ঈসাই বা খ্রিষ্টানী ধোকা ভঞ্জন
লিখেছেন মুন্সী মেহেরউল্লা   
Thursday, 22 November 2007

(রেভারেন্ড জন্ জমিরুদ্দীন সাহেবের সাথে মুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লা মরহুমের আসল কোরআন পৃথিবীতে বর্তমান আছে কি না তা নিয়ে সুদীর্ঘ তর্কযুদ্ধ হয়েছিল। এই তর্কযুদ্ধের ফলে পাদ্রী বেভারেন্ড জন্ জমিরুদ্দীন সাহেব ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।)

১৮৯২ খৃষ্টাব্দের জুন মাসের "খ্রীষ্টীয় বান্ধব" নামক মাসিক পত্রিকায়

"আসল কোরআন কোথায়"

শীর্ষক নিম্নলিখিত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়-

"আমরা যখন মুসলমানদের নিকট সুসমাচার প্রচার করি, তখন অনেক মুসলমানই কহিয়া থাকেন যে, 'আপনাদের ধর্মশাস্ত্র পরিবর্তিত হইয়াছে। কিন্তু আমাদের কোরআন কখনই পরিবর্তিত হয় নাই। খোদাতা'লা মোহাম্মদ (সা.) এর উপর যাহা নাজিল করিয়াছিলেন অদ্যাপি অবিকল তাহাই রহিয়াছে।' আমাদের ধর্মশাস্ত্র যে কখনো পরিবর্তিত হয় নাই, একথা মুসলমানদিগকে অনেক পুস্তকে লিখিয়াছি। ..... যিনি মুসলমান শাস্ত্রে অজ্ঞ তিনিই বলেন যে, কোরআন কখনই পরিবর্তিত হয় নাই। আমরা মুসলমানদিগের হাদিস এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ হইতে প্রমাণ দিতেছি যে, আসল কোরআন বিকৃত ও পরিবর্তিত হইয়াছে। সুতরাং মুসলমানদিগের হস্তে এখন আসল কোরআন নাই।

 

(১) কোরআন মোহাম্মদ (সা.) এর সময় একত্র সংগৃহীত হয় নাই। দেখ- "তির্মিক্ত" -সুন্নী মুসলমানদের হাদি।

(২) মোহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পর খলিফা আবু বকর (রাজি:) জায়েদ দ্বারা কোরআন শরিফের সূরাগুলি একত্র এবং শৃঙ্খলাবন্ধ করিয়াছিলেন। দেখ- "বোখারী" গ্রন্থে।

(৩) ওসমান (রাজি:) দুইবার কোরআন দগ্ধ করেন। দেখ - "মেশকাত উল মশাবী"।

(৪) শিয়া সম্প্রদায় কহিতেছেন যে, কোরআন আলীর (রাজি:) এবং তাঁহার বংশের মাহাত্ম্যের বিষয় অনেক কথা লেখা ছিল। কিন্তু কাফের ওসমান (রাজি:) তাহা কোরআন শরিফ হইতে উদ্ধৃত করিয়া দগ্ধ করিয়া ফেলিয়া দিলেন। দেখ - "নহল আলবলায়েত" এবং শিয়াদিগের হাদিস। কলিকাতা, দিল্লী, এলাহাবাদ প্রভৃতি ভারতের নানা নগরে শিয়াগণ বাস করিতেছেন, তাঁহাদিগকে একবার জিজ্ঞাসা কর।

(৫) এমাম জাফর কহিতেছেন যে- সূরা আহজাবে কোরেশের স্ত্রী ও পুরুষের ভ্রষ্টতার বিষয় বর্ণিত ছিল; ঐ সূরাটি সূরা বকর হইতে বড়। দেখ- "আইনুল হক" গ্রন্থের দুইশত আট ওরকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠা। আনিস এবনে মালিক কহিতেছেন, যখন আর্মেনিয়ায় সুরীয় দেশের লোকদিগের সহিত আজার মিজান ইরাফ লোকদিগের যুদ্ধ হইতেছিল, তখন হাফিজা এবনে ইমান ওসমানের (রাজি:) নিকট আসিয়া কোরআন পাঠকের পাঠে অমিল হইবে এইরূপ ভয় করিয়া কহিল, - হে বিশ্বাসী লোকের পথ প্রদর্শক, শিষ্যদিগের তথ্য লউন। পাছে তাহারা ইহুদী ও নাছারাদিগের ন্যায় শাস্ত্রে গোলযোগ উৎপন্ন করে। তাহাতে ওসমান (রাজি:) হাফিজার [মোহাম্মদ (সা.) এর স্ত্রী] নিকট লোক প্রেরণ করিয়া কহিলেন যে, -তুমি কোরআনের হস্তলিপিখানি আমার নিকট পাঠাইয়া দাও। আমরা নকল করিয়া ইহা তোমার নিকট পুনরায় পাঠাইয়া দিব। তখন ওসমান (রাজি:) জায়েদ ইবনে শাবিত, আব্দুল্লাহ এবনে জবির এবং হারিত ইবনে ইমাম এই তিনজনকে আদেশ দিলেন যে, তোমরা উহা নকল কর। তাহারা উহা নকল করিলেন। আর ওসমান (রাজি:) উক্ত তিনজনকে কহিলেন - যখন তোমাদের এবং জায়েদের কোরআনের সঙ্গে পরস্পর অমিল হইবে, তখন তাহা কোরেশের ভাষায় লিখিও। কারণ কোরআন এই ভাষায় নাজেল হইয়াছে। তাঁহারা ঠিক সেইরূপ করিলেন। খাতাটা নকল হইয়া গেলে, ওসমান (রাজি:) পুনরায় তাহা জায়েদের নিকট পাঠাইয়া দিলেন। আর যাহা লেখা হইল, তাহার একখানি প্রতিলিপি নানা প্রদেশে পাঠাইয়া দেওয়া হইল এবং পূর্বকার যত খাতা ছিল, তাহা দগ্ধ করিবার আদেশ দিলেন। দেখ, - বোখারী-সুন্নিদিগের হাদীস গ্রন্থ।

(৬) সকল মোসলমানই জানেন যে, মোহাম্মদ (সা.) স্বয়ং নিরক্ষর অর্থাৎ বিদ্যাহীন লোক ছিলেন। উক্ত আছে যে, যখন কোরআনের আয়াত সকল মোহাম্মদ (সা.) এর উপর নাজিল হইত, তখন হাফেজরা তাহা মুখস্ত করিয়া রাখিত। আবার কখনো চর্মে, খোরমা পত্র প্রভৃতি বস্তুতে লিখিয়া একটা বাক্সে ফেলিয়া রাখা হইত। যাহা লিখিত হইত, তাহা মুখস্ত হইত না, আবার যাহা মুখস্ত হইত তাহা লিখিত হইত না। এই প্রকারে ২৩ বৎসর মধ্যে কোরআন নাজেল শেষ হয়। সকলেই জানেন, মুখস্ত করা অনেক সময় বেঠিক হইয়া থাকে, হাফেজরা ভুল করিলে মোহাম্মদ (সা.) এর ধরিবার সাধ্য ছিল না। ইহাতে(১) দেখা যাইতেছে যে নিশ্চয় আসল কোরআন নাই। এখনকার মুসলমানদিগের হস্তে যাহা আছে, তাহা নকল এবং সংশোধিত কোরআন। আমরা এসম্বন্ধে আরও অনেক প্রমাণ দিতে পারি, কিন্তু অধিক লেখা বাহুল্যমাত্র এবং "খ্রীষ্টীয় বান্ধব" সম্পাদক মহাশয়ের অনুরোধ এই, "প্রবন্ধটি যেন অতিশয় দীর্ঘ না হয়।" অতএব আমরা এখন মুসলমানদিগের নিকট উক্ত ছয়টি প্রমাণ প্রদর্শন করিয়া নি:সন্দেহে জিজ্ঞাসা করিতে পারি, আপনাদিগের আসল কোরআন শরিফ কোথায়?

মাদ্রাছায়ে ইলমে ইলাহী

এলাহাবাদ

৮-৮-১৯৮২ ইং

শ্রীজন্ জমিরুদ্দীন শেখ

আসল কোরআন কোথায়? প্রবন্ধের প্রুফ দেখিবার দোষে কয়েকটি ভুল থাকে। পরে ১৮৯২ সালের জুলাই মাসের খ্রীষ্টীয় বান্ধবে উহার সংশোধন হয়। সেই পত্রখানি এই-

 

আসল কোরআন কোথায়?

ভ্রম সংশোধন-

"তালিম মহম্মদ" স্থানে "তালিম মহম্মদী", "তীর্ম্মিক্তি" স্থানে "তীর্মিজি", "মিশকাউল মাবি" স্থানে- "মিশকাতউল মশাবী", "নহল আলবলায়েত" স্থানে "নহল আলবলাগত" হইবে।

অনুগ্রহ পূর্বক সংশোধন করিবেন, নতুবা অনেক গোলযোগ হইবার সম্ভাবনা।

জে, জে, শেখ

এলাহাবাদ।

শেখ জমিরুদ্দীন সাহবের প্রবন্ধ পাঠ করিয়া মুন্সী মোহাম্মদ মেহেরউল্লাহ সাহেব যে প্রতিবাদ করিয়াছিলেন তাহা এই-

 

ঈসাই বা খ্রীষ্টানী ধোকা ভঞ্জন

(সুধাকর সম্পাদকের প্রতি),

পরম শ্রদ্ধাস্পদ ও মহামান্য সম্পাদক সাহেব। নিম্নোক্ত বিষয়টি আপনার সুবিখ্যাত পত্রিকায় প্রকাশ করতঃ বিজাতীয় আক্রমণের প্রতিকার ও ইসলাম সমাজের ব্যথিত-হৃদয় আনন্দিত করিবেন। বিষয়টি এই-

বিগত ১৮৯২ সালের জুন মাসের “খ্রীষ্টিয় বান্ধব" পত্রিকার ১৩০ পৃষ্ঠায় 'আসল কোরআন কোথায়' শীর্ষক ধোঁকাপূর্ণ একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ মুদ্রিত হইয়াছে। উহার লেখক জন জমিরুদ্দীন শেখ মহাশয় পাদ্রী ফান্ডার কৃত মিজানউল-হক ও (উর্দু) পাদ্রি আমানুদ্দীন প্রণীত 'তালিমে মোহাম্মদী (উর্দু) এবং পাদ্রি য্যাকব কান্তিনাথ বিশ্বাস কৃত 'এসলাম দর্শন (বাঙ্গালা) ইত্যাদি গ্রন্থসমূহের আশ্রয় লইয়া সংশয়শূণ্য মহাকোরআনের প্রতি অযথা আক্রমণ ও ব্যঙ্গোক্তি করিয়া বোধকরি ঈসাই সমাজের 'ট্যাংরা বাবুদের' নিকট অগণ্য ধন্যবাদও পাইয়াছেন। তিনি উক্ত গ্রন্থদ্বয় পাঠের ঈদৃশ চেতনাশূণ্য হইয়া পড়িয়াছেন যে, ঈসাই শাস্ত্রের সত্যতা ও ইসলাম শাস্ত্রের অসত্যতা প্রমাণ দর্শাইবার জন্যই সমূদয় মুসলমান ভাইকেই ঐ পুস্তক পাঠ করিতে অনুরোধ করিয়াছেন। আমরা বলি ভায়া! ইহার অনেক দিন পূর্বে মুসলমানগণ উহা পাঠ করিয়াছেন। যেদিন খ্রীষ্টানদিগের তর্কবাগীশ মুরব্বী ফন্ডার সাহেব 'মিজান-উল-হক' জনসমাজে প্রকাশ করিলেন, তাহার পরদিনই মুসলমান ধর্মবীর স্বর্গীয় মওলানা রহমাতুল্লা উহার দান্দানশেকেস্ত প্রতিবাদ ('রদ্দে মিজানউল মিজান', এজাযে ইছবি' নামক গ্রন্থদ্বয়) প্রচার করিয়াছিলেন। উক্ত প্রতিবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হইলেও ফান্ডার সাহেব অনেকদিন জীবিত ছিলেন, কিন্তু উহার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করিতেও পাদ্রি সাহেবের শক্তি অপারগ ছিল। পাদ্রি আমানুদ্দীন ও তৎপ্রণীত 'তালিমে মোহাম্মদী' জন্ সাহেবের দ্বিতীয় আশ্রয়। কিন্তু কানপুর নিবাসী মৌলভী মোহাম্মদ আলি সাহেব কর্তৃক তাহার পুস্তবের যে কঠোর প্রতিবাদ হইয়াছে, শেখজীর নজরে তাহা কি ('মিরাতুল একিন' নামক গ্রন্থখানি) আজিও পড়ে নাই? যদিও বঙ্গীয় মুসলমানদিগের কাপুরুষতা ও নির্জ্জীবতা হেতু পাদ্রি য্যাকব কান্তিনাথ বিশ্বাস কৃত 'ইসলাম দর্শনে'র প্রতিবাদ বঙ্গ ভাষায় আজিও সম্পাদিত হয় নাই, তথাপি উর্দু ও ফার্সি ভাষাতে উহার শত শত প্রতিবাদ পুস্তক বর্তমান এবং যেদিন তাহা বঙ্গভাষায় সম্পন্ন হইবে, খোদা চাহে ত সেদিন অতি নিকটবর্তী। দ্বিতীয়ত 'ইসলাম দর্শনে' এমন কোন বিষয় নাই, যাহা পাদ্রী ফান্ডার সাহেব রচিত গ্রন্থ সমূহে মুদ্রিত করে নাই এবং পাদ্রী ফান্ডারের এমন কোন প্রশ্ন নাই, ধর্মবীর মওলানা রহমতউল্লা সাহেব যাহার যুক্তি ও শাস্ত্র সঙ্গত ৪০টি করিয়া উত্তর না লিখিয়াছেন।

খ্রিষ্টভক্ত শেখ মহাশয় জগতের যাবতীয় কোরআন বিশ্বাসী মুসলমানকে অজ্ঞ বা মূর্খ বলিতে কসুর করেন নাই। তিনি লিখিয়াছেন- 'যিনি মুসলমান শাস্ত্রে অজ্ঞ তিনিই বলেন যে কোরআন কখনও পরিবর্তিত হয় নাই।' আহা! খ্রিষ্টভক্তের কি অদ্ভুত শিক্ষা! নইলে কি মহাশয়ের এত অভিজ্ঞতা? হায়? যে মহাকোরআনের বিমালোকে আজ ভূমন্ডল আলোময়, খ্রীষ্টশিষ্যের চক্ষে তাহা অন্ধকার কেন? সে দোষ কার? ঐ যে চর্ম চটিকা দিবসে দেখিতে পায় না, সে জন্য সূর্যের কোন অপরাধ নাই। ঈসাই ভাষার ও প্রচার বাক্য-চাতুর্যে আমাদের মন:ক্ষুন্ন হইবার ত কোনই কারন নাই; কেননা তাহাদের ধর্মশাস্ত্র বাইবেলে যখন সেই জগতকারণ করুনাময় বিশ্বপতি খোদাতা'লার প্রতি প্রলাপ, অজ্ঞ, দুর্বল, নাদান এবং কমজোরি শব্দসমূহ ব্যবহৃত হইয়াছে (বাইবেল ১ম কর পুস্তক অধ্যায় ২৫ দেখ) তখন উক্ত শাস্ত্রধারিগণ সেই খোদা-প্রেমিক মুসলমানকে অজ্ঞ বলিবেন না কেন? যাক্ সে কথা; এখন ঈসাই ভায়া ফান্ডারী ফন্ড্ হইতে যে ৬টি ধোকা নকল করিয়া আবার সদর্পে উহার উত্তরপ্রার্থী হইয়াছেন পাঠক, কিঞ্চিত ধীরচিত্তে তাহার বাদ-প্রতিবাদ বিচার করুন।

 

উত্তর:

 

প্রথম তিনটি প্রমাণ দ্বারা খ্রিষ্টান বন্ধুর কোন্ বাসনা পূর্ণ হইল, তাহা ত বুঝিলাম না

। আমরাও স্বীকার করি, হযরতের বর্তমানে মহা কোরআনের লিখিত অংশগুলি একত্র সংগৃহীত হয় নাই; সমুদয় কোরআন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে লেখা ছিল। কিন্তু মহা কোরআনের কোন একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হইতে না পারে, এই উদ্দেশ্য হযরত স্বয়ং সহস্রাধিক হাফেজ (কোরআন কন্ঠস্থকারী) প্রস্তুত করিয়া স্বর্গধামে গমন করেন। শেখজী দ্বিতীয় ধোকাতে বোখারী হাদিস শরীফের নাম করিয়া, উহার অর্থ প্রকাশের বেলায় ঘোমটার তলে মুখ লুকাইয়াছেন, নতুবা বিজ্ঞ পাঠকবর্গ শেখজীর নিজের লেখাতেই মহা কোরআনের আসলত্বের প্রমাণ পাইতেন। পাঠকের কৌতুহল নিবারণার্থে জন্ সাহেবের মানিত হাদিসটির মর্ম প্রকাশ করিতেছি,- খলিফা আবুবকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) একত্রে এই পরামর্শ স্থির করিলেন যে, যদি অন্যান্য যুদ্ধে এই প্রকার হাফেজ শহীদ হন ও দেশ হাফেজশূণ্য হয়, তবে ভবিষ্যতে সম্ভবত কোরআনের কোন অংশ গোলমাল হইলেও হইতে পারে; অতএব যাহাতে ঈদৃশ আশঙ্কা কোন সময়েই না থাকে, এখনই তাহার ব্যবস্থা করা দরকার। (এই পরামর্শনুযায়ী) তাঁহারা যুদ্ধস্থল হইতে সুলেখক জায়েদকে আহ্বান করতঃ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে খোরমাপত্র ইত্যাদিকে লিখিত সূরাগুলি উদ্ধৃত ও হাফেজদিগের দ্বারা উহা শৃঙ্খলাবদ্ধ করাইলেন।(২) (বোখারী শরীফ)

প্রিয় পাঠক! খ্রিষ্টান সাহেবের মানিত হাদিসটিই আসলত্বের পাকা প্রমাণ কিনা তাহা বিচার করুন। মহা কোরআনকে অক্ষুন্ন রাখিতে মুসলমান খলিফাগণ কতদূর তৎপর ছিলেন, উক্ত হাদিসটি তাহার জ্বলন্ত নিদর্শন।

তৃতীয় ধোকায় ঈসাই সাহেব ওসমানের (রা.) "কোরআন দগ্ধ কোরআন দগ্ধ" করিয়া হঠাৎ "মিশকাতুল মাবি" এই একটি উৎকৃষ্ট উৎভঙ্গি ও স্বীয় গৃহগঠিত নামের আবিস্কার করিয়া ভয়ানক বীরত্ব প্রকাশ করিয়াছেন। কেননা আজিও ইসলাম-জগতে উক্ত নামে কোন গ্রন্থ নাই, তবে 'মিশকাতুল মসাবি' নামক হাদিস শরিফ আছে(৩)।স্বয়ং সর্বশক্তিমান খোদাতালা যখন স্বীয় উক্তে বলিয়াছেন যে, আমিই কোরআনের সংরক্ষক (সূরা হেজর-৯ আয়াত), তখন কোন মানুষের শক্তি যে, সেই কোরআনকে দগ্ধ করিতে পারে? হযরত? ওসমান (রাজি:) কি দগ্ধ করিয়াছেন তাহাও পাঠক শুনুন।

যে কোন কাগজ বা বৃক্ষপত্র হউক, যাহাতে কোরআন আয়াত বা খোদাতালার নামাঙ্কিত থাকে, উহাকে যথোচিত সম্মান করা শাস্ত্রের দৃঢ় আদেশ; তাই যখন হযরত ওসমান (রা.) দেখিলেন যে, কোরআনের বহুতর আয়াত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খোরমাপত্রাদিতে লিখিত আছে, এবং সমুদয় কোরআনও এক্ষণে খৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া গিয়াছে, তখন তিনি ভাবিলেন, যে ঐ ক্ষুদ্রপত্রগুলির আর কোন আবশ্যকতা নাই এবং পত্রগুলি সাবধানে রাখাও দুরূহ। কোনক্রমে যি এগুলি কদর্য স্থানে পড়িয়া বিনষ্ট হয়, তাহা শাস্ত্রবিরুদ্ধ; সুতরাং পত্রগুলি দগ্ধ করিয়া ফেলিলে, আর সে আশঙ্কা থাকিবে না। এই উদ্দেশ্যে তিনি সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পত্রগুলি দগ্ধ করিবার আদেশ দেন। তাহা নিরপেক্ষ পাঠক বর্গের বিচারাধীন।

 

শেখজীর চতুর্থ ধোকার উত্তর

(১) খ্রিষ্টভক্তকে আমরা ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারিলাম না; কেননা, ঝটপট একটা 'ইটাতল হাদিসের' নামাবিস্কার করাও ভারি অভিজ্ঞতার লক্ষণ। শিয়াদিগের মধ্যে উক্ত নামের কোন গ্রন্থই নাই; জন সাহেব যখন সেই নামটির আবিস্কারক, তখন তিনি অশেষ ধন্যবাদের পাত্র।

(২) শিয়াদিগের কোন প্রামাণিক পুস্তকেই হযরত ওসমানের (রা.) প্রতি "কাফের" শব্দ ব্যবহৃত হয় নাই এবং আজিও কোন শিক্ষিত শিয়ার মুখ হইতে ঈদুশ কুৎসিত বাক্য নির্গত হয় নাই। তবে যদি ভায়া কোনদিন কোন ষন্ডা-গুন্ডা শিয়ার মুখে এরূপ শুনিয়া থাকেন, তবে প্রোটেষ্ট্যান্ট-গুরু পাদ্রী লুথারের প্রতি রোমান মন্ডলীর সুধামাখা বোলগুলি স্মরণ করিতে অনুরোধ করি। কলিকাতা ও অন্যান্য স্থানের রোমান খ্রীষ্টানদিগের নিকট তিনি জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহারা একবাক্যে বলিবেন যে, পাদ্রী লুথার ও প্রোটেষ্ট্যান্ট খ্রীষ্টানগণ বাইবেলের অনেক অংশ বাদ দিয়াছেন।

(৩)হযরত ওসমান (রা.) সম্বন্ধে শিয়াদের কোন প্রামাণিক গ্রন্থেই "কাফের" শব্দ ব্যবহৃত হয় নাই; বরং তাঁহার প্রতি শিয়াদিগের শিরোধার্য ও সর্বপ্রধান "হেঞ্জাল বালাগতাহ্" নামক গ্রন্থ কি লিখিত আছে তাহা দেখ - "খোদাতা'লার অনুগ্রহবর্তুক হযরত ওসমান (রা.) ও হযরত ওমরের (রা.) প্রতি, কেননা নিশ্চয় তাঁহারা বক্রপথের পথিকদিগকে সোজা ও সরল পথের পান্থ করিয়াছেন এবং কুসংস্কার সমূহকে সমূলে উচ্ছেদ করত, সুসংস্কার ও দীনে-মোহাম্মদী বা সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন।' 'কাশফল গামতাহ্' নামক গ্রন্থখানিতেও মহাপুরুষ ওসমান (রা.) সম্বন্ধে ঐ প্রকার বর্ণিত আছে। শিয়াদিগের শিরোধার্য গ্রন্থসমূহে যখন মহাত্মা ওসমানের (রা.) প্রতি ঈদৃষ মহাত্ম্যপূর্ণ রচনাবলী বর্তমান, তখন সেই শিয়াদিগের স্কন্ধে ভর করিয়া যদি কেহ হযরত ওসমান (রা.) কে দোষী করিতে চান, সেটা তাঁহার বাতুলতা বা সারশূন্য ধোকা বই আর কি?

 

জন সাহেবের পঞ্চম ধোকা

"ইমাম জাফর কহিতেছেন যে, সূরা আহযাবে কোরেশের পুরুষ ও স্ত্রীদিগের ভ্রষ্টতার বিষয় বর্ণিত ছিল। এ-সূরাটি সূরা বাকারা হইতে বড়"। দেখ- 'আয়ন-উল-হক' গ্রন্থের ২০৮ ওরক।

 

উত্তর:

(১) 'আয়ন-উল-হক' নামক গ্রন্থের ঈদৃশ কোন কথা লেখা নাই। জনৈক বিকৃতমনা শিয়া 'আয়নুল হায়াত' নামক একখানি খামখেয়ালী পুস্তকে ঐরূপ ভিত্তি ও প্রমাণশূণ্য কয়েকটা প্রলাপোক্তি করিয়াছিল সত্য; কিন্তু উক্ত পুস্তক প্রকাশ হওয়া মাত্রই যে স্বয়ং শিয়া পন্ডিতগণই উহার কঠোর প্রতিবাদ ও সেই ভন্ড শিয়াটাকে সম্পূর্ণ প্রতারক নির্দেশ করিয়াছিলেন, শেখ মহাশয় কি তাহা শুনেন নাই?

(২) কোরআন সম্বন্ধে যে-কোন বিষয়ই হউক না কেন, প্রামাণিক হাদিস বিরুদ্ধ হইলেই তাহা অগ্রাহ্য; সুতরাং সুতরাং আয়নুল হায়াত-প্রণেতা যখন হাদিস হইতে কোনই প্রমাণ দিতে পারেন নাই, তখন তাঁহার কথা বাতুলতা মাত্র।

(৩) আবূ জাফর্ সাহেব কখনই ঐ কথা বলেন নাই, উহা সম্পূর্ণ সেই ভন্ড শিয়াটার প্রতারণা। আবু জাফর সাহেবের স্বরচিত গ্রন্থই এ-বিষয়ের জ্বলন্ত প্রমাণ প্রদর্শন করিতেছে। "এৎক্কাদাৎ" নামক যে গ্রন্থখানি আজিও শিয়া সম্প্রদায়ের শিরোধার্য, সেই গ্রন্থে তিনি স্বয়ং বলিতেছেন যে, "কোরআনের প্রতি আমার বিশ্বাস এইরূপ,- আল্লাহতালা স্বীয় প্রেরিত হযরত মোহাম্মদের (সা.) প্রতি যে কোরআন অবতীর্ণ (নাজেল) করিয়াছেন, তাহা দুইটি উৎকৃষ্ট প্রণালীতে (লিখিত ও কন্ঠস্থ) বর্তমান লোকদিগের নিকট পাওয়া যায়। ইহা অপেক্ষা কম বা বেশী নয়। কিন্তু অন্যের নিকট কূরা আলামনাশরা ও অদ্দোহা পৃথক পৃথক দুইটি সূরা। উহা আমার বিবেচনায় (উভয় মিলিয়া) একটা সূরা। এতভিন্ন যে কেহ আমার সম্বন্ধে বলে যে আমি বলি, 'কোরআনে ইহা অপেক্ষা বেশি ছিল' সে প্রকাশ্য প্রতারক"। আবু জাফর প্রণীত এৎক্কাবাৎ গ্রন্থ।

প্রিয় পাঠক, যে আবূ জাফর সাহেব বর্তমান কোরআনের একটি অক্ষর বা আকার একারেরও কমবেশী স্বীকার করেন নাই, সেই মহাপুরুষের মাথায় এতবড় দোষ চাপাইয়া যাহারা সুপথগামীকে বিপথগামী করিতে চেষ্টিত, তাহার কোন্ নামে অভিহিত হইবার যোগ্য, তাহার মীমাংসা আপনারাই করুন। ধোকাবাজ খ্রীষ্টানগণ কোরআনের বিরুদ্ধে বক্তৃতাকালে সর্বদাই শিয়াদিগের মাথায় ভর দিয়া নানা প্রকার ব্যঙ্গোক্তি করিয়া থাকে। এজন্য সৈয়দ মুরতজা নামক একজন প্রবীণ শিয়া পন্ডিতের মত নিম্নে উদ্ধৃত হইল। শিয়া শিরোধার্য "জামেউল-বয়ান" নামক গ্রন্থে উক্ত মহাত্মা লিখিয়াছেন- "নিশ্চয়ই কোরআনের এলেম একটি অত্যাশ্চর্য বিষয়; নিশ্চয়ই আরবীয় ওলামাগণ (পন্ডিতমন্ডলী) স্বীয় শাস্ত্র মহা কোরআনকে পৃথিবীতে অক্ষুন্ন রাখিতে সর্বোন্নত স্থানের অধিকারী। যেহেতু কোরআন প্রেরিতত্বের (নবুয়তের) একটি পূর্ণ মোজেজা (নিদর্শন), সুতরাং কোরআন শরিফই ব্যভস্থা, বিজ্ঞান, ঐহিক এবং পার্মার্থিক বিষয়ক শিক্ষার মূল। মুসলিম ওলামাগণ কোরআনকে ঈদৃশ অক্ষুন্ন রাখিতে সক্ষম হইয়াছেন যে, উহার একটি জের জবরের ও (আকার একার) পরিবর্তন হয় নাই।'

প্রিয় ঈসাই, দেখুন, আপনাদের মানিত সাক্ষী শিয়া পন্ডিতের মুখেই কোরআনের অকৃতিমতার কি সুন্দর প্রমাণ হইল। এক্ষণেও কি আপনাদের সেই অসার স্বপ্ন ভঙ্গ হইবে না? পঞ্চম প্রশ্নে জন সাহেব যে হাদিসটির অবতারণা করিয়াছেন, তাহাই কোরআনের অপরিবর্তনীয়তার অকাট্য প্রমাণ। কিন্তু জন সাহেব হাদিসটির অনুবাদে ঠিক তাঁহাদের বাইবেলের ন্যায় "মন পোলাও" পাকাইয়া ফেলিয়াছেন। আমরা হাদিসটির যথার্থ অনুবাদ এখানে প্রকাশ করিতেছিঃ মালেকের পূত্র আনাস রাওয়ায়েত করিতেছেন- যখন ইমানের পুত্র হোজায়ফা আর্মেনিয়ার সুরিয়াবাসীদের এবং আজারবাইজানে ইরাকী সম্প্রদায়ের সহিত সংগ্রামে প্রবৃত্ত ছিলেন, তখন তিনি (ঈমানের পুত্র হোজায়ফা) কোরআন পাঠকে রপাঠোচ্চারণে অমিল হইবে এই আশঙ্কায়(৪)হযরত ওসমানের (রা.) নিকট আসিয়া কহিলেন- হে আমিরুল মুমিনিন, ইহুদী ও ঈসায়ীদের বাইবেলের ন্যায় মুসলমান শাস্ত্র (কোরআন) গোলযোগ উৎপন্ন হইবার পূর্বে(৫)মুসলিম শিষ্যগণের তত্ত্ব লউন। তখন হযরত ওসমান হাফিজার (রা.) নিকট লোক পাঠাইয়া কহিলেন, -আপনি কোরআনের হস্তলিপি আমাদের নিকট পাঠাইয়া দিবেন। আমরা উহা উদ্ধৃত করিয়া পুনরায় আপনার নিকট পাঠাইয়া দিন(৬)। হযরত হাফিজা (রা.) তৎক্ষণাৎ হস্তলিপিটি পাঠাইয়া দিলেন। তখন হযরত ওমান (রা.) সাবেতের পুত্র জায়েদ, জাবিরের পুত্র আবদুল্লাহ, আল আসের পুত্র সায়িদ এবং হাম্মামের পৌত্র ও হারেসের পুত্র আব্দুল্লাহ এই চারিজনকে(৭) তাহা নকল করিতে আদেশ দিলেন। কিন্তু আদেশ কালে বলিলেন- যখন তোমাদের সহিত (অন্য স্থানের ও বংশের) জায়েদের(৮) কোরআনের শব্দোচ্চারণের অনৈক্য হয়, তখন তাহা কোরেশের ভাষায় উচ্চারণানুযায়ী লিখিও। কারণ কোরআন শরীফ কোরেশের ভাষায় নাজিল হইয়াছে। পরে তাঁহাদের লেখা শেষ হইলে হযরত ওসমান (রা.) হস্তলিপিটি হাফিজার (রা.) নিকট পাঠাইয়া দিলেন। আর ঐরূপ এক খন্ড কোরআন লেখাইয়া প্রত্যেক দেশে প্রেরণ করিলেন। আর যে সমস্ত সহিফা/ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পত্রাদিতে বিচ্ছিন্নভাবে লেখা ছিল, তাহা দগ্ধ করিবার আদেশ দিলেন। (দেখ মেশকাত ও বোখারী।) প্রিয় পাঠক! উক্ত হাদিসটির মূলতত্ত্ব- যাহা পাদ টীকায় লিখিত হইল, কিঞ্চিত স্থিরভাবে গভীর চিত্তে পাঠ করুন; দেখিবেন, মূল কোরআনের ইহাই আসলত্বের প্রমাণ।

 

ষষ্ঠ ধোকার উত্তর

হযরত মোহাম্মদ (স.) সাধারণ বিদ্যায় নিরক্ষর ছিলেন এ-কথা সত্য, ইহা তাঁহার প্রেরিতত্বের বা নবুয়তের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ। আমরা স্বীকার করি, তিনি কোন মানুষের নিকট কোন দিন কোন বিদ্যা শিক্ষা করেন নাই। কিন্তু সেই নিরক্ষর মহাপুরুষের পবিত্র রসনাগ্র নিঃসৃত অনন্ত জ্ঞান ও যুক্তিযুক্ত এবং ব্যাকরণবিশুদ্ধ অলঙ্কারপূর্ণ রচনাবলীর নিকট যখন সমুদয় জগতের ভাষাবিদ্ বিদ্যাবাগীশ পন্ডিত মন্ডলীকে অবনত মস্তক দেখি, তখন তিনি যে নিশ্চয়ই সেই সর্বোপরিস্থ মহামহিমের প্রদত্ত বচন প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা স্থির নিশ্চয়। ... হযরত খোদাতা'লা প্রদত্ত আয়াতসমূহ বিশুদ্ধরূপে উচ্চারণ ও কন্ঠস্থ করিয়া জগৎবাসীকে শিক্ষাদানে পূর্ণ শক্তিমান হইয়াছিলেন। কোরআনের আয়াতসমূহ নাজিল হওয়া মাত্র তিনি স্বয়ং ত+সমুদয় কন্ঠস্থ করিয়া তৎক্ষনাৎ সহস্রাধিক সাহাবীগণকে তাহা মুখস্থ করাইতে প্রবৃত্ত হইতেন। আয়াতসমূহ কাহারো কাহারো তৎক্ষনাৎ মুখস্থ হইয়া যাইত; আর যাঁহাদের মুখস্থ করিতে বিলম্ব হইত, তাঁহারা তখন খোর্ম্পত্রাদিতে লিখিয়া লইতেন।

হাফেজগণ সমস্ত কোরআনই মুখস্ত করিয়া রাখিতেন॥ "যাহা লিখিত হইত তাহা মুখস্ত হইত না, আর যাহা মুখস্ত হইতো তাহা লিখিত হইত না", ইহা মিথ্যা কথা। দুই চারিজন হাফেজের মুখস্থ বিষয় বেঠিক হওয়া সম্ভব, কিন্তু যে বিষয়টি সহস্র সহস্র লোকে তখনি মুখস্থ করিত, তাহা সকলেরই বেঠিক হওয়া সম্ভবপর নহে। কোন হাফেজের কোরআন পাঠে ভুল হইলে হযরত নিজেই তাহা সংশোধন করিয়া দিতেন; কারণ তিনি নিজেই হাফেজ ছিলেন। জন সাহেবকে আমরা অনুরোধ করি, তিনি যেন এলাহাবাদী কোন হাফেজের নিকট গিয়া কোরআনের যে কোন স্থানের একটি পদ কেন, একটি আকার বা একার মাত্র ভুল করিয়া পরীক্ষা লন যে, হাফেজদিগের ভুল ধরিবার সাধ্য আছে কি না।

আশা করি, এখন বেশ বুঝা যাইতেছে যে, কোরআনের আসলত্বে কোন প্রকারেই কোন গোলমাল হয় নাই। আজ আমরা তর্করূপ রণপ্রান্তরে দন্ডায়মান হইয়া সগর্বে উচ্চঃস্বরে বলিতে পারি যে, যদি ঘটনাক্রমে একই সময়ে জগতের সমস্ত লিখিত কাগজপত্র, প্রস্তর ইত্যাদি বিলুপ্ত হইয়া যায়, তবে(৯) পৃথিবীস্থ অন্য কোন জাতির ধর্মগ্রন্থ অঙ্গহীন অবস্থায় ব্যতীত পাওয়া যাইবে না। কেবল কোরআন শাস্ত্রই সর্বাপূর্ণ অটলভাবে বিদ্যমান থাকিবে; তাহার আসলত্বের বিন্দুবিসর্গও ক্ষতি হইবে না। খ্রিষ্টান বন্ধুগণ, ধর্মতঃ বল দেখি, তোমরা বাইবেলের বলে এরূপ সাহস বাঁধিতে পার কি?

 

প্রতিবাদের উত্তর:

জন জমিরুদ্দীন সাহেব-উক্ত প্রতিবাদের উত্তরে সুধাকরে একটি ক্ষুদ্র প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। উক্ত প্রবন্ধের প্রয়োজনীয় অংশ নিম্নে লিখিত হইয়াছে-

"সুদীর্ঘ প্রবন্ধটির ঠিক মর্ম অবগত না হইয়া ও আমার লিখিত ছয়টি প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর না দিয়া আমার প্রতি অনর্থক কটুক্তি প্রয়োগ কিরয়াছেন। কিন্তু তিনি সেটি বালো কাজ করেন নাই।

"পরিশেষে লিখিতব্য এই যে, কোরআন শরিফ যদি পরিবর্তিত না হইত, তবে শিয়া ও সুন্নীদিগের কোরআন শরীফে পরস্পর মিল থাকিত। সুন্নী ও শিয়া উভয় সম্প্রদায়ের কোরআন শরিফে পরস্পর মিল নাই। শিয়াদিগের কোরআনে যে সূরা আছে সুন্নীদিগের কোরআনে সেই সূরা নাই। যদি কোন মহাশয় উক্ত সূরা দেখিতে চান, তাহা হইলে পাঞ্জাবস্থ অমৃতসরে পাদ্রী শ্রীযুক্ত বেভারেন্ড মৌলভী এমাদ উদ্দীন লাহিজ ডি. ডি. সাহেবের কৃত "তহকিকল ইমান" নামক কেতাবের ৯ম পৃষ্ঠা হইতে ১১শ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পাঠ করিয়া দেখুন। উক্ত কেতাব এলাহাবাদ ও লাহোর ট্রাস্ট সোসাইটিতে পাওয়া যায়। শিয়া সম্প্রদায় মুক্তকন্ঠে সাক্ষ্য দিতেছে যে, সুন্নীদিগের কোরআন তহরিক (পরিবর্তিত) হইয়াছে। ভাই মোহাম্মদী, আপনি অনুসন্ধান করিয়া দেখুন, যাহা সম্পূর্ণ সত্য তাহা গ্রহণ করুন। তাহাতে আপনার মঙ্গল হইবে।"

শ্রীজন জমিরুদ্দীন

এলাহাবাদ

উক্ত প্রবন্ধটি প্রকাশিত হইবার পর মুন্সী মেহেরউল্লা সাহেব নিম্নলিখিত প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন।

 

সর্বত্রই আসল কোরআন

"খ্রীষ্টিয় বান্ধব" পত্রিকায় "আসল কোরআন কোথায়" শীর্ষক প্রবন্ধে মুসলমানদিগের নিকটে কোরআনের বিরুদ্ধে যে ছয়টি প্রশ্ন করা হইয়াছিল, "সুধাকরে" তাহার সমস্তগুলিই ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু প্রতিবাদী সাহেব লিখিয়াছেন, -"সুধাকরে ঈসায়ী বা খ্রিষ্টানী ধোকা নামক সুদীর্ঘ প্রবন্ধটি পাঠ করিয়া অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইলাম। প্রবন্ধ লেকক আমার লিখিত প্রবন্ধের ঠিক মর্ম অবগত না হইয়া আমার প্রতি অনর্থক কটুক্তি প্রয়োগ করিয়াছেন।"

জন সাহেবের ছয়টি প্রশ্নই অবিকল উদ্ধৃত করিয়া পদে পদে প্রতিবাদ এবং তাঁহার মানিত হাদিসসমূহের দ্বারাই বর্তমান কোরআনের আসলত্ব বা নির্ভুলতার প্রমাণ প্রদর্শন করা হইয়াছে। উত্তর লেখক তাহার কোন্ কথার ঠিক মর্ম বুঝিতে পারেন নাই, সে কথার আলোচনা না করিয়া, "আমার প্রবন্ধের মর্ম অবগত হন নাই, প্রকৃত উত্তর দেন নাই।" এবম্বিধ ভুয়া মন্তব্য ঝাড়া বা লক্ষ্যশূন্য উড়ো ফায়ার করা কি তাঁহার পক্ষে ভদ্রতাবিরুদ্ধ কাজ হয় নাই? প্রশ্নকারী হাদিসগুলির উচ্চারণ-দোষ না হয় কম্পোজিটরের মাথায় দিয়াই পার পাইলেন। কিন্তু আনাস ইবনে মালেক বর্ণিত হাদিসটির অনুবাদেও তিনি যে সুরুচি মোতাবেক খিচুড়ি পাকাইয়া ফেলিয়াছেন, সেটি কি তাঁহার হৃদযন্ত্রের জ্ঞান-কম্পোজিটরের দোষ নয়? শেখজী বোধ হয় আমার ৪র্থ ও ৫ম প্রশ্নের উত্তর কয়টি পাঠ করেন নাই, তাহা না হইলে তিনি বারংবার সেই শিয়া কাহিনীই গাইবেন কেন? তাঁহার মানিত শিয়াদিগের প্রমাণিত ও শিরোধার্য গ্রন্থসমূহের দ্বারাই ত প্রমাণিত হইয়াছে যে, বর্তমান কোরআনই আসল কোরআন।

প্রশ্নকারী শেখ মহাশয় ৪র্থ ও ৫ম প্রশ্নে শিয়াদের মাথায় হাত রাখিয়া বলিয়াছেন যে, যে সূরাটি হযরত ওসমান (রা.) কোরআন হইতে তুলিয়া দগ্ধ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহা সূরা বকর (বাকারা) হইতে বড়। পাঠক! স্মরণ রাখিবেন যে, সূরা বকরটি অন্যূন ৮০/৯০ পৃষ্ঠায় পূর্ণ। কিন্তু প্রতিবাদী ২৩শে বৈশাখের সুধাকরে লিখিয়াছেন, যে, "যদি কেহ শিয়াদিগের কোরানোক্ত সূরাটি দেখতে চান, তবে পাদ্রি আমাদুদ্দীন কৃত "তহকিকল ঈমান" পুস্তকের ৯ হইতে ১১ পৃষ্ঠা দেখুন।

আমরা বলি, সূরা বকর হইতে বড় সূরাটি অগত্যা শতাধিক পৃষ্ঠা হওয়া চাই। সেই সূরাটি পাদ্রিজি নাকি ৯ হইতে ১১ অর্থাৎ ২/৩ পৃষ্ঠায় সমাবেশ করিয়াছেন, একথার বুনিয়াদে কি পরিমাণ সত্যের সম্পর্ক আছে, তাহা আবার বুঝাইতে হইবে? ধোকা ইহার নাম!"

দ্বিতীয়তঃ প্রশ্নকারী শেখজী পূর্বেই ৪র্থ ও ৫ম প্রশ্নে স্বয়ং সাক্ষ্য দিয়াছেন যে, হযরত ওসমান (রা.) তাহা দগ্ধ করিয়া ফেলিয়া ছিলেন। দগ্ধীভূত সূরাটি পাদ্রিজি কোথায় পাইলেন? তৃতীয়তঃ এই, বিশাল বঙ্গদেশের নানা স্থানে অসংখ্য শিয়া, শিয়াদিগের পাঠ্য কোরআন বর্তমান থাকিতে সেই পাঞ্জাবস্থ জনৈক বিকৃতমনা ব্যক্তির কৃত পুস্তক যাহা সহজে পাঠকের দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব নহে, তাহার বরাত দিয়া শেখ মহাশয় ভাল করিয়াছেন কি? আমরা কিন্তু সুন্নিদিগের সহস্র সহস্র পাঠ্য কোরআন একত্র করিয়া তাহার অভিন্নতা দর্শাইতে পারি। কিন্তু একই শহরে যদি রোমান ও প্রটেষ্ট্যান্ট উভয় সম্প্রদায়ের খ্রিষ্টান থাকে, তবে তাহাদের দুই দলের বাইবেল লইয়া মিলাইয়া দেখিবেন যে, উভয় বাইবেলে সম্পূর্ণ অমিল হইবে। যিনি ল্যাটিন ভাষা না জানেন, তিনি যেন রোমান পাদ্রিকে এ-কথা জিজ্ঞাসা করেন; দেখিবেন, তিনি বলিবেন, যে, "আমাদের রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বাইবেল আজিও বঙ্গভাষায় অনুবাদিত হয় নাই।"

ঈসাই বন্ধুকে আমরা অনুরোধ করি, তিনি পৃথিবীর সমস্ত দেশের কোরআন একত্র করিয়া পরস্পর ঐক্য করিয়া দেখুন; তাহা হইলে বুঝিতে পারিবেন, তাহাদের মধ্যে বিন্দু মাত্রও পার্থক্য নাই। তাই বলি, সর্বত্রই আসল কোরআন।

মহম্মদ মেহেরউল্লা

যশোর

শেখ জমিরুদ্দীন সাহেব এই প্রবন্ধের আর কোনই উত্তর দিতে পারেন নাই। এ ঘটনার অল্প পরেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

 

শেখ জমিরুদ্দীনের মুসলমনা ধর্ম গ্রহণ করায় ১৩০৪ সালের ১২ বৈশাখ তারিখে লিখিতমুন্সী মহম্মদ মেহেরউল্লার ধন্যবাদপত্র

"মাননীয় সাহেব! আচ্ছালামু আলায়কোম বাদ আরজ- আজ আপনার স্বহস্ত লিখিত পত্র পাঠে যে কি এক আনন্দ সাগরে ভাসমান হইলাম, তাহা লেখনী দ্বারা প্রকাশ করা অসম্ভব। 'সুধাকরে' আপনার মুসলমান হওয়ার সংবাদ প্রকাশ হইয়াছে। 'রদ্দে খ্রিষ্টানে'র জন্য যে পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহাতে আপনার নাম স্বাক্ষর দেখিয়াই আমার মনে যে ভাবের উদয় হইয়াছিল, আজ তাহাই সত্য হইল; তজ্জন্য খোদাতালার শত সহস্র শোকর গোজারী করিতেছি। আপনার ন্যায় শিক্ষিত ভ্রাতা যদি ধর্ম প্রচারে নিযুক্ত হয়েন, তবে অবশ্যই সমাজ তাঁহাকে সাদরে গ্রহণ করিবেন। অন্যান্য বিষয় বিস্তৃত পত্রে পরে লিখিতেছি। প্রচার-কার্যে আপনি শীঘ্রই প্রতিপত্তি লাভ করিতে পারিবেন।"

_____________________________________________

 

টীকাসমূহ:

(১) এই অনুবাদটি ঠিক হয় নাই। পাদ্রী জি, সি, ফান্ডার ডি. ডি সাহেব কৃত মিজানুল দেখ।

(২) এই লিখিত কোরআন শরিফখানি হযরত আবুবকরের (রা.) মৃত্যুর অনেক পরেও হযরত ওমরের (রা.) নিকট এবং হযরত ওমরের (রা.) মৃত্যুর পর তাঁহার কন্যা হাফিজার (রা.) নিকট থাকে, এই হস্তলিখিত কোরআনখানি আজিও বর্তমান আছে।

(৩) মুদ্রাকরের ক্রুটিতে নামটি ছাপিতে ভুল হইয়াছিল একথা পাদ্রী সাহেব পূর্বেই প্রকাশ করিয়াছিলেন।

(৪) এই ঘটনার পূর্বে যে কোরআন শরিফের কোন অংশই গোলমাল হয় নাই, "হইবে আশঙ্কা" শব্দ দ্বারা তাহা পরিস্কার বুঝা যাইতেছে। উক্ত যুদ্ধে বহুতর হাফেজকে শহীদ হইতেছে দেখিয়া হোজায়ফার মনে ঈদৃশ আশঙ্কা উপস্থিত হইয়াছিল।

(৫) উক্ত পদটির দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে, এই সময়ের পূর্বেই কুরআনের হেফাযতের প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে।

(৬) এই হস্তলিপিটি এখনো কা'বাতে বর্তমান আছে। দাফেওল বিসাত গ্রন্থ দেখ।

(৭) পাদ্রী সাহেব এই চারটি লিখিতেও খিচুরী পাকাইয়াছেন; বরং চারি স্থলে তিন জনই বলিয়া পালা সায় করিয়াছেন।

(৮) জায়েদ ভিন্ন আর তিন জনেই কোরেশ বংশোদ্ভুদ ছিলেন। এক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার উচ্চারণে পার্থক্য হইয়া থাকে। জায়েদ উপযুক্ত শিক্ষিত এবং কোরেশ ভাষায় সুপন্ডিত হইলেও কথার উচ্চারণে কিছু কিছু পার্থক্য ছিল; তাহা স্বাভাবিক। লিখিত ভাষাতেই এইরূপ ভুল দেখা যায়। মহাপুরুষ ওসমান ইহা বিবেচনা করিয়া যাহাতে কোরআনে ঈদৃশ বিকৃতভাবে উচ্চারিত কোন শব্দের সমাবেশ হইতে না পারে এই উদ্দেশ্যে কোরেশ বংশীয় উক্ত তিন ব্যক্তিকে পূর্বেই সতর্ক করিয়া দিয়া বলিলেন যে- যদি তোমাদের তিনজনের সহিত জায়েদের শব্দোচ্চারণে কোন অনৈক্য হয় তবে তাহা কোরেশের ভাষায় লিখিও। কারণ, কোরআন কোরেশ ভাষায় নাজিল হইয়াছে। এস্থলে মাত্র উচ্চারণের অমিলের কথা বলা হইয়াছে; কোন শব্দ বা অধ্যায় বিষয়ক অমিলের কথা নহে।

(৯) রমজানের সময় কলিকাতার এবং এদেশের অন্যান্য প্রধান প্রধান নগরে ও গ্রামে রাত্রিতে মসজিদে খতম তারাবী পড়িবার নিয়ম আছে। এই নামাজে হাফেজগণ কতিপয় দিবসে নামাজের সহিত উচ্চ:স্বরে সমগ্র কোরআন শরীফ আবৃত্তি করিয়া থাকে। ইহা বিশেষ ছওয়াবের কাজ বলিয়া মনে করা হয়। হাফেজরা কোন আয়াতে ভুল করিলে উপস্থিত অন্য কোন হাফেজ বা সমবেত লোকদের কেহ না কেহ সে ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন। কোরআনের নানা স্থানের নানা আয়াত সাধারণের মুখস্ত আছে। এইরূপ অগ্নিপরীক্ষায় হাফেজগণ সর্বদা অভ্যস্থ। কলিকাতার শত শত মসজিদে খতম তারাবী পঠিত হয়। -লেখক

 

সর্বশেষ আপডেট ( Wednesday, 29 August 2012 )