জ্বিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ফযীলত
লিখেছেন ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া   
Thursday, 22 November 2007

জ্বিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ফযীলত ও আমাদের করণীয়

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমস্ত সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক, আর দরুদ ও সালাম পেশ করছি নবী ও রাসূলদের শিরোমণি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি, আর তার সাহাবায়ে কিরাম ও কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাদের সঠিক অনুসারীবৃন্দের প্রতি।

আল্লাহর খাস রহমত যে, তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য এমন কিছু মওসুম নির্ধারণ করে দিয়েছেন যাতে নেক আমল করে তারা তাদের আমলসমূহ বর্ধিত করে নিবে, এ সমস্ত মওসুমের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি মওসুম হলোঃ

জ্বিলহজ্জের প্রথম দশ দিন

এখানে আমি কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এ দিনগুলোর ফযীলত ও করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করব।

১. আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনে এ দিনগুলোর শপথ করে এগুলোর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা কোন কিছুর উপর ঐ সময়ই শপথ করেন যখন তার মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশী হয়। তাই আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ

﴿ وَالْفَجْرِ * وَلَيَالٍ عَشْرٍ ﴾ [سورة الفجر: 1-2]

অর্থাৎ, "ফজরের সময়ের শপথ, আরও শপথ দশ রাত্রির"। [সূরা আল-ফাজরঃ ১-২]

আল্লামা ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ এ আয়াতে জ্বিলহজ্বের প্রথম দশ দিন উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

২. অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কোরআনে এ দিনগুলোতে বেশী করে তার যিক্র করার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি বলেনঃ

﴿ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ ﴾ [سورة الحج: 28]

অর্থাৎ, "আর তারা যেন আল্লাহকে নির্দিষ্ট কিছু দিন স্মরণ করে"। [সুরা আল-হাজ্জঃ ২৮]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এর তাফসীরে বলেনঃ আয়াতের এ অংশ দ্বারা জ্বিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন বুঝানো হয়েছে।

৩. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "এ দশ দিনে অনুষ্ঠিত যে কোন নেক কাজের চেয়ে উৎকৃষ্ট আর কোন দিনে কোন নেক কাজ হতে পারে না"। সাহাবায়ে কিরাম প্রশ্ন করলেনঃ এমনকি জিহাদও এর মত নয়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ "জিহাদও এর সমপর্যায়ের নয়, অবশ্য যদি কেউ এমনভাবে জিহাদে বের হয় যাতে নিজের জান মাল সব কিছুই ব্যয় করেছে, তারপর আর কিছু নিয়ে ফিরে আসেনি" (তাহলে এমন ব্যক্তির মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে)। [বুখারীঃ হাদীস নং- ৯৬৯, আবু দাঊদঃ ২৪৩, তিরমিযীঃ ৭৫৭,৭৫৮, ইবনে মাজাহঃ ১৭২৭, ১৭২৮, দারেমীঃ ১৭৭৩, ১৭৭৪]।

৪. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "এ দশ দিনে অনুষ্ঠিত যে কোন নেক কাজ অন্যান্য সময়ে কৃত অন্য কোন নেক কাজের চেয়ে আল্লাহর কাছে অনেক বেশী মর্যাদাসম্পন্ন, এবং বেশী প্রিয়। সুতরাং তোমরা এ দিনগুলোতে বেশী করে তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠ কর"। [ইমাম আহমাদ তার মুসনাদেঃ ২/৭৫,১৩১]।

৫. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আল্লাহর নিকট সবচেয়ে মহান দিন হলো কুরবানীর দিন, তারপর (মীনায়) অবস্থানের দিন" [আবু দাউদঃ ১৭৬৫]

এখানে কুরবানীর দিন হলো দশ তারিখ, আর অবস্থানের দিন হলোঃ আইয়ামে তাশরীকের দিন তথা এগার, বার, এবং তেরই জ্বিলহজ্জ।

৬. সা'ঈদ ইবনি জুবাইর রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ দশ দিনে ইবাদত করতে করতে অপারগ হয়ে যেতেন। [দারেমীঃ ১৭৭৪ হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন]।

৭. আল্লামা ইবনে হাজার রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ এ দশদিনের এত ফযীলতের কারণ আমার কাছে যা স্পষ্ট হচ্ছে তা হলোঃ এ দিনগুলোতে যাবতীয় বড় বড় ইবাদাতসমূহ একত্রিত হয়ে থাকে, যেমনঃ সালাত, রোজা, সাদকাহ তথা দান খয়রাত, এবং হজ্জ। এ দিনগুলো ছাড়া অন্য সময়ে এত ইবাদাত একত্র হয়না। [ফাতহুলবারী ২/৫৩৪]

৮. আলেমগণ বলেনঃ যাবতীয় দিনের মধ্যে জ্বিলহজ্জের প্রথম দশদিন সবচেয়ে উত্তম দিন, আর যাবতীয় রাত্রিসমূহের মধ্যে রমজানের শেষ দশ রাত্রি উত্তম রাত্রি।

এ দিনগুলোতে একজন মুমিনের কী কী করণীয়

১. হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় করাঃ এ দিনগুলোতে সবচেয়ে উত্তম কাজ হলোঃ হজ্জ ও উমরাহ্ আদায় করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ "এক উমরাহ্ থেকে আরেক উমরাহ্ এ দুইয়ের মাঝখানের যত গুনাহ আছে মিটিয়ে দেয়, আর আল্লাহর নিকট মাকবুল হজ্জের একমাত্র পুরষ্কার হলো জান্নাত" [বুখারীঃ ১৭৭৩, মুসলিমঃ ১৩৪৯]।

২. সালাতঃ বেশী বেশী নফল সালাত আদায় করা, বিশেষ করে সালাতের জন্য আগে আগে হাযির হওয়া। এমনিতেই সালাত অতি উত্তম কাজ, তার উপর রয়েছে এ সময়ের ইবাদাত। মূলতঃ যে কোন ফযীলতের সময়ের ইবাদাত অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশী সওয়াবের কারণ। সাহাবী সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "তুমি বেশী বেশী সিজদা (সালাত আদায়) করবে, কেননা তোমার একটি সিজদা তোমাকে এক নতুন মর্যাদায় উন্নীত করবে, আর তোমার একটি গুনাহ থেকে তোমাকে মুক্তি দিবে"। [মুসলিমঃ ৪৮৮]।

৩. সাওম বা রোজাঃ এ দিনগুলোতে সাওম পালন করা মুস্তাহাব। কেননা, সাওম এমনিতেই সওয়াবের কাজ, তদুপরি তা সংঘটিত হচ্ছে অতি উত্তম সময়ে। সাহাবী হুনাইদা বিন খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন এক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন যে, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জ্বিলহজ্জের নয় তারিখ, আশুরার দিন, এবং প্রতি মাসে তিন দিন সাওম পালন করতেন"। [ইমাম আহমাদ তার মুসনাদেঃ ৫/২৭২, আবুদাউদঃ ২৪৩৭, নাসায়ীঃ ২৩৭২, ২৪১৭]। ইমাম নববী বলেনঃ এ দশদিন রোজা রাখা মুস্তাহাব।

বিশেষ করে হাজী সাহেব ব্যতীত অন্য সবার জন্য জিলহজ্জের নয় তারিখ সাওম পালন করার যে বিরাট ফযীলত তা বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি এই দিনের সাওম রাখা সম্পর্কে বলেছেনঃ "আমি আল্লাহর কাছে আশা করবো তিনি এ দিনের সাওমের কারণে পূর্ববতী এবং পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন"। [মুসলিমঃ ১১৬২, আবু দাঊদঃ ২৪২৫, তিরমিযীঃ ৭৫৯]

৪. বেশী বেশী করে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলি্লাহ, আল্লাহু আকবার পাঠ করাঃ কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দিনগুলোতে বেশী বেশী করে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলি্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সম্পর্কিত হাদীস পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ "ইবনে উমর এবং আবুহুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা জ্বিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিন তাকবীর দিতে দিতে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হতেন, আর লোকেরা তাদের তাকবীর শুনে তাকবীর দিতেন"। [সহীহ বুখারীঃ কিতাবুল 'ঈদাইন, বাবঃ ফাদ্বলুল 'আমালি ফী আইয়ামিত তাশরীক্ব] তিনি আরো বলেনঃ "ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিনায় তার তাঁবুতে এমনভাবে তাকবীর বলতেন যে, মসজিদেও তা শুনা যেত, ফলে মসজিদে অবস্থানকারীগণও তার তাকবীর শুনে এমনভাবে তাকবীর দিতেন যে, সমস্ত মিনা তাকবীর ধ্বনীতে প্রকম্পিত হত"। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা মিনাতে এ দিনগুলিতে তাকবীর দিতেন, প্রত্যেক সালাতের পরে, শয্যা গ্রহণের সময়ে, তাঁবুতে অবস্থানকালীন সময়ে, বৈঠকখানায়, হাঁটা চলার সময়, সর্বাবস্থায়।

এ তাকবীর উচ্চ স্বরে দেয়া মুস্তাহাব, যেমনটি ইবনে উমার, এবং আবুহুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত হয়েছে। তবে একসাথে সমস্বরে তাকবীর দেয়া যেহেতু হাদীসে বা সালফে সালেহীনের আমল দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি, সেহেতু সমস্বরে তাকবীর দেয়া যাবে না। তবে যদি কাউকে শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য হয় তা ভিন্ন কথা।

কুরআন ও হাদীসে যত রকমের তাকবীর, তাহমীদ, তাসবীহ এসেছে সবগুলিই বলা যাবে। তবে তাবেঈনদের মধ্যে যারা ফকীহ হিসাবে প্রসিদ্ধ তাদের থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা জ্বিলহজ্জের প্রথম দশদিন যে তাকবীর পড়তেন তা হলোঃ "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ"।

এ ধরনের তাকবীর এ দিনগুলোতে সব সময়ে দেয়াই মুস্তাহাব, বিশেষ করে বাজারে, বাড়ীতে, রাস্তা-ঘাটে, অলিতে-গলিতে, মাসজিদে। তবে ফরয সালাতসমূহের জামাতের পরে দেয়া বিশেষ ভাবে নির্দিষ্ট।

হাজীদের জন্য তাকবীরের সময় হলোঃ দশ তারিখ (কুরবানির দিন) জোহরের সালাতের পর থেকে। আর যারা হাজী নন তারা তাকবীর শুরু করবেনঃ নয় তারিখ (আরাফার দিন) ফজরের সালাতের পর থেকে। প্রত্যেকের জন্যই এই নির্দিষ্ট তাকবীরের সময়সীমা তের তারিখ (আইয়ামে তাশরীকের শেষ দিন) আসরের সালাতের পর পর্যন্ত নির্ধারিত।

৫. কুরবানী করাঃ আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিজের হালাল মাল থেকে কোরবানীর পশু কিনে তা জবাই করা।

৬. তাওবা করা, যাবতীয় গুনাহ থেকে নিবৃত হওয়াঃ যাতে করে আল্লাহর রহমাতের অধিকারী হতে পারে। কেননা, গুনাহ মানুষকে আল্লাহ থেকে দুরে সরিয়ে দেয়, আর নেক কাজ মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যায়। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ "আল্লাহ্ তা'আলা আত্মসম্মানজনিত কারণে ক্রোধান্বিত হন, আর আল্লাহর ক্রোধাগ্নি উদ্রেক করে ঐ সময় যখন কেউ তার হারামকৃত বস্তুতে উপনীত হয়"। [বুখারীঃ ৫২২৩, মুসলিমঃ ২৭৬১]

৭. বেশী বেশী করে সৎকাজ করাঃ যেমন, অতিরিক্ত পরিমাণে সালাত আদায়, সাদাকা প্রদান, জিহাদে অংশ গ্রহণ, কুরআন পাঠ, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের থেকে মানুষকে নিষেধ করা। কেননা, এই সমস্ত নেক কাজ বেশী বেশী সওয়াবের অধিকারী করে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম এ দিনগুলোতে বেশী বেশী সৎকাজ করে তাঁর প্রিয় বান্দা হবার তাওফীক দান করুন। আমীন।

সমাপ্ত

গ্রন্থনাঃ

ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এমএম (ঢাকা), লিসান্স, এমএ, এম-ফিল, পিএইচ ডি (মদীনা)

প্রভাষক, আল-ফিকহ বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ

জ্বিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ফযীলত ও আমাদের করণীয়

_________________________________

প্রকাশক:

আব্দুর রহমান ইবনু আবি বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

স্বত্ব:

লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত

প্রথম প্রকাশ

প্রকাশ কাল

যিলকা'দা - ১৪২৭ হিঃ

ডিসেম্বর - ২০০৬ ইং

অগ্রহায়ণ - ১৪১৩ বাংলা

যোগাযোগঃ

মোবাইল নং- ০১৯২৯০৫০১০

সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )