أركان الإيمان বা ঈমানের স্তম্ভসমূহ
লিখেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা মুনাওরার   
Sunday, 15 October 2006

গ্রন্থনাঃ দ্বীনী গবেষণা অধিদপ্তর, ইসলামী বিশ্ববিদ্বালয় মদীনা মুনওয়ারা, সৌদি আরব।

অনুবাদঃ মুহাম্মাদ ইব্রাহীম আব্দুল হালীম

আর্কানুল ঈমান, বা ঈমানের স্তম্ভসমূহ

তা হলো আল্লাহ্ তা'আলা, তাঁর ফিরিশ্তাদের, কিতাব সমূহের, রাসূলগণের, ও শেষ দিবসের, এবং ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি ঈমান আনা।

এ প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ.

[سورة البقرة: الآية 177]

অর্থঃ ((বরং প্রকৃতপক্ষে সত্কাজ হলো- ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কেয়ামত দিবসের উপর, ফিরিশ্তাদের উপর, এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণের উপর))। [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-১৭৭ ]

তিনি আরো বলেনঃ

كُلٌّ آَمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ......

[سورة البقرة: الآية 285]

অর্থঃ ‍((সবাই বিশ্বাস রাখে, আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশ্তাদের প্রতি, তাঁর কিতাবের প্রতি এবং তাঁর নবীদের প্রতি, তারা বলে আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না))। [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৮৫]

তিনি আরো বলেনঃ

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ.

[سورة القمر: الآية 49]

অর্থঃ ((আমি প্রত্যেক বস্তুকে পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি))। [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত-৪৯]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

الإيمان أن تؤمن بالله، وملائكته، وكتبه، ورسله، واليوم الآخر. وتؤمن بالقدر خيره .وشره

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((ঈমান হলো- তুমি আল্লাহ তা'আলা, তাঁর ফিরিশ্তাগণ, কিতাব সমূহ, রাসূলগণ ও শেষ দিবসের (আখেরাতের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। আরো বিশ্বাস রাখবে ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি))। [মুসলিম শরীফ]

ঈমানের সংজ্ঞাঃ তা হলো মুখে বলা এবং অন্তরে বিশ্বাস করা ও বাস্তবে অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে সম্পাদন করা। ঈমান আনুগত্যে বৃদ্ধি হয়, নাফারমানী ও অবাদ্ধতায় হ্রাস পায়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ - الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ - أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ

[سورة الأنفال: الآية 2-4]

অর্থঃ ((প্রকৃত মু'মিন তারাই যখন তাদের নিকটে আল্লাহর নাম স্বরণীত হয় তখন তাদের অন্তর কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের নিকট তাঁর আয়াত পঠিত হয় তখন তাদের ঈমান বর্ধিত হয়। তারা তাদের প্রভুর উপরেই ভরসা করে। আর যারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে, এবং আমার প্রদত্ত রুযী হতে (আল্লাহর পথে ) ব্যয় করে। তারাই হল সত্যিকার ঈমানদার।)) [সূরা আল-আনফাল,আয়াত-২-৪]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَنْ يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا

[سورة النساء: الآية 136]

অর্থঃ ((...এবং যে আল্লাহর প্রতি,ও তাঁর ফিরিশ্তাদের প্রতি, তাঁর কিতাব সমূহের প্রতি, এবং রাসূলগণের প্রতি ও কেয়ামত দিবসের প্রতি, বিশ্বাস স্থাপন করেনা তারা চরম পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৩৬]

আর ঈমান যা মুখের দ্বারা সম্পাদিত হয়, যেমন- যিকির, দো'আ, ন্যায়ের আদেশ, অন্যায়ের নিষেধ ও কুরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে, অন্তরের সাথেও ঈমান সংশ্লিষ্ট। যেমন- স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, ইবাদাতের অধিকারী এবং সুন্দরতম নাম ও মহান গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ বা একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা। এক ও অদিত্বীয় আল্লাহ তা'আলার দাসত্বের আবশ্যকতায় বিশ্বাস স্থাপন করা। ইচ্ছা-সংকল্প ইত্যাদি ও এর মধ্যে শামিল।

আর অন্তরের কাজ হলোঃ আল্লাহর ভালবাসা, ভয়-ভীতি, আশা-আগ্রহ ও ভরসা ইত্যাদি (সব কিছু অন্তরের ঈমান)। অঙ্গ-প্রতঙ্গের কর্ম সমূহ ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। যেমন- সালাত, সওম, হজ্জ, আল্লাহর পথে জিহাদ, দ্বীনী শিক্ষার্জন ইত্যাদি।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا

[سورة الأنفال: الآية 2]

অর্থঃ ((আর যখন তাদের কাছে তাঁর (আল্লাহর ) আয়াত পঠিত হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়।)) [সূরা আল-আনফাল, আয়াত-২]

তিনি আরো বলেনঃ

هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَعَ إِيمَانِهِمْ

[سورة الفتح: الآية 4]

অর্থঃ ((তিনি মু'মিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরো ঈমান বেড়ে যায়।)) [সূরা আল-ফাতহ্, আয়াত-৪]

সুতরাং আনুগত্য ও নৈকট্যশীলতা যত বৃদ্ধি পায়, ঈমানও তত বৃদ্ধি পায়। আর আনুগত্য ও নৈকট্যশীলতা যত হ্রাস পায়, ঈমানও তত হ্রাস পায়। যেমন- অবাধ্যতা ও নাফরমানী ঈমানে কু-প্রভাব ফেলে, যদি তা (নাফরমানী) বড় ধরনের শির্ক বা কোন কুফুরী কাজ হয় তাহলে আসল ঈমানকে ধ্বংস করে দিবে। আর যদি ছোট ধরণের কোন নাফরমানী হয় তাহলে ঈমানের পরিপূর্ণতায় ঘাটতি আসে এবং তা কলুষিত ও দুর্বল হয়ে যায়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ

[سورة النساء: الآية 48]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এতদ্ব্যতীত সব কিছু যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন।)) [সূরা আন্- নিসা, আয়াত-৪৮] তিনি আরো বলেনঃ

يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ

[سورة التوبة: الآية 74]

অর্থঃ ((তারা কসম খেয়ে বলে যে আমরা বলি নাই। অথচ তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর কুফরী করেছে।)) [সুরা আত্-তাওবাহ্, আয়াত-৭৪] নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

لا يزني الزاني حين يزني وهو مؤمن، ولا يسرق السارق حين يسرق وهو مؤمن، ولا يشرب الخمر حين شربها وهو مؤمن.

[متفق عليه]

অর্থঃ ((ব্যভিচারী পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না, চোর পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় চুরি করেনা এবং মদ্যপায়ী পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় মদ পান করেনা (অর্থাৎ, উক্ত সময়ে তাদের ঈমান অপূর্ণ ও দুর্বল হয়ে যায়)।)) [বুখারী ও মুসলিম]

الركن الأول: الإيمان بالله عزوجل

প্রথম স্তম্ভঃ মহান আল্লাহর প্রতি ঈমানঃ

(১) ঈমানের বাস্তবায়নঃ

নিম্নে বর্ণিত বিষয় সমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ঈমান আনা হয়।

প্রথমতঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, এ বিশ্ব জগতের একজন প্রভু প্রতিপালক রয়েছেন। যিনি স্বীয় সৃষ্টি রাজত্ব, পরিচালনা ও কর্ম ব্যাবস্থাপনায় রিযিকদাতা, জীবন দাতা, *মৃতু্যদাতা, ক্ষমতাশীল এবং কল্যাণ ও অকল্যাণ সাধনকারী হিসেবে এক ও অদ্বিতীয়। তিনি ব্যতীত কোন প্রভু প্রতিপালক নেই।

তিনি একাই যা ইচ্ছা তা করেন, এবং যা চান তার হুকুম করেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন, আবার যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। তাঁরই হাতে আসমান জমিনের রাজত্ব। তিনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল ও জ্ঞাত রয়েছেন। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন।

সকল আদেশ তাঁরই এবং সর্ব প্রকার কল্যাণ তাঁরই হাতে, তাঁর কর্মসমূহে কোন শরীক নেই। তাঁর কর্মে তাঁকে কেহ পরাজয়কারী নেই। বরং মানব জাতি, জিন জাতি ও ফিরিশ্তা মণ্ডলী সহ সকল সৃষ্টজীব তাঁরই দাস বা বান্দা । তারা তাঁর রাজত্ব, শক্তি ও ইচ্ছা হতে বের হতে পারেন না। তাঁর কর্মসমূহ অগণিত কোন সংখ্যাই তা সীমাবদ্ধ করতে পারে না। এ সকল বৈশিষ্ট্যের তিনিই একমাত্র অধিকারী, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি ব্যতীত কেউ এর (বৈশিষ্ট্যসমূহের) অধিকার রাখে না। এসব আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সহিত সম্পর্কিত ও সাব্যস্ত করা হারাম।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (21) الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ .....

[سورة البقرة: الآيتان 21 ، 22]

অর্থঃ ((হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদাত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায় যে, তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পারবে। যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য যমীনকে বিছানা আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২১,২২]

তিনি আরো বলেনঃ

قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَنْ تَشَاءُ وَتَنْزِعُ الْمُلْكَ مِمَّنْ تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَنْ تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَنْ تَشَاءُ بِيَدِكَ الْخَيْرُ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

[سورة آل عمران، الآية: 26]

অর্থঃ ((বলুন, হে আল্লাহ! আপনিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন এবং যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-২৬]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ

[سورة هود، الآية: 6]

অর্থঃ ((আর পৃথিবীতে বিচরণশীল মাত্রই সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ তা'আলা নিয়েছেন, তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সব কিছুই এক সুস্পষ্ট গ্রন্থে রয়েছে।)) [সূরা হুদ, আয়াত-৬]

তিনি আরো বলেনঃ

أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

[سورة الأعراف، الآية: 54]

অর্থঃ ((জেনে রেখ, তাঁরই সৃষ্টি ও তাঁরই বিধান, আল্লাহ বরকতময় যিনি বিশ্ব জগতের প্রভু-প্রতিপালক।)) [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত-৫৪ ]

দ্বিতীয়তঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সুন্দর নামসমূহ ও পবিত্র পূর্ণ গুণাবলীর ক্ষেত্রে এক ও অদ্বিতীয়। যার কিছু বান্দাদের জন্য তাঁর পবিত্র গ্রন্থ ও শেষ নবী ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ سَيُجْزَوْنَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

[سورة الأعراف، الآية: 180]

অর্থঃ ((আর আল্লাহর জন্য রয়েছে *সর্বোত্তম নাম। তাই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃত কর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।)) [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত-১৮০]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

(( إن لله تسعة وتسعين اسماً من أحصاها دخل الجنة، وهو وتر يحب الوتر))[متفق عليه]

অর্থঃ ((আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি ইহা সংরক্ষন করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ্ বেজোড়, তিনি বেজোড়কে ভালবাসেন।)) [বুখারী ও মুসলিম]

আর এই আকীদাহ-বিশ্বাস দু'টি বড় মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ সুন্দর নাম ও মহান গুণ রয়েছে, যা পরিপূর্ণ গুণাবলীর প্রমাণ করে, তাতে কোন প্রকারের অপরিপূর্ণতা ও ক্রটি নেই। সৃষ্টিজীবের কোন কিছুই তার মত ও তার অংশীদার হতে পারে না। الحيّ (আল-হাইয়ু) তাঁর (আল্লাহর) নামসমূহের একটি নাম। الحياة (আল-হায়াত) তাঁর সিফাত বা গুণ যা মহান আল্লাহর জন্য সমুচিত সঠিক পন্থায় সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। আর এ জীবন এক চিরস্থায়ী পরিপূর্ণ জীবন। তাতে জ্ঞান, শক্তি ইত্যাদি *সর্ব প্রকার পূর্ণতার সমাবেশ রয়েছে। আল্লাহ চিরঞ্জীব তাঁর লয় ও ক্ষয় নাই।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ...

[سورة البقرة، الآية: 255]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৫৫]

দ্বিতীয়ঃ নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সকল দোষ ও ক্রটিযুক্ত গুণ হতে সম্পূর্ণভাবে পবিত্র। যেমন- নিদ্রা, অপারগতা, মূর্খতা ও যুলুম-অত্যাচার ইত্যাদি।

তিনি আরো পবিত্র সৃষ্টিজীবের সাথে সাদৃশ্য রাখা হতে। আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর (আল্লাহর) জন্য যে সকল গুণ অস্বীকার করেছেন, তা অস্বীকার করা অতীব জরুরী।

আল্লাহ্ তা'আলা যে সকল গুণকে নিজের জন্য অস্বীকার করেছেন সেসব গুণের বিপরীত গুণে পরিপূর্ণ ভাবে গুণাম্বিত; এই বিশ্বাস রাখা। সুতরাং যখন আল্লাহকে তন্দ্রা ও নিদ্রার দোষারোপ থেকে মুক্ত করব, তখন তন্দ্রার বিপরীত চির জাগ্রত এবং নিদ্রার বিপরীত চিরঞ্জীব পরিপূর্ণ দু'টি গুণকে সাব্যস্ত করা হবে।

অনুরূপভাবে আল্লাহকে প্রতিটি অপরিপূর্ণ গুণ থেকে মুক্ত করলে সাথে সাথে তার বিপরীত পরিপূর্ণ গুণ সাব্যস্ত হয়ে যায়। তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ আর তিনি ব্যতীত সবই অপরিপূর্ণ।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

......لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ

[سورة الشورى، الآية: 11]

অর্থঃ (( (সৃষ্টজীবের) কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন এবং সব দেখেন।)) [সূরা আশ্-শূরা, আয়াত-১১]

তিনি আরো বলেনঃ????????????????????

....وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ

[سورة فصلت، الآية: 46]

অর্থঃ ((আর আপনার প্রতিপালক বান্দাদের প্রতি যুলুম করেন না।)) [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত-৪৬]

তিনি আরো বলেনঃ

.....وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ.....

[سورة فاطر، الآية: 44]

অর্থঃ ((আকাশ ও পৃথিবীতে কোন কিছুই আল্লাহকে অপারগ করতে পারে না।)) [সূরা ফাতের, আয়াত-৪৪]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا كَانَ رَبُّكَ نَسِيًّا.

[سورة مريم، الآية: 64]

অর্থঃ ((আর আপনার প্রতিপালক বিস্মৃত হওয়ার নন।)) [সূরা মারইয়াম, আয়াত-৬৪]

আল্লাহর নাম, তাঁর গুণ ও কর্ম সমূহের প্রতি ঈমান আনা, আল্লাহ্ ও তাঁর ইবাদাতকে জানার একমাত্র পথ। কারণ আল্লাহ্ তা'আলা এই পার্থিব জগতে তাঁর সরাসরি দর্শনকে সৃষ্টিজীব হতে গোপন রেখেছেন, এবং তাদের জন্য এমন জ্ঞানের পথ খুলে দিয়েছেন, যার দ্বারা তারা তাদের প্রভু ইলাহ্-মা'বুদকে জানবে এবং সঠিক জ্ঞান অনুযায়ী তাঁর ইবাদাত করবে। সুতরাং বান্দা তার গুনময় মা'বুদের ইবাদাত করে, মুআত্তিল (আল্লাহর নাম ও গুনাবলী অধীকার কারী) অনস্তিত্বের ইবাদাত করে, মুমাচ্ছিল (মুশরীক সাদৃশ্যবাদী) প্রতিমার ইবাদাত করে। আর মুসলিম ব্যক্তি এক ও অমুখাপেক্ষী আল্লাহর ইবাদাত করে, যিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি, এবং তাঁর সমকক্ষ ও কেউ নয়।

আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলোর লক্ষ্য রাখা উচিতঃ (১) সংযোজন ও বিয়োজন ব্যাতীত কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সকল সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত রয়েছে তার উপর ঈমান আনা।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يُشْرِكُونَ

[سورةالحشر : 23]

অর্থঃ ((তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতীত সত্যিকার কোন উপাস্য নেই। তিনি এক মাত্র সব কিছুর মালিক, যাবতীয় দোষ-ক্রটি হতে পবিত্র,শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, পর্যবেক্ষক,পরাক্রান্ত, প্রতাপাম্বিত, মাহাত্ন্যশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা'আলা তা থেকে পবিত্র।)) [সূরা আল-হাশর, আয়াত-২৩ ]

হাদীসে এসেছেঃ ((وثبت في السنة أن النبي- -سمع رجلاً يقول: اللهم إني أسألك بأن لك الحمد لا إله إلا أنت المنان بديع السموات، والأرض يا ذا الجلال ،والإكرام يا الحي يا القيوم. فقال النبي -  -: تدرون بما دعا الله؟ قالوا: الله، ورسوله أعلم، قال:والذي نفسي بيده لقد دعا الله باسمه الأعظم الذي إذا دعي به أجاب، وإذا سئل به أعطى))

[رواه أبو داود، وأحمد]

অর্থঃ ((নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন। হে আল্লাহ্ ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি, কারণ সকল প্রশংসা তোমারই জন্য। তুমি ছাড়া কোন সত্যিকার মা'বুদ নেই। তুমি (মান্নান ) অনুগ্রহকারী, আসমান জমিনের সৃষ্টি কারী। হে সম্মানিত ও মর্যাদাবান! হে চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক বাহক ! অতঃপর নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ তোমরা কি জান ? সে কিসের (অসিলায়) আল্লাহকে আহ্বান করেছে? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই অধিক জানেন। তারপর নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় সে আল্লাহকে তাঁর এমন ইসমে আজমের (মহান নামের)অসিলায় আহ্বান করেছে,যার দ্বারা আল্লাহকে আহ্বান করলে আল্লাহ্ আহ্বানে সাড়া দেন, এবং আবেদন করলে তিনি দান করেন।)) [ ইমাম আবু দাউদ ও আহ্মাদ হাদীসটি বর্ণনা করেন]

(২) আল্লাহ্ নিজেই নিজের নাম রেখেছেন। সৃষ্টি জীবের কেউ তার নাম রাখে নাই। এবং তিনি নিজেই এই সকল নাম দ্বারা স্বীয় প্রশংসা করেছেন। ইহা সৃজিত নতুন নয়। ইহার উপর ঈমান আনা।

(৩) আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ এমন পরিপূর্ণ অর্থবোধক যাতে কোন প্রকারের কোন ক্রটি নেই। তাই এ নাম সমূহের প্রতি ঈমান আনা যেমন ওয়াজিব,তেমনি এর অর্থের উপর ঈমান আনাও ওয়াজিব।

(৪) এ সমস্ত নামের অর্থ অস্বীকার ও অপব্যাক্ষা না করে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা ওয়াজিব।

(৫) প্রতিটি নাম হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান ও ফলাফল এবং এর প্রভাবের প্রতি ঈমান আনা।

এ পাঁচটি বিষয়কে আরো স্পষ্ট করার জন্য আমরা আল্লাহর নাম السميع আসসামী'(শ্রবণ কারী) দ্বারা উদাহরণ পেশ করবো।

السميع এতে নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা প্রত্যেকেরই কর্তব্য।

(ক) السميع (আস্সামী') আল্লাহর নাম সমূহের একটি নাম। এ কথার প্রতি ঈমান আনা। কারণ এর বর্ণনা কুরআন ও হাদীসে এসেছে।

(খ) আরো ঈমান আনা যে,আল্লাহ্ তা'আলা নিজেই নিজেকে এ নামে নাম করণ করেছেন,এ নামে কথা বলেন এবং তা কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন।

(গ) السميع (আস্সামী') আস্সামউ বা (শোনা) অর্থকে শামিল করে। যা আল্লাহর গুণ সমূহের একটি গুণ।

(ঘ) السميع (আস্সামীয়) নাম হতে উদ্ভূত "শ্রবণ করা বা শোনা" গুনটি অস্বীকার ও অপব্যাখা না করে সম্মানের সাথে গ্রহণ করা ওয়াজিব।

(ঙ) নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শুনেন এবং তাঁর শুনা সকল ধনিকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে, এই বিশ্বাস রাখা। এ ঈমানের ফলাফল ও প্রভাব হলো আল্লাহর পর্যবেক্ষণ ও তাঁর ভয়-ভীতি আবশ্যক হয়ে যায়,এবং এ দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে,আল্লাহর কাছে কোন কিছু গোপন থাকেনা।

এমনি ভাবে আল্লাহর গুণ العَِلي(আল-আলী) সাব্যস্ত করার সময় নিম্নের বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা উচিতঃ

(১) কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সকল সিফাত বা গুণ কোন প্রকার অপব্যাখা ও সঠিক অর্থ ত্যাগ না করে প্রকৃতার্থে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।

(২) দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ্ তা'আলা যাবতীয় দোষ অসম্পূর্ণ গুণ হতে মূক্ত, বরং তিনি সূ-পরিপূর্ণ গুণে গুনাম্বিত।

(৩) আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সৃষ্টিজীবের গুণ সমূহের সাদৃশ্য না করা। কারণ আল্লাহর অনুরুপ কোন কিছু নেই। না তাঁর গুণে এবং না তাঁর কর্মে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجاً وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجاً يَذْرَؤُكُمْ فِيهِ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ

[سورة الشورى، الآية: 11]

অর্থঃ (((সৃষ্টিজীবের) কোন কিছুই তাঁর অনুরুপ নয়। আর তিনি সব শুনেন,এবং সব দেখেন।)) [সূরা আশ্শুরা,আয়াত-১১ ]

(৪) এসব গুণের রুপ ও ধরণ-গঠন জানার কোন প্রকার আশা আকাঙ্খা না করা। কেননা আল্লাহ গুণের রুপ ও ধরণ-গঠন তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানেনা। ফলে সৃষ্টিজীবের তা জানার কোন পথ নেই।

(৫) এ সব গুণাবলী হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান এবং এর প্রভাব ও দাবীর প্রতি ঈমান আনা। সুতরাং প্রতিটি গুণের সাথে ইবাদাত সম্পৃক্ত।

এখন পাঁচটি বিষয় আরো স্পষ্ট হওয়ার জন্য সিফাতুল ইস্তিওয়া الاستواء এর উদাহরণ পেশ করব।

আল-ইস্তিওয়া الاستواء গুণটি সাব্যস্ত করতে নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলো লক্ষ্য রাখা অপরিহার্য।

(১)আল-ইস্তিওয়া (আল্লাহ্ তা'আলা স্ব-সত্তায় আরশের উপরে রয়েছেন) এ গুণটি আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা এবং এর প্রতি ঈমান আনা, কেননা ইহা কুরআন ও হাদীসে একাধিকবার প্রমানিত হয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

[سورة طه، الآية: 5]

অর্থঃ ((পরম দয়াময় (আল্লাহ্ তা'আলা স্ব-সত্তায়) আরশের উপর রয়েছেন।)) [সূরা ত্বহা,আয়াত-৫]

(২) আল-ইস্তিওয়া الاستواء গুণটিকে যথাযোগ্য ও পরিপূর্ণ রূপে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা। আর এর প্রকৃত অর্থ হলো ঃ আল্লাহ তা'আলা স্বীয় আরশের উপরে বিরাজমান রয়েছেন, যেমন তাঁর মহত্বের ও শ্রেষ্টত্বের শোভা পায়। এর অর্থ আল্লাহ তাঁর আরশের উপরে সমাসীন প্রকৃত পক্ষে। তাঁর মর্মাদার জন্য যে ভাবে শোভা পায়।

(৩) আল্লাহ তা'আলার আরশের উপর বিরাজমান থাকাকে সৃষ্টি জীবের আসন গ্রহণের সাথে উপমা না দেওয়া। কেননা আল্লাহ আরশের মুখাপেক্ষী নন। তিনি আরশের মুহ্তাজ নন। কিন্তু সৃষ্টি জীবের সমাসীনতা সম্পূর্ণ সতন্ত্র, সৃষ্টিজীব এর মুহ্তাজ বা মুখাপেক্ষী।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ

[سورة الشورى، الآية: 11]

অর্থঃ(((সৃষ্টি জীবের) কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। আর তিনি সব শুনেন,এবং সব দেখেন।)) [সূরা আশ্শুরা,আয়াত-১১ ]

(৪) আল্লাহ তা'আলার আরশের উপর বিরাজমানের ধরণ ও পদ্ধতি নিয়ে তর্কে লিপ্ত না হওয়া। কেননা এটা গাইবী (অদৃশ্যের) বিষয়, যা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কেউ জানেনা।

(৫) এ গুণটি হতে সাব্যস্ত বিধি-বিধান ও ফলাফল এবং এর প্রভাবের প্রতি ঈমান আনা, আর তা হলো আল্লাহ্ তা'আলার যথাযোগ্য মহত্ত ও শ্রেষ্টত্ব সাব্যস্ত করা, যা সমগ্র সৃষ্টি হতে তাঁর উর্দ্ধে ও সু-উচ্চে (আরশের উপর) অবস্থানই প্রমাণ করে।

আরো প্রমাণ করে সকল আত্নার তাঁরই দিকে ঊর্ধমূখী হওয়া, যেমন সিজ্দাকারী সিজ্দায় বলেঃ سبحان ربي الأعلى আমি আমার প্রভুর পবিত্রতা বর্ণনা করি যিনি সু-উচ্চ ও ঊর্ধে।

তৃতীয়তঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ্ তা'আলাই একমাত্র সত্যিকার মা'বুদ বা উপাস্য এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় ইবাদাত পাওয়ার অধিকার রাখেন। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ

[سورة النحل، الآية: 36]

অর্থঃ ((আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তাগুত (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদাত করা মানে, শির্ক করা) থেকে নিরাপদ ও বিরত থাকবে।)) [সূরা আন-নহল,আয়াত-৩৬]

আর প্রত্যেক রাসূলই স্বীয় উম্মাতকে বলতেনঃ

اعْبُدُواْ اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَـهٍ غَيْرُهُ

[سورة الأعراف، الآية: 59]

অর্থঃ ((তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন সত্য উপাস্য নেই।)) [সূরা আল-আ'রাফ,আয়াত-৫৯]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء

[سورة البينة، الآية: 5 ]

অর্থঃ ((আর তাদেরকে এ ছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠ ভাবে (শির্কমুক্ত থেকে) একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে।)) [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ-আয়াত-৫]

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে,

أتدري ما حق الله على العباد وما حق العباد على الله؟.قلت:الله ورسوله أعلم.قال:حق الله على العباد أن يعبدوه ولا يشركوا به شيئاً،وحق العباد على الله ألا يعذب من لا يشرك به شيئاً

অর্থঃ ((তুমি কি জান? বান্দার উপর আল্লাহর হক্ব বা অধিকার কি? আর আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার কি? আমি (মু'য়াজ রাঃ) বল্লাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ বান্দার উপর আল্লাহর হক্ব হলো- তাঁর (আল্লাহর) ইবাদাত করা, এবং তাঁর সাথে কাউকে অংশীদার না করা। আল্লাহর উপর বান্দার হক্ব হলো- যারা তাওহীদের উপর থেকে শির্ক মুক্ত থাকে তাদেরকে শাস্তি না দেওয়া।))

সত্য মা'বুদঃ তিনিই সত্য মা'বুদ, অন্তর যার ইবাদাত করে, যার ভালবাসায় অন্তর ভরে যায়, অন্যের ভালবাসার প্রয়োজন পড়েনা। যার আশা আকাংখাই অন্তরের জন্য যথেষ্ট অন্যের কাছে আশা ও আকাংখার প্রয়োজন হয়না। যার নিকট চাওয়া পাওয়া, সাহায্য প্রার্থনা ও তাঁকে ভয়-ভীতি করাই অন্তরের জন্য যথেষ্ট। অন্য কারো কাছে চাওয়া পাওয়ার প্রার্থনা করা, কাউকে ভয়-ভীতি করার প্রয়োজন নেই।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِن دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ

[سورة الحج، الآية: 62]

অর্থঃ ((এটা একারণেও যে, আল্লাহই সত্যঃ আর তাঁর পরিবর্তে তারা যাকে ডাকে,তা অসত্য এবং আল্লাহই সবার উচ্চে,মহান।)) [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত-৬২ ]

আর ইহাই বান্দার কর্মের দ্বারা আল্লাহর একত্ববাদ ঘোষনা করা। ইহাই তাওহীদে উলুহীয়্যাহ্।

তাওহীদের গুরুত্বঃ

নিম্নের বিষয় গুলোর মাধ্যমে তাওহীদের গুরুত্ব ফুটে উঠে।

(১) তাওহীদই ইসলাম ধর্মের শুরু ও শেষ, জাহেরী-বাতেনী-এবং মুখ্য উদ্দেশ্য। আর ইহাই সকল রাসূল (আলাইহিস সালাম) এর দাওয়াত ছিল।

(২) এ তাওহীদ (কায়েম) এর লক্ষ্যে-আল্লাহ্ তা'আলা মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন, সকল নাবী রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং সব আসমানী কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আর এ তাওহীদের কারণেই মানুষ মু'মিন-কাফির, সৌভাগ্য দূর্ভাগ্যে বিভক্ত হয়েছে।

(৩) আর তাওহীদই বান্দাদের উপর সর্ব প্রথম ওয়াজিব। সর্ব প্রথম এর মাধ্যমেই ইসলামে প্রবেশ করে। এবং এ তাওহীদ নিয়েই দুনিয়া ত্যাগ করে। তাওহীদ বাস্তবায়ন বা তাওহীদ প্রতিষ্ঠাঃ

তাওহীদের বাস্তবায়ন হলঃ তাওহীদকে শির্ক, বিদ্আত ও পাপাচার মুক্ত করা।

তাওহীদকে কলুষ মুক্ত করা দু'রকমঃ

(১) ওয়াজিব ও

(২) মান্দুব বা মুস্তাহাব।

ওয়াজিব তাওহীদ তিন বিষয়ের মাধ্যমে হয়ঃ

(১) তাওহীদকে এমন শির্ক, হতে মুক্ত করা, যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী।

(২) তাওহীদকে এমন বিদ্আত হতে মুক্ত করা যা তাওহীদের পরিপূর্ণতার পরিপন্থী,অথবা মূল তাওহীদের পরিপন্থী সে বিদ্আত যদি কুফুরী পর্যায়ের হয়ে থাকে।

(৩) তাওহীদকে এমন পাপকর্ম হতে মুক্ত করা যা তাওহীদের (অর্জিত) পূণ্য হ্রাস করে এবং তাওহীদে কু-প্রভাব ফেলে।

আর মান্দুব (তাওহীদ)-

তা হলো মুস্তাহাব কাজ। যেমন নিম্নরুপঃ

(ক) ইহ্সানের (ইখলাসের) পূর্ণ বাস্তবায়ন।

(খ) ইয়াকীনের পূর্ণ বাস্তবায়ন করা।

(গ) আল্লাহ ছাড়া কারো নিকট অভিযোগ না করে পূর্ণ ধৈর্য ধারণ করা।

(ঘ) সৃষ্টি জীব হতে মুক্ত হয়ে শুধু মাত্র আল্লাহর কাছে চাওয়াই যথেষ্ঠ মনে করা।

(চ) কিছু বৈধ উপকরণ ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের প্রকাশ। যেমন-ঝাড় ফুঁক ও দাগা (রোগ নিরাময়ের জন্য) ছেড়ে দেওয়া।

(ছ) নফল ইবাদাত করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে পূর্ণ ভালবাসা লাভ করা।

অতঃপর যারা তাওহীদকে বাস্তবায়ন করবে উপরে বর্ণনানুপাতে এবং বড় শির্ক হতে বেঁচে থাকবে, তারা জাহান্নামে চিরস্থায়ী বসবাস করা হতে পরিত্রান লাভ করবে। আর যারা বড় ও ছোট শির্ক করা হতে বেঁচে থাকবে এবং বড় ও ছোট পাপ হতে দূরে থাকবে, তাদের জন্য দুনিয়াতে ও আখিরাতে পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّ اللّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ

[سورة النساء، الآية: 48]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শির্কের অপরাধ ক্ষমা করবেন না। আর ইহা ব্যতীত যাকে ইচ্ছা করেন (তার অন্যান্য অপরাধ) ক্ষমা করে দেন।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত,৪৮ ]

তিনি আরো বলেনঃ

الَّذِينَ آمَنُواْ وَلَمْ يَلْبِسُواْ إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَـئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ

[سورة الأنعام، الآية:82]

অর্থঃ ((যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শির্কের সাথে মিশ্রিত করেনা,তাদের জন্যই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।)) [সূরা-আল- আনআম,আয়াত-৮২]

তাওহীদের বিপরীত শির্ক, ইহা তিন প্রকারঃ

(১) বড় শির্ক, যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী, আল্লাহ্ শির্কের গোনাহ্ তাওবাহ্ ছাড়া মাফ করেননা। যে ব্যক্তি শির্কের উপর মারা যাবে, সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।

শির্ক হলঃ আল্লাহর ইবাদাতে কাউকে তাঁর সমকক্ষ নিধর্ারণ করে নেয়া। যেমন ভাবে আল্লাহকে ডাকে অনুরূপ ভাবে তাকে (সমকক্ষকে) ডাকা। তাকে উদ্দেশ্য করা, তার উপর ভরসা করা। তার কাছে কোন কিছুর আশা করা। তাকে ভালবাসা তাকে ভয় করা, যেরুপ আল্লাহকে ভালবাসে ও ভয় করে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللّهُ عَلَيهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ

[سورة المائدة، الآية:72]

অর্থঃ ((নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে আংশিদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করেছেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের (মুশরীকদের) কোন সাহায্যকারী নেই।)) [সূরা আল-মায়িদাহ-আয়াত-৭২ ]

(২) ছোট শির্ক তাওহীদের পূর্ণতার পরিপন্থী। ইহা প্রত্যেক ঐ মাধ্যম যা বড় শির্কের দিকে নিয়ে যায়। যেমন আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।

(৩) গোপনীয় শির্কঃ যা নিয়্যাত ও উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত রাখে। ইহা কখনো ছোট, আবার কখনো বড় শির্কে পরিনত হয়।

সাহাবী মাহমুদ বিন লবীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ

إن أخوف ما أخاف عليكم الشرك الأصغر،قالوا وماالشرك الأصغر يارسول الله ؟ قال:الرياء

[رواه الإمام أحمد]

অর্থঃ ((আমি তোমাদের উপর সব চেয়ে বেশী ভয় পাই ছোট শির্কের। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন ঃ হে আল্লাহর রাসূল ! ছোট শির্ক কি? তিনি বল্লেনঃ তা হল রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।)) [আহ্মাদ ]

(২) ইবাদাতের সংজ্ঞাঃ ইহা ঐ সব আকীদা-বিশ্বাস, অন্তর ও অঙ্গ-প্রতঙ্গের কর্ম যা আল্লাহ্ তা'আলা ভাল বাসেন ও পছন্দ করেন। ইহা ছাড়া কোন কিছু সম্পাদন করা বা বর্জন করা যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করায় তাও ইবাদাত।

অনুরুপ ভাবে কুরআন ও হাদীসে বিধিবদ্ধ্য প্রতিটি কর্ম ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত। ইবাদাত বিভিন্ন প্রকারের রয়েছে।

আন্তরিক ইবাদাতঃ যেমন- ঈমানের ছয়টি রুকন, ভয়, আশা, ভরসা, আগ্রহ, ও ভিতী, ইত্যাদি।

প্রকাশ্য ইবাদাতঃ যেমন- সালাত, যাকাত, সওম ও হজ্জ।

ইবাদাত ততক্ষনণ পর্যন্ত গ্রহণ যোগ্য হবে না যতক্ষন না তা দু'টি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথমঃ সকল ইবাদাত একমাত্র আল্লাহর জন্য খালেস করা এবং তার সাথে শির্ক না করা। আর ইহাই شهادة أن لا إله إلا الله "আল্লাহ্ ছাড়া কোন সত্য মা'বুদ নেই" এ শাক্ষ্য প্রদানের অর্থ।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ

[سورة الزمر، الآية:3]

অর্থঃ ((জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদাত আল্লাহরই নিমিত্তে। যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের ইবাদাত এজন্যই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে তাদের পারস্পরিক বিরোধপূর্ণ বিষয়ের ফায়সালা করে দেবেন। আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফিরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।)) [সূরা আয্যুমার,আয়াত-৩]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء

[سورة البينة، الآية:5]

অর্থঃ ((আর তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশকরা হয়নি যে,তারা খাঁটি মনে একনিষ্টভাবে (শির্কমুক্ত থেকে) একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করবে।)) [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ-আয়াত-৫]

দ্বিতীয়ঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে, শরীয়াত নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করা।

এর অর্থঃ নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কাজ যে ভাবে করেছেন সে কাজ সেই নিয়মে করা, কোন প্রকার কম বেশী না করা। আর ইহাই شهادة أن محمدًا رسول الله "মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল" এ সাক্ষ্য প্রদানের অর্থ।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ

[سورة آل عمران، الآية:31]

অর্থঃ ((বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভাল বাস,তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভাল বাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন,আর আল্লাহ্ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।)) [সূরা আলি-ইমরান,আয়াত-৩১ ]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا

[سورة الحشر، الآية:7]

অর্থঃ ((আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর, এবং যা থেকে বারণ করেছেন তা হতে বিরত থাক।)) [সূরা আল-হাশর,আয়াত-৭]

তিনি আরো বলেনঃ

فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّىَ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجاً مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسْلِيماً

[سورة النساء، الآية:65]

অর্থঃ ((অতএব তোমার পালন কতর্ার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষন পযনর্্ত তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নিবে।)) [সূরা আন্-নিসা,আয়াত-৬৫]

দু'টি বিষয় ছাড়া ইবাদাত (দাসত্ব) পরিপূর্ণতা লাভ করেনাঃ

প্রথমঃ আল্লাহকে পূর্ণ ভালবাসা, অর্থাৎ, আল্লাহর ভালবাসা ও আল্লাহ যা ভাল বাসেন তাঁর ভালবাসাকে অন্য সকল বস্তুর ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেওয়া।

দ্বিতীয়ঃ আল্লাহর নিকট পূর্ণ বিনয়-নম্রতা ও আনুগত্য প্রকাশ করা। অর্থাৎ, বান্দা আল্লাহ তা'আলার আদেশ সমূহ পালনের ও নিষেধাগ্যা হতে বেঁচে থাকার মাধ্যমে বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করবে।

সুতরাং পূর্ণ বশ্যতা, বিনয়-নম্রতা, আশা-আকাঙ্খা ও ভয়-ভীতির সাথে পূর্ণ ভালবাসাকে ইবাদাত বলা হয়। এর মাধ্যমেই বান্দার ইবাদাত স্বীয় প্রভু সৃষ্টি কর্তার জন্য বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর জন্য ইবাদাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়।

অতএব বান্দার ফরজ বিধান পালন করার মাধ্যমে তাঁর (আল্লাহর ) নৈকট্য অর্জন করাকে আল্লাহ্ ভালবাসেন।

বান্দার নফল ইবাদাত যতই বৃদ্ধি পাবে ততই তাঁর নৈকট্য ও মর্যাদা আল্লাহর নিকট বৃদ্ধি পাবে। আর আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুনায় ইহা জান্নাতে প্রবেশ করার উপায় হবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

ادْعُواْ رَبَّكُمْ تَضَرُّعاً وَخُفْيَةً إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

[سورة الأعراف، الآية:55]

অর্থঃ ((তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা- অতিক্রমকারীদেরকে পছন্দ করেন না।)) [সূরা আল-আ'রাফ,আয়াত-৫৫]

(৩) আল্লাহর তাওহীদ (একতাত্ববাদ) এর দলীল ও প্রমাণ পঞ্জীঃ

আল্লাহ্ তা'আলার একত্ববাদের স্বপক্ষে অজশ্র সাক্ষ্য ও প্রমাণ পঞ্জী রয়েছে। যারা এ প্রমাণ পঞ্জীকে নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করবে, তাদের জ্ঞান ও বিশ্বাস আল্লাহ তা'আলার কর্ম, নাম ও গুনাবলী এবং ইবাদাতের ক্ষেত্রে একত্ববাদকে আরো বৃদ্ধি ও দৃঢ় করবে।

নিম্নে সে সকল সাক্ষ্য ও প্রমাণ-পঞ্জীর কিছু নমুনা পেশ করা হলোঃ

(ক) এ পৃথিবী সৃষ্টির বিশালতা, সূক্ষ্ন কারীগরী,রকমারী সৃষ্টি এবং এসব পরিচালনার সুদক্ষ নিয়ম-নীতি। যে ব্যক্তি এ সমস্ত বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করবে আল্লাহ তা'আলার একত্ববাদ সম্পর্কে তার একিন-বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে। তেমনি যে নভোমন্ডল-ভূমন্ডল,সূর্য-চন্দ্র, মানুষ-পশু, উদ্ভিদ-লতাপাতা ও জড় পদার্থ সমর্্পকে চিন্তা করবে, সে নিশ্চিত ভাবে জানতে পারবে যে, এসবের এক জন স্রষ্টা রয়েছেন, যিনি স্বীয় নামসমূহ, গুনাবলী ও উপাস্য পরিপূর্ণ আর ইহাই প্রমাণ করে যে, তিনিই একমাত্র যাবতীয় ইবাদাত পাওয়ার প্রকৃত অধিকার রাখেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيهَا فِجَاجاً سُبُلاً لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ - وَجَعَلْنَا السَّمَاء سَقْفاً مَّحْفُوظاً وَهُمْ عَنْ آيَاتِهَا مُعْرِضُونَ - وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ

[سورة الأنبياء، الآيات:31-33]

অর্থঃ ((আমি পৃথিবীতে ভারী বোঝা রেখে দিয়েছি যাতে তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে এবং তাতে প্রশস্ত পথ রেখেছি, যাতে তারা পথ প্রাপ্ত হয়। আমি আকাশকে সুরক্ষিত ছাদ করেছি, অথচ তারা আমার আকাশস্ত নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। সবাই আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।))[সূরা আল-আম্বিয়া,আয়াত-৩১-৩৩]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ

[سورة الروم، الآية:22]

অর্থঃ ((তাঁর (আল্লাহর) আরও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র ! নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।)) [সূরা আর-রূম,আয়াত-২২]

(খ) আল্লাহ তা'আলা রাসূলদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহিমুস সালাম) যে শরীয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন ও অকাট্য প্রমাণাদি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এসব প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্ তা'আলা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি একমাত্র যাবতীয় ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য।

আর আল্লাহ্ তা'আলা সৃষ্টিজীবের জন্য যে সব নিয়ম-বিধান প্রনয়ণ করেছে,তা প্রমাণ করে যে, এসব সেই বিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময় হতে এসেছে সৃষ্টিজীবের যাবতীয় কল্যাণ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

[سورة الحديد، الآية:25]

অর্থঃ ((আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মিযান বা মানদন্ড যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।)) [সূরা আল-হাদীদ,আয়াত-২৫]

তিনি আরো বলেনঃ

قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُواْ بِمِثْلِ هَـذَا الْقُرْآنِ لاَ يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيراً

[سورة الإسراء، الآية:88]

অর্থঃ ((বলুনঃ যদি মানব ও জ্বীন এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্য এক হয় এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তারা কখনও এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।)) [সূরা আল-ইসরা,আয়াত-৮৮]

(গ) ফিত্রাত (সৃষ্টিগত স্বভাব বা প্রকৃতি) যার উপর আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের আত্নাসমূহকে সৃষ্টি করেছেন,তা আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করে। ফিত্রাত অন্তরের স্থায়ী জিনিস, তাই যখন কোন মানুষ কষ্ট পায় তখন তা অনুভব করতে পারে, এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। মানুষ যদি সন্দেহ ও প্রবৃত্তির অনুসরণ মুক্ত হয় যা ফিৎরাতকে পরির্বতন করে দেয় তবে সে অন্তরস্থল থেকে নাম, গুণ, ও ইবাদাত প্রাপ্য, একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদের স্বীকৃতি দিবে এবং আল্লাহ তা'আলা রাসূলদেরকে যে শরীয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছে তাতে আত্নসমর্্পন করবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفاً فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ - مُنِيبِينَ إِلَيْهِ وَاتَّقُوهُ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ

[سورة الروم، الآيتان:30-31]

অর্থঃ ((তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি,যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন,আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সঠিক ধর্ম। কিন্ত অধিকাংশ মানুষ জানেনা। সকলেই তাঁর অভিমুখী হও এবং ভয় কর, সালাত কায়েম কর এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়োনা।)) [সূরা আর-রূম,আয়াত ৩০-৩১]

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ

كل مو لد يولد على الفطرة ،فأبواه يهودانه، أو ينصرانه، أو يمجسانه، كما تنتج البهيمة بهيمة جمعاء هل تحسنون فيها من جدعاء

অর্থঃ ((প্রত্যেক শিশুই ফিৎরাতের উপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, খৃষ্টান, অথবা অগ্নী পূজক বানায়। যেমন নিখুঁত জানোয়ার নিখুঁত বাঁচ্চা জন্ম দেয়। তাতে কোন প্রকার ক্রটি থাকেনা।))

অতঃপর এই আয়াত পাঠ করলেনঃ

فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا

[سورة الروم الآية :30]

অর্থঃ ((এটাই আল্লাহর প্রকৃতি,যার উপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন।)) [সূরা আর-রূম,আয়াত-৩০]

الركن الثاني: الإيمان بالملائكة

দ্বিতীয় রুকনঃ ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমান

(১) ফিরিশ্তাদের পরিচয়ঃ

ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমানঃ দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ্ তা'আলার অনেক ফিরিশ্তা রয়েছেন। তিনি তাদেরকে নূর (জ্যোতি) হতে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিগতভাবে তারা আল্লাহর অনুগত। তারা কখনও আল্লাহর আদেশের অবাধ্য হননা, বরং যা আদিষ্ট হন তা পালন করেন। তারা দিবা রাত্রি আল্লাহর তাসবীহ্ (পবিত্রতা) বর্ণনায় রত, কখনও ক্লান্ত হননা। তাদের সংখ্যা আল্লাহ্ তা'আলা ব্যতীত কেউ জানেনা। আর আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার (কর্মের) দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَـكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَالْمَلآئِكَةِ

[سورة البقرة، الآية:177]

অর্থঃ ((বরং বড় সত্কাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, এবং ফিরিশ্তাদের উপর।))[সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-১৭৭]

তিনি আরো বলেনঃ

كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ

[سورة البقرة، الآية:285]

অর্থঃ ((সকলেই বিশ্বাস রাখেন আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশ্তাদের প্রতি,তাঁর গ্রন্থ সমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।))[সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২৮৫]

জিব্রাঈল (আলাইহিস্ সালাম) এর প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছেঃ যখন তিনি (জিব্রাঈল) আল্লাহর রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-ঈমান, ইসলাম,ও ইহসান,সম্পর্কে।

তিনি (জিব্রাঈল) বলেনঃ আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবগত করুণ।

তিনি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ

أن تؤمن بالله وملائكته وكتبه ورسله واليوم الآخر وأن تؤمن بالقدر خيره وشره

অর্থঃ ((ঈমান হলোঃ আল্লাহ তাঁর ফিরিশ্তাদের, তাঁর কিতাব সমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা, এবং ভাগ্যের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনা।))

ইসলাম ধর্মে ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমানের স্থান ও তার বিধানঃ

ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমান আনা, ঈমানের ছয়টি রুক্নের দ্বিতীয় রুকন বা স্তম্ভ। ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কোন ব্যক্তির ঈমান সঠিক ও গ্রহণ যোগ্য হবেনা। সম্মানিত ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব হওয়ার উপর সকল মুসলমান একমত । যারা সকল ফিরিশ্তাদের অথবা তাঁদের আংশিকের অস্তিত্বকে যাদের কথা আল্লাহ্ উল্লেখ করেছেন, অস্বীকার করবে তারা কুফুরী করলো, এবং কুরআন, হাদীস ও ইজমার বিরোধিতা করলো।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَمَن يَكْفُرْ بِاللّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيداً

[سورة النساء، الآية:136]

অর্থঃ ((যে আল্লাহ্ তা'আলাকে, তাঁর ফিরিশ্তাদেরকে, তাঁর কিতাব সমূহকে এবং তাঁর রাসূলগণকে ও কিয়ামত দিবসকে অস্বীকার করবে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূরে গিয়ে পড়বে।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৩৬]

(২) ফিরিশ্তাদের প্রতি ঈমান আনার পদ্ধতিঃ

ফিরিশ্তাদের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ভাবে ঈমান আনা। সংক্ষিপ্ত ঈমান নিম্নের বিষয় গুলোকে অন্তভর্ুক্ত করে।

প্রথমঃ তাদের অস্তিত্বের স্বীকার করা, তারা আল্লাহর সৃষ্টি জীব, আল্লাহ্ তাদেরকে তাঁর ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাদের অস্তিত্ব প্রকৃত, তাদেরকে আমাদের না দেখা, তাদের অনুস্তিত্বের অর্থ নয়, কারণ পৃথিবীতে অনেক সুক্ষ্ন সৃষ্টিজীব রয়েছে, তাদেরকে আমরা দেখতে পাইনা, অথচ তারা প্রকৃত পক্ষ্যে রয়েছে।

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিব্রাঈল আলাইহিস সালামকে তাঁর প্রকৃত আকৃতীতে দু'বার দেখেছেন।

কতিপয় সাহাবী কিছু ফিরিশ্তাদেরকে মানুষের আকৃতীতে দেখেছেন।

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল তার মুসনাদে আব্দুল্লাহ্ বিন মাসউদ হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম কে তাঁর নিজস্ব আকৃতীতে ছয় শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায় দেখেছেন। প্রত্যেক পাখা একেক প্রান্ত ঢেকে রেখেছে।

জিব্রাঈলের (আলাইহিস সালাম) প্রসিদ্ধ হাদীস যা ইমাম মুসলিম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, তাতে প্রমাণিত হয় যে, জিব্রাঈল (আলাইহিস্ সালাম) মানুষের আকৃতীতে ধপধপে সাদা পোষাকে, মিশ মিশ কালো চুলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসেছিলেন। তাঁর উপর ভ্রমণের কোন নিদর্শন ছিলনা। সাহাবাদের কেহ তাঁকে চিনতে পারে নাই।

দ্বিতীয়ঃ আল্লাহ্ তাদেরকে যে সম্মান দিয়েছেন, তাদেরকে সেই সম্মান দেওয়া। তারা আল্লাহর বান্দা বা দাস। আল্লাহ্ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন, তাদের মর্যাদাকে উঁচু করেছেন এবং তাদেরকে নৈকট্য দান করেছেন। তাদের কেহ্ কেহ্ আল্লাহর ওয়াহী ইত্যাদির রাসূল বা দূত। আল্লাহ্ তাদেরকে যতটুকু ক্ষমতার মালিক করেছেন,তারা ততটুকু ক্ষমতারই মালিক। তার পরও তারা তাদের নিজেদের ও অন্যদের লাভ-ক্ষতির মালিক নয়। এই জন্য আল্লাহ্ ছাড়া তাদেরকে এ রুবুবীয়াতের বা প্রভুত্তের গুনে গুনাম্বিত করা তো দূরের কথা, যেমন-নাসারারা রূহুল কুদ্দুস (জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম) সম্পর্কে ধারণা করেছে বরং তাদের জন্যে ইবাদাতের কোন অংশ পালন করা বৈধ নয়।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَداً سُبْحَانَهُ بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُونَ - لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ

[سورة الأنبياء، الآيتان:26-27]

অর্থঃ ((তারা বললঃ দয়াময় আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করেছে। তাঁর জন্য কখনও ইহা যোগ্য নয়। বরং তাঁরা (ফিরিশ্তারা) তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারেনা এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে।)) [সূরা আল-আম্বিয়া,আয়াত-২৬-২৭]

তিনি আরো বলেনঃ

لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

[سورة التحريم، الآية:6]

অর্থঃ ((তারা আল্লাহ্ তা'আলা যা আদেশ করেন,তা অমান্য করেনা এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।)) [সূরা আত-তাহরীম,আয়াত-৬]

প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর উপর এতটুকু ঈমান আনা ওয়াজেব। তাদের উপর অপরিহার্য যে, ইহা জানবে ও বিশ্বাস করবে। কেননা এ বিষয়ে অজ্ঞতা কোন গ্রহণ যোগ্য ওযর বা কারণ নয়।

ফিরিশ্তাদের প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনা নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলোকে অন্তভর্ুক্ত করে।

প্রথমতঃ ফিরিশ্তাদের সৃষ্টির মূল উত্সঃ

আল্লাহ তা'আলা ফিরিশ্তাদের কে নূর হতে সৃষ্টি করেছেন, যেমন-জি্বন জাতিকে আগুন হতে সৃষ্টি করেছেন, এবং আদম সন্তানদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন, আর তাদের সৃষ্টি হলো আদম আলাইহিস্ সালাম এর সৃষ্টির পূর্বে।

হাদীসে এসেছেঃ

خلقت الملائكة من نور، وخلق الجان من مارج من نار، وخلق آدم مما وصف لكم

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((ফিরিশ্তারা নূর হতে, জিনেরা অগি্ন স্ফুলিঙ্গ হতে, আর আদম আলাইহিস্ সালাম মাটি হতে সৃষ্ট।)) [মুসলিম শরীফ]

দ্বিতীয়তঃ ফিরিশ্তাদের সংখ্যাঃ

ফিরিশ্তারা সৃষ্ট জীব, তাদের আধিক্যের জন্যে আল্লাহ্ আয্যা ও জাল্লা ছাড়া তাদের সংখ্যা কেহ জানেনা। আকাশে প্রতি চার আংগুল পরিমাণ জায়গায় একেক জন ফিরিশ্তা সিজ্দারত অথবা দন্ডায়মান অবস্থায় রয়েছেন। সপ্তম আকাশে আল- বায়তুল মা'মুরে সত্তর হাজার ফিরিশ্তা প্রত্যহ প্রবেশ করছেন। তাদের আধিক্যতার জন্যে দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পাবেননা।

কিয়ামত দিবসে জাহান্মাম উপস্থিত করা হবে, তার সত্তর হাজার লাগাম হবে। প্রত্যেক লাগামে সত্তর হাজার ফিরিশ্তা হবে, তারা জাহান্মকে টেনে নিয়ে আসবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَمَا يَعْلَمُ جُنُودَ رَبِّكَ إِلَّا هُوَ

[سورة المدثر، الآية:31]

অর্থঃ ((আর আপনার পালন কতর্ার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন।)) [সূরা আল-মুদ্দাছির,আয়াত-৩১]

হাদীসে এসেছে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ

أطَّت السماء وحق أن تئطَّ، ما فيها موضع قدم إلا وفيه ملك ساجد وراكع

অর্থঃ ((আকাশ গর্জন করছে,আর গর্জন করারই কথা। কারণ প্রত্যেক জায়গায় সিজ্দা কারী ও রুকুকারী ফিরিশ্তা রয়েছে।))

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল-বাইতুল মা'মুর সম্পর্কে বলেনঃ

يدخله في كل يوم سبعون ألف ملك لا يعودون إليه

[رواه البخاري ومسلم]

অর্থঃ ((বাইতুল মা‘মুরে প্রত্যহ সত্তর হাজার ফিরিশতা প্রবেশ করেন, তারা দ্বিতীয় বার ফিরে আসার সুযোগ পাবেননা।)) [বুখারী ও মুসলিম ]

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেনঃ

يؤتي بجهنم يومئذٍ لها سبعون ألف زمام، مع كل زمام سبعون ألف ملك [رواه مسلم]

অর্থঃ ((জাহান্মাম কে নিয়ে আসা হবে, সে দিন তার সত্তর হাজার লাগাম হবে। আর প্রত্যেক লাগামে সত্তর হাজার ফিরিশতা হবে।)) [মুসলিম]

এখানে ফিরিশতাদের এক বিরাট সংখ্যা প্রকাশিত হল। যারা প্রায় (৭০০০০ ৭০০০০=) ৪৯০কোটি জন ফিরিশতা তবে বাকী ফিরিশতাদের সংখ্যা কত হতে পারে? পবিত্রতা সেই সত্তার যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে পরিচালনা করেন। তাদের সংখ্যা পরিসংখ্যান করে রেখেছেন।

তৃত্বীয়তঃ ফিরিশতাদের নামঃ কুরআন ও হাদীসে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের জন্যে যে, সকল ফিরিশতাদের নাম উল্লেখ্য করেছেন, তাদের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন তিনজন।

(১) জিবরীলঃ তাকে জিবরাঈল ও বলা হয়। তিনিই রুহুল কুদ্দস, যিনি ওয়াহী-যা অন্ত-রের সুধা-নিয়ে রাসূলগণের নিকট অবতরণ হন।

(২) মিকাঈলঃ তাকে প্রশান্তি বলা হয়। বৃষ্টি বর্ষণের দায়িত্বে নিয়োযিত, যা জমির জীবিকা স্বরূপ। আল্লাহ যেখানে বর্ষণের আদেশ দেন সেখানে বর্ষণ পরিচালনা করেন।

(৩) ইসরাফীলঃ তিনি শিংগায় ফুতকার দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন। পার্থিব্য জীবন শেষে পারলৌকিক জীবন শুরু হওয়ার ঘোষনা স্বরূপ এবং এর দ্বারাই, (মৃত) দেহ সমূহের পুনরুজীবন ঘটবে।

চতুর্থতঃ ফিরিশতাদের সিফাত বা বৈশিষ্ট্যঃ ফিরিশতারা প্রকৃত সৃষ্টি জীব। তাদের প্রকৃত শরীর রয়েছে যা সৃষ্টিগত ও চরিত্র গত গুনে গুনাম্বিত, নিম্নে তাদের কিছু গুন বর্ণনা করা হলোঃ

(ক) তাদের সৃষ্টি মহান এবং তাদের শরীর হলো বিশাল আকৃতিরঃ আল্লাহ তা‘য়ালা ফিরিশতাদেরকে শক্তি শালী ও বড় আকৃতীতে সৃষ্টি করেছেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে আসমান ও যমিনে যে বড় বড় কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা তার উপযোগী।

(খ) তাদের ডানা রয়েছেঃ আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদের জন্যে দুই, তিন ও চার বা ততোধিক পাখা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যেমন- রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিবরীল (আলাইহিস সালাম) কে দেখেছিলেন, তার নিজÈ আকৃতি ছয়শত পাখা বিশিষ্ট অবস্থায়। যা আকাশের প্রান্তভাগ ঢেকে রেখেছিল।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

الْحَمْدُ لِلَّهِ فَاطِرِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ جَاعِلِ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً أُولِي أَجْنِحَةٍ مَّثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ يَزِيدُ فِي الْخَلْقِ مَا يَشَاءُ

[سورة فاطر، الآية:1]

অর্থঃ ((সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা এবং ফিরিশতাদেরকে করেছেন কতাê বাহক-তারা দুই দুই, তিন তিন ও চার চার পাখা বিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টির মধ্যে যা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন।)) [সূরা ফাত্বির,আয়াত-১]

(গ) তাদের পানাহার প্রয়োজন হয় নাঃ আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা পানাহারের মুহতাজ বা মুখাপেক্ষী নন। তারা বিবাহ করেননা, সন্তান ও হয়না।

(ঘ) ফিরিশতারা অন্তর বিশিষ্ট ও জ্ঞানীঃ তাঁরা আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন, এবং আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলেছেন। তারা আদম ও অন্যান্য নাবীদের সাথে ও কথা বলেছেন।

(ঙ) তাদের নিজÈ আকৃতি ছাড়া অন্য আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছেঃ আল্লাহ স্বীয় ফিরিশতাদেরকে পুরুষ মানুষের আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা দিয়েছেন। ইহা মূর্তি পূজকদের ভ্রান্ত ধারণার খন্ডন। যারা ধারণা করে যে ফিরিশতারা আল্লাহর মেয়ে বা কন্যা। তাদের আকৃতি ধারনের পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। তবে তারা এমন সূক্ষ্ম আকৃতি ধারণ করে যে তাদের ও মানুষের মাঝে পার্থক্য করা কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ে।

(চ) ফিরিশতাদের মৃতুøবরণঃ মালাকুল মাউত বা জান কবজকারী ফিরিশতা সহ সকল ফিরিশতারা কিয়ামত দিবসে মৃতুø বরণ করবেন। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে যে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব পালন করার জন্য পুনরুথ্যান করা হবে।

(ছ) ফিরিশতাদের ইবাদাতঃ ফিরিশতারা আল্লাহর অনেক ধরণের ইবাদাত করেন। সালাত, দো'আ, তাসবীহ রুকু, সিজদাহ, ভয়-ভীতি ও ভাল বাসা ইত্যাদি।

তাদের ইবাদাতের বর্ণনা নিম্নরুপঃ

(১) তারা ক্লান্তহীন ভাবে আল্লাহর ইবাদাতে সর্বদায় রত থাকেন।

(২) তারা একনিষ্টতার সাথে আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ইবাদাত করেন।

(৩) তারা নাফারমানী বর্জন করে সর্বদায় আনুগত্যে মাশগুল থাকেন, কেননা তারা মা‘সুম অথাêত নাফারমানী ও পাপাচার হতে মুক্ত।

(৪) অধিক ইবাদাত করার সাথে সাথে আল্লাহর জন্য বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ

[سورة الأنباء، الآية:20]

অর্থঃ ((তারা রাত্রি দিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয়না।)) [সূরা আল-আম্বিয়া,আয়াত-২০]

পঞ্চমতঃ ফিরিশতাদের কর্ম সমূহঃ ফিরিশতারা অনেক বড় বড় কাজ সম্পাদন করেন, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন।

সে কাজ গুলো নিম্নরূপঃ

(১) আরশ বহন করা।

(২) রাসূলগণের উপর ওয়াহী অবতীর্ণের দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(৩) জান্নাত ও জাহান্নামের পাহারাদার।

(৪) উদ্ভিদ, বৃষ্টি বর্ষণ ও বাদল পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(৫) পাহাড়-পর্বতের দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(৬) শিংগায় ফুতকারের দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(৭) আদম সন্তানের কর্ম লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(৮) আদম সন্তানকে হিফাজত করার দায়িত্ব প্রাপ্ত। আল্লাহ যখন আদম সন্তানের উপর কোন কাজ নিধাêরন করেন, তখন তারা তাকে পরিত্যাগ করেন, অতঃপর আল্লাহ তাদের জন্য যা নিধাêরণ করেছিলেন, তা পতিত হয় বা সংঘটিত হয়।

(৯) মানুষের সাথে থাকার ও তাদেরকে কল্যানের দিকে আহ্বানের দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(১০) জরায়ুতে বীর্য সঞ্চার, মানুষের (দেহে) অন্তরে আত্না প্রক্ষেপ, তার রিযিক, কর্ম ও সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য লিপিবদ্ধে দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(১১) মৃতুøর সময় আদম সন্তানের আত্না কবজ করার দায়িত্ব প্রাপ্ত ফিরিশতা।

(১২) মানুষকে কবরে জিজ্ঞাসাবাদ এবং উত্তর অনুযায়ী শান্তি বা শাস্তি প্রদানে দায়িত্ব প্রাপ্ত।

(১৩) নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর তাঁর উম্মতের সালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত ঐ। তাই মুসলিম ব্যক্তি নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর তার সালাম প্রেরণের জন্য তাঁর কাছে (তাঁর কবরের কাছে) ভ্রমণের প্রয়োজন হয় না। বরং পৃথিবীর যে কোন স্থান হতে তাঁর উপর সালাম, ও দরুদ পাঠ করাই যথেষ্ট। কারণ ফিরিশতারা তার সালাম পৌঁছিয়ে দেন। মাসজিদে নাবাবীতে এক মাত্র নামাজ পড়ার উদ্দেশে ভ্রমণ করা বৈধ রয়েছে। উল্লেখিত এ প্রসিদ্ধ কাজ সমূহ ব্যতীত তাদের (ফিরিশতাদের) আরো অনেক কাজ রয়েছে। নিম্নে এর প্রমাণ বর্ণিত হলো-

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا

[سورة غافر، الآية:7]]

অর্থঃ ((যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চার পাশে আছে, তারা তাদের পালনকতাêর সপ্রশংসা পবিত্রতা বর্ণনা করে, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মু‘মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।)) [সূরা গাফির,আয়াত-৭]

তিনি আরো বলেনঃ

قُلْ مَن كَانَ عَدُوّاً لِّجِبْرِيلَ فَإِنَّهُ نَزَّلَهُ عَلَى قَلْبِكَ بِإِذْنِ اللّهِ

[سورة البقرة، الآية:97]

অর্থঃ ((আপনি বলে দিন, যে কেউ জিবরাঈলের শক্র হয়-যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-৯৭]

তিনি আরো বলেনঃ

وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ فِي غَمَرَاتِ الْمَوْتِ وَالْمَلآئِكَةُ بَاسِطُواْ أَيْدِيهِمْ أَخْرِجُواْ أَنفُسَكُمُ

[سورة الأنعام، الآية:93]

অর্থঃ ((যদি আপনি দেখেন যখন জালেমরা মৃতুø-যন্ত্রনায় থাকে এবং ফিরিশতারা Èীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের কর Èীয় আত্না।)) [সূরা আল-আনআম,আয়াত-৯৩]

ষষ্টয়তঃ আদম সন্তানের উপর ফিরিশতাদের অধিকারঃ

(ক) তাদের প্রতি ঈমান আনা।

(খ) তাদেরকে ভাল বাসা, সম্মান করা,ও তাদের মযাêদা বর্ণনা করা।

(গ) তাদেরকে গালি দেওয়া, মযাêদা ক্ষুন্য করা,ও তাদেরকে নিয়ে হাসি রহস্য করা হারাম।

(ঘ) ফিরিশতারা যা অপছন্দ করেন তা হতে দূরে থাকা। কারণ,আদম সন্তানরা যাতে কষ্ট পায়,তারাও তাতে কষ্ট পায়।

ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান আনার সুভ-ফলাফলঃ

(ক) ঈমান পরিপূর্ণ হয়। কারণ তাদের প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কারো ঈমান পরিপূর্ণ হবেনা।

(খ) তাদের সৃষ্টি কতাêর মহত্ব বা শ্রেণ্ঠত্ব ও তাঁর শক্তি ও রাজত্বে জ্ঞান অর্জন। কারণ, সৃষ্টি কতাêর, শ্রেণ্ঠত্ব হতে সৃষ্টি জীবের শ্রেণ্ঠত্ব প্রকাশ পায়।

(গ) তাদের গুনাগুন, তাদের অবস্থা, ও কর্ম জানার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির ঈমান বৃদ্ধি পায়।

(ঘ) আল্লাহ তা‘আলা যখন মু‘মিনদেরকে ফিরিশতা দিয়ে হিফাজত করেন, তখন তাদের (মু‘মিনদের) শান্তি ও তৃপ্তি অর্জন হয়।

(ঙ) ফিরিশতাদেরকে ভাল বাসাঃ তাদের ইবাদাত সঠিক পন্থায় হওয়ায় ও মু‘মিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে।

(চ) খারাপ ও নাফারমানী পূর্ণ কাজকে অপছন্দ করা।

(ছ) আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের গুরুত্ব দেন এই জন্য তাঁর প্রশংসা করা। যেমন আল্লাহ ঐ সকল ফিরিশতাদের কাউকে তাদেরকে (বান্দাদেরকে) হিফাজতের,ও কর্ম লিখার ইত্যাদি কল্যাণ জনক কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন।

الركن الثالث :الإيمان بالكتب

তৃতীয় রুকনঃ আসমানী গ্রন্থ সমূহের প্রতি ঈমান

রাসূলগনের উপর আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনা, ইহা ঈমানের তৃতীয় রুকন বা স্তম্ভ।

নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণ কে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছেন। এবং তাঁদের (রাসূলগণের) উপর কিতাব সমূহ অবতীর্ণ করেছেন, মাখলুকাতের হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ। যাতে-দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যশীল হয়। এবং যাতে তাদের চলার একটি সুন্দর পথ হয়। আর মানুষ যে বিষয়ে মতনৈক্যে লিপ্ত, তার সমাধানকারী বা ফায়সালাকারী হয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

َقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

[سورة الحديد، الآية:25]

অর্থঃ ((আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মিযান (মানদন্ড) যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্টা করে।)) [সূরা আল-হাদীদ,আয়াত-২৫]

তিনি আরো বলেনঃ

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ

[سورة البقرة، الآية:213]

অর্থঃ ((সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অর্ন্তভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাবীদেরকে পাঠালেন সুসংবাদ দাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২১৩]

(১) কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনার মূল কথাঃ

কিতাব সমূহের প্রতি ঈমানঃ এ কথার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহর অনেক কিতাব রয়েছে। যা তিনি তাঁর রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) উপর নাযিল করেছেন। আর তা সত্যিকার অর্থে তাঁর (আল্লাহর) বাণী। আর তা হল জ্যোতি ও হিদায়াত। আর নিশ্চয় এ কিতাব সমূহের মধ্যে যা রয়েছে তা সত্য ও ন্যায় সিণ্ঠ, এর অনুসরণ করা ও তদানুযায়ী আমল করা ওয়াজিব। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া এ কিতাব সমূহের সংখ্যা কেউ জানেনা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَكَلَّمَ اللّهُ مُوسَى تَكْلِيماً

[سورة النساء، الآية:164]

অর্থঃ ((আর আল্লাহ মূসার সাথে কথোপথন করেছেন সরাসরি।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৬৪]

তিনি আরো বলেনঃ

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلاَمَ اللّهِ

[سورة التوبة، الآية:6]

অর্থঃ ((আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দিবে, যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়।)) [সূরা আত তাওবাহ-আয়াত-৬]

(২) কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনার বিধানঃ

সকল কিতাবের প্রতি ঈমান আনা যা আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের (আলাইহিমুস সালাম) উপর অবতীর্ণ করেছেন, আল্লাহ তা‘বারাকা ও তা‘আলা সত্যিকার অর্থে কিতাব সমূহের মাধ্যমে কথা বলেছেন। এবং তা (আল্লাহর পক্ষহতে) অবতীর্ণ, মাখলুক বা সৃষ্ট নয়,আর যে ব্যক্তি তা (কিতাব সমূহ) অথবা তাঁর কিছুকে অÈীকার করবে সে কাফের হয়ে যাবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ آمِنُواْ بِاللّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَى رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِيَ أَنزَلَ مِن قَبْلُ وَمَن يَكْفُرْ بِاللّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلاَلاً بَعِيداً

[سورة النساء، الآية:136]

অর্থঃ ((হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর এবং বিশ্বাস স্থাপন কর তাঁর রাসূল ও তাঁর কিতাবের উপর ,যা তিনি অবতীর্ণ করেছেন Èীয় রাসূলের উপর এবং সে সমস্ত কিতাবের উপর যে গুলো অবতীর্ণ করা হয়েছিল ইতিপূর্বে। যে আল্লাহর উপর,তাঁর ফিরিশতাদের উপর, তাঁর কিতাব সমূহের উপর,এবং রাসূলগণের উপর ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস করবেনা, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহু দূরে গিয়ে পড়বে।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৩৬]

তিনি আরো বলেনঃ

وَهَـذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُواْ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

[سورة الأنعام، الآية:155]

অর্থঃ ((এটি এমন একটি গ্রন্থ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, খুব মঙ্গলময়। অতএব এর অনুসরণ কর এবং ভয়কর-যাতে তোমরা করুনা প্রাপ্ত হও।)) [সূরা আল-আনআম,আয়াত-১৫৫]

(৩) এসব কিতাবের প্রতি মানুষের প্রয়োজনীয়তা এবং তা অবতীর্ণ করার পিছনে হিকমাত বা রহস্যঃ

প্রথমতঃ যাতে রাসূল (আলাইহিস সালাম) এর উপর অবতীêণ কিতাব তাঁর উম্মাতের জন্য জ্ঞান কোষ স্বরূপ হয়। ফলে তারা তাদের দ্বীন সম্পর্কে জানার জন্যে এর দিকে প্রত্যাবর্তন করে।

দ্বিতীয়তঃ যাতে রাসূল (আলাইহিস সালাম) এর উপর অবতীêন কিতাব তাঁর উম্মাতের প্রত্যেক মতনৈক্য পূর্ণ বিষয়ে ইনসাফ ভিক্তিক বিচারক হয়।

তৃতীয়তঃ যাতে অবতীêণ কিতাব রাসূল (আলাইহিস সালাম) এর ইন্তেকালের পর দ্বীন বা ধর্ম সংরক্ষণকারী হিসাবে দাঁড়াতে পারে, স্থান ও কালের যতই দুরুত্ব হোকনা কেন। যেমন-আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর (পরবর্তী)দাওয়াতের অবস্থা।

চতুর্থতঃ যাতে এ অবতীর্ণ কিতাব সমূহ আল্লাহর পক্ষহতে হুজ্জাত (পক্ষ বিপক্ষের দলীল)স্বরূপ হয়। যেন সৃষ্টি জীব এর (কিতাব সমূহের) বিরোধিতা করা এবং এর আনুগত্য হতে বের হয়ে যাওয়ার সমথ্যê না রাখে।

আল্লাহ্ তা‌‌'আলা বলেনঃ

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ

[سورة البقرة، الآية:213]

অর্থঃ ((সকল মানুষ একই জাতি সত্ত্বার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা নাবীদেরকে পাঠালেন সুসংবাদ দাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে। আর তাদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব,যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২১৩]

(৪)কিতাব সমূহের প্রতি ঈমান আনার নিয়মঃ

আল্লাহর কিতাব সমূহের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ভাবে ঈমান আনা হয়ে থাকে।

সংক্ষিপ্ত ঈমানঃ এ বিশ্বাস করবে (ঈমান আনা) যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলগণের উপর অনেক কিতাব অবতীর্ণ করেছেন।

বিস্তারিত ভাবে ঈমানঃ ইহা হলো, আল্লাহ কুরআন কারীমে যে সকল কিতাবের নাম উল্লেখ্য করেছেন, তার প্রতি ঈমান আনা। তা হতে আমরা জেনেছি-কুরআন, তাওরাত, যাবুর, ইনজীল, এবং ইব্রাহীম, ও মূসা এর প্রতি অবতীর্ণ পুস্তিকা সমূহ (আলাইহিমুস সালাম)।

আরো ঈমান আনা যে, ঐসকল কিতাব ছাড়াও আল্লাহর অনেক কিতাব রয়েছে, যা তাঁর নাবীগণের উপর অবতীêণ করেছেন।

আর আল্লাহ ছাড়া ঐ সকল কিতাবের নাম ও সংখ্যা কেউ জানেনা।

এ কিতাব গুলো অবতীর্ণ হয়েছে যাবতীয় সতকর্ম ও ইবাদাত একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার নিমিত্তে সম্পাদনের মাধ্যমে তাঁর তাওহীদ (একত্ববাদ) বাস্তবায়ন এবং পৃথিবীতে শিরক ও অন্যায়-অনাচার দূরীভূত করার জন্য। মূলত সকল নাবীদের দাওয়াত এক মূলনীতির (তাওহীদ প্রতিণ্ঠা ও শির্ক বর্জনের) উপর ছিল, যদিও তাঁরা নিয়ম কানুন ও বিধি-বিধানে কিছুটা ভিন্ন রকম ছিলেন।

এ ঈমানও রাখা যে, পূর্ববর্তী রাসূলদের প্রতি (আল্লাহর পক্ষ হতে) কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল । আর আল-কুরআনের প্রতি ঈমান আনা হলো ঃ তা (অন্তরে ও মুখে) স্বীকৃতি দেয়া এবং কুরআনে যা রয়েছে তা অনুসরণ করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ

[سورة البقرة، الآية:285]

অর্থঃ ((রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালন কর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মু‘মিনরাও। সকলেই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থ সমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি।)) [সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-২৮৫]

তিনি আরো বলেনঃ

اتَّبِعُواْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلاَ تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء

[سورة الأعراف، الآية:3]

অর্থঃ তোমরা অনুসরণ কর,যা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সাথীদের অনুসরণ করোনা। [সূরা আল-আ‘রাফ,আয়াত-৩]

পূর্ববতী কিতাবের চেয়ে কুরআনের কিছু ভিন্ন বৈশিষ্ট রয়েছেঃ

(১) আল-কুরআন স্বীয় শব্দ, অর্থ এবং তাতে যে জ্ঞান ও পার্থিব তথ্য রয়েছে তা সর্ব বিষয়ে এক অলৌকিক শক্তি।

(২) আল-কুরআন সর্ব শেষ আসমানী কিতাব, কুরআনের মাধ্যমে আসমানী কিতাবের সমাপ্তি ঘটেছে। যেমন-আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর রিসালাতের দ্বারা সকল রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।

(৩) সকল প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন হতে আল্লাহ কুরআনকে হেফাজত করবেন। ইহা অন্যান্য কিতাব হতে সতন্ত্র। কেননা সে সব কিতাবে বিকৃতি ও পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটেছে।

(৪) আল-কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়ন ও সংরক্ষণকারী।

(৫) কুরআন পূর্ববর্তী সকল কিতাবের রহিতকারী।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

مَا كَانَ حَدِيثاً يُفْتَرَى وَلَـكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

[سورة يوسف، الآية:111]

অর্থঃ ((এটা কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্ত যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্য পূর্বেকার কালামের সামর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হিদায়াত।)) [সূরা ইফসুফ,আয়াত-১১১]

(৫)পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের সংবাদ গ্রহণ করাঃ

আমরা নিশ্চিত ভাবে জানি যে, পূর্ববর্তী কিতাবে আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের নিকটে ওয়াহীর মাধ্যমে যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য, তাতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। এর অর্থ এ নয় যে, বর্তমানে আহলে কিতাবদের (ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের) নিকট যে কিতাব রয়েছে তা গ্রহণ করবো। কারণ তা বিকৃত করা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের নিকট যে ভাবে অবতীর্ণ করেছেন সে ভাবে নেই। পূর্ববর্তী কিতাব হতে আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর কিতাবে (কুরআনে) যে সংবাদ দিয়েছেন তা হতে আমরা নিশ্চিত ভাবে জেনেছি যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না। মানুষ তাই পায় যা সে করে, তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

َمْ لَمْ يُنَبَّأْ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى - وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى - أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى - وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى - َأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى - ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاء الْأَوْفَى

[سورة النجم، الآيات:36-41]

অর্থঃ ((তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে যে,তার দায়িত্ব পালন করে ছিল ? কিতাবে আছে যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না, এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। আর তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ-প্রতিদান দেয়া হবে।)) [সূরা আন-নজম,আয়াত-৩৬-৪১]

তিনি আরো বলেনঃ

َلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا - وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى - إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى - صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى

[سورة الأعلى، الآيات:16-19]

অর্থঃ ((বস্ততঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও,অথচ পরকালের জীবন উতকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, ইবরাহীম ও মূসার কিতাব সমূহে।)) [সূরা আল-আ‘লা,আয়াত-১৬-১৯]

পূর্ববর্তী কিতাবের বিধানঃ কুরআনে যে সকল বিধান রয়েছে তা মেনে চলা আমাদের অপরিহার্য। তবে পূর্ববর্তী কিতাবে যা রয়েছে তা নয়। কারণ আমরা দেখবো পূর্ববর্তী কিতাবে যে বিধান রয়েছে তা যদি আমাদের শরিয়াতের পরিপন্থী হয়, তবে আমরা তা আমল করবো না, তা বাতিল এ জন্যে নয়, বরং তা সে সময় সত্য ছিল, এখন তা আমল করা আমাদের উপর অপরিহার্য নয়। কারণ তা আমাদের শরীয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। আর যদি তা আমাদের শরীয়াতের অনুসরণ হয়, তবে তা সত্য বলে বিবেচিত হবে। আমাদের শরীয়াত তা সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

(৬) কুরআন ও হাদীসে যে সকল আসমানী কিতাবের নাম উল্লেখ্য হয়েছে তা হলোঃ

(১) কুরআন কারীমঃ কুরআন হল আল্লাহর বানী যা তিনি শেষ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উপর নাযিল করেছেন।

কুরআন সর্ব শেষ অবতীর্ণ কিতাব। আল্লাহ কুরআনকে বিকৃতি ও পরির্বতন হতে হিফাজত করার দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেছেন, এবং সকল আসমানী কিতাবের রহিতকারী করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

[سورة الحجر، الآية:9]

অর্থঃ ((আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।)) [সূরা আল-হিজর,আয়াত-৯]

তিনি আরো বলেনঃ

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِناً عَلَيْهِ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللّهُ

[سورة المائدة، الآية:48]

অর্থঃ ((আমি আপনার প্রতি অবতীর্ন করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী গ্রন্থ সমূহের সত্যায়নকারী এবং সে গুলোর বিষয়বস্তর রক্ষণা বেক্ষণকারী। অতএব আপনি তাদের পারস্পারিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন।)) [সূরা আল-মায়িদাহ,আয়াত-৪৮]

(২)তাওরাতঃ তাওরাত ঐ কিতাব যাকে আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর নূর (জ্যোতি) ও হিদায়াত স্বরূপ নাযিল করেছিলেন। বানী ইসরাঈলের নাবী ও আলেমগণ এর দ্বারা ফায়সালা করতেন। সুতরাং মূসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তাওরাত এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব, বর্তমান তথা কথিত ইয়াহুদীদের হাতে বিকৃত তাওরাতের প্রতি নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

ِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُواْ لِلَّذِينَ هَادُواْ وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالأَحْبَارُ بِمَا اسْتُحْفِظُواْ مِن كِتَابِ اللّهِ

[سورة المائدة، الآية:44]

অর্থঃ ((আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি, এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে, আল্লাহর আনুগত্যশীল নাবী, আল্লাহভক্ত ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইয়াহুদীদের ফায়সালা দিতেন। কেননা তাদেরকে আল্লাহর এই গ্রন্থের দেখা শোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।)) [সূরা আল-মায়িদাহ,আয়াত-৪৪]

(৩)ইঞ্জীলঃ ইঞ্জীল ঐ কিতাব যা সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর নাযিল করেছিলেন, যা পুর্ববতীê সকল আসমানী কিতাবের সত্যায়নকারী। সুতরাং ঐ ইঞ্জীলের উপর ঈমান আনা ওয়াজিব, যা সঠিক মূলনীতি সহ আল্লাহ ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর উপর নাযিল করেছিলেন। খৃষ্টানদের নিকট বিক্রিত ইঞ্জীল সমূহে নয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَقَفَّيْنَا عَلَى آثَارِهِم بِعَيسَى ابْنِ مَرْيَمَ مُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَآتَيْنَاهُ الإِنجِيلَ فِيهِ هُدًى وَنُورٌ وَمُصَدِّقاً لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ التَّوْرَاةِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةً لِّلْمُتَّقِينَ

[سورة المائدة، الآية:46]

অর্থঃ ((আমি তাদের পেছনে মারিয়ামের পুত্র ঈসাকে প্রেরণ করেছি। তিনি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের সত্যায়নকারী ছিলেন। আমি তাকে ইঞ্জীল প্রদান করেছি। এতে হেদায়াত ও আলো রয়েছে। এটি পূর্ববর্তী গ্রন্থ তাওরাতের-সত্যায়ন করে,পথ প্রদর্শন করে এবং এটি আল্লাহভীরুদের জন্যে হেদায়াত ও উপদেশবানী।)) [সূরা আল-মায়িদাহ,আয়াত-৪৬]

তাওরাত ও ইঞ্জীলে যা রয়েছে তন্মধ্যে আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর রিসালাতের সুসংবাদ রয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالأَغْلاَلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ

[سورة الأعراف، الآية:157]

অর্থঃ ((যারা আনুগত্য করে এ রাসূলের, যিনি নিরক্ষর নাবী,যার সম্পর্কে তাদের নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিখা দেখতে পায়, তিনি তাদেরকে নির্দেশদেন সতকর্মের, বারণ করেন অসতকর্ম থেকে, তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষনা করেন ও নিষিদ্ধ করেন নিকৃষ্ট বুæসমূহ, আর তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়েছেন এবং বন্দীত্ব অপসারণ করেন যা তাদের উপর বিদ্যমান ছিল।)) [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত-১৫৭]

(৪)যাবুরঃ যাবুর ঐ কিতাব যা আল্লাহ দাউদ (আলাইহিস সালাম) এর উপর নাযিল করেছিলেন। সুতরাং ঐ যাবুরের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব যা আল্লাহ দাউদ (আলাইহিস সালাম) এর উপর নাযিল করেছিলেন। সে যাবুর নয় যা ইয়াহুদীরা বিকৃত করে ফেলেছে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُوراً

[سورة النساء، الآية:163]

অর্থঃ ((আর দাউদকে দান করেছি যাবুর।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৬৩]

(৫) ইবরাহীম ও মূসা (আলাইহিস সালাম)এর সুহুফ বা পুস্তিকা সমূহঃ

তা ঐ সকল পুস্তিকা যা আল্লাহ ইবরাহীম ও মূসা (আলাইহিস সালাম)কে দিয়েছিলেন। কুরআন ও হাদীসে যা উল্লেখ্য হয়েছে তা ছাড়া এ সকল পুস্তিকা নিরুদ্দেশ।

আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

َمْ لَمْ يُنَبَّأْ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى - وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى - أَلَّا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى - وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى - َأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَى - ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاء الْأَوْفَى

[سورة النجم، الآيات:36-41]

অর্থঃ ((তাকে কি জানানো হয়নি যা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে যে,তার দায়িত্ব পালন করে ছিল ? কিতাবে আছে যে, কেউ কারও গোনাহ বহন করবে না, এবং মানুষ তাই পায় যা সে করে। আর তার কর্ম শীঘ্রই দেখানো হবে, অতঃপর তাকে পূর্ণ-প্রতিদান দেয়া হবে।)) [সূরা আন-নজম,আয়াত-৩৬-৪১]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেনঃ

َلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا - وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى - إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى - صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى

[سورة الأعلى، الآيات:16-19]

অর্থঃ ((বস্ততঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দাও,অথচ পরকালের জীবন উতকৃষ্ট ও স্থায়ী। এটা লিখিত রয়েছে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহে, ইবরাহীম ও মূসার কিতাব সমূহে।)) [সূরা আল-আ‘লা,আয়াত-১৬-১৯]

الركن الرابع: الإيمان بالرسل

চতুর্থ রুকনঃ রাসূলদের প্রতি ঈমান ।

(১) রাসূল (আলাইহিমুস্ সালাম) দের প্রতি ঈমান আনাঃ ইহা ঈমানের রুকন সমূহের একটি রুকন, যার প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কোন ব্যক্তির ঈমান পরিপূর্ণ হবেনা।

রাসূলগণের প্রতি ঈমান হলঃ এ কথার দৃঢ় বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর অনেক রাসূল রয়েছে যাদেরকে তিনি তাঁর রিসালাত প্রচার করার জন্য নির্বাচন করেছেন। যারা তাঁদের অনুসরণ করবে, তারা হেদায়াত (সঠিক পথ) পাবে। আর যারা তাঁদের অনুসরণ করবেনা তারা পথভ্রষ্ট হবে। আল্লাহ তাদের নিকট যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তা সুস্পষ্ট ভাবে প্রচার করেছেন। তারা অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, এবং স্বীয় উম্মাতকে কল্যাণের উপদেশ দিয়েছেন। তাঁরা আল্লাহর পথে যথাযথ জিহাদ করেছেন। এবং যা সহ প্রেরিত হয়েছেন তার কোন অংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও গোপন না করে স্বজাতির উপর হুজ্জাত (পক্ষ-বিপক্ষের দলীল) কায়েম করেছেন। আল্লাহ যে সকল রাসূলদের নাম আমাদের কাছে উল্লেখ্য করেছেন, আর যাদের নাম উল্লেখ্য করেন নাই তাদের সকলের প্রতি আমরা ঈমান আনবো।

প্রত্যেক রাসূলই তাঁর পূর্ববতর্ী রাসূল আগমনের সুসংবাদ দিতেন, এবং পরবর্তী রাসূল পূর্ববতী রাসূলের সত্যায়ন করতেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

ُولُواْ آمَنَّا بِاللّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالأسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لاَ نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ

سورة البقرة، الآية:136]]

অর্থঃ ((তোমরা বলঃ আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব, এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীকে তাঁদের পালন কর্তার পক্ষ হতে যা দান করা হয়েছে, তৎসমূদয়ের উপর। আমরা তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করিনা। আর আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।))

[সূরা আল-বাক্বারা,আয়াত-১৩৬]

আর যে ব্যক্তি কোন রাসূলকে মিথ্যা জানল, সে যেন অস্বীকার করল যা সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। এবং যে ব্যক্তি তাঁর (রাসূলের) অবাধ্য হলো, সে মূলত তাঁর অবাধ্য হলো যিনি তাকে আনুগত্যের আদেশ করেছেন। (অর্থাৎ, আল্লাহর)।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُواْ بَيْنَ اللّهِ وَرُسُلِهِ وَيقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلاً - أُوْلَـئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقّاً وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَاباً مُّهِيناً

[سورة النساء، الآيتان:150-151]

অর্থঃ ((যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণকে অস্বীকার করে তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায় আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি ও কতককে অস্বীকার করি এবং এরাই মধ্যবর্তী কোন পথ অবলম্বন করতে চায়। প্রকৃত পক্ষে এরাই সত্য অস্বীকারকারী। আর যারা সত্য অস্বীকার কারী তাদের জন্য তৈরী করে রেখেছি অপমান জনক শাস্তি।))

[সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৫০-১৫১]

(২) নবুওয়াতের হাকীকতঃ

নবুওয়াত হলোঃ স্রষ্টা (আল্লাহ) ও সৃষ্টজীবের (বান্দার ) মাঝে তাঁর শরিয়াত প্রচারের মাধ্যম। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা নবুওয়াতের জন্য মনোনীত করেন এবং নবুওয়াত দিয়ে সম্মানিত করেন। এতে আল্লাহ্ ছাড়া কারো কোন প্রকার ইখতিয়ার নেই।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلاً وَمِنَ النَّاسِ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ

[سورة الحج، الآية:75]

অর্থঃ ((আল্লাহ ফিরিশ্তা ও মানুষের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।))

[সূরা আল-হাজ্ব,আয়াত-৭৫]

নবুওয়াত (আল্লাহ কতৃর্ক) প্রদত্ত,কারো অর্জিত নয়, অধিক ইবাদাত বা আনুগত্যের মাধ্যমে পাওয়া যায় না। কোন নবীর ইচ্ছায় বা তাঁর চাওয়ার মাধ্যমে ও আসেনা। ইহা শুধু মাত্র মহান আল্লাহর নির্বাচন ও মনোনয়ন।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ

[سورة الشورى، الآية:13]

অর্থঃ ((আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তাঁর অভিমূখী হয়, তাকে পথ প্রদর্শন করেন।))

[সূরা আশ্-শূরা,আয়াত-১৩]

(৩) রাসূল প্রেরণের হিকমত বা রহস্যঃ

রাসূলগণের (আলাইহিমুস্ সালাম) প্রেরণের হিকমত বা রহস্য নিম্নরূপঃ

প্রথমতঃ বান্দাদেরকে বান্দার ইবাদাত করা হতে মুক্ত করে বান্দার প্রতিপালকের (আল্লাহর) ইবাদাতে নিয়ে যাওয়া এবং সৃষ্টিজীবের দাসত্বের বন্ধন থেকে মুক্ত করে স্বীয় প্রতিপালকের (আল্লাহর) স্বাধীন ইবাদাতের পথ দেখানো।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ

[سورة الأنبياء، الآية:107]

অর্থঃ ((আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্যে রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।))

[সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-১০৭]

দ্বিতীয়তঃ যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ সৃষ্টিজীব সৃষ্টি করেছেন, সে উদ্দেশ্যের সাথে (মানুষকে) পরিচয় করা। সে উদ্দেশ্য হলো তাঁর একত্ববাদ বিশ্বাস ও ইবাদাত করা। ইহা এক মাত্র রাসূলগণের মাধ্যমে জানা যায়। যাদেরকে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টজীব হতে মনোনয়ন করেছেন এবং সকলের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ

[سورة النحل، الآية:36]

অর্থঃ ((আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগূত (আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদাত) থেকে নিরাপদ থাক।))

[সূরা আন-নহল,আয়াত-৩৬]

তৃতীয়তঃ রাসূলগণ প্রেরণের মাধ্যমে মানুষের উপর হুজ্জাত (পক্ষ-বিপক্ষের দলীল) প্রতিষ্ঠিত করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

رُّسُلاً مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلاَّ يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللّهُ عَزِيزاً حَكِيماً

[سورة النساء، الآية:165]

অর্থঃ ((সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে, আল্লাহ পরাক্রমশীল, প্রজ্ঞাময়।))

[সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৬৫]

চতুর্থতঃ কিছু অদৃশ্যের বিষয় বর্ণনা করা, যা মানুষ তাদের জ্ঞান দ্বারা উপলদ্ধী করতে পারেনা। যেমন-আল্লাহর নাম সমূহ ও তাঁর গুনসমূহ এবং ফিরিশ্তাদের ও শেষ দিবস সম্পর্কে জানা ইত্যাদি।

পঞ্চমতঃ যাতে তাঁরা (রাসূলরা) অনুসরণীয় উত্তম আদর্শ হয় কেননা আল্লাহ তাঁদেরকে উত্তম চরিত্রে পূর্ণ করেছেন। এবং তাঁদেরকে সংশয় ও প্রবৃত্তির অনুসরণ হতে মুক্ত রেখেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

ُوْلَـئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ

[سورة الأنعام، الآية:90]

অর্থঃ ((তারা এমন ছিলেন, যাদেরকে আল্লাহ পথ-প্রদর্শন করে ছিলেন, অতএব আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন।))

[সূরা আল-আনআম,আয়াত-৯০]

তিনি আরো বলেনঃ

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيهِمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

[سورة الممتحنة، الآية:6]

অর্থঃ ((তোমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে উত্তম আদর্শ-রয়েছে।))

[সূরা আল-আযহাব, আয়াত-২১]

ষষ্ঠতঃ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্র করণ এবং আত্ম বিনষ্টকারী হতে সর্তক-সাবধান করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ

[سورة الجمعة، الآية:2]

অর্থঃ ((তিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠকরেন তাঁর আয়াত সমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষাদেন কিতাব ও হিকমত।))

[সূরা আল-জুমু'আহ, আয়াত-২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إنما بعثت لأتمم مكارم الأخلاق

[رواه أحمد، والحاكم]

অর্থঃ ((আমি উত্তম আদর্শ পরিপূর্ণ করার জন্যেই প্রেরিত হয়েছি।))

[আহমাদ ও হাকেম]

(৪) রাসূলগণের (আলাইহিমুস্ সালাম) দায়িত্ব সমূহঃ

রাসূলগণের ( আলাইহিমুস্ সালাম) অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে, তা নিম্নে বর্ণিত হলঃ

(ক) শরীয়াত প্রচার করা, মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদাত করতে এবং তিনি ব্যতীত অন্যের ইবাদাত হতে মুক্ত হওয়ার আহ্বান করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَداً إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيباً

[سورة الأحزاب، الآية:39]

অর্থঃ ((তাঁরা (নবীগণ) আল্লাহর রিসালাত প্রচার করতেন ও তাঁকে ভয় করতেন। তাঁরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না। হিসাব গ্রহণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।)) [সূরা আল-আহ্যাব,আয়াত-৩৯]

(খ) দ্বীনের অবতীর্ণ বিধান বর্ণনা করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

[سورة النحل، الآية:44]

অর্থঃ ((আপনার কাছে আমি উপদেশ ভান্ডার (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি। যাতে আপনি লোকদের সামনে ঐ সব বিষয় বিবৃত করেন, যে গুলো তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা ভাবনা করে।)) [সূরা আন-নাহাল,আয়াত-৪৪]

(গ) উম্মাতকে কল্যাণের পথ প্রদর্শণ ও অকল্যাণ হতে সতর্ক সাবধান করা, এবং তাদেরকে পূণ্যের সুসংবাদ ও তাদেরকে শাস্তির ভীতি-প্রদর্শন করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

رُّسُلاً مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ

[سورة النساء، الآية:165]

অর্থঃ ((সুসংবাদ্দাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি। [সূরা আন-নিসা,আয়াত-১৬৫]

(ঘ) মানুষকে কথায় ও কাজে সুন্দর চরিত্র ও উত্তম আদর্শবান করে তুলা।

(ঙ) আল্লাহর শরীয়াত বান্দাদের মাঝে প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ণ করা।

(চ) রাসূলগণের (আলাইহিস্ সালাম) স্বীয় উম্মাতের বিপক্ষে শেষ দিবসে এ স্বাক্ষ্য দেওয়া যে তাঁরা তাদের নিকট স্পষ্ট ভাবে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছায়েছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَـؤُلاء شَهِيداً

[سورة النساء، الآية:41]

অর্থঃ ((আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি প্রতিটি উম্মাতের মধ্য থেকে সাক্ষী উপস্থাপন করব এবং আপনাকে তাদের উপর সাক্ষী উপস্থাপন করব।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত,৪১]

(৫) ইসলাম সকল নবীদের ধর্মঃ ইসলাম সকল নবী ও রাসূলগণের ধর্ম।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ

[سورة آل عمران، الآية:19]

অর্থঃ ((নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহনযোগ্য দ্বীন বা ধর্ম একমাত্র ইসলাম।)) [সূরা-আলে-ইমরান,আয়াত-১৯]

তাঁরা সকলেই এক আল্লাহর ইবাদাত করার দিকে, এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদাত বর্জন করার আহবান জানাতেন। যদি ও তাদের শরীয়াত ও বিধি-বিধান ভিন্ন রকম ছিল, কিন্তু তাঁরা সকলেই মূলনীতীতে একমত ছিলন, তা হলো তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

الأنبياء إخوة لعلات

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((নবীরা (আলাইহিমুস্ সালাম) একে অপরে বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন।)) [বুখারী]

(৬) রাসূলগণ মানুষ তাঁরা গায়েব জানেন নাঃ

ইলমে গায়েব জানা উলুহীয়াতের (আল্লাহর) বৈশিষ্ট, নবীগণের গুণ নয়। কারণ তাঁরা অন্যান্য মানুষের মত মানুষ। তাঁরা পানাহার করেন, বৈবাহিকসূত্রে আবদ্ধ হন, নিদ্রা যান, অসুস্থ হন ও ক্লান্ত হন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَما أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَيَمْشُونَ فِي الْأَسْوَاقِ

[سورة الفرقان، الآية:20]

অর্থঃ ((আপনার পূর্বে যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তাঁরা সবাই খাদ্য গ্রহণ করত এবং হাটে বাজারে চলা ফেরা করত।)) [সূরা আল-ফুরকান,আয়াত-২০]

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِّن قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجاً وَذُرِّيَّةً

[سورة الرعد، الآية:38]

অর্থঃ ((আপনার পূর্বে আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি, এবং তাঁদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছি।)) [সূরা আর-রা'দ,আয়াত-৩৮]

তাঁদেরকে ও চিন্তা, দুঃখ আনন্দ ও কর্ম প্রেরণা স্পর্শ করে যেমন-সাধারণ মানুষকে পেয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তাঁদেরকে তাঁর দ্বীন প্রচার করার জন্য মনোনয়ন করেছেন। আল্লাহ তাঁদেরকে (রাসূলদেরকে ইলমে গায়েব হতে) যা অবগত করান তা ব্যতীত কোন ইলমে গায়েব জানেন না।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

َالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَداً - إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِن رَّسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَداً

[سورة الجن، الآيتان 26-27]

অর্থঃ ((তিনি অদৃশ্ব্যের জ্ঞানী, পরন্ত তিনি অদৃশ্যের বিষয় কারও কাছে প্রকাশ করেন না। তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত। তখন তিনি তার অগ্রেও পশ্চাতে প্রহরী নিযুক্ত করেন।)) [সূরা আল-জি্বন,আয়াত-২৬-২৭]

(৭) রাসূলগণ মা'সূম বা নিস্পাপঃ

আল্লাহ তা'আলা তাঁর রিসালাত প্রদান ও প্রচার করার জন্য তাঁর সৃষ্টজীব হতে উত্তম জাতীকে নির্বাচন করেছেন।

যারা সৃষ্টিগত ও চরিত্র গত দিক হতে পরিপূর্ণ, আল্লাহ তাঁদেরকে কবীরাহ্ গুনাহ হতে নিরাপদে রেখেছেন। সকল ক্রটি হতে তাঁদেরকে মুক্ত করেছেন। যাতে তাঁরা আল্লাহর ওয়াহী স্বীয় উম্মাতের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম হন। আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর (আল্লাহর) রিসালাত প্রচারের ব্যাপারে যে সংবাদ দিয়েছেন, তাতে তাঁরা যে মা'সূম তা সর্বজন সিদ্ধ।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ

[سورة المائدة، الآية:67]

অর্থঃ ((হে রাসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন,তবে আপনি তাঁর রিসালাত কিছুই পৌঁছালেন না, আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে নিরাপদে রাখবেন।)) [সূরা আল-মায়িদাহ,৬৭]

তিনি আরো বলেনঃ

الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَداً إِلَّا اللَّهَ

[سورة الأحزاب، الآية:39]

অর্থঃ ((তাঁরা (নবীগণ) আল্লাহর রিসালাত প্রচার করতেন ও তাঁকে ভয় করতেন,তাঁরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করতেন না।)) [সূরা আল-আহ্যাব,আয়াত-৩৯]

তিনি আরো বলেনঃ

لِيَعْلَمَ أَن قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَى كُلَّ شَيْءٍ عَدَداً

[سورة الجن، الآية:28]

অর্থঃ ((যাতে আল্লাহ তা'আলা জেনে নেন যে, রাসূলগণ তাঁদের পালনকর্তার রিসালাত পৌঁছিয়েছেন কিনা। রাসূলগণের কাছে যা আছে, তা তাঁর জ্ঞান-গোচর। তিনি সব কিছুর সংখ্যার হিসাব রাখেন।)) [সূরা আল-জিন,আয়াত-২৮]

এবং যখন তাঁদের কারো পক্ষ হতে এমন কোন ছোট পাপ কর্ম প্রকাশিত হয় যা তাবলীগের (দ্বীন প্রচারের) সাথে সম্পৃক্ত নয়। নিশ্চয় তখন তা তাঁদের নিকট বর্ণনা করা হবে। আল্লাহর কাছে তাওবাহ্ ও তাঁর দিকে ধাবমান হওয়ার সাথে সাথেই মনে হবে যেন (এই পাপ) তাঁদের কাছ থেকে প্রকাশ পায় নাই, এবং এর বিনমিয়ে তাঁরা তাঁদের পূর্বের মর্যাদার চেয়ে আরো উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন। ইহা এ জন্য যে, আল্লাহ তাঁর নবীদেরকে (আলাইহিমুস্ সালাম) পূর্ণ সৎ চরিত্রে ও ভাল গুণে বিশেষিত করেছেন। এবং তাঁদের মান মর্যাদা সুউচ্চ অবস্থান ক্ষুন্ন করে এমন সকল জিনিস হতে তাঁদেরকে আল্লাহ পবিত্র রেখেছেন।

(৮) নবী ও রাসূলগণের সংখ্যা ও তাঁদের মধ্যে যারা উত্তমঃ

রাসূলগণের সংখ্যা তিন শত দশের কিছু বেশী প্রমাণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যখন রাসূলগণের সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়; তখন তিনি বলেনঃ

ثلاثمائة وخمس عشرة جماً وغفيراً

[رواه الحاكم]

অর্থঃ ((তিনশত পনের জনের বিরাট এক দল।)) [হাকিম]

আর নবীদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশী। আল্লাহ তাঁদের কারোও কথা তাঁর কিতাবে আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন, আর কারোও কথা বর্ণনা করেন নাই। আল্লাহ তাঁর কিতাবে পঁচিশ জন নবী ও রাসূলের নাম উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَرُسُلاً قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِن قَبْلُ وَرُسُلاً لَّمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ

[سورة النساء، الآية:164]

অর্থঃ ((আর এমন কতক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের ইতিবৃত্ত আমি আপনাকে বর্ণনা করেছি ইতি পূর্বে, এবং এমন কতক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের বৃত্তান্ত আপনাকে বর্ণনা করিনি।)) [সূরা আন-নিসা,আয়াত১৬৪]

তিনি আরো বলেনঃ

وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَّن نَّشَاء إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ - وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ كُلاًّ هَدَيْنَا وَنُوحاً هَدَيْنَا مِن قَبْلُ وَمِن ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَى وَهَارُونَ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ - وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَى وَعِيسَى وَإِلْيَاسَ كُلٌّ مِّنَ الصَّالِحِينَ - وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطاً وَكُلاًّ فضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ - وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ وَاجْتَبَيْنَاهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

[سورة الأنعام، الآيات:83-87]

অর্থঃ ((এটি ছিল আমার যুক্তি, যা আমি ইব্রাহীমকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে প্রদান করেছিলাম। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় সমুন্নত করি। আপনার পালনকর্তা প্রজ্ঞাময়, মহাজ্ঞানী। আমি তাঁকে দান করেছি ইসহাক ও ইয়াকুব। প্রত্যেককেই আমি পথ-প্রদর্শন করেছি এবং পূর্বে আমি নূহকে পথ-প্রদর্শন করেছি-তাঁর সন্তানদের মধ্যে দাউদ, সোলায়মান,আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারুনকে। এমনি ভাবে আমি সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। আরও যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকে। তাঁরা সবাই পূণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এবং ইসমাঈল, ঈসা, ইউনুস, লূতকে প্রত্যেককেই আমি সারা বিশ্বের উপর গৌরবান্বিত করেছি। আরো তাঁদের কিছু সংখ্যক পিতৃপুরুষ,সন্তান-সন্ততি ও ভ্রাতাদেরকে, আমি তাঁদেরকে মনোনীত করেছি এবং সরল পথ প্রদর্শন করেছি।)) [সূরা আল-আনআম, আয়াত ৮৩-৮৭]

আল্লাহ নবীদের কাউকে অন্যদের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ

[سورة الإسراء، الآية:55]

অর্থঃ ((আমি নবীদেরকে কতককে কতকের উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছি।)) [সূরা আল-ইসরা,আয়াত-৫৫]

এবং আল্লাহ রাসূলদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্টত্ব দান করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ

[سورة البقرة، الآية:253]

অর্থঃ ((এ রাসূলগণ আমি তাদের কাউকে কারো উপর মর্যাদা দান করেছি।)) [সূরা আল-বাক্বারাহ্, আয়াত-২৫৩]

রাসূলগণের মধ্যে যারা উলুলআয্ম (উচ্চ অভিলাষী) তাঁরা সর্ব উত্তম। তাঁরা হলেন নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, ঈসা, ও আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

َاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُوْلُوا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ

[سورة الأحقاف، الآية:35]

অর্থঃ ((অতএব আপনি ধৈর্য ধরুন, যেমন উলুল আয্ম (উচ্চ অভিলাষী) রাসূলগণ ধৈর্য ধরেছেন।)) [সূরা আল-আহক্বাফ, আয়াত-৩৫]

তিনি আরো বলেনঃ

وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقاً غَلِيظاً

[سورة الأحزاب، الآية:7]

অর্থঃ ((যখন আমি নবীগণের কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইব্রাহীম মূসা ও মারিইয়ামের পুত্র ঈসার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম, আরো অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার।)) [সূরা আল-আহযাব,আয়াত-৭]

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও সর্ব শেষ নবী, মুত্তাকীনদের ইমাম, আদম সন্তানের সরদার। নবীরা যখন একত্রিত হন তখন তিনি তাঁদের ইমাম। যখন তাঁরা কোন জায়গাহ হতে প্রতিনিধি দল হিসাবে আগমণ করেন তখন তিনি তাঁদের প্রবক্তা হন। তিনি মাকামে মাহমুদের (প্রশংসিত স্থানের) মালিক, যে স্থানকে নিয়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই ঈর্ষা করবে।

অবতরণ স্থান, হাউজ ও হামদ-বা প্রশংসার ঝান্ডার মালিক। শেষ দিবসে সমস্ত সৃষ্টজীবের সুপারিশকারী, জান্নাতের ওয়াসীলা নামক স্থান ও মর্যাদার মালিক। আল্লাহ তাকে তাঁর দ্বীনের সর্বোত্তম শরীয়াত বিধি-বিধান দিয়ে প্রেরণ করেছেন। এবং তাঁর উম্মাতকে সর্ব উত্তম উম্মত রূপে এই পৃথিবীতে মানুষের কল্যানের জন্য পাঠানো হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মাতের জন্য বহু মর্যাদা ও উত্তম বৈশিষ্ট দিয়েছেন। যা তাদের পূর্ববর্তীদের হতে সতন্ত্র। সৃষ্টির দিক দিয়ে তাঁরা সর্ব শেষ উম্মত আর পুনরুত্থানে তাঁরা সর্ব প্রথম উম্মত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

فضلت على الأنبياء بست

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আমি ছয়টি বৈশিষ্টে সকল নবীদের উপর প্রাধান্য পেয়েছি।)) [মুসলিম]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ

أنا سيد ولد آدم يوم القيامة وبيدي لواء الحمد ولا فخر. وما من نبي يومئذ آدم فمن سواه إلا تحت لوائي يوم القيامة

[رواه أحمد والترمذي]

অর্থঃ ((আমি কিয়ামত দিবসে আদম সন্তানের সর্দার, আমারই হাতে হামদের পতাকা থাকবে। ইহা কোন গর্ভের বিষয় নয়। কিয়ামত দিবসে আদম (আলাইহিস্ সালাম) ছাড়া সকলেই আমার পতাকার অধিনে থাকবে।)) [তিরমিযী ও আহমাদ]

মর্যাদার দিক দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরে যিনি তিনি হলেন ইব্রাহীম খালীলুর রহমান (আলাইহিস্ সালাম) সুতরাং (আল্লাহর) দু'বন্ধু-মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইব্রাহীম (আলাইহিস্ সালাম) উলুল আযমদের সর্ব শ্রেষ্ট। অতঃপর তিন জন (নূহ, মূসা ও ঈসা) সর্ব শ্রেষ্ট (অন্য সব নবীদের চেয়ে)।

(৯) নবীদের (আলাইহিমুস্ সালাম) মু'জিযাহঃ

আল্লাহ্ তাঁর রাসূলদের সহযোগিতা করেছেন বড় বড় নিদর্শন ও উজ্জ্বল মু'জিযার (অলৌকিক শক্তির) দ্বারা। যাতে হুজ্জাত প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা প্রয়োজন সাধন হয়। যেমন- কুরআন কারীম, চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়া, লাঠি ভয়ানক সাঁপে পরিণত হওয়া, ইত্যাদি। অতঃপর মু'জিযাহ্ (স্বাভাবিক নীতি ভঙ্গকারী-অলৌকিক শক্তি) নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণের দালীল,আর কারামাহ্ (অলীদের জন্যও অলৌকিক শক্তি) নবুওয়াতের সত্যতা সাক্ষ্যকারী প্রমান স্বরূপ।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ

[سورة الحديد، الآية:25]

অর্থঃ ((আমি আমার রাসূলদেরকে সুস্পষ্ট নিদর্শণাবলী সহ প্রেরণ করেছি।)) [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত-২৫]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

ما من نيي من الأنبياء إلا وقد أوتي من الآيات ما آمن على مثله البشر وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه إلي فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة

[متفق عليه]

অর্থঃ ((প্রত্যেক নবীই নিদর্শন বা মু'জিযাহ প্রাপ্ত হয়েছেন কিন্তু মু'জিযার তুলনায় মানুষ ঈমান আনে নাই। আর আমি যা প্রাপ্ত হয়েছি তা সেই ওয়াহী যা আমার নিকট (আল্লাহ) অবতীর্ণ করেছেন। ফলে আমি আশাবাদী যে, কিয়ামত দিবসে তাঁদের চেয়ে আমার অনুসারী বেশী হবে।)) [বুখারী ও মুসলিম ]

(১০) আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াতের প্রতি ঈমানঃ

তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতের প্রতি ঈমান আনা-ঈমানের মূলনীতি সমূহের একটি অন্যতম মূলনীতি। এর উপর ঈমান আনা ছাড়া কারোও ঈমান পরিপূর্ণ হবে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَمَن لَّمْ يُؤْمِن بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِنَّا أَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ سَعِيراً

[سورة الفتح، الآية:13]

অর্থঃ ((যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে না, আমি সেসব কাফিরের জন্য জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি।)) [সূরা আল-ফাত্হ, আয়াত-১৩]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إلا إله إلا الله وإني رسول الله

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আমি আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি যে,মানুষের সাথে যুদ্ধ করব যতক্ষন না তারা-আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন মা'বুদ নেই, এবং আমি আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য দিবে।)) [মুসলিম]

নিম্নে বর্ণিত বিষয়ের উপর ঈমান আনার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে।

প্রথমতঃ আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা বা জানা। তিনি হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশিম, হাশিম কুরাইশ বংশ, আর কুরাইশ আরব বংশ আর আরব ইসমাঈল বিন ইব্রাহীম আল-খলীল এর বংশধর, তাঁর ও আমাদের নবীর উপর সর্ব উত্তম দরুদ ও সালাম বর্ষিত হউক। তাঁর তেষট্টি বছর বয়স হয়েছিল। নবুয়াতের পূর্বে চল্লিশ বৎসর, নবী ও রাসূল হওয়ার পরে তেইশ বৎসর।

দ্বিতীয়তঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন সে বিষয়ে তাঁকে বিশ্বাস করা, যে বিষয় তিনি আদেশ করেছেন, তার অনুসরণ করা। যে বিষয় হতে তিনি নিষেধ করেছেন ও সতর্ক করেছেন তা হতে বিরত থাকা। তিনি যে বিধান দান করেছেন সে অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদাত করা।

তৃতীয়তঃ তিনি জিন-ইনসান সকলের নিকট প্রেরিত আল্লাহর রাসূল এ কথার বিশ্বাস রাখা। সবাইকে তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুসরণ করতে হবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعاً

[سورة الأعراف، الآية:158]

অর্থঃ ((আপনি বলুন হে মানব সকল ! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।)) [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত-১৫৮]

চতুর্থতঃ তাঁর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনা, তিনি সর্বশ্রেষ্ট ও শেষ নবী।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ

[سورة الأحزاب، الآية:40]

অর্থঃ ((বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী।)) [সূরা আল-আহযাব, আয়াত-৪১]

এবং তিনি আল্লাহর খলীল ও আদম সন্তানের সর্দার বা নেতা। তিনি মহান শাফায়াতের মালিক এবং জান্নাতে সুউচ্চ অয়াসীলা নামক স্থান তাঁরই জন্য। তিনি হউযে কাউসারের মালিক। তাঁর উম্মাত সর্বশ্রেষ্ট বা উত্তম।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ

[سورة آل عمران، الآية:110]

অর্থঃ ((তোমরাই শ্রেষ্ট উম্মত যা মানুষের (কল্যাণের)জন্য সৃজিত হয়েছে।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১১০]

অধিকাংশ জান্নাতবাসী হবে তাঁরই উম্মত এবং তাঁর রিসালাত পূর্ববর্তী সকল রিসালাতের রহিত কারী।

পঞ্চমতঃ আল্লাহ তাঁকে মহান মু'জিযাহ্ ও সুস্পষ্ট নিদর্শন দ্বারা সহযোগিতা করেছেন। তা হল মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহর বাণী যা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে সংরক্ষীত।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَن يَأْتُواْ بِمِثْلِ هَـذَا الْقُرْآنِ لاَ يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيراً

[سورة الإسراء، الآية:88]

অর্থঃ ((বলুনঃ যদি মানব ও জি্বন এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্য একত্রিত হয়, এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারী হয়,তবুও তারা এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না।)) [সূরা আল-ইসরা, আয়াত-৮৮]

তিনি আরো বলেনঃ

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

[سورة الحجر، الآية:9]

অর্থঃ ((আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।)) [সূরা আল-হিজর, আয়াত-৯]

ষষ্টতঃ নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম রিসালাত প্রচার করেছেন, আমানত আদায় করেছেন, উম্মাতদেরকে উপদেশ দিয়েছেন। সকল প্রকার কল্যাণের সন্ধান দিয়েছেন, ও তার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। সকল প্রকার অকল্যাণ হতে তাঁর উম্মাতকে নিষেধ করেছেন ও তা হতে তাদেরকে সাবধান করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

لَقَدْ جَاءكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

[سورة التوبة، الآية:128]

অর্থঃ ((তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তাঁর পক্ষে-দুঃসহ। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী,মু'মিনদের প্রতি স্নেহশীল,দয়াময়।)) [সূরা আত্-তাওবাহ, আয়াত-১২৮]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

ما من نبي بعثه الله في أمة قبلي إلا كان حقاً عليه أن يدل أمته على خير ما يعلمه لهم ويحذر أمته من شرما يعلمه لهم

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আমার উম্মাতের পূর্বে আল্লাহ যত নবী (আলাইহিস্ সালাম) প্রেরণ করেছেন, তাদের উপর দায়িত্ব ছিল নিজ উম্মাতের জন্য যা কল্যানকর তাদেরকে তার সন্ধান দেওয়া। আর যা কল্যাণকর নয় তা হতে তাদেরকে সতর্ক করা।)) [মুসলিম শরীফ]

সপ্তমতঃ তাঁকে (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভাল বাসা, ও তাঁর ভালোবাসাকে নিজের জানের ও সকল সৃষ্টিজীবের ভালবাসার উপর প্রাধান্য দেওয়া। তাঁকে সম্মান করা, মর্যাদা দেয়া, ইহ্তেরাম করা, ও তাঁর আনুগত্য করা। নিশ্চয় ইহা সে হক্ব বা অধিকার যা আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য সাবস্ত করেছেন। কারণ তাঁর ভালবাসা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর ভালবাসা, এবং তাঁর আনুগত্য প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর আনুগত্য।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

[سورة آل عمران، الآية:31]

অর্থঃ ((বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর,যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভাল বাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-৩১]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من ولده ووالده والناس أجمعين

[متفق عليه]

অর্থঃ ((তোমাদের কেহই ততক্ষন পর্যন্ত মু'মিন হতে পারেনা যতক্ষন পর্যন্ত আমি তাদের নিকট তাদের ছেলে সন্তান, পিতামাতা, ও সকল মানুষের চেয়ে প্রিয়তম না হবো।)) [বুখারী ও মুসলিম]

অষ্টমতঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর দরুদ ও সালাম বেশী বেশী পাঠ করা। কারণ কৃপণ ঐ ব্যক্তি যার নিকট নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম উল্লেখ্য হওয়ার পরও তাঁর উপর দরুদ পাঠ করেনা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيماً

[سورة الأحزاب، الآية:56]

অর্থঃ ((আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশ্তাগণ নবীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। হে মু'মিনগণ ! তোমরা নবীর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ কর।)) [সূরা আল-আহযাব, আয়াত-৫৬]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

من صلى عليّ واحدة صلى الله عليه بها عشرا

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((যে, ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তার উপর এর বিনিময়ে দশবার রহম করবেন।)) [মুসলিম শরীফ]

নিম্নের স্থান গুলোতে তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপর দরুদ পাঠ করা অত্যান্ত গুরুত্ব পূর্ণ। নামাযের তাশাহুদে, বিতির নামাযের দোআয় কুনুতে, জানাযার নামাযে, জুম'আর খুৎবাতে। আযানের পর, মাসজিদে প্রবেশ ও মাসজিদ হতে বের হওয়ার সময়। দোআর সময় এবং যখন (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নাম উল্লেখ্য করা হয়, আরো অন্যান্য স্থানে।

নবমতঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সকল নবী (আলাইহিমুস্ সালাম) তাঁদের প্রভুর নিকট জীবিত। শহীদদের কবরের জীবন হতে তাঁদের (আলাইহিমুস্ সালাম) কবরের জীবন আরো বেশী পরিপূর্ণ ও উচ্চ। তবে তাঁদের কবরের জীবন, পৃথিবীর জীবনের মত নয়। তা এমন জীবন যার বিবরণ সম্পর্কে আমরা জানি না, সে জীবন তাঁদের হতে মৃত্যুর নামও দূর করেনা।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إن الله حرم على الأرض أن تأكل أجساد الأنبياء

[رواه أبو داود والنسائي]

অর্থঃ ((আল্লাহ জমিনের জন্য নবীদের লাশ ভক্ষণ কে হারাম করে দিয়েছেন।)) [আবু দাউদ ও নাসায়ী]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ

ما من مسلم يسلم عليّ إلا رد الله عليّ روحي كي أرد عليه السلام

[رواه أبو داود]

অর্থঃ ((যখনই কোন মুসলমান আমাকে সালাম দেয় তখনই আল্লাহ আমার রুহ্ বা আত্মা আমার নিকট ফিরিয়ে দেন তার সালামের উত্তর দেওয়ার জন্য।)) [আবু দাউদ]

দশমতঃ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে উচু আওয়াজ না করা, অনুরুপ তাঁর কবরে তাঁর উপর সালাম দেওয়ার সময় উচু আওয়াজ না করা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এহতেরামের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ

[سورة الحجرات، الآية:2]

অর্থঃ ((হে মু'মিনগণ ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর-উঁচু করনা,এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচু স্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচু স্বরে কথা বলোনা। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবেনা।)) [সূরা আল-হুজরাত, আয়াত-২]

দাফনের পর তাঁকে সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মান করা, তাঁর জীবিত অবস্থায় সম্মান করার ন্যায়। অতঃপর তাঁকে আমরা সম্মান করবো যে ভাবে সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে সম্মান করতেন। কারণ তাঁরা (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) সকল মানুষের চেয়ে তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক অনুসরণকারী ছিলেন। তাঁরা (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরুধিতা করা হতে এবং দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু দ্বীনের মাঝে সংযোজন করা হতে অধিক দূরে থাকতেন।

একাদশতমঃ তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে, পরিবার-পরিজনকে ও স্ত্রীদেরকে ভাল বাসা ও তাঁদের সকলের সাথে বন্ধুত্ব রাখা। তাঁদের মর্যাদাহানী হতে বা তাঁদেরকে গালী দেওয়া হতে ও তাঁদের চরিত্রে কোন প্রকার আঘাত হানা হতে সাবধান থাকা। কারণ আল্লাহ তাঁদের প্রতি রাজি হয়েছেন, ও তাঁদেরকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহচর হিসাবে নির্বাচন করে নিয়েছেন। এই উম্মাতের উপর তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা ওয়াজিব করে দিয়েছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَالسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ

[سورة التوبة، الآية:100]

অর্থঃ ((আর যারা সর্ব প্রথম হিজরত কারী ও আনছারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।)) [সূরা আত্-তাওবাহ, আয়াত-১০০]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

لا تسبوا أصحابي فوالذي نفسي بيده لو أنفق أحدكم مثل أحد ذهبا ما بلغ مد أحدهم ولا نصيفه

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((তোমরা আমার সাহাবাদেরকে গালী দিওনা, সেই সত্যার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বতের সমপরিমান (আল্লাহর পথে) ব্যায় করে, তবুও তাদের এ বিশাল ব্যায় সাহাবাদের আল্লাহর রাস্তায় এক মুদ্ (প্রায় ৭০০গ্রাম) বা অর্ধ মুদ্ ব্যায় করার সমান হবে না।)) [বুখারী]

সুতরাং পরবর্তী লোকদের উচিত সাহাবাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং নিজেদের মনে তাঁদের ব্যাপারে যাতে কোন প্রকার কুটিলতা না থাকে এ জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلّاً لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

[سورة الحشر، الآية:10]

অর্থঃ ((যারা তাঁদের পরে আগমন করেছে তাঁরা বলেঃ হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদেরকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখনা। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু পরম করুণাময়।)) [সূরা আল-হাশর, আয়াত-১০]

দ্বাদশতমঃ তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করা হতে বিরত থাকা। কারণ অতিরঞ্জিত করা তাঁকে সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাতকে তাঁর ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করা হতে ও তাঁর প্রশংসা করার সময় সীমা লংঘন করা হতে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে যে মর্যাদা দিয়েছেন, তাঁকে তার চেয়ে মর্যাদা দেয়া হতে সতর্ক করেছেন। কারণ ইহা একমাত্র আল্লাহর জন্য খাস।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إنما أنا عبد فقولوا عبد الله ورسوله، لا أحب أن تر فعوني فوق منزلتي

অর্থঃ ((আমি একজন বান্দা বা দাস, সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও আল্লাহর রাসূল বল। তোমরা আমাকে আমার মর্যাদার চেয়ে উচু করনা এটা আমি ভাল বাসিনা।))

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ

لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((তোমরা আমার ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করনা যেমন খৃষ্টানরা ঈসা বিন মারইয়াম (আলাইহিস্ সালাম) এর ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করেছিল।)) [বুখারী]

তাঁকে (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আহ্বান করা, ও তাঁর কাছে ফরিয়াদ করা। তাঁর কবরের পাশ দিয়ে ত্বাওয়াফ করা, তাঁর নামে নজর মানা, পশু জবেহ্ করা বৈধ নয়। এ সকল কাজ আল্লাহর সাথে শরীক করার নামান্তর, অথচ আল্লাহ অন্যের ইবাদাত করা হতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপ ভাবে তাঁকে ইহতেরাম না করায় তাঁর প্রতি অনিহা প্রকাশ পায়। তাঁর মান হানি করা,তাঁকে তুচ্ছ জানা তাঁর ব্যাপারে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, ইসলাম হতে মুর্তাদ বা বের হয়ে যাওয়া ও আল্লাহর সাথে কুফুরী করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

لاَ تَعْتَذِرُواْ قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ - قُلْ أَبِاللّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ

[سورة التوبة، الآية: 66 ، 67]

অর্থঃ ((আপনি বলুনঃ তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিলে? ছলনা করোনা, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর।)) [সূরা আত্-তাওবাহ্, আয়াত-৬৫-৬৬]

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সত্যিকার ভালবাসা তাঁর নীতির ও সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণ, তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথের বিরোধিতা না করার দিকে প্রেরণা যোগায়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

[سورة آل عمران، الآية:31]

অর্থঃ ((বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভাল বাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর যাতে আল্লাহও তোমাদিগকে ভাল বাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-৩১]

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানের ব্যাপারে বেশী-কমে সীমালংঘন না করা ওয়াজিব। তাই তাঁকে উলুহীয়াতের (মা'বুদের) গুণে গুনাম্বিত করা যাবে না। তাঁর মর্যাদা সম্মান ও ভালবাসার অধিকার কমানোও যাবেনা, যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তার শরীয়াতের অনুসরণ করা, তার নীতির উপর চলা ও তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুকরণ করা।

ত্রয়দশতমঃ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনা পূর্ণাঙ্গ হবে তাঁকে সত্যায়িত ও তিনি যে শরীয়াত নিয়ে এসেছেন তার উপর আমল করার মাধ্যমে, এটা তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনুগত্য করার অর্থ। তাঁর আনুগত্য বস্তুত আল্লাহরই আনুগত্য, আর তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাফারমানী বস্তুত আল্লাহরই নাফারমানী। আর তাঁকে পূর্ণভাবে বিশ্বাস ও অনুসরণের মাধ্যমেই তাঁর প্রতি পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনা হয়ে থাকে।

الركن الخامس:الإيمان باليوم الآخر

পঞ্চম রুকনঃ শেষ দিবসের প্রতি ঈমান।

(১) শেষ দিবসের (আখেরাতের) প্রতি ঈমানঃ

এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, পার্থিব জীবন শেষ হয়ে মৃতু্য ও কবর জীবনের মাধ্যমে অন্য জগত শুরু হবে। এভাবে কিয়ামত সংঘটিত হবে, তার পর পুনরুত্থান, হাশর, নাশর, ও হিসাব নিকাশের পর ফলাফল প্রাপ্ত হয়ে জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে যাবে।

শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের রুকন সমূহের অন্যতম একটি রুকন। যার প্রতি ঈমান আনা ছাড়া কোন বান্দার ঈমান পরিপূর্ণ হবেনা। আর যে ব্যক্তি শেষ দিবসকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَـكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ

[سورة البقرة، الآية:177]

অর্থঃ ((বরং সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, ও কিয়ামত দিবসের উপর।)) [সূরা আল-বাক্বারাহ্, আয়াত-১৭৭]

জিব্রাঈল (আলাইহিস্ সালাম)এর হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

فأخبرني عن الإيمان؟ قال: أن تؤمن بالله، وملائكته وكتبه، ورسله واليوم الآخر، وتؤمن بالقدر خيره وشره

[رواه مسلم-1/157]

অর্থঃ ((জিব্রাঈল বলেনঃ হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবগত করুণ। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ঈমান হলো- আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশ্তা, তাঁর কিতাব সমূহ, তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহিমুস সালাম) এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা, আরো ঈমান আনা ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি। [মুসলিম শরীফ]

শেষ দিবসের পূর্বে কিয়ামতের যে সকল আলামত সংঘঠিত হবে তার প্রতি ঈমান আনা, যে গুলি সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন।

আলেমগণ এ আলামতকে দু'ভাগে বিভক্ত করেছেন-

(ক) ছোট আলামতঃ যা কিয়ামত নিকটে হওয়া বুঝায়, ইহা অনেক রয়েছে। অধিকাংশ সংঘঠিত না হলেও অনেক সংঘঠিত হয়ে গেছে। যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) প্রেরণ। আমানতের খিয়ানত করা। মসজিদ অধিক মাত্রায় সাজ সজ্জা ও তা নিয়ে গর্ভ করা। বড় বড় অট্রালিকা নিয়ে রাখালদের গর্ভ করা। ইয়াহুদীদের সাথে যুদ্ধ ও তাদের নিহত হওয়া। সময় নিকটবর্তী হওয়া, আমল কমে যাওয়া, ফিৎনা-ফাসাদ প্রকাশ পাওয়া, অধিক হত্যা হওয়া, ব্যভিচার ও অন্যায় কাজ অধিক মাত্রায় হওয়া।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانشَقَّ الْقَمَرُ

[سورة القمر، الآية:1]

অর্থঃ ((কিয়ামত আসন্ন ও চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।)) [সূরা আল-ক্বামার-আয়াত-১]

(খ) বড় আলামতঃ যা কিয়ামতের পূর্ব মূহুর্তে সংঘঠিত হবে এবং কিয়ামত শুরু হওয়ার সতর্ক করবে। এমন বড় আলামত দশটি। একটিও প্রকাশিত হয়নি।

বড় আলামত সমূহ যেমনঃ ইমাম মাহ্দীর আগমণ, দাজ্জালের আগমণ, ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) এর আকাশ হতে ন্যায় বিচারক হিসাবে অবতরণ, তিনি খৃষ্টানদের ক্রুসেড ভেঙ্গে দিবেন, দাজ্জাল ও শুকুরকে হত্যা করবেন। করের আইন রহিত করবেন। ইসলামী শরীয়াত অনুপাতে বিচার পরিচালনা করবেন। ইয়াজুজ, মা'জুজ বের হবে। তাদের ধ্বংসের দোআ করবেন, অতঃপর তারা মারা যাবে। তিনটি বড় ভূমি কম্প হবে। পূর্বে একটি, পশ্চিমে একটি, জাজিরাতুল আরবে একটি। ধোঁয়া বের হবে, তা হল আকাশ হতে প্রচন্ড ধোঁয়া নেমে এসে সকল মানুষকে ঢেকে নিবে। কুরআন জমিন হতে আকাশে তুলে নেওয়া হবে। পশ্চিম আকাশে সূর্য উদিত হবে। এক (অদ্ভুত) চতুস্পদ জন্তু বের হবে। ইয়ামানের আদন (জায়গার নাম) হতে ভয়ানক আগুন বের হয়ে মানুষদের শামের দিকে নিয়ে আসবে। এটাই সর্বশেষ বড় আলামত।

হুযাইফা বিন উসাঈদ আল-গিফারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে, ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন। তিনি (হুযাইফা) বলেনঃ

عن حذيفة بن أسيد الغفاري رضي الله عنه قال: اطلع النبي صلى الله عليه وسلم ونحن نتذاكر فقال: ((ما تذكرون؟ قالوا: تذكر الساعة. قال: إنها لن تقوم حتى تروا قبلها عشر آيات.فذكر: الدخان، والدجال، والدابة، وطلوع الشمس من مغربها ،ونزول عيسى بن مريم، ويأجوج، وثلاثة خسوف: خسف بالمشرق، وخسف بالمغرب، وخسف بجزيرة العرب، وآخرذلك نار تخرج من اليمن تطرد الناس إلى محشرهم

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আগমণ করলেন, এমতাবস্থায় আমরা এক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ছিলাম। তিনি বল্লেন তোমরা কি বিষয় আলোচনা করতেছ? তাঁরা বল্লেন আমরা কিয়ামতের ব্যাপারে আলোচনা করতেছি। তিনি বললেনঃ কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষন না তোমরা তার পূর্বে দশটি আলামত সংঘঠিত হতে দেখবে। অতঃপর আলামত সমূহ উল্লেখ করলেনঃ ধোঁয়া, দাজ্জাল, চতুস্পদ জন্তু পশ্চিম দিক হতে সূর্য উঠা, ঈসা বিন মারিইয়াম এর আগমণ, ইয়াজুজ-মা'জুজ আগমণ, তিনটি ভূমি কম্প- একটি পূর্বে আর একটি পশ্চিমে, আর একটি জাজিরাতুল আরবে, শেষ আলামত হল ইয়ামান হতে আগুন বের হয়ে মানুষদেরকে হাশরের মাঠের দিকে নিয়ে যাবে।)) [মুসলিম শরীফ]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ

يخرج في آخر أمتي المهدي يسقيه الله الغيث، وتخرج الأرض نباتها، ويعطي المال صحاحاً،وتكثر الماشية،وتعظم الأمة، يعيش سبعاً،أوثمانياً، يعني حججاً

[رواه الحاكم في المستدرك]

অর্থঃ ((আমার উম্মাতের শেষ ভাগে ইমাম মাহ্দী বের হবেন, তার উপর আল্লাহ্ বৃষ্টি বর্ষন করবেন। জমিন উদ্ভিত জন্ম দিবে। সুস্থ্য ও সচ্ছল লোকদের মাল প্রদাণ করা হবে। চতুস্পদ জানুয়ারের সংখ্যা বেড়ে যাবে। উম্মাতের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তিনি সাত অথবা আট বছর বসবাস করবেন।)) (হাকেম)

বর্ণিত আছে যে ঐ নিদর্শন গুলো পর্যায় ক্রমে সংগঠিত হবে, যেমন পুথির মালায় পুথি পর্যায়ক্রমে সাজানো থাকে। এগুলোর একটি সংঘঠিত হওয়ার পর পরই অপরটি সংঘঠিত হবে। এ দশটি নিদর্শন সংঘঠিত হওয়ার পর পরই আল্লাহর আদেশে কিয়ামত সংঘঠিত হবে।

কিয়ামত দ্বারা কি বুঝায়ঃ কিয়ামত দ্বারা উদ্দেশ্য হল ঐ দিন, যে দিন মানুষ আল্লাহর আদেশে তাদের কবর হতে বের হবে, হিসাব নিকাশের জন্য, অতঃপর সৎকর্মশীল সুফল ও শান্তি এবং অসৎ কর্মশীল শাস্তি প্রাপ্ত হবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعاً كَأَنَّهُمْ إِلَى نُصُبٍ يُوفِضُونَ

[سورة المعارج، الآية:43]

অর্থঃ ((সে দিন তারা কবর থেকে দ্রত বেগে বের হবে-যেন তারা কোন এক লক্ষ্যস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে।)) [সূরা আল-মাআরিজ,আয়াত-৪৩ ]

এ দিনের একাধিক নাম কুরআন কারীমে উল্লেখ্য হয়েছে। যেমন-

(يوم القيامة) ইয়াওমুল কি্বয়ামাহ, (القارعة) আল-ক্বারিয়াহ, (يوم الحساب) ইয়াওমুল হিসাব, ) (يوم الدين ইয়াওমুদ্দিন, (الطامة) আত্ত্বামাহ, (الواقعة) আল-ওয়াকি্বয়াহ, (الحاقة) আল-হাক্কাহ, (الصاخة) আস্সাখ্খাহ, (الغاشية) আল-গাশিয়াহ, ইত্যাদি।

يوم القيامة - ইয়াওমুল কি্বয়ামাহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ

[سورة القيامة، الآية:1]

অর্থঃ ((কিয়ামাত দিবসের শপথ।)) [সূরা আল-কি্বয়ামাহ, আয়াত-১]

القارعة - আল-ক্বারিয়াহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

الْقَارِعَةُ - مَا الْقَارِعَةُ

[سورة القارعة، الآيتان:1-2]

অর্থঃ ((করাঘাতকারী (আল ক্বারিয়াহ্), করাঘাতকারী কি?)) [সূরা আল-ক্বারিয়াহ, আয়াত ১-২]

يوم الحساب - ইয়াওমুল হিসাবঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ

[سورة ص، الآية:26]

অর্থঃ ((নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচু্যত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কোঠর শাস্তি, এ কারণে যে, তারা হিসাব দিবসকে ভূলে যায়।)) [সূরা ছোয়াদ, আয়াত-২৬]

يوم الدين - ইয়াওমুদ্ দ্বীনঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ - يَصْلَوْنَهَا يَوْمَ الدِّينِ

[سورة الانفطار، الآيتان:14-15]

অর্থঃ ((এবং পাপিষ্টরা থাকবে জাহান্নামে, তারা বিচার দিবসে তথায় প্রবেশ করবে।)) [সূরা আল- ইনফিতার, আয়াত ১৪-১৫]

الطّامة - আত্ত্বামাহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فَإِذَا جَاءتِ الطَّامَّةُ الْكُبْرَى

[سورة النازعات، الآية:34]

অর্থঃ ((অতঃপর যখন মহাসংকট এসে যাবে।)) [সূরা আন্ নাযিআত, আয়াত-৩৪]

الواقعة - আল-ওয়াকি্বয়াহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِذَا وَقَعَتِ الْوَاقِعَةُ

[سورة الواقعة، الآية:1]

অর্থঃ ((যখন কিয়ামতের ঘটনা ঘটবে।)) [সূরা আল-ওয়াকিয়াহ্, আয়াত-১]

الحاقة - আল-হাক্কাহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

الْحَاقَّةُ - مَا الْحَاقَّةُ

[سورة الحاقة، الآيتان:1-2]

অর্থঃ ((সু-নিশ্চিত বিষয়, সু নিশ্চিত বিষয় কি?)) [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত-১-২]

الصّاخة - আসসাখখাহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فَإِذَا جَاءتِ الصَّاخَّةُ

[سورة عبس، الآية:33]

অর্থঃ ((অতঃপর যে দিন কর্ণ বিদারক আওয়াজ আসবে।)) [সূরা আবাসা, আয়াত-৩৩]

الغاشية - আল-গাশিয়াহঃ

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ

[سورة الغاشية، الآية:1]

অর্থঃ ((আপনার কাছে আচ্ছন্নকারী কিয়ামতের বৃত্তান্ত পৌঁছেছে কি?)) [সূরা আল-গাশিয়াহ,আয়াত-১]

(২) শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনার নিয়মঃ শেষ দিবসের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত ভাবে ঈমান আনা।

শেষ দিবসের প্রতি সংক্ষিপ্ত ঈমান আনা হলঃ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, এমন একটি দিন রয়েছে,যে দিন আল্লাহ তা'আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে একত্রিত করবেন। প্রত্যেকেই স্ব-স্ব কর্মের প্রতিদান প্রদান করবেন। একদল জান্নাতী হবে,অপর দল জাহান্নামী হবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ - لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَّعْلُومٍ

[سورة الواقعة، الآيتان:49-50]

অর্থঃ ((বলুনঃ নিশ্চয় পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই একটি নির্ধারিত দিনে একত্রিত হবে।)) [সূরা আল-ওয়াকিয়াহ্, আয়াত ৪৯-৫০]

শেষ দিবসের প্রতি বিস্তারিত ঈমান হলঃ মৃতু্যর পর যা কিছু সংঘঠিত হবে তার প্রতি বিস্তারিত ঈমান আনা। আর ইহা নিম্নে বর্ণিত বিষয় গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে-

প্রথমতঃ ফিৎনাতুল কবর বা কবরের পরিক্ষা।

আর তা হলো- মৃতু্য ব্যক্তিকে দাফনের পর তাকে তার প্রভু দ্বীন ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা বা প্রশ্ন করা হবে। অতঃপর যারা ঈমান এনেছিল, তাদেরকে আল্লাহ সত্যের উপর অটল রাখবেন।

যেমন হাদীসে এসেছেঃ

ربي الله، وديني الإسلام ونبي محمد صلى الله عليه وسلم

[متفق عليه]

অর্থঃ ((যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হবে, সে বলবেঃ আমার প্রভু আল্লাহ আমার দ্বীন আল-ইসলাম, আমার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম।)) [বুখারী ও মুসলিম]

ফিরিশ্তাদ্বয়ের প্রশ্ন করা ও তাঁর পদ্ধতি, মু'মিনরা ও মুনাফিকরা কি উত্তর দিবেন এ সম্পর্কে বর্ণিত সকল হাদীসের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব।

দ্বিতীয়তঃ কবরের শাস্তি ও শান্তি।

কবরের শাস্তি ও শান্তির প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। নিশ্চয় ইহা (কবর) জাহান্নামের গর্তের একটি গভীর গর্ত, অথবা জান্নাতের বাগানের একটি বাগান। আর কবর আখিরাতের প্রথম ধাপ বা স্টেশন। যে ব্যক্তি কবর হতে মুক্তি পাবে (তার জন্য) কবরের পরে ধাপ গুলো হতে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে। আর যে ব্যক্তি, কবর হতে মুক্তি পাবেনা তার জন্য এর পরের ধাপ গুলো মুক্তি পাওয়া আরো কঠিন হবে। যার মৃতু্য হল তখন হতে তার কিয়ামত শুরু হয়ে গেল।

অতঃপর আত্মা ও শরীর, উভয়ে কবরে শাস্তি বা শান্তি ভোগ করবে। আর কখনো কখনো শুধু আত্মা ভোগ করবে। আর কবরের আযাব বা শাস্তি শুধু মাত্র যালেমদের জন্য, আর শান্তি শুধু মাত্র সত্যবাদী মু'মিনদের জন্য। আর মৃতু্য ব্যক্তি কবর জীবনের শাস্তি অথবা শান্তি প্রাপ্ত হবে, চাই ভূ-গর্ভস্ত করা হোক বা নাই হোক। যদি ও মৃতু্য ব্যক্তিকে আগুনে জালিয়ে দেওয়া হয়, অথবা পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়, অথবা হিংস্র পশু পাখি খেয়ে ফেলে তার পরও সে এ শাস্তি অথবা শান্তি ভোগ করবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوّاً وَعَشِيّاً وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ

[سورة غافر، الآية:46]

অর্থঃ ((সকালে ও সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সে দিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।)) [সূরা গাফির, আয়াত-৪৬]

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

فلو لا أن لا تدافنوا لدعوت الله أن يسمعكم من عذاب القبر

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((হায় !! যদি তোমরা (তাদেরকে) দাফন না করতে তা হলে আমি আল্লাহর কাছে দোআ করতাম তোমাদেরকে কবরের আযাব শুনানোর জন্য। [মুসলিম]

তৃতীয়তঃ শিঙ্গায় ফুৎকার।

শিঙ্গা হল বাঁশী স্বরূপ, যাতে ইস্রাফীল (আলাইহিস্ সালাম) ফুৎকার দিবেন। প্রথম ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই আল্লাহ যা জীবিত রাখবেন তা ছাড়া সকল সৃষ্টজীব মৃতু্যবরণ করবে। দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই পৃথিবী সৃষ্টি হতে কিয়ামত পর্যন্ত যত সৃষ্টিজীবের আর্বিভাব হয়েছিল, তারা সকলেই উঠে যাবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَن شَاء اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُم قِيَامٌ يَنظُرُونَ

[سورة الزمر، الآية:68]

অর্থঃ ((শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমান ও যমিনে যারা আছে সকলে বেহুঁশ হয়ে যাবে, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন সে ব্যতীত। অতঃপর আবার ফুৎকার দেওয়া হবে, তৎক্ষনাৎ তারা দন্ডায়মান হয়ে দেখতে থাকবে।)) [সূরা আয্-যুমার, আয়াত-৬৮]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

ثم ينفخ في الصور فلا يسمعه أحد إلا أصغى ليتا ورفع ليتاً ثم لا يبقى أحد إلا صعق ،ثم ينزل الله مطرا كأنه الطل, فتنبت منه أجساد الناس, ثم ينفخ فيه أخرى فإذا هم قيام ينظرون

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((অতঃপর শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথে সকলেই স্কান্ধ উচু করবে। অতঃপর সকলেই জ্ঞানহারা হয়ে পড়ে যাবে। তার পর আল্লাহ হালকা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বৃষ্টি হতে মানুষের দেহ তৈরী হবে। তার পর সিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই সকলে দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।)) [মুসলিম]

চতুর্থতঃ পুনরুত্থান। তা হলো শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুঁক দেওয়ার সময় আল্লাহ সকল মৃতদের জীবিত করবেন। তারা সকলে সমগ্র বিশ্বের প্রতি পালকের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা শিঙ্গায় ফোঁকা ও প্রত্যেক আত্মাকে স্ব-শরীরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিলে সকল মানুষ তাদের কবর হতে দাঁড়িয়ে জুতা বিহীন নাঙ্গাপা, বস্ত্র-বিহীন-উলঙ্গ শরীর, খাৎনা বিহীন ও দাঁড়ি-গোঁফ বিহীন অবস্থায় দ্রুত ময়দানের দিকে ছুটে যাবে।

ময়দানের অবস্থান দীর্ঘ হবে, সূর্য তাদের নিকটবর্তী হবে, সূর্যের উত্তাপ বেড়ে যাবে। এ উত্তপ্ত ও কঠিন অবস্থান দীর্ঘ হওয়ায় শরীর হতে নির্গত ঘামে হাবু-ডুবু খাবে, কারো ঘাম পায়ের দু'গিঁঠা পর্যন্ত, কারো দু'হাটু পর্যন্ত, কারো মাজা পর্যন্ত, কারো বক্ষ পর্যন্ত, কারো দু'কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছবে। আর কেউ-সম্পূর্ণ ভাবে হাবুডুবু খাবে, এ সব হলো তাদের (ভাল-মন্দ) কর্ম অনুপাতে। পুনরুত্থান সত্য ও নিশ্চিত, যা ইসলামী শরীয়া (কুরআন ও হাদীস) অনুভূতি শক্তি ও বুদ্ধি-বিবেক দ্বারা প্রমাণিত।

ইসলামী শরীয়াঃ এর স্বপক্ষে প্রমাণ কুরআনে অনেক আয়াত ও নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অনেক বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ

[سورة التغابن، الآية:7]

অর্থঃ ((বলুন, অবশ্যই হবে, আমার পালনকর্তার কসম, তোমরা নিশ্চয় পুনরুত্থিত হবে।)) [সূরা আত্-তাগাবুন, আয়াত-৭]

তিনি আরো বলেনঃ

كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ

[سورة الأنبياء، الآية:104]

অর্থঃ ((যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব।)) [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-১০৪]

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

ثم ينفخ في الصور فلا يسمعه أحد إلا أصغى ليتاً ورفع ليتاُ، ثم لا يبقى أحد إلا صقع، ثم ينزل الله مطراً كأنه الطل أو الظل- شك الراوي-0 فتنبت أجساد الناسن ثم ينفخ فيه أخرى فإذا هم قيام ينظرون

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((অতঃপর শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথে সকলেই স্কান্ধ উচু করবে অতঃপর সকলেই জ্ঞান হারা হয়ে পড়ে যাবে। তার পর আল্লাহ হালকা বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বৃষ্টি হতে মানুষের দেহ তৈরী হবে। তার পর শিঙ্গায় দ্বিতীয় ফুঁক দেওয়ার সাথে সাথেই সকলে দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।)) [মুসলিম]

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

قَالَ مَنْ يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ - قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ

[سورة يس، الآيتان:78-79]

অর্থঃ ((বলে, কে জীবিত করবে অস্থি সমূহকে যখন সে গুলো গলে পচে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সে গুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্ব প্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে অবগত।)) [সূরা ইয়াসীন, আয়াত ৭৮-৭৯]

الحس - (আল-হিস্স) বা অনুভূতি হতে দলীল হলঃ

আল্লাহ এই পৃথিবীতে অনেক মৃতু্যকে জীবিত করে তাঁর বান্দাদেরকে দেখিয়েছেন। আর এ বিষয়ে সূরা বাক্বারায় পাঁচটি উপমা রয়েছে, মূসা (আলাইহিস্ সালাম) এর সমপ্রদায় যাদেরকে আল্লাহ তাদের মৃতু্যর পর জীবিত করেছিলেন।

বানী ইস্রাঈলের এক নিহিত ব্যক্তিকে জীবিত করেছিলেন। ঐ সমপ্রদায়কে জীবিত করেছিলেন-যারা মৃতু্যর ভয়ে, নিজেদের গ্রাম ত্যাগ করেছিল। ঐ ব্যক্তিকে যে, জনপদ দিয়ে অতিক্রম করেছিল, ইব্রাহীম (আলাইহিস্ সালাম) এর পাখি সমূহকে।

العقل - (আল-আক্বল) বা বিবেক হতে দলীল হলঃ

ইহা দু'ভাবে হতে পারেঃ

(ক) আল্লাহ আসমান ও যমিন এবং এতদ্বয়ের মধ্যে যা রয়েছে সকলকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ আসমান যমিন প্রথমে সৃষ্টি করেছেন। যিনি প্রথম সৃষ্টির উপর ক্ষমতাবান তিনি (তাকে) পূনরায় সৃষ্টি করার ব্যাপারে অপারগ নন।

(খ) যমিন শুষ্ক ও নিজীর্ব হয়ে যায়, অতঃপর বৃষ্টি অবতীর্ণ করে যমিনকে সতেজ ও সজীব করে তুলেন, সর্ব প্রকার সবুজ-শ্যামল গাছ পালা উৎপন্ন হয়, সুতরাং যিনি এ মৃত যমিনকে জীবিত করতে সক্ষম তিনিই মৃতদের পূনরায় জীবিত করাতেও সক্ষম।

পঞ্চমতঃ হাশর, হিসাব-নিকাশ এবং প্রতিদান ও প্রতিফল। আমরা ঈমান আনবো যে, সকল দেহের হাশর নাশর হবে, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তাদের মাঝে বিচারে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং সকল সৃষ্টিজীবকে স্বীয় কৃত কর্মের প্রতিদান ও প্রতিফল প্রদান করা হবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

َحَشَرْنَاهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَداً

[سورة الكهف، الآية:47]

অর্থঃ ((এবং আমি তাদেরকে একত্রিত করব, অতঃপর তাদের কাউকে ছাড়বনা।)) [সূরা আল-ক্বাহাফ, আয়াত-৭৪]

তিনি আরো বলেনঃ

فَهُوَ فِي عِيشَةٍ رَّاضِيَةٍ - إِنِّي ظَنَنتُ أَنِّي مُلَاقٍ حِسَابِيهْ - فَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ فَيَقُولُ هَاؤُمُ اقْرَؤُوا كِتَابِيهْ

[سورة الحاقة، الآيات:19-21]

অর্থঃ ((অতঃপর যার আমল নামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবেঃ নাও, তোমরা ও আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। অতঃপর সে সুখী জীবন-যাপন করবে।)) [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ১৯-২১]

তিনি আরো বলেনঃ

وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيهْ - وَأَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِشِمَالِهِ فَيَقُولُ يَا لَيْتَنِي لَمْ أُوتَ كِتَابِيهْ

[سورة الحاقة، الآيتان:25-26]

অর্থঃ ((অতঃপর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবেঃ হায় আমায় যদি আমার আমলনামা না দেয়া হতো। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব।)) [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ২৫-২৬]

অতঃপর হাশর হলঃ মানুষদেরকে তাদের হিসাব-নিকাশের জন্য ময়দানে একত্রিত করা।

হাশর ও পুনরুত্থানের মধ্যে পার্থক্য-

পুনরুত্থান হলঃ দেহ সমূহকে পুনরুজ্জীবিত করা।

হাশর হলঃ পুনরুত্থিত ব্যক্তিদেরকে অবস্থান ময়দানে একত্রিত করা।

হিসাব, নিকাশ ও প্রতিফলঃ আল্লাহু তা'বারাকা ও তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর সামনে দাঁড় করাবেন, ও তাদেরকে তাদের সম্পাদিত কর্ম সম্পর্কে অবগত করবেন।

অতঃপর মু'মিন মুত্তাকীনদের হিসাব নিকাশ হল, শুধু মাত্র তাদের নিকট তাদের কর্ম পেশ করা হবে। যাতে তারা তাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ বুঝতে পারে, যা (অনুগ্রহ) আল্লাহ তাদের নিকট হতে দুনিয়াতে গোপন রেখেছিলেন। আর আল্লাহ আখিরাতে তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন। আর তাদের হাশর হবে তাদের ঈমান অনুপাতে। ফিরিশ্তারা তাদেরকে স্বাগত জানাবে ও জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ প্রদান করবে, আর তাদেরকে অস্থিরতা ও সকল প্রকার ভয়-ভীতি এবং এ কঠিন দিনের ভয়াবহতা হতে নিরাপত্তা দিবে,অতঃপর তাদের মূখমন্ডল উজ্জল হবে। আর মুখমন্ডল সে দিন হাসি-খুশী, আনন্দ-উৎফুল্ল সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে। অতঃপর বিমুখ মিথ্যাবাদীদের (কাফেরদের) হিসাব নিকাশ অত্যান্ত কঠিনভাবে হবে। শুক্ষ্ন প্রত্যেকটি ছোট বড় কর্মের। কিয়ামত দিবসে তাদেরকে তাদের মুখের উপর টেনে হেঁচড়ে জাহান্নামে ফেলা হবে, তাদেরকে লাঞ্চিত করার জন্য ও তাদের কৃত কর্মের ফল হিসাবে এবং তাদের মিথ্যা বলার কারণে।

কিয়ামত দিবসে সর্ব প্রথম হিসাব নেওয়া হবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মাতের, তাদের সাথে সত্তর হাজার লোক তাদের পূর্ণ তাওহীদের বদৌলাতে বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা ঐ সকল লোক নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ভাষায় যাদের গুণ বর্ণনা করেছেন, তারা কারো নিকট ঝাড় ফুঁক অনুসন্ধান করেননি লৌহ্ জাতীয় কোন কিছুর ছেঁক দিয়ে চিকিৎসা নেননি। কোন দিন বদ ও নেক ফল গ্রহণ করেননি। আর তারা তাদের প্রভুর উপরেই ভরসা করতেন। আর তাঁদের মধ্যে হলেন প্রসিদ্ধ সাহাবী উক্কাশা বিন মিহসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)। আর বান্দার সর্ব প্রথম হিসাব নেওয়া হবে আল্লাহর হক্ব-সালাতের (নামাযের)। এবং মানুষের মাঝে সর্ব প্রথম ফায়সালা করা হবে রক্তপাতের।

ষষ্ঠতঃ হাউজ।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাউজের প্রতি ঈমান আনবো। আর ইহা বিশাল হাউজ ও সম্মানিত অবতরণ স্থান। কিয়ামতের মাঠে জান্নাতের আল-কাউসার নামক নদী হতে শরাব প্রবাহিত হবে। এতে অবতরণ করবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মু'মিন উম্মাতেরা।

হাউজের কিছু বৈশিষ্ট্যঃ ইহার শারাব দুধের চাইতে সাদা, বরফের চাইতে ঠান্ডা, মধুর চাইতে অধিক মিষ্টি। মিশকের চাইতে সুগন্ধি, ইহা সুপ্রসস্ত যার দৈর্ঘ ও প্রস্থ সমান, এর প্রতিটি প্রান্তের আয়তন এক মাসের পথের সমান। এতে জান্নাত হতে প্রবাহিত দু'টি নালা রয়েছে। আর এর পানি পাত্র আকাশের তারকা রাজির চাইতে অধিক । যে ব্যক্তি ইহা হতে একবার পানি পান করবে, সে আর কখনও পিপাসিত হবে না।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

حوضي مسيرة شهر، ماؤه أبيض من اللبن وريحه أطيب من المسك، وكيزانه كنجوم السماء، من شرب منه فلا يظمأ أبداً

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((আমার হাউজের আয়তন এক মাসের পথ সমতুল্য, তার পানি দুধের চাইতে সাদা ও তার ঘ্রাণ মিশকের চাইতে সুগন্ধি, তার পানি পাত্র আকাশের তারকা রাজির সংখ্যার ন্যায়। যে ব্যক্তি ইহা হতে একবার পানি পান করবে সে আর কখনও পিপাসিত হবেনা।)) [বুখারী]

সপ্তমতঃ শাফায়াহ্।

যখন সেই মহান প্রান্তরে মানুষের বিপদ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে এবং সেথায় তাদের অবস্থান দীর্ঘ হবে। তখন তারা এ প্রান্তরের ভয়াবহ বিপদ হতে মুক্তি পাওয়ার জন্যে তাদের প্রভুর নিকট সুপারিশ করা হোক এর প্রচেষ্টা করবে। রাসূলদের মধ্য হতে যারা উলুল আজম (নূহ, ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসা) (আলাইহিমুস সালাম) তাঁরা অপারগতা স্বীকার করবেন। পরে ইহা সর্ব শেষ রাসূল আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকটে পৌঁছাবে যার আগের ও পরের গুনাহ্ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন স্থানে দাঁড়াবেন যে স্থানে আগের ও পরের সকলেই তাঁর প্রশংসা করবে। এবং এর দ্বারা তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহা সম্মান ও উঁচু মর্যাদা প্রকাশিত হবে। তার পর আরশের নিচে সিজ্দা করবেন, আল্লাহ তাঁর নিকট অনেক প্রশংসা, উপযুক্ত আদেশ ইলহাম করবেন। তিনি সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দ্বারা তাঁর (আল্লাহর) প্রশংসা করবেন ও তাঁর মর্যাদা বর্ণনা করবেন। তার পর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রভুর নিকট (তাদের জন্য) সুপারিশ করার অনুমতি চাইবেন। আল্লাহ তা'আলা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সৃষ্টিজীবের সুপারিশ করার জন্য ঐ অনুমতি দিবেন। যাতে বান্দাদের মাঝে অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট ও চিন্তা ভোগের পর সুষ্ট ফায়সালা করা হয়।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إن الشمس تدنو يوم القيامة حتى يبلغ العرق نصف الأذن فبينما هم كذلك، استغاثوا بآدم، ثم بإبراهيم، ثم بموسى، ثم بعسيى، ثم بمحمد صلى الله عليه وسلم. فيشفع ليقضي بين الخلق، فيمشى حتى يأخذ بحلقة الباب، فيؤمئذ يبعثه الله مقاماً محموداً يحمده أهل الجمع كلهم

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((কিয়ামত দিবসে সূর্য নিকটে হবে। এমনকি ঘাম অর্ধ কান পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। তারা এই অবস্থাতেই থাকবে। ফলে তারা আদম (আলাইহিস্ সালাম) অতঃপর ইব্রাহীম (আলাইহিস্ সালাম) অতঃপর মূসা (আলাইহিস্ সালাম) অতঃপর ঈসা (আলাইহিস্ সালাম) অতঃপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে প্রার্থনা করবে। অতঃপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করবেন। যাতে সৃষ্টিজীবের মাঝে ফায়সালা সুসম্পূর্ণ করা হয়। অতঃপর তিনি জান্নাতের দিকে অগ্রসর হবেন, ও জান্নাতের দরজার কড়া (খোলার জন্য) ধরবেন। আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে প্রশংসিত স্থানে অবতরণ করাবেন। সে স্থানের সকলে প্রশংসা করবে। [বুখারী]

এ মহান শাফায়াত আল্লাহ একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। এ ছাড়া তিনি আরো অনেক শাফায়াতের অধিকারী হবেন।

(১) জান্নাতীদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমুতির জন্যে তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত। তার প্রমা-

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

آتي باب الجنة يوم القيامة فاستفتح،فيقول الخازن من أنت؟ قال فأقول محمد فيقول بك أمرت لا أفتح لأحد قبلك

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আমি কিয়ামত দিবসে জান্নাতের দরজার নিকটে আসবো, দরজা খোলার অনুমতি চাবো। অতঃপর জান্নাতের প্রহরী বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তরে বলবঃ আমি মুহাম্মাদ, অতঃপর প্রহরী বলবেঃ আপনার জন্যই শুধু দরজা খোলার আদেশ প্রাপ্ত হয়েছি, আপনার পূর্বে কারো জন্য (দরজা) খুলিনি।)) [মুসলিম]

(২) তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াত ঐ সকল ব্যক্তির জন্য যাদের নেকী ও বদী বা সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান হয়েগেছে। তাদের জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে শাফায়াত করবেন। ইহা কিছু বিদ্যানদের অভিমত। কিন্তু এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম হতে কোন সহীহ্ হাদীস বর্ণিত হয়নি।

(৩) তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাফায়াত, ঐ সমপ্রদায়ের জন্যে যারা জাহান্নামের অধিকারী হয়ে গেছে, তাদেরকে জাহান্নামে না দেওয়ার ব্যাপারে। এর প্রমাণ হলো-

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসঃ

شفا عتي لأهل الكبائر من أمتي

[أبوا داود]

অর্থঃ ((আমার উম্মাতের মধ্যে যারা কাবীরাহ্ গোনাহ্ করেছে তাদের জন্য আমার শাফায়াত। [আবু দাউদ]

(৪) তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাফায়াত, জান্নাতে জান্নাতীদের মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে। তার প্রমাণ-

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসঃ

اللهم اغفر لأبي سلمة وأرفع درجته في المهديين

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((হে আল্লাহ আবূ সালমাকে মাফ কর এবং সঠিক পথ প্রাপ্তদের সাথে তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দাও।)) [মুসলিম]

(৫) তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাফায়াত, ঐ সকল সমপ্রদায়ের জন্য যারা জান্নাতে প্রবেশ করবে বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে। এর প্রমাণ-

উক্কাশাহ্ বিন মিহ্সান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদীসঃ

সত্তর হাজার লোকের ব্যাপারে, যারা বিনা হিসাবে ও বিনা শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার (উক্কাশাহ্) জন্য দোআ করলেনঃ

اللهم اجعله منهم

[متفق عليه]

অর্থঃ ((হে আল্লাহ্ তাকে (উক্কাশাকে) তাদের অন্তর্ভুক্ত করে দাও।)) [বুখারী ও মুসলিম]

(৬) নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামএর উম্মাতের মধ্যে হতে যারা কাবীরাহ্ গোনাহ করায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তাদেরকে জাহান্নাম হতে বের করার ব্যাপারে তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাফায়াত। এর প্রমাণ হলো-

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীসঃ

شفاعتي لأهل الكبائر من أمتي

[رواه أبو دواد]

অর্থঃ ((আমার উম্মাতের কাবীরাহ্ গোনাহ্ কারীদের জন্য আমার শাফায়াত।)) [আবু দাউদ]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আরো একটি হাদীস হলোঃ

يخرج قوم من النار بشفاعة محمد صلى الله عليه وسلم فيدخلون الجنة يسمون الجهنميين

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((এক দল লোক নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শাফায়াতে জাহান্নাম হতে বের করা হবে, অতঃপর তারা জান্নাতে যাবে। তাদেরকে জাহান্নামী বলে নাম করণ করা হবে।)) [বুখারী]

(৭) যারা শাস্তির হক্বদার হবে তাদের শাস্তি হালকা করার ব্যাপারে তাঁর শাফায়াত, যেমন-তাঁর সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচা আবু তালেবের জন্য শাফায়াত। এর প্রমাণ-

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস হলোঃ

لعله تنفعه شفاعتي يوم القيامة فيجعل في ضحضاح من النار يبلغ كعبيه يغلي منه دماغه

[متفق عليه]

অর্থঃ ((সম্ভবত কিয়ামতের দিবসে আমার শাফায়াত তার শাস্তি লাঘবে উপকারে আসবে, তাই শাস্তি হিসাবে শুধু পায়ের গিঠা পর্যন্ত দু'টি জুতা পরিয়ে দেয়া হবে,ফলে মাথার মগজ ফুটতে থাকবে।)) [বুখারী ও মুসলিম]

আল্লাহর নিকট শাফায়াত গ্রহণ হওয়ার জন্য দু'টি শর্ত রয়েছে-

(ক) শাফায়াত কারীর ও শাফায়াত কৃত ব্যক্তির প্রতি আল্লাহর সনু্তষ্টি থাকতে হবে।

(খ) শাফায়াত কারীর শাফায়াত করার ব্যাপারে আল্লাহর অনুমতি থাকতে হবে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى

[سورة الأنبياء، الآية:28]

অর্থঃ ((তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি, আল্লাহ সন্তুষ্ট।)) [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-২৮]

তিনি আরো বলেনঃ

مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ

[سورة البقرة، الآية:255]

অর্থঃ ((তাঁর (আল্লাহর) অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করার কে অধিকার রাখে?)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২৫৫]

অষ্টমতঃ মিযান বা মানদন্ড। মীযান বা মানদন্ড সত্য এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। আর ইহা (মীযান বা মানদন্ড) আল্লাহ্ কিয়ামত দিবসে স্থাপন করবেন, বান্দাদের আমল মাপার ও তাদের কর্মের প্রতিদান প্রদানের জন্য। ইহা বাস্তব মিযান বা মানদন্ড কাল্পনিক নয়, এর দু'টি পাল্লা ও রশি রয়েছে, এর দ্বারা কর্ম অথবা আমলনামা অথবা স্বয়ং কর্ম সম্পাদন কারীকে মাপা হবে। সবই মাপা হবে, তবে ওজন ভারি-হালকার বিষয়বসু্ত হবে শুধু কর্ম। কর্ম সম্পাদনকারী ও আমল নামা নয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئاً وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا وَكَفَى بِنَا حَاسِبِينَ

[سورة الأنبياء، الآية:47]

অর্থঃ ((আমি কিয়ামত দিবসে ন্যায় বিচারের মিযান বা মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোন আমল সরিষার দানা পরিমানও হয় আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহনের জন্য আমিই যথেষ্ট।)) [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-৪৮]

তিনি আরো বলেনঃ

وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَـئِكَ الَّذِينَ خَسِرُواْ أَنفُسَهُم بِمَا كَانُواْ بِآيَاتِنَا يِظْلِمُونَ - وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ فَمَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

[سورة الأعراف، الآيتان:8-9]

অর্থঃ ((আর সে দিন যথার্থই ওজন হবে। অতঃপর যাদের পাল্লা ভারি হবে, তারাই সফলকাম হবে। এবং যাদের পাল্লা হাল্কা হবে, তারাই এমন হবে, যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে। কেননা,তারা আমার আয়াত সমূহ অস্বীকার করতো।)) [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত ৮-৯]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

الطهور شطر الإيمان، والحمد لله تملأ الميزان

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((পবিত্রতা অর্জন করা ঈমানের অর্ধেক। আল-হামদুলিল্লাহ্ (সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য) বাক্যটি ওজনের পাল্লাকে পরিপূর্ণ করে দেয়।)) [মুসলিম]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেনঃ

يوضع الميزان يوم القيامة فلو وزن فيه السماوات والأرض لوسعت

[رواه الحاكم]

অর্থঃ ((কিয়ামত দিবসে এমন মিযান বা মানদন্ড স্থাপন করা হবে, তাতে যদি সাত আসমান ও সাত জমিনও মাপা হয় সম্ভব হবে।))

নবমতঃ আস্ সিরাত বা পুল সিরাত।

আর আমরা পুল সিরাতের প্রতি ঈমান আনবো। আর তা হলো জাহান্নামের পিঠের উপর স্থাপিত পুল, যা ভয়-ভীতি সন্ত্রস্ত অতিক্রম স্থল বা পথ। এর উপর দিয়ে মানুষ জান্নাতের দিকে অতিক্রম করবে। কেউ অতিক্রম করবে চক্ষের পলকের ন্যায়। কেউ অতিক্রম করবে বিজলীর ন্যায়। কেউ বাতাসের ন্যায়। কেউ পাখির ন্যায়। কেউ ঘোড়ার ন্যায় চলবে। কেউ মুসাফিরের ন্যায় চলবে। কেউ ঘন ঘন পা রেখে চলবে। সর্ব শেষ যারা অতিক্রম করবে তাদেরকে টেনে ফেলা হবে। সকলেই অতিক্রম করবে তাদের কর্মের ফলাফল অনুপাতে। এমন কি যার আলো তার পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলের পরিমাণ হবে সেও অতিক্রম করবে। কাউকে থাবা মেরে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি পুল সিরাত অতিক্রম করতে পারবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

সর্ব প্রথম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতঃপর তাঁর উম্মাত পুল সিরাত পাড়ি দিবেন। আর সে দিন একমাত্র রাসূলগণ কথা বলবেন। রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) দের কথা হবে।

اللهم سلم سلم

অর্থঃ ((হে আল্লাহ্ মুক্তি দাও, মুক্তি দাও।))

জাহান্নামে পুল সিরাতের দু'ধারে হুকের ন্যায় কন্টক থাকবে, এর সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেহ্ জানেনা। সৃষ্টি-জীব হতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করবেন তাকে থাবা মেরে (জাহান্নামে) ফেলে দেয়া হবে।

পুল সিরাতের কিছু বর্ণনাঃ ইহা তরবারীর চাইতে ধারালো ,আর চুলের চাইতে সূক্ষ্ন ও পিচ্ছিল জাতীয়। ইহাতে আল্লাহ্ যাদের পা স্থীর রাখবেন, শুধু মাত্র তাদেরই পা স্থীর থাকবে, আর ইহা অন্ধকারে স্থাপিত হবে। আমানত ও আত্নীয়তা বন্ধনকে পুল সিরাতের দু'পার্শে দন্ডায়মান অবস্থায় রাখা হবে, যারা ইহা সংরক্ষন করেছেন তাদের স্বপক্ষে, আর যারা সংরক্ষন করেনি তাদের বিপক্ষে সাক্ষী দেওয়ার জন্য।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

ثُمَّ نُنَجِّي الَّذِينَ اتَّقَوا وَّنَذَرُ الظَّالِمِينَ فِيهَا جِثِيّاً - وَإِن مِّنكُمْ إِلَّا وَارِدُهَا كَانَ عَلَى رَبِّكَ حَتْماً مَّقْضِيّا

[سورة مريم، الآيتان:71-72]

অর্থঃ ((তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তথায় (পুল সিরাতে) পৌঁছুবেনা এটা আপনার পালনকর্তার অনিবার্য ফায়সালা। অতঃপর আমি পরহেযগারদেরকে উদ্ধার করব এবং জালেমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় ছেড়ে দিব।)) [সূরা মারইয়াম, আয়াত ৭১-৭২]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেনঃ

ويضرب الصراط بين ظهراني جنهم فأكون أنا وأمتي أول من يجيزه

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((জাহান্নামের পিঠের উপর পুল সিরাত স্থাপন করা হবে, আর সর্ব প্রথম আমি ও আমার উম্মাত তা অতিক্রম করবো।)) [মুসলিম]

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেনঃ

ويضرب جسر جهنم..فأكون أول من يجيز ودعاء الرسل يومئذ اللهم سلم سلم

[متفق عليه]

অর্থঃ ((জাহান্নামের পুল স্থাপন করা হবে, অতঃপর আমিই সর্ব প্রথম অতিক্রম করবো। আর সে দিন রাসূলদের দোআ হবে, আল্লাহুম্মা সালি্লম, সালি্লম, (হে আল্লাহ ! মুক্তি দাও, মুক্তি দাও)।)) [বুখারী, মুসলিম]

আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেনঃ

بلغني أن الجسر أدق من الشعر وأحد من السيف

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আমি সংবাদ প্রাপ্ত হয়েছি যে, পুল-সিরাত চুলের চাইতে সূক্ষ্ন আর তরবারীর চাইতে ধারালো হবে।)) [মুসলিম]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

وترسل الأمانة والرحم فتقوم على جنبي الصراط يميناً وشمالاً، فيمر أولكم كالبرق... ثم كمر الريح، ثم كمر الطير وشد الرحال، تجزي بهم أعمالهم، ونبيكم قائم على الصراط يقول: رب سلم سلم، حتى تعجز أعمال العباد ،حتى يجئ الرجل فلا يستطيع السير إلا زحفاً قال وعلى حافتي الصراط كلاليب معلقة مأمورة بأخذ من أمرت به فمخدوش ناج ومكدوس في النار

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আমানত ও আত্নীয়তার বন্ধনকে প্রেরণ করা হবে, অতঃপর পুল সিরাতের ডানে ও বামে দাঁড়াবে, তোমাদের মধ্যে সর্ব প্রথম যারা অতিক্রম করবে, তারা বিজলীর ন্যায় অতিক্রম করবে, তার পর যারা অতিক্রম করবে তারা বাতাসের ন্যায়। তার পর পাখির ন্যায় অতিক্রম করবে, তার পর মুসাফিরের ন্যায় অতিক্রম করবে, তাদের কর্ম তাদেরকে অতিক্রম করাবে। আর তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুল সিরাতের পার্শ্বে দন্ডায়মান থাকবেন, এবং বলবেনঃ হে প্রভু মুক্তি দাও, মুক্তি দাও। এভাবে বান্দাদের কর্ম অপারগ হয়ে যাবে, এমন কি কিছু লোক হামাগুড়ি দিয়ে অতিক্রম করবে। পুল সিরাতের দু'ধারে ঝুলন্ত হুকের ন্যায় কন্টক থাকবে, যাদেরকে গ্রেফতার করার আদেশ প্রাপ্ত হয়েছে তাদেরকে গ্রেফতার করবে। অতঃপর কিছু আহত হয়ে মুক্তি পাবে, আর কিছু চাপাচাপি করে জাহান্নামে পড়ে যাবে। [মুসলিম ]

দশমতঃ আল-কানত্বারাহ্।

আমরা ঈমান আনবো এ কথার প্রতি যে, মু'মিনেরা পুল সিরাত অতিক্রম করে কানতারাতে অবস্থান করবে বা দাঁড়াবে। আর ইহা (কানত্বারাহ্) হল জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থান, এখানে ঐ সকল মু'মিনদেরকে দাঁড় করানো হবে, যারা পুল সিরাত অতিক্রম করে এসেছে এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি পেয়েছে, জান্নাতে যাওয়ার পূর্বে একে অপরের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে (এখানে দাঁড় করানো হবে)। অতঃপর তাদের পরি-শুদ্ধির পর জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

يخلص المؤمنون من النار فيحبسون على قنطرة بين الجنة والنار، فيقتص لبعضهم من بعض مظالم كانت بينهم في الدنيا حتى إذا هذبوا ونقوا أذن لهم في دخول الجنة، فوالذي نفس محمد بيده لأحدهم أهدي بمنزله في الجنة منه بمزله كان في الدنيا

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((মু'মিনেরা জাহান্নাম হতে মূক্তি পাবে, তার পর তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী কানত্বারাহ্ নামক স্থানে একত্রিত করা হবে। তার পর দুনিয়াতে তাদের মাঝে যে জুলুম নির্যাতন ঘটেছিল একে অপরের পক্ষ হতে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে। যখন তারা এসব হতে মূক্ত হবে তখন তাদেরকে জান্নাতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। অতঃপর শপথ সেই সত্তার যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রাণ, নিশ্চয় তাদের প্রত্যেকের দুনিয়ার বাসস্থান হতে জান্নাতের বাসস্থান উত্তম। [বুখারী]

একাদশতমঃ জান্নাত ও জাহান্নাম।

আমরা ঈমান আনবো যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, এ দু'টি (জান্নাত ও জাহান্নাম) বর্তমান বিদ্যমান রয়েছে, আর ইহা কখনো ধ্বংস হবে না এবং চিরস্থায়ীও নয়, বরং সর্বদায় রয়েছে। আর জান্নাতবাসীদের নি'আমত শেষ ও ঘাটতি হবে না, অনুরূপ জাহান্নামীদের মধ্যে যার ব্যাপারে আল্লাহ চিরস্থায়ী শাস্তির ফায়সালা করেছেন তার শাস্তি কখনও বিরত ও শেষ হবে না।

তবে তাওহীদ পন্থীরাঃ আল্লাহর রহমতে ও শাফায়াত কারীদের শাফায়াতে জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবেন।

আর জান্নাত হলঃ অতিথীশালা, যা আল্লাহ্ কিয়ামতে মুত্তাকীনদের জন্য তৈরী করে রেখেছেন। তথায় রয়েছে প্রবাহিত নদী উন্নত ও সুউচ্চ কক্ষ, মনোলোভা রমণী, সমূহ। তথায় আরো রয়েছে মনঃপূত-মনোহর সামগ্রী যা কোন দিন কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কর্ন শ্রবণ করেনি, আর কোন মানুষের অন্তরেও কোন দিন কল্পনায় আসেনি।

জান্নাতের নি'আমত চিরস্থায়ী কোন দিন শেষ হবেনা। জান্নাতে কোড়া সমতুল্য জায়গাহ্ দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছুর চাইতে উত্তম। আর জান্নাতের সুগন্ধী চলি্লশ বৎসর দূরত্বের রাস্তা হতে পাওয়া যায়। জান্নাতে মু'মিনদের জন্য সব চাইতে বড় নি'আমত হলো আল্লাহকে সরাসরি স্বচক্ষে দর্শনলাভ করা।

কিন্তু কাফেররা আল্লাহর দর্শনলাভ হতে বঞ্চিত হবেঃ আর যারা মু'মীনদের জন্য তাদের প্রভুর দর্শনকে অস্বীকার করলো সে বস্তুত এই বঞ্চিত হওয়াতে মু'মিনদেরকে কাফেরদের সমকক্ষ করলো। আর জান্নাতে একশতটি ধাপ রয়েছে, এক ধাপ হতে অপর ধাপের দূরুত্ব আসমান হতে জমিনের দূরত্ব অনুরূপ। আর সবচেয়ে উন্নত ও উত্তম জান্নাত হল, জান্নাতুল ফিরদাউস আল-আলা। এর ছাদ হল আল্লাহর আরশ। আর জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, প্রত্যেক দরজার পার্শ্বের দৈর্ঘ "মক্কা "হতে "হাজার" এর দূরত্বের সমান। আর এমন দিন আসবে যে দিনে ইহা ভিড়ে পরিপূর্ণ হবে, আর জান্নাতে নূন্যতম মর্যাদার অধিকারী যে হবে তার দুনিয়া ও আরো দশ দুনিয়ার পরিমান জায়গা হবে।

আল্লাহ তা'আলা জান্নাত সম্পর্কে বলেনঃ

أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ

[سورة آل عمران، الآية:133]

অর্থঃ (পরহেজগার মু'মিনদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১৩৩]

জান্নাত বাসীদের চিরস্থায়ী ও জান্নাত ধ্বংস হবে না। এই সম্পর্কে তিনি বলেনঃ

جَزَاؤُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَداً رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ

[سورة البينة، الآية:8]

অর্থঃ ((তাদের পালন কর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সনু্তষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।)) [সূরা আল-বাইয়্যেনাহ, আয়াত-৮]

আর জাহান্নামঃ ইহা শাস্তির ঘর যা আল্লাহ্ কাফের ও অবাদ্ধদের জন্য তৈরী করে রেখেছেন। তথায় বিভিন্ন প্রকার কঠিন শাস্তি রয়েছে। তার পাহারাদার হবে নিষ্ঠুর ও নির্দয় ফিরিশতারা। আর কাফেররা তথায় চিরস্থায়ী থাকবে। তাদের খাদ্য হবে যাক্কুম (কাঁটা যুক্ত) আর পানিয় হবে পুঁজ, দুনিয়ার আগুনের তাপ জাহান্নামের আগুনের তাপ মাত্রার সত্তর ভাগের এক ভাগ মাত্র। জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের চাইতে ৬৯ (উনসত্তর) গুন বেশী, এর প্রত্যেকটি অংশ দুনিয়ার আগুনের ন্যায় বা তার চাইতে আরো উত্তাপ, আর এই জাহান্নাম তার অধিবাসী নিয়ে পরিতুষ্ট হবেনা বরং বলবে যে, আরো আছে কি ? তার সাতটি দরজা হবে। প্রত্যেকটি দরজার জন্য নির্ধারিত জাহান্নামীমের অংশ থাকবে।

আল্লাহ তা'আলা জাহান্নাম সম্পর্কে বলেনঃ

أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ

[سورة آل عمران، الآية:131]

অর্থঃ ((কাফিরদের জন্য তৈরী করা হয়েছে।)) [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত-১৩১]

জাহান্নামীরা চিরস্থায়ী এবং তা ধ্বংস হবেনা। এ সম্পর্কে তিনি আরো বলেনঃ

خَالِدِينَ فِيهَا أَبَداً - ِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيراً

[سورة الأحزاب، الآيتان:64-65]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে অভিসম্পাত করেছেন, এবং তাদের জন্যে জ্বলন্ত অগি্ন প্রস্তুত রেখেছেন। তথায় তারা অনন্তকাল থাকবে।)) [সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৬৪-৬৫]

(৩) শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনার ফলাফলঃ

শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনার অনেক সূফল রয়েছে-

(১) ছাওয়াবের আশায় আনুগত্য ও কর্ম সম্পাদনে আগ্রহী ও উৎসাহী হওয়া।

(২) এ দিবসের শাস্তির ভয়ে অবাদ্ধতায় লিপ্ত ও ততপ্রতি সন্তষ্ট থাকা হতে ভয় করা।

(৩) আখেরাতে মু'মিনরা যে নি'আমত ও ছাওয়াব পাবে এ আশা- আকাঙ্খায় দুনিয়ার ছুটে যাওয়া জিনিস হতে নিজের শান্তনা লাভ করা।

(৪) ব্যক্তি ও সমাজিক জীবনে সৌভাগ্যের মূল উৎস হল শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা। কারণ মানুষ যখন এ কথার প্রতি ঈমান আনবে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টজীবকে তাদের মৃতু্যর পর পুনরুজ্জীবিত করবেন ও তাদের হিসাব নিকাশ নিবেন, এবং তাদের কর্মের প্রতিদান প্রদান করবেন। মায্লুমের (অত্যাচারিত) পক্ষে যালিম (অত্যাচার কারী) ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবেন। তখন সে আল্লাহর আনুগত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে, সকল অকল্যাণের জড় নিঃশেষ হয়ে যাবে। সমাজে কল্যাণ বিস্তার লাভ করবে, এবং সর্বত্র সম্মান-মর্যাদা,শাস্তি ও নিরাপত্তা ছড়িয়ে পড়বে। প্রশান্তি ও নিরাপত্তা বেড়ে যাবে।

الركن السادس: الإيمان بالقدر

ষষ্ঠ রুকনঃ ভাগ্যের প্রতি ঈমান।

(১) কদরের (ভাগ্যের) সংজ্ঞা ও তার প্রতি ঈমান আনার গুরুত্বঃ

কদর বা (ভাগ্য) হলঃ আল্লাহর অনন্ত জ্ঞান ও হিকমাত অনুযায়ী সৃষ্টি কূলের জন্য ভাগ্য নির্ধারণ। আর ইহা আল্লাহর কুদরতের উপর নির্ভলশীল,আর তিনি সর্ব বিষয় ক্ষমতাশীল তিনি যা ইচ্ছা তাহাই করেন। আর ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনা আল্লাহ্ তা'আলার রুবুবীয়াতের (প্রভুত্তের) প্রতি ঈমান আনার অন্তভুর্ক্ত। আর ইহা ঈমানের ছয়টি রুক্নের অন্যতম একটি রুকন, এর প্রতি ঈমান আনা ছাড়া এই ছয়টি রুক্নের প্রতি ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে না।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ

[سورة القمر، الآية:49]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আমি প্রত্যেক বসত্তকে পরিমিত রুপে সৃষ্টি করেছি।)) [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত-৪৯]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

كل شيء بقدر حتى العجز والكيس، أوالكيس والعجز

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((প্রত্যেক জিনিসই পরিমিত, এমনকি অপারগতা ও অলসতা অথবা অলসতা ও অপারগতাও।)) [মুসলিম]

(২) ভাগ্যের স্তরঃ

চারটি স্তর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনা পরিপূর্ণ হবে-

প্রথমতঃ আল্লাহর অনন্ত জ্ঞানের প্রতি ঈমান আনা, যা সকল বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاء وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ

[سورة الحج، الآية:70]

অর্থঃ ((তুমি কি জাননা যে,নিশ্চয় আল্লাহ্ অবগত যা কিছু আসমান ও জমিনে রয়েছে,নিশ্চয় ইহা কিতাবে লিখিত আছে আর নিশ্চয় ইহা আল্লাহর নিকট সহজ।)) [সূরা আল-হাজ্ব, আয়াত-৭০]

দ্বিতীয়তঃ লাউহে মাহ্ফুজে আল্লাহর জানা মোতাবেক ভাগ্য সমূহ লিখে রাখার প্রতি ঈমান আনা।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

مَّا فَرَّطْنَا فِي الكِتَابِ مِن شَيْءٍ

[سورة الأنعام، الآية:38]

অর্থঃ ((আমি কোন কিছু লিখতে ছাড়িনি।)) [সূরা আন'আম, আয়াত-৩৮]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

كتب الله مقادير الخلائق قبل أن يخلق السموات والأرض بخمسين ألف سنة

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০(পঞ্চাশ) হাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলা সৃষ্টজীবের ভাগ্য সমূহ লিখে রেখেছেন।)) [মুসলিম]

তৃতীয়তঃ আল্লাহর কার্যকরী ইচ্ছা ও তাঁর ব্যাপক শক্তির প্রতি ঈমান আনা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

[سورة التكوير، الآية:29]

অর্থঃ ((জগত সমূহের প্রভু আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে অন্য কিছুই ইচ্ছা করতে পার না।)) [সূরা আত্-তাকভীর, আয়াত-২৯]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বলেনঃ যে ব্যক্তি তাঁকে সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম লক্ষ করে বলেছিলেনঃ

ما شاء الله وشئت

"আল্লাহ এবং আপনি যাহা চেয়েছেন (ওয়াও দ্বারা আত্বফ করে)।"

أجعلتني لله نداً بل ما شاء الله وحده

[رواه أحمد]

অর্থঃ ((তুমি কি আমাকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে দিলে ? বরং তিনি একাই চেয়েছেন।)) [আহমাদ]

চতুর্থতঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ সকল বস্তুর সৃষ্টি কর্তা ইহার প্রতি ঈমান আনা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ

[سورة الزمر، الآية:62]

অর্থঃ ((আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর অভিবাবক।)) [সূরা-আয্-যুমার, আয়াত-৬২]

তিনি আরো বলেনঃ

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

[سورة الصافات، الآية:96]

অর্থঃ ((আল্লাহ তোমাদের ও তোমাদের কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।)) [সুরা আস্-সাফফাত, আয়াত-৯৬]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

إن الله يصنع كل صانع وصنعته

[رواه البخاري]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আল্লাহ্ সকল আবিস্কারক ও তার আবিস্কারকে সৃষ্টি করেন।)) [বুখারী]

(৩) ভাগ্যের প্রকারঃ

১) সকল সৃষ্টজীবের সাধারণ ভাগ্য লিপিবদ্ধ করণ। আর ইহাই আসমান জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বৎসর আগে লাউহে মাহ্ফুজে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

২) সারা জীবনের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করণ। আর তা হল বান্দার মাঝে রুহ্ বা আত্মা ফুঁকে দেওয়ার সময় হতে তার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত যা কিছু সংঘটিত হবে নির্ধারণ করা।

৩) বাৎসরিক ভাগ্য নির্ধারণ করা। ইহা হল, প্রত্যেক বৎসর যা কিছু সংঘটিত হবে তা নির্ধারণ করা। আর ইহা প্রত্যেক বৎসরের মহিমান্বিত রজনীতে হতে থাকে।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ

[سورة الدخان، الآية:4]

অর্থঃ ((এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।)) [সূরা আদ্-দুখান, আয়াত-৪]

৪) দৈনন্দিন ভাগ্য নির্ধারণ করণ, আর তা হল সম্মান, অপমান, (কিছু) দেয়া না দেওয়া জীবিত করা, মৃত্যু দান ইত্যাদি যা দৈনন্দিন সংঘটিত হবে, তা নির্ধারণ করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

يَسْأَلُهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ

[سورة الرحمن، الآية:29]

অর্থঃ ((আসমান ও যমিনে বিচরণশীল সকলেই তাঁর কাছে প্রার্থী, প্রত্যেকদিন (সময়) কোন না কোন কর্মেরত রয়েছেন।)) [সূরা আর-রাহমান, আয়াত-২৯]

(৪) ভাগ্যের ব্যাপারে সালাফদের আকিদাহ বা বিশ্বাস হলঃ

নিশ্চয় আল্লাহ সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা প্রভু তার মালিক বা অধিকারী। নিশ্চয় আল্লাহ সকল সৃষ্টিজীবকে সৃষ্টির পূর্বে তাদের ভাগ্য সমূহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। তাদের বয়স, রুযী, কর্ম সমূহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আরো লিখে রেখেছেন যে, সুখ অথবা দুঃখের দিকে তারা ধাবিত হবে।

প্রত্যেক জিনিসই স্পষ্ট কিতাবে হিসাব করে রেখেছেন। অতঃপর আল্লাহ্ যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। আর যা হয়েছে ও হবে তা সবই জানেন। আর যা হয় নাই যদি তা হতো কি ভাবে হতো তাও জানেন। আর তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাশীল। যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন,আর যাকে ইচ্ছা তাকে পথভ্রষ্ট করেন। আর নিশ্চয় বান্দার ইচ্ছা ও শক্তি রয়েছে, যা দ্বারা তাদেরকে যে সকল কাজের সমর্থবান করেছেন তা সম্পাদন করে এই বিশ্বাস রেখে যে আল্লাহ্ যা চান শুধু মাত্র তাই হয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

[سورة العنكبوت، الآية:69]

অর্থঃ ((যারা আমার পথে সংগ্রাম করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করবো।)) [সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত-৬৯]

আর নিশ্চয় আল্লাহ্ বান্দার ও তার কর্মের সৃষ্টি কর্তা আর তারাই এই কর্ম গুলো প্রকৃত পক্ষে সম্পাদন কারী। ওয়াজেব ছাড়াতে ও হারাম কাজ করাতে আল্লাহর বিরুদ্ধে কারো কোন হুজ্জাত বা দলীল দাঁড় করানোর সুযোগ নেই, বরং বান্দাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পূর্ণ দলীল রয়েছে। বিপদ-আপদে ভাগ্যকে কারণ হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ হলেও নিন্দনীয় ও পাপের কাজে ভাগ্যের অজুহাত দেয়া বৈধ নয়। যেমন-নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদম ও মূসা (আলাইহিমাস সালাম) এর পরস্পর বিতর্কের ব্যাপারে বলেনঃ

تحاج آدم وموسى، فقال موسى: أنت آدم الذي أخرجتك خطيئتك من الجنة، فقال له آدم: أنت موسى الذي اصتفاك الله برسالاته وبكلامه ثم تلومني على أمر قد قدّر عليّ قبل أن أخلق فحج آدم موسى.

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((আদম ও মূসা (আলাইহিমাস সালাম) বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন, অতঃপর মূসা (আলাইহিস্ সালাম) বললেনঃ হে আদম (আলাইহিস্ সালাম) তোমাকেই তো তোমার পাপ জান্নাত হতে বহিস্কার করেছিল। তার পর আদম (আলাইহিস্ সালাম) তাঁকে বললেনঃ হে মূসা ! (আলাইহিস্ সালাম) তোমাকেই তো আল্লাহ্ তাঁর রিসালাত ও কথোপকথনের জন্য নির্বাচন করে নিয়েছিলেন? তারপরও তুমি আমাকে এমন বিষয়ের উপর দোষারোপ করছ যা আল্লাহ্ আমার সৃষ্টির পূর্বেই আমার উপর নির্বাচন করে রেখেছেন। অতঃপর আদম (আলাইহিস্ সালাম) মূসা (আলাইহিস্ সালাম) এর উপর জয়ী হলেন। [মুসলিম শরীফ]

(৫) বান্দাদের কর্ম সমূহঃ

যে সকল কাজ আল্লাহ তা'আলা এই নিখিল বিশ্ব্যে সৃষ্টি করেছেন তা দু' ভাগে বিভক্ত-

প্রথমঃ আল্লাহ্ তা'আলার কর্ম সমূহের মধ্যে যে সকল কর্ম তাঁর সৃষ্টজীবের মাঝে পরিচালনা করেন, তাতে কাহারো কোন প্রকার ইচ্ছা ও ইখ্তিয়ার নেই। বস্তুর সকল ইচ্ছা আল্লাহর জন্য। যেমন জীবিত করা মৃতু্য দান করা সুস্থ্য ও অসুস্থ্য করা।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

[سورة الصافات، الآية:96]

অর্থঃ ((আর আল্লাহই তোমাদের ও তোমাদের কর্মকে সৃষ্টি করেছেন।)) [সূরা আস্-সাফফাত, আয়াত-৯৬]

তিনি আরো বলেনঃ

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً

[سورة الملك، الآية:2]

অর্থঃ ((যিনি মরণ ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমাদেরকে পরিক্ষা করেন- কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ট?)) [সুরা আল-মুলক্, আয়াত-২]

দ্বিতীয়ঃ আর যে সকল কর্ম সৃষ্টিজীব সম্পাদন করে থাকে, তা সবই ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত। আর ইহা সম্পাদন কারীর ইখ্তিয়ার ও ইচ্ছায় সংঘঠিত হয়, কারণ ইহা আল্লাহ্ তাদের উপর অর্পণ করেছেন।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

لِمَن شَاء مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ

[سورة التكوير، الآية:28]

অর্থঃ ((যে তোমাদের মধ্যে সোজা পথে চলতে চায়।)) [সূরা আত্-তাকভীর, আয়াত-২৫]

তিনি আরো বলেনঃ

. . . فَمَن شَاء فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاء فَلْيَكْفُرْ . . .

[سورة الكهف، الآية:29]

অর্থঃ ((অতএব যার ইচ্ছা হয় ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফুরী করুক।)) [সূরা আল-ক্বাহাফ, আয়াত-২৯]

ভাল কাজ সম্পাদনের জন্য তারা প্রশংসার হক্বদার ,আর খারাপ কাজ করার জন্য তারা অপমানের হক্বদার। আল্লাহ্ শুধু মাত্র ঐ কাজ করার জন্য শাস্তি দিবেন, যাতে বান্দার পূর্ণ ইখতিয়ার রয়েছে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَمَا أَنَا بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ

[سورة ق، الآية:29]

অর্থঃ ((আর আমি বান্দাদের উপর জুলুমকারী নই।)) [সূরা ক্বাফ, আয়াত-২৯]

আর মানুষ ইচ্ছা ও নিরুপায়ের পার্থক্য জানে। যেরূপ কেহ ছাদ হতে সিঁড়ি বেয়ে নিজ ইচ্ছায় অবতরণ করেন, আর কখনো কেহ্ তাকে ছাদ হতে ফেলে দিতে পারে। প্রথম উদাহরণ হল ইচ্ছার, আর দ্বিতীয় উদাহরণ হল নিরুপায়ের।

(৬) আল্লাহর সৃষ্টি ও বান্দার কর্মের মাঝে সমঝতাঃ

আল্লাহ্ বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন ও তার (বান্দার) কর্ম সমূহকে সৃষ্টি করেছেন। ও তাকে ইচ্ছা ও শক্তি দিয়েছেন। তাই বান্দাই প্রকৃত পক্ষে তার কর্মের সম্পাদন কারী। সারাসরি তা আদায় কারী,কারণ তার ইচ্ছা ও শক্তি রয়েছে। অতঃপর সে যদি ঈমান আনে তবে সে তার ইচ্ছায় ও ইরাদায় ঈমান আনলো। আর সে যদি কুফুরী করে তবে সে তার ইচ্ছায় ও পূর্ণ ইরাদায় কাফের হল। যেমন আমরা বলে থাকি যে, এই ফল এই গাছের আর এই ফসল এই ক্ষেতের। অর্থ হলঃ নিশ্চয় ইহা হতে উৎপন্ন হয়েছে। আর আল্লাহর দিক হতে, এর অর্থ হবেঃ নিশ্চয় আল্লাহ্ ইহাকে ইহা হতে সৃষ্টি করেছেন। এই দুইয়ের মাঝে কোন প্রকারের বিরোধ নেই। আর এর দ্বারা (শারউল্লাহ) আল্লাহর প্রনয়ণ ও তাঁর নির্ধারণ এক বলে বিবেচিত হয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَاللَّهُ خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ

[سورة الصافات، الآية:96]

অর্থঃ ((অথচ আল্লাহ্ তোমাদেরকে এবং তোমাদের কর্ম সমূহকে সৃষ্টি করেছেন।)) [সূরা আস্-সফফাত, আয়াত-৯৬]

তিনি আরো বলেনঃ

فَأَمَّا مَن أَعْطَى وَاتَّقَى - وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى - َسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى - وَأَمَّا مَن بَخِلَ وَاسْتَغْنَى - وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى - فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى

[سورة الليل، الآيات:5-10]

অর্থঃ ((অতএব যে দান করে এবং আল্লাহ্ ভীরু হয়, এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে,আমি তাকে সুখের বিষয়ের জন্যে সহজ পথ দান করব,আর যে কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয়, এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে,আমি তাকে কষ্টের জন্যে সহজ পথ দান করব।)) [সূরা আল-লাইল, আয়াত ৫-১০]

(৭) ভাগ্যের ব্যাপারে বান্দার করণীয়ঃ

ভাগ্যের ব্যাপারে বান্দার করণীয় কাজ হল দু'টি-

প্রথমঃ সাম্ভব্য কাজ সম্পাদনের ও সতর্কিত কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। তাঁর কাছে (আল্লাহর কাছে) আরো চাইবে যেন তাকে সহজ সাধ্য কাজ সহজ করেদেন, আর কঠিন সাধ্য কাজ হতে তাকে বিরত রাখেন।আর তাঁর উপর ভরসা করবে ও তাঁর কাছে আশ্রয় চাইবে। অতঃপর কল্যাণ অর্জনের জন্য ও অকল্যাণ বর্জনের জন্য তাঁর নিকটেই মুখাপেক্ষী হবে।

আর তাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

احرص على ما ينفك واستعن بالله ولا تعجز وإن أصابك شيء فلا تقل لو أني فعلت كذا لكان كذا ولكن قل قدر الله وما شاء فعل، فإن لو تفتح عمل الشيطان

অর্থঃ ((তোমার কল্যাণকর কাজের প্রতি আগ্রহবান হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর, আর অপারগতা প্রকাশ করিওনা। আর তুমি যদি কোন কষ্টের সম্মখীন হও তবে এই রুপ বলিওনা যে আমি যদি এই কাজ করতাম তাহলে এই হত। বরং বল যে, আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন ও চেয়েছেন তাই করেছেন, কারণ যদি কথাটি শায়তানের কর্ম খুলে দেয়।))

দ্বিতীয়ঃ বান্দা তার জন্য নির্ধারিত বিষয়ের উপর ধৈর্য ধারণ করবে, ঘাবড়াবেনা। অতঃপর জানবে যে, নিশ্চয় ইহা আল্লাহর পক্ষ হতে, সুতরাং সন্তোষ্ট চিত্তে মেনে নিবে। আরো জ্ঞাত হবে-যে বিপদ তাকে আক্রমন করেছে তা ভূল করে আসেনি। আর যে বিপদ তোমাকে আক্রমন করেনি তা তার জন্য আসার ছিলনা।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

وأعلم أن ما أصابك لم يكن ليخطئك وأن ما أخطأك لم يكن ليصيبك

অর্থঃ ((আরো জ্ঞাত হবে-যে বিপদ তোমাকে আক্রমন করেছে তা তোমাকে ভুল করে আসেনি। আর যে বিপদ তোমাকে আক্রমন করেনি তা তোমার জন্য আসার ছিলনা।))

(৮) ভাগ্য ও ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকাঃ

ভাগ্যের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অপরিহার্য। কেননা ইহা আল্লাহর প্রভুত্ত্বের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা অন্তর্ভুক্ত। তাই সকল মু'মিনের পক্ষে আল্লাহর ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা অপরিহার্য। কারণ আল্লাহর কর্ম ও ফায়সালা সকলই ভাল (ন্যায় পরায়ণ) ইনসাফ ভিক্তিক হিকমত পূর্ণ। সুতরাং যার আস্থা থাকবে যে, নিশ্চয় যা (সুখ-দুঃখ) তাকে পৌঁছিয়াছে তা তাকে ভূল করার ছিলনা আর যা তাকে ভূল করেছে তা তাকে পৌঁছার ছিলনা সে প্রেশানী ও সন্দেহ্ হতে বেঁচে থাকবে। আর তার জীবন হতে ব্যাকুলতা ও দোদুল্যমানতা দূর হবে। চলে বা হারিয়ে যাওয়া বস্তুর উপর চিন্তিত হবে না। আর তার ভবিষ্যৎ কে ভয় পাবেনা। আর এর মাধ্যমে সে সব চাইতে সৌভাগ্য পূর্ণ হবে, আত্মার দিক দিয়ে সব চাইতে পবিত্র হবে, আর সব চাইতে শান্ত হবে।

আর যে জানতে পারবে যে, তার বয়স সীমিত, রুযী পরিমিত, সে নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারবে যে, কাপুরুষত্বা বয়স বাড়াতে পারে না। কার্পন্নতা রুয বাড়াতে পারে না। তাহলে সবই লিখিত রয়েছে। বিপদের উপর ধৈর্য ধারণ করবে, পাপ ও ক্রটি পূর্ণ কর্ম সম্পাদন করার কারনে ক্ষমা চাইবে। আর আল্লাহ্ যা (তার জন্য) নির্ধারণ করেছেন তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। তবেই আদেশের আনুগত্য আর বিপদের উপর ধৈর্য ধারণের মাঝে সম্বন্নয় গড়তে সক্ষম হবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

[سورة التغابن، الآية:11]

অর্থঃ ((আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে কোন প্রকার বিপদ আসে না,এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, আল্লাহ্ তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।)) [সূরা আত্-তাগাবুন, আয়াত-১১]

তিনি আরো বলেনঃ

فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ

[سورة غافر، الآية:55]

অর্থঃ ((অতএব আপনি ধৈর্য ধারণ করুন। নিশ্চয় আল্লাহর প্রতিশ্রতি সত্য। আপনি আপনার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।)) [সূরা গাফের, আয়াত-৫৫]

(৯) হেদায়াত দু'প্রকারঃ (হেদায়াতের দু'টি অর্থ)

প্রথমঃ হেদায়াত অর্থ- সত্যের সন্ধান দেওয়া,সৎপথ প্রর্দশন করা। আর সকল সৃষ্টজীবই এর মালিক। আর সকল রাসূল ও তাঁদের অনুসারীগণ এরই মালিক।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

[سورة الشورى، الآية:52]

অর্থঃ ((নিশ্চয় আপনি সরল পথ প্রদর্শন করেন।)) [সূরা আশ্শুরা, আয়াত-৫২]

দ্বিতীয়ঃ হেদায়াত এর অর্থ আল্লাহ কর্তৃক বান্দাদেরকে (ভাল কাজের) তাওফীক প্রদান করা ও সঠিক পথে প্রতিষ্ঠা বা অটল রাখা, (আর ইহা) তাঁর মুত্তাকীন বান্দাদের জন্য দয়া ও অনুগ্রহ স্বরূপ। আর এই হেদায়াতের একমাত্র মালিক হলেন আল্লাহ।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ

[سورة القصص، الآية:56]

অর্থঃ ((আপনি যাকে ভালবাসেন,তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ্ তা'আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন।)) [সূরা আল-ক্বসাস, আয়াত-৫৬]

(১০) (আল্লাহর) কুরআনে বর্ণিত ইরাদা দু' প্রকারঃ

প্রথমঃ ইরাদা কাউনিয়া ক্বাদারিয়া, তা হল সকল সৃষ্টিকূলের তরে নির্ধারিত ঘটনীয় ইচ্ছা, সুতরাং আল্লাহ্ যা চান তা হয়, আর যা চান না তা হয় না। আর ইহা (ইরাদা কাউনিয়া ক্বাদারিয়া) অবশ্যই পতিত হবে। কিন্তু ইরাদা শারয়ীয়া এর সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত (ইহাকে) ভালবাসা ও এর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া জরুরী নয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

فَمَن يُرِدِ اللّهُ أَن يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلإِسْلاَمِ

[سورة الأنعام، الآية:125]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ যাকে হেদায়াত করার ইচ্ছা করেন,তার বক্ষকে ইসলামের জন্য খুলে দেন।)) [সূরা আনআম, আয়াত-১২৫]

দ্বিতীয়ঃ ইরাদা দ্বীনিয়া শারয়ীয়া, তা হল দ্বীনী নির্দেশ বা উদ্দেশ্য ও তার আহল অনুসারী কে ভালবাসা ও তাদের প্রতি সন্তষ্ট থাকা। ইরাদা দ্বীনিয়া শারয়ীয়া বাস্তবায়িত হবে না,যতক্ষণ পর্যন্ত এর সাথে ইরাদা কাউনিয়া সংযুক্ত না হবে।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

يُرِيدُ اللّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلاَ يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ

[سورة البقرة، الآية:185]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ চান, তোমাদের জন্য কঠিনতা চান না।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-১৮৫]

আর ইরাদা কাউনিয়া অধিক ব্যাপক, কারণ সকল শারয়ী উদ্দেশ্য যা বাস্তবায়িত হয় তা সৃষ্টিগত দিক হতেও বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য উদ্দেশ্যিত। আর পতিত সকল কাওনী উদ্দেশ্য বা ঘটমান ইচ্ছা শরীয়াতে তা উদ্দেশ্যিত নয়। যেমন আবু বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর ঈমানের মাঝে উভয় প্রকার ইরাদা বা ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়েছিল। আর আবু জাহল এর কুফুরীতে শুধুমাত্র ইরাদা কাওনিয়া বা ঘটমান ইচ্ছা ছিল। আর যাতে ইরাদা কাউনিয়া পাওয়া যাবে না, যদিও তা শারীয়াতের দিক থেকে প্রত্যাশিত, যেমন আবু জাহেলের ঈমান। সুতরাং যদি ও আল্লাহ্ নাফারমানী পূর্ণ ইচ্ছা করেন ঘটবার দিক থেকে, এবং সৃষ্টিগত দিক থেকে তা চান কিন্তু তা দ্বীন হিসাবে পছন্দ করেন না, ভাল বাসেন না, ও তার প্রতি নির্দেশ ও দেন না। বরং তার প্রতি বিদ্বেষ রাখেন, অপছন্দ করেন, তা হতে নিষেধ (বান্দাদেরকে) করেন ও তা সম্পাদন কারীকে সাবধান করেন।

আর এসব তাঁরই নির্ধারণ তবে আনুগত্য পূর্ণ কর্ম ও ঈমান আনা নিশ্চয় আল্লাহ্ তা'আলা ইহাকে ভাল বাসেন,এবং এর নির্দেশ দেন, এবং এর সম্পাদন কারীকে নেকী ও সুন্দর প্রতি দানের ওয়াদা (প্রতিশ্রতি) দিয়েছেন, তাঁর ইরাদা ছাড়া তাঁর নাফারমানী করা যায় না। আর আল্লাহ্ তা'আলা যা চান শুধু তাই পতিত হয়।

আল্লাহ্ তা'আল বলেনঃ

وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ

[سورة الزمر، الآية:7]

অর্থঃ (( (আল্লাহ্) তাঁর বান্দাদের জন্য কুফুরী পছন্দ করেন না।)) [সূরা আয্-যুমার, আয়াত-৬]

তিনি আরো বলেনঃ

وَاللّهُ لاَ يُحِبُّ الفَسَادَ

[سورة البقرة، الآية:205]

অর্থঃ ((আল্লাহ্ ফাসাদ (অশান্তি) পছন্দ করেন না।)) [সূরা আল-বাক্বারা, আয়াত-২০৫]

(১১) ঐ সকল আস্বাব বা কারণ সমূহ যা ভাগ্য পরিবর্তন করেঃ

আল্লাহ্ এই ভাগ্যের জন্য কিছু কারণ তৈরী করে রেখেছেন যা ইহাকে পরিবর্তন ও প্রতিরোধ করে। যেমন-দোআ, সাদাকাহ্ ঔষধ, সতর্কতা অবলম্বন, (নিজের) কর্ম দক্ষতা ব্যাবহার করা,কারণ সবই আল্লাহর ফায়সালা ও তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ, এমনকি অপারগতা- অক্ষমতা ও বিজ্ঞতা-বুদ্ধিমত্তা।

(১২) ভাগ্যের মাস্আলা বা বিষয়টি আল্লাহর সৃষ্টজীবের মাঝে তাঁর একটি রহস্যময় বিষয়ঃ

ভাগ্য নির্ধারণ আল্লাহর গোপন রহস্য, তাঁর সৃষ্টজীবের মাঝে এ কথাটি শুধু মাত্র ভাগ্যের গোপন দিকের জন্য প্রয়োজয্য। কারণ সকল জিনিসের হাকীকাত শুধুমাত্র আল্লাহ্ জানেন। মানুষ তা অবগত হতে পারে না। যেমন আল্লাহ্ পথ ভ্রষ্ট করেন,হেদায়াত করেন, মৃতু্য দান করেন, জীবিত করেন, নিষেধ করেন,ও কিছু প্রদান করেন।

যেমন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

إذا ذكر القدر فأمسكوا [رواه مسلم].

অর্থঃ ((যখন ভাগ্যের কথা স্বরণ হবে তখন তোমরা তা নিয়ে তর্ক বির্তকে লিপ্ত না হয়ে চুপ থাকবে।)) [মুসলিম]

তবে ভাগ্যের অন্যান্য দিক ও তাঁর মহা হিকমত স্তর, মর্যাদা ও তাঁর প্রভাব মানুষের নিকট বর্নণা করাও তা তাদেরকে জানানো বৈধ রয়েছে। কারণ ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের রুকন সমূহের একটি অন্যতম রুকন,যা শিক্ষা করাও জানা একান্ত কর্তব্য।

যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জিব্রীল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট ঈমানের রুকন সমূহ উল্লেখ করেন তখন বলেনঃ

هذا جبريل أتاكم يعلمكم دينكم [رواه مسلم].

অর্থঃ ((উনি হলেন জিব্রীল তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য আগমণ করেছেন।))

(১৩) ভাগ্যের দ্বারা দলীল দেওয়াঃ

ভবিষ্যতে কি হবে বা না হবে এই সম্পর্কে আল্লাহর পূর্ব জ্ঞান, (ইহা) অদৃশ্য ইহা তিনি ব্যতীত কেহ জানেনা। (ইহা) মানুষ ও জি্বনদের অজানা। এতে কোন ব্যক্তিরই স্বীয় পক্ষ গ্রহণের দলীল নেই। আর যে বিষয় ফায়সালা হয়েগেছে তার উপর ভরসা করে কর্ম ত্যাগ করা ঠিক নয়। সুতরাং ভাগ্য আল্লাহর বিরুদ্ধে ও তাঁর সৃষ্টির কাহারো জন্য দলীল বা হুজ্জাত নয়। যদি খারাপ কাজ করার উপর ভাগ্যের দ্বারা দলীল দেওয়া বৈধ হতো,তাহলে অত্যাচারী শাস্তি প্রাপ্ত হতনা, মুশরিক ব্যক্তি হত্যা হতো না, হদ্ বা বিধান প্রতিষ্ঠিত হতনা, আর কেহ্ অত্যাচার করা হতে বিরত থাকতো না। আর ইহা দ্বীন ও দুনিয়াতে অশান্তি সৃষ্টি করার মাধ্যম হত, যার ভয়াবহতা সকলের জানা।

আর যারা ভাগ্য দ্বারা দলীল দেয়, তাদেরকে আমরা বলবো তুমি জান্নাতী না জাহান্নামী এ ব্যাপারে তোমার নিকট নিশ্চিত জ্ঞান নেই। আর যদি তোমার নিকট এই ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান থাকত অবশ্যই আমরা তোমাকে সৎকাজের আদেশ দিতাম না ও অন্যায় থেকে নিষেধও করতাম না। বরং তুমি কর্ম সম্পাদন কর নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাকে তাওফীক প্রদান করবেন, আর তুমি জান্নাত বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিছু কিছু সাহাবা যখন ভাগ্যের হাদীস সমূহ শুনতেন তখন বলতেনঃ এখন তুমি আমার চাইতে বেশী প্রচেষ্টাকারী নও। (অর্থাৎ, আমি বেশী প্রচেষ্টাকারী)।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আত্ম পক্ষ সমর্থনে ভাগ্যের দ্বারা দলীল দেওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেনঃ

اعملوا فكل ميسر لما خلق له فمن كان من أهل السعادة فسييسر لعمل أهل السعادة، ومن كان من أهل الشقاوة فسييسر لعمل أهل الشقاوة،

অর্থঃ ((তোমরা কর্ম সম্পাদন করতে থাকো যাকে যার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে তা তার জন্য সহজ সাধ্য হবে, সুতরাং যারা সৌভাগ্যবান হবে তাদেরকে সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের যে কাজ সেই কাজ তার জন্য সহজ করে দেওয়া হবে। আর যারা দুর্ভাগা হবে, তাদেরকে তাদের দুর্ভাগা ব্যক্তিদের যে কাজ সেই কাজ সহজ করে দেওয়া হবে। অতঃপর নিম্নের আয়াত পাঠ করলেনঃ

فَأَمَّا مَن أَعْطَى وَاتَّقَى - وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى - َسَنُيَسِّرُهُ لِلْيُسْرَى - وَأَمَّا مَن بَخِلَ وَاسْتَغْنَى - وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَى - فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَى

[سورة الليل، الآيات:5-10]

অর্থঃ ((অতএব, যে দান করে এবং আল্লাহভীরু হয়, এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে, আমি তাকে সুখের বিষয়ের জন্য সহজ পথ দান করব। আর যে কৃপণতা করে ও বেপরওয়া হয়, এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে, আমি তাকে কষ্টের বিষয়ের জন্য সহজ পথ দান করব।)) [সূরা আল্-লাইল, আয়াত ৫-১০]))

(১৪) আসবাব বা (মাধ্যম সমূহ) গ্রহণ করাঃ

বান্দার নিকট দু' প্রকার কাজ উপস্থিত হয়-

(১) এমন কর্ম যাতে বাহানা বা অজুহাত রয়েছে তা সম্পাদনে সে অপারগ নয়।

(২) এমন কর্ম যাতে বাহানা ও অজুহাতের অবকাশ নেই, তা পালনে সে ধৈর্য ধারণ করে না। আল্লাহ্ তা'আলা বিপদ পতিত হওয়ার পূর্বেই বিপদ সম্পর্কে জানেন।

তাঁর (আল্লাহর) বিপদ সম্পর্কে জ্ঞান রয়েছে এর অর্থ এই নয় যে, তিনিই বিপদ গ্রস্ত ব্যক্তিকে বিপদে পতিত করেছেন, বরং এই বিপদ পতিত হয়েছে এর নির্ধারিত কারণ সমূহের দ্বারাই। যদি বিপদ হতে রক্ষাকারী মাধ্যম যা ব্যবহার ও গ্রহণ করার জন্য ইসলামী শরীয়াত অনুমতি দিয়েছেন পরিত্যাগ করার কারণে পতিত হয়, তবে সে নিজেকে হেফাযত না করার কারণে ও তাঁকে বিপদ হতে রক্ষাকারী মাধ্যম গ্রহণ না করার কারণে দোষী হবে। আর যদি এই বিপদ প্রতিরোধ করার তার ক্ষমতা না থাকে তবে সে মা'জুর হবে। সুতরাং মাধ্যম গ্রহণ করা ভাগ্য ও ভরসার পরিপন্থী নয় বরং ইহা (মাধ্যম গ্রহণ করা) এরই (ভাগ্য ও ভরসারই) অন্তভর্ুক্ত। আর যখন ভাগ্য পতিত হয়ে যায় তখন তার প্রতি সন্তষ্ট থাকা ও তা মেনে নেয়া ওয়াজিব হয়ে যায় ও নিম্নের কথার দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ করবে।

قدّر الله وما شاء فعل

অর্থঃ আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন ও চেয়েছেন তাই করেছেন। তবে ভাগ্য পতিত হওয়ার পূর্বে মানুষের দায়িত্ব হল বৈধ মাধ্যম গ্রহণ করা ও ভাগ্যের দ্বারা ভাগ্যের প্রতিরোধ করা। নবীগণ নিজেদেরকে নিজেদের শত্রু থেকে হেফাযতকারী পদ্ধতি ও মাধ্যম গ্রহণ করেছিলেন, অথচ তাঁরা আল্লাহর ওয়াহীও নিরাপত্তা দ্বারা সাহায্য প্রাপ্ত ছিলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল ভরসা কারীদের নেতা ছিলেন, তা সত্বে ও তিনি মাধ্যম গ্রহণ করতেন আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা থাকার পরও।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ

وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِّبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدْوَّ اللّهِ وَعَدُوَّكُمْ

[سورة الأنفال، الآية:60]

অর্থঃ ((আর প্রসত্তত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর।)) [সূরা আল-আনফাল, আয়াত-৬০]

তিনি আরো বলেনঃ

هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

[سورة الملك، الآية:15]

অর্থঃ ((তিনি তোমার জন্য যমিনকে সুগম করেছেন, অতএব তোমরা তার কাঁধে বিচরণ কর এবং তাঁর দেয়া রিযিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।)) [সূরা আল-মূলক, আয়াত-১৫]

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

المؤمن القوي خير وأحب إلى الله من المؤمن الضعيف وفي كل خير، احرص على ما ينفعك واستعن بالله ولا تعجز وإن أصابك شيء فلا تقل لو أني فعلت كذا لكان كذا وكذا، ولكن قل قدر الله ما شاء فعل فإن لو تفتح عمل الشيطان. [رواه مسلم].

অর্থঃ ((দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা, সবল মু'মিন আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয়, তবে উভয়ের মাঝে কল্যাণ নিহত রয়েছে। যা তোমাকে উপকার করবে তা আদায়ে তুমি অগ্রশীল হও। আর আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর অপারগতা প্রকাশ করিওনা। তোমাকে কোন বিপদ স্পর্শ করলে তুমি বলিওনা যে নিশ্চয় আমি এই কাজ করলে এই এই হতো বরং তুমি বলঃ আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন ও চেয়েছেন তাই করেছেন। কারণ (لو) লাও বর্ণটি শয়তানের কর্মকে খুলে দেয়।)) [মুসলিম]

(১৫) ভাগ্যকে অস্বীকার কারীর বিধানঃ

যে ব্যক্তি ভাগ্যকে অস্বীকার করল সে ইসলামী শরীয়াতের মূলনীতি সমূহের একটি অন্যতম মূলনীতিকে অস্বীকার করলো। আর এর মাধ্যমে সে কুফুরী করলো। কিছু কিছু সালাফ সালেহ্ বলেনঃ

ناظروا القدرية بالعلم، فإن جحدوه كفروا، وإن أقروابه خصموا.

অর্থঃ তোমরা কাদরীয়াহ সমপ্রদায়ের সাথে জ্ঞান দ্বারা মুনাযারা কর তারা যদি অস্বীকার করে তাহলে তারা কুফুরী করলো আর যদি তারা স্বীকার করে তাহলে তারা (তোমাদের সাথে) ঝগড়া করলো।

(১৬) ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনার ফলাফলঃ ফায়সালা ও ভাগ্যের প্রতি ঈমান আনার অনেক শুভ-পরিনাম সুন্দর প্রতিক্রিয়া বা প্রভাব রয়েছে যা জাতীয় ও ব্যক্তি জীবনে কল্যাণ নিয়ে আসে।

(ক) নিশ্চয় ইহা (ভাগ্যের প্রতি ঈমান) বিভিন্ন প্রকার নেক আমল ও ভাল গুণ অর্জন করার সুযোগ জন্ম দেয়। যেমন আল্লাহর ইখলাস বা এক নিষ্ঠতা, তাঁর উপর ভরসা করা, তাঁকে ভয় করা, তাঁর কাছে কিছু পাওয়ার আশা করা, তাঁর প্রতি ভাল ধারণা রাখা ধৈর্য ধারণ করা, প্রখর সহনশীলতা, নৈরাশ্যতা দূর করা, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, একমাত্র আল্লাহর শুকরিয়া করা, তাঁর অনুগ্রহ দয়া পেয়ে খুশী হওয়া। একমাত্র আল্লাহর জন্য বিনয় নম্রতা প্রকাশ করা, উদাসিনতা ও অহংকার ত্যাগ করা। আল্লাহর প্রতি ভরসা করতঃ ভাল পথে ব্যায় করার মন মানুষিকতা ও সৃষ্টি করে। বীরত্ব সৃষ্টি করে, ভাল কাজ করার দিকে অগ্রসর করে, অল্পে তুষ্ট থাকার গুন তৈরী করে, আত্ম সম্মানী করে, উচ্চাভিলাশী করে, কর্ম দক্ষতা সৃষ্টি করে, কর্ম সম্পাদনের প্রচেষ্টা তৈরী করে সুখে-দুখে মধ্য পথ অবলম্বন কারী তৈরী করে, হিংসা ও প্রতিবাদ করা থেকে নিরাপদে রাখে। বাজে গাল- গল্প বাতিল কাজ হতে বিবেককে মূক্ত রাখে। আত্মার প্রশান্তি ও তৃপ্তির ব্যবস্থা করে।

(খ) ভাগ্যের প্রতি ঈমান ওয়ালা ব্যক্তি তার জীবনে সঠিক ও সরল পথে পরিচালিত হয়। অধিক নি'য়ামত তাকে পথ ভ্রষ্ট করতে পারে না,আর বিপদে নৈরাশ হয় না। আর সে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে যে,তাকে যে বিপদ সর্্পশ করেছে তা (তার জন্য) আল্লাহর নির্ধারণ মাত্র, তার পরিক্ষা স্বরুপ। ঘাবড়ায় না বিচলিত হয় না। বরং ধৈর্য ধারণ করে ও নেকীর আশা রাখে।

(গ) নিশ্চয় ইহা পথ ভ্রষ্টের কারণ সমূহ ও জীবনের অশুভ সমাপনী হতে হেফাজত করে। ইহা তার জন্য (মু'মিনের জন্য) সঠিক পথে প্রতিষ্ঠা থাকার স্থায়ী প্রচেষ্টা, নেক কাজ বেশী বেশী করার সুযোগ, নাফারমানী পূর্ণ ও ধ্বংসাক্ত কাজ থেকে বিরত থাকার সুযোগ করে দেয়।

(ঘ) নিশ্চয় ইহা মু'মিনদের জন্য সুদৃঢ় অন্তর ও পূর্ণ বিশ্বাসের দ্বারা ভয়ানক ও কঠিন কর্মকে প্রতিহত করার মনভাব তৈরী করে দেয়, মাধ্যম বা উপকরণ গ্রহণ করার সাথে।

নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

عجبا لأمر المؤمن إن أمره كله له خير وليس ذلك إلا للمؤمن، إن أصابته سراء شكر فكان خيرا له، وإن أصابته ضراء صبر فكان خيرا له.

[رواه مسلم]

অর্থঃ ((কি আর্শ্চয্য ! নিশ্চয় মু'মিনের সকল কর্মই ভাল, আর ইহা শুধু মু'মিনদের জন্য খাস, যদি তাকে কোন আনন্দ স্পর্শ করে সে প্রশংসা করে, ফলে তা তাঁর জন্য কল্যাণ হয়। আর যদি তাকে কোন বিপদ স্পর্শ করে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়।)) [মুসলিম]

সমাপ্ত।

Source: www.islamhouse.com/library ((সম্পূর্ণ অবানিজ্যিক ভিত্তিতে শুধুমাত্র দ্বীন প্রচারের লক্ষ্যে কেউ এই বইয়ের লিংক ব্যবহার ও ছাপাতে পারেন নিম্নোক্ত শর্ত সাপেক্ষে-

১. লেখক ও অনুবাদকের নাম পরিবর্তন না করে এবং উল্লেখ করে।

২. বইয়ের মূল বিষয় ও লেখালেখিতে কোনরূপ পরিবর্তন না এনে।

৩. উত্তম হয় যদি সোর্স-এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

আল্লাহ আপনাদের সকলকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন।))

সর্বশেষ আপডেট ( Sunday, 14 June 2009 )