জীবন্ত নামায
লিখেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম   
Wednesday, 28 November 2007

জীবন্ত নামায

Imageনামায কালেমায়ে তাইয়েবার পয়লা বাস্তব আমলী স্বীকৃতি ।
কালেমায়ে তাইয়েবার মধ্যে যে দুটো কথা স্বীকার করা হয় তা বাস্তব জীবনে মেনে চলার ট্রেনিংই হলো নামায। কালেমা ও নামাযের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।

ধরুন, এক ব্যক্তি ইসলাম কবুল করে মুসলিম সমাজের সদস্য হয়ে গেল । কালেমায়ে তাইয়েবা উচ্চারণ করে সে তার জীবনে দুদফা পলিসী ঘোষণা করল।

 

১. আমি জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর হুকুম মেনে চলব। আল্লাহর হুকুমের বিরোধী কারো হুকুম পালন করব না।
২. রাসূল (স) আল্লাহর হুকুম যে নিয়মে পালন করেছেন, আমি একমাত্র ঐ তরীকায়ই আল্লাহর হুকুম পালন করব। আর কারো কাছ থেকে কোন নিয়ম বা তরীকা গ্রহণ করব না।

এ ঘোষণার ফলে সে মুসলিম মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল । সে কালেমায়ে তাইয়্যেবা কবুল করে ইসলামের ৫টি বুনিয়াদের (ভিত্তির) প্রথমটি গ্রহণ করার ঘোষণা দিল। এখন বাকী ৪টি ভিত্তি তাকে মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে প্রথমে নামায। যদি সকালে ইসলাম গ্রহন করে থাকে তাহলে যোহরের নামাযেই তাকে মসজিদে জামায়াতে শরীক হতে হবে। যা যা পড়তে হয় তা শিখতে কিছু দিন লাগতে পারে। কিন্তু সে অপেক্ষায় এক ওয়াক্ত নামাযও বাদ দিতে পারবে না। নামাযে যা পড়তে হয় এর যেটুকু শেখা বাকী আছে ঐটুকুর জায়গায় শুধু সুবহানাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ পড়তে থাকবে। এভাবে কালেমা কবুলের সাথে সাথেই তার উপর নামায ফরয হয়ে গেল।

রমযান মাস আসলে তাকে রোযা রাখতে হবে। তার নিকট যাকাত দেবার নেসাব পরিমাণ মাল থাকলে এক বছর পর যাকাত আদায় করবে। হজ্জ করার সাধ্য থাকলে হজ্জের মওসুমে হজ্জ আদায় করবে। কিন্তু নামায এমনই এক ইবাদত যা কালেমা কবুলের পর পরবর্তী নামাযের ওয়াকতেই তাকে আদায় করতে হবে।

কালেমা কবুলের পরপরই নামাযে শামিল হয়ে সে বাস্তবে স্বীকৃতি দিল যে সে সত্যিই কালেমা কবুল করেছে। কালেমার দুদফা ঘোষণা অনুযায়ী সে নামাযের হুকুম পালন করা শুরু করে দিল। এভাবেই নামায হলো কালেমায়ে তাইয়েবা কবুল করার বাস্তব আমলী স্বীকৃতি।

কালেমা শিক্ষার বিভিন্ন দিক

১. কালেমা তাইয়েবা শুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে হবে।
২. কালেমার শাব্দিক অর্থ জানতে হবে।
৩. কালেমার মর্মকথা বুঝতে হবে।
৪. কালেমার ওয়াদা পালন করতে হবে।

কালেমার শাব্দিক অর্থ : আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল ।

কালেমার মর্মকথা : জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সবসময়, সব অবস্থায় আল্লাহকে একমাত্র হুকুমকর্তা, (ইলাহ) প্রভু মানতে হবে এবং আল্লাহর হুকুমের বিরোধী কারো হুকুম মানা যাবেনা।

আর মুহাম্মদ (সা) এর নিকটই আল্লাহর হুকুম এসেছে এবং তিনি আল্লাহর শেখানো নিয়মে আল্লাহর হুকুম পালন করেছেন। কালেমা কবুলকারীকে একমাত্র রাসূল (সা) এর নিয়ম বা তরীকা অনুযায়ী আল্লাহর সব হুকুম পালন করতে হবে।

ময়না বা টিয়া পাখিকে শেখালে কালেমা পড়তে পারে; কিন্তু সে কালেমা বুঝে কবুল করতে পারে না। তাই পাখি কালেমা উচ্চারণ করতে পারা সত্ত্বেও মুমিন বলে গণ্য হবে না। ঈমানের দাবি হলো কালেমার শব্দগুলো মুখে উচ্চারণ করে মনে এর মর্ম বুঝে কবুল করতে হবে।

()এর সাথে সাথে () হতে হবে। অর্থাৎ মুখে স্বীকার করার সাথে সাথে মনেও কবুল করতে হবে।

উদাহরণ : পানি একটি শব্দ। কিন্তু শব্দটিতে পানি নেই। পানি একটা জিনিস যা এ শব্দ দ্বারা বুঝা যায়। পিপাসা দূর করতে হলে পানি পান করতে হবে। পানি পানি জপলে পিপসা আরও বাড়বে । কারণ পানি শব্দে কোন পানি নেই। তেমনি কালেমায়ে তাইয়েবার শব্দগুলো কালেমা তাইয়েবা নয়। এর মর্মকথাটাই আসল কালেমা।

কালেমার ওয়াদা : কালেমার মর্মকথা কবুল করার মাধ্যমে এ ওয়াদাই করা হলো যে আমি একমাত্র আল্লাহর হুকুম মেনে চলব, তার হুকুমের বিরোধী কারো হুকুম মানব না এবং আমি আল্লাহর সব হুকুম একমাত্র রাসুলে (সা) শিখানো তরিকা অনুযায়ী পালন করব এবং অন্য কারো কাছ থকে তরীকা নেব না।

কালেমা কবুল করার মধ্যে এ ওয়াদা যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না । এ ওয়াদা ছাড়া কালেমা কবুল করা অর্থহীন । কালেমা গ্রহণ মানেই এ দু’ফা ওয়াদা করা।

নামায-শিক্ষার বিভিন্ন দিক

১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে নামায আদায় করেছেন ঠিক সেভাবেই নামায পড়তে হবে।
২. নামাযে তিনি যে অবস্থায় যা পড়েছেন তা শুদ্ধ করে পড়া শিখতে হবে তা ঠোঁট ও জিহ্বা নেড়ে উচ্চারণ করতে হবে। (মনে মনে পড়লে চলবে না)।
৩. কালেমার ওয়াদা অনুযায়ী চলার ট্রেনিং হিসেবে নামায আদায় করতে হবে। নামাযে দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করতে হয় । বিভিন্ন অবস্থায় হাত বিভিন্নভাবে রাখতে হয়। বিভিন্ন অবস্হায় নির্দিষ্ট স্থানে চোখে তাকাতে হয়। রুকু ও সিজদা বিশেষ নিয়মে করতে হয় । এসবই রাসূল (স) শিক্ষা দিয়েছেন।
নামাযে এ শিক্ষাই দেওয়া হয় যে, দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেভাবে নামাযে আল্লাহ ও রাসূলের শেখানো নিয়মে ব্যবহার করা হয়, নামাযের বাইরেও এ সবকে আল্লাহ ও রাসূলের মরযী মতো ব্যবহার করতে হবে। নিজের মরযী মতো ব্যবহার করা চলবে না। এভাবেই নামাযের শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে কায়েম করতে হবে। কুরআনে নামায কায়েম করতেই হুকুম করা হয়েছে। শুধু পড়তে বলা হয়নি।
৪. নামাযে মনের ট্রেনিং আরও গুরুত্বপূর্ণ । মনই তো আসল । নামযকে কালেমার ট্রেনিং হিসেবে মনে করলেই তো বাস্তব জীবনে নামাযের শিক্ষাকে কাজে লাগানো সহজ হবে।

মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ তাআলা মুমিনের ২৪ ঘন্টার রুটিন ৫ ওয়াক্ত নামাযের নিয়ন্ত্রণে রাখার বব্যস্থাই করেছেন। এ রুটিন শুরু হবে ফজরের নামায দিয়ে এবং শেষ হবে এশার নামায দিয়ে। মাঝখানে ৩ বার দুনিয়ার দায়িত্ব মুলতবী রেখে নামাযে হাযির হতে হবে। নামায নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষদেরকে মসজিদে জামায়াতে আদায় করতে হবে। অন্য কোন কাজের জন্য নামাযকে মুলতবী করা চলবে না। এভাবে ২৪ ঘন্টার রুটিন নামায দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।

সকালে ঘুম থেকে উঠার পর নামাযই পয়লা কাজ। এর আগে পেশাব পায়খানা ও অযু গোসল তো আসলে নামাযেরই প্রস্তুতি । এগুলো দুনিয়ার কোন দায়িত্ব নয়। দুনিয়ার কাজ শুরু করার পূর্বে নামাযের মাধ্যমে এ চেতনা দান করা হলো যে , “তুমি তোমার জীবন যেমন খুশি তেমনি যাপন করতে পারবে না। তুমি স্বাধীন নও। তুমি আল্লাহর গোলাম। ”

ফজরের নামাযেই এ চেতনা নিয়ে নামায আদায়ের পর নামাযের বাইরেও এ চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে। নামাযের বাইরে দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করতে করতে এ চেতনা ঢিলা হয়ে যায়। তাই বার বার যোহর, আসর, মাগরিব এশার নামযে হাযির হয়ে কালেমার ট্রেনিং ঝালাই করতে হয় এবং ঐ চেতনাকে শান দিতে হয়।

আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করার পর সালাম ফিরাবার পূর্ব পর্যন্ত দেহ ও মনকে একমাত্র আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের (সা) তরীকা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হয়। কেউ বেশি সওয়াবের নিয়তে আত্তাহিয়্যাতু পড়ার জায়গায় সূরা ইয়াসীন পড়লে নামায হবে না। নিজের মরযী মতো নামযে কিছুই করা যাবে না। আল্লাহর হুকুম ও রাসূলে (স) তরীকা মতোই নামাযে সবকিছু করতে হবে।

এভাবে ৫ ওয়াক্ত নামাযে কালেমার যে ট্রেনিং হয় তা নামাযের বাইরে কায়েম করতে পারলেই নামাযের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়। নামায বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন অনুষ্ঠান নয়। জীবনের সব ক্ষেত্রে নামাযের ট্রেনিংকে কাজে লাগাতে হবে। এটাই নামাযে মনের টেনিং । মনকে নামায থেকে বিচ্ছিন্ন করা চলবে না। ফজরের পর মসজিদে মনকে ঝুলিয়ে রেখেই বাইরে যেতে হবে। মন সারাদিন নামাযের সময় সম্পর্কে সচেতন থাকবে।

৫. নামাযের বিভিন্ন অবস্থায় মনটাকে কাজ দিতে হবে যাতে মন নামাযের বাইরে চলে না যায়। নামাযে মন অনুপস্হিত হলেই মনে শয়তান এমন সব ভাবনা হাযির করে যা নামাযের উদ্দেশ্যেই ব্যর্থ করে দেয়। নামায শেখার সময় এটা সাধারণত শেখানো হয় না । এটা অবশ্যই শিখতে হবে। আমরা দেহ দ্বারা নামাযে যা করি তাতে নামাযের দেহ তৈরি হয়। আর মনে যদি সঠিক ভাবনা থাকে তবেই নামাযে প্রাণ সঞ্চার হয় বা নামায জীবন্ত হয় । তাই নামাযে কোন অবস্থায় মনে কোন ভাবনা থাকতে হবে তা জনাতে হবে ও তা অভ্যাস করতে হবে। নামাযে যখন যা পড়া হয় এর মর্মকথাই ভাবনায় থাকতে হবে।

নামাযে সবকিছুই আরবীতে পড়তে হয়। যারা আরবীর অর্থ বুঝে না তারাও মর্মকথাটা জেনে নিতে পারে। টাকার নোটের লেখা পড়তে জানে না তারাও কোনটা কত টাকার নোট তা চিনে নেয়। তেমনি নামাযে আরবীতে যখন পড়া হয় এর মর্মকথা জেনে নিতে হবে। আরবীটুকু মুখস্থ করতে যে সময় লাগে এরও কম সময়ে তা শেখা সম্ভব। মুখে উচ্চারণ করবে, আর মনে মর্মকথাটুকু জাগ্রত রাখবে।

৬.কালেমায়ে তাইয়েবার মধ্যে যেমন ওয়াদা রয়েছে, তেমনি নামাযেও প্রচ্ছন্নভাবে ওয়দা করা হয়।

গোটা নামাযে এ ওয়াদা ঊহ্য রয়েছে যে, “ হে আমার মাবূদ, নামাযে যেমন তোমার হুকুম ও রাসূলে (স) তরীকা মতো সবকিছু করেছি, নামাযের বাইরেও আমি সেভাবেই করব। আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নামাযে যেমন আমার মরযী মতো ব্যবহার করিনি; নামাযের বাইরেও তা আমার মরযী মতো ব্যবহার করব না। নামাযে যে মুখে তোমার পবিত্র কালাম উচ্চারণ করেছি, নামাযের বাইরেও তোমার অপছন্দনীয় কথা মুখে আনব না।

নামাযের রুকুতে আমার যে মাথা তোমার দরবারে নত করে গৌরবের ভাগী হয়েছি, সে মাথাকে আর কোন শক্তির সামনে নত করে অপমানিত করব না। আমাকে এ শক্তি দাও যাতে ঐ গৌরব বহাল রাখতে পরি।

সিজদায় আমার দেহ মনসহ আমার পূর্ণ সত্তাকে তোমার নিকট সমর্পণ করে ধন্য হয়েছি। আমি একমাত্র তোমার নিকট আশ্রয় নিয়েছি। আমার আর কোন আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই। আমি আর কোন শক্তির অনুগ্রহের ভিখারি হব না। আমি আর কোন শক্তির পরওয়া করব না। সিজদায় তোমার যে মহান নৈকট্য লাভ করেছি এটাই আমার মহা সম্পদ । আমাকে তোমার গোলাম হিসেবে কুবল করে নাও। আমাকে তোমার সালেহ বান্দাহগণ, মুখলিস দাসগণ ও অগ্রবর্তী মুকাররাবীনের মধ্যে শামিল কর।

নামাযের দেহ

১. সবাই যার যার শরীকে সুন্দর অবস্থায় রাখার চেষ্টা করে। নামাযের দেহটিকেও মুনীবের নিকট সুন্দর অবস্থায় পেশ করার জযবা থাকা উচিত । নামাযের দেহের সৌন্দর্য হলো :
ক. নামাযে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলো যেখানে যেভাবে রাখা উচিত সেভাবে রাখা।
খ. নামাযে যা পড়া হয় তা শুদ্ধ উচ্চারণে পড়া ।
নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় হাত বেঁধে স্হির হয়ে দাঁড়াতে হয়। সিজদা দেবার জায়গায় দৃষ্টি রাখতে হয়। তাহলে মাথা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে থাকবে। রুকুর অবস্থায় হাঁটুতে হাতের তালু রেখে হাত দিয়ে হাঁটুকে মযবুতভাবে ধরতে হয়। এতে শরীরের ভারটা হাতের উপর পড়ে এবং কুনই ও হাঁটু সোজা থাকে। দৃষ্টি পায়ের পাতার উপর রাখতে হয় । এতে কোমর পিঠ ও মাথা এক রেখা বরাবর সমান থাকে এবং মাটির সমান্তরালে থাকে । মাথা পিঠ থেকে নিচু হয় না এবং পিঠ বাঁকা অবস্থায় থাকে না। রুকু থেকে উঠে সিজদায় যাবার আগে স্থির হয়ে দাঁড়াতে হয় এবং দুহাত দুপাশে সোজা হয়ে থাকে। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে সিজদায় চলে গেলে নামায হবে না। এভাবে থামা ওয়াজিব।

সিজদায় যাবার সময় ধীরে ধীরে প্রথমে হাঁটু মাটিতে লাগাতে হয়, এরপর লম্বা হয়ে হাতের তালু মাটিতে রাখতে হয় প্রথমে নাক ও পরে কপাল মাটিতে রেখে স্থির হতে হয়। এ সময় দৃষ্টি নাকের দিকে থাকে। এতটা লম্বা হয়ে সিজদা করতে হয় যাতে ঊরু খাড়া (সামনে বা ছেনে ঝুঁকে না থাকে ) আর যেন ঊরু থেকে কনুই এতটা দূরে থাকে যে এর ফাঁক দিয়ে ছাগলের বাচ্চা পার হবার মতো জায়গা থাকে। হাত পাঁজরের সাথে লেগে থাকবে না, একটু ফাঁক থাকবে।

তালু থেকে কনুই পর্যন্ত হাতটি মাটি থেকে উঁচু থাকবে ( কুকুরের বসার মতো কনুই মাটিতে লেগে থাকবে না) সিজদার সময় দুপায়ের পাতা খাড়া থাকবে এবং পায়ের আঙুলগুলো ভাঁক করে কিবলামুখী করে রাখতে হবে। সিজদার সময় দুহাতের আঙ্গুল ফাঁক ফাঁক হয়ে থাকবে না, কিবলামুখী রাখার জন্য মিলিয়ে রাখতে হবে। সিজদা থেকে উঠে দাঁড়বার সময় প্রথমে কপাল, পর নাক, এরপর হাত শেষে হাঁটু উঠাতে হবে।

দুসিজদার মাঝখানে স্থির হয়ে বসে থামতে হয়। না থেমে আবার সিজদায় চলে গেলে নামায হবে না। এভাবে থামা ওয়াজিব । বসা অবস্থায় দৃষ্টি কোলের দিকে থাকবে । হাত হাঁটুর উপর এমনভাবে থাকবে যেন আঙুলের মাথা কিবলামুখী হয়ে থাকে এবং আঙুল হাঁটুর নীচে ঝুকে না পড়ে। বসার সময় বাম পায়ের পাতা মাটিতে বিছিয়ে এর উপর বসতে হয় এবং ডান পায়ের আঙুলগুলোর উপর পায়ের পাতা খাড়া করে রাখতে হয়। দুরাকাআত নামাযের পর তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু ) পড়ার সময়ও এভাবেই বসতে হয়।

ডান পায়ের আঙুলগুলো খাড়া রেখে বসার উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। জামায়াতে নামাযের সময় কাতার সোজা রাখার উপর রাসূল (স) অন্তত গুরুত্ব দিয়েছেন। নামাযে দাঁড়াবার সময় পায়ের গোড়ালির দিকে দিয়ে অন্যদের সমান হয়ে দাঁড়াতে হয়। পায়ের আঙুলের দিক দিয়ে সমান হয়ে দাঁড়ালে কাতার সোজা হবে না। কারণ পায়ের পাতা সবার সমান নয়। কারো পাতা লম্বা, কারো বেশ খাট। কিন্তু গোড়ালি বরাবর দাঁড়ালে কাঁধের দিক দিয়েও বরাবর হয়।

কাতার সোজা রাখার প্রয়োজনেই নামাযে বসার সময় ডান পা স্থির রাখা দরকার । একপা যদি এক জায়গায় স্থির থাকে তাহলে আবার দাঁড়াবার সময় কেউ সামনে বা কেউ পেছনে চলে যাবে না। এক পা যদি এক জায়গায় স্থির না থাকে তাহলে পা সরে যাবার কারণে কাতার সোজা থাকবে না।

নামায শেষ করা উদ্দেশ্যে সালাম ফেরাবার সময় শুধূ চেহারা ডান ও বাম দিকে ঘুরাবে। দেহে কেবলামুখীই থাকবে। মাথা নিচু করতে হবে না। স্থির সোজা বসা অবস্থায় শুধূ চেহারা ডানে ও বামে ঘুরাতে হবে।

অঙ্গ প্রত্যঙ্গ উপরে বর্ণিত নিয়মে যত সঠিকভাবে পরিচালনা করা হবে এবং নামাযে যা কিছু পড়া হয় তা যত শুদ্ধভাবে পড়া হবে নামাযের দেহ ততই সুন্দর হবে।

‘‘আল্লাহর রাসূল কীভাবে নামায পড়তেন ” নামে আল্লামা হাফিয ইবনুল কায়্যিমের রচিত বইটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে। এটা পড়লে এ বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান হাসিল করা যাবে।

নামাযের রূহ
নামায আদায়ের সময় মনের অবস্থার উপর নামাযের রুহ পয়দা হওয়া নির্ভর করে । নামাযে দেহ যখন যে অবস্থায় থাকে তখন মনে যে চেতনা থাকা উচিত তা থাকলেই নামায জীবন্ত হয়।

নামায শুরু করার সময় মুখে আরবীতে নিয়ত উচ্চারণের কোন দরকার নেই। এসব নিয়ত এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেখাননি। নিয়ত মুখের কজা নয়, মনের কাজ। তাই নামাযের উদ্দেশ্যে মন স্থির করে দাঁড়িয়ে আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করতে হয়।

আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করার সময় হাতের তালু কিবলামুখী রেখে হাত কাঁধের বরাবর যখন তোলা হয়, তখন মনে খেয়াল রাখতে হবে যে আমি আমার দুনিয়ার জীবনকে পেছনে রেখে আমার রবের দরবারে হাযির হয়েছি । এ তাকবীরকে তাকবীরে তাহরীমা বলে । অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলে দুহাত নাভির নিচে (আহলি হাদীস হলে বুকের উপর ) বেঁধে দাঁড়াবার পর নামাযের বাইরের হালাল কাজও নামাযের ভেতরে হারাম হয়ে যায়। এ কারণে এর নাম তাকবীরে তাহরীমা। হাত বেঁধে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে বিনয়ের সাথে নিম্নরূপ হামদ সানা ও তায়াওউয পড়তে হয় :

এটুকু পড়ার সময় মনে নিম্নরূপ খেয়াল রাখতে হবে : “হে আল্লাহ ! গৌরব, প্রশংসা, বরকত ও মর্যাদা তোমারই। আমি খাঁটিভাবে আমার সমগ্র মনোযোগ তোমার প্রতিই দিলাম। ”
রাসূল (স) সূরা ফাতেহা পড়ার আগে কুরআনের নিম্ন আয়াতটুকুও পড়তেন :
কুরআনে ---------- রয়েছে। তিনি ------------------- নামাযে পড়তেন। এ আয়াতের মর্মকথা খেয়াল করলে এমন জযবা ও আবেগ সৃষ্টি হয় যা নামাযের উদ্দেশ্যে পূর্ণতা দান করে। এ আয়াতের মর্মকথা হলো : হে আমার রব, আমার নামায, আমার কুরবানী ও যাবতীয় ইবাদত এবং আমার হায়াত ও মওত তোমারই জন্য । আমাকে তোমার নিকট সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করলাম।

বুকের বামদিকেই মানুষের কালব বা দিল। সবটুকু মনোযোগ কালবের দিকে থাকবে। মনের খুঁটিটাকে কালবের উপর মযবুত করে গেড়ে দিতে হবে। শযতান কালব থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতেই থাকবে। নামাযীকেও বারবার মনেযোগ কালবে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। শয়তানের সাথে এ যুদ্ধ চলতেই থাকবে।

এরপর আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করতে হবে। হাদীসে আছে যে সূরা ফাতিহার এক এক অংশ তিলাওয়াত করার সাথে সাথে আল্লাহ এর জওয়াব দেন। এ হাদীসের কথাগুলো এমন আবেগময় ভাষায় বলা হয়েছে যা বান্দাহর মনে গভীর দোলা দেয়। হাদীসটি নিম্নরূপ :
অর্থ : হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেলন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি নামাযকে আমার ও আমার বান্দাহর মধ্যে দুভাগে ভাগ করেছি। আর আমার বান্দাহ আমার নিকট যা চায় তাই পাবে। বান্দাহ যখন বলে, ‘‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ।” তখন আল্লাহ বলেন , “ আমার বান্দাহ আমার প্রশংসা করল ।” যখন বান্দাহ বলে ‘আর রাহমানির রাহীম ” তখন আল্লাহ বলেন আমার বান্দাহ আমার গুণ গাইল” যখন বান্দাহ বলে “মালিকি ইয়াওমিদ্দীন ” তখন আল্লাহ বলেন “আমার বান্দাহ আমার গৌরব বর্ণনা করল”

যখন বান্দাহ “ইয়্যাকা না বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন বলে, তখন আল্লাহ বলেন “এ বিষয়টা আমার ও আমার বান্দাহর মাঝেই রইল । আর আমার বান্দাহর জন্য তাই যা সে চাইল (অর্থাৎ আমার ও আমার বান্দাহর মধ্যে এ চুক্তি হলো যে সে আমার কাছে চাইবে, আর আমি তাকে দেব)।

যখন বান্দাহ বলে “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম সিরাতাল্লাযীনা আন আমতা আলাইহিম গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ দোয়াললীন” তখন আল্লাহ বলেন এটা আমার বান্দাহর জন্যই রইল আর আমার বান্দাহর জন্য তা ই যা সে চাইল ।”

এ হাদীসে মহ্বতের এমন অগ্নিকণা রয়েছে যে, বান্দার দিলে ঈমানের বারুদ থাকলে এবং নামাযে সূরা ফাতিহা পড়ার সময় আল্লাহর আবেগময় কথার দিকে খেয়াল করলে আল্লাহর প্রতি ভালবাসার এমন আগুন জ্বলে উঠবে যে, জযবায় বান্দাহ নিজেকে মনিবের অতি কাছে বলে অনুভব করবে।

নামাযে সূরা ফতিহা পড়ার সময় এ হাদীসটির কথা খেয়ালে রাখলে এক একটি আয়াত পড়ার পর আল্লাহর প্রেমময় জওয়াবটা মনের কানে শুনবার জন্য বান্দাহকে থামতেই হবে। আল্লাহর জওয়াবে যে তৃপ্তি ও শান্তি তা তারাই বোধ করতে পারে, যারা আয়াতগুলো ধীরে ধীরে মজা নিয়ে পড়ে।

সূরা ফতিহা ও কেরায়াত পড়ার পর রুকুতে যখন সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম ”তাসবীহ পড়া হয় তখন আমার রব কথাটি যেন আবেগ সৃষ্টি করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বা সারা জাহানের রব। অথচ আমার রব বলা শেখানো হয়েছে যাতে রবের সাথে নৈকট্য বোধ জাগে । তাসবীহটির অর্থ : আমার মহান রব কত পবিত্র!

রুকু থেকে ওঠে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। এ সবটুকু পড়া অভ্যাস করল কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার ওয়াজিবটা সহজেই আদায় হয়ে যায়।

এটা পড়ার সময় মাবূদের দরবারে মাথা নত করার তাওফীক দেওয়ার জন্য শুকরিয়ার গভীর অনুভুতি বোধ করতে হবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুতে থাকা অবস্থায় এমন সব দোয়া পড়তেন যাতে বিনয়ের অনুভূতিটা গভীর হয়।

এর একটি দোয়া নিম্নরূপঃ
অর্থ : হে আল্লাহ আমি তোমার জন্য রুকু দিলাম, তোমার প্রতি ঈমান আনলাম তোমার প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম, তোমার উপর ভরসা করলাম, তুমিই আমার রব। আমার কান, চোখ, মগজ, হাড় ও শিরা- উপশিরা তোমার প্রতি একাগ্রভাবে বিনয়ী হয়েছে।

 

এরপর সিজদায় চরম বিনয়ের ভাব নিয়ে পড়তে হবে () আমার মর্যাদাবান রব কতই পবিত্র! রাসূল (সা) বলেছেন,,তোমরা যখন সিজদা কর তখন তোমাদের রবের সবচেয়ে কাছে পৌঁছে যাও । তখন বেশি করে দোয়া কর।

ইসলাম মানে আত্মসমর্পণ । সিজদার অবস্থাটা আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত বাস্তব রূপ। কপাল ও নাক মানুষের সবচেয়ে সম্মানজনক স্থান। মহান প্রভুর উদ্দেশ্যে কপাল ও নাক মাটিতে রেখে গোটা দেহকে সর্ম্পূণরূপে সমর্পণ করে দেওয়া হয় সিজদায়। সিজদারত অবস্থায় মনে অনুভব করবে যে আমার মহান রবের নিকট আমি ধরনা দিলাম । আমাকে যেন গোলাম হিসেবে তিনি কবুল করেন।

রাসূল (স) সিজদায় থাকাকালে বহু আবেগময় দোয়া করতেন এর একটি দোয়া নিম্নরূপঃ
অর্থ : হে আল্লাহ তোমার জন্যই সিজাদা করলাম । তোমারই উপর ঈমান আনলাম এবং তোমারই নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। তোমারই ওপর নির্ভর করলাম, তুমি আমার প্রভু । আমার চেহারা ঐ সত্তার নিকট সিজদারত হলো যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন ও আকৃতি দান করেছেন এবং তাকে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন। আল্লাহ বরকতময়। তিনিই সকল স্রষ্টার সেরা। ”

শিশু মায়ের কোলে আশ্রয় পেলে যেমন সেখানেই দীর্ঘ সময় থাকতে চায়, তেমনি সিজদায় আল্লাহর নৈকট্য বোধ হলে তাড়াতাড়ি সিজদা থেকে উঠতে মন চাইবে না। তাসবীহ ৩, ৫, ৭ যতবার খুশি পড়ার পর কুরআন ও হাদীসের দোয়াগুলো থেকে নিজের বাছাই করা দোয়া সিজদায় পড়তে পরম তৃপ্তি বোধ হয়।

সিজদা থেকে উঠে স্থির হয়ে বসে পড়তে হবে : ()
এখানে সাতটি জিনিস চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে থেকে কোন সময় তিনটি কোন সময় আরও বেশি পড়া যেতে পারে । এটা পড়ার অ্যভ্যাস করলে দু’সিজদার মাঝখানে কিছুণ স্থির হয়ে বসার ওয়াজিবটুকু সহজেই আদায় হয়ে যায়।

এ দোয়াটির অর্থ : হে আল্লাহ আমাকে মাফ কর, আমার উপর রহম কর, আমাকে শক্তিশালী কর, আমার মর্যাদা বৃদ্ধি কর, আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে সুস্থ রাখ আমাকে রিয্‌ক দাও।

এ দোয়াটি বড়ই মূল্যবান । এত ৭টি বড় বড় নেয়ামত চাওয়া হয়েছে, যা সবারই কাম্য হওয়া উচিত ।

রাসূল (স) সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় মাটিতে হাত দিয়ে উঠতেন না। হাঁটু ও ঊরূতে হাত দিয়ে দাঁড়াতেন । (বৃদ্ধ লোকেরা অবশ্য মাটিতে হাতের ভর না দিয়ে উঠতে পারে না। )

এভাবে দুরাকাআত পড়তে হয়। দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ফাতিহার আগে বিসমিল্লাহ পড়া উচিত । রাসূল (সা) দ্বিতীয় রাকআতে আউযুবিল্লাহ পড়তেন বলে প্রমাণিত নয়। অনেকেই বিসমিল্লাহকে সূরা ফাতিহার অংশ মনে করেন। তাই বিসমিল্লাহ পড়াই নিরাপদ।

দু’রাকাআত পড়া হলেই বসতে হয়। দু’রাকআত বিশিষ্টি নামাযে এ বৈঠক ফরয। আর তিন বা চার রাকাআতবিশিষ্ট নামাযে দু’রাকাআতের পর বসা ওয়াজিব এবং শেষ বৈঠক ফরয ।

এখানে যা পড়তে হয় এর নাম তাশাহুদ
অর্থ : সকল সম্মানজনক সম্বোধন, বরকত ও পবিত্রতা আল্লাহর জন্য । হে নবী ! আপনার উপর শান্তি আল্লাহর রহমত ও বরকত নাযিল হোক। আমাদের উপর ও আল্লাহর নেক বান্দাহদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক । আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর দাস ও রাসূল।

 

আত্তাহিয়্যাতের কথাগুলো সম্পর্কে একটি চমৎকার ইতিহাস রয়েছে। রাসূল (স) মেরাজে যখন আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সুযোগ পেলেন তখন তিনি প্রথমে আল্লাহকে সম্বোধন করে বললেন :
() এর জওয়াবে আল্লাহ বলেন :
() রাসূল (স) তখন আল্লাহ থেকে পাওয়া সালাম একা গ্রহণ না করে আল্লাহর সকল নেক বান্দাহর নিকট পৌঁছাবার উদ্দেশ্যে বললেন :
() আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে সালাম বিনিময়ের পর ফেরেশতারা বলে উঠলেন :
()

মেরাজের এ মহান স্মৃতিটুকু নামাযীকে মেরাজের স্বাদ উপভোগের সুযোগ দেয়। এখানে নামাযী আল্লাহ, রাসূল ও আল্লাহর সব নেক বান্দাহকে সালাম পৌঁছাবার সৌভাগ্য লাভ করে।

এ ঘটনাটি সহী হাদীস দ্বারা প্রমাণিত না হলেও এর ভাষা ঐ ঘটনার সাথে যেভাবে খাপ খায় তাতে ঘটনা সঠিক বলে মন সাক্ষ্য দেয় । প্রথম বাক্যের সাথে দ্বিতীয় এবং দ্বিতীয় বাক্যের সাথে তৃতীয় বাক্যের কথাগুলো ঐ ঘটনা ছাড়া খাপছাড়াই মনে হয়।

বিখ্যাত তাফসীরে কুরতুবিতে সূরা আল বাকারার শেষ আয়াতের তাফসীরে মেরাজের সাথে তাশাহহুদের সম্পর্ক ঐভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে, যেভাবে উপরে বর্ণিত হয়েছে। (দারুল ইফতার মুফতী মাওলানা আবদুল মান্নান থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে)।

তাশাহহুদের পর দরূদ এবং দরূদের পর নামাযের শেষ দোয়াটি নিম্নরূপ :
()

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আমার নাফসের উপর অনেক যুলম করেছি (মানে অনেক গুনাহ করেছি) তুমি ছাড়া আর কেউ তা মাফ করতে পারেনা। সুতরাং তোমার পক্ষ থেকে আমাকে মাফ কর এবং আমার উপর রহম কর । নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও মেহের বান।

নামায শেষ করার পূর্বে এ দোয়াটি ছাড়া আরও বহু দোয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় পড়তেন। সব দোয়ার মধ্যে এ দোয়াটিই প্রায় সবাই পড়ে। এ দোয়াটি বান্দাহর জন্য বড় সম্বল। বান্দাহর তো হামেশাই গুনাহ হতে থাকে। তাই মাফ চাইতে থাকাই উচিত । মুমিন হিসেবে এক মুহুর্তেও আল্লাহকে ভুলে থাকা উচিত নয়। ভুলে থাকলেই মনে এমন সব খেয়াল আসে যা মুমিনের জন্য মোটেই সাজে না।

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাগণকে বললেন তোমরা আল্লাহকে লজ্জা কর। সবাই বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমরা তো লজ্জা করি। রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহকে লজ্জা করার মানে হলো, তোমার মগজকে পাহারা দাও যেন এমন চিন্তা সেখানে না ঢুকে যা আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় । তোমার পেটকে পাহারা দাও যাতে এমন খাবার সেখানে না ঢুকে যা হালাল নয়। আর মৃত্যুকে বেশি করে ইয়াদ কর।

অর্থাৎ এমন ভাবনায় সব সময় থাকতে হবে যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন এবং আমার মনের খবরও তিনি রাখেন। এ অবস্থায় এমন চিন্তা আমি কেমন করে মগজে স্থান দিতে পারি যা মন্দ এবং এমন খাদ্য কেমন করে আমি খেতে পারি যা হারাম। এ লজ্জাবোধকে রাসূল (স) ঈমানের শাখা বলেছেন।

সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করার পর রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন সময় বহু দোয়া পড়তেন। এ সব দোয়ার মর্মকথা হলো মাফ চাওয়া, দয়া ভিক্ষা করা, আল্লাহর নৈকট্য কামনা করা ও সব অবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।

নামায শেষ হলে তিন তাসবীহ পড়ার উপর রাসূল (স) বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। একদিন রাসূল (স) হযরত মুয়ায (রা) কে তিনবার বলেন “মুয়ায তোমাকে আমি ভালবাসি। প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার আল্লাহু আকবার এবং ১বার () পড়তে ভুলবে না।

এ তাসবীহগুলো পড়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, প্রতিটি তাসবীহই তাওহীদের ঘোষণা । কুরাআনে সুবহানাল্লাহ তাসবীহটি শিরকের প্রতিবাদেই ব্যবহার করা হয়েছে । যেমন : ()

আলহামদুলিল্লাহ মানে সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহর জন্য, আর কোন সত্তা এর অধিকারী নয়। আল্লাহু আকবার তো স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করে যে, আর কোন সত্তা এর চেয়ে বড় নয়। এভাবে এ তাসবীহগুলো তাওহীদের ঘোষণা হিসেবেই উচ্চারণ করতে হবে।

এভাবে নামায আদায় করতে পারলেই নামাযে রূহ পয়দা হবে। নামাযের আসল অর্জনই হলো নামযের রূহ। মৃত দেহ যেমন কোন কাজের নয়, নিস্প্রাণ নামাযও আসল নামায নয়। প্রাণহীন নামাযে এর উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে না।

নামাযের জামায়াতে যত লোক শামিল হয় তারা সবাই একই নামায পড়ে, কেরায়াত ও তাসবীহ একই ভাষায় পড়ে, রুকু সিজাদা একইভাবে করে, কিন্তু আল্লাহ এর সওয়াব কি সবাইকে এক সমানই দেবেন? হাদীস অনুযায়ী প্রত্যেক নেক আমলের পুরস্কার ১০গুণ থেকে ৭০০ গুণ দেওয়া হবে। একই সাথে যারা নামায আদায় করে তাদের কেউ ১০ গুণ, কেউ ২০, কেউ ২০০ কেউ ৫০০ গুণ কেন পাবে? কিসের ভিত্তিতে এত পার্থক্য হবে?

নামাযের দেহ কতটুকু সুন্দর হলো, যা কিছু পড়া হয় তা কী পরিমাণ শুদ্ধ হলো, নামায আদায়ের সময় মনের অবস্থা কার কেমন ছিলো , নামাযে কার কতটা আবেগ ও আন্তরিকতা ছিলো ইত্যাদির পার্থক্যের কারণেই সওয়াব বেশ কম হবে। তাই এসব দিক দিয়ে নামাযের মানকে যাতে উন্নত করা যায় সে বিষয়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। উন্নতির কোন শেষ নেই। তাই প্রচেষ্টা ও চলতেই থাকা উচিত।

নামাযের মর্যাদা

আল্লাহ, রাসূল ও আখিরাতে সঠিকভাবে ঈমান আনার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তা আল্লাহ তাআলা সূরা আন নাসে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ মানুষের রব, বাদশাহ ও ইলাহ বা মাবূদ । কুরআনে আরও একটি সম্পর্কের কথা বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি আরো আবেগময়।আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে ঈমানদারদের ওয়ালী বা অভিভাবক। জীবন্ত নামায আল্লাহর সাথে এ চার রকম সম্পর্ক মযবুত করতে থাকে। মুমীনের রুহানী তরক্কীর জন্য নামাযই সবচেয়ে বেশি কার্যকর । রাসূল (স) নামাযকে তাঁর চোখের মণি বলেছেন। কখনো কোন পেরেশানীর কারণ ঘটলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়াসল্লাম নামাযের মাধ্যমে প্রশান্তি বোধ করতেন।

 

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেন: ()

 

বোখারী শরীফে বর্ণিত এ হাদীসটির অর্থ : তোমাদের কেউ যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের সাথে গোপনে কথা বলে এবং তার রব তার ও কিবলার মাঝে বিরাজ করেন।

 

জীবন্ত নামাযের বাস্তব অবস্থা এটাই । মুমিন দুনিয়াকে পেছনে রেখে নামাযে যখন দাঁড়ায় তখন তার ও কিবলার মাঝে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ থাকে না। নামাযে যা কিছু পড়া হয় এ সবই আল্লাহর সাথে একান্তে বলা হয়। তাই এ সবই আল্লাহর সাথে গোপন সংলাপ।

নামায মুমিনের মেরাজ কথাটি প্রচলিত আছে। সহী হাদীসে এ ভাষায় কথাটি না থাকলেও উপরের হাদীসটি থেকে একথাটি নামাযের বেলায় প্রযোজ্য । পার্থক্য এটুকু অবশ্য রয়েছে যে রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজে গিয়েছিলেন সশরীরে আর নামাযে মুমীনের মেরাজ হয় শুধু রূহানীভাবে। নামাযে আল্লাহরই সাথে নামাযীর সংগোপনে সংলাপ চলে । এটা অন্তরে অনুভব করার বিষয় । নামায যতটা জীবন্ত হয় এ অনুভুতি ততই গভীর হয়।

বহু হাদীস থেকে জানা যায়, অগণিত ফেরেশতা নামাযের বিভিন্ন অবস্হায় রয়েছে। একদল ফেরেশতা শুধু দাঁড়িয়ে আছে, একদল শুধু রুকুতে আছে, একদল শুধু সিজদায় আছে। হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, কোন একদল ফেরেশতা পূর্ণ নামায আদায় করে।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে পূর্ণ নামায আদায়ের মাধ্যমে ফেরেশতার চেয়ে মর্যাদা দান করেছে। তাই আল্লাহর সাথে বান্দাহর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার জন্য নামাযই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। জীবন্ত নামাযের মজা যারা পেয়েছে তাদের নিকট নামাযই সবচেয়ে প্রিয় । নামাযেই আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া যায়।

নামাযে দেহ ও রূহ নির্মাণের জন্য যা করণীয় তা প্রতি ওয়াকতে এবং প্রতি রাকআতে করা সম্ভব নয়। এর জন্য মনকে অবসর করে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট সময় লাগিয়ে নামায আদায় করতে হয়। এর জন্য উপযুক্ত সময় হলো শেষ রাত। তাহাজ্জুদের অভ্যাস করতে পারলেই এটা সম্ভব ও সহজ মনে হবে। ৫ ওয়াকতের নামাযে তাহাজ্জুদের মতো নিরিবিলি পরিবেশ ও মানবিক প্রস্তুতি সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয নামাযের পর তাহাজ্জুদের নামায একই সকল নফল নামাযের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষনা করেছেন। তাহাজ্জুদ সম্পর্কে একটি হাদীস উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করি :

অর্থ : রাত জাগা তোমাদের কর্তব্য । কেননা এটা তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের তরীকা, তোমাদের রবের নৈকট্যের মাধ্যমেই আগের গুনাহর কাফফারা এবং গুনাহ থেকে বিরত রাখার উপায়।(তিরমিযী)

রাসূল (স) এ হাদীসে তাহাজ্জুদের ৪টি ফযীলত বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে আল্লাহর নৈকট্য একটি আল্লাহর দরবারে ধরনা দেবার শ্রেষ্ঠ মাধ্যমই হলো নামায। আল্লাহর সাথে এটা বান্দাহর সরাসরি সম্পর্কের মহা সুযোগ।

নামাযের রূহের দিকটাকে না বুঝলে নামায নিতান্তই একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হতে বাধ্য । এ প্রাণহীন নামাযে কী করে মজা পাওযা যেতে পারে। এ জাতীয় নামাযই আমাদের সমাজে চালু আছে। এ কারণেই এ ধরনের নিস্প্রাণ নামায দ্বারা নামাযের উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন :
অর্থ : আমাকে স্মরণে রাখার জন্য নামায কায়েম কর। (সূরা তোয়াহা : ১৪ )

বারবার নামাযে হাযির হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করা হয় । যাতে আল্লাহর কথা ভুলে না যায় সেজন্যই বারবার নামায । নামায শেষ হলে দুনিয়ার দায়িত্ব পালনকালে কি আল্লাহকে ভুলে থাকার অনুমতি আছে ?
সূরা জুমআর ১০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন :
অর্থ : যখন নামায শেষ হয় তখন যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযক) তালাশ কর। এ সময় আরও বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলতা লাভ করতে পার। এ আয়াতে নামাযের বাইরে আরও বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাদীসে আছে যে আল্লাহ বলেন, “ বান্দাহ যখন আমাকে স্মরণ করে তখন আমি তার সাথেই থাকি। যখন সে একা স্মরণ করে আমিও তখন একা তাকে স্মরণ করি। যখন সে কোন জামায়াতে আমাকেস্মরণ করে তখন এর চেয়ে ভাল জামায়াতে (ফেরেশতাদের মধ্যে )আমি তাকে স্মরণ করি। যখন সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তখন তার দিকে একহাত এগিয়ে যাই। যখন সে একহাত আমার দিকে এগিয়ে আসে আমি তার দিকে একগজ এগিয়ে যাই। যখন সে আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তখন তার দিকে দৌড়ে যাই।

আল্লাহর সাথে বান্দাহর এ সম্পর্ক নামাযের মাধ্যমেই গড়ে উঠে ও বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বিতরের নামায

বিতরের নামাযের সঠিক সময় তাহাজ্জুদের পর । এ নামায ওয়াজিব তাই । শেষ রাতে যারা উঠার অভ্যাস করেনি তাদেরকে এশার পরই বিতর পড়তে হয়, যাতে ওয়াজিব তরক হয়ে না যায়।

এ নামাযের তৃতীয় রাকাআতে দোয়া কুনুত পড়তে হয়। এ দোয়াটির অর্থের দিকে খেয়াল করলে বুঝা যায় যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করাই এর উদ্দেশ্য। দোয়াটি বড়ই আবেগময়। কুনুতে দুটো দোয়াই প্রচলিত। এর একটি হানাফী মাযহাব অনুসারী নামাযীদের মধ্যে এবং অপরটি আহলি হাদীসের মধ্যে প্রচলিত। দোয়া দুটোর অনুবাদ এখানে পেশ করা হল :
“ হে আল্লাহ ! আমরা তোমারই সাহায্য চাই । তোমারি নিকট ক্ষমা চাই, তোমারই প্রতি ঈমান রাখি, তোমারই উপর ভরসা করি এবং সকল মঙ্গল তোমারই দিকে ন্যস্ত করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞ হয়ে চলি, অকৃতজ্ঞ হই না। আমরা তোমার অবাধ্যদের সাথে সম্পর্ক রাখিনা। হে আল্লাহ ! আমরা তোমারই দাসত্ব করি, তোমারই জন্য নামায পড়ি এবং তোমাকেই সিজদা করি। আমরা তোমারই দিকে দৌড়াই ও এগিয়ে চলি । আমরা তোমরাই রহমত আশা করি এবং তোমার আযাবকে ভয় করি । আর তোমার আযাবতো কাফিরদের জন্যই নির্ধারিত ।

“ হে আল্লাহ তুমি যাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছ, আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে তাদের মধ্যে শামিল কর। যাদেরকে ক্ষমা ও সুস্থতা দান করেছ, আমাকেও ক্ষমা ও সুস্থতা দান করে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর। তুমি তাদের অভিভাবক হয়েছ, আমাকেও তাদের মধ্যে শামিল কর। তুমি আমাকে যা দিয়েছ তাতে বরকত দান কর। তোমার মন্দ ফায়সালা থেকে আমাকে রক্ষা কর। তুমিই আসল ফায়সালাকারী, তোমার উপর কারো ফায়সালা চলে না। তুমি যার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছ তাকে কেউ অপদস্থ করতে পারে না। তুমি যাকে শত্র“ সাব্যস্ত করেছ তাকে কেউ ইজ্জত দিতে পারে না। হে আমাদের রব ! তুমিই বরকতময় ও মহান।

এ দোয়া দুটো আরবীতে নিম্নরূপ :
নামাযে শুধু একটি পড়লেই চলে, তবে দুটো পড়লেই তৃপ্তি বেশি হয়।

নামাযের প্রধান মাসয়ালা মাসায়েল

নামাযের নিয়ম-কানুন ও মাসয়ালা-মাসাযেল অনেক। নামায শিক্ষার বইতে তা পাওয়া যায়। এখানে এ বিষয়ে শুধু বিশেষ জরুরী কথাগুলো পেশ করা হচ্ছে :
নামাযের ফরয ও ওয়াজিব কয়টি তা ভালভাবে জানা প্রয়োজন। ফরয ও ওযাজিব ছাড়া বাকী সবই সুন্নাত ও মুস্তাহাব। ফরয ও ওয়াজিবগুলো চিনে নিলেই চলে এ সম্পর্কে তিনটি কথা জরুরী।
১. নামাযে কোন ফরয ভুলে বাদ পড়ে গেলে আবার নতুন করে নামায পড়তে হবে।
২. নামযে কোন এক বা একাধিক ওয়াজিব ভুলে বাদ পড়ে গেলে নামায শেষ করার আগে সহু সিজদা দিলেই নামায হয়ে শুদ্ধ যাবে।
৩. ফরয ও ওয়াজিব ছাড়া অন্য কিছু বাদ পড়ে গেলেও নামায নষ্ট হবে না; যদিও ত্রুটিযুক্ত হবে।
তাই কোনটা কোনটা ফরয আর কোনটা কোনটা ওয়াজিব তা না জানলে সঠিকভাবে নামায আদায় করা সম্ভব নয়।

নামাযে ১৪টি ফরয

নামাযে মোট চৌদ্দটি ফরযের মধ্যে নামায শুরুর আগেই ৭টি ফরয, আর নামাযের ভেতরে ৭টি ফরয ।
(ক) নামাযের বাইরের ৭টি ফরয :
শরীর পাক, পরনের কাপড় পাক, নামায পড়ার স্থান পাক, সতর ঢাকা, কিবলা রোখ হওয়া, ওয়াক্ত চিনে নামায পড়া ও নিয়াত করা।
(খ) নামাযের ভিতরের ৭টি ফরয :
তাকবীর তাহরীমা, দাঁড়ানো, কিরাআত, রুকু, সিজদা, শেষ বসা ও মুসল্লীর ব্যক্তিগত কাজের মাধ্যমে নামায শেষ করা ।এক্ষেত্রে সালাম সর্বোওম কাজ।

 

সব নামাযে মোট ১১টি ওয়াজিব

১. সূরা ফাতিহা পড়া,
২. সূরা ফাতিহার পর কুরআনে আরও কিছু পড়া,
৩. রুকুতে কিছুক্ষণ বিলম্ব করা,
৪. রুকুথেকেউঠে স্থিও হয়ে দাঁড়ানো
৫. সিজদায় কিছুণ বিলম্ব্ করা,
৬. দু’ সিজদার মাঝে স্থির হয়ে বসা
৭. প্রত্যেক বৈঠকে তাশাহুদ পড়া,
৮. সালাম শব্দ দ্বারা নামায শেষ করা,
৯. ফরয ও ওয়াজিবগুলো তারতীব মতো আদায় করা,
১০. ফরয নামাযে ফজর, মাগরিব ও ইশায় আওয়াজ করে কিরাআত পড়া এবং যোহর ও আসরে আওয়াজ না করা।
১১. তা’দীলে আরকান অর্থাৎ নামাযের রুকনসমূহ (কিরাআত, রুকু, সিজদা ) ধীরে সুস্থে আদায় করা ।

 

অতিরিক্ত আরও ৩টি ওয়াজিব

১. তিন ও চার রাকাআতের নামাযে দুরাকাআতের পর বসা।
২. বিতরের নামাযে দোয়া কুনুত পড়া।
৩. দু ঈদের নামাযে তাকবীর পড়া ।

 

নামাযে সমস্যা

নামায শেখার সময় মনে কোন অবস্থায় কী চেতনা রাখতে হবে তা না শেখায় এবং চেতনা ছাড়াই নামায পড়ায় অভ্যস্ত হওয়ায় নামাযে মনকে হাযির রাখা বিরাট সমস্যা মনে হয়। মনকে নামাযে ধরে রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও বারবার মন নামাযের বাইরে চলে যায় এবং নামাযের বাইরের খেয়াল মন দখল করে নেয়।

 

এর প্রতিকারের জন্য তিনটি কাজ করতে হবে :
১. আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মনটাকে কালবের মধ্যে গেড়ে রাখতে হবে। নড়ে গেলে আবার মযবুত করতে হবে। মনটাকে কালবে আটকে রাখার জন্য অবিরাম চেষ্টা করতে হবে।
২. নামাযে যা কিছু পড়া হয় তা এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যেন নিজের কানে শুনা যায়। মনোযোগ রখায় এটা অঅশ্যই সহায়ক । এতটা জোরে পড়া উচিত নয় যে অন্য লোক শুনতে পায়।
৩. নামাযে যে অবস্থায় যে চেতনা থাকা প্রয়োজন বলে আলোচনা করা হয়েছে তা অভ্যাস করতে হবে।

 

এভাবে কালব, মুখ ও কানের সমন্বয় সাধন করতে হবে। ল্ক্ষ্য রাখতে হবে যেন মনের অজান্তে মুখে উচ্চারণ না হয় বা বেখেয়ালী মধ্যে পড়া না হয়।

 

জীবন্ত নামাযের নমুনা

রাসূল (স) এর নামায
১. অন্তরের প্রশান্তি, “নামাযকে আল্লাহ তাআলা আমার জন্য চোখের শান্তি বানিয়েছেন । ” (হাদীস )
২. পেরেশান অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের মাধ্যমে স্বস্তি বোধ করতেন, “নামায ও সবরের মাধ্যমে সাহায্য চাও ।” (সূরা আল বাকারা )
৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ প্রত্যেক নবীর জন্য আল্লাহ একটা করে খাহেশ পয়দা করেছেন, আমার খাহেশ রাতের নামায । আল্লাহ প্রত্যেক নবীর জন্য একটি মর্যাদার লুকমা বানিয়েছেন, ৫ ওয়াক্তের নামায আমার লুকমা।”
৪. দীর্ঘ সময় দাঁড়াবার দরুন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পা বা হাটুঁ অবশ হয়ে যেত।

 

সাহাবায়ে কেরামের নামায
১. হযরত আবূ বকর (রা) খুটির মত নিশ্চল হয়ে নামাযে দাঁড়াতেন।
২. বল্লমের আঘাতে বেহুশ থাকা অবস্থায় হযরত ওমর (রা) কে নামাযের কথা বললে তিনি হুঁশ ফিরে পান।
৩. হযরত উসমান (রা) এর হত্যাকারীদেরকে লক্ষ্য করে তাঁর বিবি বললেন “তোমরা এমন লোককে হত্যা করলে যে রাতের নামাযে কুরআন খতম করতেন।
৪. হযরত আলী (রা) এর পায়ে বিদ্ধ তীর সিজদারত অবস্থায় সহজে খোলা গেল।
৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)অসুস্থ অবস্থায় চোখের চিকিৎসা ত্যাগ করলেন, কারণ চিকিৎসক সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সিজদা দিতে নিষেধ করেছিলেন।
৬. হযরত আবদুল্লহ ইবনে যুবাইর (রা) নিশ্চল থমের মত দাঁড়াতেন এবং বলতেন এটাই খুশু ।
৭. হযরত আবূ তালহা আনসারী (রা) বাগানে নামাযের সময় পাখির দিকে খেয়াল করায় রাকাআতের সংখ্যা ভুলে যাওয়ার কাফফারা হিসেবে ঐ বাগানটাই আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য রাসূল (স)কে দিয়ে দিলেন।
৮.এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর নিকট উপদেশ চাইলে তিনি বলনে “ যখন নামাযে দাঁড়াবে, জীবনের শেষ নামায মনে করে পড়বে।”

 

নামাযের শেষে দোয়া

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইমাম হিসেবে নামায পড়ালে নামাযের শেষ দিকে () বলে নামায শেষ করে মুসল্লীদের দিকে মুখ করে বসতেন যাতে যারা শেষ দিকে নামাযে শরীক হয়েছে তারা বুঝতে পারে যে জামায়াত শেষ হয়ে গেছে। ঘুরে বসার সময় তিনি আওয়ায দিয়ে আল্লাহু আকবার এবং তিনবার আসতাগফিরুল্লাহ বলতেন।

 

“আল্লাহর রাসূল (স) কিভাবে নামায পড়তেন” নামক বই থেকে বিস্তারিত জানা যায় যে, এ সময় তিনি কী কী দোয়া পড়তেন। এ সব দোয়ার কথাগুলোও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করায় সহায়ক।

আসলে মুমিনের জীবনটা আল্লাহময় হোক, এটাই নামাযের উদ্দেশ্য । আল্লাহ সব সময় দেখছেন এবং মনে যা চিন্তা-ভাবনা আসে তা সবই তিনি জানেন, এ চেতনা সবময় মুমিনকে পরিচালিত করুক জীবন্ত নামাযের এটাই লক্ষ্য ।

কুরআন ও হাদীস থেকে অনেকগুলো দোয়া বাছাই করে আমি একটি ছোট সংকলন তৈরি করেছি। বই আকারে আল্লাহর দরবারে ধরনা নামে তা প্রকাশিত। নামাযের ভেতরে ও বাইরের জন্য অনেক আবেগময় দোয়া এ সংকলনে রয়েছে। আমি ৫ ওয়াক্ত নামাযের জন্য দোয়া বাছাই করে নামাযের শেষে আল্লাহর দরবারে পেশ করি। প্রত্যেকেই তার পছন্দমতো দোয়া বাছাই করে নিতে পারেন। একসাথে সব দোয়া মনে থাকে না। এভাবে নির্দিষ্ট করে নিলে মনে থাকে।

নামায ও নামাযের বাইরের জীবন

নামায ও নামাযের বাইরের জীবনে স্বাভাবিক কারণেই একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। নামায যে মানের হয় সে মানেই বাইরের জীবনে এর প্রভাব পড়ে। যে নামাযকে শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান মনে করে তার জীবনে নামাযের কোন ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা নয়। কিন্তু যে নামাযকে কালেমায়ে তাইয়েবার ওয়াদা অনুযায়ী চলার ট্রেনিং হিসেবে গ্রহণ করে তার জীবনে নামাযের প্রভাব অবশ্যই পড়বে। নামায যে পরিমাণ জীবন্ত হবে সে পরিমাণ ইতিবাচক প্রভাবই নামাযীর বাস্তব জীবনে পড়বে।

 

সচেতন নামাযী সহজেই উপলব্ধি করতে পারবে যে নামাযের প্রভাব তার জীবনে কতটুকু পড়ছে । নামাযের বাইরের জীবনের প্রভাব নামাযের উপর পড়ে। বাস্তব জীবনে নামাযী যে পরিমাণ তাকওয়া অবলম্বন করতে সক্ষম হয়, সে পরিমাণেই নামাযের সময় প্রতিফলিত হয়। নামাযের বাইরে ঈমানের দাবি পূরণ করতে পারলে নামাযের সময় ঈমান-বিরোধী কোন ভাব মনে জাগবে না।

 

আমরা এটা রোজ যাচাই করে দেখতে পারি । বাইরের জীবনে বিবেকের বিরুদ্ধে কিছু করলে ওটা নামাযের সময়ও মনকে কলুষিত করবে। এ হিসেবে আমরা বলতে পারি যে, আমার নামাযে বাইরের জীবনের রিপোর্ট আসে এবং বাইরের জীবনে নামাযের রিপোর্ট পাওয়া যায় । নামায ও বাস্তব জীবন পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, অত্যন্ত ঘীনষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ।

নামাযের বাইরে মনকে কী কাজ দেয়া যায়?

নামাযের মাধ্যমে মনের যে ব্যাপক ট্রেনিং হয় এর সুফল যাতে বহাল থাকে সে উদ্দেশ্যে নামাযের বাইরে মনকে এমন কাজ দিতে হবে যাতে মন শয়তানের খপ্পরে না পড়ে ।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আমরা যখন কাজ করি তখন ঐ কাজটি ভালভাবে সমাধা করার জন্য মনোযোগ দিয়েই কাজটি করতে হয়। অবশ্য এটা কাজের ধরনের উপর অনেকটা নির্ভর করে। কৃষক ও শ্রমিককে শুধূ হাত-পা ব্যবহার করে গতানুগতিক ধরনের এমন কাজও করতে হয় যে কাজে মনের তেমন কোন দায়িত্ব থাকে না। রিক্সাওয়ালার দেহ রিক্সা টেনে নিয়ে যাবার সময় এ কাজে মনের তেমন কোন দায়িত্ব নেই বলে তখন হাজারো ভাব মনে জাগতে পারে।

কিন্তু হাত যখন কলম দিয়ে লেখে তখন মন এ কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, মুখ যখন বক্তৃতা করে অথবা কান যখন বক্তৃতা শুনে তখন মন এ কাজেই শরীক থাকে।

 

তাই আমাদেরকে হিসাব করতে হবে যে, দেহ যে কাজ করছে সে কাজে মনের দায়িত্ব কতটুকু আছে । যে কাজের সময় মন বেকার থাকে তখন তাকে কাজ দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে আমাদের অজান্তেই ইবলীস তাকে বাজে কাজে বেগার খাটাবে। এটাই মানব জীবনের বিরাট এক সমস্যা। মন অত্যন্ত শক্তিশালী যন্ত্র। এর যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা অসীম। কাজ ছাড়া এক মুহুর্তও থাকতে পারে না। তাকে সব সময়ই কাজ দেবার যোগ্যতা অনেকেরই নেই। ফলে আমাদের এ মূল্যবান কর্মচারী ইবলীসের বেগার খাটে।

আপনার দেহ কোথাও বসে বা দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে । ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বা পায়চারি করে কাটাতে হচ্ছে। একা একা পার্কে বা রাস্তায় ভ্রমণ করছেন। যানবাহনের অপেক্ষায় স্টেশনে বসে বা কিউতে দাঁড়িয়ে আছেন । যানবাহনে চুপচাপ বসে আছেন বা বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দৈনিক পরিশ্রম করার পর ক্লান্তি দূর করার উদ্দেশ্যে বসে বা শুয়ে আছেন। ঘুমের কামনায় বিছানায় চোখ বুঝে পড়ে আছেন। এমন বহু সময় রোজই আমাদের জীবনে কেটে যায় যখন সচেনতনভাবে আমরা মনকে কোন বিশেষ চিন্তায়, ভাবনায় বা পরিকল্পনা রচনায় ব্যবহার করি না। মনকে আমরা এভাবে যখনই বেকার রেখে দেই তখন সে ইবলীসের বেগার কর্মচারীতে পরিণত হয়।

এর প্রতিকার হিসেবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ইতিবাচক ও একটি নেতিবাচক উপদেশ দিয়েছেন। নেতিবাচক উপদেশটির সারমর্ম হলো, তোমরা আল্লাহকে লজ্জা কর। মনে এমন ভাব আসতে দিওনা, যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। আল্লাহ মনের গোপন ভাবও জানেন। তাই এ কথা খেয়াল রাখবে যে এমন কথা আমি মনে কী করে স্থান দিতে পারি যা আমার মনিব অপছন্দ করেন? এভাবে লজ্জাবোধ করলে মনকে বাগে রাখা যায়।

আর ইতিবাচক উপদেশ হলো, জিহ্বাকে সব সময় আল্লাহর যিকরে চলমান রাখা, যাকে হাদীসের ভাষায় () বলে । মনে খারাপ ভাব আসতে না দিলে মুখের যিকর মনকে যিকরে মশগুল রাখবে। অর্থাৎ মন ও মুখ কোনটাই খালি রাখা নিরাপদ নয়। মুখের যিকর মনকে যিকর করতে সাহায্য করে। মনকে দেবার মতো কোন কাজ না থাকলে তাকে যিকরে ব্যস্ত করে দিতে হবে এবং এ উদ্দেশ্য সফল করার জন্য মুখেও যিকর জারী করা দরকার ।

যিকরের ব্যাপারে এটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, শুধু ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ যিকর কোথাও শিক্ষা দেওয়া হয়নি । আল্লাহ’ শব্দের সাথে আল্লাহর কোন একটি গুণ থাকা দরকার । যেমন সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি । বুখারী শরীফের শেষে একটি চমৎকার তাসবীহ শেখানো হয়েছে।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম বলেন :()

অর্থ :দুটো বাক্য এমন আছে যা মুখে উচ্চারণ করা খুব সহজ, কিন্তু দাঁড়িপাল্লায় বেশ ভারী এবং আল্লাহর নিকট বড় প্রিয় । তাহলো, সুবাহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, সুবাহানাল্লাহিল আযীম।

 

কতক বাস্তব পরামর্শ

খালি মনকে কাজে ব্যস্ত রাখার জন্য কতক পরামর্শ পেশ করছি :
১. সব সময় সব অবস্থায় ইসলামী বই সাথে রাখুন, যখনই মন অবসর হয়ে যায়, বই পড়ুন । এটা যিকর থেকেও বেশি কার্যকর পন্থা । যিকরে মনোযোগের অভাব হতে পারে। পড়ার সময় তা হয় না। তাছাড়া সকল রকম নফল ইবাদাতের মধ্য দীনের ইলম তালাশ করা শ্রেষ্ঠতম।
২. অনেক সময় বই পড়ার পরিবেশ বা সুয়োগ থাকে না। তখন কয়েকটি কাজ করতে পারেন :
ক. কুরআন পাকের মুখস্থ করা সূরাগুলো আওড়াতে থাকুন । পরিবেশ অনুকূল থাকলে গুনগুন করেই পড়ুন।
খ. কালেমা তাইয়েবা, তিন তাসবীহ, দরূদ বা যে কোন যিকর মুখে ও মনে জপতে থাকুন।
গ. আপনার করণীয় কজাগুলো সুষ্ঠুভাবে করার পরিকল্পনা করুন। কারো সাথে আলোচনার কথা থাকলে বিষয়টি মনে গুছিয়ে নিন।
ঘ. নিঃশ্বাস টানার সময় সচেতনভাবে ‘লা ইলাহা’ এবং নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় ‘ইল্লাল্লাহ’ নিঃশব্দে মনে মনে পড়তে থাকুন।
ঙ. একটানা অনেকক্ষণ একই ধরনের কাজ করতে মন চায়না। তাই এসব কাজ অদল বদল করে করতে থাকুন।

 

নামায বহু কিছু শেখায়

১. যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে আদায় করে নামায তাকে সারাক্ষণ আল্লাহর কথা স্মরণ করায় । সর্বদা নামাযের সময় সম্পর্কে তাকে সচেতন থাকতে হয় । সে যে একমাত্র আল্লাহর দাস নামায তাকে সে কথা ভুলতে দেয়না।

 

আল্লাহ বলেন : () আমাকে মনে রাখার উদ্দেশ্যে নামায কায়েম কর। (সূরা তোয়া হা : ১৪)
২. যে মন-মানসিকতা ও জযবা নিয়ে নামায আদায় করতে হয় নামাযের বাইরের তৎপরতার সময়ও ঐ মন মানসিকতা ও জযবার প্রভাব জারী থাকে।
৩. নামায কড়াভাবে সময়ানুবর্তিতা শেখায় । বারবার যথাসময়ে নামাযের জামায়াতে হাযির হওয়ার ফলে সব কাজই সময় মতো করার অভ্যাস হয়।
৪. ঠিক মতো অযু করা, মসজিদে হাযির হওয়া, ইমামের আনুগত্য করা, ঠিক ঠিক মতো নামায আদায় করা ইত্যাদি নামাযীর জীবনে শৃঙ্খলাবোধ সৃষ্টি করে । সব কাজ গোছালোভাবে করার মানসিকতা গড়ে উঠে।
৫. নামায সামাজিক ও রাষ্টীয় জীবনে নিয়ম নীতি মেনে চলার প্রশিক্ষণ দেয়। ইমামের আনুগত্যের মাধ্যমে নেতার আনুগত্যের ট্রেনিং হয়। ইমাম ভুল করলে শালীন ভাষায় লুকমা দিয়ে ইমামকে সংশোধন করার মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করার ভদ্র-পদ্ধতির শিক্ষা লাভ হয়। নামায রাজনৈতিক ময়দানেও সুশৃঙ্খল ও শালীন হতে উদ্বুদ্ধ করে।

মুমিনের সাফল্যের হাতিয়ার

১. মুমিনকে মযবুতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার সৈনিক। আমি আর কোন শক্তির পরওয়া করি না। আমার রব, বাদশাহ, ইলাহ ও অভিভাবক এমন এক মহান সত্তা যার আশ্রয় নিলে আর কোনশক্তিকে ভয় করা দরকার হয় না।

 

আমার কিসের ভয়? আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে আগ্রহী । কারণ আমার রবের কাছে পৌঁছার ওটাই তো প্রবেশপথ । আমি শহীদী মৃত্যু কামনা করি । তাই দীনের কোন দুশমন আমাকে মেরে ফেলবে, সে ভয় করার প্রশ্নই উঠে না। মৃত্যু ভয়ই সকল দুর্বলতার মূল। আল্লাহর সৈনিকের মুত্যু ভয় থাকতে পারে না।নপ
২. মুমিনের সবচেয়ে মযবুত হাতিয়ার হলো জীবন্ত নামায । যার নামায জীবন্ত সে আল্লাহর নৈকট্যের অনুভূতি নিয়ে তৃপ্ত । এ সম্পদের কোন তুলনা নেই। তার নিকট দুনিয়া তুচ্ছ। সবর ও নামায দ্বারা আল্লাহর সাহায্য চাইবার নির্দেশ আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন।
৩. ইকামাতে দীনের আন্দোলনে জান ও মাল দিয়ে সর্বদা সক্রিয় থাকতে হবে। সর্বাবস্থায় পরম সবরের সাথে ইসলামী সংগঠনে সক্রিয় থেকে আল্লাহর নিকট বাইয়াতের দাবি পূরণ করতে হবে। সংগঠন ও আন্দোলন ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করতেই থাকে। এ বিষয়ে ঢিল দিলেই বিপদ । দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির জন্য এ তিনটি হাতিয়ারই যথেষ্ট।

 

শেষকথা

হাদীসে আছে যে, বেহেশতবাসীদের একটি আফসোস ছাড়া বেহেশতে আর কোন মনোবেদনা থাকবে না। দুনিয়াতে যে সময়টা আল্লাহকে ভুলে থেকে কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে ঐ অবহেলার জন্যই আফসোস করতে থাকবে। বেহেশত তো ঐ চিরস্থায়ী বাসস্থানেরই নাম যেখানে সামান্যতম দুঃখ কষ্ট এমনকি অভাব পর্যন্ত থাকবে না। অথচ একটা বিষয়ে আফসোস থেকেই যাবে। আফসোস তো মনোবেদনারই সৃষ্টি করে । এ দুঃখটুকু থেকেই যাবে সকলের বেলায় তা হয়তো সত্য নয়্ কিন্তু যাদের বেলায়ই হোক, এ বেদনাটুকুর অস্তিত্ব সত্য ।

 

এ আফসোসের কারণ তালাশ করলে হাদীসের বিবরণ থেকে তা বুঝা যায়। আল্লাহর দীদারই বেহেশতের সকল নিয়ামতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নিয়মাত বলে বেহেশত বাসীরা মনে করবে। আল্লাহ তাআলাকে দেখতে পাওয়ার চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কোনটাতেই তারা বোধ করবে না। আর সবাই সমান পরিমাণ সময় আল্লাহকে দেখতে পাবে না। যে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহকে যত বেশি স্মরণ করেছে সে তত বেশি সময় আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করবে। তাই যারা কম সময় দেখার সুয়োগ পাবে তারাই হয়তো ঐরকম আফসোস করবে।

তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের ভিত্তিতে জীবন যাপনের সিদ্ধান্ত যারা নেয় তারা মানব সমাজে আল্লাহর প্রভুত্ব কায়েমের জন্য সংগ্রাম করে । আর এ সংগ্রামের পরিণামে আখিরাতে সাফল্যের আশা রাখে । এ সিদ্ধান্ত তাদের মন-মগজ ও চরিত্রকে এক বিশেষ ছাঁচে গড়ে তোলে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হয়।

যা হোক, আপনি ইসলামী আন্দোলনে সক্রিয় হোন বা না হোন আখিরাতে মুক্তির কামনা তো নিশ্চয়ই করেন। তাহলে মনটাকে ইতিবাচক কাজ দিন । মনকে ইবলীসের বেগার কর্মচারী হতে দেবেন না। ইবলীস থেকে মনকে রক্ষা করতে হলে দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য অনিবার্য।

মনে রাখবেন, ইবলীসের বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম মৃত্যু পর্যন্ত— চালিয়ে যেতে হবে। এ সংগ্রাম থেকে অবকাশ পাওয়ার উপায় নেই। তবে দীর্ঘ অনুশীলনের ফলে ধীরে ধীরে আল্লাহর মেহেরবানীতে ইবলীসের পরাজয় হওয়া অসম্ভ নয়।
আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন : ()
“শয়তান তোমাদের দুশমন, তাকে দুশমনই মনে করবে। ”
হযরত আদম (আ) বেহেশতে শয়তানের ধোঁকায় এ কারণেই পড়েছিলেন যে, তিনি শয়তানকে শত্রু“ মনে করতে ভুলে গেলেন । (সূরা ফাতির : ৬ )

সমাপ্ত

সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )