি, এভাবে করলে কেন? আর না করলেও কখনো বলেননি, এটা কেন করলেন না? তাঁর ভৃত্য ও চাকরানীদের সাথেও এ রকমই ব্যবহার করতেন। তিনি কাউকে কখনো প্রহার করেননি।’

হযরত আয়েশা রা. বলেন, তিনি কখনো স্ত্রী বা চাকর চাকরানীদের মারেননি। কারো কাছ থেকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধও গ্রহণ করেননি। অবশ্য আল্লাহর পথে জেহাদ করতে গিয়ে কিংবা আল্লাহর আইন অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি বিধান করতে গিয়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকলে সেটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার।

 

ব্যক্তিগত জীবন

সাধারণত সেই সব লোককেই নেতা বলা হয়ে থাকে, যারা সামষ্টিক জীবনের একটা কৃত্রিম আলখেল্লা পরে থাকেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে যেয়েই সে আলখেল্লা খুলে ফেলেন। বাইরে প্রচুর মহত্ব ও উদারতার মহড়া দেখান, কিন্তু ঘরোয়া জীবনে গিয়েই নেমে যান ইতরামির সর্বনিম্ন স্তরে। লোক সমাজে সরলতা ও বিনয়ের চরম পরাকাষ্ঠা দেখান, আর গৃহে ফিরেই বিলাসিতায় ও আরাম আয়েশে মেতে ওঠেন। সামষ্টিক ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে কোন ব্যক্তির যত বেশী ব্যবধান ও দূরুত্ব হবে, ততই যেন তার মর্যাদা হবে। অথচ রসূল সা.-এর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবন ছিল একই রকম।

এক ব্যক্তি হযরত আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলো, রসূল সা. ঘরোয়া জীবনে কী কী করতেন? তিনি জবাব দিলেনঃ রসূল সা. সাধারণ মানুষের মতই ছিলেন। নিজের কাপড় চোপড়ের তদারকী নিজেই করতেন। (অর্থাৎ পোকামাকড় লাগলো কিনা সেদিকে নজর রাখতেন)। ছাগলের দুধ নিজেই দোহাতেন এবং নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলো নিজেই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতে হলে নিজেই লাগাতেন, জুতো মেরামত করতেন। বোঝা বহন করতেন, পশুকে খাদ্য দিতেন। কোন ভৃত্য থাকলে তার কাজে অংশ নিতেন, যেমন তার সাথে আটা পিষতেন, কখনো একাই পরিশ্রম করতেন, বাজারে যেতে কখনো লজ্জাবোধ করতেন না। নিজেই বাজার সদাই করে আনতেন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সাধারণত একখানা কাপড়ে বেধে আনতেন। কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করেছিল যে, রসূল সা. ঘরোয়া জীবনে কেমন আচরণ করতেন? হযরত আয়েশা জবাবে বলেনঃ সবচেয়ে বিনম্র স্বভাবের, হাসিমুখে প্রফুল্ল আচরণ তিনি করতেন। কেমন বিনম্র স্বভাবের ছিলেন তা বুঝা যায় এই উক্তি দ্বারা যে, ‘কখনো কোন ভৃত্যকে ধমক পর্যন্ত দেননি।’ [আল মাওয়াহিল লাদুন্নিয়া, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৯৩] আপন পরিবার পরিজনের সাথে সহৃদয় আচরণে রসূলুল্লাহর সা. কোন জুড়ি ছিলনা। (সহীহ মুসলিম)

একবার হযরত ইমাম হোসেনের জিজ্ঞাসার জবাবে হযরত আলী রা. বললেনঃ রসূল সা. বাড়ীতে থাকাকালে তিন ধরনের কাজে সময় কাটাতেন। কিছু সময় কাটাতেন আল্লাহর এবাদতে, কিছু সময় দিতেন পরিবার পরিজনকে এবং কিছু সময় বিশ্রামে ব্যয় করতেন। এই তিন সময় থেকেই একটা অংশ সাক্ষাত প্রার্থীদের জন্য বের করতেন। মসজিদের সাধারণ বৈঠক ছাড়াও যদি কোন বন্ধু বান্ধাব একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হতে চাইত কিংবা যদি কোন অতিথি আসতো, অথবা যদি কেউ কোন অভাব অভিযোগ জানাতে আসতো, তবে তাদেরকে তাঁর বিশ্রামের সময় থেকে কিছু সময় দিতেন। এতে করে দেখা যায় যে, তাঁর বিশ্রামের জন্য খুব কম সময় অবশিষ্ট থাকতো। [শামায়েলে তিরমিযী, রসূল (সা) এর বিনয় ও সরলতা সংক্রান্ত অধ্যায়]

স্ত্রীদের খোরপোশ ও বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর ব্যবস্থাও তাঁকেই করতে হতো। তাছাড়া তাদের শিক্ষা দীক্ষার ব্যবস্থার ভারও তাঁরই কাঁধে ন্যস্ত ছিল। অতপর তাঁদের দ্বারাই মহিলাদের সংশোধনের কাজ চালু রাখা হতো। মহিলারা তাদের নানা সমস্যা নিয়ে আসতো এবং উম্মুল মুমিনীনগণের মাধ্যমে তার সমাধান চাইতো। তবুও তিনি বাড়ীর পরিবেশকে একদিকে যেমন নিরস ও একঘেয়ে হতে দেননি, অন্যদিকে তেমনি সেখানে কোন কৃত্রিমতার সৃষ্টি হতে দেননি। তাঁর সংসার একজন মানুষের সংসারের মতই ছিল এবং তার পরিবেশে স্বাভাবিক ভাবাবেগের জোয়ার ভাটা থাকতো। সেখানে অশ্রুও ঝরতো এবং মুচকি হাসিও দীপ্তি ছড়াতো। এমনকি কখনো কখনো কিছু ঈর্ষাকাতরতা জনিত উত্তেজনারও সৃষ্টি হয়ে যেত। উদ্বেগ ও অস্থিরতা যেমন বিরাজ করতো, তেমনি আনন্দের মূহুর্তও আসতো। রসূল সা. যখন বাড়ীতে আসতেন, তখন ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসের মতো আসতেন, এবং এক অপূর্ব প্রশান্তি ও আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত। কথাবার্তা হতো। কখনো কখনো গল্প বলাবলিও হতো। মজার মজার কৌতুক-রসিকতাও চলতো। যেমন হযরত আয়েশা রা. নিজের একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন যে, একবার আমি খামীরা (গোশতের কিমার সাথে আটা দিয়ে রান্না করা এক ধরনের খাদ্য) বানালাম। হযরত সওদাও রা. সেখানে ছিলেন। রসূল সা. আমাদের দুজনের মাঝখানে বসেছিলেন একটা অকৃত্রিম আন্তরিকতার পরিবেশ বিরাজ করছিল। আমি সওদাকে বললাম, খাও। সে অস্বীকার করলো। আমি আবার পিড়াপিড়ী করলাম। সে তবুও বললো, খাবোনা। আমি আরো জিদ ধরে বললাম, তোমাকে খেতেই হবে। সে এবারও খেতে রাযী হলোনা। আমি বললাম যদি না খাও, তবে আমি ঐ খামীরা তোমার মুখে মেখে দেবো। সওদা জিদ বহাল রাখলো্। আমি সত্যি সত্যি খামীরার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে এক মুঠ তুললাম এবং সওদার মুখে লেপ্টে দিলাম। রসূল সা. তা দেখে খুব হাসলেন। তিনি সওদাকে বললেন, তুমিও আয়েশার মুখে লেপ্টে দাও। উভয়ে সমান হয়ে যাক। সওদাও তৎক্ষণাত আয়েশার মুখে মেখে দিল। এবার রাসূল সা. আবারও হাসলেন। [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৯৬-২৯৭]

একবার আবু বকর রা. এসে দেখেন, আয়েশা রসূল সা. এর সাথে জোরে জোরে কথা বলছেন। আবু বকর রা. রেগে গিয়ে তাকে প্রহার করতে উদ্যত হলেন। রসূল সা. তাকে শান্ত করলেন এবং বললেন, আমাদের মধ্যে কোন রাগারাগি হয়নি। তবুও হযরত আবু বকর রাগ নিয়েই চলে গেলেন। তিনি যাওয়ার পর রসূল সা, হযরত আয়েশাকে তীর্যক স্বরে বললেন, দেখলে তো কিভাবে আমি তোমাকে রক্ষা করলাম?

ঘরোয়া জীবনের এই স্বাভাবিক উত্থান পতনকে কেউ কেউ ইসলামী আদর্শের চেয়ে নীচু মানের মনে করেন। বিশেষত রসূল সা. এর পারিবারিক জীবনের এমন একটা ছবি তারা অন্তরে পোষণ করেন, যেন সেখানে কতিপয় অতিমানবীয় সত্তা বাস করতো, যাদের কোন ভাবাবেগ বা কামনা বাসনা ছিলনা। অথচ সে পরিবারটাও মানুষেরই পরিবার ছিল। তাদের মধ্যে যাবতীয়, মানবীয়, ভাবাবেগ বিদ্যমান ছিল। তবে ঐ পরিবারটায় আল্লাহর নাফরমানী বা পাপের অস্তিত্ব ছিলনা। এদিক থেকে ওটা ছিল আদর্শ পরিবার। রাতের বেলা যখন রসূল সা. ঘুমাতে যেতেন, তখন পরিবার পরিজনের সাথে তাঁর সাধারণ কথাবার্তা হতো। কখনো ঘরোয়া বিষয়ে, আবার কখনো সাধারণ মুসলমানদের সমস্যাবলী নিয়ে। এমনকি কখনো কখনো গল্পও শোনাতেন। একবার তিনি হযরত আয়েশাকে উম্মে যারার গল্প বলেন। এই কাহিনীতে এগারো জন মহিলা পরস্পরের কাছে নিজ নিজ স্বামীর স্বভাব চরিত্র বর্ণনা করে। এদের মধ্যে এক মহিলা ছিল ‘উম্মে যারা’। সে তার স্বামী আবু যারা‘র মনোমুগ্ধকর চরিত্র বর্ণনা করে। সাহিত্যিক দৃষ্টিতে এটা বড়ই মজার কাহিনী। উপসংহারে রসূল সা. হযরত আয়েশাকে বলেন, উম্মে যারার জন্য আবু যারা যেমন ছিল, আমিও তোমার জন্য তেমনি। অনুরূপভাবে আর একবার কোন এক মজলিসে তিনি একটা গল্প শোনালেন। শ্রোতাদের মধ্য থেকে এক মহিলা বলে উঠলো, এতো ‘খুরাফার’ গল্পের মত। খুরাফা আরবের এক ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি বহু সংখ্যক চমকপ্রদ কিসসা কাহিনী লিখে গেছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। রসূল সা. ঐ মহিলাকে বললেন, খুরাফা কে ছিল তা জান? অতঃপর তিনি এই খোরাফা নামক খ্যাতনামা ব্যক্তির কাহিনীও শোনালেন। বনু আযরা গোত্রের এই ব্যক্তিকে জিনেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং পরে আবার ফেরত দিয়ে গিয়েছিল। [শামায়েলে তিরমিযী]।

রসূল সা. এর আজীবন এই অভ্যাস ছিল যে, রাতের শেষার্ধে প্রথম দিকে তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে ওযূ ও মেছওয়াক করার পর তাহাজ্জুদ পড়তেন। [যাদুল মায়াদ]। কোরআন খুব ধীরে ধীরে পড়তে গিয়ে নামাযে কখনো কখনো এত দীর্ঘ কেয়াম (দাঁড়িয়ে থাকা) করতেন যে, পা ফুলে যেত। [তিরমিযীঃ ইবনুল মুসাইয়েব কর্তৃক বর্ণিত।] সাহাবাগণ তাঁর এই কষ্ট দেখে বলতেন, আল্লাহ তো আপনার আগে পাছের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তবুও আপনি এত কষ্ট কেন করেন। রসূল সা. বললেন, তাই বলে আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবনা? [যাদুল মায়াদ]

গৃহ ও গৃহের আসবাবপত্র সম্পর্কে রসূল সা. এর দৃষ্টিভংগী ছিল এরূপ যে, দুনিয়ার জীবনটা একজন পথিকের মত কাটানো উচিত। তিনি বলেন, আমি সেই পথিকের মত, যে কিছুক্ষণের জন্য গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করে, অতঃপর নিজের গন্তব্য স্থলের দিকে রওনা হয়ে যায়। অর্থাৎ যারা আখেরাতকে গন্তব্যস্থল রূপে গ্রহণ করে, দুনিয়ার জীবনকে কেবল কর্তব্য সম্পাদন বা পরীক্ষার অবসর মনে করে কাটিয়ে দেয়, এবং যাদের এখানে বসে উচ্চতর লক্ষ্য জান্নাত লাভের জন্য কাজ করতে হবে, তাদের বড় বড় গগনচুম্বী বাড়ীঘর বানানো, সেগুলোকে আসবাবপত্র দিয়ে ভরে তোলা, এবং প্রাণ ভরে আরাম আয়েশ উপভোগ করার সুযোগ কোথায়? এ জন্য তিনিও তাঁর সাহাবীগণ উঁচুমানের বাড়ীঘরও বানাননি। সেগুলোতে আসবাবপত্রও জমা করেননি এবং সেগুলোর সাজসজ্জা ও জাকজমক বাড়াননি। তাঁদের বাড়ীঘর উত্তম মুসাফির খানা ছিল বলা যায়। [যাদুল মায়াদ] ঐ সব বাড়ীতে শীত ও গরম থেকে আত্মরক্ষা, জীব জানোয়ার থেকে নিরাপত্তা ও পর্দাপুশিদার ভালো ব্যবস্থা ছিল। তা ছাড়া স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থাও ছিল। রসূল সা. মসজিদে নববীর সাথে সংশ্লিষ্ট ছোট ছোট কক্ষ স্বীয় স্ত্রীদের জন্য তৈরী করিয়েছিলেন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ছাড়া আর কোন সাজসজ্জা তাতে ছিল না। পরিচ্ছন্নতার রুচি রসূল সা. এর এত তীব্র ছিল যে, সাহাবীদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন নিজ নিজ বাড়ীর আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখে। [তিরমিযী]

তৈজসপত্রের মধ্যে কয়েকটি ছিল একেবারেই সাদা ধরনের। যেমন একটা কাচের পেয়ালা, যার ওপর লোহার পাত লাগানো ছিল। পানাহরে এটা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। খাদ্য সম্ভার সঞ্চয় করা তো দূরের কথা, দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের মত খাবারও থাকতোনা। খেজুরের ছাল ভর্তি চামড়ার তোষক ছিল তাঁর বিছানা। বানের তৈরী চৌকি এবং টাটের তৈরী বিছানাও ব্যবহার করতেন। এই বিছানা দু’ভাজ করে বিছানো হতো। একবার চারভাজ করে বিছানো হলে সকাল বেলা সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, আজকে বিছানায় এমন আরামদায়ক কী ব্যবস্থা ছিল যে, আমার গাঢ় ঘুম হয়েছে এবং তাহাজ্জুদ ছুটে গেছে? যখন আসল ব্যাপারটা জানতে পারলেন, তখন বললেন, বিছানাকে আগের মতো দু’ভাজ করে রেখে দাও। মাটিতে চাটাই বিছিয়ে শোয়ার অভ্যাসও ছিল। একবার চৌকির কাঠের দাগ শরীরে দেখে রসূল সা. এর কতিপয় সাহাবী (হযরত ওমর ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ) কেঁদে ফেলেছিলেন। [শামায়েলে তিরমিযী]

আর একবার নগ্ন চৌকিতে শুয়ে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গেছে দেখে হযরত ওমরের চোখে পানি এসে গেল। রসূল সা. তাঁর চোখে তাঁর চোখে পানি আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলে হযরত ওমর বললেন, রোম ও ইরানের সম্রাটরা ভোগবিলাসে মত্ত আর আপনার এই অবস্থা! রসূল সা. বললেন, ‘ওমর! তুমি কি এতে খুশী নও যে, তারা দুনিয়া নিয়ে যাক, আর আমরা আখেরাত লাভ করি?

 

পানাহার

রসূল সা. পানাহার রুচিটা ছিল অত্যন্ত ছিমছাম ও ভদ্রজনোচিত। তিনি গোশতের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। সবচেয়ে বেশী পছন্দ করতেন পিঠ, উরু ও ঘাড়ের গোশত। পাশের হাড়ও তার বিশেষ প্রিয় ছিল। গোশতের ঝোলের মধ্যে রুটি টুকরো টুকরো করে ভিজিয়ে রেখে ‘ছারীদ’ নামক যে উপাদেয় আরবীয় খাবার তৈরী করা হতো, সেটাও তিনি খুবই পছন্দ করতেন। অন্যান্য প্রিয় খাবারের মধ্যে মধু, সের্কা ও মাখন ছিল অন্যতম। দুধের সাথে খেজুর খেতেও ভালোবাসতেন। (এটা একটা চমৎকার পুষ্টি খাদ্যও বটে।) মাখন মাখানো খেজুরও তাঁর কাছে একটা মজাদার খাবার ছিল। রোগীপথ্য হিসাবে ক্যলরিযু্ক্ত খাদ্য পছন্দ করতেন এবং অন্যদেরকেও খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। প্রায়ই জবের ছাতু খেতেন। একবার বাদামের ছাতু খেতে দেয়া হলে তিনি এই বলে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, এটা বিত্তশালীদের খাদ্য। বাড়ীতে তরকারী রান্না হলে প্রতিবেশীর জন্য একটু বেশি করে তৈরী করতে বলতেন।

পানীয় দ্রব্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল মিষ্টি পানি এবং তা বিশেষ যত্নের সাথে দু’দিনের দূরত্ব থেকে আনানো হতো। পানি মেশানো দুধ ও মধুর শরবতও সাগ্রহে পান করতেন। মাদক নয় এমন খেজুরের নির্যাসও পছন্দীয় ছিল। মশক বা পাথরের পাত্রে পানি ঢেলে খেজুর ভেজানো হতো এবং তা এক নাগাড়ে সারা দিন ব্যবহার করতেন। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ রাখা হলে মাদকতার সৃষ্টি হতে পারে, এই আশংকায় ফেলে দিতেন। আবু মালেক আশয়ারীর বণর্না ‍অনুসারে তিনি বলেছেনও যে, আমার উম্মতের কেউ কেউ মদ খাবে, কিন্তু তার নাম পাল্টে নাম রাখবে। (ইতিহাস সাক্ষী যে, পরবর্তী কালের শাসকরা ফলের নির্যাস নামে মদ খেতো।)

এক এক ব্যক্তির আলাদা আলাদাভাবে খাওয়া দাওয়া করা পছন্দ করতেন না। একত্রে বসে খাওয়ার উপদেশ দিতেন। চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়া দাওয়া করাকে নিজের বিনয়ী স্বভাবের বিপরীত মনে করতেন। অনুরুপভাবে দস্তরখানের উপর ছোট ছোট পেয়ালা পিরিচে খাবার রাখাও নিজের রুচি বিরোধী মনে করতেন। স্বর্ণরৌপ্যের পাত্রকে একেবারেই হারাম ঘোষণা করেছেন। কাঁচ, মাটি, তামা ও কাঠের পাত্র ব্যবহার করতেন। দস্তরখানের ওপর হাত ধোয়ার পর জুতো খুলে বসতেন। ডান হাত দিয়ে নিজের সামনের দিক থেকে খাবার তুলে নিতেন। পাত্রের মাঝখানে হাত রাখতেন না। হেলান দিয়ে বসে পানাহার করার অভ্যাস ও তাঁর ছিল না। কখনো দুই হাঁটু খাড়া করে এবং কখনো আসন গেড়ে বসতেন। প্রতি গ্রাস খাবার মুখে তোলার সময় বিছমিল্লাহ পড়তেন। যে খাদ্যদ্রব্য অপছন্দ হতো কোন দোষ উল্লেখ না করেই তা বাদ দিতেন। বেশী গরম খাবার খেতেন না। কখনো কখনো রান্না করা খাবার ছুরি দিয়ে কেটে খেতেন। তবে এটা তাঁর কাছে কৃত্রিমতা ও আড়ম্বর মনে হতো এবং এটা তেমন ‍ভালবাসতেন না। [বুখারী ও মুস্লিম (আমর বিন উমাইয়া কর্তৃক বর্ণিত) আবু দাউদ ও বায়হাকী (হযরত আয়েশা কর্তৃক বর্ণিত)।] রুটি ইত্যাদি তিনি সব সময় আঙ্গুল দিয়ে ধরতেন এবং আঙ্গুলে তরকারী ইত্যাদি লাগাতে দিতেন না। কখনো কখনো ফলমূল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বা হাটা চলা করা অবস্থায় খেতেন না। দুটো ফল এক সাথেও খেতেন–যেমন এক হাতে খেজুর অপর হাতে তরমুজ ইত্যাদি। খেজুরের আটি বাম হাত দিয়ে ফেলে দিতেন। দাওয়াত কখনো ফেরত দিতেন না। যদি অন্য কে‍উ ঘটনাক্রমে তাঁর সাথে থাকতো (আলাপরত থাকার কারণে বা অন্য কোন কারণে) তবে তাকে সাথে নিয়ে যেতেন ঠিকই, কিন্তু বাড়ীওয়ালার কাছ থেকে তার জন্য অনুমতি নিতেন। কোন মেহমানকে খাওয়ালে বারবার তাকে বলতেন যে, লজ্জা শরম বাদ দিয়ে তৃপ্তি সহকারে খাও। খাবার মজলিস থেকে ভদ্রতার খাতিরে সবার শেষে উঠতেন। অন্যদের খাওয়া আগে শেষ হলে তিনি ও দ্রুত শেষ করে তাদের সাথে উঠে যেতেন। খাওয়ার শেষে হাত অবশ্যই ধুয়ে নিতেন এবং আল্লাহর শোকর আদায় এবং জীবিকা ও বাড়ীওয়ালার জন্য বরকত কামনা করে দোয়া করতেন। কোন খাবার জিনিস উপঢৌকন পেলে উপস্থিত বন্ধুদের তাতে শরীক না করে ছাড়তেন না এবং অনুপস্থিত বন্ধুদের অংশ রেখে দিতেন। খাবার মজলিসে একটি দানাও নষ্ট হয় না, এরুপ যত্নসহকারে খেতে সবাইকে প্রশিক্ষণ দিতেন। পানি খাওয়ার সময় ঢক ঢক শব্দ করতেন না এবং সাধারণত তিনবার মুখ সরিয়ে শ্বাস নিয়ে খেতেন। প্রতিবার বিছমিল্লাহ বলে আরম্ভ ও আলহামদুলিল্লাহ বলে শেষ করতেন। সাধারণত বসে পানি খাওয়াই তাঁর নিয়ম ছিল। তবে কখনো কখনো দাঁড়িয়েও পানি পান করেছেন। মজলিসে কোন পানীয় জিনিস এলে সাধারণত‍ঃ ডান দিক থেকে পরিবেশন শুরু করতেন। যেখানে একটা জিনিসের পরিবেশন শেষ হতো, সেখান থেকেই পরবতী জিনিসের পরিবেশন শুরু হতো। বেশী বয়স্ক লোকদের অগ্রাধিকার দিতেন, তবে ডান দিক থেকে শুরু করা ধারাবাহিকতায় যাদের প্রাপ্য, তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই ধারাবাহিকতা ভংগ করতেন। বন্ধুদের কিছু পান করালে নিজে সবার শেষে পান করতেন এবং বলতেন, ‘যে পান করায় সে সবার শেষে পান করে’। খাদ্য পানীয়ে ফু দেয়া ঘ্রাণ নেয়া অপছন্দ করতেন। মুখের দুর্গন্ধ অপছন্দীয় ছিল বিধায় কাঁচা পেয়াজ ও রশুন খাওয়া কখনো ভালবাসতেন না। খাদ্য পানীয় দ্রব্য সব সময় ঢেকে রাখার নিদেশ দিয়েছেন। নতুন কোন খাবার এলে খাওয়ার আগে তার নাম জেনে নিতেন। বিষ খাওয়ার ঘটনার পর তাঁর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে, কোন অজানা লোক খানা খাওয়ালে প্রথমে এক দু’লোকমা তাকে খাওয়াতেন।

এত তীব্র রুচিবোধের পাশাপাশি বেশীর ভাগ সময় ক্ষুধা ও দারিদ্রের কষাঘাতে জজরিত থাকতেন। এ ব্যাপারে যথাস্থানে বিশদ বিবরণ দেয়া হবে। তিনি বলেছেনঃ ‘আমার খানাপিনা আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দর মতই।’

 

ওঠাবসা ও শয়ন

কখনো আসন গেড়ে বসতেন, কখনো দু’হাত দিয়ে দু’উরুর চার পাশ জড়িয়ে ধরে বসতেন, আবার কখনো হাতের পরিবর্তে কাপড় (চাদর ইত্যাদি) দিয়ে জড়িয়ে রাখতেন। বসা অবস্থায় হেলান দিলে সাধারণত বাম হাতের উপর হেলান দিতেন। কোন বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করার সময় একটা কাঠের টুকরো দিয়ে মাটি খোচাঁতে থাকতেন। সাধারণত ডান দিকে কাত হয়ে এবং ডান হাতের তালুর উপর ডান গাল রেখে শুতেন। কখনো কখনো চিত হয়ে ও শুতেন এবং পায়ের উপর পা রাখতেন। তবে সতরের দিকে কঠোরভাবে লক্ষ্য রাখতেন। উপুড় হয়ে শোয়া তীব্রভাবে অপছন্দ করতেন এবং সবাইকে তা থেকে বারণ করতেন। এমন অন্ধকার ঘরে শোয়া পছন্দ করতেন না যেখানে বাতি জ্বালানো হয়নি। খোলা ছাদে শোয়া ভাল মনে করতেন না। ওযু করে ঘুমানোর অভ্যাস ছিল এবং ঘুমানোর আগে বিভিন্ন দোয়া ছাড়াও সূরা ইখলাস, সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়ে শরীরে ফুঁক দিয়ে নিতেন। ঘুমন্ত অবস্থায় মৃদু নাক ডাকার শব্দ বেরুতো। রাত্রে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলে পবিত্রতা অর্জনের পর হাতমুখ অবশ্যই ধুয়ে নিতেন। ঘুমানোর জন্য আলাদা লুংগী ছিল। গায়ের জামা খুলে ঝুলিয়ে রাখতেন।

 

মানবীয় প্রয়োজন

প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য সেকালে পায়খানার প্রথা না থাকায় তিনি মাঠে জংগলে চলে যেতেন। সাধারণত এত দূরে চলে যেতেন যে চোখের আড়াল হয়ে যেতেন। কখনো কখনো দু’মাইল পযন্ত চলে যেতেন। এজন্য এমন নরম মাটি খুজতেন, যাতে ছিটে না আসে। প্রয়োজন পূরণের জায়গায় প্রথমে বাম পা ও পরে ডান পা রাখতেন। বসার সময় ভূমির অতি নিকটে গিয়েই কাপড় খুলতেন। কোন টিলা বা গাছ ইত্যাদির আড়ালেই বসতেন। এ সময় পায়ে জুতো ও মাথায় আচ্ছাদন নিয়েই বেরুতেন। কেবলার দিকে মুখ বা পিঠ দিয়ে বসতেন না। প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের সময় হাতের আংটি খুলে নিতেন। (কারণ ‍তাতে আল্লাহ ও রসূলের সা. নাম খোদিত ছিল।) সব সময় বাম হাত দিয়ে শৌচক্রিয়া সম্পন্ন করতেন। প্রয়োজনের জায়গা থেকে বেরুবার সময় প্রথমে ডান পা ও পরে বাম পা ফেলতেন।

গোছলের জন্য পর্দাকে অপরিহার্য গণ্য করেছিলেন। ঘরে গোছল করলে কাপড়ের পর্দা টানিয়ে নিতেন। বৃষ্টিতে গোছল করলে মাথায় লুংগি বেঁধে নিতেন। হাঁচি দেয়ার সময় স্বল্প শব্দ করতেন এবং হাত বা কাপড় মুখে চেপে নিতেন।

 

প্রবাস

প্রবাসে বা সফরে রওনা হবার জন্য বৃহস্পতিবারটা অধিক পছন্দ করতেন। বাহনকে দ্রুত চালাতেন। বিরতিস্থল থেকে সকাল বেলা যাত্রা করাটাই তাঁর অভ্যাস ছিল। প্রবাসকালে যে সব সামষ্টিক কাজ থাকতো, ‍তাতে অবশ্যই অংশগ্রহণ করতেন। একবার রান্নার আয়োজন ছিল। সঙ্গীরা যখন নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিল, তখন তিনিও জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের দায়িত্বে ঘাড়ে নিলেন। সবাই বললো, আপনার কষ্ট করার দরকার নাই। আমরাই যথেষ্ট। তিনি বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে পৃথক মর্যাদা নিয়ে বসে থাকা পছন্দ করি না। [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া (১ম খন্ড, পৃঃ ২৯৪)] ভ্রমণকালে পালাক্রমে কোন কোন পদাতিক সহযাত্রীকে নিজ ‍বাহনে আরোহণ করাতেন। রাতের বেলা প্রবাস থেকে ফেরা পছন্দ করতেন না। ফিরলে সোজা বাড়ীতে যাওয়ার পরিবর্তে আগে মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ পড়ে নিতেন। বাড়ীতে খবর পৌঁছার পর বাড়ীতে যেতেন।

 

আবেগ ও অনুভূতি

আবেগ ও অনুভূতির কথা বাদ দিয়ে আমরা মানবতার কথা ভাবতে পারি না। রসূল সা. এর মধ্যেও মানবীয় অনুভূতি সর্বোত্তম পর্যায়ে বিদ্যামান ছিল। তিনি ছিলেন তীব্র অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ। আনন্দে আনন্দিত ও দুঃখ বেদনায় ব্যথিত হতেন।

যারা সারা দুনিয়ার দুঃখশোকে মুহ্যমান হন, কিন্তু পরিবারের দুঃখশোকে পাষাণ ও নিরুদ্বেগ থাকেন, সেই সব তথাকথিত মহামানবদের কাতারে তিনি শামিল ছিলেননা। মহিয়ষী জীবন সংগিনীদের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালবাসা ছিল। হযরত আয়েশা রা. সাথে একই পাত্রে পানি পান করতেন। আনসারদের মেয়েদেরকে ডেকে আনাতেন তারঁ স্ত্রীদের সাথে খেলা করার জন্য। নিগ্রোদের ক্রীড়া নৈপুন্য দেখতে দেখতে হযরত আয়েশা রা. এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, রসূল সা. এর কাঁধের উপর ভর দিয়ে দেখছিলেন। এরপরও তিনি যখন আয়েশাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন কি তোমার তৃপ্তি হয়েছে? তখন হযরত আয়েশা বললেন, ‘না আরো দেখবো’। এভাবে দীঘ সময় ধরে এ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া (১ম খন্ড, পৃঃ ২৯৬)।] হযরত সাফিয়া রা. কে উটের ওপর আরোহণ করানোর জন্য তিনি নিজের হাঁটু এগিয়ে দেন এবং সেই হাঁটুর উপর দাঁড়িয়ে সাফিয়া রা. উটে আরোহণ করেন। একবার উষ্ট্রী পা পিছলে পড়ে গেলে রসূল সা. এবং হযরত সাফিয়া মাটিতে পড়ে যান। হযরত আবু তালহা সাথে ছিলেন। তিনি রসূল সা. এর কাছে ছুটে গেলে তিনি বললেন, আগে মহিলাকে উদ্ধার কর। একবার কাফেলার তত্ত্বাবধায়ক উটগুলোকে দ্রুত চালালে রসূল সা. বললেন, ‘সাবধান, কাঁচের পাত্রে রয়েছে কাঁচের পাত্র। একটু ধীরে, সাবধান।’ [বুখারী ও মুসলিম, (কাঁচের পাত্র দ্বারা নারীদের বুঝিয়েছেন)।] এই ভালবাসার কারণেই একবার মধু না খাওয়ার কসম খেয়ে ফেলেছিলেন। এবং সে জন্য ‘হালাল জিনিসকে হারাম করোনা’ বলে কুরআনে তাঁকে ভৎসনা করা হয়েছিল। [পাশ্চাত্যের লেখকরা রসূল (সা) এর এই পবিত্র ও নির্মল দাম্পত্য জীবনের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। অথচ তাদের সভ্যতায় সর্বাপেক্ষা দায়িত্বশীল ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন যে কয়জন মানুষ জন্মেছে, তারা শুধু যে ঘরোয়া জীবনেই পংকিলতার পর্যায়ে পৌঁছেনি বরং এই পরিমন্ডলের বাইরেও তারা জঘন্য কলংকময় জীবন যাপন করে থাকেন। রসূল (সা) এর বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর সমস্ত আবেগ অনুভূতি ও কামনাবাসনা নিজের স্ত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং তাও ছিল পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতায় সুষমামন্ডিত। তিনি প্রকৃতির দাবীগুলোকে শালীনতার সীমার মধ্যে রেখে অধিকতর সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেন এবং দাম্পত্য প্রেমের এক পরিশীলিত রীতির পত্তন করেন।]

নিজের সন্তানদের প্রতিও রসূল সা. এর স্নেহ মমতা ছিল অত্যন্ত গভীর। হযরত ইবরাহীমকে মদীনার উপকন্ঠে এক কামার পরিবারের ধাই এর কাছে দুধ খাওয়াতে দিয়েছিলেন। তাকে দেখতে অনেক দূরে হেটে চলে যেতেন। ধূয়ায় আচ্ছন্ন ঘরে বসতেন এবং ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করতেন। হযরত ফাতেমা রা. এলে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করতেন। কখনো কখনো নিজে যেতেন। নিজের অবস্থা বলতেন এবং তাঁর অবস্থা শুনতেন। তাঁর দু’ছেলে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন রা. কে অত্যধিক স্নেহ করতেন। তাদের কোলে নিতেন, ঘাড়ে ওঠাতেন এবং নিজে ঘোড়া সেজে পিঠে চড়াতেন। নামাযের সময়ও তাদের ঘাড়ে উঠতে দিতেন। একবার হযরত আকরা বিন হাবিস তাঁকে হযরত হাসানকে চুমু খেতে দেখে অবাক হয়ে বললেন, আমার তো দশটা ছেলে রয়েছে। কিন্তু কাউকেও এভাবে আদর করিনি। অথচ আপনি চুমু খান। রসূল সা. বললেন, যে দয়া স্নেহ করেনা সে দয়া স্নেহ পায়না।

ছেলে ইবরাহীম যখন মারা গেল, তখন শোকে তাঁর চোখ ছলছল করে উঠলো। আরো এক মেয়ে তাঁর সামনেই মারা গেল। চাকরানী উম্মে আইমান চিৎকার করে কাদঁতে লাগলো। রসূল সা. তাকে নিষেধ করলেন। সে বললো, আপনি ও তো কাদঁছেন। রসূল সা. বললেন, এভাবে (নিঃশব্দে বা মৃদু শব্দে) কাঁদা নিষিদ্ধ নয়। মনের যে কোমলতা ও মমত্বের কারণে এই (মৃদু) কান্ন‍া আসে, সেটা আল্লাহর রহমত স্বরুপ। তাঁর মেয়ে উম্মে কুলসুমের কবরে যখন দাঁড়ান, তখনও তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। হযরত উসমান বিন মাযউনের লাশের সামনেও তাঁর চোখ অশ্রু সজল ছিল। তিনি তাঁর কপালে চুমু খেয়েছিলেন। [আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৯৭]। নিজের কান্নার স্বরূপ বর্ণনা করে তিনি বললেন, ‘চোখ অশ্রুসজল, হৃদয় মর্মাহত, কিন্তু তবুও আমরা মুখ দিয়ে এমন কোন কথা উচ্চারণ করবোনা, যা আল্লাহ পছন্দ করেন না। দুঃখ শোকের সময় প্রায়ই পড়তেন حسبنا الله ونعم الوكيل উচ্চশব্দে কখনো কাঁদতেন না, কেবল দীর্ঘ শ্বাস ছাড়তেন এবং বুকের মধ্য থেকে হাড়িতে সিদ্ধ হওয়ার শব্দের মত শব্দ বেরুতো।

এহেন দরদী হৃদয় যখন আল্লাহর কাছে কোন আকুতি জানাতো তখন সে সময়েও চোখের পাতায় অশ্রু মুক্তার মত চিক চিক করতো। একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদকে কোরআন তেলাওয়াতের অনুরোধ করলেন। তিনি যখন সুরা নিসার এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেনঃ ‘যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন সাক্ষী হাজির করবো এবং তোমাকে এদের ওপর সাক্ষী বানাবো তখন কী উপায় হবে?’ এ সময় রসূলের সা. চোখ দিয়ে অশ্রুর স্রোত বয়ে গেল। [অধিকাংশ ঘটনা শামায়েলে তিরমিযী থেকে সংকলিত]

সমগ্র মানব জাতির প্রতি এবং বিশেষত মুসলিম জামায়াতের সদস্যদের প্রতি রসূল সা. এর যে গভীর স্নেহ মমতা ও সহানুভূতি ছিল, তাঁর হৃদয়ের এই কোমলতাই ছিল তাঁর উৎস। এত কোমল হৃদয় এবং এত আবেগ ভরা মন নিয়েও রসূল সা. কঠিন বিপদ মুসিবতে যে ধৈয ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, সেটা সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার।

 

রসিকতা

আমি আগেই বলেছি, রসূল সা. সদা হাসিমুখ ছিলেন। তিনি বলেছেন‍ঃ ‘তোমর ভাই-এর দিকে মুচকি হাসি নিয়ে তাকানোটাও একটা সৎ কাজ।’ রসূল সা. এর সম্পর্কে এ কথাও বর্ণিত হয়েছে যে, ‘তিনি অত্যন্ত হাসিমুখ ও সদাপ্রফুল্ল ছিলেন।’

পৃথিবীতে বড় বড় কীর্তি সম্পাদনকারী ব্যক্তিগণের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো, তাঁরা জীবনের কঠিন দায়িত্বের বোঝাকে নিজেদের মুচকি হাসির সাহায্যে সহনীয় করে নেন। এবং সাথীদের হৃদয়ের গভীরে নিজেদের আসন প্রতিষ্ঠিত করে নেন। তিনি এমন অকৃত্রিম রসিকতা করতেন যে, তাঁর সাথীদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা বদ্ধমূল হয়ে যেত।’ তিনি হাস্য কৌতুকের মাধ্যমে মজলিসে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেলতেন। তবে সব সময় ভারসাম্য বজায় থাকতো। কথাবার্তায় রসিকতার মাত্রা থাকতো খাদ্যে লবণের মাত্রার সমান। তাতে কোন অন্যায় ও অসত্য কথাও আসতোনা, তা দ্বারা কারো মনে কষ্ট ও দেয়া হতো না এবং কেউ অট্টহাসিতে ফেটেও পড়তোনা। সামান্য মুচকি হাসির সৃষ্টি করতো, যাতে শুধু দাঁত বের হতো মুখগহ্বর বা কন্ঠনালি দেখা যেতনা।

একবার হযরত আবু হুরায়রা অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি দেখি আমাদের সাথে রসিকতাও করেন!’ রসূল সা. বললেনঃ হাঁ, তা করি। তবে আমি কোন অন্যায় ও অসত্য কথা বলিনা।’

এখানে আমরা রসূল সা.এর কিছু রসিকতার নমুনা তুলে ধরছি, যা হাদীসের গ্রন্থাবলীতে সংরক্ষিত রয়েছেঃ [অধিকাংশ ঘটনা শামায়েল তিরমিযী থেকে সংকলিত]

জনৈক ভিক্ষুক তাঁর কাছে একটা বাহক উট চাইল। রসূল সা. বললেনঃ আমি তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দেবো। ভিক্ষুক অবাক হয়ে বললো, ‘আমি ওটা দিয়ে কি করবো? রসূল সা. বললেন, ‘প্রত্যেক উটই কোন না কোন উটনীর বাচ্চা হয়ে থাকে।

এক বুড়ি এসে বললো, ‘আমার জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে জান্নাত দান করেন।’রসূল সা. রসিকতা করে বললেনঃ‘কোন বুড়ি জান্নাতে যেতে পারবেনা।’বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে উদ্যত হলো। রসূল সা. উপস্থিত লোকদের বললেন, ‘ওকে বলো যে, আল্লাহ ওকে বুড়ি অবস্থায় নয় বরং যুবতী বানিয়ে জান্নাতে নেবেন। আল্লাহ বলেছেন, আমি জান্নাতের নারীদের নতুন করে সৃষ্টি করবো,তাদেরকে কুমারী সমবয়সী যুবতী বানাবো।’ মোট কথা জান্নাতে গমনকারীনীদের আল্লাহ নব যৌবন দান করবেন।

যাহের বা যোহায়ের নামক এক বেদুইনের সাথে রসূল সা. এর সখ্য ছিল। তিনি তাঁর এই বেদুইন বন্ধুকে শহর সংক্রান্ত কাজে সাহায্য করতেন এবং বেদুইন রসূল সা. কে গ্রাম সংক্রান্ত কাজে সাহায্য করতো। কখনো কখনো সে আন্তরিক আবেগ সহকারে উপহার দিত। রসূল সা.অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে ঐ উপহারের দাম দিয়ে দিতেন। তিনিবলতেন, যাহের গ্রামে আমাদের প্রতিনিধি এবং আমরা শহরে তার প্রতিনিধি। এই যাহের একদিন বাজারে নিজের কিছু পন্য বিক্রি করছিল। রসূল সা.পেছন থেকে চুপিসারে যেয়ে তার চোখ চেপে ধরলেন এবং বললেন, বলতো আমি কে। বেদুইন প্রথমেতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। পরক্ষনেই বুঝতে পেরে আনন্দের আতিশয্যে রসূল সা. এর বুকের সাথে মাথা ঘষতে লাগলেন। অতপর রসূল সা. রসিকতা করে বললেন, এই দাসটা কে কিনবে? যাহের বললো, হে রসুলুল্লাহ, আমার মত অকর্মন্য দাসকে যে কিনবে,সেই ঠকবে। রসূল সা. বললেন, আল্লাহর চোখে তুমি অকর্মন্য নও।

একবার এক মজলিশে খেজুর খাওয়া হলো। রসূল সা. রসিকতা করে খেজুরের আটি বের করে হযরত আলীর সামনে রাখতে লাগলেন। অবশেষে আটির স্তুপ দেখিয়ে বললেন,তুমি তো অনেক খেজুর খেয়েছো দেখছি। হযরত আলী বললেন, আমি আটি সুদ্ধ খেজুর খাইনি।

খন্দক যুদ্ধের সময় একটা ঘটনায় রসূল সা. এত হেসেছিলেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। আমেরের পিতা সাঈদ তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। শত্রুপক্ষের জনৈক যোদ্ধা তীরের আক্রমনের লক্ষ্য ছিল। সে খুবই ত্বরিত গতিতে ঢাল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলতো,তাই সা’দের তীর কোনমতেই তাকে বিদ্ধ করতে সক্ষম হচ্ছিলনা। শেষবারে পুণরায় সা’দ তীর ধনুক নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং সুযোগ খুঁজতে থাকলেন। শত্রু সৈন্যটি যেই ঢালের বাইরে মাথা বের করেছে,আর যায় কোথায়। সা’দের তীর সোজা তার কপালে গিয়ে বিঁধলো,সে এমন যোরে মাথা ঘুরে পড়লো যে, তার ঠ্যাং দুটো ওপরের দিকে উঠে গেল।

পরবর্তীকালের লোকেরা তাঁর এ ধরনের রসিকতার কথা শুনে অবাক হয়ে যেত। কেননা একেতো ধর্মের সাথে সবসময় একধরনের নিরস জীবনের ধারনা যুক্ত থাকতো এবং খোদাভীরু লোকদের কাঁদো কাঁদো মুখ ও সুক্ষ কঠিন মেজাজ থাকার কথা সবার জানা ছিল। তদুপুরি রসুল সা. এর সার্বক্ষনিক এবাদত মুখিতা, খোদাভীরুতা ও অসাধারণ দায়িত্বসচেতনতার বিষয়টি লক্ষ্য রাখলে একথা বুঝাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যে, এ ধরনের একজন অসাধারন মানুষ আপন জীবন কাঠামোতে এমন কৌতুক ও হাস্যরসের অবকাশ কিভাবে সৃষ্টি করলেন। হযরত ইবনে ওমরকে রা. জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে রসূল সা. এর সাথীরা কি হাসতেন? তিনি বললেন, ’হ্যাঁ হাসতেন।অথচ তাদের অন্তরে পাহাড়ের চেয়ে বড় ও মজবুত ঈমান ছিল। (অর্থ্যাৎ কৌতুক ও রসিকতা ঈমান ও খোদভীতির প্রতিকূল নয়।) তাঁরা তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষন নিতে গিয়ে ছুটোছুটি করতেন আর পরস্পর হেসে লুটুপুটি খেতেন। (কাতাদার বর্ণনা)

একথা আগেই উল্লেখ করেছি যে, ফজরের নামাজের পর নিয়মিত বৈঠক হতো, তাতে জাহেলী যুগের প্রসঙ্গ উঠতো এবং সাহাবী গনের সাথে সাথে রসূল সা. ও খুব হাসতেন। শিশুদের সাথে ও স্ত্রীদের সাথে তিনি যে হাস্য কৌতুক করতেন তা ও ইতিপূর্বে আলোচনা করে এসেছি।

 

বিনোদন

ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংগ হলো (বৈধ সীমার মধ্যে) বিনোদন। রসিকতার ন্যায় এ অংশটা ও যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়,তাহলে জীবন একটা বোঝা হয়ে উঠবে। যে জীবন ব্যাবস্থায় বিনোদনের স্থান নেই, তা কোন সমাজ বেশী দিন বহন করতে পারেনা। রসূল সা. কিছু কিছু বিনোদন ভালবাসতেন এবং বৈধ সীমার মধ্যে এর ব্যবস্থা করতেন।

ব্যাক্তিগত ভাবে তাঁর বাগানে ভ্রমনের শখছিল। কখনো একা আবার কখনো সাথীদের নিয়ে বাগানে যেতেনে এবং সেখানে বৈঠকাদিও করতেন।

সাঁতারকাটা ও তাঁর সখের অন্তর্ভূক্ত ছিল। বন্ধুবান্ধবের সাথে কখনো কখনো পুকুরে সাঁতার কাটতেন।এজন্য দু’জনের এক একটা জোড় গঠন করতেন। প্রত্যেক জোড় দূর থেকে সাঁতরে পরস্পরের দিকে আসতো। একবার রসূল সা. হযরত আবু বকরকে নিজের সাঁতারের সাথী মনোনীত করেছিলেন।

কিছুদিন বিরতির পর বৃষ্টি হলে লুংগি বেঁধে ফোয়ারায় গোসল করতেন। কখনো কখনো চিত্তবিনোদনের লক্ষ্যে কোন কূয়ার মুখে বসে ভেতরে পা ঝুলিয়ে রাখতেন। [শামায়েলে তিরমিযী]

দৌড় ও তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগীতার আয়োজন করতেন এবং নিজে পূর্ণ আগ্রহ নিয়ে শরীক হতেন। এরূপ পরিস্থিতিতে প্রচুর হাসাহাসি ও হতো।

উৎসবাদিতে ঢোল বাজানো ও শিশু মেয়েদের গান গাওয়া পছন্দ করতেন। একবার ঈদের দিন দুটো মেয়ে হযরত আয়েশার কাছে গান গাইছিল। রসূল সা. তার কাছেই শায়িত ছিলেন। হযরত আবুবকর এসে এই দৃশ্য দেখে ধমক দিয়ে উঠলেন যে, আল্লাহর রসূলের বাড়িতে এসব শয়তানী কান্ড কারখানা কেন? একথা শুনে রসূল সা. বললেন, ওদেরকে গাইতে দাও। [মুসলিম, হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত]

বিয়ে শাদীর সময় ও ঢোল বাজাতে উৎসাহ দিয়েছেন। (হযরত আয়েশা ও মুহাম্মদ বিন হাতে আল জুহমীর বর্ণনা) হযরত আয়েশা বলেন, আমার কাছে জনৈক আনসারীর মেয়ে থাকতো। আমি তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলাম। বিয়ের সময় রসূল সা. বললেন, ‘আয়েশা তুমি গানের ব্যবস্থা করলেনা? আনসার গোত্র তো গান পছন্দ করে।’ অন্য এক বর্ণনায় (সম্ভবত এই ঘটনা প্রসঙ্গেই) রয়েছে যে, রসূল সা. বলেছেন, ‘তোমরা কনের সাথে একজন গায়ককে পাঠালে ভাল করতে।সে গাইত, আমরা তোমার কাছে এসেছি, কাজেই তোমরা সুখী হও, আমরা ও সুখী হই। এ ধরনেরই এক বিয়ের অনুষ্ঠানে ছোট ছোট মেয়েরা গান গাইছিল। হযরত আমের বিন সা’দ কতিপয় শ্রোতাকে আপত্তি জানিয়ে বললেন, ‘হে রসূলের সাহাবীগন,হে বদরের যোদ্ধাগন!তোমাদের সামনে এসব কর্মকান্ড হচ্ছে? উপস্থিত সাহাবীগন জবাব দিলেন, ‘তোমার ইচ্ছা হলে বসে শোন,নচেত চলে যাও। আল্লাহর রসূল আমাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন।’

বিনোদনের উপায় হিসেবে রসূল সা.কবিতার প্রতি ও আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে আরবে যে ভাবে কবিতার পুজা করা হতো, তা তিনি এড়িয়ে চলতেন। ওহীর সুমিষ্ট সুরের তীব্র আকর্ষন তাকে কবিতার প্রতি আকৃষ্ট করার তেমন সুযোগ দিতনা। কিন্তু কবিতার রুচি থেকে তিনি একদম বঞ্চিত ও ছিলেননা। বক্তব্যের দিক দিয়ে ভাল কবিতার যথেষ্ট কদর করতেন। বরঞ্চ বলা যায় যে, রসূল সা. সমাজকে এদিক দিয়ে এক নতুন রুচি দিয়েছেন এবং বাছ বিচারের এক নতুন মানদন্ড নির্ধারন করেছেন। হযরত জাবের বিন সামুরা বলেন, আমি রসূল সা. এর উপস্থিতিতে একশোর বেশী বৈঠকে যোগদান করেছি। এসব বৈঠকে জাহেলী যুগের কিচ্ছা কাহিনী যেমন বলা হতো তেমনি সাহাবীগন কবিতা ও পাঠ করতেন। একবার আরব কবি লাবীদের কবিতার নিম্নের চরন দুটির তিনি প্রশংসা করলেনঃ (আরবী***********)

‘সতর্ক হয়ে যাও, আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই ধংসশীল,দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত একদিন বিলীন হয়ে যাবে।’

একবার প্রবাসে থাকাকালে হযরত শরীদকে অনুরোধ করে কবি উমাইয়া ইবনে আবিসসালাতের একশোটা কবিতা পড়িয়ে শোনান। পরে মন্তব্য করেন,এই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহনের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কোন কোন সময় তিনি নিজে ও, বিশেষত যুদ্ধের ময়দানে, স্বতস্ফূর্তভাবে ও বিনা ইচ্ছায় কবিতার মত করে কথা বলতেন। ইসলামের শত্রুরা ইসলামের বিরুদ্ধে নিন্দা সূচক যেসব কবিতা পাঠ করতো, হযরত হাসসান ও কা’ব বিন মালেককে দিয়ে তার জবাব কবিতা রচনা করাতেন। কখনো কখনো হযরত হাসসানকে নিজের মিম্বরে বসিয়ে কবিতা পাঠ করাতেন এবং বলতেন, ‘এ কবিতা শত্রুর বিরূদ্ধে তীরের চেয়ে ও কঠোর।’ তিনি একথা ও বলেছেন, ‘মুমিন তরবারী দিয়ে যেমন জেহাদ করে, তেমনি মুখ দিয়ে ও জেহাদ করে।’ আমি কবিতা, সাহিত্য ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিষয়ে আলাদা একটা প্রবন্ধের মাধ্যমে বিষদ ভাবে আলোচনা করে দেখাতে চাই,রসূল সা. মানুষের রুচিকে কেমন গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করতেন।

 

কয়েকটি চমৎকার অভিরুচি

এ পর্যায়ে রসূল সা.এর এমন কিছু আদত অভ্যাস ও অভিরুচির উল্লেখ করতে চাই, যা অন্য কোন শিরোনামের আওতায় আনা হয়নি।

কোন জিনিস দেয়া ও নেয়ার কাজ ডান হাত দিয়েই সম্পন্ন করতেন। চিঠি লিখতে হলে প্রথমে বিছমিল্লাহ লেখাতেন। তারপর প্রেরকের নাম ও তার নিচে যাকে চিঠি লেখা হচ্ছে তার নাম থাকতো।

তিনি কল্পনা বিলাসিতা থেকে মুক্ত ছিলেন এবং কোন ‘শুভলক্ষন’ বা ‘অশুভলক্ষনে’ বিশ্বাস করতেননা। তবে ব্যক্তি ও স্থানের ভাল অর্থবোধক ও শ্রুতি মধুর নাম পছন্দ করতেন। খারাপ নাম পছন্দ করতেননা। বিশেষত সফরে যাত্রা বিরতির জন্য এমন জায়গা নির্ধারন করতেন। যার নাম আনন্দ বরকত বা সাফল্যের অর্থসূচক। অনুরূপভাবে, যে ব্যাক্তির নাম ঝগড়া, লড়াই বা ক্ষতির অর্থবোধক,তাকে কোন কাজ সোপর্দ করতেননা। যাদের নামের অর্থে আনন্দ বা সাফল্য ইত্যাদি আছে,তাদেরকেই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করতেন। বহুনাম তিনি পাল্টে দিয়েছেন।

-বাহক জন্তুর মধ্যে ঘোড়াই বেশী প্রিয় ছিল। বলতেন, ঘোড়ার মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত কল্যান ও বরকত নিহিত রয়েছে। ঘোড়ার চোখ,মুখ ও নাকের বিশেষ যত্ন নিতেন এবং নিজে হাতে পরিষ্কার করতেন।

- হৈ চৈ ও হাঙ্গামা পছন্দ করতেননা। সব কাজে ধীরস্থির থাকা, নিয়ম শৃংখলা ও সময়ানুবর্তিতা ভালোবাসতেন। এমনকি নামাজ সম্বন্ধে ও বলেছেন যে, দৌড়াদৌড়ি করে এসনা। শান্তশিষ্ট ও ধীরস্থিরভাবে এস। আরাফার দিন অনেক হৈ-চৈ হলে তিনি নিজের ছড়ি উচিয়ে শান্ত থাকা ও শৃংখালা মেনে চলার নির্দেশ দেন এবং বলেন তাড়াহুড়োয় কোন পূণ্য নেই। [বুখারী ও মুসলিম]

 

স্বভাব চরিত্র

রসূল সা. এর আখলাক বা স্বভাব চরিত্র ও নৈতিকতার বিবরণ কোন উপশিরোনামে দেয়া সম্ভব নয়। কেননা তার গোটা জিবনইতো সৎ চরিত্রের নামান্তর। হযরত আয়েশা বলেছিলেনঃ ‘কোরআনই ছিল তার চরিত্র। হযরত আনাস ইবনে মালেক বলেনঃ ‘তিনি সবার চেয়ে ন্যায়পরায়ণ, দানশীল ও বীর ছিলেন।’

সবার চেয়ে ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এভাবে যে,সারাজীবনে ও কাওকে কষ্ট দেননি, (আল্লাহর হুকুম অনুসারে যা দিয়েছেন, তা বাদে)এবং অন্যদের অত্যাচারের কোন প্রতিশোধ নেননি। সবাইকে ক্ষমা করেছেন, এমনকি মক্কা ও তায়েফের নজীরবিহীন অত্যাচারকারীদেরকেও এবং সকল মোনাফেক ও দুর্বৃত্তকেও। সবচেয়ে দানশীল ছিলেন এভাবে যে, হযরত জাবের রা. বলেন, রসূলুল্লাহর কাছে যে যা-ই চেয়েছে, তিনি তা দিতে অস্বীকার করেননি। হাতে থাকলে তৎক্ষণাত দিতেন, কখনো অন্যের কাছ থেকে ধার করে দিতেন, আর না থাকলে পরে আসতে বলতেন অথবা চুপ থাকতেন। সবার চেয়ে বীর ছিলেন, একথার প্রমাণ হিসেবে আপাতত এটুকু বলাই যথেষ্ট যে, সত্য আদর্শ নিয়ে একবোরেই একাকী মাঠে নেমেছিলেন এবং সমগ্রদেশ বাসীর বিরোধীতা ও অত্যাচারের মুখে ও অটল থেকেছিলেন। কখনো কোন কঠিনতম যুদ্ধের মুখে ও ভীতি বা দুর্বলতা প্রকাশ করেননি। সূর পর্বতের গুহায়ই হোক কিংবা ওহুদ ও হুনায়েনের রণাঙ্গনেই হোক, সবত্র অবিচল প্রত্যয় ও বিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছেন।

মক্কীযুগে মানবতার বন্ধু সা.

 

তীব্র বিরোধীতার মুখোমুখী

এ হচ্ছে একটি শাশ্বত কথা।

এ কথাটি গ্রহন করে তোমরা

আমার সাথি হয়ে যাও। দেখবে,

এর শক্তিতে গোটা আরব তোমাদের।

মুষ্টিবদ্ধ হবে এবং এর প্রভাবে

গোটা বিশ্ব তোমাদের অধীন হবে।

-মানবতার বন্ধু সা.

এবার আসুন, ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতটা পর্যালোচনা করা যাক। উষর মরুতে বিকশিত সেই ফুলের গাছটার উত্থান পর্যবেক্ষন করি,যার চারদিকে কাটা বিছিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল।

 

এই সেই যুবক

আরবের এক বিশিষ্ট,সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে, নির্মল স্বভাব বিশিষ্ট এক ভাগ্যবান দম্পতির গৃহে এক ব্যতিক্রমী শিশু পিতৃহীন অবস্থায় জন্ম গ্রহন করে। সে জনৈকা দরিদ্র ও সুশীলা ধাত্রীর দুধ খেয়ে গ্রামের সুস্থ ও অকৃত্রিম পরিবেশে প্রকৃতির কোলে লালিত পালিত হয় ও বেড়ে ওঠে। সে বিশেষ ব্যবস্থাধীনে মরুভুমিতে ছুটাছুটি করতে করতে জীবনের কর্মক্ষেত্রে চরম বিপদ মুসিবত ও দুঃখ কষ্ট মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং ছাগল ভেড়া চরিয়ে চরিয়ে এক বিশ্বজোড়া জাতির নেতৃত্ব করার প্রশিক্ষন গ্রহন করে। শৈশবের পুরো সময়টা অতিবাহিত করার আগেই এই ব্যতিক্রমী শিশু মায়ের স্নেহময় ছায়া থেকে ও বঞ্চিত হয়। দাদার ব্যক্তিত্ব পিতামাতার এই শুন্যতা খানিকটা পুরন করতে পারলে ও কিছুদিন যেতে না যেতেই এই আশ্রয় ও তার হাতছাড়া হয়ে যায়। অবশেষে চাচা হন অভিভাবক। এ যেন কোন পার্থিব আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী না হয়ে একমাত্র আসল মনিবের আশ্রয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি পর্ব।

যৌবনে পদার্পন করা পর্যন্ত এ ব্যতিক্রমী কিশোরকে অন্যান্য ছেলেদের মত দুষ্ট ও বখাটে হয়ে নয়, বরং প্রবীনদের মত ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে দেখা যায়। যখন সে যৌবনে পদার্পন করে, তখন চরম নোংরা পরিবেশে লালিত পালিত হওয়া সত্ত্বে ও নিজের যৌবনকে নিষ্কলংক রাখতে সক্ষম হয়। যে সমাজে প্রেম,কু-দৃষ্টি বিনিময় ও ব্যভিচার যুবকদের জন্য গর্বের ব্যাপার, সেই সমাজে এই অসাধারন যুবক নিজের দৃষ্টিকে পর্যন্ত কলুষিত হতে দেয়না। যে সমাজে প্রত্যেক অলিতে গলিতে মদ তৈরীর কারখানা এবং ঘরে ঘরে পানশালা, যে সমাজে প্রত্যেক মজলিশে পরনারীর প্রতি প্রকাশ্য প্রেম নিবেদন ও মদ্যপানের বিষয়ে কবিতা পাঠের জমজমাট আসর বসে, সেখানে এই নবীন যুবক এক ফোঁটা মদ ও মুখে নেয়না। যেখানে জুয়া জাতীয় অনুষ্ঠানের রূপ পরিগ্রহ করেছিল, সেখানে আপাদমস্তক পবিত্রতায়মন্ডিত এই যুবক জুয়ার স্পর্শ পর্যন্ত করেনা। রূপকথার গল্প বলা ও গান বাজনা যেখানে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে ভিন্ন এক জগতের এই অধিবাসী এইসব অপসংস্কৃতির ধারে কাছেও ঘেষেনা। দু’একবার যদি ও এধরনের বিনোদনমুলক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ তার হয়েছিল,কিন্তু যাওয়া মাত্রই তার এমন ঘুম পায় যে, সেখানকার কোন অনুষ্ঠানই তার আর দেখা্ ও শোনার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। যে সমাজে দেবমূর্তির সামনে সিজদা করা ধর্মীয় প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে হযরত ইবরাহিমের বংশধর এই পবিত্র মেজাজধারী তরুণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা ও নোয়ায়না এবং কোন মোশরেক সুলভ ধ্যান ধারণা ও পোষন করেনা। এমনকি একবার যখন তাকে দেবমূর্তির সামনে বলি দেয়া জন্তুর রান্না করা গোশত খেতে দেয়া হয়,তখন সে তা খেতে অস্বীকার করে। যেখানে কুরায়েশরা হজ্জের মৌসুমে আরাফাত ময়দানে না গিয়েই হজ্জ সম্পন্ন করতো, সেখানে এই অসাধারন কুরায়েশী যুবক এই মনগড়া নিয়মকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। হযরত ইবরাহীমের বংশধরেরা যেখানে ইবরাহীমী আদর্শকে বিকৃত করে অন্য বহু অনাচার ছাড়াও দিগম্বর সেজে কা’বা শরীফ তওয়াফ করার জঘন্য বেদায়াত চালু করে,সেখানে এই লাজুক যুবক এক মুহুর্তের জন্যেও এই বেদায়াতকে গ্রহন করেনা। যে দেশে যুদ্ধ একটা খেলা এবং রক্তপাত, একটা তামাশায় পরিনত হয়েছিল সেখানে মানবতার সম্মানের পতাকাবাহী এই যুবক এক ফোটা ও রক্তপাত করেনি। তারুণ্যে এই যুবক ‘হারবুল ফুজ্জার’ নামক বিরাট যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে হয়েছিল। কোরায়েশ গোত্রের এই যুদ্ধে অংশ গ্রহন ন্যায় সংগত ছিল বলে সে এই যুদ্ধে যোগদান করলে ও মানুষকে নিজে কোন আঘাত করেনি।

শুধু কি তাই? এই সতচরিত্র ও সত্যাশ্রয়ী যুবকের শখ কেমন তা ও দেখুন। যে বয়সে ছেলেরা সাধারনত বিপথগামী হয়ে থাকে, ঠিক সেই বয়সেই সে গরীব ও নিপিড়িত মানুষের সহায়তা এবং অত্যাচারীদের যুলুম উচ্ছেদের লক্ষে ‘হালফুল ফুজুল’ নামে একটা সংস্কারকামী সমিতিতে যোগদান করে। এতে যোগদানকারীরা তাদের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়নের অঙ্গিকার করে।

নবুয়ত লাভের পর রসূল সা.ঐ সমিতির স্মৃতি চারন করতে গিয়ে বলতেনঃ’

ঐ অঙ্গিকারের পরিবর্তে কেউ যদি আমাকে লাল রং এর উটও দিত, তবু ও আমি তা থেকে ফিরে আসতামনা। আজও কেউ যদি আমাকে ঐ রকমের কোন চুক্তি সম্পাদন করতে ডাকে, তবে আমি সেজন্য প্রস্তুত।’

এই যুবকের গুনাবলী ও যোগ্যতা কতখানি, তা এ ঘটনা থেকেই বুঝা যায় যে, কা’বা শরীফ সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদ পুনস্থাপন নিয়ে কোরায়েশদের মধ্যে তীব্র অন্তর্দন্দ্ব দেখা দেয়। এটা এতদুর গড়ায় যে, তলোয়ার পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে এবং সাজসাজ রব পড়ে যায়। কিন্ত ভাগ্রক্রমে এই গোলযোগ মিটমাট করার সুযোগটা এই যুবকই লাভ করে। চরম উত্তেজনার মধ্যে শান্তির পতাকাবাহী এই বিচারক একটা চাদর বিছিয়ে দেয় এবং চাদরের উপর রেখে দেয় হাজরে আসওয়াদ নামক সেই পাথর। তারপর সে কোরায়েশ গোত্রের সকল শাখার প্রতিনিধিদেরকে চাদর উত্তোলনের আহবান জানায়।

পাথর সমেত চাদর উত্তোলিত হয়ে যখন যথাস্থানে উপনীত হলো, তখন এই যুবক পাথরটা তুলে যথাস্থানে স্থাপন করলো। গোলযোগ থেমে গেল এবং সকলের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল ও উৎফুল্ল হয়ে উঠলো।

এই যুবক যখন অর্থোপার্জনের ময়দানে পদার্পন করলো, তখন বাণিজ্যের ন্যায় পবিত্র ও সম্মানজনক পেশা বেছে নিল। দেশের বড় বড় পুঁজিপতি এই যুবককে তাদের পুঁজিগ্রহণ ও বাণিজ্য করার জন্য মনোনীত করে। এ যুবকের মধ্যে এমন গুণ নিশ্চয়ই ছিল যে জন্য তারা তাকেই মনোনীত করেছিল। সায়েব, কায়েস বিন সায়েব, হযরত খাদীজা এবং আরো কয়েক ব্যক্তি একে একে এই যুবকের অনুপম সততার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং তারা সবাই তাদে এক বাক্যে ‘তাজের আমিন’ বা ‘সৎ ব্যবসায়ী’ উপাধিতে ভূষিত করে। আব্দুল্লাহ বিন আবিল হামসার সাক্ষ্য আজও সংরক্ষিত রয়েছে যে, নবুয়তের পূর্বে একবার এই তরুণ সৎ ব্যবসায়ীর সাথে তাঁর কথা হয় যে, আপনি এখানে দাড়ান, আমি আসছি। কিন্তু পরে সে ভুলে যায়। তিন দিন পর ঘটনাক্রমে আব্দুল্লাহ ঐ জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পায়, ঐ সৎ ব্যবসায়ী আপন প্রতিশ্রুতির শেকলে আবদ্ধ হয়ে সেই জায়গায়ই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। সে আব্দুল্লাহকে বললো, ‘তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ। আমি তিন দিন ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি।’- আবু দাউদ

তারপর দেখুন, এ যুবক জীবন সংগিনী নির্বাচন করার সময় মক্কার উঠতি যৌবনা চপলা চঞ্চলা মেয়েদের দিকে ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত না করে এমন এক মহিলাকে বিয়ে করে, যার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য এইযে, তিনি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সতী সাধ্বী ও সচ্চরিত্র মহিলা। তার এ নির্বাচন তাঁর মানসিকতা ও স্বভাব চরিত্রের গভীরতাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিয়ের প্রস্তাব হযরত খাদীজাই পাঠান, যিনি এই যুবকের অতুলনীয় সততা ও নির্মল চরিত্র দেখে অভিভূত হয়েছিলেন। আর যুবকও এ প্রস্তাব সর্বান্তকরণে গ্রহণ করে।

এছাড়া কোন ব্যক্তির চরিত্র ও মানসিকতাকে যদি তাঁর বন্ধুবান্ধব ও সহচরদেরকে দেখে যাচাই করতে হয়, তাহলে আসুন দেখা যাক কেমন লোকেরা এ যুবকের বন্ধু ছিল?

সম্ভবত হযরত আবু বকরের সাথেই ছিল তাঁর সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব ও সবচেয়ে অকৃত্রিম সম্পর্ক। একে তো সমবয়সী, তদুপরি সমমনা। তার অপর এক বন্ধু ছিল হযরত খাদীজার চাচাতো ভাই হাকীম বিন হিযাম। এই ব্যক্তি হারাম শরীফের একজন খাদেম ছিলেন। [অষ্টম হিজরী পর্যন্তও তিনি ঈমান আনেননি। কিন্তু তবুও রসূল (সাঃ) এর সাথে গভীর বন্ধুত্ব ও প্রীতি বজায় রাখতেন। এই বন্ধুত্বের কারনেই একবার পঞ্চাশ আশরাফী দিয়ে একটা মূল্যবান পোশাক কিনে মদীনায় এসে রসূল (সাঃ) কে উপহার দেন। কিন্তু রসুল (সাঃ) অনেক পীড়াপীড়ী করে তাকে ঐ পোশাকের মূল্য দিয়ে দেন।] দেমাদ বিন সা’লাবা আযদী নামক একজন চিকিৎসকও ছিল তাঁর অন্যতম বন্ধু। কই, এ যুবকের বন্ধু মহলে একজনও তো নীচ, হীন, বদ অভ্যাস, যুলুমবাজ ও পাপাচারী লোক দেখা যায়না!

এই যুবক সাংসারিক, ব্যবসায়িক ও অন্যান্য দুনিয়াবী ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে যখনই কিছু সময় অবসর পেয়েছে, তখন তা আমোদ ফূর্তি ও বিনোদনে কাটায়নি। যত্রতত্র ঘোরাঘোরি করে, আড্ডা দিয়ে, অথবা অলসভাবে ঘুমিয়ে কাটায়নি। বরং সমস্ত হৈ হাঙ্গামা থেকে দূরে সরে ও সমস্ত কর্মব্যস্ততা পরিহার করে নিজের নির্মল ও নিষ্কলুষ সহজাত চেতনা ও বিবেকের নির্দেশক্রমে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করতো হেরা গুহার নিভৃত প্রকোষ্ঠে গিয়ে। বিশ্বজগতের প্রচ্ছন্ন মহাসত্যকে হৃদয়ংগম করা ও মানব জীবনের অদৃশ্য রহস্যগুলোকে জানার জন্য আপন সত্তায় ও বিশ্ব প্রকৃতির অতলান্তে চিন্তা গবেষণা চালাতো। সে ভাবতো, কিভাবে আপন দেশবাসী ও গোটা মানবজাতিকে নৈতিকহীনতা ও নীচতা থেকে টেনে তুলে ফেরেশতার পর্যায়ে উন্নীত করা যায়। যে যুবকের যৌবনের অবসর সময় ব্যয় হলো এরূপ একান্ত চিন্তা গবেষণা কার্যে, তাঁর উঁচু ও পবিত্র স্বভাব সম্পর্কে মানবীয় বিবেক বুদ্ধি ও অন্তর্দৃষ্টি-কি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা?

দৈনন্দিন জীবনের এ জাতীয় ঘটনাবলী নিয়ে ভবিষ্যতের বিশ্বনবী কোরায়েশদের চোখের সামনেই মক্কী সমাজের কোলে লালিত পালিত হতে থাকে, ক্রমে যৌবনে পদার্পন করে এবং পরিপক্কতা লাভ করে। জীবনের এই চিত্র কি বলে দিচ্ছিলনা যে, এ যুবক এক অসাধারণ মহামানব? এভাবে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কি কোনভাবে এম ধারণা পোষোণ করা চলে যে, ইনি কোন মিথ্যাচারী ও ধাপ্পাবাজ মানুষ হতে পারে? কিংবা হতে পারেন কোন পদলোভী, স্বার্থপর কিংবা ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসায় ফেঁদে বসা কোন ধর্মব্যবসায়ী? কক্ষনো নয়। খোদ কোরায়েশরাই তাঁকে সাদেক(সত্যবাদী) আমীন (বিশ্বাসী ও সৎ) জ্ঞানীগুণি, পবিত্রাত্না, ও মহৎ চরিত্রধারী মানুষ বলে স্বীকার করেছে এবং বারংবার করেছে। তার শত্রুরাও তাঁর মণীষা ও নৈতিকতার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দিয়েছে এবং কঠিনতম দ্বন্দ্ব সংঘাতের মধ্যেও দিয়েছে। সত্যের এই মহান আহবায়কের জীবন চিত্রকে কুরআন নিজেও সাক্ষী হিসেবে পেশ করে তাঁকে বলতে বলেছেঃ [আরবীঃ ************]

‘আমি তো এর আগেও তোমাদের মাঝেই জীবনের একটা অংশ অতিবাহিত করেছি, তবুও কি তোমাদের বুঝে আসেনা?’ (ইউনুস, ১৬০)

কিন্তু জাতির এই উজ্জ্বল রত্নটি যখন নবুয়তের পদে অধিষ্ঠিত হয়ে সত্যের বাণী পেশ করলো, তখন তাদের মনোভাব সহসাই পালটে গেল। তার সততা, সত্যবাদিতা, ভদ্রতা, মহত্ব ও বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব সব কিছুরই মূল্য কমে গেল।কাল পর্যন্ত যে ব্যক্তি জাতির চোখের মনি ছিল, আজ সে দুশমন, বিদ্রোহী ও জাতির কলংক খেতাব পেল। কাল পর্যন্ত যাকে প্রতিটি শিশু পর্যন্ত সম্মান করতো, আজ সে সকলের ক্রোধভাজন। দীর্ঘ চল্লিশোর্ধ বছর ধরে যে ব্যক্তি নিজেকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করেছেন, তিনি আজ আল্লাহর একত্ববাদ, সত্য ও ন্যায়ের বাণী শোনানো মাত্রই কোরায়েশদের চোখে খারাপ হয়ে গেলেন! আসলে তিনি খারাপ ছিলেন না। বরং কোরায়েশের মূল্যায়নকারীদের চোখেই ছিল বক্রতা এবং তাদের মানদন্ডই ছিল ভ্রান্ত।

কিন্তু সত্যই কি কোরায়েশদের চোখ এত অন্ধ ছিল যে, ঘোর তমসাচ্ছন্ন পরিবেশে এমন আলোকময় একটা চাঁদকে তারা দেখতে পায়নি? চরিত্রহীনদের সমাবেশে সৎ চরিত্রবান একজন নেতাকে দেখে কি তারা চিনতে পারেনি? আস্তাকুড়ে পড়ে থাকা মুক্তার একটা মালা কি তাদের নজর কাড়তে পারেনি? অসভ্য ইতর মানুষদের সমাজে এই আপাদমস্তক ভদ্রতা ও শিষ্টাচারে মন্ডিত ব্যক্তি কি নিজের যথোচিত আদর ও কদর আদায় করতে পারেন নি? না, তা নয়। কোরায়েশরা ভালোভাবেই জানতো মুহাম্মদ কেমন মানুষ। কিন্তু জেনে শুনেও তারা চোখে ঠুলি পরেছিল। স্বার্থপরতা ও বিদ্বেষ তাদেরকে চোখ থাকতে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছিল। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ ‘তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখতে পায়না।' চোখ থাকতে যারা অন্ধ হয় তাদের দ্বারা হেন বিপদ নেই যা ঘটতে পারেনা এবং হেন বিপর্যয় নেই যা দেখা দিতে পারেনা।

 

কোরায়েশদের বিরোধিতার কারণ

আজ যদি আমরা কোনভাবে মক্কার কোরায়েশদের সাথে কথা বলতে পারতাম তাহলে অবশ্যই জিজ্ঞেস করতাম, তোমাদের গোত্রের এই নয়নমনি যে দাওয়াতটা দিয়েছিল, তাতে সে মূলত কোন্ খারাপ কাজটার প্ররোচনা দিয়েছিল? সে কি তোমাদের চুরি ডাকাতি করার আহবান জানিয়েছিল? সে কি তোমাদের হত্যা ও লুটতরাজ করতে ডেকেছিল? সে কি এতীম, বিধবা ও দুর্বলদের যুলুম নির্যাতন ও শোষণ চালানোর কোন পরিকল্পনা পেশ করেছিল? সে কি তোমাদের পারস্পরিক লড়াই চালাতে ও গোত্রে গোত্রে কোন্দল বাধাতে উস্কানি দিয়েছিল? সে কি কোন বিত্তবৈভব গড়া ও ভূ-সম্পত্তি বানানোর জন্য কোন সমিতি গঠন করতে চেয়েছিল? তোমরা তার ডাকে কী অসুবিধা দেখেছিলে? তার কর্মসূচীতে কোন্ বিপর্যয় অনুভব করেছিলে? কী কারণে তোমরা তার বিরুদ্ধে আদাপানি খেয়ে লেগেছিলে?

যে জিনিসটি জাহেলিয়াতের ভ্রান্ত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে এবং পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কোরায়েশদের উন্মত্ত করে তুলেছিল, সেটা রসূল সাঃ এর চিন্তা ও চরিত্রের কোন ত্রুটি এবং তাঁর দাওয়াতের কোন মারাত্নক ক্ষতিকর ছিলনা। এর কারন এও ছিলনা যে, তাঁর আন্দোলন তৎকালীন জাহেলী সমাজকে পশ্চাদপদতার দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল। বরং সে জিনিসটি ছিল শুধুমাত্র কোরায়েশদের স্বার্থপরতা। শত শত বছর ধরে গঠিত আরবীয় সমাজ কাঠামোতে কোরায়েশরা নিজেদের জন্য একটা উচ্চ নেতৃত্বের আসন দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। সমস্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পদ তাদের কুক্ষিগত ছিল। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে তাদের আধিপত্য ছিল অদম্য। এক কথায় গোটা আরব জাতির তারাই ছিল হর্তাকর্তা ও কর্ণধার। তাদের এই অবিসংবাদিত নেতৃত্ব ও আধিপত্য শুধু সেই ধর্মীয়,সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোতেই চলতে সক্ষম ছিল, যা জাহেলী যুগ থেকে চলে আসছিল। তারা যদি সচেতন ও অবচেতনভাবে নিজেদের এই সর্বময় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বকে টিকিয়ে রাখতে বাধ্য থেকে থাকে, তবে তারা তাদের জাহেলী সমাজ ব্যবস্থাকেও সব রকমের আক্রমণ ও অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে বাধ্য ছিল।

কোরায়েশ গোত্র যেখানে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে আরবদের নেতা ও পরিচালক ছিল, সেখানে তারা আরবদের পৌত্তলিক ধর্মের পুরোহিত, ধর্মীয় তীর্থস্থানগুলোর রক্ষক ও সেবক এবং যাবতীয় ধর্মীয় তৎপরতার একচ্ছত্র ব্যবস্থাপকও ছিল। এই ধর্মীয় একচ্ছত্র ব্যবস্থাপনা ও সর্বময় কর্তৃত্ব তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্তৃত্বেরও পৃষ্ঠপোষক ছিল এবং এটা স্বতন্ত্রভাবে একটা বড় রকমের ব্যবস্থাও ছিল। এর কারণে আরব উপদ্বীপের প্রতিটি অঞ্চল থেকে তাদের কাছে নযর নিয়ায তথা উপঢৌকনাদি আসতো। এর কারণে তারা প্রগাঢ় ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র ছিল। লোকেরা তাদের কদমবুছি করতো। ধর্ম যখন কোন শ্রেণী বা গোষ্ঠীর ব্যবসায়ে পরিণত হয় তখন তার আসল প্রেরণা, চেতনা ও প্রাণশক্তি লোপ পায় এবং রকমারি আনুষ্ঠানিকতায় পরিপূর্ণ একটা নিরেট প্রদর্শনীমূলক তামাশার রূপ ধারণ করে। ধর্মের নীতিগত দাবী কি, তা আর কেউ মনে রাখেনা। তখন মনগড়া ঐতিহ্য ও অনুষ্ঠানাদি মৌলিক গুরুত্বের অধিকারী হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহর দেয়া ওহী ভিত্তিক জ্ঞান ও আইন কানুন তখন উধাও হয়ে যায় এবং ধর্মব্যবসায়ীদের তৈরী করা এক অভিনব শরীয়ত বিকাশ লাভ করে। যৌক্তিকতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অন্ধ বিশ্বাস ও অলীক ধ্যানধারণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সাক্ষ্য প্রমাণ সহকারে বক্তব্য দেয়ার রীতি উধাও হয়ে যায়। আবেগ উত্তেজনা বিবেকবুদ্ধির কন্ঠরোধ করে। ধর্মের গণমুখী ও গণতান্ত্রিক মেযাজ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ধর্মব্যবসায়ীদের একনায়কত্ব সমাজের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে পড়ে। প্রকৃত জ্ঞান অবলুপ্ত হয়ে যায় এবং ভিত্তিহীন কথাবার্তা জনপ্রিয়তা লাভ করে। সহজ সরল আকীদা বিশ্বাস ও বিধিমালার পরিবর্তে কথায় কথায় জটিল ও পেঁচালো বিধিনিষেধ জারী করা হয়। দ্বিমত পোষণের অধিকার সম্পূর্ণরূপে হরণ করা হয় এবং একটা গোষ্ঠীর স্বৈরাচারী কর্তৃত্ব অবাধে চালু হয়ে যায়। সত্য, সততা, সৌজন্য ও খোদাভীতির নাম নিশানাও অবশিষ্ট থাকেনা এবং ধর্ম একটা প্রতারণাময় বহুরূপী কারবারের রূপ ধারণ করে। যখনই কোন ধর্মের বিকৃতি ঘটেছে, তখন এই প্রক্রিয়াতেই তা ঘটেছে। আরবের জাহেলী সমাজে এই বিকৃতি নিকৃষ্টতম পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। এই বিকৃতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিল কোরায়েশ গোত্রের ধর্মীয় পৌরহিত্যের গদি। এই বিরাট লাভজনক ক্ষমতার গদিকে টিকিয়ে রাখার জন্য ঐ বিকৃত ধর্মীয় আবহ ও অবকাঠামোকে বহাল রাখা আবশ্যক ছিল। তার বিরুদ্ধে কোন বাদ প্রতিবাদ ও ভিন্নমতের আওয়ায তোলা এবং কোন ধরনের সংস্কার ও সংশোধনের আহবান জানানো যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য ছিল। সুতরাং কোরায়েশ গোত্র যে ইসলামের দাওয়াতে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে সেটা ছিল সম্পূর্ন স্বাভাবিক।

তা ছাড়া, কোরায়েশদের সংস্কৃতি ছিল চরম পাপাচারী সংস্কৃতি। মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়া, সুদখোরী, নারী নির্যাতন, মেয়ে শিশুকে জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলা, স্বাধীন মানুষকে গোলাম বানানো এবং দুর্বলদের ওপর যুলুম করা এসবই ছিল কোরায়শ সংস্কৃতির বৈশিষ্ট। শত শত বছরব্যাপী পুঞ্জীভূত বদভ্যাস ও গৌরবময় জাতীয় ঐতিহ্যের রূপ ধারণকারী কদর্য সমাজপ্রথার সমন্বয়েই গঠিত ছিল এ সংস্কৃতি। নিজেদের হাতে গড়া এই সাংস্কৃতিক লৌহ খাঁচা ভেঙ্গে একটা নতুন পরিবেশে বিচরণ করতে প্রস্তুত হওয়া কোরায়েশদের জন্য সহজ ছিলনা। তারা সংগে সংগেই বুঝতে পেরেছিল যে, মুহাম্মদ সাঃ এর দাওয়াত তাদের চিরাচরিত রীতি-প্রথা, আদত অভ্যাস, কামনা-বাসনা, ললিতকলা তথা তাদের প্রিয় সংস্কৃতির শত্রু। তাই তারা প্রচন্ড আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ঐ দাওয়াতের বিরোধিতা করতে বদ্ধপরিকর হয়ে যায়।

আসলে এ সব কারণেই প্রতিষ্ঠিত বিকৃত সমাজব্যবস্থার কর্ণধাররা, ধর্মীয় ঠিকাদাররা এবং প্রবৃত্তির পূজারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চিরকাল সত্যের দাওয়াতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।

 

ঘোর অন্ধকারে কয়েকটা আগুনের ফুলকি

রসূল সাঃ এর নবুয়ত লাভের আগে আরবের কিছু প্রতিভাধর ব্যক্তির মনে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। মহাবিশ্বে বিরাজমান প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলীতে প্রতিফলিত খোদায়ী আভাস ইংগিতের ভিত্তিতে চলমান সমাজ, পরিবেশ ও পৌত্তলিক ধর্মের প্রতি তাদের সৃষ্টি হ্য় অনাস্থা ও বিরাগ। এ অবস্থা তাদের মনকে অশান্ত ও স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদে সোচ্চার করে তুলেছিল। একটু আগেই আমরা যে ক’জন সংবেদনশীল ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছি, তাদের অন্তরাত্না থেকেও পরিবর্তনের অস্পষ্ট আকুতি ফুটে উঠেছিল।

একদিন কোরায়েশ জনতা একটা প্রতিমার চারপাশে সমবেত হয়ে একটা উৎসব উদযাপন করছিল। তারা ঐ পাথুরে দেবমূর্তির ভজন গাইছিল। ভক্তি নিবেদন করছিল, তার ওপর নিভিন্ন নজর নেয়ায চড়াচ্ছিল, এবং তওয়াফ করছিল। ঠিক এই সময় চার ব্যক্তি ওয়ারাকা ইবনে নওফেল, আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ, উসমান ইবনুল হুয়াইরিছ এবং যায়েদ বিন আমর এই অর্থহীন উৎসবের প্রতি বিরক্ত হয়ে দূরে একটা আলাদা জায়গায় বসে গোপন বৈঠক করছিল। তারা পরস্পরের বক্তব্যের গোপনীয়তা রক্ষার শপথ গ্রহণের পর আলাপ আলোচনা চালায়। তাদের সর্বসম্মত অভিমত ছিল এরুপঃ ‘আমাদের জনগণ একেবারেই ভিত্তিহীন একটা মতাদর্শের ওপর চলছে। নিজেদের দাদা ইবরাহীমের ধর্মকে তারা বর্জন করেছে। যে পাথর নির্মিত মুর্তির উপাসনা করা হচ্ছে, তা দেখেও না, শোনেওনা, কারো উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারেনা। সাথীরা, তোমরা নিজ নিজ বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস কর, তাহলে আল্লাহর কসম, তোমরা বুঝতে পারবে যে, তোমাদের কোন ভিত্তি নেই। দুনিয়ার দেশে দেশে সফর কর এবং খোঁজ নাও, ইবরাহীমের ধর্মের সত্যিকার অনুসারী কেউ কোথাও আছে কিনা। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪২] পরে তাদের মধ্য থেকে ওয়ারাকা ইবনে নওফেল খৃষ্টান হয়ে যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে জাহাশ প্রথমে অস্থিরতার বশে মুসলমান হয়ে যায় এবং পরে আবার অস্থিরতার বশেই খৃষ্টান হয়ে যায়। উসমান রোম সম্রাটের কাছে গিয়ে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। আর যায়েদ ইহুদী বা খৃষ্টান কোনটাই হলোনা, আবার পৌত্তলিকতাও পরিত্যাগ করলো। সে মৃত প্রাণির গোশত, রক্ত, এবং বেদীতে বলি দেয়া পশুর গোশত খাওয়া ছেড়ে দিল এবং মেয়ে শিশু হত্যা করতে লোকজনকে নিষেধ করতে লাগলো। সে বলতোঃ ‘আমি ইবরাহীমের প্রভুর ইবাদত করি’। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪২] হযরত আবু বকরের মেয়ে আসমা বলেন, ‘আমি বুড়ো গোত্রপতি যায়েদকে কা’বা শরীফের সাথে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখেছি। সে বলছিল, ‘হে কুরাইশ জনতা, আল্লাহর শপথ, আমি ছাড়া তোমাদের কেউ ইবরাহীমের ধর্ম অনুসরণ করছেনা।’ তারপর সে বললো, ‘হে আল্লাহ, আমি যদি জানতাম কোন্ নিয়ম তোমার পছন্দ, তা হলে সেই নিয়মেই তোমার ইবাদত করতাম। কিন্তু আমি জানিনা। তারপর সে হাতের তালু মাটিতে রেখে সিজদা করতো। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪২] তার সাথে কেউ সাক্ষাত করতে গেলে সে প্রায়ই এই কবিতাটা পড়ে শোনাতো, যার অর্থ হলোঃ “রব কি একজন হওয়া উচিত’ না হাজার হাজার? জীবনের সমস্যাগুলো যখন একাধিক রবের মধ্যে বন্টিত হয়ে যায়, তখন আমি কোন রবের আনুগত্য করবো”।

‘আমি লাত ও উযযা সবাইকে ত্যাগ করেছি। দৃঢ়চেতা ও ধৈর্যশীল লোকেরা এমনটিই করে থাকে।’

‘তবে হাঁ, আমি আমার দয়াময় রহমানের ইবাদত অবশ্যই করতে থাকবো, যাতে সেই ক্ষমাশীল প্রভু মাফ করে দেন আমার গুনাহগুলো।’

‘সুতরাং তোমরা একমাত্র আল্লাহকে ভয় করার নীতি অব্যাহত রাখ, যতক্ষণ এটা অব্যাহত রাখবে, তোমরা ধ্বংস হবে না ততক্ষণ।’

বেচারা যায়েদের স্ত্রী সফিয়া বিনতুল হাযরামী অনবরত তার পেছনে লেগে থাকতো। কখনো কখনো যায়েদ প্রকৃত ইবরাহীমি ধর্মের অন্বেষণে মক্কা ছেড়ে বেরুতে চাইত। কিন্তু তার স্ত্রী এটা খাত্তাব বিন নুফাইলকে আগে ভাগে জানিয়ে দিত। আর খাত্তাব পৈত্রিক ধর্ম ত্যাগ করার জন্য তাকে তীব্র ভর্ৎসনা করতো। যায়েদ নিজের মতের প্রতি এত উৎসর্গীত ছিল যে, কা’বা শরীফের চত্তরে প্রবেশ করা মাত্রই বলে উঠতো।

‘হে সত্য প্রভু! আমি তোমার কাছে আন্তরিকতার সাথে ও দাসত্বের মনোভাব নিয়ে ইবাদত করার জন্য হাজির হয়েছি।’ তারপর আরো বলতো, ‘আমি কা’বার দিকে মুখ ক’রে সেই সত্তার কাছে আশ্রয় চাই, যার কাছে হযরত ইবরাহীম আশ্রয় চাইতেন।’ [সীরাত ইবনে হিশাম পৃঃ ২৪৮]

খাত্তাব বিন নুফাইল যায়েদকে কষ্ট দিত। এক পর্যায়ে সে তাকে মক্কার বাইরে নির্বাসিত করে। যায়েদ মক্কার উপকন্ঠে হেরার কাছে অবস্থান করতে থাকে। এরপর খাত্তাব কুরাইশ গোত্রের কিছু যুবক ও দুশ্চরিত্র লোককে তার প্রহরী নিযুক্ত করে এবং তাকে মক্কায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার নির্দেশ দেয়। যায়েদ কখনো লুকিয়ে মক্কায় আসতো। খাত্তাব ও তার সাথীরা টের পেলে তাকে আবার বিতাড়িত করতো। তারা তাকে ধর্ম বিকৃত করার দায়ে খুবই ঘৃণার সাথে নির্যাতন করতো। অবশেষে বিরক্ত হয়ে সে দেশ ছেড়ে চলে যায় এবং মোসেল, সিরিয়া প্রভৃতি স্থানে হযরত ইবরাহীমের ধর্মের অন্বেষণে ঘুরে বেড়াতে থাকে। অবশেষে সে দামেস্কের রোলকা এলাকায় জনৈক বিদ্বান দরবেশের সন্ধান পেল এবং তার কাছে গিয়ে হযরত ইবরাহীমের ধর্মের সন্ধান জানতে চাইল। দরবেশ বললো, ‘আজ আর তুমি এই ধর্মের অনুসারী একজন মানুষও পাবে না। তবে এই ধর্মের পতাকাবাহী একজন নবী শীঘ্রই আবির্ভূত হবেন এবং তুমি যে জায়গা থেকে এসেছ, সেখানেই আবির্ভূত হবেন। যাও, তার সাথে সাক্ষাত কর।` যায়েদ ইহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম ভালো করেই পরখ করে দেখেছিল। ঐ দুই ধর্ম তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। সে দরবেশের উপদেশ অনুসারে মক্কার দিকে ছুটে চললো। কিন্তু পথিমধ্যে ‘বিলাদ লাখাম’ নামক স্থানে লোকেরা তাকে হত্যা করে। [সীরাত ইবনে হিশাম, (প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৪৯,২৫০)]

এই যায়েদের পুত্র সাঈদ ও হযরত ওমর ইসলামের আবির্ভাবের পর রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, আমরা যায়েদের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে পারি কিনা? রসূল সা. বলেনঃ ‘হা, কারণ সে কেয়ামতের দিন একটা স্বতন্ত্র উম্মত হিসাবে ওঠবে।` অর্থাৎ কোন ব্যক্তির তার নির্মল স্বভাবের কাছ থেকে যতটুকু পথ নির্দেশ পাওয়া সম্ভব, তা পেয়েই যায়েদ পূর্ণ আন্তরিকতা সহকারে তা গ্রহণ করেছে, অতঃপর সে ওহীর হেদায়াত লাভের জন্য অনেক ছুটাছুটি করেছে। সর্বশেষে সে রসূল সা. এর কাছে রওনা হয়েছিল, কিন্তু এই সত্য সন্ধানের পথেই সে শহীদ হলো।

এই দীর্ঘ বর্ণনা থেকে বুঝা যায়, ইতিহাস একটা নতুন মোড় নেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল এবং মানবীয় বিবেক অশান্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু প্রকৃতির অস্পষ্ট আভাস ছাড়া কোন আলোর দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছিলনা। বিকৃত ধর্মচর্চা ও অযৌক্তিক আনুষ্ঠানিকতার পরিবেশ মানুষের স্বকীয়তার টুটি চেপে ধরেছিল। মানুষ ছিল স্থবিরতার চার দেয়ালে বন্দী। সংবেদনশীল লোকেরা হয় খৃস্টধর্মের মনযিলে এসে থেমে গিয়েছিল। কেননা পরিবেশ এর অনুকুল ছিল। নচেত তারা দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু চলমান ভ্রষ্টতার বিরুদ্ধে জেহাদ করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। উল্লেখিত চার ব্যক্তির মধ্যে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেবল যায়েদ এতটা সাহস দেখিয়েছে যে, হারাম শরীফে বসে এক আল্লাহকে ডেকেছে এবং কুরাইশদের সামনে পৌত্তিলিকতাকে ধিক্কার দিয়েছে। কিন্তু সেও অস্থিরতা প্রকাশ ও প্রতিবাদ করার চেয়ে বেশী কিছু করতে পারে নি। কেননা তার সামনে কোন এমন সুস্পষ্ট ও পূর্ণাংগ আদর্শ ছিলনা, যাকে সে দাওয়া ও আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তবুও মক্কা তার অস্তিত্ব বরদাশত করতে অস্বীকার করেছে।

জাহেলী সমাজে কবিদের বিশেষ মর্যাদা ছিল। তারা মানুষের মনস্তাত্মিক নেতৃত্বও দিত। তাদের কবিতা ছিল তৎকালীন সমাজের মানসিকতা ও চিন্তাধারার দর্শন। সমাজের বিবেকের অস্থিরতার ছাপ রসূল সা. এর অব্যবহিত-পূর্ববর্তী যুগের জাহেলী কবিদের কবিতায় প্রতিফলিত হতো। এ সব কবিতায় অনেক সময় মানবীয় বিবেক মৌলিক সত্য নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠতো।

এ সব কবির মধ্যে একজন হচ্ছেন তায়েফের বিশিষ্ট সরদার উমাইয়া বিন আবিস্ সাল্ত। ইনি তাওহীদ, কেয়ামত ও কর্মফল সম্পর্কে ভালো ধ্যান-ধারণা পেশ করেছেন। তাছাড়া বেশ কিছু নৈতিক উপদেশও তার কবিতায় রয়েছে। ইনিও পৌত্তলিক চিন্তাধারার প্রতি বিদ্রোহী ছিলেন। কিন্তু রসূল সা. এর দাওয়াতকে গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেননি। রসূল সা. তার কবিতাকে পছন্দ করতেন এবং বলতেন, এই ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল।

এ ধরনের সচেতন ব্যক্তিবর্গের মানসিক আলোড়ন পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, পরিবেশ একটা নতুন প্রাণোচ্ছল বাণী লাভের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল।

ইতিহাস যে বিপ্লবী শক্তির প্রতীক্ষায় ছিল, তা উপযুক্ত সময়েই মুহাম্মদ সা. এর মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তিনি শুধু নেতিবাচক প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে এবং নিজের ব্যক্তিগত মনমানস ও মহৎ চরিত্র নিয়েই উপস্থিত হননি, বরং একটা সর্বব্যাপী ইতিবাচক মতবাদ ও মতাদর্শ নিয়ে সমগ্র জাতি ও সমগ্র পরিবেশের আমূল পরিবর্তন সাধনের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। আরবের তৎকালীন পরাক্রান্ত বাতিল শক্তির পক্ষে এই অপরাধকে (?) বরদাশত করা কিভাবে সম্ভব ছিল?

 

দাওয়াতের প্রথম যুগঃ গোপন প্রচার

নবুয়তের সূচনা যুগের প্রাক্কালে প্রস্তুতি স্বরূপ নিভৃত ধ্যানে মগ্ন থাকার সময় রসূল সা. কে বিভিন্ন সত্য স্বপ্ন দেখানো হতো। কখনো বা গায়েবী আওয়ায শুনতে পেতেন। কখনো ফেরেশতা দেখতে পেতেন। অবশেষে আল্লাহর আরশ থেকে প্রথম বাণী এলো। জিবরীল এসে সম্বোধন করলেনঃ (আরবী********)

এটা ছিল তাঁর ওহী লাভের প্রথম অভিজ্ঞতা। তিনি অনুভব করলেন যেন তার ঘাড়ের ওপর এক ভীতিময় ও বিরাট বোঝা চেপে বসেছে। বাড়ীতে ফিরে এসে নিজের জীবন সংগীনিকে ঘটনা অবহিত করলেন। তিনি সান্ত্বনা দিলেন যে, আপনার খোদা কখনো আপনাকে ছেড়ে দেবন না। ওয়ারাকা ইবনে নওফেল বললেন, এতো আল্লাহর সেই দূত, যিনি মূসা আ. ওপর অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি আরো বললেন, দেশের লোকেরা আপনাকে মিথ্যুক বলবে, উত্যক্ত করবে, দেশ থেকে বিতাড়িত করবে এবং আপনার সাথে যুদ্ধ করবে। আমি যদি সেদিন বেঁচে থাকি, তাহলে আমি আল্লাহর কাজে আপনাকে সমর্থন করবো। এরপর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আল্লাহ পক্ষ থেকে সত্যের দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত হলেন। তাঁর ওপর এক বিরাট দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হলো। এ দাওয়াতা সর্বপ্রথম হযরত খাদীজার সামনে উপস্থাপিত হলো এবং তিনিই লাভ করলেন এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী প্রথম ব্যক্তির মর্যাদা। এরপর ধীর গতিতে গোপনে চলতে লাগলো এ কাজ। হযরত আবু বকর সিদ্দীক ছিলেন তাঁর বাল্যবন্ধু। দু’জনেরই মন মেযাজ ও রুচি ছিল একই রকম। তিনি যখন সত্যের দাওয়াত পেলেন, তৎক্ষণাত এমনভাবে তা গ্রহণ করলেন যেন তাঁর অন্তরাত্মা এরই জন্য আগে থেকে অপেক্ষমান ছিল। রসূল (সা) এর পালিত পুত্র যায়েদও তাঁর সাথী হলো। সে তাঁর জীবন ও চরিত্র দ্বারা আগে থেকেই প্রভাবিত ছিল।

এই ঘনিষ্ঠতম লোকদের তাঁর ওপর ঈমান আনা তার নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সত্যবাদিতার একটা প্রমাণ। এই ব্যক্তিবর্গ কয়েক বছর ধরে তাঁর ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন এবং তাঁর ভেতর ও বাহির সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে অবহিত ছিলেন। রসূল সা. এর জীবন চরিত্র, চিন্তাভাবনা ও মানসিকতা সম্পর্কে এদের চেয়ে বেশী জানা কারো পক্ষে সম্ভব ছিলনা। এই ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গ একেবারে সূচনাতেই তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে দিলেন যে, আহ্বায়কের সত্যবাদিতা ও আন্তরিকতা সন্দেহাতীত।

হযরত আবু বকর রা. রসূল সা. এর আন্দোলনের সৈনিক হওয়া মাত্রই নিজের প্রভাবাধীন লোকদের মধ্যে জোরে শোরে কাজ শুরু করে দিলেন। তিনি হযরত ওমর, ওসমান, যুবায়ের, আব্দুর রহমান বিন আওফ, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস, তালহা রা. প্রমুখসহ বেশ কিছু সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে এ বিপ্লবী আন্দোলনের সদস্য বানিয়ে ফেললেন। অত্যন্ত সতর্কতা, গোপনীয়তা ও নীরবতার মধ্য দিয়ে তারা এ কাজের প্রসার ঘটাতে লাগলেন। ইসলামী আন্দোলনের এই গোপনীয় ও প্রাথমিক যুগে অন্যান্য যারা প্রথম কাতারের মুসলমানদের দলভুক্ত হন তাদের মধ্যে হযরত আম্মার, খাব্বাব, আরকাম, সাঈদ বিন যায়েদ, (ইতিপূর্বে আলোচিত যায়েদ বিন আমরের পুত্র, যিনি পিতার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন) আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, উসমান বিন মাযঊন, আবু উবাইদা, সুহায়েব রূমী প্রমুখ অন্যতম।

নামাযের সময় হলে রসূল সা. কোন পাহাড়ের ওপর চলে যেতেন এবং নিজের সাথীদের নিয়ে গোপনে নামায পড়ে আসতেন। শুধু চাশতের নামায কা’বার চত্তরে পড়তেন। কেননা ও নামায কুরাইশদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। একবার রসুল সা. হযরত আলীকে সাথে নিয়ে কোন এক গিরিপথে নামায পড়েছিলেন। এ সময় তাঁর চাচা আবু তালেব তা দেখে ফেলেন। এই নতুন ধরনের নামায দেখে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান এবং গভীর মনোযোগের সাথে তা দেখতে থাকেন। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমরা এটা কোন ধর্ম অবলম্বন করলে? রসূল সা. বললেন, ’আমাদের দাদা ইবরাহীমের ধর্ম এটাই ছিল।’

একথা শুনে আবু তালেব বললেন, ’আমার পক্ষে তো এ ধর্ম গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি। কেউ তোমাদের বাধা দিতে পারবেনা। [সীরাতুন্নবী, শিবলী নুমানী, (প্রথম খন্ড, পৃঃ ১৯২)।]

হযরত আবু যরও ইসলামী আন্দোলনের এই গোপনীয়তার যুগে ঈমান এনেছিলেন। আল্লামা শিবলী নুমানীর মতে তাঁর ক্রমিক নম্বর ৬ষ্ঠ বা ৭ম। ইনিও সেই সব ব্যক্তির অন্যতম, যারা অস্থিরতায় ভুগছিলেন এবং মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়ে নিছক আপন নির্মল স্বভাব ও বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর যিকির ও ইবাদত করতেন। কোন না কোন উপায়ে তিনি রসূল সা. এর দাওয়াতের খবর পেয়ে গেলেন। অতঃপর নিজের ভাইকে সঠিক তথ্য জানার জন্য পাঠালেন। তাঁর ভাই রসূল সা. সাথে সাক্ষাত করলেন, তাঁর কুরআন তেলাওয়াত শুনলেন এবং ফিরে গিয়ে ভাইকে বললেন, ’আমি এই দাওয়াত দাতাকে দেখে এসেছি। লোকেরা তাকে ধর্মত্যাগী [বিকৃত সমাজ ব্যবস্হার বিচিত্র রূপ দেখুন। যে ব্যক্তি সারা দুনিয়ার মানুষকে ঈমানের শিক্ষা দিতে এসেছিলেন, তিনিই নাকি ধর্মচ্যুত! সকল যুগের ধর্ম ব্যবসায়ীরাই এ ধরনের ফতোয়া দিয়ে থাকে] বলে থাকে। কিন্তু তিনি মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী শিক্ষা দেন এবং এমন এক বিস্ময়ের বাণী শোনান, যা মানবীয় কবিতা থেকে একেবারেই অন্য রকম। তাঁর চালচলন তোমার চালচলনের মত। এরপর তিনি নিজে এলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন।

এ ঘটনা থেকে প্রমানিত হয়, গোপনীয়তা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সত্যের সুবাস বাতাসের ওপর ভর করেই দিক থেকে দিগন্তে ছুটে যাচ্ছিল। এ সময়ে রসূল সা. কে নানা রকমের কু-খেতাব দেওয়াও শুরু হয়ে গিয়েছিল। তথাপি পরিবেশ মোটামুটি শান্ত ও স্বাভাবিক ছিল। কেননা তখনো কুরাইশ নেতারা আসন্ন বিপদের গুরুত্ব অনুমান করতে পারেনি।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করুন, ইসলামী আন্দোলনের এই প্রথম সারির নেতৃবৃন্দের মধ্যে একজনও এমন ছিলেন না, যিনি উচ্চতর জাতীয় ও ধর্মীয় পদে আসীন ছিলেন। এর ফলে তাঁরা সকল স্বার্থপরতার বন্ধন থেকে মুক্ত ছিলেন। ইতিহাসে এ ধরনের স্বাধীনচেতা যুবকরাই বড় বড় পরিবর্তন সূচিত করার জন্য সম্মুখের কাতারে অবস্থান গ্রহণ করে থাকে। নেতা ও পদস্থ ব্যক্তিরা কেউ এ কাজে অবদান রাখেনি।

গোপনীয় স্তরের এই ইসলামী আন্দোলনকে কুরাইশ নেতারা আদৌ গুরুত্ব দেয়ার যোগ্য মনে করেনি। তারা ভেবেছিল, এ-তো কতিপয় যুবকের পাগলামি। ওরা উল্টো পাল্টা কথাবার্তা বলে থাকে। কয়েকদিন পর আপনা থেকেই মাথা ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মত বুকের পাটা কার আছে? এভাবে ক্ষমতার মসনদে আসীন লোকগুলো নিজেদের ক্ষমতার গর্বে এতই দিশেহারা ছিল যে, ঐ মসনদের ছায়ার নীচে তাদের অজান্তেই সত্যের চারাগুলো ক্রমে ক্রমে বেড়ে ওঠে ইতিহাসের মহীরূহে পরিণত হলো। কুরাইশদের এটাও ধারণা ছিল যে, লাত মানাত ও উযযার মত দেবতাদের আমরা যখন এত ভক্তি ও পূজা করি, তখন তারাই মান সম্মান ও পৌত্তলিক ধর্মের হেফাজত করবে। তাদের আধ্যাত্মিক অভিশাপ এই গুটিকয় তওহীদপন্থীর দেবদ্রোহিতাকে খতম করে দেবে।

 

প্রকাশ্য দাওয়াত

এভাবে তিন বছর কেটে গেল। কিন্তু একটা পরিস্থিতিকে চিরদিন একইভাবে থাকতে দেয়া আল্লাহর রীতি নয়। তাঁর চিরাচরিত রীতি হলো, তিনি বাতিলের প্রতিরোধের জন্য সত্যকে সামনে নিয়ে আসেন এবং উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বাধান। যেমন আল্লাহ বলেনঃ আমি বরং সত্যকে বাতিলের ওপর নিক্ষেপ করি, অতপর সত্য বাতিলকে আঘাত করে। এর ফলে বাতিল উৎখাত হয়ে যায়।’ -সূরা আল আম্বিয়া

আল্লাহর এই চিরাচরিত রীতি অনুসারে আদেশ জারী হলোঃ ‘তোমাকে যা নির্দেশ দেয়া হচ্ছে তা প্রকাশ করে দাও।’

রসূল সা. সমস্ত হিম্মত ও সাহস সঞ্চয় করে, নতুন সম্ভাব্য সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে একদিন সাফা পর্বতের ওপর এসে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি আরবের বিশেষ রীতি অনুযায়ী কুরাইশ জনতাকে ডাক দিলেন। কোন বিপদের মুহূর্তে জনগণকে সাহায্যের জন্য একটা বিশেষ সাংকেতিক ধ্বনি দিয়ে ডাকার রেওয়াজ ছিল। তিনি সেই পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। লোকেরা ছুটে এল। বিরাট জন সমাগম হলো। সবাই রুদ্ধশ্বাসে কান পেতে রইল কী হয়েছে জানার জন্য।

রসূল সা. প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘আমি যদি তোমাদের বলি, এই পাহাড়ের অপর পাশে হানাদার বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণ চালাতে ছুটে আসছে, তাহলে তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?’

সবাই সমবেত স্বরে বলে উঠলোঃ হাঁ, কেন করবোনা? আমরা তোমাকে সব সময় সত্য কথাই বলতে দেখেছি।’

- তাহলে ওহে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর, ওহে আবদ মানাফের বংশধর, ওহে যাহরার বংশধর, ওহে তামীমের সন্তানেরা, ওহে মাখযুমের সন্তানেরা, ওহে আসাদের বংশধর, শোনো, আমি বলছি, তোমরা এক আল্লাহকে প্রভু ও উপাস্য মেনে নাও, নচেত তোমাদের ওপর কঠিন আযাব নেমে আসবে। এই বলে তিনি অতি সংক্ষেপে প্রথমবারের মত উন্মুক্ত দাওয়াত পেশ করলেন।

তাঁর চাচা আবু লাহাব কথাটা শোনা মাত্রই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো, ‘ওরে হতভাগা, তুই আজকের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যা। এই কথা বলার জন্যই কি আমাদের এখানে ডেকেছিলি?’ আবু লাহাব ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় লোকেরা খুবই ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেল।

লক্ষণীয় যে, আবু লাহাবের পক্ষ থেকে, রসূলের দাওয়াতকে নিছক গুরুত্বহীন ও আমল দেয়ার অযোগ্য বলে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন প্রতিক্রিয়া তখনো দেখা দেয়নি। অভিযোগটা শুধু এই ছিল যে, তুমি আমাদের অকারণেই কষ্ট দিয়েছ এবং আমাদের সময় নষ্ট করেছ।

প্রকাশ্য দাওয়াতের দ্বিতীয় পদক্ষেপটা নেয়া হলো এই যে, রসূল সা. আব্দুল মুত্তালিব পরিবারের লোকদের জন্য একটা ভোজের আয়োজন করলেন। এই ভোজে তাঁর চাচা হামযা, আবু তালিব ও আব্বাসের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গও যোগদান করেন। আহারের পর তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে বিধান নিয়ে এসেছি তা ইহকাল ও পরকাল উভয়ের জন্যই কল্যাণের। এ কাজে আমার সাথী হবার জন্য কে কে প্রস্তুত? একথা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি দাওয়াতের সূচনালগ্নেই এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে, তিনি দুনিয়ার জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন ধর্ম নয় বরং দুনিয়াকে কল্যাণময় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে পারে এমন ধর্ম নিয়েই এসেছেন।

তাঁর আবেদনে সমবেত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে নীরবতা বিরাজ করতে লাগলো। সহসা তেরো বছরের এক কিশোর নীরবতা ভংগ করে উঠে দাঁড়ালো। সে বললো, ‘যদিও আমি চোখের অসুখে আক্রান্ত, আমার পা দুর্বল, এবং আমি একজন কিশোর মাত্র, তবুও আমি আপনার সংগী হব।’ ইনি ছিলেন হযরত আলী রা.। পরবর্তীতে তিনি এ আন্দোলনের অন্যতম স্তম্ভ প্রমাণিত হন।

একটা কিশোর ছাড়া আর কেউ সাড়া দিল না- এই দৃশ্য দেখে সমবেত জনতা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আব্দুল মুত্তালিবের বংশধররা এই অট্টহাসির মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে এ কথাই বললো যে, এই দাওয়াত, এই দাওয়াতদাতা এবং সাড়াদানকারী বালক মিলিত হয়ে কোন মহাবিপ্লব সাধন করবে? এ সব একটা তামাশা এবং একটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। এ আহবানে সাড়া দেয়ার জন্য একটা বিদ্রুপাত্মক অট্টহাসিই যথেষ্ট।

এই দ্বিতীয় ঘটনায়ও পরিবেশের শান্তভাব কাটেনি। কিন্তু এরপর যখন তৃতীয় পদক্ষেপ নেয়া হল, তখন সমাজে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়ে তা ক্রমশ তীব্রতর হতে লাগলো।

এই তৃতীয় পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা করার আগে আরো একটা ঘটনার বর্ণনা জরুরী মনে হচ্ছে। আগেই বলেছি যে, প্রতিকূল পরিবেশের কারণে নামায গোপনে পড়া হতো, রসূল সা. ও তাঁর সাথীরা শহরের বাইরে পাহাড়ের উঁচু নীচু স্থানে বা সমতলে যেয়ে যেয়ে নামায পড়ে আসতেন। একদিন এক পার্বত্য ঘাঁটিতে হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস অন্যান্য সাহাবীকে সাথে নিয়ে নামায পড়ার সময় মোশরেকরা দেখে ফেলে। নামায পড়ার সময়ই মোশরেকরা অশালীন কথাবার্তা বলতে শুরু করে দিল এবং নামাযের প্রতিটা কাজের ব্যংগ বিদ্রুপ করতে লাগলো। ওদিক থেকে যখন কোনই জবাব দেয়া হলো না, তখন তারা বিরক্ত হয়ে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে দিল। এই সংঘর্ষে জনৈক মোশরেকের তলোয়ারের আঘাতে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. আহত হলেন। মক্কার মাটিতে এটাই ছিল আল্লাহর পথের প্রথম রক্তপাতের ঘটনা। এটা ছিল জাহেলী সমাজের প্রথম উন্মত্ত হিংস্র প্রতিক্রিয়া। এ প্রতিক্রিয়া থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে, বিরোধিতা এখন হিংস্রতার পথে পা বাড়াতে শুরু করেছে।

 

উস্কানী ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি

ইসলামী আন্দোলনে ক্রমান্বয়ে চল্লিশ জন সহযোগী জুটে গেল। এভাবে ইসলামী সংগঠন একটা বাস্তব শক্তিতে পরিণত হলো। প্রকাশ্যে সত্যের কালেমা উচ্চারণের নির্দেশ ইতোমধ্যে দেয়াই হয়। এ নির্দেশ পালন করার জন্য রসূল সা. একদিন কা’বার চত্বরে দাঁড়িয়ে আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু ধর্মীয় চেতনা যখন বিকৃত হয়ে যায়, তখন ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো ভূলুণ্ঠিত হয়ে থাকে। তাই যে পবিত্র ঘর একদিন তাওহীদের বাণী প্রচারের কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার চত্বরে আল্লাহর একত্বের কথা বলা ঐ কেন্দ্রের অবমাননার কারণ হিসাবে চিহ্নিত হলো। বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, অতগুলো মূর্তি স্থাপনে কা’বা শরীফের অবমাননা হয় না, মূর্তির সামনে কপাল ঘষলেও তার অবমাননা হয় না, উলংগ হয়ে তাওয়াফ করলে, উলু ধ্বনি দিলে এবং তালি বাজলেও তার পবিত্রতাহানি হয় না। দেবদেবীর নামে জানোয়ার বলি দিলে এবং পুরোহিতগিরি ও খাদেমগিরির কর আদায় করলেও কা’বার অপমান হয় না। অপমান হয় শুধু ঐ ঘরের আসল মালিকের নাম নিলেই।

আওয়াজ উঠলোঃ ‘কা’বার অবমাননা করা হয়েছে, হারাম শরীফের সম্মানহানি করা হয়েছে।’ কী সাংঘাতিক ব্যাপার! মাথায় রক্ত চড়িয়ে দেয়ার মত উস্কানিদায়ক কাজ! প্রচণ্ড উত্তেজনায় বেসামাল ও আবেগে দিশেহারা মোশরেকরা তাওহীদের কালেমা শুনে চারদিক থেকে ধেয়ে এল। গোলযোগের সূত্রপাত হলো। রসূল সা. ঘেরাও হয়ে গেলেন। হারেস বিন উবাই হৈ চৈ শুনে রসূল সা. কে রক্ষা করতে ছুটে এলেন। কিন্তু তরবারীর আঘাতে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। আরবে ইসলাম ও জাহেলিয়াতের সংঘাতে এটাই ছিল ইসলাম রক্ষার লক্ষ্যে সংঘটিত প্রথম শাহাদাত।

অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ উপায়ে ও যুক্তিসংগত পন্থায় যে দাওয়াত দেয়া হলো, তা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং যুক্তির জবাব যুক্তির মাধ্যমে দেয়ার পরিবর্তে অন্ধ আবেগ ও উন্মত্ত হিংস্রতা দিয়ে তার জবাব দেয়া হলো। রসূল সা. তরবারীর জোরে সত্যের কালেমা গ্রহণে বাধ্য করেননি। কিন্তু বিরোধী শক্তি তলোয়ার হাতে নিয়ে রুখে এল। একটা বাতিল ব্যবস্থার স্বার্থপর হোতাদের এটাই প্রধান বৈশিষ্ট্য যে, তারা যুক্তির জবাবে উস্কানি ও উত্তেজনা এবং প্রমাণের জবাবে হিংস্রতা ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করে থাকে। বিরোধীদের মধ্যে এতটুকু সহিষ্ণুতাও ছিল না যে, অন্ততপক্ষে কয়েক সপ্তাহ, কয়েক দিন বা কয়েক মিনিট সময় কা’বার চত্বরে প্রদত্ত ঘোষণাটা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করবে। তারা এ কথাটা স্বীকার করতে পারতো যে, তাদের মত মুহাম্মদ সা. -এরও অধিকার রয়েছে কোন না কোন ধর্ম, মতবাদ, দর্শন, বা আকীদা বিশ্বাস পোষণ করার, তদনুসারে বলার এবং অন্য কারো ধর্ম, মত বা আকীদা বিশ্বাসের বিরোধিতা করার। তারা অন্তত এতটুকু সম্ভাবনার কথা স্বীকার করতে পারতো যে, আমাদের ভেতরে কিছু ভুল ত্রুটি থাকতে পারে এবং মুহাম্মদের সা. প্রচারিত মতাদর্শে সে ত্রুটি শুধরাবার ব্যবস্থাও থাকতে পারে। আসলে কোন বাতিল ব্যবস্থার নেতাদের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা একেবারেই শেষ হয়ে যায় এবং তাদের চিন্তাভাবনা ও বিচার বিবেচনার যোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়।

একটু ভাবতে চেষ্টা করুন তো সেই পরিবেশটা কেমন ছিল, যেখানে আমাদের সকলের ইহ-পরকালের কল্যাণের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে একেবারেই নিরস্ত্র ও নিঃসম্বল অবস্থায় আপন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা.।

 

অপপ্রচার

হযরত ইবরাহীম আ. ও হযরত ইসমাঈল আ. এর পবিত্র আবেগ উদ্দীপনা ও আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হারাম শরীফের অভ্যন্তরে মক্কাবাসী কর্তৃক একজন নিরপরাধ মানুষের এই হত্যাকাণ্ড থেকে অনাগত ভবিষ্যতের একটা ধারণা পাওয়া গেলেও এর মধ্য দিয়ে আসল হিংস্রতার যুগের সূচনা হয়নি।

বিরোধিতার প্রথম স্তর সব সময়ই ঠাট্টা বিদ্রুপ, উপহাস ও কূটতর্কের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা সন্ত্রাস- গুণ্ডামীর রূপ ধারণ করে।

রসূল সা. এর দাওয়াতের গুরুত্ব কমানোর উদ্দেশ্যে গালিগালাজের ঘৃণ্য ইতরামির পাশাপাশি রকমারি উপাধি প্রণয়নের কাজও শুরু করে দিল অপপ্রচারের দক্ষ কুশলীরা।

যেমন কেউ বললো, এই ব্যক্তির কথাবার্তা তোমরা শোনো না। কারণ ওতো ‘ধর্মত্যাগী’। আমাদের পূর্বপুরুষদের চিরাচরিত ধর্মকে পরিত্যাগ করে সে নিজে এক মনগড়া উদ্ভট ধর্ম তৈরি করেছে। তারা কোন যুক্তির ধার ধারতো না। যার ইচ্ছা হতো, কুফরি ফতোয়া জারি করে দিত। কখনো বা বলা হতো, সে ‘সাবী’ (নক্ষত্র পূজারী বা প্রকৃতিপূজারী) হয়ে গেছে। যেহেতু তৎকালীন মোশরেক সমাজে সাবী হওয়া ছিল একটা অবাঞ্ছিত ও কলংকজনক ব্যাপার, তাই কাউকে সাবী আখ্যা দেয়া আজকের যুগে কোন মুসলমানকে ইহুদী, খারেজী বা নাস্তিক বলার মতই গালি বলে বিবেচিত হতো। সত্যের বিরুদ্ধে যুক্তিপ্রমাণ সহকারে বক্তব্য দিতে অক্ষম লোকদের একমাত্র সম্বল হয়ে থাকে নেতিবাচক প্রচারণা। আর এই নেতিবাচক প্রচারণার একটা হাতিয়ার হলো খারাপ নাম ও খারাপ উপাধি দেয়া। প্রত্যেক অলিতে গলিতে এবং প্রত্যেক সভা সমিতিতে মক্কার প্রচারণাবিদেরা এই বলে ঢেঁড়া পিটাতো যে, ওরা সাবী হয়ে গেছে, ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে, বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করেছে, নতুন নতুন আকীদা তৈরি করে শোনাচ্ছে; ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ধরনের প্রচারণার ঝড় যখন উঠতো তখন সাধারণ মানুষের জন্য পরিবেশ যে কত ভারী ও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠতো এবং সঠিক পথের সন্ধান করা যে কত দুরূহ হয়ে উঠতো, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। আর এরূপ পরিবেশে সত্যের সেই ক্ষুদ্র কাফেলা যে কী সংকটের সম্মুখীন ছিল, তা কল্পনা করাও বোধ হয় সহজসাধ্য নয়। কিন্তু পরিস্থিতি ও পরিবেশ যতই বিপদসংকুল হোক, তা দৃঢ়চেতা ও কৃতসংকল্প লোকদের পথ আগলে রাখতে পারে না। আল্লাহ বলেনঃ

‘আল্লাহ মানুষের জন্য যে অনুগ্রহ উন্মুক্ত করেন, তা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না।’ (সূরা ফাতের)

যুক্তিপ্রমাণের মোকাবিলায় যখন গালি বর্ষণ করা হতে থাকে, তখন চিরদিনই এরূপ হয়ে থাকে যে, যুক্তিপ্রমাণ তো যথাস্থানে বহালই থাকে, কিন্তু যে গালি দেয়া হয়, তা আবেগের ওপর ভর করে, দু'চারদিন টিকে থাকলেও অচিরেই নিস্প্রভ ও ম্লান হয়ে যায় এবং মানুষের মন তার প্রতি বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ হয়ে যায়। তাই এ কাজে যারা অভিজ্ঞ, তাদের মূলনীতি হলো নিত্যনতুন গালি আবিষ্কার করে যেতে হবে।

এই মূলনীতি অনুসারে রসূল সা. এর জন্য আর একটা নতুন গালি উদ্ভাবন করা হয়। তা হলো ‘ইবনে আবি কাবশা’। ‘আবি কাবশা’ আরবের একজন কুখ্যাত ব্যক্তির নাম। সে সারা আরবের ধর্মীয় ভাবধারার বিরুদ্ধে ‘শা’রা’ নামক নক্ষত্রের পূজা করতো। সেই আবি কাবশার নাম থেকেই ‘ইবনে আবি কাবশা’ উপাধির উদ্ভব। এর অর্থ আবি কাবশার ছেলে বা অনুসারী। নাউযুবিল্লাহ। মনের আক্রোশ মেটাতে মক্কার আবেগগ্রস্ত লোকেরা কত কিইনা আবিষ্কার করেছে!

কোন দাওয়াত বা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ও প্রধান ব্যক্তিত্বকে যখন এ ধরনের হীন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়, তখন শুধু ঐ ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়াই আসল লক্ষ্য হয় না, বরং আসল লক্ষ্য হয়ে থাকে ঐ মতবাদ ও মতাদর্শকে এবং ঐ আন্দোলনকে হেয় করা ও তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা যার ক্রমবর্ধমান প্রসারে বিরোধীরা আতংকিত থাকে। কিন্তু প্রচণ্ড বেগবান একটা স্রোতধারাকে বালির বাঁধ দিয়ে ঠেকানো কেমন করে সম্ভব? মক্কার বিদ্রুপকারীরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল যে, তারা নোংরা আবর্জনা দিয়ে যত বাঁধই বাঁধছিল, তা এই দাওয়াতের তোড়ে খড়কুটোর মত ভেসে যাচ্ছে এবং প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তা ক্রমশ কিছু না কিছু সামনেই অগ্রসর হচ্ছে। তাই তারা অপপ্রচারের একটা নতুন কৌশল অবলম্বন করলো। তারা রসূল সা. এর নামে একটা নতুন উপাধি উদ্ভাবন করে বলতে লাগলো, এই ব্যক্তি আসলে পাগল হয়ে গেছে। নাউযুবিল্লাহ। দেবতাদের অভিশাপে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সে যে সব কথাবার্তা বলে, তা কোন সচেতন মানুষের উপযোগী কথাবার্তাও নয় এবং কোন সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধিজনিত ও চিন্তাসুলভ কথাও নয়। সে এক ধরনের মানসিক ব্যাধি বা হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত মানুষ। এই ব্যাধির তীব্রতা বাড়লে কখনো সে ফেরেশতা দেখে। কখনো বেহেশত ও দোজখের স্বপ্ন দেখে, কখনো তার মনে হয় যেন অদৃশ্য জগত থেকে কোন ওহী বা কোন অদ্ভুত কথা ভেসে আসছে। সে আসলে একজন মস্তিষ্কবিকৃত মানুষ। তার কথাবার্তায় মনোযোগ দেয়া উচিত নয়। সবার নিজ নিজ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের প্রতি আস্থা অবিচল রাখা উচিত। এভাবে সত্যের আহবায়কদের যুক্তির ধার ভোঁতা করার জন্য তাদের পাগল ও উন্মাদ বলা কিংবা নির্বোধ ও বোকা বলা বাতিলপন্থীদের একটা চিরাচরিত রীতি। দুনিয়ার সুখ সমৃদ্ধি বাড়ানো এবং নিজেদের লোভ-লালসা ও কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়া যাদের স্বভাব, তাদেরকেই বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ লোক মনে করা হয়। পক্ষান্তরে সমাজের সংস্কার ও সংশোধনের কর্মসূচি গ্রহণ করে যারা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করে, তাদেরকে নির্বোধ ও উন্মাদ বলা ছাড়া দুনিয়াপূজারীদের অভিধানে আর কোন উপযুক্ত শব্দ থাকে না।

এই সব গালি শুধু যে অসাক্ষাতেই বলা হতো তা নয়, বরং সামনাসামনিও বলা হতোঃ

يا ايها الذى نزل عليه الذكر انك لمجنون

“ওহে ওহীপ্রাপ্ত হওয়ার দাবীদার, তুমি তো একটা পাগল ছাড়া আর কিছু নও।’ (সূরা আল-হিজর, ৬)

আসলে মুখের ওপর গালি না দিতে পারলে গালির প্রকৃত মজাই পাওয়া যায় না।

কিন্তু ভেবে দেখার মত বিষয় হলো, কোন পাগলের নেতৃত্বে কখনো সমাজের লোকেরা আন্দোলন করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়েছে, এমন কোন দৃষ্টান্ত আছে কি? সুস্থ মস্তিষ্ক, সৎ স্বভাব ও সচেতন তরুণ সমাজ কি কখনো নির্বোধ লোকদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে? মাথা বিগড়ে যাওয়া কোন উন্মাদ লোকের আহবানে সুস্থ ও বুদ্ধিমান লোকেরা কি কখনো সাড়া দিয়েছে? এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্য মক্কার মোশরেকরা আরো একটা বাহানা প্রস্তুত করে। [ধর্মভীরু লোকদের জন্য পাশ্চাত্যবাসী Fanatics বা ধর্মান্ধ পরিভাষা এই অর্থেই উদ্ভাবন করেছে যে, তারা মস্তিষ্কের ভারসাম্যহারা আবেগপ্রবণ মানুষ। আমাদের সমাজের অধার্মিক ধরনের লোকেরা যখন ইসলামপ্রিয় লোকদের ‘মোল্লা’ বলে আখ্যায়িত করে তখন এই অর্থেই করে যে, তারা অবুঝ, যুগের চাহিদা সম্বন্ধে অজ্ঞ, এবং অতীতের ধ্যানধারণার অন্ধ ভক্ত। এর চেয়েও একধাপ নিচে নেমে ধার্মিক লোকদেরকে বিরোধীরা রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ও নির্বোধ বলে অভিহিত করে থাকে।] তারা বলে, নবুয়তের দাবীদার এই ব্যক্তি জাদুবিদ্যায়ও পারদর্শী। তার সাথে কেউ সাক্ষাত করতে এলেই সে দু’চারটে কথা বলে তাকে সম্মোহিত করে ফেলে এবং মায়াবী দক্ষতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখায়। এ কারণে ভালো ভালো বুদ্ধিমান লোকেরা পর্যন্ত ক্রমশ তাঁর ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এ ব্যাপারে প্রশ্ন না জেগে পারে না যে, আজ পর্যন্ত কোন জাদুকর কি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনা করেছে? কোন জাদুকর বা জ্যোতিষী কি কখনো আল্লাহর ইবাদত, তাওহীদ, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার শিক্ষা দেয়ার জন্য জাদুবিদ্যাকে ব্যবহার করেছে? ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত কি আছে যে, জাদুকরের ন্যায় মানসিকতার অধিকারী কোন ব্যক্তি কখনো চলমান সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টানোর জন্য নিজের জাদুশক্তি বলে একটা বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলেছে? জাদুর শক্তি দিয়ে মন মগজ, চরিত্র ও অন্তরাত্মাকে বদলে দেয়ার কোন দৃষ্টান্ত কোথাও আছে কি? আর ইনি ছিলেনই বা কেমন জাদুকর যে, জাদুর ভেলকি দেখিয়ে, দু’পয়সা উপার্জন করার পরিবর্তে সারা দেশের মানুষের যুলুম নিপীড়ন ভোগ করে সমাজের সর্বোত্তম লোকগুলোকে বাছাই করছিলেন এবং একটা বিরাট সামষ্টিক অভিযান পরিচালনা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন? এটা কি কোন ভেলকিবাজি ছিল? আসলে এটা ছিল একটা গৎবাঁধা অভিযোগ। প্রত্যেক যুগে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে নিয়োজিত লোকদের ওপর এ অভিযোগ আরোপ করা হয়েছে। এ দ্বারা জনগনকে এরূপ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে, এ দাওয়াতের সাথে সত্যের কোন যোগাযোগ নেই এবং এ কারণে তার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ জন্মে এমন কোন উপাদানও নেই। দাওয়াতদাতার যুক্তিতে এমন কোন ধার নেই যে, তা দ্বারা সে মানুষের মন জয় করতে পারবে, বরং গোটা ব্যাপারটাই জালিয়াতি ও জাদুর. কারসাজির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এ জন্যই ভালো ভালো বুদ্ধিমান লোকেরা পর্যন্ত দাওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে এবং ভারসাম্য হারাচ্ছে।

কিছু কিছু লোক হয়তো বা কোরায়েশ নেতাদের সামনে রসূল সা. এর ওহী যোগে প্রাপ্ত বাণী বিশেষত কোরআনের আয়াতগুলো পেশ করে থাকবে যে, এতে উচ্চাংগের অলংকারমণ্ডিত ভাষা রয়েছে। সেই ভাষা নিয়ে সেকালের সাহিত্যবিশারদদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাগবেষণাও হয়ে থাকতে পারে এবং তারা অনুভব করতে পারে যে, ওহীর এই বাণীই এক অলৌকিক ও অসাধারণ প্রভাবশালী বাণী। তাই এই বাণীর অলৌকিকত্বের ধারণাটা খণ্ডন করার জন্য তারা বলতে লাগলো, “এমন অলৌকিকত্বের কী আছে এতে? এতো কেবল এক ধরনের কবিতা, ভাষার শৈল্পিক চর্চা এবং সাহিত্যিক ওজস্বিতা। মুহাম্মাদ স. একজন উচ্চাংগের বাগ্মী। তাঁর বাগ্মিতার জোরে অপরিপক্ব মনের অধিকারী কিছু তরুণ বিপথগামী হচ্ছে।”

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কবি তো পৃথিবীতে কতই এসেছে। মুহাম্মাদ স. ও তাঁর সংগীরা যে চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, এমন নজিরবিহীন ও নিষ্কলংক চরিত্রের অধিকারী কোন কবি কি কখনো পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছে? কোরায়েশদের চোখের সামনে যে ধরনের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, নিছক কবিতার আসর গরমকারীরা কি কখনো তা করতে পেরেছে!

এ প্রশ্ন কোরায়েশদেরকেও বিব্রত করেছিল। এর জবাবে তারা রসূল সা. এর বিরুদ্ধে রটনা করেছিল জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার আর এক অপবাদ। জ্যোতিষীরা কিছু ধর্মীয় ভাবভংগী অনুসরণ করতো। তারা একট রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করতো। চল্লিশ দিন ব্যাপী ধ্যান, নির্জনবাস, জপতপ ও মন্ত্রতন্ত্রের মধ্য দিয়েই তাদের জীবন কাটতো। তারা নানা ধরনের অস্বাভাবিক পন্থায় বিচিত্র তথ্যাবলী সংগ্রহ করে তা রহস্যময় কৌশলগত ভাষার মাধ্যমে ব্যক্ত করতো। সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা বিচরণ করতো অসাধারণ মানুষ হিসেবে। কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ধরনের এসব লোককে ‘কাহেন’ নামে আখ্যায়িত করা হতো। সেই নামে রসূল সা. কে আখ্যায়িত করে তারা বুঝাতে চেয়েছিল যে, উনিও একই ধাপ্পাবাজির ব্যবসা খুলেছেন, যাতে লোকেরা এসে মুরীদ হয়, এবং তাঁর জীবিকার সমস্যারও সমাধান হয়ে যায়। (নাউযুবিল্লাহ)

কিন্তু কোরআন এই সব অপপ্রচারের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছে এই বলে যেঃ

(আরবী*********)

“সে কবি নয়। কিন্তু তোমাদের বিশ্বাস ও ঈমানের দ্বার তোমরাই রুদ্ধ করে রেখেছ। সে কোন জ্যোতিষী নয়। কিন্তু তোমরা তো চিন্তভাবনাই কর না।” (সূরা আল-হাক্কা)

তাদের এই উচ্ছৃংখলতার তাণ্ডব সম্পর্কে কোরআন খুবই সংক্ষেপে যে পর্যালোচনা করেছে তা হলোঃ

(আরবী********)

“দেখ, এ লোকগুলো তোমার সম্পর্কে কি কি ধরনের প্রবাদ, উদাহরণ, পরিভাষা ও উপাধি প্রয়োগ করে।” এত সব কিছু করার পর তারা সহসা কিভাবে বিপথে ধাবিত হয়, সে সম্পর্কে কোরআন বলেঃ (আরবী*****) “নিজেরাই নিজেদেরকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে।”

এবার লক্ষ্য করুন, আরো একটা বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা। হযরত ইবরাহীমের ধর্মের অনুসারী হবার দাবীদাররা বলে যে, মুহাম্মাদের স. কাছে একটা জ্বিন এসে অদ্ভুত অদ্ভুত কথাবার্তা শিখিয়ে দিয়ে যায়। কখনো কখনো মক্কার জনৈক রোমক খৃস্টান ক্রীতদাস (জাবের, জাবরা বা জারব) এর নামোল্লেখ করে বলা হয় যে, ঐ ক্রীতদাসটা গোপনে গিয়ে মুহাম্মাদকে এ সব ভাষণ লিখে দিয়ে আসে। অথচ সে কেবল মাঝে মাঝে রসূলের স. কথাবার্তা শোনার জন্য যেত। একবার কোরায়েশ নেতাদের একটা দল রসূল স. কে বললোঃ ‘আমরা শুনেছি, ইয়ামামার রহমান নামক এক ব্যক্তি তোমাকে এই সব জিনিস শেখায়। আল্লাহর কসম, আমরা কখনো ঐ রহমানের ওপর ঈমান আনবো না।’[সীরাতে ইবনে হিশাম, (আরবী) প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৩১৭] এই সব ভিত্তিহীন অপপ্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে এরূপ ধারণা দেয়া যে, এসব কোন বিদেশী অপশক্তি কিংবা ব্যক্তির কারসাজি। মুহাম্মাদ স. ঐসব অপশক্তির ক্রীড়নক হয়ে তাদের সাথে যোগসাজশ করে আমাদের ধর্ম ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করার চক্রান্ত এঁটেছে। অপরদিকে এ ধারণা দেয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে যে, এই মনোমুগ্ধকর অলংকারসমৃদ্ধ বাণীগুলো মুহাম্মাদেরও স. প্রতিভার সাক্ষর নয়, আল্লাহর দানও নয়। বরঞ্চ এগুলোর মধ্য দিয়ে তৃতীয় কোন বহির্শক্তি তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। উপরন্তু এ দ্বারা রসূল সা. কে আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। এসব দুরভিসন্ধি ব্যর্থ করে দিয়ে কোরআন অনেক বিস্তারিত জবাব দিয়েছে। তবে তার যে চ্যালেঞ্জটা সবচেয়ে অকাট্য ও অব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে তা হলো, ‘তোমরা জ্বিন ও মানুষের সম্মিলিত চেষ্টা দ্বারাও যদি পার তবে কোরআনের মত কোন সূরা বা কয়েকটি আয়াত রচনা করে নিয়ে এস।’

আনুষংগিকভাবে এর মধ্য দিয়ে এ কথাও বলা হলো যে, মুহাম্মাদ স. কোন নতুন কথা বলছে না বা কোন বিরল কৃতিত্বও দেখায়নি। আসলে সে কিছু পুরানো কিসসা কাহিনীর বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে তা জোরদার ভাষায় নতুন করে পেশ করছে। এ হচ্ছে এক ধরনের গল্প বলার শিল্প। গল্পকাররা যেমন গল্প বলে বলে আসর জমায় তেমনি মুহাম্মদ মজার মজার গল্প শুনিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করছে। ইসলামের দাওয়াতকে প্রাচীন কিসসা কাহিনী বলে গালি দেয়ার এরূপ একটা তীর্যক ইংগিত রয়েছে যে, ঐসব সেকেলে কিসসা কাহিনী দিয়ে এ যুগের সমস্যাবলীর সমাধান কেমন করে হবে? সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রাচীন রূপকথায় তখনকার মানুষের কোন উপকারিতা নেই।

মজার ব্যাপার হলো, একদিকে বাপদাদার ধর্মের সম্পূর্ণ বিরোধী নতুন ধর্ম প্রচারের দায়ে রসূল স.কে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল। অপরদিকে সেই রসূলের স. পেশ করা বাণীকেই প্রাচীন কিসসা কাহিনী বলে নিন্দা করা হচ্ছিল। মতলববাজ কুচক্রীদের এটা চিরাচরিত স্বভাব যে, আগপাছ চিন্তাভাবনা না করে কখনো একদিক থেকে একটা খুঁত ধরে, আবার কখনো অন্যদিক থেকে আক্রমণ করে ঠিক তার বিপরীত আপত্তি তোলে। অথচ তারা ভেবেও দেখে না যে, এভাবে তারা স্ববিরোধী আচরণই করছে।

এই পর্যায়ে একটা ফ্রন্ট খোলা হয় কবিদের দিয়ে। রসূল স. এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দাসূচক কবিতা রচনা ও প্রচার করার দায়িত্বে নিযুক্ত হয় আবু সুফিয়ান বিন হারেস, আমর বিন আস, এবং আব্দুল্লাহ বিন যাবারী। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, আরবের জাহেলী সমাজে কবিদের প্রচণ্ড প্রভাব ছিল। তারা বলতে গেলে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষক ও দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করতো। তাদের মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ মানুষের অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করতো এবং তা মুখস্থ করে করে প্রচার করা হতো। ধরে নেয়া যেতে পারে যে, সেকালে কবিরা অনেকাংশে এ যুগের সাংবাদিকদের ন্যায় অবস্থানে ছিল। আজ যেমন একজন দক্ষ সাংবাদিক নিজের লেখনী ও পত্রিকার শক্তি নিয়ে কারো পেছনে লাগলে তার অনেক ক্ষতিসাধন করতে পারে, নিজের কুটিল ও তীর্যক মন্তব্য, অশালীন ব্যংগবিদ্রুপ, অশোভন চিঠিপত্র, সংবাদ না ছাপানো কিংবা বিকৃতভাবে ছাপানো, এবং বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে যেমন কোন দাওয়াত, আন্দোলন বা সংগঠনের জন্য সমস্যার পাহাড় সৃষ্টি করতে পারে, ঠিক তেমনি ভূমিকা পালন করতো আরবের কবিরা। সেখানে প্রতিটি অলিগলিতে মুহাম্মদ স. ও তার আন্দোলনের দুর্নাম ও কুৎসা রটিয়ে বেড়ানো এবং ছন্দবদ্ধ গালি ও নিন্দাসূচক শ্লোগান দিয়ে পরিবেশকে বিষাক্ত করার কাজে একাধিক কবি নিয়োজিত ছিল। একজন ভদ্র পথচারীর পেছনে কুকুর লেলিয়ে দিলে যে দৃশ্যের অবতারণা হয়, মুহাম্মাদ স. কে ঘিরে ঠিক সেই ধরনের দৃশ্যের সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু মানবতার বন্ধু নবী মুহাম্মাদ স. এর বাণী ও চরিত্র কবিদের অপপ্রচারের মায়াবী প্রভাবকে একবারেই নিস্প্রভ ও পণ্ড করে দিচ্ছিল।

উল্লেখ্য যে, অপপ্রচারের এই গোটা অভিযান কোন ভুল বুঝাবুঝির কারণে নয়, বরং একটা সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত চক্রান্তের আওতায়ই পরিচালিত হচ্ছিল। তারা সর্বসম্মতভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যেঃ (আরবী*******)

‘এই কোরআন তোমরা শুনো না, বরং কোরআন পাঠের সময় হৈ চৈ কর, হয়তো এভাবেই তোমরা জয়ী হতে পারবে।’ (হা-মীম আস-সাজদা, আয়াত ২৬)

অর্থাৎ দাওয়াতদাতার কথায় কর্ণপাতই করো না, ওটা বুঝবার চেষ্টাই করো না। তাহলে চিন্তাধারায় পরিবর্তন এসে যেতে পারে এবং বিদ্যমান আকীদাবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। হৈ চৈ করে এর প্রচারে বাধার সৃষ্টি কর এবং একে হাসি ঠাট্টার বিষয়ে পরিণত কর। এতে করে কোরআনের শক্তি চূর্ণ হয়ে যাবে, এবং শেষ বিজয় তোমাদেরই হবে। এ আয়াত থেকেই অনুমান করা যায়, ইসলাম বিরোধী শক্তির মনস্তত্ত্বটা কেমন। তারা কথা শুনতে ও বুঝতে চায় না এবং অন্যদেরকেও শুনতে ও বুঝতে দিতে চায় না। এ জন্য হাংগামা সৃষ্টি করে তারা বাধা আরোপ করতে চায়। আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতার পালা পড়েছিল ঠিক এমনি লোকদের সাথে!

আ’স বিন ওয়ায়েল আস-সাহামী রসূল স. এর দাওয়াত ও আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় যেভাবে বিষোদগার করছিল তা হলো, ‘মুহাম্মাদ যা করছে, করতে দাও। সে তো নির্বংশ। তার কোন পুত্রসন্তান নেই। সে মারা গেলে তার কথা কেউ স্মরণও করবে না এবং তোমরা তার কবল থেকে চিরতরে অব্যাহতি পাবে।’ রসূল স. এর পুত্রসন্তান জীবিত না থাকায় এই কুটিল মন্তব্য করা হয়। আরবে এ মন্তব্য নিরর্থকও ছিল না। কিন্তু আগের মত লোকেরা এ কথা বুঝতে সমর্থ হয় না যে, নবীদের ন্যায় ইতিহাসস্রষ্টা ব্যক্তিগণের আসল সন্তান হয়ে থাকে তাদের অসাধারণ ও ঐতিহাসিক কীর্তি। তাদের মস্তিষ্ক থেকে নতুন নতুন সভ্যতার অভ্যুদয় ঘটে। তাদের দাওয়াত ও শিক্ষার উত্তরাধিকার ধারণ করা ও তাদের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তাদের সাথী ও অনুসারীরা দলে দলে অগ্রসর হয়। এভাবে যে বিপুল কল্যাণের সমাগম ঘটে, তার শক্তি ও মূল্যমান ঝাঁক ঝাঁক পুত্রসন্তানের চেয়েও অনেক বেশি। এই তীর্যক মন্তব্যের জবাবেই সূরা কাওসার নাজিল হয়। ঐ সূরায় আ’স ও তার সতীর্থদের বলা হয় যে, আমি আমার নবীকে কাওসার দান করেছি, এই কাওসারকে তার জন্য বিপুল কল্যাণের উৎস বানিয়েছি, কোরআনের ন্যায় শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত তাকে দিয়েছি, আল্লাহ ও রসূলের অনুগত এবং ইসলামের বাস্তবায়ন ও প্রচারকারী মুমিনদের একটা বিরাট দল তাকে দিয়েছি, আর আখিরাতে তার জন্য কাওসার নামক পুষ্করিণী উপহার দেয়ার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি। সেই পুষ্করিণী থেকে কেউ একবার পানি পান করার অনুমতি পেলে অনন্তকাল পর্যন্ত তার আর পিপাসা লাগবে না। তারপর আল্লাহ বলেছেন, হে নবী, আসলে নির্বংশ তো তোমার শত্রুরাই। তাদের প্রকৃতপক্ষে কোনই স্মরণকারী থাকবে না। তাদের কথা কেউ ভুলেও মনে করবে না যে অমুক কে ছিল। ইতিহাসে তাদের কোন স্থানই থাকবে না।

ব্যংগবিদ্রুপে মক্কার যে নরাধমরা সবচেয়ে অপ্রগামী ছিল, এখানে তাদের একটা তালিকা দেয়া বোধ হয় অপ্রাসংগিক হবে না। তারা ছিল বনু আসাদ গোত্রের আসওয়াদ ইবনুল মুত্তালিব, বনু যুহরা গোত্রের আসওয়াদ বিন আব্দু ইয়াগুস, বনু মাখযূমের ওলীদ ইবনুল মুগীরা, বনু সাহমের আস বিন ওয়ায়েল এবং বনু খুযায়া গোত্রের হারিস বিন তালাতিলা।

 

কূটতর্ক

ব্যংগবিদ্রুপ, ঠাট্টা উপহাস, গালিগালাজ ও অশালীন উপাধি প্রদানের সাথে সাথে কূটতর্কের পালাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। যারা একটা চাক্ষুষ সত্যকে মানতে চায়নি, তারা নিজেদের ও দাওয়াতদাতার মাঝে নানা রকমের কূটতর্ক বাধিয়ে অন্তরায় সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাতো। এই অপচেষ্টার একটা ব্যর্থ হলে নব উদ্যমে আরেকটা শুরু করা হতো। এ ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত লোকদের গোটাজীবনই এতে নষ্ট হয়ে যায়, অথচ তারা না পারে নিজেদের কোন উপকার করতে, আর না পারে অন্যদের কোন গঠনমূলক সেবা করতে। আন্তরিকতার সাথে যে প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়, তার ধরন হয় এক, আর চক্রান্তমূলকভাবে দাওয়াতদাতার পথ আটকানোর জন্য যে প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয় তার ধরন হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শেষোক্ত শ্রেণীর প্রশ্ন ও আপত্তি তোলাকে বলা হয় কূটতর্ক। কূটতর্ক সব সময় বেঈমানী, দুরভিসন্ধি ও ষড়যন্ত্রের প্রতীক হয়ে থাকে। কূটতার্কিকদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা দাওয়াত থেকে কিছুই শিখতে চায় না, বরং তাতে কৃত্রিমভাবে কোন না কোন বক্রতা অন্বেষণ করে। কোরআনে এ অবস্থাটা বলা হয়েছেঃ “তারা বক্রতা অন্বেষণ করে।” (সূরা হুদঃ ১৯)

বাপদাদার ধর্মের এই সব উগ্র ও কট্টর সমর্থক একদিকে তো রসূল স. কে বারবার জিজ্ঞাসা করতো যে, তুমি যদি নবী হয়ে থাক তবে তোমার নবী হওয়ার এমন কোন অকাট্য আলামত ও প্রমাণ তোমার সাথে কেন থাকলো না যা দেখে কারো পক্ষে নবুয়ত স্বীকার না করে উপায়ই থাকবে না?

আবার কখনো কখনো তারা নিতান্ত সরলতার ভান করে বলতোঃ ‘আমাদের ওপর সরাসরি কোন নির্দশন নাযিল হলো না কেন, কিংবা এমন হলো না কেন যে, আমরা আমাদের মনিবকে সরাসরি দেখে নিতাম?’ (সূরা ফুরকান, আয়াত ৩১)

অর্থাৎ দীর্ঘ আলোচনা বা তর্কের কী দরকার? সোজাসুজিভাবে আকাশ থেকে দলে দলে ফেরেশতা নেমে এসে আমাদের সামনে বিচরণ করলেই পারতো। আর আল্লাহ তোমার মাধ্যমে আমাদের কাছে খবরাখবর পাঠিয়ে নিজের খোদায়ী চালু করার বদলে তিনি স্বয়ং আমাদের সামনে হাজির হলেই পারেন। আমরা দেখে নিতে পারি যে, এই তো আমাদের আল্লাহ। তাহলে তো আর ঝগড়া থাকে না।

তারা সময় সময় এও বলতো যে, তুমি যা যা বল, তা যদি সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে থাক, তাহলে তো একখানা লিখিত কিতাব আমাদের চোখের সামনেই আমাদের কাছে চলে আসলে ভালো হতো। বরঞ্চ তুমি নিজেই একটা সিঁড়ি দিয়ে আকাশ থেকে কিতাবখানা হাতে নিয়ে নেমে আসলে আরো ভালো হতো। আমরা তা হলে অবনত মস্তকে মেনে নিতাম যে, তুমি সত্যিই নবী। এ প্রশ্নও তোলা হয় যে, কোরআন এভাবে এক এক অংশ করে নাযিল হয় কেন? পুরো কিতাবখানা একবারেই নাযিল হয় না কেন? কিন্তু তাদের এ জাতীয় প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব কোরআনে বারবার দেয়া হয়েছে। এই জবাব দেয়ার কারণেই তারা ক্ষুব্ধ ছিল। কেননা এতে করে তাদের ষড়যন্ত্রের মুখোশ খুলে যেত এবং তা ব্যর্থ হয়ে যেত।

তাদের আরো একটা কূটতর্ক ছিল এই যে, তুমি তো আমাদেরই মত রক্ত মাংসের তৈরী মানুষ। তোমারও ক্ষুধা লাগে, আয়রোজগার করতে বাধ্য হও, বাজারে যাও, কষ্টে জীবন যাপন কর, তোমার ওপর কত যুলুম হয়, অথচ তোমার কোন সাহায্য করা হয় না। এমতাবস্থায় একথা কিভাবে বিশ্বাস করি যে, তুমি আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দা এবং তোমাকে বিশ্ববাসীর সংস্কার ও সংশোধনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে? তুমি যদি এমন একজন বিশিষ্ট ও অসাধারণ লোক হতে, তাহলে তোমার আগে আগে একদল ফেরেশতা প্রহরী হিসাবে চলতো এবং পথ থেকে লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য হাঁকাহাকি করতো। কেউ তোমার ওপর যুলুম তো দূরের কথা, সামান্য বেআদবী করলেই ঐ ফেরেশতারা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিত। এ রকম হলে সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিত যে, তুমি আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও নবী। তোমার জন্য আকাশ থেকে ধনরত্ন নাযিল হওয়া উচিত ছিল। রাজকীয় শান শওকতে তোমার জীবন যাপন করা উচিত ছিল, তোমার বসবাসের জন্য একটা স্বর্ণনির্মিত প্রাসাদ হওয়া উচিত ছিল, তোমার জন্য বিশেষভাবে একটা খাল তৈরী হওয়া উচিত ছিল, তোমার একটা বড় রকমের ফলের বাগান থাকা উচিত ছিল, এবং সেই বাগান থেকে তোমার সচ্ছন্দে জীবন যাপনের উপযুক্ত অর্থ উপার্জিত হওয়া দরকার ছিল। এ ধরনের শান শওকত ও জাঁকজমক নিয়ে যদি তুমি নবুয়তের দাবী করতে, তাহলে আমরা তা অবশ্যই মেনে নিতাম। অথচ আমরা ধনে, জনে, তোমার চেয়ে কত বড়। আর তুমি ও তোমার সাথীরা সমাজের সবচেয়ে গরীব ও নিম্ন শ্রেণীর লোক। আমাদের তুলনায় তোমাদের কোনই শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাহলে হে মুহাম্মাদ, তুমিই বল, কোন্ যুক্তিতে আমরা তোমাকে নবী মেনে নেব?

এ জন্য যখনই রসূল সা. কোন রাস্তা দিয়ে যেতেন, অমনি লোকজন বলে উঠতো, ‘ইনি নাকি সেই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ রসূল সা. করে পাঠিয়েছেন? আংগুল নাচিয়ে নাচিয়ে, ইংগিত করে করে মক্কার গুন্ডাপান্ডা ও সন্ত্রাসী লোকেরা বলতো, ‘দেখ, আল্লাহ নবী ও রসূল বানানোর জন্য এই চালচুলোহীন লোক ছাড়া আর কাউকে পেলেন না। কী চমৎকার নির্বাচন! অনুরূপভাবে ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের দেখিয়ে বলা হতো, এই নাকি সেই সব বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যাদেরকে আল্লাহ আমাদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়ে বাছাই করেছেন।

এ কথাও বলা হতো, যে আযাবের ভয় দেখিয়ে তুমি নেতা হতে চাইছ, তা নিযে আস না কেন? আমাদের মত কাফেরদের ওপর তুমি আকাশের একাংশ ভেংগে ফেলতো দেখি! খোদ আল্লাহর কাছেও দোয়া করতো যে, এই দাওয়াত সত্য হলে হে আল্লাহ আমাদেরকে আযাব দিয়ে খতম করে দাও।’

বাপদাদার ধর্মের এই একচেটিয়া অধিকারের দাবীদাররা কখনো কখনো এ কথাও বলতো যে, ‘হে মুহাম্মদ! তুমি যখন বল, আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তখন তিনি নিজের শক্তি প্রয়োগ করে আমাদেরকে ইসলামের পথে চালান না কেন? তিনি যদি আমাদেরকে তাওহীদপন্থী ও সৎ লোক দেখতে চান, তাহলে তিনি আমাদের তাওহীদপন্থী ও সৎ লোক বানিয়ে দেন না কেন? তিনি তো আমাদেরকে মূর্তিপূজা করতে বাধা দিতে পারেন। তিনি আমাদেরকে ভুল আকীদা পোষণ করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেন। তা যখন তিনি করেন না, তখন নিশ্চয়ই আমাদের বর্তমান চালচলন তাঁর পসন্দ। এমতাবস্থায় তুমি কেন আমাদের চালচলন ও রীতিনীতির নিন্দা সমালোচনা কর? তুমি কোথাকার কে?

তারা কেয়ামত নিয়েও উপহাস করতো। খুব নাটকীয় ভংগিতে জিজ্ঞেস করতো, এই ঘটনাটা কবে ঘটবে বলুন তো। কেয়ামতের কোন দিন তারিখ কি নির্ধারিত নেই?

কোরআন, হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলী থেকে এই উদাহরণগুলো সংগৃহীত। এগুলো দ্বারা অনুমান করা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনুগ্রাহক এবং মানবতার সবচেয়ে বড় হিতাকাংখী মানুষটিকে কেমন হীন পরিবেশের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অত্যন্ত নিকৃষ্ট রুচির অধিকারী লোকেরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে নিন্দা ও কুৎসা গেয়ে চলেছে। বিতর্কের সুরে নানা ধরণের প্রশ্ন বানিয়ে বানিয়ে তুলে ধরছে। আর রসূল সা. অত্যন্ত ঠান্ডা ও শান্তমনে এবং অত্যন্ত ভদ্র ও শালীন মেজাজে নিজের দাওয়াতের পক্ষে যুক্তি পেশ করছেন। জবাবে কোন নিন্দা ও তিরস্কার করছেন না। বিতর্কের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। রেগে যাচ্ছেন না। কিন্তু দাওয়াত ও তার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও পিছু হটছেন না।

ব্যংগবিদ্রুপ ও কুটতর্কের এই তান্ডবের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হবার সময় রসূল সা.যে মানসিক নির্যাতন ও কষ্ট ভোগ করেছেন, তার পুরো প্রতিচ্ছবি কোরআনে পাওয়া যায়।

আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং রসূল সা. কে প্রবোধ ও সান্তনা দিয়েছেন এবং এই স্তরটা ধৈর্যের সাথে পেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেনঃ ‘ক্ষমার নীতি অবলম্বন কর, সৎ কাজের আদেশ দাও এবং অজ্ঞ লোকদের এড়িয়ে চল।’ (সূরা আরাফ-১৯৯)

অর্থাৎ সেই যুলুম নির্যাতনের যুগে রসূল সা. কে তিনটে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়ঃ অপপ্রচার ও গালমন্দের তোয়াক্কা না করা, সর্বাবস্থায় হক কথা বলতে থাকা এবং দুশ্চরিত্র ও মুর্খ লোকদের পেছনে না পড়া।

কোরআন ও ইতিহাস উভয়ই সাক্ষ্য দেয় যে, রসূল সা. যুলুম নির্যাতনের সমগ্র যুগটা ঐ তিনটে নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে পার করে দিয়েছেন। চরম মর্মযাতনা ভোগ করা সত্ত্বেও নিজের ভাষায়ও কোন পরিবর্তন ঘটতে দেননি, দাওয়াতদাতা হিসেবে নিজের উন্নত চরিত্রের পার্থক্য সৃষ্টি হতে দেননি, এবং যুক্তির প্রখরতাকেও কিছুমাত্র ম্লান হতে দেননি।

আল্লাহ তাঁর পবিত্র আত্মা ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর রহমত ও বরকত নাযিল করুন। এমনকি ঐ কুটতার্কিকরা যখনই কিছু ধারালো যুক্তি উপস্থাপন করেছে, অমনি ওহীর নির্দেশে তাকেও সর্বতোভাবে খন্ড করেছেন, তা সে যতই নিম্নস্তরের হোক না কেন।

 

যুক্তি

ব্যংগ বিদ্রুপ, কুৎসা রটনা ও কুটতর্কে কখনো কখনো কোরায়েশ নেতারা দু’একটা ধারালো যুক্তিও উপস্থাপন করেছে, তবে তার সংখ্যা খুবই কম। এর কয়েকটা উদাহরণ দেয়া যাচ্ছেঃ

এ ধরণের একটা যুক্তি তারা মাঝে মাঝে এভাবে পেশ করতো যে, আমরা তো দেবমূর্তিগুলোকে আল্লাহর চেয়ে বড় কখনো মনে করিনা। আমরা শুধু বলি, এই মূর্তিগুলো যেসব মহান ব্যক্তির আত্মার প্রতীক, তারা আল্লাহর দরবারে আমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারে। এসব মূর্তির সামনে সিজদা করে ও বলি দিয়ে আমরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি।

তারা আরো বলতো, আমাদের মতে দুনিয়ার জীবনই একমাত্র জীবন এ ছাড়া আর কোন জীবন আমাদের হবেনা এবং আমাদের মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিতও হতে হবেনা। সুতরাং আমরা এমন একটা ধর্মকে কিভাবে মেনে নেব, যা অন্য একটা জগতের ধারণা দিয়ে আমাদেরকে এ দুনিয়ার জীবনের স্বার্থ ও সুখশান্তি থেকে বঞ্ছিত করতে চায়?

তারা এ যুক্তিও দিত যে, আমরা যদি মুহাম্মদের সা. দাওয়াত মেনে নেই, বর্তমান ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত হতে দেই এবং এর ওপর আমাদের প্রধান্যকে খর্ব হতে দেই, তাহলে দেশ থেকে আমাদের উৎখাত হয়ে যেতে হবে।

এই দু’তিনটে উদাহরণ থেকে বুঝা গেল যে, কূটতর্ক ও ধড়িবাজির মাঝে তারা কিছু কিছু যুক্তিও দিত। তবে কোরআন সে সব যুক্তির দাঁতাভাঙ্গা জবাবও দিত।

 

সন্ত্রাস ও গুন্ডামী

ব্যংগ বিদ্রুপ, গালিগালাজ ও অপপ্রচারাভিযানের সাথে সাথে কোরায়েশদের উন্মত্ত বিরোধিতা ক্রমশ গুন্ডামী, সন্ত্রাস ও সহিংসতার রূপ নিত। নেতিবাচক ষড়যন্ত্রের হোতারা যখন তাদের ব্যংগ বিদ্রুপ ও কুৎসা রটনাকে ব্যর্থ হতে দেখে, তখন গুন্ডামী ও সন্ত্রাসই হয়ে থাকে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ। মক্কাবাসী রসূল সা. কে উত্যক্ত করার জন্য এমন হীন আচরণ করেছে যে, তিনি ছাড়া আর কোন প্রচারক হলে সে যতই সাহসী ও উদ্যমী হোক না কেন, তার উৎসাহ উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে যেত এবং হতাশ হয়ে বসে পড়তো। কিন্তু রসূল সা. এর ভদ্রতা ও গাম্ভীর্য সকল সহিংসতা ও গুন্ডামীকে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।

যে আচরণটা একেবারেই নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল, সেটা হলো, তাঁর মহল্লার অধিবাসী বড় বড় মোড়ল ও গোত্রপতি তাঁর পথে নিয়মিতভাবে কাঁটা বিছাতো, তাঁর নামায পড়ার সময় ঠাট্টা ও হৈ চৈ করতো, সিজদার সময় তাঁর পিঠের ওপর জবাই করা পশুর নাড়িভূড়ি নিক্ষেপ করতো, চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিত, মহল্লার বালক বালিকাদেরকে হাতে তালি দেয়া ও হৈ হল্লা করে বেড়ানোর জন্য লেলিয়ে দিত এবং কোরআন পড়ার সময় তাঁকে, কোরআনকে এবং আল্লাহকে গালি দিত।

এ অপকর্মে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী ছিল আবু লাহাব ও তার স্ত্রী। এ মহিলা এক নাগাড়ে কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁর পথে ময়লা আবর্জনা ও কাঁটা ফেলতো। রসূল সা. প্রতিদিন অতি কষ্টে পথ পরিষ্কার করতেন। এই হতভাগী তাঁকে এত উত্যক্ত করেছিল যে, তাঁর সান্ত্বনার জন্য আল্লাহ তায়ালা আলাদাভাবে সূরা লাহাব নাযিল করেন এবং তাকে ঐ দুর্বত্ত দম্পতির ঠিকানা যে দোজখে, তা জানিয়ে দেন।

একবার পবিত্র ক’বার চত্বরে রসূল সা. নামায পড়ছিলেন। এ সময়ে উকবা ইবনে আবু মুয়ীত রসূলের গলায় চাদর পেঁচিয়ে এমনভাবে ফাঁস দেয় যে, তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে যান। এই দুর্বৃত্তই একবার নামাযের সময় তাঁর পিঠের ওপর নাড়িভূড়ি নিক্ষেপ করেছিল।

একবার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক দুরাচার তাঁর মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে। তিনি ঐ অবস্থাতেই নীরবে বাড়ী চলে যান। শিশু ফাতেমা রা. তাঁর মাথা ধুয়ে দেয়ার সময় দুঃখে ও ক্ষোভে কাঁদতে থাকেন। তিনি শিশু মেয়েকে এই বলে সান্ত্বনা দেন, মাগো, তুমি কেঁদনা। আল্লাহ তোমার আব্বুকে রক্ষা করবেন।

আর একবার যখন তিনি হারাম শরীফে নামায পড়ছিলেন, তখন আবু জাহল ও অপর কয়েকজন কোরায়েশ সরদার তা লক্ষ্য করলো। তখন আবু জাহলের নির্দেশে উকবা ইবনে আবু মুয়ীত গিয়ে নাড়িভূড়ি নিয়ে এল এবং রসূল সা. এর গায়ে নিক্ষেপ করে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। সেদিনও শিশু মেয়ে ফাতেদমা তাঁর গা ধুয়ে পরিস্কার করে দেন এবং উকবাকে অভিশাপ দেন।

‘এক আল্লাহর আনুগত্য কর, সততা ও ইনসাফের অনুসারী হও এবং এতীম ও পথিককে সাহায্য কর’, এই সদুপদেশের প্রতিরোধ এভাবে নেয়া হয়েছিল যে, কাঁটা বিছিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হলো। ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করে তাওহীদ ও সদাচারের পবিত্র দাওয়াতকে সমুলে উৎখাতে অপচেষ্টা চালানো হলো। রসূল সা. এর পিঠে নাড়িভূড়ির বোঝা চাপিয়ে ধারণা করা হলো যে, এখন আর সত্য মাথা তুলতে পারবেনা। রসূলের সা. গলায় ফাঁস লাগিয়ে জ্ঞানপাপীরা ভেবেছিল এবার ওহীর আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে যাবে। যাঁকে কাঁটা বিছিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হলো, তিনি সব সময় ফুল বর্ষণ করতে লাগলেন। যাঁর গায়ে ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করা হলো, তিনি জাতিকে ক্রমাগত আতর গোলাপ বিতরণ করতে লাগলেন। যার ঘাড়ে নাড়িভূড়ির বোঝা চাপানো হলো, তিনি মানবজাতির ঘাড়ের ওপর থেকে বাতিলের ভূত নামিয়ে গেলেন। যার গলায় ফাঁস দেয়া হলো, তিনি সভ্যতার গলা থেকে বাতিল রসম রেওয়াজের শেকল খুলে ফেললেন। গুন্ডামী এক মুহূর্তের জন্যও ভদ্রতার পথ আটকাতে পারেনি। ভদ্রতা ও শালীনতার পতাকাবাহীরা যদি যথার্থই কৃত সংকল্প হয়, তবে মানবেতিহাসের শাশ্বত নিয়মের পরিপন্থী সন্ত্রাস ও গুন্ডামীকে এভাবেই চরম শাস্তি দিয়ে চিরতরে নির্মূল করতে হবে।

 

ইসলামী আন্দোলনকে সহায়হীন করার অপচেষ্টা

ইসলামী দাওয়াতের বিরোধীরা যখন পানি মাথার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখে, তখন বেশামাল হয়ে আন্দোলনকে বা তার নেতা ও কর্মীদেরকে সমাজের সব ধরণের কার্যকর সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্ছিত করার চেষ্টা চালায়। প্রত্যক্ষভাবে পারা না গেলেও পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করে বিপ্লবের সৈনিকদের নিস্ক্রিয় করে দিতে চায়।

মক্কাবাসী রসূল সা. কে একেবারেই খতম করে দিতে চাইত। কিন্তু ভয় পেত যে, গোত্রীয় জিঘাংসা ও প্রতিশোধ পরায়ণতার আগুন এমনভাবে জ্বলে উঠবে যখন রক্তপাতের ধারাবাহিকতা বন্ধ করার সাধ্য আর কারো থাকবেনা। নিকট অতীতে এক সর্বনাশা যুদ্ধ তাদেরকে এত ক্ষত বিক্ষত করে দিয়েছিল যে, এক্ষণি অনুরূপ আর একটা যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে তারা মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। এছাড়া আরো একটা জটিলতাও ছিল। বনু হাশেম ও বনু উমাইয়ার মধ্যে ছিল পুরানো কোন্দল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বনু উমাইয়ার নেতারা বিশেষত আবু লাহাব কিছুতেই বরদাশত করতে পারছিলনা যে, বনু হাশের গোত্রের কোন পরিবারে কেউ নবী হোক এবং সেই সুবাদে ঐ পরিবার সমাজের স্বীকৃতি লাভ করুক। বনু হাশেম দু’একবার এই মর্মে মন স্থিরও করে ফেলেছিল যে, ‘মুহাম্মদকে খোলাখুলিভাবে সমর্থন করলে ক্ষতি কী? সে তো আমাদেরই লোক। সে যদি বড় হয় এবং তার ধর্ম যদি বিস্তার লাভ করে, তবে তা তো আমাদেরই কল্যাণ ও সমৃদ্ধি এনে দেবে।’ কিন্তু বনু উমাইয়ার নেতারা তাদেরকে ঐ সিদ্ধান্ত কখনো কার্যকরী করতে দেয়নি। বনু হাশেম কার্যকরভাবে কিছু করতে পারেনি বটে, তবে তাদের একজন সদস্যের গায়ে হাত তোলা সহজ ব্যাপার ছিলনা, যতক্ষণ না তারা তাকে গোত্র থেকে বহিষ্কার করেছে। এদিকে রসূল সা. ছিলেন তাঁর চাচা আবু তালেবের অভিভাবকত্বে। এ অভিভাবকত্ব যতক্ষণ বহাল ছিল, ততক্ষণ বলতে গেলে গোটা বনু হাশেম গোত্র তাঁর রক্ষক ছিল। তাঁর শত্রুরা তাই সর্বশক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা চালালো যাতে রসূল সা. কে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত করা যায়। এ জন্য আবু তালেবের ওপর চাপ প্রয়োগ অনেকদিন ধরে অব্যাহত ছিল, কিন্তু তারা প্রতিবারই তাতে ব্যর্থ হয়।

একবার রবীয়ার দু’ছেলে উতবা ও শায়বা, আবু সুফিয়ান বিন হারব, আবুল বুখতারী, আসওয়াদ বিন আব্দুল মুত্তালিব, আবু জাহল, ওলীদ ইবনুল মুগীরা, হাজ্জাজ বিন আমেরের দু’ছেলে নাবাইহ ও মুনাব্বিহ এবং আস বিন ওয়ায়েলের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের এক শক্তিশালী প্রতিনিধি দল আবু তালেবের কাছে উপস্থিত হয়ে বললোঃ

‘হে আবু তালেব আপনার ভাতিজা আমাদের দেবতা ও ঠাকুরদের গালি দেয়, আমাদের ধর্মের খুঁত ধরে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের বোকা ঠাওরায় ও বিপথগামী আখ্যায়িত করে। এখন আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ, হয় আপনি ওকে আমাদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করা থেকে নিবৃত্ত করুন, নচেত আামাদের হাতে সোপর্দ করুন। কেননা আকীদা বিশ্বাসের দিক দিয়ে আপনিও আমাদেরই দলভুক্ত এবং ওর বিরোধী। আপনি যদি ওকে সামলাতে না পারেন তবে আমরা অবশ্যিই পারবো।’

আবু তালেব সমস্ত কথাবার্তা শান্তভাবে শুনলেন এবং প্রতিনিধি দলকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিদায় করলেন। রসূল সা. নিজের কাজ যথারীতি অব্যাহত রাখলেন এবং কোরায়েশরা তেলে বেগুনে জ্বলতে লাগলো। প্রতিনিধি দলের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। দেখবেন, এতে কত গভীর আবেগ সক্রিয় রয়েছে। এত অত্যন্ত জোরদার আবেদন জানানো হয়েছে। এ বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, ইসলামের দুশমনরা জনগণকে উত্তেজিত করার বিশেষ আয়োজন করে রেখে এসেছিল। এমন সব স্লোগান ও অভিযোগ তুলেছিল, যা শোনা মাত্রই জনতা ক্রোধে ফেটে পড়বে এবং রসূল সা. এর বিরুদ্ধে ভয়ংকরভাবে ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত হবে। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংগঠিত করা হয়েছে, তখন জনগণকে উস্কানি দেয়ার লক্ষ্যে কিছু না কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য অবশ্যই পরিবেশন করা হয়েছে।

এ ধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্যের মধ্যে একটি ছিল এই যে, তোমাদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হচ্ছে এবং তোমাদের দেবদেবীকে গালি দেয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়টি এই ছিল যে, চিরাচরিত ও পৈত্রিক ধর্মের খুঁত ধরা হচ্ছে।

তৃতীয়টি হলো, পূর্ব পুরুষদের অবমাননা করা হচ্ছে।

মক্কার মোশরেকরা উত্তেজনাকর এসব উপকরণ সংগ্রহ করে ফেলেছিল। যদিও রসূল সা. এর কাছে নাযিল হওয়া ওহীতে কোরায়েশদের দেবদেবীকে গালি দেয়া হয়নি। রবং গালি দিতে মুসলমানদের নিষেধ করা হয়েছে। তবুও এই সব দেবদেবীর বিরুদ্ধে উপস্থাপিত যুক্তি প্রমাণকে গালি আখ্যায়িত করে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি ওদের পূর্ব পুরুষদের অবমাননা করেননি, কেবল এ কথাই বলেছেন যে, কোন জিনিস শুধু পুরুষানুক্রমিকভাবে চলে আসছে এই অজুহাতে ধারণ করে রাখা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু এ কথাটাকেও পূর্ব পুরুষদের অবমাননা বলে ধরে নেয়া হয়েছে। অনুরুপভাবে রসূল সা. তাওহীদের যৌক্তিকতা ও শেরকের অযৌক্তিকতার প্রমাণ করার জন্য যা কিছু বলেছেন এবং মোশরেকদেরই প্রশ্নের জবাবে প্রচলিত ধর্মমতের যে পর্যালোচনা করেছেন, তাকে গতানুগতিক ধর্মের দোষ অন্বেষণের পর্যায়ে ফেলা হয়েছে।

আরেকবার এলো অন্য এক প্রতিনিধি দল। তারাও একই কাসুন্দি ঘেঁটে বললোঃ

‘হে আবু তালেব আপনি আমাদের মধ্যে বয়সেও প্রবীণ, মান মর্যাদায়ও শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। আমরা দাবী করেছিলাম যে, আপনার ভাতিজার অত্যাচার থেকে আমাদের বাঁচান। কিন্তু আপনি কিছুই করলেন না। আল্লাহর কসম, আমাদের বাপদাদাকে যেভাবে গালি দেয়া হচ্ছে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের যেভাবে বেকুফ ঠাওরানো হচ্ছে এবং আমাদের দেবদেবীর যেভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে, তা আমাদের কাছে অসহ্য। আপনি যদি ওকে না ঠেকান, তবে আমরা ওকেও দেখে নেব, আপনাকেও দেখে নেব। হয় আমরা বেঁচে থাকবো,না হয় মুহাম্মদ ও তার সমর্থকরা বেঁচে থাকবে। [সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ১০৮]

আবু তালেব এবার রসূলকে সা. ডাকলেন এবং সমস্ত কথাবার্তা তাঁকে জানালেন। তারপর খুবই অনুনয় করে বললেনঃ ‘ভাতিজা, আমার ওপর এমন বোঝা চাপিওনা, যা বহন করতে পারিনা।’ এ পর্যায়ে তিনি এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন যে, তাঁর একমাত্র আশ্রয়স্থলও যেন টলটলায়মান হয়ে পড়লো। বাহ্যত ইসলামী আন্দোলনের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্ত এসে পড়েছিল। কিন্তু লক্ষ্য করুন, কী গভীর আন্তরিকতা ও অবিচল সংকল্পে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বললেনঃ

‘চাচাজান, আল্লাহর কসম, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদ উপহার দিয়েও এই কাজ পরিত্যাগ করতে বলে, তবুও আমি তা পরিত্যাগ করতে পারবোনা। আমার এ কাজ সেই দিন বন্ধ হবে, যেদিন হয় আল্লাহ আমাকে এ কাজে বিজয়ী করবেন, নচেত আমি এই চেষ্টা সাধনা করতে করতে খতম হয়ে যাবো।’

রসূল সা. এর এ উক্তির মধ্য দিয়ে আমরা সেই আসল শক্তির সোচ্চার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি, যে শক্তি ইতিহাসকে ওলট পালট করে দেয় এবং সকল প্রতিরোধ ও ষড়যন্ত্রকে চূর্ণ করে আপন লক্ষ্যে উপনীত হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, কোরায়েশ এই শক্তির উপস্থিতি টের পায়নি। আবু তালেব এই শক্তির মায়াবী প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে বললঃ ‘যাও ভাতিজা, তোমার যা ভালো লাগে তার দাওয়াত দাও গে। আমি কোন অবস্থায় তোমাকে অসহায় ছেড়ে দেবনা।’

কিছুদিন পর আরেক প্রতিনিধি দল এলো আম্মারা ইবনে ওলীদকে সাথে নিয়ে। এবার তারা এল এক ব্যতিক্রমধর্মী পরিকল্পনা নিয়ে। তারা আবু তালেবকে বললোঃ ‘এই দেখুন, এ হচ্ছে কোরায়েশ বংশের সবচেয়ে সুঠাম ও সুদর্শন যুবক। একে নিয়ে নিন। এর বুদ্ধি ও শক্তি আপনার অনেক কাজে লাগবে। একে নিজের ছেলে বানিয়ে নিন এবং তার বিনিময়ে মুহাম্মদকে আমাদের হাতে অর্পণ করুন। কেননা সে আপনার ও আপনার চৌদ্দ পুরুষের ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, আপনার দেশের জনগনের মধ্যে বিভেদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে এবং তাদের পূর্ব পুরুষকে বেকুফ গণ্য করেছে। ওকে আমরা হত্যা করতে চাই। আপনাকে একজন মানুষের পরিবর্তে আর একজন মানুষ দিচ্ছি। [ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ ২৭৯]

লোকগুলোর চিন্তার ধরণটা দেখুন। মুহাম্মদ সা. এর ন্যায় সুমহান ব্যক্তিত্ব যেন একটা বাণিজ্যিক পণ্য। আর আবু তালেব যেন তার চাচা নয়, বরং একজন ব্যবসায়ী! প্রতিনিধিদের কথা শুনে আবু তালেবের ভাবাবেগে প্রচন্ড আঘাত লাগলো। তিনি বললেনঃ ‘তোমরা চাও যেন তোমাদের সন্তানকে তো আমি আদরযত্নের সাথে লালন পালন করতে থাকি, কিন্তু আমার ভাতিজাকে নিয়ে তোমরা যবাই করে দাও। এমনটি কস্মিনকালেও হতে পারেনা।’ শেষ পর্যন্ত উত্তেজিত বাক্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে ঘটনার সমাপ্তি ঘটলো। খোদ প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিমতের সৃষ্টি হলো।

এবার কোরায়েশরা রসূল সা. এর সাথীদের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য যে সমস্ত গোত্রে কোন মুসলমান ছিল, সেই সব গোত্রকে উস্কে দিতে লাগলো। তাদেরকে ইসলাম থেকে ফেরানোর জন্য কঠোর নির্যাতন চালানো শুরু হলো। কেবল রসূল সা. কে আল্লাহ আবু তালেবের পৃষ্ঠপোষকতায় রক্ষা করলেন। আবু তালেব কুরায়েশদের হাবভাব দেখে অস্থির হয়ে উঠলেন এবং বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালেবের কাছে রসূল সা. এর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানালেন। লোকেরা সমবেত হলো এবং মুহাম্মদ সা. কে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। কিন্তু আবু লাহাবের প্রবল বিরোধিতায় কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া গেলনা।

পরবর্তী সময় যখন শত্রুদের মধ্য থেকে হামযা ও ওমরের ন্যায় দু’জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ইসলামী আন্দোলনে যোগদান করলো, তখন শত্রু মহলে আবারো প্রচন্ড গাত্রদাহের সৃষ্টি হলো। স্পষ্ট বুঝা গেল যে, মুহাম্মদের সা. এর পরিচালিত আন্দোলন তখন ঘরে ঘরে ঢুকতে আরম্ভ করেছে। সুতরাং একটা কিছু করা চাই। আবু তালেব তখন রোগ শয্যায়। তারা তাঁর কাছে হাজির হলো। এবার তাদের পরিকল্পনা এই ছিল যে, রসূল সা. এর সাথে তাদের এই মর্মে চুক্তি হয়ে যাক যে, সেও আমাদের ব্যাপারে নাক গলাবেনা, আর আমরাও তার ব্যাপারে নাক গলাবোনা। সে আমাদের ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবেনা, আর আমরাও তার ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবোনা। রসূল সা. কে ডাকা হলো। তিনি কোরায়েশদের দাবী দাওয়া শোনার পর বললেনঃ

(আরবীঃ *********)

‘‘ওহে কোরায়েশ নেতৃবৃন্দ, তোমরা আমার এই একটা মাত্র কথাকে মেনে নাও, দেখবে আরব ও অনারব নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতি তোমাদের অনুগত হয়ে গেছে।’’

একটু কল্পনা করুন তো, কী প্রাণঘাতি পরিবেশ। ষড়যন্ত্র ও বিরোধিতার বিষে জর্জরিত কী ভয়াবহ পরিস্থিতি। তা সত্ত্বেও রসূল সা. এর মনে স্বীয় দাওয়াতের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে কত গভীর ও অবিচল আস্থা। যেন রাতের প্রগাঢ় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলছেন, এক্ষুণি সূর্য উঠবে। শুধু তাই নয়, এও লক্ষ্য করুন যে, নিজের আদর্শের শুধু ধর্মীয় দিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকও তাঁর সামনে কি রকম উজ্জ্বল ছিল।

আবু জেহেল ঝনাত্ করে বলে উঠলোঃ ‘হ্যাঁ, তোর বাপের কসম, একটা কেন, দশটা কথা চলবে।’

অন্য একজন বললোঃ ‘আল্লাহর কসম, এ লোকটা তোমাদের পছন্দ মাফিক কোন কথাই মেনে নেবে বলে মনে হচ্ছেনা।’

এরপর তারা হতাশ হয়ে চলে গেল। তবে প্রতিনিধি দলটির কথাবার্তা থেকে কয়েকটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথমত, ইসলামী আন্দোলনকে তারা এমন একটা শক্তি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, যাকে উৎখাত করার বৃথা চেষ্টার চেয়ে আপোষ ও সহাবস্থানের কোন উপায় খুঁজে বের করা অনেক ভালো। দ্বিতীয়ত, কোরায়েশগণ তাদের সমস্ত নির্যাতন নিষ্পেষণ ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও নিজেদের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে।

এ ছিল স্বয়ং রসূল সা. এর অবস্থা। পক্ষান্তরে তাঁর সংগীদের মধ্যেও যারা কারো না কারো অভিভাবকত্বের আওতায় জীবন যাপন করছিল, তাদেরকেও অভিভাবকত্বহীন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল।

উদাহরণ স্বরূপ, হযরত আবু সালমাও আবু তালেবের নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলেন। তাঁর গোত্র বনু মাখযুমের লোকেরা এল। তারা বললো, আবু তালেব, আপনি আপনার ভাতিজাকে তো আমাদের হাতে সোপর্দ করলেন না। কিন্তু আমাদের গোত্রের লোককে ঠেকানোর কী অধিকার আছে আপনার? আবু তালেব বললেন, ‘সে আমার ভাগ্নে এবং আমার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। তোমরা ওর ওপর যুলুম চালাচ্ছিলে। আল্লাহর কসম, হয় তোমরা যুলুম থেকে বিরত হবে, নচেত আমি ওর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা করা দরকার করবো।’

অনুরূপভাবে, আবিসিনিয়ায় হিজরত শুরুর পর একবার হযরত আবু বকর মক্কার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে মক্কা ত্যাগ করে চললেন। কিছু দূর গেলে ইবনুদ দুগুন্না নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। সে যখন জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো, উনিও হিজরত করছেন, তখন সে বললো, আপনার মত লোকদের এভাবে মাতৃভূমি ত্যাগ করা উচিত নয়। আপনি বিপদাপদে আত্মীয় স্বজনকে সাহায্য করেন, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেন, এবং নগ্ন লোককে কাপড় দেন। নিজে সৎকাজ করেন এবং অন্যদেরকেও সৎ কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। ইবনুদ দুগুন্না এভাবে হযরত আবু বকরকে নিজ দায়িত্বে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়ে ফিরিয়ে আনলো এবং কোরায়েশদের সামনে ঘোষণা করে দিল যে, আবু বকর তাঁর নিরাপত্তা হেফাজতে আছেন। বাড়িতে তিনি নিজের নামায পড়ার জায়গায় বসে সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়তেন। সেই সাথে তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তো। ফলে যে-ই তার তেলাওয়াত শুনতো, সে প্রভাবিত হতো। ক্রমে ক্রমে ব্যাপারটা কোরায়েশদের কানে গেল। তারা ইবনুদ দুগুন্নার কাছে এসে বললো, তুমি আবু বকরকে আশ্রয় দিয়ে তো আমাদের সর্বনাশ করেছ। তিনি সুললিত কণ্ঠে কোরআন পড়েন, আর তা শুনে আমাদের মহিলারা ও শিশুরা প্রভাবিত হচ্ছে, তোমার আশ্রয় দেয়ার প্রয়োজন নেই। আবু বকরকে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। সেখানে বসে সে যা ইচ্ছে করুক। আমরা নাক গলাতে যাব না। ইবনুদ দুগুন্না অগত্যা আবু বকর রা. কে তাঁর বাড়ীতে পাঠিয়ে দিল। (ইবনে হিশাম)

 

নেতিবাচক ফ্রন্ট

শ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মদ সা. মানবজাতির যে বৃহত্তম সেবায় নিয়োজিত ছিলেন, তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য ইসলামের শত্রুরা হরেক রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। কিন্তু সে সব সত্ত্বেও তাঁর দাওয়াতী কাজ অব্যাহত ছিল এবং তার সুফলও কিছুনা-কিছু পাওয়া যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় বিরুদ্ধবাদী প্রচারণার একটা সক্রিয় সেল গঠন করা হলো। এই সেলের আওতায় মক্কার কতিপয় শীর্ষস্থানীয় নেতা রসূল সা. এর কাছাকাছি অবস্থান করতে লাগলো। তাদের প্রধান সমস্যা ছিল এই যে, মক্কা ছিল সমগ্র আরবের কেন্দ্রস্থল। এখান দিয়ে সব জায়গা থেকে কাফেলা যাতায়াত করতো এবং সত্যের দাওয়াতের নিত্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতো। মক্কার সরদারদের যে ধাপ্পাবাজী খোদ মক্কাবাসীর ওপর চলতো, সেটা বহিরাগতদের ওপর চলতোনা। তাছাড়া নবাগতদের মধ্যে অনেক মেধাবী ও নির্মল বিবেকধারী লোকও থাকতো। তারা কোন দাওয়াতকে নিছক যুক্তির বিচারে এবং দাওয়াত দাতাকে শুধু তার আচার ব্যবহার ও স্বভাব চরিত্রের আলোকে যাচাই করে কোন বিদ্বেষ বা কোন ঐতিহাসিক ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। মুহাম্মদ সা. এর দাওয়াত ও আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাদের অন্তরে কোন হিংসা বিদ্বেষ ছিলনা এবং থাকার কোন কারণও ঘটেনি। এ পরিস্থিতিতে শুধু মক্কাকে মুহাম্মদদের সা. দাওয়াতের প্রভাব থেকে রক্ষা করায় কোন লাভ হতোনা, যদি মক্কার বাইরের আরবীয় সমাজ ঐ দাওয়াত দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। কোরআনে বিষয়টির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে এভাবেঃ

(আরবী*******)

‘তারা কি দেখতে পায়না, তাদের প্রভাবাধীন এলাকাকে আমি চারদিক থেকে সংকুচিত করে আনছি?’ এ দিক দিয়ে তাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক সময় ছিল হজ্জের মওসুম। আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা দলে দলে তাদের সরদারদের নেতৃত্বে মক্কায় সমবেত হতো। এ সময় রসূল সা. ঐ সব দলের সদস্য ও নেতাদের সাথে তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে সাক্ষাত করতেন এবং দাওয়াত দিতেন। প্রতিক্রিয়াশীল নেতিবাচক আন্দোলনের নেতারা তা দেখে তেলেবেগুনে জ্বলতো। একবার হজ্জের মওসুম সমাগত হলে কোরায়েশ নেতারা ওলীদ ইবনুল মুগীরার বাড়ীতে জমায়েত হলো এবং গভীরভাবে ভাবতে লাগলো। ওলীদ সমস্যাটা এভাবে তুলে ধরলোঃ

‘হে কোরায়েশ জনতা, হজ্জের মওসুম সমাগত। সমগ্র আরব থেকে তোমাদের এখানে দলে দলে লোক আসবে। তারা সবাই আমাদের এই লোকের (মুহাম্মাদের) ব্যাপারটা জেনে গেছে। তাই তারা বিষয়টা ভালো করে জানার কৌতুহল নিয়েই আসবে। কাজেই তোমরা এখন এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও। পরস্পর কোন মতভেদে লিপ্ত হয়োনা। একজনের কথা আরেকজন মিথ্যা সাব্যস্ত করতে থাকবে ও খন্ডন করতে থাকবে এমন যেন না হয়।’

উপস্থিত জনতা বললোঃ ‘আপনিই বলুন। একটা কর্মসূচী আপনিই ঠিক করে দিন। আমরা সেই মোতাবেক কাজ করবো।’

কিন্তু ওলীদ জোর দিয়ে বললোঃ ‘তোমরাই আলোচনা কর, আমি শুনি।’

অগত্যা আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

একদল বললোঃ আমরা তো মনে করি, মুহাম্মদ একজন জ্যোতিষী। এই কথাই হজ্জে আগত লোকদের বলে বুঝাতে হবে।

ওলীদঃ না, আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ জ্যোতিষী নয়। আমরা বহু জ্যোতিষী দেখেছি। জ্যোতিষীদের মত ছন্দবদ্ধ ও মিত্রাক্ষর পয়ারে মুহাম্মদ কথা বলেনা।

লোকেরা বললোঃ তাহলে আমরা বলবো, ওকে ভূতে ধরেছে।

ওলীদঃ না, সে ভূতেধরাও নয়। ভূতে ধরা মানুষের যেমন গলা ধরে যায়, অংগপ্রত্যংগ কাঁপে, এবং চিন্তাধারা এলোমেলো থাকে, মুহাম্মাদের মধ্যে সে সব লক্ষণ নেই।

জনতাঃ তাহলে আমরা বলবো, ও একজন কবি।

ওলীদঃ না, ও কবি বলেও তো আমার মনে হয়না। আমরা হরেক রকম ছন্দের কবিতা চিনি। সে অনুসারে সে কবিও নয়।’

জনতাঃ তাহলে আমরা বলবো সে একজন যাদুকর।

ওলীদঃ না, সে যাদুকরও নয়। আমরা অনেক যাদুকর ও তাদের জাদু দেখেছি। জাদুতে ফুঁক ও মাদুলী দেয়ার যে রীতি আছে, মুহাম্মাদের সা. কাছে তা তো নেই।

জনতাঃ তাহলে ওহে আবু আবদুশ্শামস, আপনিই বলুন, মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালানোর জন্য আমরা কী বলবো?

ওলীদঃ আল্লাহর কসম। ওর কথাবার্তা বড়ই মধুর। তার কথার শেকড় অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং তার শাখা প্রশাখায় অনেক ফল ধরে। এ দাওয়াত বিজয়ী হবেই। একে পরাভূত করা যাবে না। এ দাওয়াত অন্য সব কিছুকে পর্যদুস্ত করে দেবে। তোমরা যেটাই বলবে, নিরর্থক ও বৃথা হয়ে যাবে। তবে তোমরা যা যা বলেছ, তার মধ্যে শেষের কথাটাই কিছুটা মানানসই হয়েছে। তোমরা এটাই বলবে যে, সে একজন জাদুকর। তার কথায় জাদু রয়েছে। সে কথা দিয়ে বাপ-বেটায়, স্বামী-স্ত্রীতে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, ব্যক্তি ও গোত্রে এবং গোত্রে-গোত্রে বিভেদ ও বিচ্ছেদ ঘটায়। (ইসলামের দাওয়াতের দিকে ইংগিত করে এ কথা বলা হয়েছে। কেননা এই দাওয়াতের ভিত্তিতে সমাজে দুটো দল সৃষ্টি হয়ে গেছে। অথচ এর আসল কারণ হলো, ইসলামের শত্রুদের ষড়যন্ত্র।) তোমরা বলবে যে, তার জাদুর কারণেই লোকেরা তাকে বয়কট করে রেখেছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম ও সীরাতুল মুস্তাফা, ইদ্রীস কান্দুলভী)

লক্ষ্য করুন, কিভাবে একজন মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্য ষড়যন্ত্র করা হয়। যে কথা বিবেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়না, সে কথাই জোর করে চালু করার চক্রান্ত করা হয়। ঐ মজলিসেই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, মক্কা অভিমুখী এক এক রাস্তার মুখে এক একটা দল বসে থাকবে। তারা প্রত্যেক প্রতিনিধি দলকে মুহাম্মাদ সা. ও তার দাওয়াত সম্পর্কে সতর্ক করে দেবে। এই পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করা হলো। কিন্তু এর ফল হলো উল্টো। রসূল সা. সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য আরবের কোণে কোণে পৌঁছে গেল। যারা এ সম্পর্কে কিছুই জানতোনা, তারাও জেনে গেল যে, আরবে একটা নতুন ধর্মের দাওয়াত চালু হয়েছে এবং মুহাম্মদই সা. তার পতাকাবাহী।

এবার আসুন, ইতিহাসের পর্দায় ইসলামের আহ্বায়ক ও তার বিরুদ্ধে কর্মরত নেতিবাচক আন্দোলনকারীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা যাক।

রবীয়া বিন উবাদা বর্ণনা করেন, আমি তখন একজন তরুণ। মীনায় বাবার সাথে থাকতাম। দেখতাম যে, রসূল সা. আরবের বিভিন্ন গোত্রের তাঁবুতে তাঁবুতে যেয়ে বলছেন, হে অমুক গোত্রের জনমন্ডলী, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসূল। তোমাদের কাছে আমার দাওয়াত, তোমরা শুধু আল্লাহর এবাদত কর, তাঁর সাথে আর কাউকে শরীক করোনা। যে সমস্ত দেবমূর্তির তোমরা পূজা করে থাক, তা বর্জন কর। আমার ওপর ঈমান আনো। আমাকে সমর্থন কর ও আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত কর। তাহলে আল্লাহ যে সমস্ত কথা বলার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন, তা বিস্তারিতভাবে বলবো।’

ঘটনার প্রতিবেদক বলেন, এক ব্যক্তি এতেনীয় পোশাক পরে রসূল সা. এর পেছনে পেছনে চলছিল। রসূল সা. যখনই তার কথা বলা শেষ করতেন, অমনি ঐ লোকটা চিৎকার করে বলতোঃ ‘ওহে অমুক গোত্রের অতিথিবৃন্দ, এই লোকটা তোমাদেরকে লাত ও উয্যা থেকে দূরে সরিয়ে নতুন ধর্ম ও ভ্রষ্টতার দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। ওর কথা তোমরা শুনোনা এবং মান্য করোনা।

ঐ তরুণ এ দৃশ্য দেখে নিজের বাবাকে জিজ্ঞেস করে, দাওয়াতদাতার পেছনে পেছনে যে লোকটা ছুটে চলেছে সে কে? সে তো ওর প্রত্যেকটা কথা খন্ডন করছে।’

বাবা জবাব দেন, ‘সে ঐ ব্যক্তির চাচা আবু লাহাব।’

হজ্জের ন্যায় বিভিন্ন মেলায়ও রসূল সা. হাজির হতেন, যাতে সামাজিক সমাবেশগুলো দ্বারা কিছু না কিছু উপকৃত হওয়া যায়। একবার যুল মাজায নামক মেলায় হাজির হয়ে জনতাকে কলেমায়ে তাইয়েবার দাওয়াত দিলেন। আবু জাহেল তাঁর পিছু লেগে ছিল। সে এমন ইতরামির পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল যে, হাতে ধুলোবালি নিয়ে রসূল সা. এর মুখে নিক্ষেপ করছিল এবং বলছিল, তোমরা ওর কথা শুনোনা। ও লাত ও উয্যার পূজা বন্ধ করতে চায়। (সীরাতুন্নবী, শিবলী নুমানী)

বিরুদ্ধবাদী প্রচারণার এই জোরদার অভিযানের খবরাদি শুনে আবু তালেব শংকিত হন যে, আরবের জনগন সংঘবদ্ধভাবে বিরোধিতা শুরু করে না দেয়। এ জন্য তিনি একটা দীর্ঘ কবিতা লিখে কা’বার দুয়ারে ঝুলিয়ে রাখেন। এতে তিনি একদিকে সাফাই দেন যে, আমি নিজে মুহাম্মাদের দাওয়াত গ্রহণ করিনি। অপর দিকে তিনি এ কথাও ঘোষণা করেন যে, আমি কোন অবস্থাতেই মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করতে পারবোনা। প্রয়োজন হলে তার জন্য আমি নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দেব। আবু তালেবের নামে সংকলিত এ জাতীয় কবিতার বেশির ভাগই ঐতিহাসিকভাবে দূর্বল। তবে এর বেশ কিছু অংশ যে সঠিক, সে ব্যাপারেও সন্দেহের অবকাশ নেই। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

 

বিরূপ প্রতিক্রিয়া

যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মক্কায় আসতো, অমনি ইসলামের শত্রুরা তাকে ঘিরে ধরতো এবং রসূল সা. এর প্রভাব থেকে তাকে বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতো। কিন্তু অধিকাংশ সময় উল্টো ফল ফলতো। এ ধরণের কয়েকটা ঘটনার উল্লেখ করা জরুরী মনে হচ্ছে।

তোফায়েল বিন আমর দাওসী একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নামকরা কবি ছিলেন। একবার তিনি মক্কায় বেড়াতে এলে কোরায়েশদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে গেল। তারা গিয়ে বললোঃ ‘তোফায়েল সাহেব, আপনি আমাদের শহরে আগমন করেছেন, এতে আমরা আনন্দিত। তবে এখানে যে ক’টা দিন থাকবেন একটু সাবধানে থাকবেন। এখানে মুহাম্মাদের সা. কার্যকলাপ আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ লোকটা আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করে দিয়েছে এবং আমাদের স্বার্থ ধ্বংস করে দিয়েছে। ওর কথাবার্তা জাদুর মত। সে পিতাপুত্রে, ভাইয়ে ভাইয়ে এবং স্বামী স্ত্রীতে বিচ্ছেদ ঘটাচ্ছে। আপনার ও আপনার গোত্রকে নিয়ে আমরা শংকিত, পাছে আপনারা ওর ধাপ্পার শিকার হয়ে যান। তাই মুহাম্মাদের সা. সাথে আপনার একেবারেই কোন কথা না বলা ও তার কোন কথা না শোনা সবচেয়ে উত্তম।’

তোফায়েল বলেনঃ আমি মুহাম্মাদের সাথে কোন কথা বলবোনা এবং তাঁর কোন কথা শুনবোনা-এই মর্মে ওয়াদা না করায় তারা আমার পিছু ছাড়েনি। তাই মসজিদুল হারামে যাওয়ার সময় কানে তুলো দিয়ে যেতাম। এই সময় হঠাৎ একদিন দেখলাম, রসূল সা. কা’বার কাছে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন। আমিও তাঁর খুব কাঁছে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি তাঁর আবৃত্তি করা খুবই মধুর বাণী শুনলাম। মনে মনে বললামঃ আমি কি মায়ের দুধ খাওয়া শিশু? আল্লাহর কসম, আমি তো একজন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। আমি একজন কবি। ভালোমন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা আমার আছে। তাহলে মুহাম্মাদের কথা শুনতে আমাকে কে বাধা দিতে পারে? তিনি যে দাওয়াত দেন তা যদি ভালো হয় তাহলে গ্রহণ করবো। আর খারাপ হলে প্রত্যাখ্যান করবো।’

এই চিন্তা-ভাবনায় খানিকটা সময় কেটে গেল। নামায শেষে রসূল সা. বাড়ীর দিকে রওনা হলেন। তোফায়েল তাঁর সাথে সাথে চললেন। পথে তাঁকে সব কথা জানালেন যে, তাঁর কাছে তাঁর সম্পর্কে কিরূপ অপপ্রচার করা হয়েছে এবং কিভাবে তাকে রসূল সা. এর কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছে। বাড়ীতে পৌঁছে তিনি রসূল সা. এর দাওয়াত কি, সবিস্তারে জানতে চাইলেন। রসূল সা. তাঁকে ইসলামের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে এবং কোরআন পড়ে শোনালেন। তোফায়েল বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম, এত সুন্দর বাণীও আমি কখনো শুনিনি, এমন নির্ভুল ও সত্য দাওয়াতও আমি কখনো পাইনি। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। অতঃপর তিনি নিজ গোত্রের কাছে গিয়ে ইসলাম প্রচার করলেন। এতে তাঁর সমগ্র গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে।

তোফায়েল এমন আবেগোদ্দীপ্ত প্রচারকে পরিণত হন যে, বাড়ীতে গিয়ে বৃদ্ধ পিতার সাথে দেখা হওয়া মাত্রই বলেনঃ ‘আপনিও আমার কেউ নন, আমিও আপনার কেউ নই।’ পিতা বললেনঃ ‘সে কী? তোমার কী হয়েছে বাবা!’ তোফায়েল বললেনঃ ‘আমি এখন মুহাম্মদ সা. এর ধর্ম গ্রহণ করেছি এবং তাঁর আনুগত্যের পথ অবলম্বন করেছি।’ পিতা বললেনঃ ‘বাবা, তোমার ধর্ম যা, আমার ধর্মও তাই হবে।’ তিনি তৎক্ষণাত গোসল করে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তোফায়েল একই পন্থায় নিজের স্ত্রীকেও দাওয়াত দিলেন। সেও ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর গোত্রের সবার মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। পরে তিনি রসূল সা. এর কাছে এসে পুরো ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁর গোত্রের বিভিন্ন চারিত্রিক দোষের উল্লেখ করে তাদের জন্য আযাবের দোয়া করতে রসূল সা. কে অনুরোধ করেন। কিন্তু রসূল সা. হেদায়াতের ও সংশোধনের দোয়া করেন এবং তোফায়েলকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন, যেন, ধৈর্যের সাথে নিজের গোত্রের সংশোধনের জন্য কাজ করে যেতে থাকে এবং তাদের সাথে নম্র আচরণ করে। (ইসলাম প্রচারে তার জবরদস্তির প্রবণতা ইসলামী কর্মনীতির সাথে সামঞ্জস্যশীল ছিলনা।) [সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খন্ডঃ ৪০৭-৯ পৃষ্ঠা]

আরো একটা ঘটনা লক্ষ্য করুন। আ’শা ইবনে কায়েসও একজন বিশিষ্ট কবি ছিলেন। তিনি রসূল সা. সম্পর্কে অনেক কিছু শুনে ইসলাম গ্রহণ করার মানসে মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি রসূল সা. এর প্রশংসাসূচক একটা কবিতাও রচনা করেছিলেন। আ’শা মক্কার সীমার ভেতরে পৌঁছা মাত্রই জনৈক কোরায়েশী মোশরেক (ইবনে হিশামের মতে, সে ছিল আবু জাহল) এসে তাকে ঘিরে ধরলো এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। আ’শা বললেন, আমি মুহাম্মদ সা. এর কাছে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে চাই। এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেশ কথাবার্তা হলো। কূচক্রী মোশরেকটি আ’শার মনোভাব যাচাই করার জন্য বললো, দেখ, মুহাম্মদ তো ব্যভিচার নিষিদ্ধ করে।’ এতেও যখন আ’শা দমলেন না, তখন সে বললো, মুহাম্মদ সা. মদ খেতেও নিষেধ করে। এভাবে এটা ওটা বলতে বলতে সে আ’শার সংকল্পটাকে দুর্বল করে দিল। শেষ পর্যন্ত তাকে এই মর্মে রাজী করালো যে, এবারকার মত তুমি চলে যাও। আগামী বছর এসে ইসলাম গ্রহণ করো। আ’শা ফিরে গেল। কিন্তু পরের বছর মক্কায় ফিরে আসার আগেই হতভাগার মৃত্যু হয়ে গেল।

সবচেয়ে মজার ঘটনা ছিল মুরদ আরাশীর। বেচারা একটা উট নিয়ে মক্কায় এসেছিল। আবু জাহলের সাথে উট বিক্রির বিষয়ে তার কথাবার্তা পাকা হয়। কিন্তু আবু জহল দাম দিতে গড়িমসি করতে থাকে। বাধ্য হয়ে সে কোরায়েশদের বিভিন্ন নেতার কাছে গিয়ে উটের দাম আদায় করিয়ে দেয়ার জন্য কাকুতি মিনতি করতে থাকে। পবিত্র কা’বার চত্তরে কোরায়েশদের একটা বৈঠক চলছিল। আরাশী ঐ বৈঠকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের কাছে আবেদন জানালো যে, আপনাদের কেউ আবু জাহলের কাছে থেকে আমার পাওনাটা আদায় করে দিন। আমি একজন বিদেশী। আমার ওপর যুলুম করা হচ্ছে। বৈঠকের লোকদের মধ্যে এমন কেউ ছিলনা, যে আবু জাহলের কাছে গিয়ে বিদেশীর হক আদায় করে দেয়ার দুঃসাহস দেখায়। এ জন্য তারা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, ঐ যে একটা লোক (মুহাম্মদ সা.) বসে আছে, ওর কাছে যাও। সে আদায় করে দেবে। আসলে এটা ছিল একটা পরিহাস মাত্র। কেননা সবাই জানতো মুহাম্মাদের সা. সাথে আবু জাহলের কি সাংঘাতিক শত্রুতা। আরাশী রসূল সা. এর কাছে এসে তার সমস্ত ঘটনা খুলে বললো। রসূল সা. তৎক্ষণাত উঠলেন এবং বললেন, আমার সাথে এস। সবাই অপেক্ষা করতে লাগলো কী ঘটে তা দেখার জন্য। রসূল সা. হারাম শরীফ থেকে বেরিয়ে সোজা আবু জাহলের বাড়ীতে গেলেন এবং দরজায় করাঘাত করলেন। ভেতর থেকে আওয়ায এলো, কে? তিনি বললেনঃ আমি মুহাম্মদ। বাইরে এস। আমার জরুরী কথা আছে।

আবু জাহল বেরিয়ে এল। মুখ তার ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। তিনি বললেন, এ লোকটার যা পাওনা আছে, দিয়ে দাও। আবু জাহল বিনা বাক্যব্যয়ে পাওনা পরিশোধ করে দিল। আরাশী সানন্দে হারাম শরীফের বৈঠকরত লোকগুলোর কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা জানালো।

মুহাম্মদ সা. এর নির্মল চরিত্রের প্রভাবেই ঘটেছিল এ ঘটনা। আবু জাহল নিজেও এর স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং বৈঠকরত কোরায়েশ নেতাদের কাছে তা ব্যক্তও করেছিল। সে বললো, মুহাম্মদ এসে দরজায় করাঘাত করলো। আমি তার আওয়ায শুনতেই কেন যেন ভয় পেয়ে গেলাম। (ইবনে হিশাম)

স্বয়ং আরাশী এবং মক্কাবাসীর ওপর এ ঘটনার কেমন প্রভাব পড়ে থাকতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

যে সব নওমুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাদের কল্যাণে ঐ এলাকায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে ২০ জন খৃস্টান মক্কায় এল। তারা হারাম শরীফে রসূল সা. এর সাথে সাক্ষাত করে। রসূল সা. তাদের সাথে কথা বলেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন, কোরআন শোনান এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তাদের চোখে পানি এসে যায় এবং তারা নির্দ্বিধায় ঈমান আনে। তারা যখন উঠে বেরুলো, তখন মসজিদের বাইরে কোরায়েশরা জটলা পাকাচ্ছিল। আবু জাহল আবিসিনিয়ার প্রতিনিধি দলকে বললো, তোমরা কেমন নির্বোধ! নিজেদের ধর্মকে পরিত্যাগ করলে! প্রতিনিধি দল বললো, ‘আপনাদেরকে আমরা ছালাম জানাচ্ছি। আমরা আপনাদের সাথে কোন বিবাদ বিসম্বাদে যেতে চাইনে। আমাদের পথ ভিন্ন এবং আপনাদের পথও ভিন্ন। আমরা একটা কল্যাণ থেকে বঞ্ছিত হতে চাইনে।’

মক্কার কুচক্রীরা প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলবে এই আশংকায় আকাবার দ্বিতীয় বায়আতের পুরো ঘটনাটা রাতের গভীর অন্ধকারে কঠোর গোপনীয়তার সাথে সম্পন্ন করা হয়। মদীনা থেকে আগত প্রতিনিধি দল যখন বায়আত সম্পন্ন করে নিজেদের অবস্থান স্থলে পৌঁছলো, তখন কোরায়েশ নেতারা সেখানে গিয়েই তাদের সাথে সাক্ষাত করলো। কোরায়েশদের গোয়েন্দাগিরির ব্যবস্থা এত মজবুত ছিল যে, তারা বায়আতের পুরো ঘটনা জানিয়ে তাদেরকে বললো, তোমরা মুহাম্মদ সা. কে এখান থেকে নিয়ে যেতে চাও এবং তার হাতে হাত দিয়ে তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করার শপথ নিয়েছ। ভালো করে শুনে নাও, তোমরা যদি আমাদের সাথে আরবদের লড়াই বাধিয়ে দাও, তাহলে আমাদের চোখে তোমাদের চেয়ে ঘৃণ্য মানুষ আর কেউ থাকবে না। আনসারগণ ব্যাপারটা গোপন করার চেষ্টা করলেন। তাই তখনকার মত ব্যাপারটা আর সামনে গড়ালোনা এবং আনসারগণ মদীনায় রওনা হয়ে গেল। কিন্তু কোরায়েশগণ এরপরও গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে যায় এবং সমস্ত তথ্য জেনে ফেলে। তারা আনসারী কাফেলার পিছু ধাওয়া করে এবং সা’দ বিন উবাদা ও মুনযির বিন আমরকে পাকড়াও করে নিয়ে আসে। তারা উভয়ে নিজ নিজ গোত্রে ইসলাম প্রচারের অংগীকার করেছিলেন। কোরায়েশগণ তাদের উভয়কে পিছমোড়া দিয়ে বেধে ভীষণ মারধর করে।

সা’দ বিন উবাদা বর্ণনা করেছেন, আমাদের এই করুণ অবস্থায় কোরায়েশদের এক দীর্ঘাঙ্গী ও সুদর্শন ব্যক্তি এল। আমি মনে মনে বললাম, এই গোত্রটির মধ্যে যদি কোন ভালো লোক থেকে থাকে, তবে সে বোধহয় এই ব্যক্তি এবং এর কাছ থেকে হয়তো কিছুটা সদ্ব্যবহার পাওয়ার আশা করা যায়। কিন্তু সে কাছে এসেই আমাকে প্রচন্ড একটা থাপপড় মারলো। এবার আমি বুঝে নিলাম, এদের কাছ থেকে কোন সদ্ব্যবহার আশা করা যায় না। অবশেষে তাদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, কোরায়েশদের মধ্যে কি এমন কেউ নেই, যার সাথে তোমাদের কোন পূর্বপরিচয়, সৌহার্দ বা চুক্তি আছে? আমি জুবাইর ইবনে মুতায়াম ও হারেস বিন হারবের নামোল্লেখ করলাম। সে আমাকে ঐ দু’জনের নাম ধরে ধরে ডাকার পরামর্শ দিল। আমি তাই করলাম। তখন তারা উভয়ে এসে আমাদের মুক্ত করলো।

এই ঘটনাগুলো থেকে বুঝা যায়, ইসলামী দাওয়াতের বিরোধীরা কত সক্রিয় ছিল।

 

সাহিত্য ও গান বাজনার ফ্রন্ট

নযর বিন হারেস ছিল ইসলাম বিরোধী অভিযানের আর এক হোতা। সে নিজের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ঘন ঘন পারস্য যেত। সেখান থেকে সে অনারব রাজা বাদশাদের ঐতিহাসিক সাহিত্যিক কিচ্ছা কাহিনী সংগ্রহ করে আনতো। তারপর মক্কায় কোরআনের বৈপ্লবিক সাহিত্যের মোকাবিলায় অনারব বিশ্ব থেকে আমদানী করা বিনোদন মূলক সাহিত্যের আসর গড়ে তুলত। এসব আসরে সে জনগণকে এ বলে দাওয়াত দিতে থাকে যে, আরে মুহাম্মদের সা. কাছ থেকে আ’দ সামূদের পঁচাবাসি কিচ্ছা শুনে কি করবে, আমার কাছে এস, আমি তোমাদের রুস্তম ও ইসফিন্দিয়ারের দেশের মজার মজার কাহিনী শোনাবো। নযর বিন হারেসকে একটা স্বতন্ত্র মানবীয় চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করে কোরআন বলেছেঃ

‘এক শ্রেণীর লোক এমনও আছে যারা বিভ্রান্তিকর চিত্তবিনোদনমূলক কিচ্ছা-কাহিনী কিনে আনে, যাতে করে তা দ্বারা না জেনে বুঝে মানুষকে বিপথগামী করতে পারে এবং তাদেরকে উপহাস করতে পারে।’ (সূরা লুকমানঃ ৬)

এই নযর বিন হারেস একবার এক মজলিসে আবু জাহলের সামনে রসূল সা. এর দাওয়াত ও আন্দোলন সম্পর্কে নিম্নরূপ ভাষণ দিয়েছিলঃ

‘হে কোরায়েশ জনমন্ডলী, আজ তোমরা এমন একটা জিনিসের সম্মুখীন, যার মোকাবিলায় ভবিষ্যতে তোমাদের কোন কৌশল সফল হবে না। মুহাম্মদ সা. এক সময় তোমাদের সবার প্রাণপ্রিয় এক কিশোর ছিল। তোমাদের সবার চাইতে সত্যবাদী এবং সবার চাইতে আমানতদার ও বিশ্বাসী ছিল। পরে যখনই সে প্রৌঢ় বয়সে পদার্পন করলো এবং নিজের দাওয়াত পেশ করলো, অমনি তোমরা বলতে আরম্ভ করলে, সে যাদুকর......, বলতে আরম্ভ করলে, সে জ্যোতিষী, বলতে আরম্ভ করলে সে উন্মাদ।..... আসলে এর কোনটাই ঠিক নয়। হে কোরায়েশ জনমন্ডলী, তোমরা তোমাদের নীতি সম্পর্কে আরো একটু চিন্তাভাবনা কর। কেননা আল্লাহর কসম তোমাদের সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উপস্থিত।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম)

নযর বিন হারেসের এ ভাষণ থেকে বুঝা যায়, রসূলের সা. দাওয়াতকে সে একটা অসাধারণ ব্যাপার মনে করতো এবং তাঁর চারিত্রিক মাহাত্ম সম্পর্কেও সচেতন ছিল। কিন্তু সে নিজের সচেতন বিবেককে পদদলিত করে রসূলের দাওয়াতের বিরোধীতা করার জন্য কুটিল শয়তানী চক্রান্ত আঁটতো। সে ভালো করেই বুঝতো যে, একটা ইতিবাচক ও মহৎ উদ্দেশ্যমূলক আন্দোলনের আন্তরিকতাপূর্ণ আহ্বানের মোকাবিলায় সাধারণ লোকদের জন্য বিনোদনমূলক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অধিকতর আকর্ষণীয় উপাদান থাকতে পারে। এ জন্য সে বিনোদনমূলক ও নান্দনিক সাহিত্যের একটা আসর গড়ে তুলতো। নযর বিন হারেস বলতো, ‘আমি মুহাম্মাদের চেয়েও চিত্তাকর্ষক ও মজাদার কিচ্ছাকাহিনী শোনাতে পারি।’ এরপর যখন সে বিদেশী কিচ্ছাকাহিনী বলতো, তখন বলতো, মুহাম্মাদের সা. কিচ্ছাকাহিনী আমার কিচ্ছাকহিনীর চেয়ে কোন্ দিক দিয়ে ভালো? পক্ষান্তরে কোরআনের কিচ্ছাকাহিনীকে সে পূরাকালের কিচ্ছাকহিনী বলে ব্যংগ করতো।

শুধু এখানেই শেষ নয়, সে গানবাজনায় পারদর্শিনী একটা দাসীও কিনে এনেছিল। সে লোকজনকে দাওয়াত করে খাওয়াত এবং খাওয়ার পর ওই দাসীর গানবাজনা শোনাতো। যে যুবক সম্পর্কেই সে খবর পেতো যে, সে ইসলামের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, তার কাছে সে ওই গায়িকাকে নিয়ে যেত এবং দাসীকে নির্দেশ দিত, 'এ যুবককে খাইয়ে দাইয়ে অ গানবাজনা শুনিয়ে পরিতৃপ্ত কর।' শিল্প ও সংস্কৃতির এরূপ প্রদর্শনীর আয়োজন করার পর সে সগর্বে বলতো 'মুহাম্মদ সাঃ যে দাওয়াত দেয়, সেটা বেশি আনন্দদায়ক, না আমি যেটার আয়োজন করছি সেটা বেশি আনন্দদায়ক?' (সিরাতুল মুসতাফা, মাওলানা ইদ্রীস কান্দালভী, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ১৮৮)

প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মূল প্রাণশক্তি হল আল্লাহর আনুগত্য ও নৈতিকতা। নরনারীর অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতার পরিবেশে ওই প্রাণশক্তির মৃত্যু ঘটে। যে পরিবেশে খাওয়া দাওয়া, গান বাজনা, বিনোদন, ললিত কলা ও যৌনতার প্রতি সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়, সে পরিবেশ ইসলামী দাওয়াতের উপযোগী হতে পারেনা। এ কারণেই নযর বিন হারেস একদিকে বিনোদনমূলক কিচ্ছাকাহিনী পরিবেশন করা শুরু করে অপরদিকে গান বাজনা, নারী পুরুষের সম্মিলন ও অশ্লীলতার সমাবেশ ঘটায়।

কিন্তু একটা গঠনমূলক দাওয়াত ও সদুদ্দেশ্যমুলক আন্দোলনের প্রতিরোধে বিনোদনমূলক সাহিত্য সফল হয়না এবং ললিত কলা তথা গান বাজনা ইত্যাদিও কোন কাজে লাগেনা। দু'চারদিন একটু হৈ চৈ হলো। তারপর সব স্তব্ধ হয়ে গেল।

নযর বিন হারেসের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর সে কোরায়েশ নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে মদীনায় ইহুদী ধর্মযাজকদের কাছে গেল। তাদের কাছে সে জিজ্ঞাসা করল তোমরা তো জ্ঞানীগুণী মানুষ আর আমরা অশিক্ষিত মূর্খ, ইসলামী আন্দোলনকে আমরা কিভাবে ঠেকাই এবং কিভাবে মুহাম্মাদ সাঃ কে প্রতিরোধ করি, তা বলে দাও। ইহুদী আলেমরা তাদের শেখালো যে, তোমরা মুহাম্মদ সাঃ এর কাছে যুলকারনাইন ও আসহাবে কাহফের ঘটনা জিজ্ঞেস কর এবং আত্মা কি জিনিশ জানতে চাও। তারা ঐ তিনটে প্রশ্ন যথা সময়ে রসূল সাঃ এর কাছে তুললো এবং ওহীর সাহায্যে তিনি তার সন্তোষজনক জবাব ও দিলেন। কিন্তু কাফেরদের হঠকারিতার প্রতিরোধ কিভাবে সম্ভব? (সীরাতে ইবনে হিশাম)

 

আপোষের চেষ্টা

গোপনীয়তার প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করার পর যখন ইসলামী আন্দোলন দ্রুতগতিতে ছড়াতে লাগলো এবং পরবর্তীতে যখন অপপ্রচার ও হিংস্রতার বিভিন্ন আয়োজন ব্যর্থ ও নিষ্ফল হয়ে গেল, তখন বিরোধীরা অনুভব করতে আরম্ভ করলো যে, ইসলামী আন্দোলন একটি অজেয় শক্তি এবং তা অচিরেই দেশে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে ছাড়বে। তাই আপোষ মীমাংসা ও সমঝোতার একটা পথ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা এবং দু'পক্ষের মাঝে লেনদেনের ভিত্তিতে এ দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান ঘটানো যায় কিনা, সে জন্য পুনরায় উদ্যোগ আয়োজন ও চেষ্টা তৎপরতা শুরু হলো। কিন্তু আদর্শবাদী আন্দোলনে এতো বেশি শৈথিল্যের অবকাশ থাকেইনা যে, লেনদেন ও গোঁজামিলের মাধ্যমে একটা মধ্যবর্তী পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তবু ফোরামের নেতারা এ কৌশলটাও সর্বতভাবে পরীক্ষা করে দেখল যে, হয়তোবা কোনদিক দিয়ে কিছু সুযোগ সুবিধা আদায় করা যেতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ, তাদের একটা আপোষ প্রস্তাব এই ছিল যে, রসূল সাঃ তাদের দেবদেবী ও দেবমূর্তিগুলোর নিন্দা সমালোচনা করবেন না এবং তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করবেননা। এছাড়া আর যত ইচ্ছা ওয়াজ নছিহত ও নৈতিক উপদেশ দিতে চান, দেবেন, তাতে কোন আপত্তি করা হবে না। অর্থাৎ তিনি মূল দাওয়াতী কলেমা থেকে বাতিলকে প্রত্যাখ্যানজনিত বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন। অন্য কথায় এর অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহর নাম নেওয়ার অবকাশ থাকবে কিন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মা'বুদ নেই (লাইলাহ ইল্লাল্লাহ) এ কথা বলা যাবে না। যে বাতিল ধ্যানধারণার উপর প্রচলিত সভ্যতা দাড়িয়ে আছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। সমাজে খারাপ পরিবেশ ও খারাপ উপাদান যেটুকু যেভাবে আছে, তাকে ওইভাবেই বহাল থাকতে দিতে হবে। সত্য ও ন্যায়কে এমন আকারে পেশ করতে হবে, যেন তা বিপ্লবের পথকে উন্মুক্ত না করে এবং তা থেকে বৈপ্লবিক প্রেরণা নির্মূল করে দিতে হবে। ইসলামের রাজনৈতিক সংলাপ নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে। সমাজ ব্যবস্থাকে যথারীতি বহাল রেখে তার অধীনে আধ্যাত্মিক সমাজ সংস্কারের কাজ করে যেতে হবে। ভাবখানা এই যে, কোরায়েশদের শ্রেণীগত শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার ও নেতৃত্ব, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও কৌলীন্য, কায়েমী স্বার্থ এবং অর্জিত পদমর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা সবই বহাল রাখতে হবে। এরপর তুমি যা করতে চাও কর। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন যদি এ শর্ত মেনে নিত, তবে তা আপনা থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যেত।

তাদের পক্ষ থেকে এই শর্তও আরোপ করা হয় যে, এই কোরআন বাদ দিয়ে তদস্থলে অন্য কোন কোরআন আনতে হবে অথবা তাতে এমন রদবদল করতে হবে, যাতে আমাদের দাবী দাওয়াও পূর্ণ হয়।

ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَٰذَا أَوْ

'এই কোরআন বাদ দিয়ে অন্য কোরআন নিয়ে এস, অথবা এতে রদবদল ঘটাও।' (সূরা ইউনুসঃ ১৫)

এর যে জবাব ওহীর ভাষায় রসূল সাঃ এর পক্ষ থেকে দেয়া হয়, তা হলোঃ 'আমি আমার নিজের খেয়াল খুশী মোতাবেক এ কোরআনকে বদলে ফেলবো, এ অধিকার আমার নেই। আমার কাছে যে ওহী আসে, তা ছাড়া অন্য কিছুর অনুসরন আমি করতে পারিনা। আমি যদি আমার প্রতিপালকের অবাধ্য হই, তাহলে আমাকে কেয়ামতের ভয়াবহ দিনের আযাব ভোগ করতে হতে পারে। যে ব্যক্তি নিজের মনগড়া কথাকে আল্লাহর বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তার চেয়ে বড় জালেম আর কে আছে?'

আপোষ মীমাংসার পথ বের করার জন্য ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীদের পক্ষ থেকে এ দাবীও করা হয় যে, তুমি তোমার আশপাশ থেকে সমাজের নিম্ন শ্রেণীর লোকগুলোকে বের করে দাও। যারা কাল পর্যন্ত আমাদেরই গোলাম ছিল তাদেরকে যদি বের করে দাও, তাহলে আমরা তোমার কাছে এসে বসতে পারি, তোমার উপদেশ শুনতে পারি। নচেৎ বর্তমান অবস্থায় আমরা তোমার কাছে আসতে পারিনা এবং তোমার কথাবার্তা শুনতে পারিনা। নিম্ন স্তরের লোকেরা আমাদের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অথচ তোমার ওখানে তারাই বড় বড় নেতা হয়ে জেঁকে বসে আছে। এই লোকদের সম্পর্কেই তারা বিদ্রূপ করে বলতো, এরাই নাকি রোম ও পারশ্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে ! মোশরেকদের মন যে ইসলামী আন্দোলনের খিদমতের জন্য অস্থির হয়ে গিয়েছিল, তা নয়। বরং তাদের উদ্দেশ্য এই ছিল যে, যে সব তাজা প্রাণ তরুণ সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা তুলে পাগলের মত ছুটে বেড়াচ্ছিল, যারা নিজেদের যাবতীয় স্বার্থ কুরবানী করে সব রকমের বিপদ মুসিবত হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছিল এবং যাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস এই পবিত্র লক্ষ্য অর্জনের কাজে নিবেদিত ছিল, তাদের উৎসাহ যেন ভেঙ্গে যায় এবং ইসলামী আন্দোলন যেন তাদের একনিষ্ঠ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

রসূল সাঃ এর মনে এই প্রতারণাপূর্ণ আপোষ প্রস্তাবের কোন প্রভাব পড়ার আগেই কোরআন তাকে সতর্ক করে দেয় যে, এটা ইসলামের শত্রুদের চিরচারিত একটা ধাপ্পাবাজী। পূর্ববর্তী সকল নবীর সাথেই এই ধাপ্পাবাজির আশ্রয় নেয়া হয়েছিল। সূরা হুদের ২৭নং আয়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত নূহ আঃ এর কাছেও অবিকল এই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সূরা আনআমের ৫২নং আয়াতে রসূল সাঃ কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, তুমি ইসলামের শত্রুদেরকে খুশি করার জন্য সকাল বিকাল আল্লাহর নাম জপধারী একনিষ্ঠ সাথীদের নিজের সান্নিধ্য থেকে দুরে সরিয়ে দিও না। সূরা শুয়ারার ২১৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে যে তোমার এইসব নিষ্ঠাবান অনুসারীদেরকে স্নেহের সাথে লালন করতে থাক। এমনকি সূরা আবাসের প্রথম দশ আয়াতে রসূল সাঃ কে শুধু এজন্য ভৎর্সনা করা হয়েছে যে, তিনি একজন প্রভাবশালী কাফেরের সাথে কথা বলার সময় নিজের একজন অন্ধ সাহাবীর প্রশ্ন করাকে অপছন্দ করেছিলেন।

একবার কট্টরপন্থী কোরায়েশ নেতৃবৃন্দের বৈঠকে এ প্রসঙ্গে চিন্তাভাবনা হচ্ছিল। সে সময় অপরপ্রান্তে রসূল সাঃ একাকী বসে ছিলেন। উতবা ইবনে রবীয়া বৈঠকে উপস্থিত কোরায়েশ নেতৃবৃন্দকে বললো, 'তোমরা যদি সম্মতি দাও তবে আমি মুহাম্মাদের সাথে গিয়ে কথাবার্তা বলি। আমি তার কাছে কয়েকটা বিকল্প ফরমুলা তুলে ধরবো, যার মধ্যে থেকে কোন একটা হয়তো সে গ্রহণ করবে। আমরা সেটা মেনে নিলে সে হয়তো আমাদের সাথে আর দ্বন্দ্ব-সংঘাত করতে চাইবেনা।' এটা স্পষ্টতই একটা আপোষের উদ্যোগ ছিল। কোরায়েশদের এ পর্যন্ত আসা সম্ভবত হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণ এবং ইসলামী আন্দোলনের দ্রুত বিস্তৃতির কারণেই সম্ভব হয়েছিল। উপস্থিত সকলের সম্মতিক্রমে উতবা গিয়ে রসূল সাঃ এর সাথে নিম্নরূপ কথা বলেঃ

'হে ভাতিজা, আমরা তোমাকে কতখানি মর্যাদা দিয়ে থাকই, তা তো তুমি জানই। সমগ্র গোত্রের মধ্যে তুমি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। বংশগতভাবেও তুমি বিশিষ্টতার দাবীদার।' এভাবে কিছুক্ষণ তোষামোদিতে পরিপূর্ণ কিন্তু বাস্তব ভূমিকা দেওয়ার পর উতবা একটু অনুযোগের সুরে বলল, 'তুমি জাতিকে খুবই উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছ। তাদের ঐক্যকে খণ্ড বিখন্ড করে দিয়েছ। তাদের নেতৃবৃন্দকে বেকুব ও নির্বোধ বলে আখ্যায়িত করছ। তাদের ধর্মের ও তাদের দেবদেবীদের খুঁত ধরেছ। তাদের অতীত পূর্বপুরুষদের বিধর্মী আখ্যায়িত করেছ। এবার আমার কথা শোনো। আমি যে কয়টা প্রস্তাব দিচ্ছি, তা নিয়ে তুমি চিন্তাভাবনা কর। হয়তো তার কোন একটা তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। রসুল সাঃ বললেন, ঠিক আছে। আপনি বলুন। আমি শুনবো। উতবা নিম্নোক্ত বিকল্প প্রস্তাবগুলো একে একে তুলে ধরলোঃ

'তোমার উদ্দেশ্য যদি ধনসম্পদ অর্জন করা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা তোমার জন্য এত ধনসম্পদ সংগ্রহ করে দেব, যাতে তুমি আমাদের সবার চেয়ে ধনবান হয়ে যাবে।

আর যদি তুমি এর দ্বারা নেতৃত্ব ও ক্ষমতা পেতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা ও সরদার নিযুক্ত করতে প্রস্তুত আছি। আমরা কোন ব্যাপারেই তোমার মতামত না নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব না।

তুমি যদি দেশে রাজা হতে চাও, আমরা তোমাকে রাজা বানাতেও প্রস্তুত।

আর যদি এর কারণ এই হয়ে থাকে যে, তোমার উপর কোন জিন ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে, এবং সেইসব অশিরীরী জীব তোমার উপর প্রবল হয়ে পড়েছে, তাহলে আমরা চাঁদা তুলে তোমার চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবো। এরপর তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে ভালো কথা, নচেৎ আমাদের অক্ষমতা প্রমাণিত হবে।'

এই আপোষমূলক প্রস্তাবগুলোতে বিভিন্ন ধরনের মনভাব ও ধ্যাণধারণার প্রতিফলন ঘটেছে। ইসলামী আন্দোলনের বিরোধীরা সাধারণত এসব ধ্যানধারনা পোষণ করতো। এই প্রস্তাবগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, তাদের দৃষ্টিতে দুটো সম্ভাবনাই ছিল। প্রথমত রসূল সাঃ হয়তো জাহেলী সমাজ ব্যাবস্থার সাথে এত বড় সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার উদ্যোগ সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে নিচ্ছেন না, বরং কোন ভূত প্রেতের প্রভাবে কিংবা অচেতন অবস্থায় নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, যদি তিনি সজ্ঞানে ও সচেতন অবস্থায় এ সব উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই রাজত্ব বা ক্ষমতা লাভই তার উদ্দেশ্য। যাহোক সব ক'টা প্রস্রাব শোনার পর রসূল সাঃ বললেন, 'ওহে অলীদের বাবা, আপনার কথা শেষ হয়েছে?' সে বলল, হাঁ। রসূল সাঃ বললেন এবার আমার বক্তব্য শুনুন। উতবা বলল, 'আচ্ছা বল, শুনি।' রসূল সাঃ সবক'টা প্রস্তাব একদিকে রেখে সূরা হা-মীম সিজদার শুরু থেকে পরতে শুরু করলেনঃ

'হা-মীম। এ হচ্ছে পরম দয়ালু ও করুণাময়ের প্রেরিত বাণী। এ হচ্ছে একটা সুলিখিত গ্রন্থ, যার প্রতিটি আয়াত সুস্পষ্ট। এ হচ্ছে আরবী ভাষায় রচিত কোরআন – বুদ্ধিমান লোকদের জন্য। এ গ্রন্থ বিশ্বাসীদের সুসংবাদদাতা এবং অবিশ্বাসীদের দুঃসংবাদদাতা। কিন্তু ওদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং তারা কর্ণপাত ই করেনা। তারা বলে যে, আমাদের মন এ সব তত্ত্বের বিরোধী, যার দিকে তুমি আমাদের ডাকছ। আর আমাদের কানে রয়েছে ভারী ঢাকনা এবং আমাদের ও তোমাদের মধ্যে রয়েছে একটা আড়াল। সুতরাং, তুমি নিজের কাজ করে যাও, আমরাও আমাদের কাজ করে যাব। (আয়াত ১-৫)

রসূল সাঃ যতক্ষণ শোনাতে লাগলেন, ততক্ষণ উতবা দুহাত পেছনে নিয়ে তার উপর হেলান দিয়ে নীরবে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো। সিজদার আয়াত এলে তিনি পড়া বন্ধ করে সিজদা করলেন। তারপর বললেন, 'ওলীদের বাবা, শুনলেন তো? এখন যা ভালো বোঝেন করুন।'

এরপর উতবা উঠল এবং তার সঙ্গীদের কাছে চলে গেল। তারা উতবার চেহারা দেখেই বলল, উতবার চেহারা বদলে গেছে। যাওয়ার সময় ওর চেহারা যেমন ছিল, এখন তেমন নেই। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে তারা জিজ্ঞাসা করলো, 'ব্যাপার কি?'

উতবা বললঃ

'ব্যাপার হলো, আমি এমন বানী শুনে এলাম, যা জীবনে আর কখন শুনিনি। আল্লাহর কসম, ওটা কবিতাও নয়, যাদুও নয়, জ্যোতিষীর কথাও নয়। হে কোরেশ জনমণ্ডলী, আমার কথা শোন। আমি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই বলছি, মুহাম্মদকে তার বর্তমান অবস্থায় ছেড়ে দাও এবং তার পেছনে লেগনা। আল্লাহর কসম, আমি যে বানী শুনেছি, তার দ্বারা নিশ্চয়ই বড় রকমের ফল ফলবে। আরবরা যদি মুহাম্মাদকে হত্যা করে, তবে অন্যদের দ্বারা তোমরা ওর কবল থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে। আর যদি সে আরবের রাজা হয়ে যায়, তাহলে তার রাজত্ব তোমাদেরই রাজত্ব এবং তার শক্তি তোমাদেরই শক্তি হবে। তখন তারই কল্যাণে তোমরা সবচেয়ে সৌভাগ্যশীল জাতিতে পরিণত হবে। (সীরাতে ইবানে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৩১৩-৩১৪)

উতবার এই বক্তব্য থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা যায়। প্রথমত, সেকালের আরবের বড় বড় বাগ্মী ও কবি সাহিত্যিকগণ কোরআনের ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব ও চমৎকারিত্বের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হত। দ্বিতীয়ত যতক্ষণ বিরোধীরা ইসলামের মূল দাওয়াতকে সরাসরি দাওয়াতদাতার মুখ থেকে না শুনতো, ততক্ষণই তারা নানা রকম বিষাক্ত অপপ্রচারে প্রভাবিত হতো এবং বিরোধীতার উপর অবিচল থাকতো। কিন্তু যখনই কেউ আসল দাওয়াতের কিছু অংশ সরাসরিভাবে শোনার সুযোগ পেয়েছে, অমনি তার মন তাকে গ্রহণ করেছে। তৃতীয়ত ওহীর বাণী সম্পর্কে মোশরেক সমাজের প্রত্যেক মেধাবী মানুষের ধারনা এই ছিল যে, এই বাণীর ভিত্তিতে বড় কোন বিপ্লব সংগঠিত হবেই। তারা এর অন্তরালে একটা পূর্নাঙ্গ বিপ্লবের দৃশ্য দেখতে পেত এবং অনুমান করতো যে, এই কলেমার ভিত্তিতে একটা সাম্রাজ্য এবং একটা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবেই।

কিন্তু উতবার কথা শুনে কোরায়েশদের মজলিশে ঠাট্টাবিদ্রূপ শুরু হয়ে গেল এবং অনেকেই বলল, 'ওলীদের বাবা, মুহাম্মাদ তো আপনাকেও যাদু করে দিয়েছে দেখছি।' উতবা বলল, 'ওর সম্পর্কে আমার যা অভিমত, তাতো বললামই। এখন তোমরা যা ভালো মনে কর, কর।'

এর কিছুদিন পর এ ব্যাপারে আরও একটি চেষ্টা করা হলো। একদিন সূর্যাস্তের পর কোরায়েশদের সকল বড় বড় সরদার কাবা শরীফের চত্বরে জমায়েত হলো। উতবা ইবনে রবীয়া, শায়বা ইবনে রবীয়া, আবু সুফিয়ান বিন হারব, নযর বিন হারিস, কানদা, আবুল বুখতারী, আসওয়াদ বিন মুত্তালিব, যাময়া বিন আসওয়াদ, ওলীদ বিন মুগীরা, আবু জাহল বিন হিশাম, আব্দুল্লাহ বিন উমাইয়া, আ'শ বিন ওয়ায়েন, নবীহ ও মুনাবিবহ বিন হুজ্জাজ, (বনুসাহম) এবং উমাইয়া বিন খালফ এরা সবাই এদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা রসূল সা. কে ডেকে পাঠালো। রসূল সা. একটা নতুন আশায় বুক বেধেঁ তাদের কাছে এলেন। কিন্তু তারা নতুন কিছু বললেন না। ইতিপূবে উতবা ইবনে রবীয়ার মাধ্যমে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি করলো। শুনে রসূল সা. নিম্নরূপ জবাব দিলেন‍ঃ ‘তোমরা যা বলছ, আমার ব্যাপারটা তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি যে দাওয়াত তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছি, তার উদ্দেশ্য ধনসম্পদ অর্জন, নেতৃত্ব ও সরদারী লাভ কিংবা রাজত্ব কায়েম করা নয়। আমাকে তো আল্লাহ তোমাদের কাছে নবী ও রসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি আমার কাছে কিতাব নাযিল করেছেন এবং আমাকে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা হবার আদেশ দিয়েছেন। সে অনুসারে আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নিদের্শাবলী পৌছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদের হিতাকাংখীর দায়িত্ব পালন করেছি। আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি, তা যদি তোমরা গ্রহণ কর, ‍তাহলে সেটা তোমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। আর যদি প্রত্যাখ্যান কর, তাহলে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় ধৈর্যের পরিচয় দেব, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে নিজের ফয়সালা জারী করেন। (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, পৃঃ 315)

এ জবাব শুনে তারা যখন দেখলো সামনে অগ্রসর হবার পথ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন নানা রকমের কূটতর্ক শুরু করলো। উদাহরণ স্বরূপ, তারা বললো‍: তুমি তো জান, আমাদের দেশটা বড়ই সংকীণ। এখানে পানি খুব কম এবং জীবন যাপন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তুমি আল্লাহকে বল তিনি যেন ঐ পাহাড়গুলো সরিয়ে দেন, আমাদের ভূখন্ডকে প্রশস্ত করে দেন এর উপর ইরাক ও সিরিয়ার মত নদনদী সৃষ্টি করেন। তাঁকে বল, তিনি যেন আমাদের বাপদাদাদের জীবিত করে দেন, বিশেষত কুসাই বিন কিলাবকে যেন অবশ্যই জীবিত করেন। কেননা তিনি খুব সত্যবাদী ছিলেন এবং তাকে আমরা জিজ্ঞেস করবো তোমার দাওয়াত সত্য না মিথ্যা। এভাবে যদি আমাদের পূবপুরুষরা একে একে জীবিত হয়ে তোমার দাওয়াতকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেয় এবং আমরা যা যা দাবি করছি, তা তুমি করে দেখাও, তাহলে আমরা মেনে নিব যে, তুমি আল্লাহর রসূল। আর ‍যদি তা না কর, তাহলে ‍আমাদের উপর তুমি আযাবই নামিয়ে আনো’। রসূল সা. এইসব অসম্ভব দাবী-দাওয়ার জবাবে এই কথাই বারংবার বলেছেন যে, ’আমি এসবের জন্য প্রেরিত হইনি’। অবশেষে রসূল সা. যখন বাড়ীর দিকে ফিরে চললেন, তখন তাঁর ফুফাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও তাঁর সাথে সাথে চললো। সে বললো তোমার গোত্রের লোকেরা তোমাকে কতকগুলো সুযোগ সুবিধা দিতে চাইল। কিন্তু তুমি তার একটি ও গ্রহণ করলেনা। এখন তো আল্লাহর কসম, আমি তোমার উপর আর ঈমান আনছিনে, এমনকি তোমাকে আকাশের উপর সিঁড়ি লাগিয়ে সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠিয়ে যেতে দেখলে ও নয়। আবার তোমাকে ‍যদি আকাশ থেকে নেমে আসতে স্বচোক্ষে দেখি এবং তোমার সাথে চার চারজন ফেরেশতা এসে ও যদি তোমার সত্যতার স্বপক্ষে স্বাক্ষ্য দেয়, তবুও নয়। আল্লাহর কসম, আমি যদি ঈমান আনিও, তবুও আমার আদৌ মনে হয়না যে, আমি সত্যিই তোমার সমথকে পরিণত হয়ে যাবো। (সীরাত ইবনে হিশাম)

এরপর রসূল সা. খুবই মর্মাহত হয়ে বাড়ী ফিরে এলেন।

এ ধরণের আরো একটি ঘটনা ঘটে তায়েফ সফরের পর। রসূল সা. এই সময় মক্কা থেকে বেরিয়ে পার্শ্ববতী বনুকান্দা, বনু হানিফা ও অন্যান্য গোত্রে দাওয়াত ও প্রচারের কাজ শুরু করেন। বনু আমের গোত্রে যখন দাওয়াত দিতে গেলেন, তখন ঐ গোত্রের সদার বুখায়রা বিন ফিরাসের সাথে দেখা করলেন। বুখায়রা রসূল সা. এর দাওয়াত শুনলেন। তারপর নিজের সমর্থকদের বললেন‍ঃ ’আল্লাহর কসম কোরায়শ গোত্রের এই যুবককে আমি যদি পেতাম, তাহলে আমি তার মাধ্যমে গোটা আরব জয় করে ফেলতাম।’ তারপর সে রসূল সা. কে জিজ্ঞেস করলো, আমরা যদি এই দাওয়াত গ্রহণ করি, এবং তুমি যদি তোমার বিরোধীদের উপর জয়যুক্ত হও, তাহলে তোমার পরে ইসলামের যাবতীয় কতৃত্ব কি আমার হাতে চলে আসবে?

ভেবে দেখার বিষয় হলো, প্রাথমিক সংক্ষিপ্ত ‍দাওয়াত পাওয়া মাত্রই ঐ ব্যক্তির মনে ধারণা জন্মে গিয়েছিল যে, এ দাওয়াত এক বিপ্লব সৃষ্টিকারী দাওয়াত। এর বিজয় হওয়ার সম্ভাবনা ও রয়েছে এবং বিজয়ী হলে তা তাদের স্বাথোদ্ধারেরও সহায়ক হবে। এ সব ধারণার কারণেই বুখায়রার মনে ব্যবসায়ী সুলভ মনোভাব ‍সৃষ্টি হয়ে যায়। কিন্তু রসুল সা. তো স্রেফ দাওয়াতদাতা ছিলেন। তিনিতো আর রাজনৈতিক ব্যবসা খুলে বসেননি। তাই তিনি জবাব দিলেনঃ

‘এটাতো আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আমার পরে তিনি যাকে চাইবেন নিযুক্ত করবেন।‘

বুখায়রা বললোঃ

’বেশ তো! আজ আমরা সমগ্র আরববাসীর সাথে লড়াই করবো। তারপর যেই তোমার স্বাথ উদ্ধার হয়ে যাবে, তখন অন্যেরা সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেবে। তুমি যাও। আমাদের এ ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই।’ (রহমাতুল্লিল আলামীন, প্রথম খন্ড, পৃঃ-89)

রসূল সা. যদি কোন অরাজনৈতিক বক্তা হতেন অথবা সুফীবাদী বা পীরীমুরিদী কায়দায় সমাজের নৈতিক পরিশুদ্ধির কাজে আত্মনিয়োগ করতেন, তাহলে সিদেসাধাভাবে জবাব দিতেন যে, ’আরে মিয়া, তুমি এ সব কি স্বপ্ন দেখছ? এতো আল্লাহ ওয়ালাদের সংস্কারমূলক কাজ। এতে স্বাথ ও সুযোগ-সুবিধার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? কিভাবেই বা কথা ওঠে স্থলাভিষিক্ত হবার বা নেতৃত্ব ও সরদারী লাভের? রসূল সা. নিজেও যেমন জানতেন তাঁর আন্দোলন কত সুদূর প্রসারী এবং তাঁর রাজনৈতিক সম্ভাবনাই বা কতখানি। তেমনি যার সাথে তিনি কথা বলতেন সেও টের পেয়ে যেত এ দাওয়াতের শেষ গন্তব্য কোথায়।

এই সব রকমারী আপোষ-প্রচেষ্টা থেকে বিরোধী শক্তি যে সুবিধাটা বাগাতে চেয়েছিল তা হলো, রসূল সা. যদি আন্দোলনে নিরাপদে অগ্রসর হওয়ার পথ বের করা বা নির্যাতন থেকে সংগীদের বাচাঁনোর জন্য আপোষ করতে রাজী হয়ে যান, তাহলে আদশবাদী আন্দোলন হিসেবে তাঁর দাওয়াতের শক্তি চূর্ণ হয়ে যাবে। আর যদি তিনি আপোষহীনতার পরিচয় দেন, তাহলে প্রচারণা চালানো যাবে যে, দেশবাসী দেখে নাও, আমরা দ্বন্দ্ব কলহ মেটানোর জন্য কত সুযোগ সুবিধা দিতে চাইলাম এবং কত উপায় বের করলাম, কিন্তু এই ব্যক্তি এমন হঠকারী যে, কোন সমাধানকেই সে গ্রহণ করলো না। বাস্তবিকই রসূল সা. এর অবস্থানটা ছিল খুবই স্পশকাতর। তাই কোরআন এই সব আপোষ ফর্মূলার মোকাবিলায়

রসূল সা. কে দৃঢ়তা প্রদর্শনের জন্য ক্রমাগত সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে থাকে। এমনকি এক জায়গায় তো অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বিরোধীদের এই ধোকা থেকে আত্মরক্ষা করার নিদেশ দেয়া হয় এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংরক্ষণের আশ্বাসও দেয়া হয়।

সূরা বানী ঈসরাঈলের ৭৪ ও৭৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন‍ঃ

’আমি যদি তোমাকে দৃঢ়তা দান না করতাম, তাহলে বিচিত্র নয় যে, তুমি তাদের প্রতি খানিকটা নমনীয় হয়ে যেতে। তা যদি হতে, তাহলে আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখেরাতে দ্বিগুণ শাস্তির মজা ভোগ করিয়ে দিতাম। তখন তুমি আমার মোকাবেলায় কাউকে সাহায্যকারী পেতেনা। ‘

মোটকথা, অত্যধিক বিচক্ষণতা, কুশলতা ও ধৈয্য-সহিঞ্চুতা দ্বারা রসূল সা. আন্দোলনকে এসব সওদাবাজী থেকে রক্ষা করেছেন।

 

সহিংসতার চরম রূপ

ইসলামের শত্রুরা চিরকালই উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে অসৎ এবং যুক্তির দিক দিয়ে ‍অসার ও দেউলে হয়ে থাকে। তাদের আসল সমস্য হয়ে থাকে স্বার্থপরতা ও গদির নেশা। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে কেউ ময়দানে নামলেই তারা সর্বশক্তি নিয়ে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং যুক্তি-প্রমাণের জবাব দেয় সহিংসতা সন্ত্রাস ও গুন্ডামী দিয়ে। ইসলামী আন্দোলন মানবীয় বিবেক বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির বলে কাজ করে। কিন্তু ইসলাম বিরোধীরা ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আবেগ উত্তেজনা দিয়ে এর গতি রোধে সচেষ্ট হয়। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য কোন শক্তি যদি সামান্যতম তৎপরতাও চালায়, তবে তাকে সমাজ ব্যবস্থার ধারক ও বাহকদের হাতে মার খেতে হয়। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত যে সুদূরপ্রসারী ও সর্বাত্মক পরিবতনের আহবান জানায়, তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে প্রচলিত রাষ্ট্র ও সমাজের কর্ণধাররা এক ধরণের তীব্র উম্মত্ততায় ভোগে। মক্কায় এই অবস্থাটাই দেখা দিয়েছিল। যদিও প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনার সাথে সাথেই সহিংসতা ও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ক্রমান্বয়ে জাহেলিয়াতের হিংস্রতা ও মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। পাচঁ ছয় বছরের মধ্যে মক্কা ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য একটা জ্বলন্ত চুলোয় পরিণত হলো। হযরত খাদীজা ও জনাব আবু তালেবেরে ইন্তেকালের পর এই চুলোর দহনশক্তি আরো তীব্র ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। কম হোক, বেশী হোক, এই চুলোয় দগ্ধ হওয়া থেকে কেউই রেহাই পায়নি। এই চুলোয় দগ্ধ হয়ে ও তপ্ত হয়ে ও গলে গলে তাঁরা খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। এই চুলোর আঁচের সবচেয়ে বড় অংশ আন্দোলনের নেতা যদিও মুহাম্মদ সা. নিজেই ভোগ করেন, কিন্তু তাঁর সহচররা ও কম ভোগ করেননি। সাহাবায়ে কেরামের উপর পরিচালিত এই ভয়ংকর নিযাতনের কথা ইতিহাস থেকে আমরা খুব কমই জানতে পারি। তথাপি ইতিহাস থেকে যেটুকু জানা যায়, তাও লোমহষক। এখানে আমি ইসলামের দুশমনদের পরিচালিত এই নিযাতনের কিছু সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি।

সরাসরি রসূল সা. এর ওপর তো প্রতি মুহুর্তেই রকমারি যুলুম চালানো হতো। কিন্তু তাঁর সহচরবৃন্দকে যে যন্ত্রণা দেয়া হতো, তাও পরোক্ষভাবে রসূল সা. এর সংবেদনশীল মনকে ও ফোঁড় ও ফোঁড় করে দিত। এবার লক্ষ্য করুন কার ওপর কেমন নিযাতন চলেছে।

খাব্বাব ইবনুল আরত তামীমীকে জাহেলিয়তের যুগে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। উম্মে নুমার নাম্নী এক মহিলা তাকে খরিদ করে নেয়। হযরত আরকামের বাড়ী যখন ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এবং সেখান থেকেই রসূল সা. সমস্ত সাংগঠনিক কাযক্রম পরিচালনা করতেন, তখনই হযরত খাব্বার ইসলাম গ্রহণ করেন। কোরায়েশরা জ্বলন্ত অঙ্গার বিছিয়ে তাকে সেই আগুনের বিছানায় শুইয়ে দিত। সংগে সংগে একজন মানুষ ও বুকের উপর দাড়িয়ে যেত, যাতে খাব্বার পাশ ফিরে শুতে না পারে। শেষ পযন্ত পিঠের নিচেই অংগারগুলো নিভে যেত। পরবতীকালে খাব্বার রা. হযরত ওমর রা. কে একবার নিজের পিঠ দেখালে তিনি কুষ্ঠের ন্যায় সাদা সাদা দাগ দেখতে পান। পেশায় তিনি একজন কামার ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি যখন বিভিন্ন লোকের কাছে নিজের পাওনা চান, তখন তারা জবাব দেয়, যতক্ষণ পযন্ত মুহাম্মদ সা. এর সাথে সম্পক ছিন্ন না করবে, ততক্ষণ এক পয়সা ও পাবে না। এভাবে তার উপর অথনৈতিক নিষ্পেষণ চালানো হচ্ছিল। কিন্তু এই সত্যের সৈনিক জবাব দিলেন, এটা আমার পক্ষে কখনো সম্ভব নয়।

কৃষ্ণাংগ হযরত বিলাল ছিলেন উমাইয়া বিন খালাফের ক্রীতদাস। সূয ঠিক মাথার উপর এলে আরবের উত্তপ্ত মরুভূমির বালুর উপর তাকে শুইয়ে দেয়া হতো এবং বুকের উপর ভারী পাথর দিয়ে রাখা হতো, যাতে তিনি পাশ ফিরে শুতে না পারেন। উমাইয়া তাকে বলতো, ইসলাম থেকে ফিরে আস, নচেত এভাবেই খতম হয়ে যাবে। হযরত বিলাল রা. এর জবাবে চিৎকার করে শুধু ’আহাদ’ ’আহাদ’ (আল্লাহ এক, আল্লাহ এক) বলতেন। এতে উমাইয়ার রাগ আরো বেড়ে যেত। সে তাঁর গলায় দড়ি বেঁধে শহরের উচ্ছৃংখল ছেলেদেরকে তার পেছনে লেলিয়ে দিত। তারা তাকে গলিতে গলিতে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতো। কিন্তু এই নিবেদিত প্রাণ আল্লাহ প্রেমিক সেই অবস্থায়ও উচ্চস্বরে ‘আহাদ আহাদ’ ঘোষণা করে যাচ্ছিলেন। কখনো তাকে গরুর চামড়ায় জড়িয়ে আবার কখনো লোহার বর্ম পরিয়ে প্রখর রৌদ্রে বসিয়ে দেয়া হতো। হযরত আবু বকর রা. অন্য একটা ক্রীতদাসের বিনিময়ে তাকে খরিদ করে মুক্ত করে দেন।

আম্মার বিন ইয়াসার ছিলেন কাহতান বংশোদ্ভুত। তাঁর পিতা ইয়াসার ইয়ামান থেকে নিজের দু‘ভাইকে সাথে নিয়ে হেজাজে এসেছিলেন তাদের অপর এক হারানো ভাইকে খুঁজতে। দু‘ভাই পরে ইয়ামানে ফিরে যান। কিন্তু ইয়াসার আবু হুযাইফা মাখযুমীর সাথে মৈত্রী স্থাপন পূবক মক্কায়ই থেকে যান এবং এখানেই বিয়ে করেন। ইয়াসার সহ তার পুরো পরিবার পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় আম্মার বিন ইয়াসারের কোন স্বপক্ষীয় না থাকায় তার ওপর ভীষণ অত্যাচার চালানো হতো। ইসলাম গ্রহেণের শাস্তি স্বরূপ তাকেও তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে দেয়া হতো। কোরায়েশরা তাকে মারতে মারতে বেহুঁশ করে ফেলতো। তার ‍পিতামাতার উপর ও একই রকম শারীরিক নিযাতন চালানো হতো। তাকে পানিতে ডুবানো হতো। জ্বলন্ত অংগারের ওপরও শোয়ানো হতো। রসূল সা. তাঁর মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন এবং বেহেশতের সুসংবাদ শোনাতেন। হযরত ‍আলীর রা. বণনা মোতাবেক রসূল সা. বলতেন, আম্মারের মাথা থেকে পা পযন্ত ঈমানে পরিপূণ। হযরত আম্মারের মা হযরত সুমাইয়া রা. কে ইসলাম গ্রহণের অপরাধে হত্যা করা হয়।

আবু জাহল স্বয়ং বর্শার আঘাতে অত্যন্ত পাশবিক পন্থায় তাকে হত্যা করে। ইসলামের এটাই প্রথম শাহাদাতের ঘটনা। হযরত আম্মারের বাবা হযরত ইয়াসার ও নির্যাতনের চোটে শহীদ হয়ে যান।

সুহায়েব ও আম্মারের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাকে এত নিমমভাবে প্রহার করা হতো যে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন। হিজরতের সময় কোরায়শরা তার সমস্ত সহায় সম্বল তাদেরকে দিয়ে যেতে হবে এই শর্তে তাঁকে হিজরত করার অনুমতি দেয়। সুহায়েব রা. এই শর্ত সানন্দে মেনে নেন এবং খালি হাতে মদীনায় চলে যান।

আবু ফুকইহা সুহালী ছিলেন সাফওয়ান বিন উমাইয়ার ক্রীতদাস। তিনি ইসলাম গ্রহণে হযরত বিলালের সমসাময়িক ছিলেন। একবার তার বুকের উপর এত ভারী পাথর চাপা দেয়া হয় যে, তার জিভ বেরিয়ে পড়ে। কখনো তাকে লোহার বেড়ি পরিয়ে তপ্ত বালুর ওপর উপুড় করে শুইয়ে দেয়া হতো। হযরত আবু বকর রা. তাকে ও কিনে স্বাধীন করে দেন।

হযরত ওমরের রা. ইসলাম গ্রহণের পূবে তাঁর পরিবারে লুবাইনা নাম্নী এক দাসী ছিল। ওমর রা. তাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। তারপর বলতেন, তোকে দয়া করে নয়, বরং ক্লান্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছি।

হযরত ওমরের পরিবারের আর এক দাসী ছিল যুনাইরা। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে তাকে ও হযরত ওমর রা. অত্যন্ত নিমমভাবে প্রহার করতেন। আবু জাহল একবার তাকে পেটাতে পেটাতে চোখ নষ্ট করে দেয়। তবে একটি বণনা থেকে জানা যায় যে, ঈমানের বরকতে আল্লাহ তায়ালা অচিরেই তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীক তাকে ও কিনে স্বাধীন করে দেন।

নাহদিয়া ও উম্মে উবাইস নামক দুটো দাসী ও ইসলাম গ্রহণের কারণে কঠোর নির্যাতন সহ্য করে।

হযরত ওসমানের বয়সের দিক দিয়ে ও সম্মানাহ ছিলেন এবং প্রচুর ধনসম্পদ ও পদমযাদার অধিকারী ছিলেন। তবুও তিনি ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর আপন চাচা তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে মারে।

হযরত আবু যর ইসলাম গ্রহণ করা মাত্রই কা‘বা শরীফে এসে ঘোষণা দেন। সংগে সংগে কোরায়েশ সন্ত্রাসীরা তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মারতে মারতে ধরাশায়ী করে দেয়।

হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে তাঁর চাচা ইসলাম গ্রহণের শাস্তি স্বরূপ চাটাইতে জড়িয়ে নাকে ধূঁয়া দিতেন। কিন্তু তিনি পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে বলতেন, ’কোন অবস্থায়ই আমি কুফরির দিকে ফিরে আসবো না।’

আপন চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়েদ ইসলাম গ্রহণ করলে হযরত ওমর রা. তাকে রশী দিয়ে বেঁধে রাখেন।

সাইদ বিন ওয়াক্কাসও অসহনীয় নির্যাতন ভোগ করেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ইসলাম গ্রহণের পর সবপ্রথম কা’বা শরীফের চত্তরে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করেন। সূরা রহমান তেলাওয়াত শুরু করতেই কাফেররা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখের ওপর উপর্যুপরি ঘুষি মারতে থাকে। কিন্তু তারপরও তিনি তেলাওয়াত অব্যাহত রাখেন এবং আহত মুখমণ্ডল নিয়ে বাড়ী ফিরে আসেন।

উসমান ইবনে মাযঊন প্রথমত ওলীদ বিন মুগীরার আশ্রয়ে থাকার কারণে নিরাপদে ছিলেন। কিন্তু রসূলের সা. সাহাবীদের ওপর ভয়ংকর যুলুম নির্যাতন হতে দেখে তিনি অনুভব করেন যে, আমার সাথীরা যখন এত নির্যাতন ভোগ করছে, তখন আমি একজন মোশরেকের আশ্রয়ে থেকে নিরাপদ জীবন যাপন করবো কেন? তিনি ওলীদ বিন মুগীরাকে বললেন, আমি আপনার আশ্রয় ফিরিয়ে দিচ্ছি। ওলীদ তাকে বুঝালো যে, ‘ভাতিজা, আমার আশংকা হয়, কেউ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারে।’ তিনি বললেন, ‘না, আমি তো আল্লাহর আশ্রয়ে থাকবো। তাঁর ছাড়া আর কারো আশ্রয় আমার পছন্দ নয়।’ কা’বা শরীফে গিয়ে তিনি ওলীদ বিন মুগীরার আশ্রয় ফেরত দেয়ার ঘোষণা দিলেন। তারপর কোরায়েশদের মজলিসে গিয়ে বসলেন। সেখানে কবি লবীদ স্বরচিত কবিতা পড়ছিল। সে যখন পড়লোঃ ‘‘আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুই বাতিল’’ তখন উসমান বললেন, তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু লবীদ যখন এর পরবর্তী চরণ পড়লো, ‘‘সমস্ত নিয়ামত ধ্বংসশীল’’ তখন উসমান বললেন, এ কথাটা তুমি ভুল বলেছ। বেহেশতের নিয়ামত কখনো ধ্বংস হবে না।’ লবীদের মাথায় খুন চড়ে গেল। সে চারদিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলো, কে তার ভুল ধরার ধৃষ্টতা দেখালো। লবীদ বললো, ‘ওহে কোরায়েশ জনমন্ডলী, তোমাদের সহযোগী কবির সাথে এমন বেআদবী কে করলো? একজন বললোঃ ‘এ হচ্ছে ধর্মচ্যুত জনৈক বেকুফ। ওর কথা গায় মাখিও না।’ উসমান চুপ থাকতে পারলো না। তিনি তার কথার যুৎসই জবাব দিলেন। এতে ঐ লোকটি উঠে উসমানকে এমন জোরে থাপ্পড় দিল যে, তার চোখ নষ্ট হয়ে গেল।’ এ দৃশ্য দেখে ওলীদ বিন মুগিরা বললো, তুমি আমার আশ্রয়ে থাকলে আজ এভাবে চোখ খোয়াতে না। উসমান বললেন, আমার যে চোখটা অক্ষত আছে, তাও হারাতে রাযী আছি। আমি যার আশ্রয়ে আছি, তিনি তোমার চেয়েও প্রতাপশালী ও শক্তিশালী।

হযরত আবু যর গিফারী ইসলাম গ্রহণের পর বিপ্লবী প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে সরাসরি হারাম শরীফে উপনীত হলেন এবং সেখানে উচ্চস্বর নিজের নতুন আকীদা-বিশ্বাস ঘোষণা করলেন। কোরায়েশরা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো, এই ধর্মত্যাগীকে পেটাও। অমনি মারপিট শুরু হয়ে গেল। তাকে মেরে ফেলাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু রসূলের সা. চাচা আব্বাস ঘটনাক্রমে ওখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, আরে এ তো গিফার গোত্রের লোক। তোমাদের বাণিজ্যোপলক্ষে ওদের এলাকা দিয়েই যেতে হয়। একটু সাবধানে কাজ কর।’ অগত্যা কোরায়েশরা সংযত হলো। পরের দিন তিনি আবারো নিজের ইসলামী আকীদা বিশ্বাস ঘোষণা করলেন এবং আবারো গণপিটুনি খেলেন।

হযরত উম্মে শুরাইক ইসলাম গ্রহণ করলে তার আত্মীয় স্বজন তাকে প্রখর রোদে দাঁড় করিয়ে দিলেন। এ সময় তাকে খাবার জন্য রুটির সাথে মধু দিত এবং পানি খেতে দিতনা, যাতে গরম বেশি অনুভূত হয় এবং দ্বিগুণ শাস্তি ভোগ করে। এ অবস্থায় এক নাগাড়ে তিন দিন কেটে গেল। চরম কষ্টের ভেতরে যখন তাকে বলা হলো, ইসলাম ত্যাগ কর, তখন তার বোধশক্তি অবশ হয়ে গিয়েছিল। তিনি বুঝতেই পারলেননা তাকে কি করতে বলা হচ্ছে। অবশেষে যুলুমবাজরা আকাশের দিকে ইংগিত দিয়ে বললো, আল্লাহর একত্ব অস্বীকার কর। এবার তিনি তাদের দাবী বুঝতে পেরে বললেন, আমি আমার আকীদা বিশ্বাসে অবিচল আছি এবং থাকবো।

খালেদ ইবনুল আ’স ইসলাম গ্রহণ করার পর তার বাবা তাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়। উপরন্তু তাকে ক্ষুধার শাস্তিও দেয়া হয়।

মোটকথা, এমন কেউ ছিলনা যাকে কঠিন অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়নি। হযরত উসমানের ন্যায় হযরত আবু বকর ও তালহাকেও রশী দিয়ে বেধে রাখা হয়। ওলীদ ইবনে ওলীদ, আইয়াশ বিন আবি রবীয়া এবং সালমা বিন হিশামকে কঠোর নির্যাতন করা হয় এবং তাদেরকে হিজরত করতেও বাধা দেয়া হয়। হযরত ওমর নিজের বোন ও ভগ্নিপতির ওপর যে নির্যাতন চালান তাও ছিল অমানুষিক। এর বিস্তারিত বিররণ পরে দেয়া হবে।

একদিকে এই ভয়াবহ নির্যাতন আর অপরদিকে ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহীদের দৃঢ়তা লক্ষ্য করুন। নারী-পুরুষ, দাস-দাসী, যে-ই একবার এই দাওয়াতকে গ্রহণ করেছেন, সে আর পিছু হটেনি। যুলুম-নির্যাতন কোন এক ব্যক্তিকেও ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করতে পারেনি। আমরা দেখতে পাই, সার্থক অর্থে একটা বিপ্লবী প্রেরণা তাদের অস্থিমজ্জায় সঞ্চালিত হয়েছিল। তাদের অতুলনীয় ধৈর্য কোরায়েশদের নিপীড়নমূলক স্বৈরাচারকে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। ইসলামের আহ্বানে যে-ই একবার সাড়া দিত, তার ভেতরে সম্পূর্ণ নতুন একটা মানুষ জন্ম নিত এবং তার বুকে নতুন শক্তি সঞ্চারিত হতো।

 

আবিসিনিয়ায় হিজরত

প্রতিটি বিপদ মুসিবতেরই একটা সহ্য সীমা থাকে। ইসলামী আন্দোলনের নিশানবাহীরা কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছিল, এবং তাতে তারা ধৈর্যের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, তা অবশ্যই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু যুলুম নির্যাতনের বিরতির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিলনা। বরং ক্রমেই তা জোরদার হচ্ছিল। রসূল সা. তাঁর সংগীদের দুরবস্থা দেখে মর্মাহত হতেন। কিন্তু তাঁর কিছুই করার ক্ষমতা ছিলনা। তাদের একমাত্র অবলম্বন ছিল আল্লাহর প্রতি আস্থা, আখেরাতে অবিচল ঈমান, সত্যের চূড়ান্ত বিজয়ের দৃঢ় আশা এবং আবেগভরা দোয়া। রসূল সা. তাঁর সাথীদের এই বলে প্রবোধ দিতেন যে, আল্লাহ কোন না কোন পথ অবশ্যই বের করবেন। বাহ্যত মক্কার পরিবেশ হতাশাব্যঞ্জক হয়ে উঠছিল এবং এমন কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না যে, ঐ অনুর্বর ভূমিতে ইসলামী আন্দোলনের পবিত্র বৃক্ষে কোন ফল জন্মাবে। পরিস্থিতি দেখে স্পষ্টতই মনে হচ্ছিল, মক্কায় ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনের সম্ভাবনা নেই, এ সৌভাগ্য হয়তো অন্য কোন ভূখন্ডের কপালে লেখা রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে আগেও হিজরাতের অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই অনুমিত হচ্ছিল যে, রসূল সা. ও তার সাহাবীদেরকেও হয়তো মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে হবে। একটা সর্বাত্মক মানব কল্যাণমূলক মতাদর্শের সূচনা যদিও একটা বিশেষ দেশ ও বিশেষ জাতির মধ্যেই হয়ে থাকে, কিন্তু তা জাতীয়তাবাদ বা আঞ্চলিকাতাবাদের সংকীর্ণতার উর্দ্ধে অবস্থান করে এবং তা কোন দেশ ও জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। কোন বিশেষ এলাকার মানুষ যদি অযোগ্য প্রমাণিত হয়, তবে তা অন্য কোন জনপদকে এই লক্ষ্যে মনোনীত করে। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অনুমতি বা নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত দাওয়াতের কেন্দ্রীয় ভূমিকে পরিত্যাগ করা নবীদের নীতি নয়। তা সত্ত্বেও রসূল সা.যুলুম ও ধৈর্যের সংঘাতকে এমন এক পর্যায়ের দিকে ধাবমান হতে দেখছিলেন, যেখানে সহনশীলতার মানবীয় ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। মুসলমানগণ ব্যাকুল ভাবে অপেক্ষা করছিলেন আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে। এরূপ পরিস্থিতিতে তিনি সাহাবীদের পরামর্শ দিলেন, ‘‘তোমরা দুনিয়ার কোন দেশে চলে যাও। আল্লাহ অচিরেই তোমাদের কোথাও একত্রিত করবেন।’’ তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, কোন্ দেশে যাবো? রসূল সা. আবিসিনিয়ার দিকে ইংগিত করলেন। ঐ দেশটার রাজা অপেক্ষাকৃত ন্যায়পরায়ণ এবং হযরত ঈসার আ. আদর্শের অনুসারী বলে রসূল সা. জানতেন। তাঁর ধারণা ছিল যে, ঐ দেশটাই হিজরতের উপযোগী। তিনি আবিসিনিয়া সম্পর্কে বললেন, ‘ওটা সততা ও ন্যায়পরায়ণতার দেশ’। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

নবুয়তের পঞ্চম বছর রসূল সা. এর বিপ্লবী দলের এগারো জন পুরুষ ও চারজন মহিলার কাফেলা হযরত উসমান ইবনে আফফানের নেতৃত্বে রাতের অন্ধকারে আবিসিনিয়া অভিমুখে রওনা হলো। হযরত উসমানের তাঁর মহীয়সী স্ত্রী অর্থাৎ রসূল সা. এর কন্যা রুকাইয়াও হিজরতের এই প্রথম সফরে সংগিনী হন। রসূল সা. এই মহান দম্পতি সম্পর্কে মন্তব্য করেনঃ হযরত লুত ও হযরত ইবরাহীমের পর এটাই আল্লাহর পথে মাতৃভূমি ত্যাগকারী প্রথম দম্পতি। (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া, রহমাতুল্লিল আলামীন)

এই কাফেলার গৃহত্যাগের খবর যখন কোরায়েরশরা জানতে পারলো, তৎক্ষণাত তারা তাদের পিছু ধাওয়া করতে লোক পাঠালো। কিন্তু জেদ্দা বন্দরে পৌঁছে জানতে পারলো, তাৎক্ষণিকভাবে নৌকা পেয়ে যাওয়ায় তারা এখন নাগালের বাইরে। এই মোহাজেররা খুব অল্প দিন (রজব থেকে শাওয়াল পর্যন্ত) আবিসিনিয়ায় থাকেন। তারা একটা গুজব শুনতে পান যে, কোরায়েশরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাই মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু মক্কার কাছাকছি পৌঁছেই জানতে পারেন, ঐ গুজব ছিল ভুল। এবারে দেখা দিল কঠিন সমস্যা। কেউ লুকিয়ে এবং কেউ বিভিন্ন ব্যক্তির সহায়তায় শহরে প্রবেশ করলো। এভাবে ফিরে আসার অনিবার্য পরিণাম স্বরূপ আগের চেয়েও প্রবলভাবে নির্যাতন হতে লাগলো।

এরপর আরেকটা বড় কাফেলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করলো। এ কাফেলায় ৮৫ জন পুরুষ ও ১৭ জন মহিলা ছিল। আবিসিনিয়ায় তারা নিরাপদ পরিবেশ পেলেন এবং নিশ্চিন্তে ইসলামী জীবন যাপন করতে লাগলেন।

এবার লক্ষ্য করুন, ইসলামের শত্রুদের আক্রোশ কত সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে। তারা একটা বৈঠকে মিলিত হয়ে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ আলোচনা চালালো। তারা স্থির করলো, আব্দুল্লাহ ইবনে রবীয়া ও আমর ইবনুল আ’সকে আবিসিনিয়ার রাজার কাছে দূত করে পাঠাবে। দূতদ্বয় রাজার সাথে আলোচনা করে মোহাজেরদের ফিরিয়ে আনবে। এ উদ্দেশ্যে নাজ্জাশী ও তার সভাসদদের জন্য মূল্যবান উপঢৌকন প্রস্তুত করা হলো এবং বিপুল জাঁকজমকের সাথে দূতত্বয় রওনা হলো। আবিসিনিয়া পৌঁছে তারা সভাসদ ও পাদ্রীদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো এবং তাদের ঘুষ দিল। তারা তাদেরকে বুঝালো যে, আমাদের দেশে কয়েকজন বেয়াড়া লোক একটা ধর্মীয় গোলযোগ সৃষ্টি করেছে। ওরা আমাদের পৈতৃক ধর্মের জন্য যতটা বিপজ্জনক, ঠিক ততটা বিপজ্জনক আপনাদের ধর্মের জন্যও। আমরা ওদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার পর ওরা আপনাদের এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ওদেরকে এখানে থাকতে দেয়া উচিত নয়। এ উদ্দেশ্যে আপনারা আমাদের সহযোগিতা কররুন। তারা চেষ্টা চালিয়েছিল যাতে দরবারে পুরো ঘটনা নিয়ে আলোচনাই না হতে পারে, মোহাজেররা আদৌ কথা বলারই সুযোগ না পায় এবং রাজা কোরায়েশ দূত দ্বয়ের একতরফা কথা শুনেই মোহাজেরদেরকে তাদের হাতে সমর্পণ করেন। এ উদ্দেশ্যে ঘুষ ও গোপন যোগসাজশের পথ অবলম্বন করা হয়। সভাসদদের নেপথ্যে বশীকরণের পর তারা উপঢৌকনাদি নিয়ে নাজ্জাশীর সামনে উপস্থিত হয়। তারা নিজেদের আগমণের উদ্দেশ্যে এভাবে ব্যাখ্যা করে, মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ আমাদেরকে আপনার দরবারে এই আবেদন পেশ করার জন্য পাঠিয়েছেন যে, আপনি আমাদের লোকগুলোকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন। সভাসদ ও পাদ্রীরা তাদের আবেদনকে সংগে সংগেই সমর্থন করলো। কিন্তু নাজ্জাশী একতরফা দাবীর ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন, মোহাজেরদের বক্তব্য না শুনে আমি তাদেরকে তোমাদের হাতে সমর্পন করতে পারি না।

পরদিন দরবারে উভয় পক্ষকে ডাকা হলো। মুসলমানদের কাছে যখন নাজ্জাশীর আহ্বান পৌঁছলো, তখন তারা পরামর্শে বসলেন। তারা আলোচনা করলেন, রাজা তো খৃষ্টান, আর আমরা আকীদা বিশ্বাসে ও রীতিনীতিতে তার সাথে ভিন্ন মত পোষণ করি। এমতাবস্থায় তার কাছে আমরা কি বলবো? আলাপ আলোচনার পর তাঁরা স্থির করলেন যে, রসূল সা. আমাদের যা যা শিখিয়েছেন, আমরা হুবহু তাই বলবো, তা থেকে চুল পরিমাণও ভিন্ন কিছু বলবো না। এতে পরিণাম যা হয় হোক। ভেবে দেখুন, তাঁদের ঈমান কত মজবুত ছিল। কঠিন অবস্থায়ও সত্য ও সততার ওপর অবিচল থাকাই আল্লাহর বিধান। এরপর যখন মোহাজেররা দরবারে পৌঁছলেন, তখন প্রচলিত রীতি অনুসারে নাজ্জাশীকে সিজদা করলেন না। সভাসদরা এতে আপত্তি তুলে জিজ্ঞেস করলো, তোমরা সিজদা করলে না কেন? মোহাজেরদের মুখমাত্র হযরত জাফর জবাব দিলেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করিনা। এমনকি স্বয়ং রসূল সা. কেও আমরা সাদাসিদাভাবে শুধু সালামই করি। লক্ষ্য করুন যে, কী নাজুক পরিস্থতিতে প্রকৃত তাওহীদের এই দুঃসাহসিক অভিব্যক্তি ঘটানো হচ্ছিল। যে শক্তির সামনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রেখে চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছিল, সেই শক্তির সামনেই তারা অকুতোভয়ে আদর্শবাদী একনিষ্ঠতার পরিচয় দিলেন।

এবার মক্কার দূতদ্বয় তাদের দাবী পেশ করলো যে, এই মোহাজেররা আমাদের দেশের পলাতক আসামী। তারা একটা নতুন ধর্ম উদ্ভাবন করেছে এবং তার ভিত্তিতে একটা সর্বনাশা তান্ডবের সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই ওদেরকে আমাদের হাতেই সোপর্দ করা হোক। নাজ্জাশী মুসলমানদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের ব্যাপার কী? তোমরা কি খৃষ্টবাদ ও পৌত্তলিকতা ছাড়া তৃতীয় কোন ধর্মকে গ্রহণ করেছ?

মুসলমানদের মুখপাত্র হিসাবে হযরত জাফর উঠে দাঁড়ালেন এবং নাজ্জাশীর কাছে এই মর্মে আবেদন জানালেন যে, তিনি প্রথমে মক্কার দূতদ্বয়ের কাছে কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চান। তাকে এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করার অনুমতি দেয়া হোক। নাজ্জাশীর অনুমতি লাভের পর তিনি নিম্নরূপ জিজ্ঞাসাবাদ করলেনঃ

হযরত জা’ফরঃ আমরা কি মক্কায় কারো ক্রীতদাস ছিলাম যে, আমরা আমাদের মনিবের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে তো আমাদের অবশ্যই ফেরত পাঠানো উচিত।

আমর ইবনুল আসঃ না, তোমরা ক্রীতদান নও, স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত।

হযরত জা’ফরঃ আমরা কি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এসেছি? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী বা অভিভাবকদের কাছে ফেরত পাঠানো উচিত।

আমর ইবনুল আ’সঃ না, তোমরা এক ফোঁটা রক্তও প্রবাহিত করনি।

হযরত জা’ফরঃ আমরা কি কারো ধনসম্পদ চুরি করে এসেছি? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেই পাওনা পরিশোধ করতে প্রস্তুত।

আমর ইবনুল আ’সঃ না তোমাদের কাছে কারো এক পয়সাও পাওনা নেই।

এই জেরার মাধ্যমে যখন মুসলমানদের নৈতিক অবস্থা ও মান সুস্পষ্ট হয়ে গেল, তখন হযরত জা’ফর নিম্নরূপ ভাষণ দিলেনঃ

‘‘হে রাজা, আমরা একটা মূর্খ ও অজ্ঞ জাতি ছিলাম। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মরা জন্তুর গোশত খেতাম, ব্যভিচার করতাম, প্রতিবেশিকে কষ্ট দিতাম, ভাইয়ে ভাইয়ে যুলুম অত্যাচার করতাম, এবং আমাদের সবলেরা দুর্বলদের শোষণ ও নিপীড়ন করতো। এমতাবস্থায় আমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি জন্ম নিল যার সততা ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদিতা ও ভদ্রতা সম্পর্কে আমরা আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং আমাদেরকে পাথর পূজা পরিত্যাগ করা, সত্য কথা বলা, রক্তপাত বন্ধ করা, এতীমদের সম্পদ আত্মসাত না করা, প্রতিবেশীর সেবা ও উপকার করা, সতী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা না করা, নামায পড়া, রোযা রাখা ও দানসদকা করার শিক্ষা দিলেন। আমরা তাঁর ওপর ঈমান আনলাম, পৌত্তলিকতা ছেড়ে দিলাম, এবং সমস্ত খারাপ কাজ বর্জন করলাম। এই অপরাধে আমাদের গোটা জাতি আমাদের শত্রু হয়ে গেল। তারা আমাদেরকে আগের সেই গোমরাহীতে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে। এই পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের ঈমান ও জান বাঁচানোর জন্য আপনার রাজ্যে পালিয়ে এসেছি। আমাদের জাতি যদি আমাদেরকে মাতৃভূমিতে থাকতে দিত, তাহলে আমরা আসতাম না। এই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত অবস্থা।’’

কথা যদি সত্য হয় এবং বক্তা যদি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা সহকারে তা বলে, তবে শ্রোতার মনে তা প্রভাব বিস্তার না করে পারে না। নাজ্জাশীর মত খোদাভীরু রাজার মন গলে গেল। তিনি বললেন, তোমাদের ওপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে, তার কিছু অংশ আমাকে শোনাও তো দেখি। হযরত জা’ফর সূরা মরিয়মের প্রথম থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনালেন। আল্লাহর এই আয়াতগুলো শুনে রাজার মন আরো নরম হলো এবং তাঁর চোখে পানি এসে গেলো। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেনঃ “আল্লাহর কসম, এই বাণী এবং ইনজিল একই উৎস থেকে এসেছে।” তিনি আরো বললেন “মুহাম্মাদ (সাঃ) তো সেই রসূলই, যার ভবিষ্যদ্বাণী হযরত ঈসা (আঃ) করেছিলেন। আল্লাহর শোকর যে, আমি সেই রসূল (সাঃ) এর যুগটা পেয়ে গেলাম।” সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই রায়ও দিলেন যে, মোহাজেরদের ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত দরবারের কার্যক্রম শেষ হলো এবং দূতদ্বয় ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল। পরে তারা উভয়ে স্থির করলো যে, আর একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। নাজ্জাশী একজন খৃষ্টান। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলমানদের আকীদা বিশ্বাস দরবারে তুলে ধরলে বিচিত্র নয় যে, রাজার মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষের আগুন জ্বলে উঠবে।

পরদিন আমর ইবনুল আ’স পুনরায় দরবারে হাজির হলো। নাজ্জাশীকে উস্কে দেয়ার জন্য এই অপবাদ আরোপ করলো যে, এই মোহাজেররা হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে খুবই খারাপ ধারনা পোষণ করে। নাজ্জাশী পুনরায় মুসলমানদের ডাকলেন। তারা যখন পরিস্থিতি জানলেন তখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন যে, হযরত ঈসা (আঃ) “আল্লাহর পুত্র”- এই কথা অস্বীকার করলে নাজ্জাশীর কি প্রতিক্রিয়া হয় কে জানে?

কিন্তু ঈমানদারদের দৃঢ়তা এবারও তাদেরকে নির্দেশ দিলো, যা সত্য তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দাও। হযরত জা’ফর তাঁর ভাষনে বললেনঃ

“আমাদের নবী বলেছেনঃ হযরত ঈসা (আঃ) আল্লাহর দাস, আল্লাহর নিদর্শন ও আল্লাহর রসূল”।

একথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে একটা ঘাসের টুকরো হাতে নিয়ে বললেন, ‘তুমি যা বলেছ, হযরত ঈসা (আ:) তা থেকে এই ঘাসের টুকরো পরিমাণও বেশি কিছু নন’। ষড়যন্ত্রের শিকার এবং ঘুষ ও উপঢৌকন দ্বারা বশীভূত পাদ্রীরা মনে মনে অনেক ছটফট করলো। এক পর্যায়ে তাদের নাক দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু নাজ্জাশী তার কোন তোয়াক্কা করলেন না। পরিষ্কার নির্দেশ দিলেন যে, সব উপঢৌকন ফেরত দেয়া হোক। মক্কার প্রতিনিধিদ্বয় একেবারেই ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলো।

 

হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহন

সহিংসতার এই অধ্যায়ের একটি কাহিনী সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল, হযরত ওমরের ক্রোধোন্মত্ততার কাহিনী। রসূল (সাঃ) যখন নবুয়ত লাভ করেন, তখন হযরত ওমরের (রা) বয়স ছিল সাতাশ বছর। ইসলাম খুবই দ্রুত গতিতে তাঁর পরিবারে ছড়িয়ে পরে। তাঁর ভগ্নিপতি সাঈদ প্রথমেই ইসলাম গ্রহন করেন। তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর বোন ফাতেমাও মুসলমান হয়ে যান। ওমর (রা) এর পরিবারে আরো এক প্রভাবশালি ব্যক্তি নঈম বিন আবদুল্লাহও ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। প্রথম প্রথম তিনি জানতেই পারেননি যে, তাঁর পরিবারে এইভাবে ইসলামের বিস্তার ঘটছে। যখনই জানতে পারলেন, ক্রোধে অধীর এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। তাঁর পরিবারের এক দাসী লুবাইনাকে ইসলাম গ্রহন করার কারনে তিনি পেটাতে পেটাতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন। বিশ্রাম নিয়ে নতুন উদ্যোগে আবার পেটাতেন।

শেষ পর্যন্ত একদিন সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্তটাই নিয়ে ফেললেন। সেটি হলো, এই আন্দোলনের মূল আহ্বায়ককেই খতম করে ফেলতে হবে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই সময় আবু জাহল রসুল (সাঃ) কে যে হত্যা করতে পারবে তাকে দু’শো উট পুরষ্কার দেয়ার কথা ঘোষনা করে রেখেছিল এবং সেই পুরষ্কার পাওয়াই ছিল এই সিদ্ধান্তের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু হযরত ওমরের (রা) মেজাজের সাথে এই ধরনের লোভের শিকার হওয়াটা বেমানান। মনে হয়, তিনি এ কাজটাকে একটা পৈত্রিক ধর্মের সেবা মনে করেই করতে চেয়েছিলেন। যাই হোক, তিনি তলোয়ার নিয়ে রওনা দিলেন। পথিমধ্যে নঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাত হওয়ায় বাধা পেলেন। নঈম বললেন, ‘আগে নিজের বোন ভগ্নিপতির খোঁজ নাও, তারপর আর যেখানে যেতে চাও যেও।’ ওমর রাঃ তৎক্ষণাৎ ফিরলেন এবং বোনের বাড়ী অভিমুখে চললেন। সেখানে যখন পৌঁছলেন, তখন বোন ফাতেমা কোরআন পড়ছিলেন। পায়ের শব্দ কানে আসা মাত্রই চুপ করে গেলেন এবং কোরআনের পাতা গুলো লুকিয়ে ফেললেন। হযরত ওমর (রাঃ) ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি পড়ছিলে? বোন নিরুত্তর রইলেন। ওমর (রাঃ) বললেন আমি জেনে ফেলেছি, তোমরা উভয়ই ধর্মত্যাগী হয়েছ। তবে দেখাচ্ছি মজা। এই বলে ভগ্নিপতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বোন স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে তাকেও পিটালেন। বোনের দেহ রক্তাক্ত হয়ে গেল। কিন্তু অশ্রুভরা চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দৃপ্ত কন্ঠে ফাতেমা বললেন,

‘ওমর! যা ইচ্ছে করতে পার। কিন্তু আমাদের পক্ষে ইসলাম ত্যাগ করা সম্ভব নয়।’

ক্ষতবিক্ষত দেহ, রক্তাক্ত পোশাক পরিচ্ছদ, চোখ ভরা অশ্রু ও আবেগভরা মন নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। শুধু নারী নয়-সহোদরা বোন। আর তার মুখে এমন তেজোদীপ্ত কথা! ভেবে দেখুন, অবলা নারীর মধ্যেও ইসলাম কেমন নতুন প্রেরনা সঞ্চারিত করেছিল। এহেন মর্মস্পর্শী দৃশ্যের সামনে ওমরের দুর্ধর্ষ শক্তিও হার মানলো। তার ইস্পাত কঠিন সংকল্পের বজ্র আঁটুনি মাঝপথেই ফস্কা গিরোয় পরিনত হলো। বললেন, ‘আচ্ছা তোমরা যা পড়ছিলে, আমাকে একটু শোনাও তো।’ ফাতেমা গিয়ে কোরআনের লুকিয়ে রাখা পাতাগুলো নিয়ে এলেন। পড়তে পড়তে যখন এ কথাটা সামনে এলো, “************” অমনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন ‘আশহাদু আল-লাইলাহা ইলাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’ ঈমান আনার পর ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্র হযরত আরকামের বাড়ী অভিমুখে রওনা হলেন। সেখানে গিয়ে রসূল সাঃ এর হাতে বায়য়াত করলেন। এই ঘটনায় সেখানে উপস্থিত মুসলমানগণ আনন্দের আতিশয্যে এমন জোরে “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিলেন যে, মক্কার গোটা পরিবেশ গুঞ্জরিত হয়ে উঠলো। ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহীরা সেখান থেকে বেরুলেন এবং সমগ্র মক্কা নগরীতে ছড়িয়ে পড়লেন। তারা অনুভব করলেন যে তাদের শক্তি বেড়ে গেছে। হযরত ওমরের (রাঃ) ঈমান আনার অব্যবহিত পর থেকেই কাবা শরীফে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে জামায়াতে নামাজ পড়া শুরু হলো।

হযরত ওমর (রাঃ) মক্কার যুবকদের মধ্যে স্বীয় মেধা ও আবেগ উদ্দীপনার জন্য বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর আচার ব্যবহার ছিল আন্তরিকতা ও নিষ্ঠায় পরিপূর্ণ। জাহেলিয়াতের যুগে তিনি ইসলামের সাথে যে শত্রুতা পোষণ করতেন, তাও কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা তাড়িত হয়ে নয় বরং ওটাকে ন্যায়সঙ্গত মনে করে আন্তরিকতার সাথেই করতেন। তারপর যখন প্রকৃত সত্য তাঁর কাছে উদঘাটিত হলো এবং বিবেকের উপর থেকে পর্দা সরে গেলো, তখন পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে ইসলামের পতাকা উঁচু করে তুলে ধরলেন। বিরোধিতা করার সময় তার ধরন যদিও অতিমাত্রায় উগ্র ও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর প্রখর মেধা ও নির্মল বিবেক সবসময়ই একটু একটু করে সত্যের আলো গ্রহন করেছে। মক্কার পরিবেশে সংঘটিত প্রতিটি ঘটনা তাঁর অন্তরাত্মাকে প্রভাবিত, আলোড়িত ও ইসলাম গ্রহনের জন্য প্রস্তুত করতে থাকে। একদিকে ইসলামের দাওয়াতের খবরাখবর প্রতিনিয়ত তাঁর কর্ণগোচর হতে থাকে। অপরদিকে এর বিরোধীদের হীন ও কদর্য মানসিকতাও তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। তারপর একদিকে তিনি রসূল (সাঃ) ও তাঁর সাথীদের নির্মল ও সৎ চরিত্র এবং অন্যদিকে ইসলাম বিরোধীদের চরিত্রের কলুষিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকগুলো প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। প্রতিনিয়ত এই তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ মক্কার সচেতন ও জাগ্রত বিবেকের অধিকারী এই যুবককে ক্রমাগত প্রভাবিত ও আলোড়িত করতে থাকে। তবে পরিস্থিতির এই দুটো পরস্পর বিরোধী সাধারন দৃশ্য ছাড়াও কয়েকটা বিশেষ ঘটনাও তাঁর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

উদাহরন স্বরূপ, উম্মে আবদুল্লাহ বিনতে আবি হাশমা আবিসিনিয়ায় হিজরত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এসময় একদিন হযরত ওমর তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘উম্মে আবদুল্লাহ, মনে হচ্ছে মক্কা ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন’। উম্মে আবদুল্লাহ বললেন, ‘হা, তাই যাচ্ছি। তোমরা আমাদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছ এবং আমাদের উপর অনেক নির্যাতন চালিয়েছ। এখন আল্লাহ আমাদেরকে বাঁচার জন্য একটা পথ খুলে দিয়েছেন’। ওমর বললেনঃ ‘আল্লাহ আপনাদের সাথী হোন।’ উম্মে আবদুল্লাহ বলেন, ঐ সময় ওমর কে যেরূপ দুঃখভারাক্রান্ত দেখাচ্ছিল, তেমন আমি আর কখনো দেখিনি। আমাদের দেশান্তরী হওয়ার প্রস্তুতি দেখে তিনি গভীর মর্মবেদনা অনুভব করেন। উম্মে আবদুল্লাহ তাঁর স্বামী আমের বিন রবীয়াকে যখন ওমরের এই মর্মবেদনার কথা জানালেন, তখন আমের জিজ্ঞেস করলেন, ওমরের এই ভাবান্তর দেখে কি তুমি তাঁর ইসলাম গ্রহনের আশা পোষণ করছ? উম্মে আবদুল্লাহ বললেন, হাঁ। আমের বললেন, তুমি যাকে দেখেছ, সে যখন ইসলাম গ্রহন করবে, তখন খাত্তাবের গাধাও ইসলাম গ্রহন করবে (খাত্তাব হযরত ওমরের পিতার নাম)। উম্মে আব্দুল্লাহ বলেন, ইসলামের ব্যাপারে ওমরের নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার কারনে এ ধরনের হতাশা জন্মে গিয়েছিল। (সিরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড)

কিন্তু এই ঘটনা যে হযরত ওমরের বিবেকে এক জোরালো কষাঘাত হেনে থাকবেনা, তা কে বলতে পারে? অনুরূপভাবে অন্য একটা বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রসূল (সাঃ) এর কোরআন পাঠ শুনে তাঁর মন প্রভাবিত হয়েছিল। এ সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্য নিম্নরুপঃ

‘আমি ইসলাম থেকে অনেক দূরে ছিলাম। জাহেলিয়াতের যুগে মদে আসক্ত ছিলাম এবং খুব বেশী পরিমাণে মদ খেতাম। হাযওয়ারাতে [তৎকালে এটা মক্কার একটা বাজার ছিল। বর্তমানে এই যমিনটুকু মসজিদুল হারেমের অন্তর্ভুক্ত] আমাদের মদের আসর বসতো এবং সেখানে কুরায়শী বন্ধুরা জমায়েত হতো। এক রাতে আমি নিজের সতীর্থদের আকর্ষনে ঐ আসরে উপস্থিত হই। সতীর্থদের সেখানে অনেক খোঁজাখুঁজি করি। কিন্তু কাউকে পাইনি। পরে এক মদ বিক্রেতার কথা মনে পড়লো এবং ভাবলাম ওখানে গিয়ে মদ খাবো। কিন্তু তাকেও পেলাম না। তারপর ভাবলাম কা’বা শরীফে চলে যাই এবং ওখানে ষাট সত্তর বার তাওয়াফ করে নেই। সেখানে গিয়ে দেখলাম, রসূল সাঃ নামায পড়ছেন। তিনি রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝখানে (বাইতুল মাকদাস অভিমূখে) দাঁড়িয়েছিলেন। সহসা মনে ইচ্ছা জাগলো, এই লোকটা কি পড়ে আজ একটু শোনাই যাকনা। কা’বার গেলাফের ভেতরে ঢুকে আস্তে আস্তে একেবারে কাছে গিয়ে শুনতে লাগলাম। আমার ও রসূল (সাঃ) এর মাঝে কেবল কা’বার গিলাফ ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। আমি যখন কোরআন শুনলাম, তখন আমার মনটা গলে গেলো। চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। ঠিক সেই মূহুর্তেই আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করলো। [সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, ৩৬৮-৩৬৯ পৃ]

এই বর্ননার অবশিষ্টাংশে বলা হয়েছে, ওমর রাঃ তখনই রসূল (সাঃ) এর সাথে চলে যান এবং ইসলাম গ্রহন করেন। তবে প্রকৃত পক্ষে তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে পূর্বোক্ত বর্ণনাই সঠিক। তাঁর বোনের ঈমান, ধৈর্য ও দৃঢ়তা দেখেই তাঁর মনমগজ ইসলাম গ্রহণের দিকে চূড়ান্তভাবে ধাবিত হয়। ওমরের (রাঃ) নিজের বর্ননার এই অংশটা খুবই গুরুত্ববহ যে তিনি রসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে কোরআন শ্রবণ করতে গিয়েছেন। এবং নিজ কানে শোনা কোরআনের আয়াত তাঁর অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করেছে। এক নাগাড়ে বছরের পর বছর ধরে চলা থাকা দ্বন্দ্ব সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এরূপ ঘটনা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। ওমরের মত ব্যক্তিত্ব ইসলামের দাওয়াত নিজ কানে না শুনে সিদ্ধান্ত নেবেন এটা হয়ইবা কেমন করে?

কোরআনের বিরোধিতায় লিপ্ত আর অনেকে, এমনকি বড় বড় নেতারাও পর্যন্ত কৌতুহলের বশে গোপনে ছুটে আসতো আকাশ থেকে নেমে আসা এই সুমধুর তান শুনতে। অথচ প্রকাশ্য মজলিসে তারাই আবার বলতো, ‘আমাদের কান বধির’। একবার গভীর রাতে রসূল সাঃ যখন নিজ ঘরে বসে কোরআন পড়ছিলেন, তখন আবু সুফিয়ান, আবু জাহল ও অখনাস বিন শুরাইক লুকিয়ে লুকিয়ে রসূল সাঃ এর ঘরের আশে পাশে সমবেত হয়ে শুনছিল। পরে বাড়ী ফেরার সময় ঘটনাক্রমে তারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে পড়ে। তখন একে অপরকে এই বলে ভর্ৎসনা করতে থাকে যে, এ রকম করা উচিৎ নয়। নচেত স্বল্পবুদ্ধির সাধারণ লোকেরা যদি দেখে ফেলে, তাহলে তাদের মনে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ কথা বলে তারা চলে গেল। পরেরদিন তারা আবারো আসলো এবং আবারো আগের মতন ভর্ৎসনা ও উপদেশ বিনিময় হলো। তৃতীয় রাতে আবারো এই ঘটনা ঘটলো এবং শেষ পর্যন্ত খুবই জোরদার প্রতিজ্ঞা করা হলো যে, ভবিষ্যতে এমন কাজ আর কিছুতেই হবেনা। তবে প্রাসঙ্গিক ভাবে পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ হলো যে, মুহাম্মাদ সাঃ এর কাছ থেকে শোনা বাণী সম্পর্কে কার কি মত? প্রত্যেকেই কিছু না কিছু বললো। সবার শেষে আবু জাহল উত্তেজিত কন্ঠে বললো, বনু আবদ মানাফের সাথে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময়ই ছিল। তারা আতিথেয়তা করলে আমরাও করতাম, তারা রক্তপণ দিলে আমরাও দিতাম, তারা দানশীলতা করলে আমরাও করতাম। এভাবে আমরা তাদের সমকক্ষ হয়ে গিয়েছিলাম। কোন ব্যাপারেই পেছনে পড়িনি। হঠাৎ এখন তারা বলতে আরম্ভ করেছে যে, তাদের গোত্রে নবী এসেছে। এটা আমরা কেমন করে মেনে নেই? এই ক্ষেত্রে তো আমরা তাদের সমকক্ষতা দাবি করতে পারছিনা। কাজেই আল্লাহর কসম, আমরা তাঁর উপর ঈমানও আনতে পারিনা, তাঁকে সমর্থনও করতে পারিনা। [সীরাত ইবনে হিশাম,প্রথম খন্ড পৃ-৩৩৭-৩৩৮]

ঐ সময় ইসলাম সম্পর্কে সর্ব সাধারণের মনে ব্যাপক কৌতুহল ও অনুসন্ধিৎসা জেগেছিল এবং যা হযরত ওমরকেও কখনো কখনো রসূল সাঃ এর কাছে নিজ কানে আল্লাহর বাণী শোনার জন্য টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তা অনুধাবন করার জন্যই এই ঘটনাটা প্রাসঙ্গিক ভাবে উল্লেখ করলাম।

 

আর এক ধাপ অগ্রগতি

মোটকথা, হযরত ওমরের রাঃ ইসলাম গ্রহণ ছিল একটা বিরাট ঘটনা। এ ঘটনার পেছনে অনেকগুলো কার্যকারণ সক্রিয় ছিল। এ ঘটনার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার আরো একটা কারন হলো, ইসলাম বিরোধী একতরফা সহিংসতা যখন চরম আকার ধারন করেছে, ঠিক তখনই এই সত্যসন্ধানি মানুষটি এগিয়ে আসেন। বিরোধী শক্তি জনগণকে ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্যই নির্যাতন চালাচ্ছিল। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এই নির্যাতন জনগনের মনকে গলিয়ে দিচ্ছিল এবং নির্যাতনের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলেছিল। ইসলাম যে সত্য তার একটা অন্যতম অকাট্য প্রমান এটাই যে, সহিংস ও আগ্রাসী প্রতিরোধ যতই বেড়েছে, ততই উৎকৃষ্টতম মনমগজের অধিকারী লোকেরা ইসলামে দীক্ষিত হতে থেকেছে। আবিসিনিয়ায় হিজরতের পরের সময়টায় মক্কার মূল্যবান রত্নগুলো ইসলামে জড়ো হতে থাকে।

একদিকে ওমরের রাঃ মত ব্যক্তিত্ব ইসলাম গ্রহন করবে, আর নতুন কোন আলোড়ন সৃষ্টি হবে না, এটাই বা কেমন করে সম্ভব? তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে, একবার গোটা সমাজকে চ্যালেঞ্জ করবেনই। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর তখনও বালক মাত্র। তিনি বলেন, ‘আমার পিতা ওমর রাঃ ঈমান আনার পর খোঁজ নিলেন যে কোরায়েশ গোত্রের কোন ব্যক্তি কথা ছড়াবার উস্তাদ? তিনি জামীল বিন মুয়াম্মার জামহী নামক এক ব্যক্তির সন্ধান পেলেন। তিনি খুব ভোরে তার কাছে চলে গেলেন। ওখানে গিয়ে তিনি কি করেন তা দেখার জন্য আমিও তাঁর সাথে গেলাম। তিনি যেয়ে তাকে বললেন, ‘ওহে জামিল, তুমি কি জান, আমি ইসলাম গ্রহন করেছি এবং মুহাম্মাদ সাঃ এর দলে অন্তর্ভূক্ত হয়ে গিয়েছি’? জামীল একটি কথাও না বলে নিজের চাদরটা ঘাড়ে করে সোজা মসজিদুল হারামের দরজায় দিয়ে পৌছালো। তারপর গগনবিদারী কন্ঠে ঘোষণা করতে শুরু করলো যেঃ 'ওহে কোরায়েশ জনতা শোনো। খাত্তাবের ছেলে ওমর রাঃ সাবী (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছে।’ হযরত ওমরও তার পিছু পিছু এসে পৌঁছলেন এবং চিৎকার করে বললেনঃ 'জামীল ভুল বলছে। আমি সাবী নয়, মুসলমান হয়েছি। আমি ঘোষণা করেছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মা'বুদ নেই, এবং মুহাম্মাদ সা. তার বান্দা ও রসূল।' কোরায়েশরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। এমনকি নিজের বাবার সাথেও তিনি তুমুল লড়াই করলেন। ধস্তাধস্তি করতে করতে সূর্য মাথার ওপর চলে আসলো। এই সময় জনৈক প্রবীণ কোরায়েশ নেতা হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, ব্যাপার কি? অতঃপর পুরো ঘটনা শুনে সে বললো, এই ব্যক্তি নিজের জন্য একটা মত ও পথ বাছাই করে নিয়েছে। এখন তোমরা কী করতে চাও! ভেবে দেখ, বনু আদী (হযরত ওমরের গোত্রের নাম) কি তাদের লোককে এভাবে তোমাদের হাতে অসহায় ছেড়ে দেবে? ওকে ছেড়ে দাও।’ এই সরদারের নাম ছিল আস বিন ওয়ায়েল সাহমী। সে হযরত ওমরকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে নিল। (সীরাত ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড, ৩৭০-৩৭১ পৃঃ)

এই সাথে হযরত ওমর নিজের ঈমানী উৎসাহ উদ্দীপনা প্রকাশের আরো একটা পথ খুঁজে পেয়ে গেলেন। তিনি ঈমান আনার পর প্রথম রাতেই চিন্তা করলেন, রাসূল সাঃ এর সবচেয়ে কট্টর ও উগ্র বিরোধী কে? তিনি বুঝলেন, আবু জাহলের চেয়ে কট্টর ও উগ্র বিরোধী আর কেউ নেই। প্রত্যুষে উঠেই আবু জাহলের বাড়ীতে গিয়ে পৌছলেন। দরজার কড়া নাড়তেই আবু জাহল বেরিয়ে এলো। সে স্বাগত জানিয়ে আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইল। ওমর রা. বললেন, আমি আপনাকে জানাতে এসেছি যে, আমি মুহাম্মদ সা. -এর ওপর ঈমান এনেছি এবং তিনি যা বলেন তা সত্য বলে স্বীকার করেছি। আবু জাহল 'তোর ওপর এবং তোর এই খবরের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত' এই কথাটা বলেই ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিল।

অপর দিকে ওমর রা. ইসলামী আন্দোলনকে এক ধাপ সামনে এগিয়ে দিলেন। মার খেয়েও কা'বার চত্তরে প্রকাশ্যে নামায পড়ার সূচনা করে দিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, 'আমরা হযরত ওমরের ইসলাম গ্রহণের আগে কা’বা শরীফের সামনে প্রকাশ্যে নামায পড়তে পারতামনা। ওমর রাঃ ইসলাম গ্রহণ করলে তিনি কোরায়েশদের সাথে লড়াই করে কা’বায় নামায পড়লেন এবং আমরাও তার সাথে নামায পড়লাম।’

এভাবেই তীব্র সহিংসতার ভেতর দিয়েও শত্রুদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গ ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে।

 

হযরত হামযার ইসলাম গ্রহণ

হযরত হামযার ঘটনাও প্রায় একই ধরনের। মক্কার এ যুবক একাধারে মেধাবী সাহসী ও প্রভাবশালী ছিলেন। রসূল সা. এর চাচাদের মধ্যে আবু তালেবের পর ইনিই একমাত্র চাচা ছিলেন, যিনি দ্বিমত পোষণ করা সত্ত্বেও রসূল সা. কে ভালোবাসতেন। বয়সেও ছিলেন মাত্র দু’তিন বছরের বড়। সমবয়সী হওয়ার কারণে শৈশবে চাচা ভাতিজা গলাগলি ভাব ছিল।

ঘটনা। সাফা পাহাড়ের কাছে আবু জাহল রসূল সা. কে লাঞ্চিত করে এবং অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করে। রসূল সা. ধৈর্য ধারণ করলেন এবং এই লাঞ্চনার কোন প্রতিশোধ নিলেন না। ঘটনাক্রমে জনৈক দাসী এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। হযরত হামযা তখন শিকারে গিয়েছিলেন। ধনুক হাতে করে ফিরে আসতেই দাসীটা তাকে ঘটনাটা শুনালো এবং বললো, ‘হায়, তুমি যদি নিজ চোখে দেখতে পেতে যে তোমার ভাতিজার কী অবস্থা হয়েছিল।’ ঘটনার বিবরণ শুনে হামযার তীব্র আত্ন-সম্ভ্রমবোধ জেগে উঠলো। তিনি সোজা কোরায়েশদের মজলিসে আবু জাহলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আবু জাহলের মাথায় ধনুক দিয়ে আঘাত করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি মুহাম্মাদকে গালি দিয়েছ? যদি দিয়ে থাক তাহলে জেনে রেখ, আমিও তার ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি এবং সে যা কিছু বলে, আমিও তা বলি। সাহস থাকলে আমার মোকাবিলা করতে এস।’ আবু জাহলের সমর্থনে বনু মাখযুমের এক ব্যক্তি উঠে দাড়ালো। কিন্তু আবু জাহল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, ‘বাদ দাও, আমি হামযার ভাতিজাকে খুব অশ্রাব্য গালি দিয়েছি।’ এরপর হযরত হামযা ইসলামের ওপর অটল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। কোরায়েশরা বুঝতে পারলো যে, রসূলের শক্তি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড)

 

বয়কট ও আটকাবস্থা

ইসলামের শত্রুরা তাদের সকল ফন্দি ফিকিরের ব্যর্থতা, ইসলামের অগ্রগতির ও বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণের দৃশ্য দেখে দিশাহারা হয়ে উঠে। নবুয়তের সপ্তম বছরের মহাররম মাসে মক্কার সব গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করার চুক্তি সম্পাদন করলো। চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশেম যতক্ষণ মুহাম্মদ সা. কে আমাদের হাতে সমর্পন না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোন আত্নীয়তা রাখবেনা, বিয়ে শাদীর সম্পর্ক পাতাবেনা, লেনদেন ও মেলা মেশা করবেনা এবং কোন খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাদের কাছে পৌছাতে দেবেনা। আবু তালেবের সাথে একাধিকবার কথাবার্তার পরও আবু তালেব রসূল সা. কে নিজের অভিভাবকত্ব থেকে বের করতে প্রস্তুত হননি। আর তার কারণে বনু হাশেমও তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারেনি। এই কারণে হতাশ হয়ে তারা ঐ চুক্তি সম্পাদন করে। গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র অসহায় অবস্থায় ‘শিয়াবে আবু তালেব’ নামক উপত্যকায় আটক হয়ে গেল। এই আটকাবস্থার মেয়াদ প্রায় তিন বছর দীর্ঘ হয়। এই সময় তাদের যে দুর্দশার মধ্য দিয়ে কাটে তার বিবরণ পড়লে পাষাণও গলে যায়। বনু হাশেমের লোকেরা গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে এবং শুকনো চামড়া সিদ্ধ করে ও আগুনে ভেজে খেতে থাকে। অবস্থা এত দূর গড়ায় যে, বনু হাশেম গোত্রের নিষ্পাপ শিশু যখন ক্ষুধার যন্ত্রনায় কাঁদতো, তখন বহু দূর পর্যন্ত তার মর্মভেদী শব্দ শোনা যেত। কোরায়েশরা এ সব কান্নার শব্দ শুনে আনন্দে আত্নহারা হয়ে যেত। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র একমাত্র ইসলামী আন্দোলনের নেতার কারণে এহেন বন্দীদশায় নিক্ষিপ্ত হলো। বয়কট এমন জোরদার ছিল যে, একবার হযরত খাদীজার ভাতিজা হাকীম বিন হিযাম তার ভৃত্যকে দিয়ে কিছু গম পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। পথি মধ্যে আবু জাহল তা দেখে গম ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। ঠিক এ সময় আবুল বুখতারীও এসে গেল এবং তার মধ্যে একটু মানবিক সহানুভুতি জেগে উঠলো। সে আবু জাহলকে বললো, আরে ছেড়ে দাওনা। এছাড়া হিশাম বিন আমরও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু গম পাঠাতো।

এই হিশাম বিন আমরই এই নিপীড়নমূলক চুক্তি বাতিলের প্রথম উদ্যোক্তায় পরিণত হলো। সে যুহাইর বিন উমাইয়ার কাছে গেল। তাকে বললো, ‘তুমি কি এতে আনন্দ পাও যে, তুমি খাবে দাবে, কাপড় পরবে, বিয়ে শাদী করবে, আর তোমার মামাদের এমন অবস্থা হবে যে, তারা কেনাবেচাও করতে পারবেনা এবং বিয়ে শাদীও করতে পারবেনা? ব্যাপারটা যদি আবুল হাকাম বিন হিশামের (আবু জাহল) মামা নানাদের হতো এবং তুমি তাকে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদনের আহবান জানাতে, তাহলে সে কখনো সে আহবানে সাড়া দিতনা।’ এ কথা শুনে যুহাইর বললো, ‘আমি কী করবো? আমি তো একা মানুষ। আল্লাহর কসম আমার সাথে যদি আর কেউ থাকতো, তাহলে আমি এই চুক্তি বাতিল করানোর উদ্যোগ নিতাম এবং বাতিল না করিয়ে ছাড়তামনা।’ হিশাম বললো, ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি তো তুমি পেয়েই গেছ।’ যুহাইর বললো, ‘সে কে?’ হিশাম বললো, আমি স্বয়ং। এরপর হিশাম গেল মুতয়াম বিন আদীর কাছে এবং একইভাবে তাকে বুঝালো। সেও যুহাইরের ন্যায় জবাব দিল যে, আমি একাকী কী করবো। হিশাম তাকেও বললো, ‘আমি আছি তোমার সাথে।’ মুতয়াম বললো, ‘তাহলে তৃতীয় একজনকে খুজে বের কর।’ হিশাম বললো, তৃতীয় ব্যক্তি তো আমি পেয়েই গেছি। সে বললো, কে সে? হিশাম বললো, ‘যুহাইর বিন আবি উমাইয়া।’ মুতয়াম বললো, এবার চতুর্থ একজন বের করা দরকার। অতপর আবুল বুখতারী ও যামরা বিন আসওয়াদের কাছে পৌছে হিশাম কথা বললো।

এভাবে বয়কট চুক্তি বাতিলের আন্দোলন যখন ভেতরে ভেতরে কার্যকরভাবে অগ্রসর হলো, তখন তারা সবাই একত্রে বসে পরবর্তী কর্মসূচী স্থির করলো। পরিকল্পনা করা হলো যে, হিশামই প্রকাশ্যে কথাটা তুলবে। সে অনুসারে হিশাম কা’বা শরীফের সাতবার তওয়াফ করলো। তারপর জনতার কাছে এসে বললো, ‘ওহে মক্কাবাসী, এটা কি সমীচীন যে, আমরা খাবার খাবো, পোশাক পরবো, আর বনু হাশেম ক্ষুধায় ছটফট করতে থাকবে এবং কোন কিছু কিনতেও পারবেনা?’ তারপর সে নিজের ইচ্ছেটা এভাবে জানিয়ে দিলঃ

‘আল্লাহর কসম, সম্পর্ক ছিন্নকারী এই নিপীড়নমূলক চুক্তি টুকরো টুকরো করে না ফেলে আমি বিশ্রাম নেবনা।’

আবু জাহল চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি কখনো এটা ছিড়তে পারবেনা।’

যাময়া ইবনুল আসওয়াদ আবু জাহলকে জবাব দিল, ‘আল্লাহর কসম, তুমিই সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী। এই চুক্তি যেভাবে লেখা হয়েছে, আমরা তা পছন্দ করিনা।’ আবুল বুখতারীও বলে উঠলো, ‘যাময়া ঠিকই বলেছে। এই চুক্তি আমাদের পছন্দ নয় এবং আমরা তা মানিও না।’ মুতয়ামও সমর্থন করে বললো, ‘তোমরা দু’জনে ঠিকই বলেছ। এর বিপরীত যে বলে সে ভুল বলে।’ এভাবে অধিকাংশ লোক বলতে থাকায় আবু জাহল মুখ কাচুমাচু করে বসে রইল এবং চুক্তি ছিড়ে ফেলা হলো। লোকেরা যখন চুক্তিটাকে কা’বার প্রাচীর থেকে নামালো তখন অবাক হয়ে দেখলো যে, সমগ্র চুক্তিটাকে উই পোকায় খেয়ে ফেলেছে। কেবল ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ কথাটা বাকী আছে। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

 

দূঃখের বছর

বন্দীদশা কেটে যাওয়ায় রসূল সা. আর একবার সপরিবারে মুক্ত পরিবেশে উপনীত হলেন। কিন্তু এবার তার চেয়েও কঠিন যুগের সূচনা হলো। তখন চলছিল নবুয়তের দশম বছর। এ বছর সর্বপ্রথম যে বিয়োগান্ত ঘটনাটা ঘটলো, তা এই যে, হযরত আলীর পিতা আবু তালেব মারা গেলেন। যে শেষ আশ্রয়টি এ যাবত পরম স্নেহে রসূল সা. কে শত্রুদের কবল থেকে রক্ষা করে আসছিল এবং কোন চাপ ও উস্কানীর কাছে নতি স্বীকার না করে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সকল চক্রান্ত প্রতিহত করে আসছিল, সেই আশ্রয়টি এভাবে হারিয়ে গেল।

এই বছরই রসূল সা. দ্বিতীয় যে আঘাতটা পেলেন তা হলো হযরত খাদীজার রা. ইন্তিকাল। হযরত খাদীজা রা. শুধু রসূলের স্থী-ই ছিলেন না, বরং প্রথম ঈমান আনয়নকারী ভাগ্যবান গোষ্ঠীটির অন্যতম ছিলেন। নবুয়ত লাভের আগেও তিনি তার প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মীতা দেখাতে মোটেই কসুর করেননি। প্রথম ওহি নাযিল হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি সত্যের পথে রসূলের সা. যথার্থ জীবন সংগিনীর ভূমিকা পালন করে গেছেন। ইসলামী আন্দোলনের সমর্থনে তিনি প্রচুর অর্থও ব্যয় করেছেন। পদে পদে পরামর্শও দিয়েছেন এবং আন্তরিকতা সহকারে সহযোগিতাও করেছেন। এ জন্য তার সম্পর্কে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে, তিনি রসূল সা. এর মন্ত্রী ছিলেন। বস্তুত এ বন্তব্য যথার্থ ও সংগত।

একদিকে পরপর এই দুটো আঘাত রসূল সা. কে সইতে হলো। অপরদিকে এই বাহ্যিক সহায় দুটো হারিয়ে যাওয়ার কারণে বিরোধিতা আরো প্রচন্ড আকার ধারণ করলো। এবার বিরোধিতা ও নির্যাতন নিপীড়ন অতীতের সমস্ত রেকর্ড যেন ছাড়িয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা সম্ভবত এই ছিল যে, ইসলাম নিজের হেফাযত নিজেই করুক, নিজের চলার পথ নিজেই তৈরী করুক এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখুক। দুনিয়াবী সহায়গুলো এভাবে হটিয়ে না দিলে হয়তো সত্যের প্রাণশক্তি পুরোপুরি দৃশ্যমান হতে পারতোনা। এই দুঃখজনক ও দুঃসহ পরিস্থিতির উদ্ভবের কারণেই এ বছরটা দুঃখের বছর নামে আখ্যায়িত হয়।

এখন কোরায়েশরা চরম অসভ্য আচরণ শুরু করে দিল। বখাটে ছেলেদেরকে তার পেছনে লেলিয়ে দিতে লাগলো। তারা হৈ চৈ করতো। রসূল সা. যখন নামায পড়তেন, তখন হাতে তালি দিত। পথে চলার সময় রসূল সা. এর ওপর নোংরা বর্জ্য নিক্ষেপ করা হতো। দরজার সামনে কাঁটা বিছানো হতো। কখনো তাঁর গলায় ফাঁস লাগানী হতো। কখনো তাঁর গায়ে পর্যন্ত হাত দেয়া হতো, প্রকাশ্যে গাল দেয়া হতো। তাঁর মুখের ওপর মাটি নিক্ষেপ করা হতো। এমনকি কোন কোন নরপশু এমন জঘন্যতম বেয়াদবীও পর্যন্ত করেছে যে, তার জ্যোতির্ময় মুখমন্ডলে থুথু নিক্ষেপ করেছে। একবার আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল একটা পাথর নিয়ে রসূল সা. কে খুঁজতে খুঁজতে হারাম শরীফ পর্যন্ত এসেছিল। তার ইচ্ছা ছিল এক আঘাতেই তাঁকে খতম করে দেয়া। রসূল সা. হারাম শরীফে তার সামনেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাকে এমনভাবে তার চোখের আড়ালে রেখে দিলেন যে, সে তাঁকে দেখতেই পেলনা। অগত্যা সে হযরত আবু বকরের সামনে ক্রোধ উদগীরণ করে ফিরে এল এবং নিম্নের কবিতা আবৃত্তি করলো “আমরা নিন্দিত ব্যক্তির আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেছি, তার আদেশ অমান্য করেছি এবং তার ধর্মের প্রতি শত্রুতা পোষণ করেছি।” বস্তুত নাম বিকৃত করা এবং খারাপ শব্দ প্রয়োগ করা নৈতিক নীচতা ও অধোপতনের লক্ষণ। শত্রু যখন ইতরামির সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়, তখন এই সব নোংরা অস্ত্র প্রয়োগ করে থাকে।

এসব কথা শুনে রসূল সা. বলতেন, আল্লাহ তাদের নিন্দাবাদ থেকে আমাকে বাঁচিয়েছেন। ওরা মুযাম্মামকে (নিন্দিত ব্যক্তি) গালি দেয়। কিন্ত আমি তো মুহাম্মাদ। কাজেই ওদের গালি আমাকে স্পর্শ করেনা।

অনুরূপভাবে একবার আবু জাহল পাথর দিয়ে আঘাত করে রসূল সা. কে হত্যা করার মতলবে তার কাছে পৌছে যায়। কিন্তু আল্লাহ আবু জাহলকে সহসাই এমন ভীত ও সন্ত্রস্থ করে দেন যে, সে কিছুই করতে পারেনি।

একবার শত্রুরা সদলবলে রসূল সা. এর ওপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপট ছিল এ রকমঃ ইসলামের শত্রুরা তাদের এক আড্ডায় বসে বলাবলি করছিল যে, ‘এই লোকটার (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি আমরা বড্ড বেশী সহনশীলতা দেখিয়ে এসেছি। এতটা সহনশীলতার কোন নজীর নেই।’ ঘটনাক্রমে ঠিক এ সময়ই রসূল সা. সেখানে এসে পড়েন। শত্রুরা জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি এ সব কথা বলে থাক? রসূল সা. পরিপূর্ণ নৈতিক দৃঢ়তা নিয়ে বললেন, ‘হ্যা, আমিই তো এ সব কথা বলে থাকি।’ ব্যাস, আর যায় কোথায়। চার দিক থেকে আক্রমণ চালানো হলো। আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আ’স বর্ণনা করেন যে, রসূল সা. এর ওপর কোরায়েশদের পক্ষ থেকে এমন বাড়াবাড়ি আর কখনো দেখিনি।

আক্রমণকারীরা কিছুক্ষণ পর থামলে রসূল সাঃ পুণরায় সেই অতি মানবীয় সাহসিকতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী উচ্চারণ করলেনঃ ‘আমি তোমাদের কাছে এমন বার্তা নিয়ে এসেছি যে, তোমরা যবাই হয়ে যাবে।’ অর্থাৎ যে যুলুম নির্যাতনের ছুরি তোমরা আমার গলায় চালাচ্ছো, ইতিহাসের শাশ্বত বিধান আল্লাহর আইন শেষ পর্যন্ত ঐ ছুরি দিয়েই তোমাদের যবাই করবে। তোমাদের এই যুলুমের রাজত্ব একেবারেই খতম হয়ে যাবে।

এই সব ঘটনার সঠিক সময়কাল বলা কঠিন। তবে অনুমান হয় যে, যে সময় সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছিল, তখনই এ ঘটনাগুলো ঘটে থাকবে। আবু তালেবের মৃত্যুর পরেই যে এ সব ঘটনা ঘটেছে, তা সুনিশ্চিত।

হযরত উসমান বিন আফফান বর্ণনা করেন, একবার রসূল সা. পবিত্র কা’বার তাওয়াফ করছিলেন। কোরায়েশ সরদার উকবা ইবনে আবু মুয়াইত, আবু জাহল ও উমাইয়া ইবনে খালফ এ সময় হাতীমে কা’বায় বসা ছিল। রাসূল (সা) যখনই তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা তাঁকে লক্ষ্য করে অশ্রাব্য গালাগাল বর্ষণ করছিল। এভাবে তিনবার হলো। শেষ বাস রাসূল (সা) পরিবর্তিত চেহারা নিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আল্লাহর আযাব অবিলম্বে তোমাদের ওপর না নামলে তোমরা কিছুতেই ক্ষান্ত হবে না।’ হযরত উসমান বলেন, এ কথাটা বলার সাথে সাথেই তাদের মধ্যে এমন আতংক উপস্থিত হয় যে, প্রত্যেকে ভয়ে কাঁপতে থাকে। এ কথাটা বলার পর রাসূল (সা) বাড়ী অভিমুখে রওনা হলেন। তাঁর সাথে হযরত উসমান এবং অন্যান্যরাও রওনা হন। এই সময় রাসূল (সা) নিজ সাথীদের সম্বোধন করে বলেনঃ

‘তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী, তাঁর বাণীকে পূর্ণাঙ্গ এবং তাঁর দ্বীনের সাহায্য করবেন। আর এই লোকগুলোকে অচিরেই আল্লাহ তোমাদের হাত দিয়ে যবাই করাবেন।’

লক্ষ্য করুন, দৃশ্যত নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে এ সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। অথচ কত দ্রুত কেমন জাঁকজমকের সাথে তা সত্য প্রমাণিত হলো। ইসলামী আন্দোলন যেন একটা অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললো।

 

তায়েফে ইসলামের দাওয়াত

এ ঘটনাটা ঠিক কোন সময়ে ঘটেছিল, নিশ্চিতভাবে তা বলা কঠিন। কেউ কেউ এটিকে সুরা মুদাসসিরের নাযিল হবার প্রেক্ষাপট হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এ কথা মেনে নিলে ঘটনাটিকে প্রাথমিক যুগে স্থান দিতে হয়। কিন্তু ঘটনার ধরন দেখে মনে হয়, এটা মক্কী যুগের শেষের দিককার ব্যাপার।

একদিন রাসূল (সা) প্রত্যুষে বাড়ী থেকে বেরুলেন। মক্কার বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু পুরো দিনটা অতিবাহিত করেও তিনি সেদিন একজন লোকও পেলেন না, যে তাঁর বক্তব্যে কর্ণপাত করে। সে সময় ইসলামবিরোধীরা যে নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করেছিল তা হলো রাসূল (সা) কে আসতে দেখলেই সবাই সটকে পড়তো। কারণ তাঁর কথা শুনলেই জটিলতা দেখা দেয়। বিরোধিতা করলে বা তর্কবিতর্ক করলে তার আরো বিস্তার ঘটে। এই কর্মপন্থা বেশ সফল হলো। দু’ একজনের সাক্ষাত পেলেও তারা উপহাস অথবা গুন্ডামির মাধ্যমে জবাব দিল। পুরো দিনটা বিফলে যাওয়ায় তিনি বুকভরা হতাশা ও বিমর্ষতা নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। কেউ যখন কোন ব্যক্তির উপকার করতে ও শুভ কামনা করতে এগিয়ে যায়, আর সেই ব্যক্তি ঐ উপকারী ও শুভাকাংখী ব্যক্তিকে হত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন উপকারী ব্যক্তিটির মন যেমন দুর্বিষহ বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে, রসূল (সা) এর মনের অবস্থাটাও ছিল অবিকল তদ্রুপ।

ঐ বিশেষ দিনটার অভিজ্ঞতা থেকে রসূল (সা) এর মনে এই ধারণা দানা বাঁধে যে, মক্কার মাটি এখন ইসলামের দাওয়াতের জন্য অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে এবং এখানে যা কিছু ফসল ফলার সম্ভাবনা ছিল, তা ইতিমধ্যেই ফলেছে। পরবর্তী সময় পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটতে থাকায় তাঁর এ ধারণা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। সম্ভাবনাময় সর্বশেষ মানুষগুলো তখন রসূল (সা) এর চার পাশে সমবেত হয়ে গেছে। সম্ভবত ঐ দিন থেকেই তাঁর মনে এই ভাবনা প্রবলতর হতে থাকে যে, এখন মক্কার বাইরে গিয়ে কাজ করা উচিত। আসলে একজন বিচক্ষণ ও প্রাজ্ঞ দাওয়াতদাতার এ রকম ভাবাটাই স্বাভাবিক। সে যখন নিজের প্রাথমিক কেন্দ্রে এতটা দাওয়াতী কাজ সম্পন্ন করে ফেলে, যার ফলে সেখানকার কার্যোপযোগী সব লোক দাওয়াত গ্রহণ করে এবং একগুয়ে হটকারী লোকেরা ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না, তখন সে আর ঐ জায়গায় পড়ে থেকে শক্তির অপচয় করেনা, বরং নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করে এবং পরিবেশ পরিবর্তন করে নতুন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েই রসূল (সা) মক্কার আশপাশে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তায়েফকে দাওয়াতের নতুন ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেন। যায়েদ বিন হারেসাকে সাথে নেন। তিনি তায়েফকে দাওয়াতের নতুন ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেন। যায়েদ বিন হারেসাকে সাথে নিয়ে একদিন মক্কা থেকে পায়ে হেটে রওনা হন। পথিমধ্যে যে সব গোত্রের বসতবাড়ী দেখতে পান তাদের সবার কাছে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেন। আসা যাওয়ায় তাঁর প্রায় এক মাস সময় অতিবাহিত হয়ে যায়।

তায়েফ ছিল ছাড়া সুনিবীড়, সুজলা-সুফলা, শস্যশ্যামলা, বাগবাগিচা ও ক্ষেতখামারে পরিপূর্ণ অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা আবহাওয়াযুক্ত একটা স্থান। অধিবাসীরা ছিল খুবই স্বচ্ছল, সুখী এবং অত্যধিক ভোগবিলাস ও আরাম আয়েশে মত্ত। আর্থিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের অধিকারী হলে সাধারণত আল্লাহকে ভুলে যায় এবং প্রবৃত্তির লালসা চরিতার্থ করার কাজে নিয়োজিত হয়। তায়েফবাসীর অবস্থা ছিল এ রকমই। মক্কাবাসীর মধ্যে তো তবু ধর্মীয় পৌরহিত্য ও দেশ শাসনের দায়িত্বের কারণে কিছুটা নৈতিক রাখঢাক থাকা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তায়েফবাসী ছিল একেবারেই বেপরোয়া ধরনের। উপরন্তু সুদখোরীর কারণে তাদের মানবতাবোধ সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এহেন জায়গায় সফরে যাওয়ার অর্থ হলো, রসূল (সা) মক্কার চেয়েও খারাপ জায়াগায় যাচ্ছিলেন।

বিশ্বমানবের পরম সুহৃদ মুহাম্মদ (সা) তায়েফ পৌঁছে সর্বপ্রথম সাকীফ গোত্রের সরদারদের সাথে সাক্ষাত করলেন। তারা ছিল তিন ভাই আবদ ইয়ালীল, মাসউদ ও হাবীব। এদের প্রত্যেকের ঘরে কোরায়েশ বংশোদ্ভ’ত বনু জামাহ গোত্রের এক একজন স্ত্রী ছিল। সে হিসাবে তিনি আশা করেছিলেন যে, তারা কিছুটা সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করতে পারে। রসূল (সা) তাদের কাছে গিয়ে বসলেন, তাদেরকে সর্বোত্তম ভাষায় আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন দাওয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনা করলেন এবং আল্লাহর সত্য দ্বীন প্রতিষ্ঠায় তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করলেন। কিন্তু এই তিন ব্যক্তি কেমন জবাব দিল দেখুনঃ

এক ভাই বললোঃ সত্যি যদি আল্লাহই তোমাকে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে তিনি কা’বা ঘরের গেলাফের অবমাননা করতে চান।

দ্বিতীয় ভাইঃ কি আশ্চর্য ! আল্লাহ তাঁর রসূল বানানোর জন্য তোমাকে ছাড়া আর কোন উপযুক্ত লোক পেলেন না !

তৃতীয় ভাইঃ আল্লাহর কসম, আমি তোমার সাথে কথাই বলবো না। কেননা তুমি যদি তোমার দাবী মোতাবেক সত্যি সত্যিই আল্লাহর রসূল হয়ে থাক, তাহলে তোমার মত লোককে জবাব দেয়া ভীষণ বেআদবী হবে। আর যদি তুমি আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে থাক, তাহলে তোমার সাথে কথা বলা যায় এমন যোগ্যতাই তোমার নেই।’

এর প্রতিটি কথা রসূল (সা) এর বুকে বিষমাখা তীরের মত বিদ্ধ হতে লাগলো। তিনি পরম ধৈর্য সহকারে মর্মঘাতী কথাগুলো শুনলেন এবং তাদের কাছে সর্বক্ষেত্রে অনুরোধ রাখলেন যে, তোমরা তোমাদের এ কথাগুলোকে নিজেদের মধ্যেই সীমিত রাখ এবং জনসাধারণকে এসব কথা বলে উস্কে দিওনা।

কিন্তু তারা ঠিক এর উল্টোটাই করলো। তারা তাদের শহরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট বখাটে তরুণদেরকে, চাকর নফর ও গোলামদেরকে রসূলের পেছনে লেলিয়ে দিল এবং বলে দিল যে, যাও, এই লোকটাকে লোকালয় থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এসো। বখাটে যুবকদের এক বিরাট দল আগে পিছে গালি দিতে দিতে, হৈ চৈ করতে করে ও পাথর ছুঁড়ে মারতে মারতে চলতে লাগলো। তারা তাঁর হাঁটু লক্ষ্য করে করে পাথর মারতে লাগলো, যাতে তিনি বেশী ব্যথ্যা পান। পাথরের আঘাতে আঘাতে এক একবার তিনি অচল হয়ে বসে পড়ছিলেন। কিন্তু তায়েফের গু-ারা তার বাহু টেনে ধরে দাঁড় করাচ্ছিল এবং পুনরায় হাঁটুতে পাথর মেরে তাতে তালি দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। ক্ষতস্থানগুলো থেকে অঝোরা ধারায় রক্ত ঝরছিল। এভাবে জুতোর ভেতর ও বাহির রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল। আর এই অপূর্ব তামাশা দেখার জন্য জনতার ভীড় জমে গেল। গু-ারা এভাবে তাকে শহর থেকে বের করে এক আঙ্গুরের বাগানের কাছে নিয়ে এল। বাগানটা ছিল রবিয়ার ছেলে উতবা ও শায়বার। রসূল (সা) একেবারে অবসন্ন হয়ে একটা আংগুর গাছে সাথে হেলান দিয়ে বসলেন। বাগারে মালিক তাঁকে দেখছিল এবং ইতিপূর্বে তাঁর ওপর যে অত্যাচার হচ্ছিল, তাও কিছুটা প্রত্যক্ষ করেছিল।

এখানে দু’রাকাত নামায পড়ে তিনি নিম্নের মর্মস্পর্শী দোয়াটা করলেনঃ

’হে আল্লাহ! আমি আমার দুর্বলতা, সম্বলহীনতা ও জনগণের সামনে অসহায়ত্ব সম্পর্কে কেবল তোমারই কাছে ফরিয়াদ জানাই। দরিদ্র ও অক্ষমদের প্রতিপালক তুমিই। তুমিই আমার মালিক। তুমি আমাকে কার কাছে সঁপে দিতে চাইছ? আমার প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে, নাকি শত্রুর কাছে? তবে তুমি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না থাক, তাহলে আমি কোন কিছুর পরোয়া করি নে। কিন্তু তোমার পক্ষ থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা পেলে সেটাই আমার জন্য অধিকতার প্রশস্ত। আমি তোমার কোপানলে অথবা আযাবে পতিত হওয়ার আশংকা থেকে তোমার সেই জ্যোতি ও সৌন্দর্যের আশ্রয় কামনা করি, যার কল্যাণে সকল অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তোমার সন্তোষ ছাড়া আমি আর কিছু কামনা করিনা। তোমার কাছ থেকে ছাড়া আর কোথাও থেকে কোন শক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।”

ইতিমধ্যে বাগানের মালিক এসে পড়লো। তার অন্তর সমবেদনায় ভরে উঠেছিল। সে তাঁর খৃস্টান গোলাম আদ্দাসকে ডাকলো এবং তাকে দিয়ে একটি পিরিসে করে আঙ্গুর পাঠিয়ে দিল। আদ্দাস আঙ্গুর দিয়ে রসূল (সা) এর সামনে বসে পড়লো। রসূল (সা) ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আঙ্গুরের দিকে হাত বাড়াতেই আদ্দাস বললো, ‘আল্লাহর কসম, এ ধরনের কথা তো এ শহরের লোকেরা কখনো বলেনা। রসূল (সা) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কোন শহরের অধিবাসী এবং তোমার ধর্ম কী? সে বললো, আমি খৃস্টান এবং নিনোভার অধিবাসী। রসূল (সা) বললেন, ‘তুমি তো দেখছি আল্লাহর সৎ বান্দা ইউনুস বিন মিত্তার শহরের লোক।’ আদ্দাস অবাক হয়ে বললো, ‘আপনি কিভাবে ইউনুস বিন মিত্তাকে চিনেন? রসূল (সা) বলেলেন, ‘উনি আমার ভাই। তিনিও নবী ছিলেন আর আমিও নবী।’ এ কথা শোনা মাত্রই আদ্দাস রসূল (সা) এর হাতে ও পায়ে চুমু খেতে লাগলো। রবীয়ার এক ছেলে চুমু খাওয়া দৃশ্য দেখে মনে মনে চটে গেল। আদ্দাস ফিরে গেলে তাকে সে ভর্ৎসনা করলে লাগলো যে, তুমি ও কী করছিলে? তুমি তো নিজের ধর্ম নষ্ট করে ফেলছিলে। আদ্দাস গভীর আবেগের সাথে বললো, “হে আমার মনিব, পৃথিবীতে এর চেয়ে উত্তম কোন জিনিস নেই। ঐ ব্যক্তি আমাকে এমন একটা কথা বলেছে যা নবী ছাড়া আর কারা জানা সম্ভব নয়।”

আসলে চাচা আবু তালেবের মৃত্যুর পর রসূল (সা) মক্কায় বাহ্যত একেবারে সহায়হীন ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর শত্রুদের শক্তি ও প্রতাপ বহুল পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। তাই ভেবেছিলেন তায়েফে হয়তো আল্লাহর কিছু বান্দাকে সাথী হিসেবে পাওয়া যাবে। অথচ সেখানেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হ’লো। সেখানে থেকে তিনি নাখলায় এসে অবস্থান করলেন। অতঃপর সেখান থেকে ফিরে এসে হেরা গুহায় উপনীত হলেন। এখান থেকে মুতয়াম বিন আদীকে (বয়কট চুক্তি বাতিলের উদ্যোক্তাদের অন্যতম) বার্তা পাঠালেন যে, “আপনি কি আমাকে নিরাপত্তামূলক আশ্রয় দিতে পারেন?” আরবের জাতীয় চরিত্রের একটা ঐতিহ্যবাহী বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কেউ নিরাপত্তামূলক আশ্রয় চাইলে তা তাকে দেয়া হতো চাই সে শত্রুই হোক না কেন। মুতয়াম রসূল (সা) এর অনুরোধ গ্রহণ করলো। সে তার ছেলেদেরকে নির্দেশ দিল, সশস্ত্র অবস্থায় কা’বার চত্তরে ঘোরাফিরা করবে এবং মুহাম্মাদের (সা) নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সে নিজে গিয়ে রসূল (সা) কে সাথে করে মক্কায় নিয়ে এল এবং উটের ওপর বসে ঘোষণা করলো, আমি মুহাম্মাদকে (সা) আশ্রয় দিয়েছি। মুতয়ামের ছেলেরা খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে পাহারা দিয়ে রসূল (সা) কে হারাম শরীফে নিয়ে এল এবং তারপর তাঁর বাড়ীতে পৌঁছালো।

তায়েফে রসূল (সা) এর যে দুরবস্থা হয়েছিল, ইতিহাসের ভাষা আমাদেরকে তার পূর্ণাংগ বিবরণ দিতে পারেনি। একবার হযরত আয়েশা (রা) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “হে রসূলুল্লাহ, আপনি কি ওহুদের চেয়েও কঠিন দিনের সম্মুখীন কখনো হয়েছেন?” তিনি জবাব দিলেনঃ “তোমার জাতি আমাকে আর যত কষ্টই দিয়ে থাকুক, আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টকর দিন ছিল তায়েফে যেদিন আমি আব্দ ইয়ালীলের কাছে দাওয়াত দিলাম। সে তা প্রত্যাখ্যান করলো এবং এত কষ্ট দিল যে, অতি কষ্টে কারনুস সায়ালেব নামক জায়াগায় পৌঁছে কোন রকমে রক্ষা পেলাম।” (আল মাওয়াহিবুল লাদুননিয়া, প্রথম খন্ড, ৫৬ পৃঃ)

নির্যাতনের চোটে অবসন্ন ও সংজ্ঞাহীন হয়ে যাওয়ার পর যিনি রসূল (সা) কে ঘাড়ে করে শহরের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন, সেই যায়েদ বিন হারেসা ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদোয়া করুন। রাসুল সাঃ বললেন, “আমি ওদের বিরুদ্ধে কেন বদদোয়া করবো? ওরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান নাও আনে, তবে আশা করা যায়, তাদের পরবর্তী বংশধর অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর এবাদত করবে।”

এই সফরকালেই জিবরীল এসে বলেন, পাহাড় সমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতারা আপনার কাছে উপস্থিত। আপনি ঈংগিত করলেই তারা ঐ পাহাড় দুটোকে একসাথে যুক্ত করে দেবে, যার মাঝখানে মক্কা ও তায়েফ অবস্থিত। এতে উভয় শহর পিষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু মানবতার বন্ধু মহান নবী এতে সম্মত হননি।

এহেন নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতেই জ্বিনেরা এসে রসূল (সা) এর কোরআন তেলাওয়াত শোনে এবং তাঁর সামনে ঈমান আনে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা রসূল (সা) কে জানিয়ে দিলেন যে, দুনিয়ার সকল মানুষও যদি ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে আমার সৃষ্ট জগতে এমন বহু জীব আছে, যারা আপনার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

 

শুভ দিনে পূর্বাভাস

তায়েফের অভিজ্ঞতা এতই মর্মান্তিক ছিল যে, তা অতিক্রম করতে গিয়ে রসূল (সা) দুঃখবেদনার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। এই সীমায় পৌঁছার পরই আল্লাহ মানুষের সাফল্যের দ্বার উদঘাটন করেন। সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা দৃশ্যত রসূল (সা) কে সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দিয়েছিল। আর এর অনিবার্য ফল স্বরূপ তাঁর মর্যাদা আল্লাহর দরবারে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছিল।

আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীদেরকে পাঠিয়ে যখনই হক ও বাতিলের সংঘাত লাগিয়েছেন, তখন সে সংঘাতকে একটা সুনির্দিষ্ট বিধির আওতাধীন করে দিয়েছেন। বিধিটি ছিল এই যে, বাতিল যখন সত্যের সৈনিকদের ওপর যুলুম নির্যাতন ও বলপ্রয়োগের শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, নির্যাতিত মোজাহেদরা যুলুম নিপীড়নের সব ক’টা স্তর একে একে চরম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে পার হয়ে যায় এবং সর্বশেষ প্রাণান্তকর সময়টাও অতিক্রম করে, কেবল তখনই আল্লাহর গায়েবী সাহায্যের সময় সমাগত হয়। জান্নাতমুখী পথগুলো কাঁটায় পরিপূর্ণ। এই পথে যারা চলে, তাদের সাফল্যের সুসংবাদ কখন আসে, সে কথা কোরআনে এভাবে বলা হয়েছেঃ

“তারেদ ওপর বিপদ মুসিবত ও দুর্যোগাদি এলো এবং তারা একেবারেই দিশেহারা হয়ে পড়লো। এমনকি রসূল এবং তাঁর সহচর মুমিনরা বলে উঠলো, কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য? (এ পর্যায়ে পৌঁছার পর তাদের সুসংবাদ দেয়া হয় যে) শুনে নাও, আল্লাহর সাহায্য নিকটে।” (বাকারাঃ ২১৪)

তায়েফের অভিজ্ঞতার পর রসূল (সা) যেন এই সর্বশেষ পরীক্ষা অতিক্রম করলেন। আল্লাহর বিধান অনুসারেই এখন নতুন যুগের সূচনা অবধাতির ছিল এবং এ সম্পর্কে সুসংবাদ দেয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছিল। এই সুসংবাদ দেয়ার উদ্দেশ্যেই রসূল (সা) কে মে’রাজ দ্বারা সম্মানিত করা হয়।

আসলে মে’রাজের তাৎপর্য হলো, রসূল (সা) কে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্যের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করা হয়। যে বিশ্ব সম্রাটের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে রসূল (সা) বেশ কয়েকটা বছর নানা রকমের দুঃখকষ্ট ও বিপদ মুসিবত ভোগ করলেন এবং বিভিন্ন অপশক্তির সাথে আদর্শিক ও চিন্তাগত যুদ্ধ করে কাটিয়ে দিলেন, সেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর দূতকে নিজের সর্বোত্তম উপাধিতে ভূষিত করার জন্য আপন দরবারে ডেকে পাঠান। যে বীর সেনানী জীবন ও জগত সংক্রান্ত মৌলিক সত্যগুলোকে মেনে নিতে স্বজাতিকে উদ্বুদ্ধ করার সংগ্রামে নেমে চারদিক থেকে ক্রমাগত আঘাতের পর আঘাত সহ্য করেছেন, মে’রাজের মাধ্যমে তাকে সুযোগ দেয়া হয় যেন, ঐ সত্যগুলোকে নিকট থেকে দেখে আসতে পারেন। বিশ্ব মানবতার সার্বিক কল্যাণ সাধনের সর্বাত্মক চেষ্টায় নিয়োজিত শেষ নবীকে এক বিরল সৌভাগ্যে ভূষিত করা হয় যেন, তিনি এই আন্দোলনের এক বিরাট ও সুপ্রাচীন কেন্দ্রে (বাইতুল মাকদাস) উপস্থিত হয়ে অতঃপর সেখান থেকে উর্ধ জগতে উড্ডয়ন করে এই আন্দোলনের সাবেক নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হতে পারেন।

পূর্বতন নবীগণকে অদৃশ্য সত্যগুলোকে দর্শন ও আল্লাহর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে উপনীত হবার মাধ্যমে বিশেষ অনুগ্রহ লাভের সুযোগ দেয়া হতো। কোরআনে একদিকে যেমন হযরত ইবরাহীম আ. সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাঁকে…… আকাশ ও পৃথিবীর সাম্রাজ্য পরিদর্শন করানো হয়েছিল। অপরদিকে তেমনি হযরত মূসা আ. কে তূর পর্বতে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে আল্লাহ তা’য়ালা একটা আলোকময় গাছের আড়াল থেকে… ‘আমি আল্লাহ’ বলে ঘোষনা দিয়ে তাঁর সাথে কথোপকথন করেন। অন্য এক সময় এরূপ ঘনিষ্ঠ পরিবেশেই তাকে শরীয়তের বিধান প্রদান করা হয়। মোটকথা সকল বড় বড় নবী কোন না কোন পন্থায় মে’রাজের সুযোগ লাভ করেছিলেন। তবে রসূল সা. এর মে’রাজ ছিল পূর্ণাংগ।

তয়েফ ও হিজরতের ঘটনার মাঝখানে মে’রাজের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৈশিষ্টমন্ডিত আর কোন ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনার খবর যখন তিনি জানালেন তখন মক্কায় হৈ চৈ পড়ে গেল। তিনি ঐ রাতে কোথায় কোথায় কী কী দেখেছেন সব খোলাখুলি বর্ণনা করলেন। বাইতুল মাকদাসের আকৃতির পুরো ছবি তুলে ধরলেন। পথিমধ্যকার এমন সব সুনিশ্চিত আলামতও বর্ণনা করলেন যা পরে নির্ভুল বলে প্রমাণিত হয়।

ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে অবস্থানের এই সৌভাগ্যময় মহূর্তে যে বিশেষ ওহী নাযিল করা হলো, সেটাই সূরা বনী ইসরাইলের আকারে আমাদের কাছে বিদ্যমান। ঐ সূরা শুরুই হয়েছে মে’রাজের ঘটনা দিয়ে। আর গোটা সূরাই মে’রাজের প্রেরণায় সিক্ত। ঐ সূরার নিন্মোক্ত বক্তব্যগুলো বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়ঃ

১- বনী ইসরাইলের শিক্ষাপ্রদ ইতিবৃত্ত সামনে রেখে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর আইন বড় বড় শক্তিধর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে পর্যন্ত জবাদিহীর কাঠগড়ায় দাঁড় করায় এবং তারা্ বিপথগামী হলে তাদেরকে অন্য কোন অনুগত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দিয়ে পিটিয়ে দেয়া হয়। অপর দিকে এ কথাও শেখানো হয়েছে যে, বিজয় ও সফলতার যুগে পৌছে তারাও যেন বনী ইসরাইলের মত আচরণ শুরু করে না দেয়।

২- চরম প্রতিকূল পরিবেশে দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলা হয়, সত্য সমাগত, বাতিল পরাভূত (আয়াত-৮৯) অর্থাৎ অন্ধকার তখন দূরীভূত হবে এবং প্রভাতের আবির্ভাব ঘটবে।

৩- আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে এ কথাও জানিয়ে দেন যে, মক্কাবাসী এবার আপনাকে মক্কা থেকে তাড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু আপনাকে বহিষ্কার করার পর বেশী দিন শান্তিতে থাকতে পারবেনা।(আয়াত-৭৬) হিজরতের যে দোয়া আল্লাহ শেখালেন তার ভাষা ছিল এ রকমঃ “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সত্যের দরজা দিয়ে প্রবেশ করান এবং সত্যের দরজা দিয়েই(বর্তমান পরিবেশ থেকে) বের করুন, আর আমাকে আপনার পক্ষ থেকে সাহায্য হিসাবে শাসন ক্ষমতা দান করুন।”-(আয়াত-৮০) এ দোয়ায় শাসন ক্ষমতার প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে প্রকারন্তরে সুসংবাদ দেয়া হলো যে, হিজরতের পরবর্তী সময়টা আধিপত্য ও শাসনের যুগ হবে।

৪- ২২ থেকে ২৯ নং আয়াতে একাধারে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রাথমিক মূলনীতি সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে, যাতে করে ঐ মূলনীতি সমূহের ভিত্তিতে নতুন সমাজ ও নতুন সভ্যতা গড়ে তোলা হয়।

মে’রাজের প্রাক্কালীন ওহীর এই বক্তব্য সমূহ বক্ষে ধারণ করে যখন রসূল সা. ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করতেন, তখন সম্ভবতঃ আকাশ থেকে আলোর এক বিরাট স্রোতধারা নেমে আসতে দেখতেন। মক্কার এই ভীতিময় পরিবেশে যদি তাঁর পরিবর্তে অন্য কোন বস্তুবাদী নেতা থাকতো, তাহলে সে হয়তো হতাশ হয়ে নিজের সমস্ত কর্মসূচী ও তৎপরতা বন্ধ করে দিত। কিন্তু রসূল সা. চরম প্রতিকূল ও হতাশঅব্যঞ্জক পরিবেশের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়েও নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতেন যে, প্রভাত আসছে। এই প্রভাত সমীরণের একটা ঝাপটা এসে যেন রসূলের সা. কানে কানে এ কথাও বলে দিয়েছে যে, নতুনপ্রভাতের সূর্যদয় আর কোথাও নয় মদিনায়ই ঘটবে। কেননা ওখানকার তরুণরা পরম পরিতৃপ্তি ও আন্তরিকতার সাথে ইসলামী আন্দোলনে দীক্ষিত হতে আরম্ভ করেছিল।

মক্কী জীবনের অবসান কালে রসূল সা. তায়েফকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়েছিলেন যে, তুমি কি সত্যের মশাল বহন করতে পারবে? তায়েফ জবাব দিল, আমি তো এ কাজে মক্কার চেয়েও অযোগ্য। এই হতাশাব্যঞ্জক জবাব শুনে রসূল সা. যখন পরবর্তী কর্মসূচী স্থির করার চিন্তায় মগ্ন, তখন ইয়াসরিব বললো, ‘আমি মদিনাতুন নবী (নবীর শহর) হতে প্রস্তুত। আমি সত্যের মশাল উঁচু করবো এবং সারা দুনিয়াকে আলোকিত করবো। আমার বুকের ওপর সত্য ও ন্যায়ের বিধান লালিত হবে। আমার কোলে এক নতুন ইতিহাস বিকাশ লাভ করবে।’ তায়েফ নিকটে থেকেও দূরে সরে গেল। ইয়াসরিব দূরে থেকেও নিকটে এসে গেল।

নবুয়তের একাদশ বছর ইয়াসরিব থেকে আগত ৬ জন বিপ্লবী যেদিন রসূল সা. এর সাথে অংগীকারে আবদ্ধ হলো, সেদিন ইয়াসরিব আরো নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। বিস্তারিত আলাপ আলোচনার পর তারা ইসলামের তাওহীদ ও নৈতিক বিধিবিধান মেনে চলার যে শপথ করেন, তাকেই বলা হয় আকাবার প্রথম বায়াত। এরপর হজ্জের সময় আরো একটা বড় দল মদিনা থেকে আসে। তারাও রাতের অন্ধকারে এক গোপন বৈঠকে আকাবার দ্বিতীয় বায়য়াত সম্পন্ন করেন। এটি ছিলো পুরোপুরি রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত চুক্তি। এতে রসূল সা. এর হিজরত করে মদিনায় চলে যাওয়া স্থির হয় এবং এমন সর্বাত্মক ত্যাগের মনোভাব প্রতিফলিত হয় যে, মদিনার আনসারগণ রসূল সা. জন্য সমগ্র দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে প্রস্তুত থাকার কথা ঘোষণা করেন।

তায়েফ সফর ও হিজরতের মধ্যবর্তী সময়টাতেই সম্ভবত সূরা ইউসুফ নাযিল হয়েছিল। এ সূরায় অন্য একজন নবী হযরত ইউসুফের জীবন কাহিনী বর্ণনা করে রসূল সা. কে সুসংবাদ দেয়া হয় এবং তাঁর শত্রুদেরকে তাদের অমানুষিক নির্যাতনমূলক কর্মকান্ড সম্পর্কে সাবধান করে তাদের শোচনীয় পরিণতি জানিয়ে দেয়া হয়।

 

বিদায় হে মক্কা!

অস্থিতিশীল নিমজ্জমান সমাজ ব্যবস্থার শেষ অস্ত্র হয়ে থাকে সহিংসতা, সন্ত্রাস ও নির্যাতন নিপীড়ন। এতেও যদি প্রতিপক্ষকে দমন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সংস্কার বিরোধীরা বিপ্লবী আন্দোলনের মূল নায়ককে হত্যা করতে কৃত সংকল্প হয়। মক্কাবাসীতো আগে থেকেই আক্রোশে অধীর ছিল এবং তাঁকে খতম করে দিতেই উৎসুক ছিল। কিন্তু পেরে ওঠেনি। এবার চরম মহুর্ত উপস্থিত। দ্বন্দ্ব সংঘাত একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল। একটা হেস্তনেস্ত হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ছাঁটাই বাছাই হয়ে পরস্পর থেকে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে। আকীদা বিশ্বাস ও মনমানসিকতার দিক দিয়ে একটা সুস্পষ্ট সীমারেখা চিহ্নিত হয়ে গেছে। এক পক্ষ এই সীমারেখার ওপারে রয়ে গেছে, আর এক পক্ষ এপারে। কোন পক্ষেরই আর ঐ সীমারেখা অতিক্রম করার সুযোগ নেই। ইসলামী আন্দোলন এখন একটা সুসংগঠিত ও সংঘবদ্ধ শক্তি। এর দলীয় শৃংখলা অটুট এবং চারিত্রিক মান অত্যন্ত উন্নত। এর যুক্তি খুবই ধারালো এবং আবেদন অসাধারণ রকমের চিত্তাকর্ষক। এর নেতা ও কর্মীদের ওপর পরিচালিত যুলুম নিপীড়ন জনগণের হৃদয় জয় করার ক্ষমতা রাখে। সত্যের ক্ষুদ্র চারাগাছটা পরিণত হয়েছে বিশাল মহীরূহে। জাহেলী সমাজের কর্ণধারদের কাছে কালও যে আশংকা ছিল নিছক আনুমানিক, আজ তা বাস্তব। উদ্ভুত উপস্থিতি তাদের কাছে দাবী জানাচ্ছিল যে, এই আশংকাকে প্রতিহত করার ক্ষমতা যদি তোমাদের থেকে থাকে, তবে প্রতিহত কর। অন্যথায়, নবাগত যুগের যে আলোর সয়লাব আসছে, তাতে তোমাদের ধর্ম, পদ পদবী, জাহেলী ঐতিহ্য-সব কিছুই ভেসে যাবে। তারপর তোমাদের উদ্ধত মস্তককে নোয়াতে হবে মুহাম্মদ ও তাঁর আদর্শের সামনে। জাহেলিয়াতের নেতারা ইতিহাসের এ চ্যালেঞ্জ শুনতে পাচ্ছিলো এবং ক্রমাগত উৎকন্ঠিত হচ্ছিলো। তাই এই পর্যায়ে উপনীত হয়ে রসূল সা. এর রক্তপিপাসু দুশমনেরা তাঁর বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর চক্রান্তের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায়।

ইসলামী আন্দোলনের সাথীদের জন্য যে মক্কা জ্বলন্ত চুলোর রূপ ধারণ করেছিল তা এমনিতেও উত্তাপের সর্বোচ্চ মাত্রায় উপনীত হয়েছিল। নির্যাতন ও নিপীড়ন অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। কোরায়েশ নরপশুরা তাদের যুলুমের ষ্টীম রোলার চালিয়ে সত্যের নিশানাবাহীদের জীবন দুর্বিষহ করে এবং তাদের ধৈর্যর বাঁধ ভেংগে গিয়েছিল। এর স্পষ্ট অর্থ ছিল এই যে, এ পরিস্থিতিতে কোন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসন্ন, কোন মুক্তির পথ বেরিয়ে আসা অবধারিত এবং ইতিহাসের কোন নতুন অধ্যায় সংযোজন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কোরায়েশ তাদের জন্য এক বিরাট সৌভাগ্যের দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। তারা নিজেদেরকে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হবার অযোগ্য প্রমাণ করেছিল। এহেন মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশে মে’রাজের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যখন রসূল সা. উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুসংবাদ দিলেন, আভাসে ইংগিতে হিজরতের পথ উন্মুক্ত হওয়ার ও তারপর ক্ষমতার যুগ শুরু হওয়ার আশ্বাস দিলেন, তখন মুসলমানদের মধ্যে নতুন আশা উদ্দীপনা সঞ্চারিত হলো। যারা সহিংসতার স্বীকার হয়েছিল, তারা সান্ত্বনা পেল এবং তাদের উৎসাহ বৃদ্ধি পেল। তারপর যখন রসূল সা. সেই প্রতিশ্রুত মহুর্তটি ঘনিয়ে আসতে দেখলেন তখন তার আবেগ ও অনুভূতি তুংগে উঠলো। তিনি গায়েবী সূত্র থেকে বুঝতে পারলেন যে, ভবিষ্যতের সেই হিজরতের স্থান হবে মদিনা। একদিকে পরিস্থিতির সুস্পষ্ট সাক্ষ্য, বিশেষতঃ আকাবার বায়য়াতের দুটো ঘটনা, অপর দিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত তথ্য থেকে এটা জানা যাচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে রসূল সা. তাঁর সাথীদের মদিনা চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন এবং সাহাবীগণ একের পর এক চলে যেতে লাগলেন। ক্রমান্বয়ে অনেকেই চলে গেল। মহল্লার পর মহল্লা খালি হয়ে গেল। একবার আবু জাহল অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কোরায়েশ নেতা বনু জাহশ গোত্রের শূন্য বাড়ীঘর দেখে মন্তব্য করলোঃ

‘এটা আমাদের ভাতিজার(মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কীর্তি। সে আমাদের ঐক্য ভেঙ্গে দিয়েছে। আমাদের সমাজকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। আমাদের পরস্পরের মধ্যে ভাংগন লাগিয়ে দিয়েছে।’ (সীরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃঃ ১১৪) সাথীদেরকে মদিনা পাঠানো সত্ত্বেও রসূল সা. নিজ দাওয়াতের কেন্দ্রভূমি ত্যাগ করেননি। তিনি আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষায় ছিলেন। কোরায়শরা আটক করে রেখেছিলেন কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিল, এমন স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তি ছাড়া কোন মুসলমানই আর মক্কায় অবশিষ্ট ছিল না। তবে ঘনিষ্ঠ সাথীদের মধ্যে যখন হযরত আবু বকর ও হযরত আলী তখনো মক্কায় ছিলেন। এহেন পরিস্থিতিতে যখন কোরায়েশরা বুঝতে পারলো যে, মুসলমানরা যখন একটা ঠিকানা পেয়ে গেছে এবং এক এক করে সবাই চলে গেছে, তখন মুহাম্মদ সা. অচিরেই আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। এরপর আমাদের আওতার বাইরে গিয়ে শক্তি অর্জন করবে এবং অতীতের সব কিছুর প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। তখন তারা সবাই মক্কার গণ মিলনস্থল ‘দারুননাদওয়া’তে সমবেত হলো এবং সলাপরামর্শ করতে লাগলো, মুহাম্মদের বিরদ্ধে এখন কী পদক্ষেপ নেয়া যায়। একটা প্রস্তাব এল, তাঁকে কোন লোহার তৈরী হাজতখানায় আটক করা হোক এবং দরজা বন্ধ করে রাখা হোক। এতে আপত্তি তোলা হলো যে, সে এমন এক ব্যক্তি, যার কথা বদ্ধ লোহার ঘর থেকেও বাইরে চলে যাবে। অন্য কোন উপায় খুঁজতে হবে। মজলিসের জনৈক সদস্য প্রস্তাব দিল, তাঁকে মক্কা থেকে বের করে দেয়া হোক। তারপর তার কী পরিণতি হয় তা দিয়ে আমাদের কী কাজ। কিন্তু এ প্রস্তাবেও আপত্তি উঠল। অনেকে বললো, তোমরা কি তার চিত্তাকর্ষক কথাবার্তা খবর রাখ না? সে কেমন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, তা কি তোমরা জাননা? এ সব জিনিসই তো তার জনমনে এত ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতারকারণ। এ পদক্ষেপ নিলে তার কবল থেকে তোমরা রেহাই পাবানা। সে আরবদের ওপর সর্বাত্মক প্রভাব বিস্তার করবে এবং নিজের বাগ্মীতার জোরে তাদেরকে স্বমতে দীক্ষিত করে ফেলবে। তারপর সমগ্র আরব জনগণকে সাথে নিয়ে তোমাদের ওপর হামলা চালাবে, ক্ষমতার বাগডোর তোমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে এবং তারপর তোমাদের সাথে যেমন খুশী আচরণ করবে। এবার ধুরন্ধর আবু জাহল এক সুচতুর কৌশল উদ্ভাবন করলো। সে বললো, মক্কার প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন শক্তিশালী ও প্রতাপশালী যুবককে বেছে নিয়ে তাদের সবাইকে তলোয়ার দিতে হবে এবং তারা সবাই একযোগে আক্রমন চালিয়ে মুহাম্মদকে সা. হত্যা করবে। এভাবেই আমরা তার খপ্পর থেকে মুক্তি পেতে পারি। এতে মুহাম্মদের খুনের দায়দায়িত্ব ও রক্তপণ সকল গোত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। বনু হাশেম গোত্র একাকী এত সব গোত্রের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারবে না এবং সে সাহস ও করবেনা। ব্যাস, এই কৌশলটাই সবার মনোপুত হয়ে গেল এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে এই ষড়যন্ত্রমূলক বৈঠক সমাপ্ত হলো। এই বৈঠকের সম্পর্কে কোরআন নিম্নরূপ পর্যালোচনা করেছেঃ

“আর সেই সময়টার কথা স্মরণ কর, যখন কাফেররা তোমাকে বন্দী করা, হত্যা করা বহিষ্কার করার ফান্দি আঁটছিল। তারা তাদের পছন্দমত চক্রান্ত আটে, আর আল্লাহ পাল্টা পরিকল্পনা করেন। আল্লাহ সবার চেয়ে দক্ষ পরিকল্পনাকারী।” (সূরা আনফাল-৩০)

রহস্যঘেরা সেই কালো রাত সামনে। দুপুর বেলা রসূল সা. তাঁর প্রিয়তম ও ঘনিষ্ঠতম সহচর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. এর বাড়ীতে গেলেন। গিয়ে গোপনে জানালেন, হিজরতের অনুমতি পেয়ে গেছি। হযরত আবু বকর রা. তার সহযাত্রী হবার অনুমতি চাইলেন। এ অনুমতি তিনি চাওয়ার আগেই পেয়েছিলেন। এ সৌভাগ্য লাভের জন্য আনন্দের আতিশয্যে হযরত আবু বকরের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। তিনি হিজরতের জন্য আগে থেকেই দুটো উটনীকে ভালোভাবে খাইয়ে দাইয়ে মোটাতাজা করে রেখেছিলেন। ঐ উটনী দুটো দেখিয়ে তিনি রসূল সা. কে বললেন, এই দুটোর যেটা আপনার ভালো লাগে হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করুন। কিন্তু রসূল সা অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ‘জায়দা’ নামক উটনীটাকে মূল্য দিয়ে কিনে নিলেন। রাত হলে রসূল সা. আল্লাহর ইংগিতক্রমে নিজের ঘরে ঘুমালেন না। তাঁর অপর প্রিয়তম সাথী হযরত আলীকে আপন বিছানায় নির্ভয়ে ঘুমানোর নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে লোকজনের রক্ষিত আমানতগুলো তাঁর কাছে অর্পণ করলেন এবং সকাল বেলা সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে ফেরত দিতে বললেন। এত উঁচু মানের নৈতিকতার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে আর কটাই বা আছে যে, এক পক্ষ যাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে, সে স্বয়ং হত্যাকারীদের আমানত ফেরত দেয়ার চিন্তায় বিভোর? এর পর রসূল সা. হযরত আবু বকর সিদ্দীকের বাড়ীতে চলে গেলেন। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর দ্রুত নিজের কোমরের বেল্ট কেটে দুটো বানালেন এবং একটি দিয়ে খাবারের পুটুলি ও অপরটা দিয়ে পানির মসকের মুখ বাঁধলেন। সত্যের পথের এই দুই অভিযাত্রী রাতের আধারে রওয়ানা হয়ে গেলেন।

আজ বিশ্বমানবতার সবচেয়ে বড় উপকারী ও শুভাকাংখী বন্ধুর সা. একেবারেই বিনা অপরাধে আপন ঘরবাড়ী থেকে বিতাড়িত হবার দিন। আজ তিনি সেই সব অলিগলিকে বিদায় জানাতে জানাতে যাত্রা করেছেন, যেখানে চলাফেরা করে তিনি বড় হয়েছেন, যার ওপর দিয়ে তিনি সত্যের বাণী সমুন্নত করতে হাজার হাজার বার দাওয়াতী সফর করেছেন, যেখানে তিনি অসংখ্য গালাগাল খেয়েছেন এবং নির্যাতন সয়েছেন। আজ তাঁর হারাম শরীফের পবিত্র আধ্যাত্মিক কেন্দ্র থেকে বিদায় নেয়ার পালা, যেখানে তিনি বহুবার সিজদা করেছেন, বহুবার আপন জাতির কল্যাণ ও সুখশান্তির জন্য দোয়া করেছেন, বহুবার কোরআন পড়েছেন, বহুবার এই চত্তরে ও নিরাপত্তার গ্যারান্টিযুক্ত এই একমাত্র আশ্রয়স্থলেও বিরোধীদের হাতে নিপীড়িত হয়েছেন এবং মর্মঘাতী বোলচাল শুনেছেন। যে শহরে হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ. এর পবিত্র স্মৃতি ও কীর্তি রক্ষিত এবং যে শহরের আকাশ বাতাস আজও তাঁর দোয়ায় মুখরিত, সেই শহরকে আজ তাঁর শেষ সালাম নিবেদন করতে যাচ্ছেন।

এটা করতে গিয়ে তাঁর হৃদয় যে বিদীর্ণ হয়ে গেছে, কলিজা যে কেটে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে, চোখে যে অশ্রুর বান ডেকেছে, সেতো সম্পুর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও জীবনের লক্ষ্য অর্জনে যেহেতু এ কুরবানীর প্রয়োজন ছিল, তাই শ্রেষ্ঠ মানব এ কুরবানীও দিতে দ্বিধা করলেন না।

আজ মক্কার দেহ থেকে যেন তাঁর প্রাণ বেরিয়ে গেছে। মক্কার বাগানের ফুল থেকে যেন সুগন্ধি হারিয়ে গেছে। এর ঝর্ণা যেন শুকিয়ে গেছে। কারণ তার সমাজের ভেতর থেকে নীতিবান ও চরিত্রবান লোকগুলো বেরিয়ে গেছে।

সত্যের দাওয়াতের চারা গাছটি মক্কার মাটিতেই জন্মেছিল। কিন্তু তার ফল আহরণ করার সৌভাগ্য মক্কাবাসীর কপালে জোটেনি। এ সৌভাগ্য অর্জন করল মদিনাবাসী এবং সারা দুনিয়ার অধিবাসীরা। মক্কাবাসীকে আজ ধাক্কা দিয়ে পিছনে হটিয়ে দেয়া হলো এবং মদিনাবাসীর জন্য সামনের কাতারে জায়গা বানানো হলো। যারা নিজেদেরকে বড় মনে করত, অভিজাত ও কুলীন মনে করত, তাদেরকে নিম্নতর স্তরে নামিয়ে দেয়া হলো। আর যাদেরকে অপেক্ষাকৃত নীচ মনে করা হতো, তাদের জন্যই আজকের দিনে বরাদ্দ হলো উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠতর স্থান।

রসুল সা. শেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মক্কাকে বললেনঃ

“আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর সবোর্ত্তম ভূখণ্ড এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে সবার্পেক্ষা প্রিয় ভূখণ্ড। আমাকে এখান থেকে জোরপূবর্ক তাড়িয়ে দেয়া না হলে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” (তিরমিযী)

কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সূর পবর্ত গুহায় উপনীত হলেন।

কোন্‌ পথ ধরে যেতে হবে, সেটা স্বয়ং রাসুল সা. নির্ধারণ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ বিন আরিকতকে নির্দিষ্ট মজুরীর ভিত্তিতে পথ প্রদর্শক নিয়োগও তিনিই করলেন। তিনি তিন দিন গুহায় কাটালেন। হযরত আবু বকরের ছেলে আব্দুল্লাহ রাতে মক্কার সমস্ত খবর পৌছাতেন। আমের বিন ফুহাইরা (হযরত আবু বকরের ক্রীতদাস) মেষপাল নিয়ে সারাদিন গুহার আশপাশ দিয়ে চরিয়ে বেড়াতো, আর অন্ধকার হলে গুহার কাছে নিয়ে যেত, যাতে হযরত আবু বকর ও রসূল সা. প্রয়োজনীয় দুধ নিতে পারেন।

এদিকে কোরায়েশরা সারা রাত রসূল সা. এর বাড়ী ঘেরাও করে রাখলো। তাছাড়া পুরো শহরের চতুঃসীমানাও বন্ধ করে রাখা হলো। কিন্তু সহসা যখন তারা জানতে পারলো যে, সেই ইপ্সিত ব্যক্তিটাই হাতছাড়া হয়ে গেছে, তখন তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। রসূল সা. এর বিছানায় আলীকে দেখে তারা গভীর হতাশায় ভেঙ্গে পড়ল এবং তাঁকে অনেক বকাবকি করে গায়ের ঝাল মিটিয়ে চলে গেল। চারদিকে তালাশ করতে লোক পাঠানো হলো। কিন্তু কোন হদিসই মিললোনা। একটা দল অনেক দৌড়ঝাপ করে সূর পবর্তগুহার ঠিক মুখের উপর এসে পড়লো। ভেতর থেকে তাঁদের পা পর্‍যন্ত দেখা যেতে লাগল। কী সাংঘাতিক নাজুক মূহুর্ত ছিল সেটি, তা ভাষায় বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। হযরত আবু বকর এই ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন যে, এই লোকগুলো গুহায় ঢুকে পড়লে গোটা ইসলামী আন্দোলন হুমকীর সম্মুখীন হবে। এরূপ মূহুর্তে সাধক মানবীয় স্বভাবপ্রকৃতির অধিকারী কোন মানুষের ভেতর যে ধরণের অনুভূতি সৃষ্টি হওয়ার কথা, হযরত আবু বকরের মধ্যে সে ধরণেরই অনুভূতি জন্মেছিল। কিন্তু যেহেতু রসূল সা. কে আল্লাহর কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল, এবং তাঁর পক্ষ থেকে সাহায্য ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, তাই তিনি নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, আল্লাহ আমাদেরকে নিরাপদে রাখবেন। তথাপি হযরত মূসার কাছে যেমন ওহি যোগে ‘ভয় পেয়োনা’- এই আশ্বাসবাণীটা এসেছিল,তেমনি রসূল সা. এর কাছেও এল। তিনি সাথী আবু বকরকে বললেন “তুমি চিন্তা করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” তাই দেখা গেল, যারা গর্তের মুখের কাছে এসেছিল, তারা এখান থেকেই ফিরে গেল।

তিন দিন গুহার মধ্যে অবস্থান করার পর রসূল সা. হযরত আবু বকর ও পথ প্রদর্শক আমের বিন ফুহাইরাকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। কোরায়েশের গোয়েন্দারা যাতে তাদের পিছু নিতে না পারে, সে জন্য সাধারণ চলাচলের পথ বাদ দিয়ে সমুদ্রোপকূলের দীর্ঘ পথ অবলম্বন করা হয়। এদিকে মক্কায় ঘোষণা করা হয় যে, মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর- এই দু’জনের যে কোন একজনকেও কেউ যদি হত্যা অথবা গ্রেফতার করতে পারে, তবে তাকে শত শত উট পুরস্কার দেয়া হবে। অনেকেই খোঁজাখুঁজিতে ব্যাপৃত হয়ে পড়ে। সুরাকা বিন জা’সাম খবর পেল যে, এ ধরণের দু’জনকে উপকূলীয় সড়কে দেখা গেছে। সে একটা বর্শা হাতে ঘোড়া হাঁকিয়ে রওনা হয়ে গেল। কাছাকাছি এসেই সুরাকা যখন ত্বরিত গতিতে ধাওয়া করলো, অমনি তার ঘোড়ার সামনের দু’পা মাটিতে দেবে গেল। সুরাকা দু’তিনবার ব্যর্থ চেষ্টা চালানোর পর ক্ষমা চাইল এবং একটা লিখিত নিরাপত্তানামাও চাইল। এর অর্থ দাঁড়ায়, সে উপলব্ধি করল যে, এই ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে একটা নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। নিরাপত্তানামা লিখে দেয়া হলো। সেই নিরাপত্তানামা মক্কা বিজয়ের দিন কাজে লাগলো। এই সময় রসূল সা. সুরাকাকে এই বলে সুসংবাদও দিলেন যে, ‘হে সুরাকা, তুমি যেদিন ইরানের সম্রাটের কংকন পরবে, সেদিন তোমার কেমন মর্‍যাদা হবে দেখ।’ হযরত ওমরের খেলাফত যুগে ইরান জয়ের সময় এ ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয়েছিল। এই সময় হযরত যোবায়ের ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে সিরিয়া থেকে আসছিলেন। পথিমধ্যে তিনি রসূল সা. ও আবু বকরের সাথে মিলিত হন এবং উভয়কে সাদা পোশাক হাদিয়া দেন।

এই সফর কালে বারীদা আসলামীও ৭০ জন সাথী সমেত তাঁদের সাথে সাক্ষাত করেন। মূলত তাঁরা পুরস্কারের লোভে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু সামনে আসামাত্রই বারীদার মধ্যে পরিবর্তন এল। পরিচয় গ্রহণের সময়ই যখন রসূল সা. তাকে সুসংবাদ দিলেন যে, “তোমার অংশ নির্ধারিত হয়ে গেছে” (অর্থাৎ তুমিও ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে অবদান রাখবে এটা নির্ধারিত হয়ে গেছে)। তখন বারীদা তাঁর সত্তর জন সাথীসহ ইসলাম গ্রহণ করলো। এরপর বারীদা বললো, ‘রসূল সা. মদিনায় প্রবেশকালে তাঁর সামনে একটা পতাকা থাকা উচিত।’ রসূল সা. সম্মতি দিলেন এবং নিজের পাগড়ি বর্শার মাথায় বেঁধে বারীদার হাতে সমর্পণ করলেন। এই পতাকা উড়িয়ে এই কাফেলা মদিনায় প্রবেশ করলো।

*******

“অবশ্য অবশ্য তোমাদেরকে প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করা হবে। আর আহলে কিতাব ও মোশরেক- উভয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে তোমাদের অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনতে হবে। এ সব পরীক্ষায় তোমরা অবিচল থাকতে পারলে এবং (নোংরামি থেকে) সংযত থাকলে নিঃসন্দেহে সেটা হবে সাহসিকতাপূর্ণ কীর্তি।” (আল ইমরান, ১৮৬)

*******

‘কোন নবীর প্রতি তাঁর আত্মীয় স্বজনের যতটা অসদাচারী হওয়া সম্ভব, তোমরা ততটাই অসদাচারী ছিলে। তোমরা আমাকে অবিশ্বাস করলে আর অন্যরা আমার সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিল। তোমরা আমাকে মাতৃভূমি থেকে বহিষ্কার করলে, আর অন্যরা আমাকে নিজেদের কাছে ঠাই দিল। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে। আর অন্যরা আমার সহযোগিতা করলো।’

- বদরের ময়দানে মোশরেকদের লাশকে সম্বোধন করে দেয়া রসূল সা. এর ভাষণ।

 

মাদানী অধ্যায়ে মানবতার বন্ধু সা.

ইতিহাসের পট পরিবর্তন

“অতি প্রত্যুষে উম্মে আহমদ আমাকে দেখলো, আমি যে ব্যক্তিকে না দেখেও ভয় পাই, তাঁর হেফাযতে বেরিয়ে যাচ্ছি, তখন সে বলতে লাগলো, তোমার যদি চলে যেতেই হয় তবে ইয়াসরিবে যেয়োনা, আমাদেরকে অন্য কোথাও নিয়ে চল।

আমি তাকে জবাব দিলাম, এখন ইয়াসরিবই আমাদের গন্তব্যস্থল। দয়াময় আল্লাহ যেদিকেই বান্দাকে নিতে চান, বান্দা সেদিকেই রওনা হয়।

কত যে প্রিয় সাথী ও শুভাকাংখীকে আমরা পেছনে ছেড়ে এসেছি এবং কত যে বেদনা ভারাক্রান্ত মহিলাকে অশ্রু বিসর্জন দিতে দেখে এসেছি, তার ইয়ত্তা নেই।

তুমি তো ভাবছ, আমাদেরকে যারা বহিষ্কার করেছে, তাঁদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের যোগ্যতা অর্জনের জন্য আমরা মাতৃভূমি ছেড়ে যাচ্ছি। অথচ আমাদের অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে।

এক পক্ষ আমরা, আর অপর পক্ষ হলো আমাদের সেই সব বন্ধু, যারা সত্য পথ থেকে দূরে সরে গেছে এবং আমাদের ওপর নির্‍যাতনের অস্ত্র প্রয়োগ করে হাঙ্গামা বাধিয়েছে।

এই দুটো বিবাদমান পক্ষের একটা সত্যের পতাকা ওড়াবার সৌভাগ্য লাভ করেছে এবং সঠিক পথে পরিচালিত হয়েছে। আর অপর পক্ষ আল্লাহর আযাবের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।

রক্ত সম্পর্কের দিক থেকে যদিও তাঁরা আমাদের ঘনিষ্ট আত্মীয়, কিন্তু (আদর্শ ও লক্ষ্যের ঐক্য ভিত্তিক) আন্তরিক সম্পর্ক যেখানে থাকেনা, সেখানে কেবল রক্ত সম্পর্ক অচল।

এমন একদিন আসবে, যেদিন তোমাদের ঐক্য ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। তোমাদের সামষ্টিক অস্তিত্ব ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে। তখন তুমি ভালো ভাবেই জানবে, আমাদের উভয় গোষ্ঠীর মধ্যে কারা সত্যের পথে রয়েছে।”

(আবু আহমাদ বিন জাহাশের হিজরত সংক্রান্ত কবিতার সার সংক্ষেপ)

মানবতার সবচে বড় বন্ধু এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইতিহাসের স্রষ্টা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেতিহাসের মক্কী যুগটা দাওয়াত ও আদর্শ প্রচারের যুগ। আর মাদানী যুগ শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের যুগ। মক্কায় লোক তৈরী করা হয়েছে। আর মদিনায় সামষ্টিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মক্কায় মালমসলা তৈরী করা হয়েছে। আর মদিনায় ভবন নির্মিত হয়েছে।

এই পার্থক্যের কারণে কোরআন, নবী জীবন ও ইসলামের ইতিহাসকে স্থূল দৃষ্টিতে অধ্যয়নকারী সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, ইসলামী আন্দোলন ও তার আহ্বায়কের ওপর পরীক্ষার কথিত সময় কেবল মক্কায়ই কেটেছে। মদিনায় বিরোধিতার তেমন তীব্রতা ও উগ্রতা ছিলনা এবং সেখানে তেমন সাবর্ক্ষণিক নির্‍যাতনের দুবির্সহ পরিবেশ ছিলনা, যেমন ছিল মক্কায়। অন্তত পক্ষে এরূপ মনে করা হয় যে, বিরোধিতা ও শত্রুতা মাদানী যুগে নগ্ন তরবারীর রূপ ধারণ করে যুদ্ধের ময়দানে চলে এসেছিল। শত্রুদের পক্ষ থেকে হীন ও ইতরসুলভ আচরনের যুগটা অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ঘটনা এর বিপরীত। এ কথা সত্য যে, মাদানী যুগে প্রধান বিরোধী গোষ্ঠী কোরায়েশ উন্মুক্ত যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিল। কিন্তু এ কথাও অস্বীকার করা যায়না যে, ইসলামী আন্দোলন আগের চেয়ে জোরদার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তার নতুন নতুন শত্রু সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। এ সব শত্রু অপকর্মে মক্কাবাসীর চেয়ে কোন অংশে কম ছিলনা। তাঁদের নিত্য নতুন ষড়যন্ত্র রসূল সা. ও তাঁর সাহাবীদেরকে শুরু থেকে শেষ পর্‍যন্ত উত্যক্ত ও বিব্রত করেছে এবং পূনর্জাগরণের কাজে বাধা দিতে কোন অপচেষ্টাই বাদ রাখেনি।

ইতিহাসের একটা চিরচারিত নিয়ম হলো, সংস্কার সংশোধন ও পূনর্জাগরণের কাজ যতই অগ্রসর হয়, সংস্কার বিরোধী ও কর্মবিমুখ গোষ্