রসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন
লিখেছেন আবু সলীম মুহাম্মদ আবদুল হাই   
Thursday, 21 February 2008
Image

রাসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন

পূর্ব-কথা

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর পবিত্র জীবনচরিত পর্যালোচনা করলে এর দু'টি বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে বেশি প্রতিভাত হয়ে উঠে। প্রথমত, তাঁর জীবনধারার অন্ত-র্নিহিত বৈপ্লবিক আদর্শ - যার ছোঁয়ায় মানব জাতির সমাজ ও সভ্যতায় এসেছে বৈপ্লবিক রূপান্তর। দ্বিতীয়ত, সে আদর্শের সু্ষ্ঠু রূপায়নের জন্যে তাঁর নির্দেশিত বৈপ্লবিক কর্মনীতি - যার সফল অনুস্মৃতির মাধ্যমে একটি অসভ্য ও উচ্ছৃঙ্খল জনগোষ্ঠী পেয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা ও সংস্কৃতির শিরোপা।

দুঃখের বিষয় যে, আজকের মুসলিম মানস থেকে বিশ্বনবীর পবিত্র জীবনচরিতের এই মৌল বৈশিষ্ট্য দু'টি প্রায় লোপ পেতে বসেছে। আজকের মুসলমানরা বিশ্বনবীর জীবন আদর্শকে দেখছে খণ্ডিত রূপে, নেহায়েত একজন সাধারণ ধর্মপ্রচারকের জীবন হিসেবে। এর ফলে তার জীবনচরিতের সমগ্র রূপটি তাদের চোখে ধরা পড়ছে না; তার জীবন আদর্শের বৈপ্লবিক তাৎপর্যও তারা উপলব্ধি করতে পারছে না। বস্তুত, আজকের মুসলিম মানসের এই ব্যর্থতা ও দীনতার ফলেই আমরা বিশ্বনবীর পবিত্র জীবনচরিত থেকে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন বৈপ্লবিক রুপান্তর ঘটানোর তাগিদ অনুভব করছি না ।

"রসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন" আমাদের এই কুষ্ঠাহীন উপলব্ধিরই স্বাভাবিক ফসল। বিশ্বনবীর বিশাল ও ব্যাপক জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়াদি এ পুস্তকের উপজীব্য নয়। এর বিষয়বস্তু প্রধানত তার বৈপ্লবিক আদর্শ ও কর্মনীতি । এই বিশেষ দু'টি দিকের উপরই এতে আলোকপাত করা হয়েছে সবিস্তারে। এতে জীবনের চরিতের অন্যান্য উপাদান এসেছে শুধু প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে।

পুস্তকটির মূল কাঠামো তৈরি করেছেন ভারতের বিশিষ্ট লেখক আবু সলীম মুহাম্মদ আবদুল হাই। তার সাথে আমরা সংযোজন করেছি অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে স্বভাবতই পুস্তকটির কলেবর হয়েছে মূলের তুলনায় অনেক সমপ্রসারিত। এর বর্তমান সংস্করণেও সন্নিবিষ্ট হয়েছে অনেক মূল্যবান তথ্য। পুস্তকটির বিষয়টির প্রেক্ষিতে এর বাংলা নামকরণ করেছেন আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন মরহুম কবি ফররুখ আহমদ। এর প্রথম অধ্যায়ে উদ্ধৃত কবিতাটির বাংলা অনুবাদ করে দিয়েও তিনি আমায় চির ঋণপাশে আবদ্ধ করে গেছেন।

বর্তমান সংস্করণে পুস্তকটির অঙ্গসজ্জা ও মুদ্রণ পরিপাট্যের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হয়েছে। কম্পিউটার কম্পোজের ফলে এ মুদ্রণই শুধু ঝকঝকে হয়নি, আগের তুলনায় এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে ১৬ পৃষ্ঠার মত। এছাড়াও পরিশিষ্ট পর্যায়ে "ইসলাম প্রচারে মহিলা সাহাবীদের ভূমিকা" শিরোনামে একটি নতুন অধ্যায়ও সংযোজিত হয়েছে এ সংস্করণে। এর ফলে পুস্তকটির সৌকার্য ও আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, পুস্তকটির এ সংস্করণও পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে বিপুল ভাবে।

ঢাকা ১ জানুয়ারী, ১৯৯৩
মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

রসূলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন

মূল:আবু সলীম মুহাম্মদ আবদুল হাই
অনুবাদ: মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান

ইসলামী আন্দোলন ও তার অনন্য বৈশিষ্ট্য

ইসলাম তথা হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর পয়গাম দুনিয়ার এক বিরাট সংস্কারমূলক আন্দোলন। সৃষ্টির আদিকাল থেকে বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে খোদা-প্রেরিত নবীগণ এই একই আন্দোলনের পয়গাম নিয়ে এসেছেন। এ কেবল একটি আধ্যাত্নিক আন্দোলনই নয়, বরং এটি মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে পরিব্যাপ্ত এক অভূতপূর্ব সংস্কার আন্দোলন। এটি একাধারে আধ্যাত্নিক, নৈতিক, সামাজিক, অর্থনীতিক ইত্যাদি সকল বৈশিষ্টের অধিকারি একটি ব্যাপক ও সর্বাত্নক আন্দোলন।মানব জীবনের কোন দিকই এ আন্দোলনের গণ্ডী-বহির্ভূত নয়।

ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্ব

দুনিয়ার সংস্কারমূলক বা বিপ্লবাত্নক আন্দোলন বহুবারই দানা বেধে উঠেছে;কিন্তু ইসলামী আন্দোলন তার নিজস্ব ব্যাপকতা এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যের দরুণ অন্যান্য সকল আন্দোলনের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।এ আন্দোলনের সাথে কিছুটা প্রাথমিক পরিচয় ঘটলেই লোকদের মনে প্রশ্ন জাগে :কিভাবে এ আন্দোলন উত্থিত হয়েছিল ?এর প্রবর্তক কিভাবে একে পেশ করেছিলেন এবং তার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?কিন্তু এ প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব পাওয়া গেলে শুধু ঐতিহাসিক কৌতূহলই নিবৃত হয়না, বরং এর ফলে আমাদের মানস পটে এমন একটি ব্যাপক ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারমূলক আন্দোলনের ছবি ভেসে উঠে, যা আজকের দিনেও মানব জীবনের প্রতিটি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করতে সক্ষম।এখানেই ইসলামী আন্দোলনের আসল গুরুত্ব নিহিত।

এ আন্দোলন যেমন মানুষকে তার প্রকৃত লাভ-ক্ষতির সঠিক তাৎপর্য বাতলে দেয়,তেমনি তার মৃত্যু পরবর্তী অনন্ত জীবনের নিগূঢ় তত্ত্বও সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়।ফলে প্রতিটি জটিল ও দুঃসমাধেয় সমস্যা থেকেই মানুষ চিরতরে মুক্তি লাভ করতে পারে। বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের এসব বৈশিষ্ট্য একে ঘনিষ্ট আলোকে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করবার এবং এর সর্ম্পকে উত্থাপিত দাবিগুলোর সত্যতা নিরুপণের জন্যে প্রতিটি কৌতূহলী মনকে অনুপ্রাণিত করে।

ইসলামী আন্দোলনকে জানবার ও বুঝবার জন্যেএ পর্যন্ত অনেক বই-পুস্তকই লেখা হয়েছে এবং আগামীতেও লেখা হতে থাকবে। এসব বই-পুস্তকের সাহায্যে ইসলামী আন্দোলন সর্ম্পকে বেশ পরিষ্কার একটি ধারণাও করা চলে,সন্দেহ নেই।কিন্ত প্রদীপ থেকে যেমন আলোকরশ্মি এবং ফুল থেকে খোশবুকে বিচ্ছিন্ন করা চলে না, তেমনি এ জন্যেই যখন ইসলামী আন্দোলনের কথা উঠে, তখন মানুষ স্বভাবতই এর আহ্বায়ক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনচরিত এবং এর প্রধান উৎস আল-কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানবার জন্যে উৎসুক হয়ে উঠে। এ ঔৎসুক্য খুবই স্বাভাবিক।

ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

একথা সর্বজনবিদিত যে, মানুষের নৈতিক জীবনের সংশোধন, তার ক্ষতিকর বৃত্তিগুলোর অপনোদন এবং জীবনকে সঠিকভাবে কামিয়াব করে তুলবার উপযোগী একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন পদ্ধতি উপস্থাপনই হচ্ছে মানবতার প্রতি সবচেয়ে পবিত্র এবং এটাই হচ্ছে তার সবচেয়ে সেরা খেদমত।এই উদ্দেশ্যেই দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ নিজ নিজ পথে কাজ করে গেছেন।কিন্তু এ ধরণের সংস্কারমূলক কাজ যাঁরা করেছেন, তাঁরা মানব জীবনের কয়েকটি মাত্র ক্ষেত্রকেই শুধু বেছে নিয়েছেন এবং তার আওতাধীনে থেকেই যতদূর সম্ভব কাজ করে গেছেন।কেউ আধ্যাত্নিক ও নৈতিক দিককে নিজের কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংশোধনের মধ্যে।কিন্তু মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের সুষম পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন এমন পূর্ণাঙ্গ সংস্কারবাদী একমাত্র খোদা-প্রেরিত নবীগণকেই বলা যেতে পারে।

মানব জাতির প্রতি বিশ্বস্রষ্টার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ এই যে, তার প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাওয়াত ও জীবন-চরিত কে তিনি অতুলনীয়ভাবে সুরক্ষিত রেখেছেন।বস্তুত এই মহামানবের জীবনী এমন নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে, দুনিয়ার অন্য কোন মহাপুরুষের জীবনী কিংবা কোন ঐতিহাসিক দলিলের লিপিবদ্ধকরণেই এতখানি সতর্কতা অবলম্বনের দাবি করা যেতে পারে না।পরন্ত ব্যাপকতার দিক দিয়ে এর প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, এতে হযরত (সা )-এর কথাবার্তা, কাজ-কর্ম জীবন-ধারা, আকার-আকৃতি, উঠা-বসা চলন-বলন, লেন-দেন, আচার-ব্যবহার, এমনকি খাওয়া পরা, শয়ন-জাগরণ এবং হাসি-তামাসার ন্যায় সামান্য বিষয়গুলো পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। মোটকথা, আজ থেকে মাত্র কয়েক শো বছর আগেকার বিশিষ্ট লোকদের সম্পর্কেও যে খুঁটিনাটি তথ্য জানা সম্ভবপর নয়, হযরত মুহাম্মদ (স) সম্পর্কে প্রায় দেড় হাজার বছর পরেও সেগুলো নির্ভুলভবে জানা যেতে পারে।

হযরত মুহাম্মদ(স)-এর জীবন-চরিত পর্যালোচনা করার আগে এর আর একটি বৈশিষ্ট্যের প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখা দরকার।তাহলো এই যে, কোন কাজটি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা কেবল সেই কাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অনুধাবণ করা চলে। কারণ প্রায়শই দেখা যায় যে, অনুকূল পরিবেশে যে সব আন্দোলন দ্রুতবেগে এগিয়ে চলে,প্রতিকূল পরিবেশে সেগুলোই আবার স্তিমিত হয়ে পড়ে।তাই সাধারণ আন্দোলনগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে,সেগুলোকে গ্রহণ করার জন্যে আগে থেকেই লোকদের ভেতর যথারীতি প্রস্তুতি চলতে থাকে।অত:পর কোন দিক থেকে হঠাৎ কেউ আন্দোলন শুরু করলেই লোকেরা স্বত:স্ফূর্তভাবে তার প্রতি সহানুভূতি জানাতে থাকে এবং এর ফলে আন্দোলনও স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে চলে।দৃষ্টান্ত হিসাবে দুনিয়ার আজাদী আন্দোলনগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।মানুষ স্বভাবতই বিদেশী শাসকদের জুলুম-পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং মনে মনে তার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে থাকে।অত:পর কোন সাহসী ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যভাবে আজাদীর দাবি উত্থাপন করে,তাহলে বিপদ-মুসিবতের ভয়ে মুষ্টিমেয় লোক তার সহগামী হলেও দেশের সাধারণ মানুষ তার প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে পারে না।অর্থনৈতিক আন্দোলনগুলোর অবস্থাও ঠিক এইরূপ। ক্রমাগত দু:খ-ক্লেশ এবং অর্থগৃধ্‌নু ব্যক্তিদের শোষণ-পীড়নে লোকেরা স্বভাবই এরূপ আন্দোলনের জন্যে প্রস্তত হতে থাকে।এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক বিধি-ব্যবস্থার সংশোধন এবংমানুষের দুঃখ-দুর্গতি মোচনের নামে দেশের কোথাও যদি কোনো বিপ্লবাত্মক আন্দোলন মাথা তুলে দাঁড়ায়, তাহলে লোকেরা স্বভাবতই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।কিন্তু এর বিপরীত -সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে উত্থিত একটি আন্দোলনের কথা ভেবে দেখা যেতে পারে।দৃষ্টান- হিসাবে বলা যায়, কোনো উগ্র মূর্তিপূজারী জাতির সামনে কোনো ব্যক্তি যদি মূর্তিপূজাকে নেহাত একটি অনর্থক ও বাজে কাজ বলে ঘোষণা করে, তাহলে তার ওপর কী বিপদ-মুসিবত নেমে আসতে পারে, একটু ভেবে দেখা দরকার।

বস্তুত ইসলামী আন্দোলনের আহ্বায়ক হযরত মুহাম্মদ(স) কী প্রতিকূল পরিবেশে তার কাজ শুরু করেছিলেন, তা স্পষ্টত সামনে না থাকলে তার কাজের গুরুত্ব এবং তার বিশালতা উপলব্ধি করা কিছুতেই সম্ভবপর হবে না। এ কারণেই তার জীবনচরিত আলোচনার পূর্বে তৎকালীন আরব জাহান তথা সারা দুনিয়ার সার্বিক অবস্থার ওপর কিছুটা আলোকপাত করা দরকার।

ইসলামী আন্দোলনের প্রাক্কালে দুনিয়ার অবস্থা

ইসলাম মানুষের কাছে যে দাওয়াত পেশ করেছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ হচ্ছে তাওহীদ। কিন্তু এই তাওহীদের আলো থেকেই তখনকার আরব উপদ্বীপ তথা সমগ্র দুনিয়া ছিল বঞ্চিত।তৎকালীন মানুষের মনে তাওহীদ সম্পর্কে সঠিক কোন ধারণাই বর্তমান ছিল না।এ কথা সত্যি যে হযরত মুহাম্মদ (স) এর আগেও খোদার অসংখ্য নবী দুনিয়ায় এসেছেন এবং প্রতিটি মানব সমাজের কাছেই তারা তাওহীদের পয়গাম পেশ করেছেন।কিন্তু মানুষের দুর্ভাগ্য এই যে, কালক্রমে এই মহান শিক্ষা বিস্মৃত হয়ে সে নিজেরই ইচ্ছা-প্রবৃত্তির দাসত্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং তার ফলে চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ,দেব-দেবী, নদী-সমুদ্র, পাহপড়-পর্বত, জ্বিন-ফেরেশতা, মানুষ-পশু ইত্যাকার অনেক বস্তুকে নিজের উপাস্য বা মাবুদের মধ্যে শামিল করে নেয়।এভাবে মানুষ এ খোদার নিশ্চিত বন্দেগীর পরিবর্তে অসংখ্য মাবুদের বন্দেগীর আবর্তে জড়িয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক দিক থেকে তখন পারস্য ও রোম এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি বর্তমান ছিলো । পারস্যের ধর্মমত ছিলো অগ্নিপূজা (মাজুসিয়াত) । এর প্রতিপত্তি ছিলো ইরাক থেকে ভারতের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। আর রোমের ধর্ম ছিলো খ্রিষ্টবাদ(ঈসাইয়াত)।এটি গোটা ইউরোপ ,এশিয়া ও আফ্রিকাকে পরিবেষ্টন করে ছিলো। এ দুটি বৃহৎ শক্তি ছাড়া ধর্মীয় দিক থেকে ইহুদী ও হিন্দু ধর্মের কিছুটা গুরুত্ব ছিলো। এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় সভ্যতার দাবি করত।

অগ্নিপূজা ছাড়া পারস্যে (ইরানে) নক্ষত্রপূজারও ব্যাপক প্রচলন ছিলো। সেই সঙ্গে রাজা-বাদশা ও আমির-ওমরাগণ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রজাদের খোদা ও দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলো। তাদেরকে যথারীতি সিজদা করা হত এবং তাদের খোদায়ীর প্রশস্তিমূলক সংগীত পরিবেশন করা হত।মোট কথা,সারা দুনিয়া থেকেই তাওহীদের ধারণা বিদায় নিয়েছিলো।

রোম সাম্রজ্য

গ্রীসের পতনের পর রোম সাম্রাজ্যকেই তখন দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা শক্তি বলে বিবেচনা করা হত। কিন্তু ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে এই বৃহৎ সাম্রাজ্যই অধঃপতনের শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়। রাষ্ট-সরকারের অব্যাবস্থা,শত্রুর ভয়,অভ্যন্তরীন অশান্তি ,নৈতিকতার বিলুপ্তি, বিলাসিতার আতিশয্য-এক কথায় তখন এমন কোন দুষ্কৃতি ছিলো না ,যা লোকেদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেনি। ধর্মীয় দিক থেকে তো কিছু লোক নক্ষত্র ও দেবতার কল্পিত মূতির পূজা-উপাসনায় লিপ্ত ছিলোই;কিন্তু যারা ঈসার ধর্মের অনুসারী বলে নিজেদের দাবি করত, তারাও তাওহীদের ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলো। তারা হযরত ঈসা(আঃ) ও মরিয়মের খোদায়ী মর্যাদায় বিশ্বাসী ছিলো। পরন্ত তারা অসংখ্য ধর্মীয় ফির্কায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিলো এবং পরস্পর লড়াই-ঝগড়ায় লিপ্ত থাকতো। তাদের মধ্যে কবর পূজার ব্যাপক প্রচলন ছিলো। পাদ্রীদের তারা সিজদা করত। পোপ ও বিভিন্ন পর্যায়ের ধর্মীয় পদাধিকারীগণ বাদশাহী,এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে খোদায়ী ক্ষমতা পর্যন্ত করায়ত্ত করে রেখেছিলো। হারাম ও হালালের মাপকাঠী তাদের হাতেই নিবদ্ধ ছিলো। তাদের কথাকে ‘খোদায়ী আইন’ বলে গণ্য করা হত। পাশাপাশি সংসারত্যাগ বা সন্ন্যাস ব্রতকে ধার্মিকতার উচ্চাদর্শ বলে মনে করা হতো এবং সকল প্রকার আরাম আয়েশ থেকে দেহকে মুক্ত রাখাই শ্রেষ্ঠ ইবাদত বলে বিবেচিত হতো।

ভারতবর্ষ

ধর্মীয় দিক থেকে ভারতে তখন‘পৌরাণিক যুগ’ বিদ্যমান ছিলো। ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসে এই যুগটিকে সবচেয়ে অন্ধকার যুগ বলে গণ্য করা হয়। কারণ এ যুগে ব্রাহ্মণ্যবাদ পুনরায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলো এবং বৌদ্ধদেরকে প্রায় নির্মূল করে দেয়া হয়েছিলো। এ যুগে শির্কের চর্চা মাত্রাতিরিক্ত রকমে বেড়ে গিয়েছিলো। দেবতাদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৩৩ কোটি পর্যন্ত পৌঁছেছিলো। কথিত আছে যে,বৈদিক যুগে কোন মূর্তি পূজার প্রচলন ছিলনা। কিন্তু এ যুগে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিলো। মন্দিরের পুরোহিতগণ অনৈতিকতার এক জীবন্ত প্রতীক। সরল প্রাণ লোকেদের শোষাণ ও লুন্ঠন করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। সে যুগে বর্ণবাদ বা জাতিভেদ প্রথার বৈষম্য চরমে পৌছেছিল। এর ফলে সামাজিক শৃংখলা ও ব্যাবস্থাপনা ধ্বংস হয়েছিল। সমাজপতিদের খেয়াল-খুশি মতো আইন কানুন তৈরি করে নেয়া হয়েছিল বিচার ইনসাফকে সম্পূর্ণরুপে হত্যা করা হয়েছিল। বংশ-গোত্রের দৃষ্টিতে লোকেদের মর্যাদা নিরুপন করা হতো। সাধারণ্যে মদপানের ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিলো। তবে খোদা প্রাপ্তির জন্য বন-জঙ্গল ও পাহাড়-পর্বতে জীবন কাটানো কে অপরিহার্য মনে করা হতো। কুসংস্কার ও ধ্বংসাত্নক চিন্তাধারা চরমে পৌছেছিলো। ভূত প্রেত , শুভাশুভ গণন এ ভবিষ্যৎ কথনে বিশ্বাস গোটা মানব জীবনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। যে কোন অদ্ভুত জিনিসকেই ‘খোদা’ বলে গণ্য করা হতো। যে কোন অস্বাভাবিক বস্তুর সামনে মাথা নত করাই ধর্মীয় কাজ বলে বিবেচিত হতো। দেব-দেবী ও মূর্তির সংখ্যা গণনা তো দূরের কথা , তা আন্দাজ অনুমানেরও সীমা অতিক্রম করেছিলো। পূজারিণী ও দেবদেবীদের নৈতিক চরিত্র অত্যন্ত লজ্জাকর অবস্থায় উপনীত হয়েছিলো। ধর্মের নামে সকল প্রকার দুষ্কর্ম ও অনৈতিকতাকে সর্মথন দেয়া হতো। এক এক জন নারী একাধিক পুরুষকে স্বামীরুপে গ্রহণ করতো। বিধবা নারীকে আইনের বলে সকল প্রকার সুখ সম্ভোগ থেকে জীবনভর বঞ্চিত করে রাখা হতো। এই ধরনের জুলুম মূলক সমাজরীতির ফলে জীবন- নারী তার মৃত স্বামীর জ্বলন- চিতায় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পর্যন্ত স্বীকৃত হতো। যুদ্ধে হেরে যাবার ভয়ে বাপ,ভাই ও স্বামী তাদের কন্যা , ভগ্নি ও স্ত্রীকে স্বহস্থে হত্যা করে ফেলতো এবং এতে তারা অত্যন্ত গর্ববোধ করতো। নগ্ন নারী ও নগ্ন পুরুষের পূজা করাকে পূণ্যের কাজ বলে গণ্য করতো। পূজা পার্বণ উপলক্ষে মদ্যপান করে তারা নেশায় চুর হয়ে যেত। মোদ্দাকথা, ধর্মাচরণ, নৈতিকতা ও সামাজিকতার দিক দিয়ে খোদার এই ভূখন্ডটি শয়তানের এক নিকৃষ্ট লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছিলো।

ইহুদী

আল্লাহর দ্বীনের অনুসারী হিসেবে কোনো সংস্কার-সংশোধন যদি প্রত্যাশা করা যেতো, তাহলে ইহুদীদের কাছ থেকেই করা যেতে পারতো। কিন্তু তাদের অবস্থাও তখন অধঃপতনের চরম সীমায় পৌছে গিয়েছিলো। তারা তাদের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন সব গুরুতর অপরাধ করেছে যে, তাদের পক্ষে কোনো সংস্কার মূলক কাজ করাই সম্ভব ছিলো না। তাদের মানসিক অবস্থা অত্যন- শোচনীয় আকার ধারণ করেছিলো। ফলে তাদের ভেতর কোনো নবীর আগমন ঘটলে তাঁর কথা শুনতে পর্যন্ত তারা প্রস্তুত ছিলো না। এজন্যে কতো নবীকে যে তারা হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। তারা এরুপ ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত ছিলো যে, খোদার সাথে তাদের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে ; সুতরাং কোনো অপরাধের জন্যেই তিনি তাদের শাস্তি দেবেন না। তারা এ-ও ধারণা করতো যে, বেহেস্তের সকল সুখ-সম্ভোগ শুধু তাদের জন্যেই নির্দ্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।নবুয়্যাত ও রিসালাতকে তারা নিজেদের মীরাসী সম্পত্তি বলে মনে করতো। তাদের আলেম সমাজ দুনিয়া-পুজা ও যুগ-বিভ্রান্তিতে চরমভাবে লিপ্ত হয়ে পড়েছিলো। বিত্তশালী ও শাসক সম্প্রদায়ের মনোতুষ্টির জন্যে সবসময় তারা ধর্মীয়বিধি-বিধানে হ্রাস-বৃদ্ধি করতে থাকতো। খোদায়ী বিধান সমূহের মধ্যে যেগুলো অপেক্ষাকৃত সহজতর এবং তাদের মর্জি মাফিক,সে গুলোই তারা অনুসরণ করতো;পক্ষান্তরে যেগুলো কঠিন ও অপছন্দনীয় ,সেগুলো অবলীলাক্রমে বর্জন করতো।

পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ ও খুন খারাবী করা তৎকালীন ইহুদীদের একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিলো। ধন-মালের লালসা তাদেরকে সীমাহীনভাবে অন্ধ করে তুলেছিলো এবং এদিক থেকে কিছুমাত্র ক্ষতি হতে পারে, এমন কোন কাজ করতেই তারা প্রস্তুত ছিলো না। এর ফলে তাদের নৈতিক চরিত্র অত্যন্ত দূর্বল হয়ে পড়েছিল। তাদের ভেতরে মুশরিকদের মত মূর্তিপূজাও প্রভাব বিস্তার করেছিল। যাদু-টোনা,তাবিজ-তুমার, আমল-তদবীর ইত্যাদি অসংখ্য প্রকার কুপ্রথা তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিলো এবং তওহীদের সঠিক ধারণাকে তা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো। এমন কি,যখন আল্লাহর শেষ নবী তওহীদের সঠিক দাওয়াত পেশ করেন। তখন এই ইহুদীরাই মুসলমানদের চেয়ে আরব মুশরিকদেরকে উত্তম বলে ঘোষণা করেন।

আরব দেশের অবস্থা

দুনিয়ার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনার পর এবার খোদ আরব দেশের প্রতি আমরা দৃষ্টিপাত করবো। কারণ, এই গুরুত্বপূর্ণ ভূ-খণ্ডেই আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী তার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন এবং এখানকার পরিস্থিতিই তাকে সর্বপ্রথম মুকাবেলা করতে হয়।

আরবের একটি বিরাট অংশ- কোরা উপত্যকা, খায়বার ও ফিদাকে তখন বেশির ভাগ বাসিন্দাই ছিল ইহুদী। খোদ মদীনায় পর্যন্ত ইহুদীদের আদিপত্য কায়েম ছিল। বাকী সারা দেশে পৌত্তলিক রীতি-রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। লোকেরা মূতি,পাথর ,নক্ষত্র,ফেরেশতা, জ্বিন প্রভৃতির পূজা-উপাসনা করতো ।অবশ্য এক আল্লাহর ধারণা তখনও কিছুটা বর্তমান ছিল। তবে তা শুধু এই পর্যন্ত যে, লোকেরা তাকে খোদাদের খোদা বা ‘সবচাইতে বড় খোদা’ বলে মনে করত। আর এই আকিদাও এতটা দুর্বল ছিল যে কার্যত তারা নিজেদের মনগড়া ছোটখাটো খোদাগুলোর পূজা উপাসনায়ই লিপ্ত থাকতো। তারা বিশ্বাস করতো যে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই সব ছোট খাটো খোদার প্রভাবই কার্যকর হয়ে থাকে। তাই বাস্তব ক্ষেত্রে তারা এগুলেরই পূজা উপাসনা করতো। এদের নামেই মানত মানতো ও কুরবানী করতো এবং এদের কাছেই নিজ নিজ বাসনা পূরণের আবেদন জানাতো। তারা এও ধারণা করতো এসব ছোট খাটো খোদাকে সন্তষ্ট করলেই আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তষ্ট হবেন।

এ ভ্রান্ত লোকেরা ফেরেস্থতাদেরকে খোদার পুত্র কন্যা বলে আখ্যা দিত। জ্বীনদের কে খোদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং খোদায়ীর অন্যতম শরিকদার বলে ধারণা করতো এবং এই কারণে তারা তাদের পূজা-উপাসনা করতো, তাদের কাছে সাহায্য কামনা করতো। যে সব শক্তিকে এরা খোদায়ীর শরিকদার বলে মনে করতো, তাদের মূর্তি বানিয়ে যথারীতি পূজা-উপাসনাও করতো। মূর্তি পূজার এতোটা ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল যে, কোথাও কোন সুন্দর পাথর খন্ড দৃষ্টি গোচর হলেই তারা তার পূজা-উপাসনা শূরু করে দিত। এমনকি, একান্তই কিছু না পাওয়া গেলে মাটির একটা স্তুপ বানিয়ে তার উপর কিছুটা ছাগ-দুগ্ধ ছিটিয়ে দিত এবং তার চারদিক প্রদক্ষিণ করতো।

মোট কথা, পূজা-উপাসনার জন্য আরবরা অসংখ্য প্রকার মূর্তি নির্মান করে নিয়েছিল। এসকল মূর্তির পাশাপাশি তারা গ্রহ নক্ষত্রেরও পূজা করতো। বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা বিভিন্ন নক্ষত্রের পূজা করতো। এর ভিতর সূর্য ও চন্দ্রের পূজাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা জ্বিন-পরী এবং ভূত-প্রেতেরও পূজা করতো। এদের সম্পর্কে নানা প্রকার অদ্ভূত কথা তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এছাড়া মুশরিক জাতি গুলোর মধ্যে আর যে সব কুসংস্কারের প্রচলন দেখা যায়,সেসব ও এদের মধ্যে বর্তমান ছিল।

এহেন ধর্মীয় বিকৃতির সাথে সাথে পারস্পারিক লড়াই-ঝগড়া আরবদের মধ্যে একটা সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। মামুলি বিষয়াদি নিয়ে তাদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ শুরু হয়ে যেতো এবং বংশ পরম্পরায় তার জের চলতে থাকতো। জুয়াখেলা ও মদ্যপানে তারা এতটা অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল যে, তখনকার দিনে আর কোন জাতিই সম্ভবত তাদের সমকক্ষ ছিল না।মদের প্রশস্তি এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট দুষ্কর্মগুলো প্রসংসায় তাদের কাব্য-সাহিত্য পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া সুদী কারবার,লুটপাট,চৌর্যবৃত্তি,নৃশংসতা রক্তপাত, ব্যভিচার, এবং এ জাতীয় অন্যান্য দুষ্কর্ম তাদেরকে প্রায় মানবরুপি পশুতে পরিণত করেছিল।আপন কন্যা সন্তানকে তারা অপয়া ভেবে জীবন্ত দাফন করতো। নির্লজ্জ আচরণে তারা এতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে, পুরুষ ও নারীর একত্রে নগ্নাবস্থায় কাবা শরীফ তওয়াফ করাকে তারা ধর্মীয় কাজ বলে বিবেচনা করতো। মোটকথা,ধর্মীয়,নৈতিক,সামাজিক,ও রাজনৈতিক জীবনে তখনকার আরব ভূমি অধঃপতনের চরম সীমায় উপনীত হয়েছিল।

ইসলামী আন্দোলনের জন্যে আরব দেশের বিশেষত্ব

আরব উপদ্বীপ তথা সমগ্র বিশ্বব্যাপী এই ঘোর অমানিশার অবসান ঘটিযে আল্লাহর পথভ্রষ্ট বান্দাদেরকে তারই মনোনীত পথে চালিত করার জন্যে একটি শুভ প্রভাতের যে একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শুভ প্রভাতটির সূচনার জন্যে আল্লাহ তা’আলা সারা দুনিয়ার মধ্যে আরব দেশকে কেন মনোনীত করলেন, প্রসঙ্গত এই কথাটিও আমাদের ভেবে দেখা দরকার।

আল্লাহ তা’আলা হযরত মুহাম্মদ(স)- কে সারা দুনিয়ার জন্যে হেদায়াত ও দিক-নির্দেশনা সর্বশেষ পয়গামসহ পাঠানোর জন্যে মনোনীত করেছিলেন। সুতরাং তার দাওয়াত সমগ্র দুনিয়ায়ই প্রচারিত হবার প্রয়োজন ছিল। স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, এই বিরাট কাজের জন্যে কোন এক ব্যক্তির জীবন-কালই যথেষ্ট হতে পারে না।এর জন্যে প্রয়োজন ছিল :আল্লাহর নবী তার নিজের জীবদ্দশায়ই সৎ ও পুণ্যবান লোকদের এমন একটি দল তৈরি করে যাবেন, যারা তার তিরোধানের পরও তার মিশনকে অব্যাহত রাখবেন। আর এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্যে যে ধরনের বিশেষত্ব ও গুণাবরীর প্রয়োজন ছিল, তা একমাত্র আরব অধিবাসীদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি উন্নত মানের এবং বিপুল পরিমানে পাওয়া যেত । উপরন্ত আরবের ভৌগোলিক অবস্থানকে দুনিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকার প্রায় কেন্দ্রস্থল বলা চলে। এসব কারণে এখান থেকেই নবীজীর দাওয়াত চারদিকে প্রচার করা সবদিক থেকেই সুবিধাজনক ছিল।

এছাড়া আরবী ভাষারও একটি অতুলনীয় বিশেষত্ব ছিল। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এই ভাষায় যতটা সহজে ও হৃদয়গ্রাহী করে পেশ করা যেতো, দুনিয়ার অন্য কোন ভাষায় তা সম্ভবপর ছিল না। সর্বোপরি, আরবদের একটা বড়ো সৌভাগ্য ছিল যে, তারা কোনো বিদেশি শক্তির শাসনাধীন ছিল না। গোলামীর অভিশাপে মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার যে নিদারুণ অধঃগতি সূচিত এবং উন্নত মানবীয় গুণাবলীরও অপমৃত্যু ঘটে,আরবরা সে সব দোষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। তাদের চারদিকে পারস্য ও রোমের ন্যায় বিরাট দুটি শক্তির রাজত্ব কায়েম ছিল; কিন্তু তাদের কেউই আরবদের কে গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারেনি ।তারা ছিল দুর্ধর্ষ প্রকৃতির বীর জাতি; বিপদ-আপদকে তারা কোনোদিন পরোয়া করতো না। তারা ছিল স্বভাবগত বীর্যবান;যুদ্ধ-বিগ্রহকে তারা মনে করতোএকটা খেল-তামাসা মাত্র । তারা ছিল অটল সংকল্প আর স্বচ্ছ দিলের অধিকারী। যে কথা তাদের মনে জাগতো,তা-ই তারা মুখে প্রকাশ করতো। গোলাম ও নির্বোধ জাতিসমূহের কাপুরুষতা ও কপট মনোবৃত্তির অভিশাপ থেকে তারা ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত। তাদের কাণ্ডজ্ঞান,বিবেক-বুদ্ধিও মেধা-প্রতিভা ছিল উন্নত মানের। সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ কথাও তারা অতি সহজে উপলব্ধি করতে পারতো। তাদের স্মরণ শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর; এক্ষেত্রে সমকালীন দুনিয়ার কোনো জাতিই তাদের সমকক্ষ ছিল না।তারা ছিল উদারপ্রাণ, স্বাবলম্বী ও আত্ম-মর্যাদা সম্পূর্ণ জাতি। করো কাছে মাথা নত করতে তারা আদৌ অভ্যস্ত ছিল না। সর্বোপরি, মরুভূমির কঠোর জীবন-যাত্রায় তারা হয়ে ওঠেছিল নিরেট বাস্তববাদী মানুষ। কোন বিশেষ পয়গাম কবুল করার পর বসে বসে তার প্রশস্তি কীর্তন করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না;বরং সে পয়গামকে নিয়ে তারা মাথা তুলে দাঁড়াতো এবং তার পিছনে তাদের সমগ্র শক্তি-সামর্থ্য নিয়োজিত করতো।

আরবদের সংশোধনের পথে বাধা

আরব দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, তার শক্তিশালী ভাষা এবং তার বাসিন্দাদের এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই আল্লাহ তা’আলা তাঁর সর্বশেষ নবীকে এই জাতির মধ্যে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত করেন, সন্দেহ নেই।কিন্তু এই অদ্ভূত কওম কে সংশোধন করতে গিয়ে খোদ হযরত মুহাম্ম্‌দ (স)-কে যে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়, তার গুরুত্বও কোনো দিক দিয়ে কম ছিল না। আগেই বলেছি, কোনো কাজের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে সে কাজটির চারদিকের অবস্থা ও পরিবেশের কথা বিচার করা প্রয়োজন ।এই দৃষ্টিতে বিচার করলে আরব ভূমির সেই ঘনঘোর অন্ধকার যুগে এ ইসলামী আন্দোলনের সূচনা ও তার সাফল্যকে ইতিহাসের এক নজিরবিহীন কীর্তি বলে অভিহিত করতে হয়। আর একারণেই আরবদের ন্যায় একটি অদ্ভূত জাতিকে দুনিয়ার নেতৃত্বের উপযোগী করে গড়ে তুলতে গিয়ে হযরত মুহাম্মদ(স)-কে যে সীমাহীন বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে, তাকেও একটা অলৌকিক ব্যাপার ছাড়া আরা কিছুই বলা চলে না।

কাজেই আরবদের এই বৈশিষ্ট্যেগুলো যে পর্যন্ত সামনে না রাখা হবে, সে পর্যন্ত হযরত মুহামামদ(স)- এর নেতৃত্বে সম্পাদিত বিশাল সংস্কার কার্যকে কিছুতেই উপলব্ধি করা যাবে না।এই কওমটির সংশোধনের পথে যে সমস্ত জটিলতার অসুবিধা বর্তমান ছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমরা এখানে বিবৃত করছি। আরবরা ছিল একটা নিরেট অশিক্ষিত জাতি।খোদার সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কিতজ্ঞান, নবুয়্যাতের স্বরূপ ও গুরুত্ব, ওহীর তাৎপর্য, আখিরাত সম্পর্কিত ধারণা, ইবাদতের অর্থ ইত্যাদি কোনো বিষয়ই তারা ওয়াকিফহাল ছিল না।পরন্ত তারা বাপ-দাদার আমল থেকেই প্রচলিত রীতিনীতি ও রসম রেওয়াজের অত্যন্ত অন্ধ অনুসারী ছিল এবং তা থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ দূরে সরতেও প্রস্তুত ছিল না। অথচ ইসলামের যাবতীয় শিক্ষাই ছিল তাদের এই পৈত্রিক ধর্মের সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্যদিকে শির্ক থেকে উদ্ভূত সকল মানসিক ব্যাধিই তাদের মধ্যে বর্তমান ছিল। অহংকার ও আত্মম্ভরিতার ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি হয়ে পড়েছিল প্রায় নিস্ক্রিয়।পারস্পরিক লড়াই-ঝগড়া তাদের একটা জাতীয় বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। এ জন্যে শান্ত মস্তিষ্কে ও গভীরভাবে কোনো কিছু চিন্তা করা তাদের পক্ষে সহজতর ছিল না।তাদের কিছু ভাবতে হলে তা যুদ্ধ-বিগ্রহের দৃষ্টিকোণ থেকেই ভাবতো, এর বাইরে তাদের আর কিছু যেন ভাববারই ছিল না।সাধারণভবে দস্যুবৃত্তি,লুটতরাজ ইত্যাদি ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়।এ থেকে সহজেই আন্দাজ করা চলে যে,হযরত মুহাম্মদ(স)-এর দাওয়াত তাদের ভেতর কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। তিনি যখন তাদের কে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান, তখন তাদের কাছে তা মনে হয়েছিল একটি অভিনব দুর্বোধ্য ব্যাপার। তারা বাপ-দাদার আমল থেকে যে সব রসম-রেওয়াজ পালনে অভ্যস্ত, যে সব চিন্তা-খেয়াল তারা মনের মধ্যে পোষণ করেছিল -এ দাওয়াত ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ দাওয়াতের মূল কথা ছিল : লড়াই-ঝগড়া বন্ধ করো, শান্তিতে বসবাস করো,দস্যুবৃত্তি ও লুটতরাজ থেকে বিরত থাকো, বদভ্যাস ও ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারা পরিহার করো, সর্বোপরি জীবিকার জন্যে হারাম পন্থা ত্যাগ করো। স্পষ্টতই বোঝা যায়,এ ধরণের একটি সর্বাত্মক বিপ্লবী পয়গামকে কবুল করা তাদের পক্ষে কত কঠিন ব্যাপার ছিল।

মোটকথা, তৎকালীন দুনিয়া অবস্থা, আরব দেশের বিশেষ পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট জাতির স্বভাব-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ব -এর কোন জিনিসই ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে অনুকূল ছিল না।কিন্তু যখন এর ফলাফল প্রকাশ পেলো,তখনই স্পষ্ট বোঝা গেল :
“বজ্রের ধ্বনি ছিল সেথবা ছিল সে ‘সওতে হাদী’
দিল যে কাঁপায়ে আরবের মাটি রাসূল সত্যবাদী।
জাগালো সে এক নতুন লগ্ন সকলের অন্তরে,
জাগায়ে গেল সে জনতাকে চির সুপ্তির প্রান্তরে!
সাড়া পড়ে গেল চারদিকে এই সত্যের পয়গামে,
হলো মুখরিত গিরি-প্রান্তর চির সত্যের নামে।”

বস্তুত এটই ছিল ইসরামী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মু’জিজা। এই মু’জিজার কথা যখন উত্থাপিত হয়, তখন স্বভবতই হযরত মুহাম্মদ(স)- জীবনধারা আলোচনা এবং তার পেশকৃত পয়গামকে নিকট থেকে উপলব্ধিকরার জন্যে প্রতিটি উৎসুক মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে এই বিষয়টি আমরা পাঠকদের সামনে তুলে ধরবার চেষ্টা করবো।

জন্ম ও বাল্যকাল

বংশ পরিচিতি

হযরত মুহাম্মদ(স)-এর সম্মানিত পিতার নাম আব্দুল্লাহ।তিনি ক’বার মুতাওয়াল্লী আবদুল মুত্তালিবের পুত্র ছিলেন। তার বংশ-পরম্পরা উর্ধ্ব দিকে প্রায় ষাট পুরুষ পর্যন্ত পৌঁছে ইব্রাহীম (আঃ)-তনয় হযরত ইসমাঈল(আ)-এর সাথে মিলিত হয়েছে।তার খান্দানের নাম কুরাইশ।আরব দেশের অন্যান্য খান্দানের মধ্যে এটিই পুরুষানুক্রমে সবচেয় শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত খান্দান বলে পরিগণিত হয়ে আসছে। আরবদেশের ইতিহাসে এই খান্দানের অনেক বড়ো বড়ো মান্য-গণ্য ব্যক্তির নাম দেখতে পাওয়া যায়।এদের ভেতর আদনান, নাযার, ফাহার, কালাব, কুসসী প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুসসী তার জামানায় কা’বা শরীফের মুতাওয়াল্লী ছিলেন ।তিনি অনেক বড়ো বড়ো স্মরণীয় কাজ করে গেছেন।যেমন : হাজীদের পানি সরবরাহ করা, তাদের মেহমানদারির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। তার পরেও তার খান্দানের লোকেরা এই সকল কাজ আঞ্জাম দিতে থাকে।এসব জনহিতকর কাজ এবং কা’বা শরীফের মুতাওয়াল্লী হবার কারণে কুরাইশরা সারা আরব দেশে অতীব সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ খান্দান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।সাধারণভাবে আরবে লুটতরাজ, রাহাজানি ইত্যাকার দুষ্কৃতি হিসেবে স্বীকতি প্রচলিত ছিল এবং এ কারণে রাস্তাঘাট আদৌ নিরাপদ ছিল না।কিন্তু কা’বা শরীফের মর্যাদাও হাজীদের খেদমতের কারণে কুরাইশদের কাফেলার ওপর কখনো কেউ হামলা করতো না।তারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ব্যবসায়ের পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারতো।

আব্দুল মুত্তালিবের দশটি(মতান্তরে বারোটি) পুত্র ছিল।কিন্তু কুফর বা ইসলামের বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তাদের মধ্যে পাঁচ জন মাত্র খ্যাতি লাভ করেন। প্রথম আব্দুল্লাহ, ইনি হযরত(স)-এর পিতা। দ্বিতীয়,আবু তালিব; ইনি ইসলাম কবুল করেননি বটে,তবে কিছুকাল হযরতের সাহায্য ও পৃষ্টপোষকতা করেছেন।তৃতীয়,হযরত হামযা(রা) এবং চতুর্থ,হযরত আব্বাস(রা)-এরা দুজনই ইসলামে সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন এবংইসলামের ইতিহাসে অতীব উচ্চ মর্যাদা লাভ করেন।আর পঞ্চম হচ্ছে আবু লাহাব;ইসলামের প্রতি বৈরিতার কারণে ইতিহাসে যার নাম সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। কুরাইশদের একটি গোত্রের নাম হচ্ছে জাহারা। এই গোত্রের ওহাব বিন আবদুল মানাফের কন্যা আমিনার সঙ্গে আবদুল্লাহর বিবাহ হয়। সমগ্র কুরাইশ খান্দানের ভেতর ইনি একজন বিশিষ্ট মহিলা ছিলেন।বিবাহকালে আবদুল্লাহর বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর।বিয়ের পর খান্দানী রীতি অনুযায়ী তিনি তিন দিন শ্বশুরালয়ে অবস্থান করেন।অতঃপর ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া গমন করেন। ফিরবার পথে মদিনা পর্যন্ত পৌঁছেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। ঐ সময় আমিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

জন্ম তারিখ

ঈসায়ী ৫৭১ সালের ২০ এপ্রিল মুতাবেক ৯ রবিউল আওয়াল সোমবারের সুবহে সাদিক।এই স্মরণীয় মুহূর্তে রহমতে ইলাহীর ফয়সালা মুতাবেক সেই মহান ব্যক্তিত্ব জন্ম গ্রহণ করলেন,সারা দুনিয়া থেকে জাহিলিয়াতের অন্ধকার বিদূরিত করে হেদায়েতের আলোয় গোটা মানবতাকে উদ্ভাসিত করার জন্যে যার আবির্ভাব ছির একান্ত অপরিহার্য এবং যিনি ছিলেন কিয়ামত পর্যন্ত এই দুনিয়ায় বসবাসকারী সমগ্র মানুষের প্রতি বিশ্বপ্রভুর পরম আর্শিবাদ স্বরূপ।জন্মের আগেই এই মহামানবের পিতার ইন্তেকাল হয়েছিল। তাই দাদা আবদুল মুত্তালিব এর নাম রাখলেন মুহাম্মদ(স)।

শৈশবে লালন-পালন

সর্বপ্রথম হযরত(স)- এর স্নেহময়ী জননী আমিনা তাকে দুধ পান করান। দু-তিন দিন পর আবু লাহাবের বাঁদী সাওবিয়াও তাকে স্তন্য দান করেন। সে জামানার রেওয়াজ অনুযায়ী শহরের সম্ভান- লোকেরা তাদের সন্তান-সন্ততিকে দুধ পান করানো এবং তাদের লালন -পালনের জন্য গ্রামাঞ্চলে পাঠিয়ে দিতেন।সেখানকার খোলা আলো-হাওয়ায় তাদের স্বাস্থ্য ভালো হবে এবং তারা বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিখতে পারবে বলে তারা মনে করতেন।কেনা, আরবের শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের ভাষা অধিকতর বিশুদ্ধ বলে ধারণা করা হতো।এই নিয়ম অনুযায়ী গ্রামের মেয়েরা শহরে এসে বড়ো বড়ো অভিজাত পরিবারের সন্তানদের লালন- পালনের জন্যে সঙ্গে নিয়ে যেতো।তাই হযরত(স)-এর জন্মের কয়েক দিন পরই হাওয়াযেন গোত্রের কতিপয় মহিলা শিশুর সন্ধানে মক্কায় আগমন করেন।এদের হালিমা সা’দিয়া নাম্নী এক মহিলাও ছিলেন। এই ভাগ্যবতী মহিলা অপর কোন বড়ো লোকের শিশু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আমিনার ইয়াতিম শিশু সন্তানকে নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

দু’বছর পর আমিনা তাঁর শিশু পুত্রকে ফেরত নিয়ে আসেন । এর কিছুদিন পর মক্কায় মহামারী বিস্তার লাভ করলো। তাই আমিনা তাকে আবার গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন ।সেখানে তিনি ছয় বছর পর্যন্ত অতিবাহিত করেন ।

হযরত (স)- এর বয়স যখন ছ’ বছর, তখন আমিনা তাকে নিয়ে মদিনায় গমন করেন সম্ভবত স্বামীর কবর জিয়ারত অথবা কোন আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করার জন্যে তিনি এই সফরে বের হন।মদিনায় তিনি প্রায় এক মাস কাল অবস্থান করেন। কিন্তু ফিরবার পথে আরওয়া নামক স্থানে তিনি মৃত্যু বরণ করেন এবং সেখানেই চিরতরে সমাহিত হন।

আম্মার মৃত্যুর পর হযরত(স)-এর লালন-পালন ও দেখা শোনার ভার দাদা আবদুল মুত্তালিবের ওপর অর্পিত হয়। তিনি হামেশা তাকে সঙ্গে-সঙ্গে রাখতেন।হযরত(স)- এর বয়স যখন আট বছর,তখন দাদা আবদুল মুত্তালিবও মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি হযরত(স)-এর লালন পালনের ভার পুত্র আবু তালিবের ওপর ন্যস্ত করে যান। তিনি এই মহান কর্তব্য অতীব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পালন করেন। আবু তালিব এবংআবদুল্লাহ (হযরতের পিতা)সহোদর ভাই ছিলেন।এদিক দিয়েও হযরত(স)- এর প্রতি আবু তালিবের গভীর মমত্ব ছিল।তিনি নিজের ঔরসজাত সন্তানদের চাইতেও হযরত(স)-কে বেশি আদায় যত্ন করতেন।শোবার কালে তিনি হযরত(স)-কে সঙ্গে নিয়ে শুইতেন;বাইরে বেরুবার সময়ও তিনি তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরুতেন।

হযরত(স)-এর বয়স যখন দশ-বারো বছর, তখন তিনি সমবয়স্ক ছেলেদের সঙ্গে মাঠে ছাগলও চরান।আরবে এটাকে কোন খারাপ কাজ বলে মনে করা হতো না।ভালো ভালো সম্ভান্ত ঘরের ছেলেরাও তখন মাঠে ছাগল চরাতো।

আবু তালিব ব্যাবসায় করতেন। কুরাইশদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার তিনি সিরিয়া যেতেন।হযরত(স)-এর বয়স তখন সম্ভবত বারো বছর; এসময় একবার আবু তালিব সিরিয়া সফরের ইরাদা করলেন।সফরকালীন কষ্টের কথা স্মরণ করে তিনি হযরত(স)-কে সঙ্গে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু হযরত(স)-এর প্রতি তার অত্যন্ত প্রগাঢ় মমতা ছিল; তাই সফরে রওয়ানা করার সময় তার সঙ্গে যাবার জন্যে হযরত(স) পীড়াপীড়ি শুরু করলে আবু তালিব তার মনে আঘাত দিতে পারলেন না।তিনি হযরত(স)-কে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

নবুয়্যাতের আগে

ফুজ্জারে যুদ্ধ

ইসলাম-পূর্বযুগে আরবদের মধ্যে এক সুদীর্ঘ ও অসমাপ্য ধারা বর্তমান ছিল। এর ভেতর সবচেয়ে ভয়ংকর ও মশহুর ছিল ফুজ্জারের যুদ্ধ।এই যুদ্ধ কুরাইশ ও কায়েস গোত্রসমূহের মধ্যে সংঘটিত হয়।এতে কুরাইশদের ভূমিকা ছির সম্পূর্ণ ন্যায়ানুগ ;তাই হযরত(স) ও কুরাইশদের পক্ষ থেকে এতে অংশগ্রহণ করেন।কিন্তু তিনি করো ওপর আঘাত হানেন নি এ যুদ্ধে প্রথমে কায়েস এবং পরে কুরাইশরা জয়লাভ করে। শেষ অবধি সন্ধি মারফত এর পরিসমাপ্তি ঘটে।

হিলফুল ফুযুল

এভাবে অনবরত যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে আরবের শত শত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল ।লোকদের না ছিল দিনের বেলায় কোন স্বস্তি আর নাছিল রাত্রে কোন আরাম।ফুজ্জারের যুদ্ধের পর এই পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে কিছু কল্যাণকামী লোক এর প্রতিকারের জন্যে একটা আন্দোলন শুরু করেন।হযরত(স)-এর চাচা জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব পরিস্থিতি দ্রুত শোধরাবার জন্যে বাস্তব ধর্মী কাজের প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলেন।এর কিছু দিন পর কুরাইশ খান্দানের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগন জমায়েত হয়ে নিম্নোক্ত চুক্তি সম্পাদন করেনঃ ১.আমরা দেশ থেকে অশান্তি দূর করবো।
২.পথিকের জান-মালের হেফাজত করবো।
৩.গরীবদের সাহায্য করতে থাকবো।
৪.মজলুমের সহায়তা করে যাবো।
৫.কোনো জালেমকে মক্কায় আশ্রয় দেব না।
এই চুক্তিতে হযরত(স) ও অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হন।নবুয়্যাতের জামানায় এ চুক্তি সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন :আমাকে ঐ চুক্তির বদলে যদি একটি লাল রং-এর মূল্যবান উটও দেয়া হতো, তবু তা আমি কবুল করতাম না।আজো যদি কেউ এরুপ চুক্তির জন্যে আমাকে আমন্ত্রণ জানায়, তাতে সাড়া দিতে আমি প্রস্তুত।

কা’বা গৃহের সংস্কার

তখন কা’বা গৃহের শুধু চারটি দেয়াল বিদ্যমান ছিল। তার ওপর কোনো ছাদ ছিল না।দেয়ালগুলোও বড়জোর মানুষের দৈর্ঘ্য সমান উঁচু ছিল।পরন্ত গৃহটি ছিল খূব নীচু জায়গায়। শহরের সমস্ত পানি গড়িয়ে সেদিকে যেতো।ফলে পানি প্রতিরোধ করার জন্যে বাঁধ দেয়া হতো। কিন্তু পানির চাপে বাঁধ বারবার ভেঙ্গে যেতো এবং গৃহ প্রাঙ্গনে পানি জমে উঠতো। এভাবে গৃহটি দিন দিন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল। তাই গৃহটি ভেঙ্গে ফেলে একটি নতুন মজবুত গৃহ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হল। সমগ্র কুরাইশ খান্দান মিলিতভাবে নির্মাণ কাজ শুরু করলো । কেউ যাতে এ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত না হয় , সেজন্য বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা গৃহের বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিলো।কিন্তু কা’বা গৃহের দেয়ালে যখন ‘হাজরে আসওয়াদ’ স্থাপনের সময় এলো তখন বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে তুমুল ঝগড়া বেধে গেলো।প্রত্যেক গোত্রই দাবি করছিল যে, এ খেদমতটি শুধু তারাই আঞ্জাম দেবার অধিকারী্‌ অবস্থা এতদূর গড়ালো যে, অনেকের তলোয়ার পর্যন্ত কোষমুক্ত হলো। চারদিন পর্যন্ত এই ঝগড়া চলতে থাকলো। পঞ্চম দিন আবু উম্মিয়া বিন মুগিরা নামক এক প্রবীণ ব্যক্তি প্রস্তাব করেন যে,আগামীকাল প্রত্যুষে যে ব্যক্তি এখানে সবার আগে হাজির হবে,এর মিমাংসার জন্যে তাকেই মধ্যস্থ নিয়োগ করা হবে। সে যা সিদ্ধান্ত করবে, তাই পালন করা হবে। সবাই এ প্রস্তাব মেনে নিলো।

পরদিন আল্লাহর কুদরতে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির ওপর সবার নজর পড়লো, তিনি ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মাদ(স)। ফয়সালা অনুযায়ী তিনি হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করতে ইচ্ছুক প্রতিটি খান্দান কে একজন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে বললেন্ ।অতঃপর একটি চাদর বিছিয়ে তিনি নিজ হাতে পাথরটিকে তার ওপর রাখলেন এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণকে চাদরের প্রান্ত ধরে পাথরটিকে ওপরে তুলতে বললেন। চাদরটি তার নির্দিষ্ট স্থান বরাবর পৌছলে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপন করলেন। এভাবে তিনি একটি সংঘর্ষের সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিলেন। এ সংঘর্ষে কতো খুন-খারাবী হতো,কে জানে!

এবার কা’বার যে নয়া গৃহ নির্মিত হলো,তার ওপর যথারীতি ছাদও দেয়া হলো;কিন্তু পুরো ভূমির গৃহ নির্মাণের উপযোগী উপকরণ না থাকায় এক দিকের ভূমি কিছুটা বাইরে ছেড়ে দিয়ে নয়া ভিত্তি গড়ে তোলা হলো। এই অংশটিকেই এখন ‘হিত্তিম’ বলা হয়।

ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ

আরবদের, বিশেষত কুরাইশদের পুরানো পেশা ছিল ব্যবসায় হযরত(স)-এর চাচা আবু তালিবও একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। এ কারণেই হযরত(স)-যখন যৌবনে পদার্পন করেন, তখনও তিনি ব্যবসায় কে অর্থোপার্জনের উপায় হিসাবে গ্রহণ করেন।কিশোর বয়সে চাচার সঙ্গে তিনি ব্যবসায় উপলক্ষে যে সফর করেন,তাতে তার যথেষ্ঠ সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।এ ব্যাপারে তিনি লোকদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রতিপন্ন হলেন।লোকেরা তার ব্যবসায়ে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নিজ নিজ মূলধন তার কাছে জমা করতে লাগলো।পরন্ত ওয়াদা পালন,সদাচরণ ন্যায়পরায়ণতা,বিশ্বস্ততা ইত্যাদি কারণেও তিনি লোকদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা অর্জন করলেন। এমনকি, লোকেরা তাকে ‘আস-সাদিক’(সত্যবাদী) ‘আল-আমীন’(বিশ্বস্ত) বলে সাধারণভাবে অভিহিত করতে লাগলো।ব্যবসায় উপলক্ষে তিনি সিরিয়া,বসরা, বাহরাইন ও ইয়েমেনে কয়েকবার সফর করেন।

খাদীজার সাথে বিবাহ

তখন খাদীজা নামে আরবে এক সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী মহিলা ছিলেন।তিনি হযরত(স)- এর দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন ছিলেন।প্রথম বিবাহের পর তিনি বিধবা হন এবং দ্বিতীয় বিবাহ করেন। কিন্তু কিছুদিন পর তার দ্বিতীয় স্বামীও মৃত্যুবরণ করেন এবং পুনরায় বিধবা হন।তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও সচ্চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। লোকেরা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘তাহিরা’(পবিত্রা) বলে ডাকতো।তার আগে ধন-দৌলত ছিল। তিনি লোকদের কে পুঁজি এবং পণ্য দিয়ে ব্যবসায় চালাতেন।

হযরত(স)-এর বয়স তখন পঁচিশ বছর। ইতোমধ্যে ব্যবসায় উপলক্ষে তিনি বহুবার সফর করেছেন। তার সততা,বিশ্বস্ততা ও সচ্চরিত্রের কথা জনসমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল।তার এ খ্যাতির কথা শুনে হযরত খাদীজা তার কাছে এই মর্মে পয়গাম পাঠান : আপনি আমার ব্যবসায়ের পণ্য নিয়ে সিরিয়া গমন করুন। আমি অন্যান্যদের কে যে হারে পারিশ্রমিক দিয়ে থাকি, আপনাকেও তা-ই দেবো। হযরত(স)- তার এই প্রস্তাব কবুল করলেন এবং পণ্যদ্রব্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত গমন করলেন।

খাদীজা হযরত(স)-এর অসামান্য যোগ্যতা ওঅতুলনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হয়ে প্রায় তিন মাস পর তার কাছে বিয়ের পয়গাম প্রেরণ করেন। হযরত(স)-তার পয়গাম মন্‌জুর করলেন এবং বিয়ের দিন-ক্ষণও নির্ধারিত হলো। নির্দিষ্ট দিনে আবু তালিব, হযরত হামযা এবং খান্দানের অপরাপর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে হযরত(স) খাদীজার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। আবু তালিব বিয়ের খোতবা পড়লেন। পাঁচ শো তালায়ী দিরহাম (স্বর্ণ-মুদ্রা) বিয়ের মোহরানা নির্ধারিত হলো।

বিবাহকালে হযরত খাদীজার বয়স চল্লিশ বছর এবং তার পূর্বোক্ত দুই স্বামীর ঔরসজাত দুই পুত্র ও এক কন্যা ছিল।

অসাধারণ ঘটনাবলী

দুনিয়ায় যতো বিশিষ্ট লোকের আবির্ভাব ঘটে তাঁদের জীবনে শুরু থেকেই অসাধারণ কিছু নিদর্শনাবলী লক্ষ্য করা যায় । এ দ্বারা তাঁদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা সহজেই অনুমান করা চলে । একথা অবশ্য এমন সব লোকের বেলায়ই প্রযোজ্য,যারা পরবর্তী কালে কোন বিশেষ খান্দান,কওম বা দেশের উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করে থাকেন। কিন্তু যে মহান সত্তাকে কিয়ামত অবধি সারা দুনিয়ার নেতত্বের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যাকে মানব জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের পূর্ণ সংস্কারের জন্যে প্রেরণ করা হয়েছে,তার জীবন-সূচনায় এমন অসাধারণ নিদর্শনাবলী তো প্রচুর পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হওয়ায় স্বাভাবিক। তাই স্বভাবই তার জীবনী গ্রন্থগুলোয় এ ধরণের নিদর্শনাবলীর প্রচুর উল্লেখ দেখা যায়। কিন্তু যে সকল ঘটনা প্রামাণ্য বিশুদ্ধ রেওয়ায়েতসহ উল্লিখিত হয়েছে, তার কয়েকটি নিম্নে উদ্ধৃত হলোঃহযরত(স) বলেছেনঃ ‘আমি যখন আমার মায়ের গর্ভে ছিলাম, তখন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, তার দেহ থেকে একটি আলো নির্গত হয়েছে এবং তাতে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত আলোকিত হয়ে গেছে।’বহু রেওয়ায়েত থেকে এ-ও জানা যায় যে, তখন ইহুদী ও খ্রিষ্টান এক নতুন নবীর আগমন প্রতিক্ষায় ছিল এবং এ ব্যাপারে তারা নানা রকম ভবিষ্যত বাণী করেছিল।

রাসূল (স)-এর বাল্যকালের একটি ঘটনা। তখন কা’বা গৃহ কিছুটা সংস্কার কার্য চলছিল এবং এ ব্যাপারে বড়োদের সাথে ছোট ছোট ছেলেরাও ইট বহণ করে নিয়ে যাচ্ছিল।এই ছেলেদের মধ্যে হযরত (স) এবং চাচা হযরত আব্বাসও ছিলেন। হযরত আব্বাস তাকে লক্ষ্য করে বললেনঃ‘তোমার লুঙ্গি খূলে কাঁধের ওপর নিয়ে নাও, তাহলে ইটের চাপে ব্যথা পাবে না।’তখন তো বড়োরা পর্যন্ত নগ্ন হতে লজ্জানুভব করতো না।কিন্তু হযরত(স) যখন এরুপ করলেন, নগ্নতার অনুভূতিতে সহসা তিনি বেহঁশ হয়ে পড়লেন।তার চোখ দুটো ফেটে বের হয়ে যাবার উপক্রম হলো। সম্ভিত ফিরে এলে তিনি শুধু বলতে লাগলেনঃ“আমার লুঙ্গি আমার লুঙ্গি ”। লোকেরা তাড়াতাড়ি তাকে লুঙ্গি পরিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর আবু তালিব তার অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বললেনঃ‘আমি সাদা কাপড় পরিহিত এক লোককে দেখতে পাই। সে আমাকে বললো, শিগগির সতর আবৃত কর।’সম্ভবত এই প্রথম হযরত(স) গায়েবী আওয়াজ শুনতে পান।

আরবে তখন আসর জমিয়ে কিসসা বরার একটা কুপ্রথা চালু ছিল। লোকেরা রাত্রি বেলায় কোন বিশেষ স্থানে জমায়েত হতো এবং কাহিনীকাররা রাতের পর রাত তাদের নানারুপ উদ্ভট কিস্‌সা-কাহিনী শোনাতো।বাল্য বয়সে হযরত(স)একবার এই ধরণের আসরে যোগদান করার ইরাদা করেন।কিন্তু পথিমধ্যে একটা বিয়ে মজলিস দেখার জন্যে তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং পরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। অতঃপর চোখ মেলে দেখেন যে ভোর হয়ে গেছে। এরুপ তার জীবনে আরো একবার সংঘটিত হয়। এভাবে আল্লাহ তা’আলা তাকে কুসংসর্গ থেকে রক্ষা করেন।

রাসূল(স) যে যুগে জন্মগ্রহণ করেন, তখন মক্কা মূর্তি-পূজার সবচেয়ে বড়ো কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল।খোদ কা’বা গৃহে তখন তিন শ’ ষাটটি মূর্তির পূজা হতো এবং তার নিজ খান্দানের লোকেরা অর্থাৎ কুরাইশরাই তখন কা’বার মুতাওয়াল্লী বা পূজারী ছিলেন।কিন্তু এতদ সত্ত্বও হযরত(স) কোনদিন মূর্তির সামনে মাথা নত করেন নি এবং সেখানকার কোন মুশরিকী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন নি। এছাড়া কুরাইশরা আর যে সব খারাপ রসম-রেওয়াজে অভ্যস্ত ছিল, তার কোন ব্যাপারে হযরত(স) কোনদিন তার খান্দানের সহযোগিতা করেন নি।

নবুয়্যাতের সূচনা

হযরত(স) এর বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি পৌঁছলো। তার জীবনে এবার আর একটি বিপ্লবের সূচনা হতে লাগলো। নির্জনে বসে একাকী আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা এবং আপন সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় অধঃপতন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনায় তিনি মশগুল হয়ে পড়লেন।তিনি ভাবতে লাগলেনঃ তার কওমের লোকেরা কিভাবে হাতে-গড়া মূর্তিকে নিজেদের মা’বুদ ও উপাস্য বানিয়েছে।নৈতিক দিক থেকে তারা কত অধঃপাতে পৌঁছেছে!তাদের এই সব ভ্রান্তি কি করে দূরীভূত হবে?খোদা-পরস্তির নির্ভুল পথ কিভাবে তাদের দেখানো যাবে? এই বিশ্ব-জাহানের প্রকৃত স্রষ্টা মালিকের বন্দেগী করা উচিত? এমন অসংখ্য রকমের চিন্তা ও প্রশ্ন তার মনের ভেতর তোলপাড় করতে লাগলো। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে এসব বিষয়ে তিনি গভীর ভাবে চিন্তা করতে লাগলেন।

হেরা গুহায় ধ্যান

মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত জাবালূন নূর-এ ‘হেরা’নামে একটি পর্বত-গুহা ছিল।হযরত(স) প্রায়শই সেখানে গিয়ে অবস্খান করতেন এবং নিবিষ্ট চিত্তে চিন্তা-ভাবনা ও খোদার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। সাধারণত খানাপিনার দ্রব্যাদি তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন, শেষ হয়ে গেলে আবার নিয়ে আসতেন।কখনো কখনো হযরত খাদীজা(র) ও তা পৌঁছে দিতেন।

সর্ব প্রথম ওহী নাযিল

এভাবে দীর্ঘ ছয়টি মাস কেটে গেল। হযরত চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। একদা তিনি হেরা গুহার ভেতর যথারীতি খোদার ধ্যানে মশগুল রয়েছেন্‌ সময়টি তখন রমজান মাসের শেষ দশক।সহসা তার সামনে আল্লাহর প্রেরিত এক ফেরেশতা আত্নপ্রকাশ করলেন। ইনি ফেরেশতা-শ্রেষ্ঠ জিবরাঈল(আ) ।ইনিই যুগ যুগ ধরে আল্লাহর রাসূলদের কাছে তার পয়গাম নিয়ে আসতেন।

হযরত জিবরাঈল(আ) আত্নপ্রকাশ করেই হযরত(স)-কে বললেনঃ‘পড়ো’। তিনি বললেনঃ ‘আমি পড়তে জানি না’।একথা শুনে জিবরাঈল(আ) হযরত(স)-কে বুকে জড়িয়ে এমনি জোরে চাপ দিলেন যে, তিনি থতমত খেয়ে গেলেন।অতঃপর হযরত(স)-কে ছেড়ে দিয়ে আবার বললেনঃ‘পড়ো’।কিন্তু তিনি আগের জবাবেরই পুনরুক্তি করলেন।জিবরাঈল(আ) আবার তাকে আলিঙ্গন করে সজোরে চাপ দিলেন এবং বললেনঃ‘পড়ো’। এবারও হযরত(স)জবাব দিলেনঃ‘আমি পড়তে জানি না।’পুনর্বার জিবরাঈল(আ) হযরত(স)-কে বুকে চেপে ধরলেন এবং ছেড়ে দিয়ে বললেনঃ

اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ{1} خَلَقَ الْإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ{2} اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ{3} الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ{4} عَلَّمَ الْإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ{5} 

“পড়ো তোমার প্রভুর(রব) নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন;সৃষ্টি করেছেন জমাট-বাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো এবং তোমার প্রভু অতীব সম্মানিত, যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে এমন জিনিস শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।”

এই হচ্ছে সর্বপ্রথম ওহী নাযিলের ঘটনা।এ ঘটনার পর হযরত(স) বাড়ি চলে গেলেন।তখন তার পবিত্র অন্তঃকরণে এক প্রকার অস্থিরতা বিরাজ করছিল।তিনি কাঁপতে কাঁপতে খাদীজা (রা) কে বললেনঃ‘আমাকে শিগগির কম্বল দ্বারা ঢেকে দাও’ খাদীজা(রা) তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। অতঃপর কিছুটা শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে এলে তিনি খাদীজা (রা)-এর কাছে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করলেন;বললেনঃ ‘আমার নিজের জীবন সম্পর্কে ভয় হচ্ছে’ খাদীজা(রা) বললেনঃ‘না, কক্ষনোই নয়।আপনার জীবনের কোন ভয় নেই।খোদা আপনার প্রতি বিমুখ হবেন না।কেননা আত্মীয়দের হক আদায় করেন;অক্ষম লোকদের ভার-বোঝা নিজের কাঁধে তুরে নেন;গরীব-মিসকিনদের সাহায্য করেন;পথিক-মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন।মোটকথা, ইনসাফের খাতিরে বিপদ- মুসিবতের সময় আপনিই লোকদের উপকার করে থাকেন।’

এরপর খাদীজা(রা) হযরত(স)-কে নিয়ে প্রবীণ খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা অরাকা বিন নওফেলের কাছে গমন করলেন।তিনি তাওরাত সম্পর্কে খুব ভালো পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। হযরত খাদীজা(রা) তার কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন।তিনি সব শুনে বললেনঃ ‘এ হচ্ছে মূসার ওপর অবতীর্ণ সেই ‘নামূস’(গোপন রহস্যজ্ঞানী ফেরেশতা)। হায়! তোমার কওমের লোকেরা যখন তোমাকে বের করে দেবে, তখন পর্যন্ত আমি যদি জিন্দা থাকতাম! হযরত(স) জিজ্ঞেস করলেনঃ আমার কওমের লোকেরা কি আমায় বের করে দেবে? অরাকা বললেনঃ তুমি যা কিছু নিয়ে এসেছো, তা নিয়ে ইতঃপূর্বে যে-ই এসেছে, তার কওমের লোকেরা তার সঙ্গে দুশমনি করেছে। আমি যদি তখন পর্যন্ত জিন্দা থাকি, তাহলে তোমায় যথাসাধ্য সাহায্য করবো’ এর কিছুদিন পরই অরাকার মৃত্যু ঘটে।

এরপর কিছুদিন জিবরাঈলের আগমন বন্ধ রইলো। কিন্তু হযরত(স) যথারীতি হেরা গুহায় যেতে থাকলেন।এই অবস্থা অন্তত ছয়মাস চলতে থাকলো।এই বিরতির ফলে কিছুটা ফায়দা হলো। মানবীয় প্রকৃতির দরুণ তার অন্তরে ওহী নাযিলের ঔৎসুক্য সঞ্চারিত হলো। এমন কি, এই অবস্থা কিছুটা বিলম্বিত হলে তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে জিবরাঈলের আগমন শুরু হলো। তবে ঘন ঘন নয়,মাঝে মাঝে। জিবরাঈল এসে তাকে এই বলে প্রবোধ দেন যে,আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল মনোনীত হয়েছেন। এরপর হযরত(স) শান্ত চিত্তে প্রতিক্ষা করতে লাগলেন। কিছুদিন পর জিবরাঈল ঘন ঘন আসা শুরু করলেন।

আন্দোলনের সূচনা

হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাযিলের পর কিছুদিন পর্যন্ত আর কোন ওহী আসেনি। এরপর সূরা মুদ্দাসিরের প্রারম্ভিক আয়াতসমূহ নাযিল হলো-

يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ{1} قُمْ فَأَنذِرْ{2} وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ{3} وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ{4} وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ{5} وَلَا تَمْنُن تَسْتَكْثِرُ{6} وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ{7} 

“হে কম্বল আচ্ছাদনকারী ওঠো এবং (ভ্রষ্টাচারী লোকদেরকে)ভয় দেখাও।আর আপন প্রভুর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। লেবাস-পোশাক পরিষ্কার রাখো এবং নোংরামী ও অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো। বেশি পাওয়ার উদ্দেশ্যে কারো প্রতি অনুগ্রহ করো না এবং আপন প্রভুর খাতিরে বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করো। ”

নবুয়্যাতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবার এটা ছিল সূচনা মাত্র।এবার তিনি যথারীতি হুকুম পেলেন যে,ওঠো এবং ভ্রষ্ঠ মানবতাকে কল্যাণ দেখাও লোকদের কে সতর্ক করে দাও যে, সফলতার পথ মাত্র একটি এবং তা হচ্ছে এক খোদার বন্দেগী ও আনুগত্য। যারা এই পথ অবলম্বন করবে, পরিণামে তারাই সফলকাম হবে আর যারা এ ছাড়া অন্য পথ অবলম্বন করতে চায়,তাদের কে আখিরাতে মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে ভয় দেখাও।তাদের কে বল, মানুষের জীবন-ধারা প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত শুধুমাত্র এক খোদার বন্দেগী,তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের স্বীকৃতির ওপর। একমাত্র এভাবেই মানুষ সর্ববিধ প্রকাশ্য নাপাকী ও গোপন নোংরামী থেকে বেঁচে থাকতে পারে। পক্ষান্তরে খোদা ছাড়া অন্যান্য শক্তির বন্দেগী হচ্ছে ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলার মূলীভূত কারণ।একইভাবে মানুষের পরস্পরের মধ্যে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণ করা উচিত;সে সদাচরণের বুনিয়াদ কোন পার্থিব স্বার্থ কিংবা লালসার ওপর স্থাপিত হওয়া উচিত নয়।

সংগ্রামের দুই পর্যায়

এখান থেকে হযরত(স)-এর জীবনের সংগ্রামী পর্যায় শুরু হলো। এই পর্যায়কে আমরা দুটি বড়ো বড়ো অংশে ভাগ করতে পারি। এক :হিজরতের পূর্বে মক্কায় অতিবাহিত অংশ;যাকে বলা হয় মক্কী পর্যায়। দুই :হিজরতের পর মদিনায় অতিক্রান্ত অংশ;একে বলা হয় মাদানী পর্যায়।প্রথম পর্যায তের বছর এবং দ্বিতীয় পর্যায় প্রায় দশ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

প্রথম পর্যায় :মক্কী জীবন

হযরত(স)-এর সংগ্রামী জীবনের এই পর্যায় তার নিজস্ব পরিণতির দিক দিয়ে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে এই পর্যায়েই ইসলামের ক্ষেত্র কর্ষিত হয়।এই পর্যায়ে মানবতার এমন সব উন্নত নমুনা তৈরি হয়,যাদের কল্যাণে উত্তর কালে ইসলামী আন্দোলন সারা দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে যে সব ইতিহাস ও নবী-চরিত পাওয়া যায়, তার কোথাও মক্কী পর্যায়ের বিস্তৃত ঘটনা দেখা যায় না।তাই এ পর্যায়ের গুরুত্ব এবং শিক্ষামূলক ঘটনাবলী অনুধাবণ করতে হলে কুরআনের মক্কী অংশ গভীর ভাবে অধ্যয়ন করা দরকার।প্রকৃতপক্ষে, এই পর্যায়ের সঠিক গুরুত্ব ঠিক তখন উপলব্ধি করা সম্ভব,যখন মক্কী সূরাসমূহের প্রকাশ-ভঙ্গি, তখনকার পরিস্থিতি ও ঘটনাবলীর বর্ণনা, তওহীদ ও আখিরাতের প্রমাণাদি, জীবন ও চরিত্র গঠনের নির্দেশাবলী এবং হক ও বাতিলের চরম সংঘাতকালে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে মুষ্টিমেয় কর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টা-সাধনার বিবরণ সামনে আসবে।

মক্কী জীবনের চার স্তর

হিজরতের পূর্বে হযরত(স) তার পবিত্র জীবনের যে অংশ মক্কায় অতিবাহিত করেন এবং যা ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন স্তর ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত হয, তাকে আপন বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে চারটি স্বতন্ত্র বিভক্ত করা যায়।

প্রথম স্তর :নবুয়্যাতের পর প্রায় তিন বছরকাল;এ সময়ে দাওয়াত ও প্রচারের কাজ গোপনে আঞ্জাম দেয়া হয়।

দ্বিতীয় স্তর :নবুয়্যাতের প্রকাশ্য ঘোষণার পর প্রায় দু’ বছরকাল। এ স্তরের প্রথম দিকে আন্দোলনের কিছু বিরোধিতা করা হয়।এরপর ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, নানারুপ অপবাদ দিয়ে, মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে এবং বিরুদ্ধ কথাবার্তা বলে তাকে দমিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়।

তৃতীয় স্তর :এতদসত্ত্বেও যখন ইসলামী আন্দোলন দৃঢ়ভাবে সামনে এগুতে থাকে, তখন জুলুম নির্যাতনের শুরু হয়।মুসলমানের ওপর নিত্য- নতুন জোর-জুলুম চলতে থাকে এই অবস্থা প্রায় পাঁচ- ছয় বছরকার অব্যাহত থাকে। এ সময় মুসলমানদের নানারুপ বিপদ-মুসিবতের সম্মুখীন হতে হয়।

চতুর্থ স্তর :আবু তালিব হযরত খাদিজা(রা)-এর ওফাতের পর থেকে হিজরত পর্যন্ত প্রায় তিন বছরকার। এ স্তরটি হযরত(স) এবং তার সঙ্গীদের জন্যে অত্যন্ত কঠিন সংকটকাল ছিল।

প্রথম স্তর :গোপন দাওয়াত নবুয়্যাতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হবার পর হযরত(স)-এর সামনে প্রথম সমস্যা ছিলোঃএক খোদার বন্দেগী কবুল করার ও অসংখ্য মিথ্যা খোদার অস্তিত্ব অস্বীকার করার দাওয়াত প্রথম কোন ধরণের লোকদের দেওয়া যাবে?দেশ ও জাতির লোকদের তখন যে অবস্থা ছিল,তার একটি মোটামুটি চিত্র ইতঃপূর্বে পেশ করা হয়েছে। এহেন লোকদের সামনে তাদের মেজাজ,পসন্দ ও অভ্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত কোন জিনিস পেশ করা বাস-বিকই অত্যন- কঠিন কাজ ছিল। তাই যে সব লোকের সঙ্গে বতেদিন হযরত(স) এর খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং যারা তার স্বভাব প্রকৃতি ও নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে সারাসরি অবহিত ছিলেন, তাদেরকেই তিনি সর্ব প্রথম দাওয়াতের জন্যে মনোনীত করলেন। কারণ, এরা হযরত(স)-এর সততা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নিঃসংশয় ছিলেন এবং তিনি কোন কথা বললে তাকে সরাসরি অস্বীকার করা এদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হযরত খাদীজা(রা)। তারপর হযরত আলী(রা), হযরত জায়েদ(রা), হযরত আবু বকর(রা) প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। আলী(রা) হযরত(স)-এর চাচাতো ভাই,জায়েদ(রা) গোলাম এবং আবু বকর(রা) ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।এরা বছরের পর বছর ধরে হযরত(স)-এর সাহচর্য লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাই সর্ব প্রথম হযরত খাদীজা(রা) এবং পরে অন্যান্যদের কাছে তিনি দাওয়াত পেশ করেন। এরাই ছিলেন ঊম্মাতের মধ্যে পয়লা ঈমান্দার -ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত প্রথম ভাগ্যবান দল। এরা হযরত(স)-এর কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গেই তার সত্যতা স্বীকার করেন।এদের পর হযরত আবু বকর(রা)-এর প্রচেষ্টায় হযরত উসমান(রা), হযরত জুবাইর(রা), হযরত আব্দুর রহমান বিন আওফ(রা), হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস(রা) হযরত তালহা(রা) প্রমুখ ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে গোপনে গোপনে ইসলামের দাওয়াত ছড়াতে লাগলোএবং মুসলমানের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগলো।

কুরআনের অনন্য প্রভাব

এপর্যায়ে কুরআনের যে অংশগুলো নাযিল হয়েছিল, তা ছিল আন্দোলনের প্রথম স্তরের উপযোগী ছোট-খাটো বাক্য সমন্বিত। এর ভাষা ছির অতীব প্রাঞ্জল, কবিত্বময়, ও হৃদয়গ্রাহী। পরন্ত এতে এমন একটা সাহিত্যিক চমক ছির যে, শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তা শ্রোতার মনে প্রভাব বিস্তার করতো এবং এক একটি কথা তীরের ন্যায় বিদ্ধ হতো। এসব কথা যে শুনতো তার মনেই প্রভাব বিস্তার করতো এবং বারবার তা আবৃত্তি করার ইচ্ছা জাগতো।

আকিদা-বিশ্বাসের সংশোধন

কুরআন পাকের এই সূরাগুরোতে তওহদি ও আখিরাতের তাৎপর্য বর্ণনা করা হচ্ছিল। এ ব্যাপারে এমন সব প্রমানাদি পেশ করা হচ্ছিল, যা প্রতিটি শ্রোতার মনে বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছিল। এসব দলিল প্রমাণ শ্রোতাদের নিকটতম পরিবেশ থেকেই পেশ করা হচ্ছিল। পরন্ত এসব কথা এমন ভঙ্গিতে পেশ করা হচ্ছিল, যে সম্পর্কে শ্রোতারা পুরোপুরি অভ্যস্ত ও অবহিত ছিল। তাদেরই ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে এসব কথা বোঝাবার চেষ্টা করা হচ্ছিল। আকিদা-বিশ্বাসের যে সব ভ্রান্তি সম্পর্কে তারা ওয়াকিফহাল ছিল, সেগুলো সম্পর্কেই আলোচনা করা হচ্ছিল্‌ এ কারণেই খোদার এই কালাম শুনে কেউই প্রভাবিত না হয়ে পারছিল না। খোদার নবী প্রথমে একাকীই এই আন্দোরন শুরু করেছিলেন। কিন্তু কুআনের এই প্রাথমিক আয়াতসমূহ এ ব্যাপারে অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে। ফলে গোপনে গোপনে আন্দোলন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিস্তার লাভ করতে থাকে।

এ পর্যায়ে দাওয়াত প্রচারের জন্যে তওহীদ ও আখিরাতের দলিল-প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে এই বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্যে খোদ হযরত(স)-কে কিভাবে আত্মপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং কি কি পন্থা তাকে অবলম্বন করতে হবে সে সম্পর্কেও তাকে সরাসরি শিক্ষাদান করা হচ্ছিল।

চুপিসারে নামায

এ পর্যন্ত সবকিছু গোপনে গোপনেই হচ্ছিল্‌ নেহাত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য লোক ছাড়া বাইরের কারো কাছে কোন কিছু যাতে ফাঁস না হয়ে যায়, সেজন্যে হামেশা সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছিল। নামাযের সময় হলে হযরত(স) আশেপাশের কোন পাহাড়ের ঘাঁটিতে চলে যেতেন এবং সেখানে নামায আদায় করতেন। একবার তিনি হযরত আলী(রা) কে সঙ্গে নিয়ে কোন এক জায়গায় নামায পড়ছিলেন। এমন সময় তার চাচা আবু তালিব ঘটনাক্রমে সেখানে এসে হাজির হলেন।তিনি অনেকক্ষণ ধরে ইবাদতের এই নতুন পদ্ধতি তাজ্জবের সাথে লক্ষ্য করলেন। নামায শেষ হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘এটা কোন ধরণের দ্বীন।’ হযরত(স) জববি দিলেনঃ‘আমাদের দাদা ইবরাহীম(আ)-এর দ্বীন।’ আবু তালিব বললেনঃ‘বেশ, আমি যদিও এটা গ্রহণ করতে পারছি না, তবে তোমাকে পালন করার পুরো অনুমতি দিলাম। কেউ তোমার পথে বাদ সাধতে পারবে না।’

এ যুগের মুমিনের বৈশিষ্ট্য

এই প্রারম্ভিক যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, এ সময় ইসলাম গ্রহণ ছিল প্রকৃতপক্ষে জীবন নিয়ে বাজী খেলার নামান্তর। কাজেই এ যুগে যারা সামনে অগ্রসর হয়ে ইসলামের দাওয়াত কবুল করেন, তাদের মধ্যে অবশ্যই কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল,যার ভিত্তিতে তারা এ বিপদ সঙ্কুল পথে অগ্রসর হবার সাহস পেয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই :এসব লোক আগে থেকেই মুশরিকী রসম রেওয়াজ ও ইবাদত বন্দেগীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ এবং সত্যের জন্যে অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। স্বভাব-প্রকৃতির দিক দিয়ে এরা ছিলেন সৎ ওসত্যের অধিকারী।

প্রায় তিন বছর যাবত দাওয়াত ও প্রচারের কাজ এভাবে গোপনে গোপনে চলতে লাগলো।কিন্তু কতদিন আর এভাবে চলা যায়!যে সূর্যকে আপন রশ্মি দ্বারা সারা দুনিয়াকে আলোকময় করে তুলতে হবে, তাকে তো লোকচক্ষুর সামনে আত্মপ্রকাশ করতে হবেই। তাই আন্দোলন এবার দ্বিতীয় পর্যায়ে পদার্পণ করলো।

দ্বিতীয় স্তর : প্রকাশ্য দাওয়াত

এবার গোপন কর্মসূচি পরিহার করে প্রকাশ্যেই দাওয়াত প্রচারের আদেশ পাওয়া গেল। সুতরাং একদিন হযরত(স) সাফা পর্বতের ওপর আরোহণ করলেন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে উচ্চেঃস্বরে বললেনঃ‘ইয়া সাবা হা -হে সকাল বেলার জনতা!’ আরবে সে সময একটা নিয়ম ছিল এই যে, কখনো কোন বিপদ দেখা দিলে কোন উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ এই সাংকেতিক কথাটি উচ্চারণ করতো। লোকেরা এই সংকেত ধ্বনি শুনেই দ্রুত সেখানে জমায়েত হলো। এদের মধ্যে তার চাচা লাহাবও ছিল।

হযরত(স) সমবেত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃহে লোক সকল! আমি যদি বলি যে, এই পাহাড়ের পিছনে বিরাট একদল শত্রু সৈন্য তোমাদের ওপর হামলা চালানো জন্যে ওঁত পেতে আছে, তাহলে তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে?রোকেরা বললোঃ ‘নিশ্চয় করবো।তুমি তো কখনো মিথ্যা কথা বল নি। আমরা তোমাকে আস সাদিক এবং আল-আমিন বলেই জানি।’ হযরত(স) বললেনঃ‘তাহলে শোন,আমি তোমাদেরকে এক খোদার বন্দেগীর দিকে আহ্ববান জানাচ্ছি এবং মূর্তি পূজার পরিণাম থেকে তোমাদের কে বাঁচাতে চাচ্ছি। তোমরা যদি আমার কথা না মানো, তাহলে তোমাদের এক কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছি।

কুরাইশরা একথা শুনে যারপরনাই অসন্তষ্ট হলেন।আবু লাহাব ক্রুদ্ধ হয়ে বলে উঠলোঃ‘ব্যস এটুকু কথার জন্যেই বুঝি তুমি সাত সকালে আমাদেরকে ডেকেছিলে?

এটা ছিল ইসলামের সাধারণ ও প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা।এবার রাসূলে খোদা অত্যন্ত খোলাসা করে জানিয়ে দিলেন যে, তাকে কি কথা বারবার এবং কোন রাজপথের দিকে লোকদের আহ্ববান জানাবার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করলেনঃ এই বিশাল সাম্রাজ্যের স্রষ্টা ও মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তা’আলা।তিনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই তার প্রকৃত মালিক। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা হচ্ছে এই যে, সে এক আল্লাহর বান্দা এবং গোলামের বেশি কিছু নয়। তারই আনুগত্য ও ফরমাবর্দারী করা প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য(ফরয)। তিনি ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করা অথবা তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করা মালিক কর্তৃক প্রদত্ত মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। প্রকৃতপক্ষে এক আল্লাহই মানুষ এবং তামাম জাহানের স্রষ্ঠা, মা’বুদ ও শাসক। তার এই সাম্রাজ্যের ভেতর মানুষ না পূর্ণ স্বাধীন আর না অন্য কারো গোলাম। মানুষের কাছে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আনুগত্য -বন্দেগী বা পূজা-উপাসনা -পাওয়ার যোগ্য নয়। দুনিয়ার এই জীবনে আল্লাহ মানুষ কে কিছুটা কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন বটে, কিন্তু আসলে দুনিয়ার জীবন একটা পরীক্ষাকাল ছাড়া আর কিছুই নয়। এ পরীক্ষার পর অবশ্যই মানুষকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে এবং তিনি সমস্ত কাজ কর্ম যাচাই করে পরীক্ষার সাফল্য ও ফলাফল ঘোষণা করবেন।

এ ঘোষণা কোন মামুলি ব্যাপার ছিল না।এর ফলে গোটা কুরাইশ এবং অন্যান্য গোত্রের ভেতর আগুন জ্বলে উঠলো এবং চারদিকে এ সম্পর্কে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেল।কয়েকদিন পর হযরত(স) আলী(র)-কে একটি ভোজ সভার আয়োজন করতে বললেন। এতে গোটা আবদুল মুত্তালিব খান্দানকে আমন্ত্রণ করা হলো। এ ভোজ সভায় হামজাহ, আবু তালিব, আব্বাস প্রমুখ সবাই শরীক হলেন।পানাহারের পর হযরত(স) দাঁড়িয়ে বললেনঃআমি এমন একটি জিনিস নিয়ে এসেছি, যা দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যেই যথেষ্ঠ। এই বিরাট বোঝা উত্তোলনে কে আমার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছেন? এটা ছিল অত্যন্ত কঠিন সময়। চারদিকে শুধু বিরোধিতার ঝাণ্ডা উত্তোলিত হচ্ছিল। সুতরাং এবোঝা উত্তোরনে সহযোগিতা করার অর্থ ছিল এইযে, শুধু দু’একটি খান্দান, গোত্র শহরের লোকদেরই নয়, বরং গোটা আরবের বিরোধিতা মুকাবেলা করার জন্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রস্তুত হতে হবে।তাকে এ জন্যেও তৈরি হতে হবে যে, এর বিনিময়ে শুধু আখিরাতের জিন্দেগী সফলকাম হবে এবং সে আপন মালিকের সন'ষ্টি লাভ করতে পারবে।এছাড়া দূরব্যাপী দৃষ্টি নিক্ষেপ করেও তাৎক্ষণিক ফায়দা লাভের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না।ফলে সমস্ত মজলিসের ওপর একটা নিস্তব্ধতা নেমে এলো।উঠে দাঁড়ালেন শুধু কিশোর আলী। তিনি বললেনঃ ‘আমার চোখে যদিও যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে, আমার হাঁটুদ্বয় অত্যন্ত দুর্বল, পরন্ত বয়সেও আমি সবার ছোট, তবুও আমি আপনার(হযরতের) সহযোগিতা করে যাবো।মাত্র তেরো বছর বয়স্ক একটি বালক না বুঝে-শুনে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলো। গোটা কুরাইশ খান্দানের পক্ষে এটা ছিল এক বিস্ময়কর দৃশ্য।

আন্দোলনের বিরোধিতা

এ পর্যন্ত ইসলামী সংগঠনে চল্লিশ কি তার চেয়ে কিছু বেশি লোক যোগদান করেছিল। এরপর একদিন হযরত(স) কা’বা শরীফে গিয়ে তওহীদের কথা ঘোষণা করলেন।মুশরিকদের কাছে এটা ছিল কাবা শরীফের সবচেয়ে বড় অবমাননা।এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এক বিরাট হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেল। চারদিক থেকে লোকেরা এসে হযরত(স)- এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।হযরত হারিস বিন আবী হালাহ(রা)তাকে সাহায্য করার জন্যে ছুটে এলেন।কিন্তু চারদিক থেকে এত তলোয়ার ঝনঝনিয়ে উঠলো যে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।ইসলামের পথে এই ছিল প্রথম শাহাদাত। খোদার ফযলে হযরত(স) নিরাপদ রইলেন এবং কোন রকমে হাঙ্গামাও মিটে গেল।

বিরোধিতার কারণসমূহ

ইসলামী আন্দোলনের মূলমন্ত্র তওহীদের এই ঘোষণা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কজনক ছিল কুরাইশদের জন্যে।তারাই এ আন্দোলনের বিরোধিতা করছিল তীব্রভাবে।কারণ এ সময় কাবার কারণেই মক্কার যা কিছু ইজ্জত বর্তমান ছিল।আর কুরাইশ খান্দান ছিল কাবার মুতাওয়াল্লী ও তত্ত্বাবধায়ক।ফলে প্রায় সারা আরব উপদ্বীপেই কুরাইশদের এক প্রকার ধর্মীয় আধিপত্য কায়েম ছিল। ধর্মীয় ব্যাপারে লোকেরা তাদের দিকেই চেয়ে থাকতো এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করতো।তাই ইসলামী আন্দোলনের সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক তীব্র আঘাত পড়ে কুরাইশদের এই ধর্মীয় আধিপত্যের ওপর।এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে,বাপ-দাদার অনুসৃত ধর্মের প্রতি মূর্খ জাতিগুলোর একটা অন্ধ বিশ্বাস থাকে বলে কোন যুক্তি সম্মত কথা পর্যন্ত তারা শুনতে চায় না।এ কারণেই এ নতুন ধর্ম আন্দোলনের কথা শুনে আরবের কায়েমি স্বার্থীরা অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলো।তাছাড়া কুরাইশদের প্রভাবশালী লোকেরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল যে এই নয়া আন্দোলন ফলে-ফুলে বিকশিত হতে পারলে তাদের সমস্ত ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তিই ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।ধর্মীয় কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে যে মর্যাদা তারা ভোগ করে আসছে, তা-ও আপনি- আপনিই খতম হয়ে যাবে।এই কারণে যে যতবড় গদিতে সমাসীন, সে ততখানি ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করতে লাগলো।

অপরদিকে কুরাইশদের মধ্যে নানারুপ দুষ্কৃতি ও অনৈতিকতা বিস্তার লাভ করেছিল। বড় বড় পদস্ত ব্যক্তিরা নানারুপ গর্হিত কার্যকলাপে লিপ্ত ছিল। এতদ সত্ত্বেও ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদার কারণে তারা লোকচক্ষে হেয় প্রতিপন্ন হতো না।এই প্রেক্ষিতে হযরত(সা) একদিকে মূর্তিপূজার অনিষ্ঠকারিতা বর্ণনা করে তার পরিবর্তে লোকদেরকে খালেস তওহীদের দিকে আহ্ববান জানাচ্ছিলেন, অন্যদিকে তিনি মানুষের বুনিয়াদী চরিত্রের দোষ-ত্রুটি ও দুর্বলতাগুলো খোলাখুলি বয়ান করে এসব থেকে বাঁচার জন্যে তাদের উপদেশ দিচ্ছিলেন।তার এসব উপদেশ ঐ বড়লোকদের কঠিন পেরেশানিতে ফেলে দিচ্ছিল। কারণ, হযরত(স)-এর কথাগুলোকে তারা সত্য বলে স্বীকার করে নিতে পারছিল না।আর যেহেতু তারা নিজেরা এসব দুষ্কৃতি থেকে মুক্ত ছিল না, তাই জনসাধারণের মধ্যে এসব কথা প্রচারিত হতেই তারা আতঙ্কিত বোধ করলো।তারা উপলব্ধি করলো যে, লোকচক্ষে তাদের মর্যাদার অবনতি ঘটছে এবংসামনা-সামনি না হলেও পেছনে অবশ্যই তাদের সমালোচনা হচ্ছে।তাদের মানসিক অস্থিরতা বৃদ্ধির জন্যে এই কথাগুলোই যথেষ্ঠ ছিল।পরন্ত কুরআন মাজীদে এই ধরণের দুশ্চরিত্র ও দুষ্কৃতিকারী লোকদের সম্পর্কে বারবার আয়াত নাযিল হচ্ছিল এবং তাদের এই শ্রেণীর কীর্তিকলাপের জন্যে কঠোর আযাবের ভয় প্রদর্শন করা হচ্ছিল।এই সকল আয়াত যখন সর্ব সাধারণের মধ্যে প্রচারিত হতে লাগলো, তখন কোথাকার পানি কোনদিকে গড়াচ্ছে, তা সবাই স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারলো।

ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা ও বৈরিতার জন্যে এই কারণগুলো এতই যথেষ্ঠ ছিল যে, হয়তো এই ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা ইসলামী সংগঠনের মুষ্টিমেয় লোকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতো এবং এই নয়া ‘বিপদের’ নাম-নিশানাকে একেবারে মুছে ফেলতে পারতো। কিন্তু আল্লাহর দরবারে আগেই ফয়সালা হয়েছিল যে, এই মুষ্টিমেয় লোকদের মারফতেই তিনি কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার একমাত্র মুক্তি-পয়গামকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিবেন। এই জন্যে এ সময় এমন কতকগুলো কার্য-কারণও দেখা দিলো, যার ফলে কুরাইশরা ঐরুপ কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হলো না।

বিরুদ্ধবাদীদের অপপ্রচার

মাত্র অল্প কিছুকাল আগে কুরাইশরা গৃহযুদ্ধের ফলে নাস্তানাবুদ হয়ে গিয়েছিল। ফুজ্জারের যুদ্ধের পর তারা এতোটা হীনবল হয়ে পড়েছিল যে, যুদ্ধের নাম শুনলেই সবাই আঁতকে উঠতো। তদুপরি বিভিন্ন গোত্র থেকে আগত এবং ইসলামী সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত মুষ্টিমেয় মুসলমানদের হত্যা করার অর্থ ছিল আরবের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে আবার যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়া।কেননা এসময় কোন এক ব্যক্তিকে হত্যা করার অর্থই ছিল তার সাথে সংশ্লিষ্ট তামাম গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। আর এভাবে যুদ্ধ বাঁধলে সমগ্র মক্কারই যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হবার প্রবল আশংকা ছিল। তাই এ পর্যায়ে আন্দোলনকে দমিয়ে দেবার জন্যে নানারুপ বিকল্প পন্থা অবলম্বন করা হলো। আন্দোলন ও তার আহ্ববায়ক কে নানাভাবে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হলো। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটনা করা হলো;রাস্তাঘাটে গালিগালাজ ও হৈ-হল্লা দ্বারা উত্যক্ত করা হলো। নিত্য-নতুন মিথ্যা ও ভ্রান- কথা প্রচার চালানো হলো। মজনু ও পাগল বলে আখ্যা দেওয়া হলো;কবি ও জাদুকর বলে প্রচার করা হলো।সর্বোপরী, হযরত(স)-এর কথা শোনা থেকে বিরত রাখার জন্য লোকদেরকে সরাসরি বাধা দেওয়া হলো।

অপপ্রচারের মুকাবেলা

এ পর্যায়ে কুরআন মাজীদে যেসব সূরা অবতীর্ণ হচ্ছিল,তাতে এ পরিস্থিতি মুকাবেলা করার জন্যে বারবার পথনির্দেশনা আসছিল এবং বিরুদ্ধবাদীদের উত্থাপিত আপত্তি সমূহের যথোচিত ও যুক্তিযুক্ত জবাবও দেয়া হচ্ছিল। দৃষ্টান্তস্বরুপ, সূরা ক্বলমে হযরত(স)-এর সান্ত্বনার জন্যে বলা হলোঃআপনার প্রতি আল্লাহ খুবই মেহেরবান।আপনি পাগল বা মজনু নন;আপনার প্রতি তার অপরিসীম অনুগ্রহ রয়েছে। কার জ্ঞান বুদ্ধি বিকৃত হয়ে গেছে ,তা শিগগিরই জানা যাবে। আপনার প্রভু খুব ভার করেই জানেন যে,কে সঠিক পথে রয়েছে,আর কে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আপনি নিজের কাজ চালিয়ে যেতে থাকুন। যারা এ আন্দোলনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চায়, তাদের কথায় মোটেই কর্ণপাত করবেন না। তারা চায় যে, আপনি আন্দোলনের কাজে শৈথিল্য প্রদর্শন করুন তো তাদের তৎপরতাও আপনি আপনি শিথিল হয়ে আসবে।কিন্তু ঐ সব লোকের প্রবৃত্তি অনুসরণ করা আপনার কাজ নয়। আপনি যা কিছু পেশ করেছেন, তা যারা মানতে রাজি নয়, তাদের ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দিন। তারা খুব শিগগিরই জানতে পারবে যে,তাদের যে অবকাশ দেয়া হয়েছিল, তার তাৎপর্য কি?আপনি তাদের জিজ্ঞেস করুনঃ‘আমি কি তোমাদের কাছে কিছু প্রার্থনা করছি? না নিজের ফায়দার জন্যে কিছু দাবি করছি? অথবা আমার কথার বিরুদ্ধে তোমাদের কাছে কোন যুক্তি-প্রমাণ আছে ? এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, তাদের কাছে এ ধরণের প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।আপনি অত্যন্ত ধৈর্যশীলতার সাথে পরিস্থিতি মুকাবেলা করুন। যথাসময়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবেই।

উদ্ধৃত বাণী একটি নমুনা মাত্র। এ ধরনের বাণী বরাবরই নাযিল হচ্ছিল। তাতে লোকদের স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হলো যে, সত্যের আহ্ববায়ক না মজনু না গণক -না কবি নাজাদুকর। গণক, কবি ও জাদুকরের বৈশিষ্ট্যগুলো তোমাদের সামনে রাখো এবং সত্যে আহ্ববায়কে ভিতর তার কোন কোন লক্ষণ পাওয়া যায়, তাও বিচার করে দেখ। তিনি যে কালাম পেশ করেছেন, তার প্রতিটি কাজের মাধ্যমে যে চরিত্র প্রতিভাত হচ্ছে এবং তোমাদের মাঝে তিনি যে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেছেন, তার কোনটির সাথে পাগল, কবি ও জাদুকরের তুলনা হতে পারে?

আন্দোলনের প্রতি লোকদের মনোযোগ

মক্কাবাসীদের এই ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় অবশ্য একটি ফায়দা হলো। তারা লোকদের যতোই বিরত রাখার চেষ্টা করছিল, তাদের মধ্যে ততোই এ কৌতূহল জাগতে লাগলোঃআচ্ছা, এ লোকটি কি বলছেন, একটু দেখা যাক না। এই কৌতূহলের ফলে আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে যে সব লোক হজ্জ কিংবা অন্য কোন কাজে মক্কায় আগমন করতো, তাদের অনেকে চুপি চুপি হযরত(স)-এর খেদমতে গিয়ে হাযির হতো। এখানে এসে তারা হযরত(স)-এর মহান চরিত্র অবলোকন এবং আল্লাহর বাণী শ্রবণ করতো; ফলে তাদের অন্তর-রাজ্যে এক প্রচণ্ড আলোড়ন ও পরিবর্তন সূচিত হতো। অতঃপর নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে তারা ইসলামের দাওয়াত প্রচারে আত্মনিয়োগ করতো।

এভাবে ইসলামের প্রচারকার্য যখন বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়লো, তখন লোকেরা শুধু হযরত(স)- অবস্থা জানবার জন্যেই দূর-দারাজ এলাকা থেকে আসতে লাগলো। এ ধরনের ঘটনাবলীর মধ্যে হযরত আবু জার গিফারী(রা) ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।কুরাইশরা ব্যবসায় উপলক্ষে যে পথ দিয়ে সিরিয়ায় যাতায়াত করতো, সেই পথের পাশেই গিফার গোত্রটি বসবাস করতো। ঐ গোত্রের কাছে মক্কার ঘটনাবলীর কথা উপনীত হলে হযরত(সা)-সাক্ষাত করার জন্যে হযরত আবু জরের হৃদয়ে প্রবল আগ্রহ জাগলো। তিনি প্রথমত তার সহোদর ভাই আনিসকে এই বলে মক্কায় পাঠালেনঃ‘তুমি গিয়ে দেখ, যে লোকটি নবুয়্যাতের দাবি করেছেন, তিনি লোকদের কি তালিম দিচ্ছেন।’ আনিস মক্কায় এসে হযরত(স) সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে যথারীতি ফিরে গেলেন এবং তার ভাই কে বললেনঃ‘লোকটি অত্যন্ত উন্নত চরিত্রের অধিকারী। তিনি খুব চমৎকার নৈতিক শিক্ষা প্রদান করেন এবং এক খোদার বন্দেগীর প্রতি লোকদেরকে আহ্বান জানান। তিনি যে কালাম পেশ করেন, তা কবিত্ব থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।’

এই সংক্ষিপ্ত কথায় হযরত আবু জার হৃষ্ট হতে পারলেন না। তিনি নিজেই সফরের জন্যে তৈরি হলেন।কিন্তু মক্কায় পৌঁছে ভয়ে কারো কাছে হযরত(স)-এর নাম পর্যন্ত জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলেন না। অবশ্য কাবা গৃহে হযরত আলী(রা)-এর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটলে তার বাড়িতে তিন দিন মেহমান হিসেবে অবস্থান করলেনএবং শেষ পর্যন্ত তার কাছে সফরের উদ্দেশ্য বিবৃত করতে ভরসা পেলেন।আলী(রা)তাকে হযরত (স)-এর খেদমতে নিয়ে গেলেন। সেখানে পৌঁছেই আবু যার ইসলাম কবুল করলেন। হযরত(স) তাকে নিজ গোত্রের মধ্যে ফিরে যেতে উপদেশ দিলেন। কিন্তু তওহীদের যে সতেজ প্রভাব তার মনে ক্রিয়াশীল হলো, তা তার মন থেকে সমস্ত দ্বিধা-সংকোচ ও ভয়-ভীতি দূর করে দিলো।তিনি সেখান থেকে কাবা গৃহে পৌঁছেই উচ্চেঃস্বরে ঘোষণা করলেনঃ

أٌشْهَدُ أَنْ لَّا Ø¥ÙÙ„Ù‡ÙŽ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً رَّسُولُ اللهِ 

‘‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ” এ ঘোষণা শুনেই লোকেরা চারদিক থেকে ছুটে এসে তাঁকে বেদম প্রহার করতে লাগলো।এমনি সময় হযরত আববাস (রা)সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি হামলাকারীদের বললেনঃ‘এ লোকটি গিফার গোত্রভুক্ত এবং তোমাদের বাণিজ্য পথটি এদেরই এলাকা দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে। কাজেই এরা যদি তোমাদের পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে কি করবে ? একথা শুনেই হামলাকারীরা তাকে ছেড়ে দিল।

হযরত আবুজার আপন গোত্রের মধ্যে ফিরে এসে ইসলামের আহবান জানালে সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় অর্ধেক লোক মুসলমান হয়ে গেল। গিফারদের কাছাকাছি আসলাম গোত্র বসবাস করত। এদের প্রভাবে তারাও ইসলামের দাওয়াত কবুল করলো। এভাবে ইসলামের দাওয়াত ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।বিরুদ্ধবাদীদের কাছে এটা নিদারুণ ক্ষোভ ও বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে লাগলো। এমনকি এদের ভেতরকার কিছু লোক বাধ্য হয়ে আবু তালিবের কাছে গিয়ে অভিযোগ পেশ করলো। এই প্রতিনিধি দলে প্রায় সমস্ত কুরাইশ নেতাই শামিল ছিল। তারা আবু তালিবকে বললোঃ ‘তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র আমাদের মাবুদ ও উপাস্য দেবতাদের অপমান করছে। আমাদের বাপ-দাদাদের গোমরাহ বলে প্রচার করছে, আমাদের সবইকে আহম্মক ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যা দিচ্ছে। সুতরাং হয় তুমি মাঝপথ থেকে সরে দাঁড়াও, ব্যাপারটা আমরা শেষবারের মত মিটিয়ে ফেলি, নচেত তাকে তুমি বুঝিয়ে ঠিক করো।’ আবু তালিব বুঝতে পারলেন,ব্যাপারটা এখন খুবই নাজুক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া তিনি একাকী কতো দিনই বা সমস্ত কুরাইশের মুকাবিলা করবেন। তিনি হযরত (স)-কে ডেকে বললেন : ‘ স্নেহের ভাতিজা, আমার ওপর তুমি এতো বোঝা চাপিও না যাতে, আমি উঠে দাঁড়াতে না পারি।’

হযরত (স) দেখলেন, এবার চাচা আবু তালিবের পাও নড়ে-চড়ে যাচ্ছে। তাই তিনি দৃঢ়তার সাথে বললেন : ‘খোদার কসম ! এই লোকগুলো যদি আমার এক হাতে চন্দ্র এবং অপর হাতে সূর্যও এনে দেয়, তবুও আমি আপন কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হবো না। খোদা হয় এই কাজকে পুরা করার সুযোগ দেবেন, নতুবা আমি নিজেই এ কাজের ভেতর বিলীন হয়ে যাবো।’ হযরত (স)- এর কঠোর সংকল্প ও নির্ভীক ফয়সালার কথা শুনে আবু তালিবও আবার হিম্মত ফিরে পেলেন। তিনি বললেন : ‘যাও, কেউ তোমার একটি চুলও বাঁকা করতে পারবে না।’

বিরুদ্ধবাদীদের প্রলোভন

কুরাইশরা এদিক থেকেও নিরাশ হয়ে অবশেষে চরম পন্থা হিসেবে স্থির করলো যে, কঠোরতা দ্বারা সম্ভব না হলে নম্রতা দ্বারাই এ আন্দোলন খতম করতে হবে। তারা প্রবীণ নেতা উতবা বিন রাবিয়াকে একটি প্রস্তাবসহ হযরত (স)- এর খেদমতে প্রেরণ করলো। সে এসে বললো :‘মুহাম্মদ ! আচ্ছা বলো তো, তুমি কি চাও? মক্কার শাসন ক্ষমতা পেতে চাও? কিংবা বড় ঘরে বিবাহ করতে চাও? অথবা অগাধ ধন-দৌলত তোমার কাম্য? আমরা এসবই তোমাকে যোগাড় করে দিতে পারি। এজন্যে কেন মিছেমিছি এসব করছো? আমরা সমগ্র মক্কাকে তোমার কর্তৃত্বাধীন করে দিতে রাজি। এছাড়া আরো কিছু চাইলে তারও ব্যবস্থা করে দিতে প্রস্তত; কিন্তু তুমি এই আন্দোলন থেকে বিরত হও।

বেচারা বিরুদ্ধবাদীরা শুধু এটুকুই ভাবতে পেরেছিল। প্রচ্ছন্ন বস্তগত স্বার্থ ছাড়াই যে কোনো আন্দোলন পরিচালনা অথবা কোন আদর্শের দাওয়াত বুলন্দ করা যেতে পারে, এটা আদৌ তাদের ম-মানসে ঠাঁই পায়নি। তারা একথা চিন্তাই করতে পারেনি যে, কোনো কাজ শুধু খোদার সন্তষ্টি এবং নিছক তার আনুগত্যে জন্যেও করা যেতে পারে। তারা শুধু এটুকুই জানতো যে, ধন-দৌলত আর শাসন কর্তৃত্ব লাভের উদ্দেশ্যেই মানুষ জান-মাল কুরবানী করে থাকে।তারা কি করে বুঝবে যে, আখিরাতে অনন্ত জীবনের কামিয়াবীর জন্যেও মানুষ এগুলো উৎসর্গ করে থাকে ? তাই উতবার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে, তার প্রস্তাবটি অবশ্যই মঞ্জুর হবে। কিন্তু হযরত(স) তার প্রশ্নের জবাবে শুধু তওহীদের দাওযাত এবং তার নবুয়্যাত উদ্দেশ্য সম্পর্কিত কুরআন পাকের কতিপয় আয়াত পাঠ করে শোনালেন।

হযরত(স) -এর জবাব শুনে উতবা অত্যন্ত মুগ্ধ হয়ে ফিরে গেল। সে কুরাইশ নেতৃবর্গের সামনে নিজের রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে বললোঃ মুহাম্মদ যে কালাম পেশ করছে, তা কিন্তু কবিত্ব নয়, বরং অন্য কিছু। আমার মতে, মুহাম্মদ কে তার নিজের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। যদি সে কামিয়াবী হয় তো সমগ্র আরবের ওপরই বিজয়ী হবে এবং তাতে তোমাদের ইজ্জত বাড়বে। আর তা না হলে আরব নিজেই তাকে ধ্বংস করে ফেলবে। কিন্তু কুরাইশরা তার এ অভিমত পছন্দ করলো না।

এরপর একটি কর্মপন্থাই শুধু বাকী রইল,যা এ পর্যায়ে এসে প্রত্যেক বাতিল শক্তিই হকের বিরুদ্ধে অবলম্বন করে থাকে। তাহলো, পূর্ণ জোর-জবরদস্তি ও নিষ্ঠুরতার সাথে হকের আওয়াজকে স্তব্ধ করে দেয়ার প্রয়াস। তাই কুরাইশরা ফয়সালা করলো যে, মুসলমানরা যাতে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়, সেজন্যে তাদের প্রতি নির্দয় ব্যবহার করতে হবে। তাদের যাকে যেখানে পাওয়া যাবে , সেখানেই নিপীড়ন চালাতে হবে।

তৃতীয় স্তর: ঈমানের পরীক্ষা

এই পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের কাজ যেটুকু অগ্রসর হয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়া তিন প্রকারে প্রকাশ পেল :
১. কিছু সৎ ও ভাল লোক এ আন্দোলনকে কবুল করলো। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলনকে যে কোন মূল্যে এগিয়ে নেয়ার জন্যে প্রস্তুত হলো।
২. অজ্ঞতা, ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা বাপ-দাদার অনুসৃত ধর্মের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসহেতু বহূ লোক এ আন্দোলনের বিরোধিতার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
৩. মক্কা ও কুরাইশদের গন্ডী অতিক্রম করে এ আন্দোলন অপেক্ষাকৃত বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো।
এ অবস্থার প্রেক্ষাপটে নতুন এই আন্দোলন এবং পুরনো জাহিলিয়াতের মধ্যে এক কঠিন দন্দ্ব-সংঘাত শুরু হলো। যেসব লোক নিজেদের পুরনো ধর্মকে আকঁড়ে থাকতে চাইলো, তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে কোমর বাধঁলো। তারা নও-মুসলিমদের ওপর অমানুষিক জুলুম-নির্যাতনের স্টীম রোলার চালালো এবং তাদেরকে সর্বতোভাবে হীনবল করার জন্যে সংঘবদ্ধ হলো। বস্তত কুরাইশদের এ পর্যায়ের জুলুম-নির্যাতনের ঘটনাবলী যেমন নির্মম ও হৃদয় বিদারক, তেমনি তা শিক্ষামুলকও। আরবের মত উষ্ণ দেশে দুপুরের প্রচণ্ড রোদে জ্বলন্ত বালুকার ওপর নও-মুসলিমদের শুইয়ে দেয়া, তাদের বুকের ওপর ভারী ভারী পাথর চাপিয়ে রাখা,লোহা গরম করে শরীরে দাগ দেয়া, পানিতে চুবিয়ে রাখা, নির্দয় ভাবে মারধর করা, এবং এ ধরনের অসংখ্য নির্যাতনের স্টীম রোলার মুসলমানদের ওপর চাপানো হলো। এ পর্যায়ে সাধারণভাবে সমগ্র মুসলমানের জীবনই দুর্বিষহ করা হয়েছিল;তবে ইতিহাসে যে সব মুজলমের জীবন কাহিনীর কিছুটা বিবৃত হয়েছে,তাদের মধ্যে থেকে নমুনা স্বরূপ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো।

হযরত খাব্বাব (রাঃ) : ইনি উম্মে আম্মারের গোলাম ছিলেন। সবেমাত্র ছয়-সাত ব্যক্তি ইসলাম কবুল করেছেন,এমনি সময় তিনি ইসলামের সুশীতল ছাঁয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই অপরাধে তিনি কুরাইশদের নির্মম জুলুমের শিকারে পরিণত হন। একদিন কুরাইশরা মাটির ওপর কয়লা জ্বালিয়ে তার ওপর খাব্বাব (রাঃ)-কে চিৎ করে শুইয়ে দিলো এবং তিনি যাতে নড়াচড়া করতে না পারেন, সেজন্যে এক ব্যক্তি তাকে পা দিয়ে সজোরে চেপে ধরলো। এমন কি, তাঁর পিঠের নীচেই জ্বলন্ত কয়লা নিভে ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। কিছুদিন পর একদিন তিনি তাঁর পিঠের ওপর সাদা সাদা কতগুলো পোড়া দাগ সবাইকে দেখান।

হযরত বিলাল (রাঃ) : ইনি উমাইয়া বিন্‌ খালফের গোলাম ছিলেন। উমাইয়া তাঁকে দুপুরের তপ্ত বালুকার ওপর শুইয়ে দিতো এবং বুকের ওপর ভারী পাথর চাপা দিয়ে বলতো : ‘ইসলামকে অস্বীকার কর, নচেৎ এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মরে যাবি।’ কিন্তু সেই নিদারুন কষ্টের মধ্যেও তাঁর মুখে শুধু ‘আহাদ’ শব্দ উচ্চারিত হতো। উমাইয়া তাঁর গলায় রশি বেধেঁ ছোট ছোট ছেলেদের হাতে দিতো। ওঁরা তাঁকে শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে টেনে নিয়ে যেতো।

হযরত আম্মার (রাঃ) : ইনি ইয়ামেনের বাসিন্দা ছিলেন। প্রথম দিকে যে কজন সাহসী ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন, ইনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশরা তাঁকে উত্তপ্ত জমিনের ওপর শুইয়ে এত প্রহার করতো যে, তিনি বেহূঁশ হয়ে যেতেন।

হযরত লুবাইনা (রা) : ইনি একজন বাঁদী ছিলেন। মুসলমান হবার আগে হযরত উমর(রা) একে এত মারধর করতেন যে, তিনি নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। কিন্তু এই খোদাভক্ত মহিলা শুধু বলতেন : ‘যদি ইসলাম গ্রহন না করো তো খোদা তোমার কাছ থেকে এর বদলা গ্রহণ করবেন’।

হযরত জুনাইরাহ(রা):ইনিও হযরত উমর(রা) -এর পরিবারে বাঁদী ছিলেন। একবার আবু জেহেল তাকে এত প্রহার করে যে ,তার চোখ দুটো বেরিয়ে যাবার উপক্রম হয়।

মোটকথা, পুরুষ ও নারীর মধ্যে এরকম অনেক লাচার ও নিরুপায় মুসলমানকেও ইসলাম ত্যাগে সম্মত করাতে পারেনি।

এই বেকসুর ও নিরপরাধ মুসলমানের ওপর যখন জুলুম-পীড়ন চলছিল,তখন লোকেরা স্বভাবতই তাদের প্রতি কৌতুহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে লাগলো। তারা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলোঃএত মুসিবত সত্বেও এই লোকগুলো কিসের মোহে ইসলামকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে ? কোন প্রলোভনের হাতছানি এদেরকে এতখানি কষ্ট-সহিষ্ণু করে তুলেছে ? একথা সবাই জানতো যে, নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার এবং মানবীয় গুনাবলীর দিক দিয়ে নিঃসন্দেহ এরা উত্তম মানুষ। এদের অপরাধ শুধু এই যে,এরা বলে-‘আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্ত্বার আনুগত্য এবং বন্দেগী করবে না।’ অব্যাহত জুলুম-পীড়ন সত্ত্বেও নও-মুসলিমদের এহেন দৃঢ়তাব্যঞ্জক উক্তি অনেক লোকের সামনেই এক বিরাট প্রশ্ন তুলে ধরলো এবং তাদের হৃদয় মনে স্বতঃই এক প্রকার নম্রতার সৃষ্টি করলো। তারা এই নতুন আন্দোলনকে নিকট থেকে দেখবার ও বুঝবার জন্যে আগ্রহান্বিত হলো। সত্যাশ্রয়ী ও ন্যায়নিষ্ঠদের ওপর জুলুম-পীড়ন চিরকালই সত্যের কামিয়াবীর পক্ষে সহায়ক হয়ে থাকে।তাই একদিকে যেমন কুরাইশদের জুলুম-পীড়ন বেড়ে চলছিল, অন্যদিকে তেমনি ইসলামী আন্দোলনের পরিধিও সমপ্রসারিত হতে লাগলো। এমনকি গোটা পরিবার বা খান্দানের ইসলাম কবুল করেনি,মক্কায় এমন কোন খান্দান বা পরিবারই আর রইলো না। এই কারনে কুরাইশরা ইসলামের বিরুদ্ধে আরো বেশি ক্রুদ্ধ ও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তারা দেখতে লাগলো : তাদেরই আপন ভাই-ভাতিজা, বোন-ভগ্নিপতি, পুত্র-কন্যা, ইসলামী দাওয়াতকে কবুল করে চলেছে এবং ইসলামের খাতিরে সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্যে প্রস্তত হচ্ছে। তাদের কাছে এটা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসহ আঘাতের শামিল। পরন্ত মজার ব্যাপার এই যে, যারা এই নয়া আন্দোলোনে যোগদান করছিল তাদের নৈতিক চরিত্র এবং সাধারণ মানবীয় গুণাবলী সবার কাছেই সুস্পষ্ট ও সুবিদিত ছিলো। এই শ্রেণীর লোকেরা যখন ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদের সমস্ত পার্থিব স্বার্থ কুরবানী করতে প্রস্তুত হতে লাগলো, তখন সাধারণ লোকেরা হতবাক হয়ে ভাবলো : এই নতুন আন্দোলোন এবং এর আহবায়কের ভেতর এমন কি আকর্ষণ রয়েছে, যা লোকদেরকে এরূপ আত্নোৎসর্গের জন্যে অনুপ্রাণিত করছে! তাছাড়া লোকেরা এও দেখতে লাগলো যে, ইসলামের গণ্ডীর মধ্যে প্রবেশ করার পর এসব লোক অধিকতর ন্যায়ানুগ, সত্যবাদী, চরিত্রবান, এবং আচার-ব্যবহারে উত্তম ও পুত-পবিত্র মানুষে পরিণত হচ্ছে। এসব বিষয় প্রতিটি দর্শকের মনে অনির্বচনীয় এক ভাবধারার সঞ্চার করতে লাগলো এবং এর ফলে ইসলামী দাওয়াত কবুল করুক আর না-ই করুক, তার শ্রেষ্ঠত্বকে তারা কিছুতেই উপলব্ধি না করে পারলো না।

আবিসিনিয়ায় হিজরত

হযরত (স)-এর নবুয়্যাতের বয়স এবার পাচঁ বছর হলো। তিনি বুঝতে পারলেন যে, কুরাইশদের জুলুম- নির্যাতন খুব শীগগীর বন্ধ হবার সম্ভাবনা নেই। অপরদিকে বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমানের অবস্থা এই দাঁড়ালো এই যে, কোন দুঃসহ পরিস্থিতিতেই তারা ইসলামের প্রতি বিমুখ হবে না বটে; কিন্তু দুঃখ-দুর্ভোগের মাত্রা তাদের সহ্য-শক্তির বাইরের চলে যাচ্ছে এবং ইসলামের প্রতি কর্তব্য (ফরয) পালন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই হযরত (স) ফয়সালা করলেন যে, কিছু মুসলমানকে হিজরত করে আবিসিনিয়ায় যেতে হবে। আবিসিনিয়া আফ্রিকার পূর্ব উপকূলবর্তী একটি দেশ। এখানকার বাদশাহ্‌ নাজ্জাশী ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ন ও সুবিচারক খ্রিস্টান। এই হিজরতের একটি উদ্দেশ্য ছিল এই যে, অবস্থা অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত কিছু সংখ্যক মুসলমান অন্তত কুরাইশদের জোর-জুলুম থেকে রেহাই পাবে। এর আরো একটি বড় ফায়দা ছিলো এই যে, এইসব আত্মোৎসর্গকারী লোকদের সাহায্যে ইসলামের দাওয়াত দূর-দারাজ এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হবার সুযোগ পাবে।

সুতরাং প্রথম দফায় এগার জন পুরুষ ও চারজন মহিলা এই হিজরতের জন্যে তৈরি হলেন। এরা পঞ্চম নববী সালের রজব মাসে যাত্রা করলেন। আল্লাহ্‌র কুদরত এই যে, এঁরা যখন বন্দরে পৌঁছলেন, তখন একটি বাণিজ্য জাহাজ প্রত্যাগমনের জন্যে সম্পূর্ণ তৈরি হয়েছিল। এটি তাদেরকে খুব কম ভাড়ায় নিতে সম্মত হলো। কুরাইশরা এই হিজরতের খবর শুনে মুসলমানদের পিছন ধাওয়া করলো। কিন্তু তারা বন্দরে পৌঁছবার আগেই আল্লাহ্‌র ফজলে জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে গেল।

আবিসিনিয়ায় মুসলমানরা বেশ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বাস করতে লাগলো। এ খবর কুরাইশদের কাছে পৌঁছলে তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর (আরবরা তাকে এ নামে ডাকতো) কাছে কয়েকজন লোক পাঠাতে হবে। তারা গিয়ে মুসলমানদের সমন্ধে বলবে যে, এই লোকগুলো আমাদের দেশ থেকে পলাতক অপরাধী; এদেরকে আপনি আপনার দেশ থেকে বের করে দিন। আমরা এদেরকে সাথে নিয়ে যাবো। আব্দুল্লাহ্‌ বিন রাবিয়া ও আমর বিন আসকে এ কাজের জন্যে মনোনীত করা হলো। তারা অত্যন্ত জাঁক-জমকের সাথে রওয়ানা হলো। প্রথমে তারা আবিসিনিয়ার পাদ্রীদের কাছে গিয়ে বললো : ‘এই লোকগুলো একটি নতুন ধর্ম উদ্ভাবন করেছে। আমরা এদেরকে তাড়িয়ে দেয়ায় আপনাদের দেশে পালিয়ে এসেছে। এখন আপনাদের বাদশাহের খেদমতে আমরা এই মর্মে আবেদন পেশ করতে চাই যে, এরা আমাদের দেশ থেকে পলাতক অপরাধী; এদেরকে আমাদের হাতে প্রত্যার্পণ করুন। আমাদের এই আবেদনের সপক্ষে বাদশাহর দরবারে সুপারিশ করার জন্যে আপনাদেরকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

নাজ্জাশীর দরবারে মুসলমান

মক্কাবাসী কুরাইশরা নাজ্জাশীর দরবারে উপরিউক্ত মর্মে আবেদন জানালে তিনি মুসলমানদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন : ‘তোমরা কি কোনো নতুন ধর্ম আবিষ্কার করেছ? মুসলমানরা নিজেদের পক্ষ থেকে কথা বলবার জন্যে হযরত জাফর বিন্‌ আবু তালিবকে (হযরত আলীর ভ্রাতা) মনোনীত করলেন। তিনি নাজ্জাশীর দরবারে যে ভাষণ দেন, তার বিস্তৃত বিবরণ ইতিহাস গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। তার সার সংক্ষেপ এই : ‘হে বাদশাহ ! আমরা কিছুকাল অঙ্গতা ও বিভ্রান্তির অন্ধকারে হাতড়ে ফিরছিলাম। এক খোদাকে বিস্মৃত হয়ে মানুষের গড়া অসংখ্য মূর্তির পূজা করতাম। মরা জীব-জন্তুর গোশত খেতাম; ব্যভিচার, লুটতরাজ, চৌর্যবৃত্তি, পারস্পরিক জুলুম ইত্যাদি ছিলো আমাদের দৈনন্দিন কাজের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের শক্তিমানরা দুবলদের শোষণ করতে গর্ববোধ করতো। মোটকথা, জীব-জন্তুর চেয়েও আমাদের জীবন-যাত্রা ছিল নিম্ন পর্যায়ের। কিন্তু আল্লাহর রহমত দেখুন, তিনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। আমাদেরই ভেতরকার এক ব্যক্তিকে রাসূল নিযুক্ত করে পাঠিয়েছেন। আমরা তাঁর বংশ-খান্দানকে খুব ভাল মতো জানি; তিনি অত্যন্ত শরীফ লোক। আমরা তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থার সাথেও সম্যক পরিচিত। তিনি অতীব সত্যবাদী, আমানতদার ও সচ্চরিত্রবান। দোস্ত-দুশমন সবাই তাঁর সততা ও শরাফতের প্রশংসা করে। তিনি আমাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেছেন এবং এই শিক্ষা দিয়েছেনঃ তোমরা মূর্তিপূজা ছেড়ে দাও, এক আল্লাহকে নিজের মালিক ও মনিব বলে স্বীকার করো, ব্যভিচার ও অন্যান্য অশ্লীল ক্রিয়া-কর্ম থেকে বেচেঁ থাকো, নামাজ পড় ও রোযা পালন করো।’ আমরা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি, শিরক ও মূর্তিপূজা ছেড়ে দিয়েছি এবং সমস্ত অসৎ কাজ থেকে তওবা করেছি। এর ফলে আমাদের কওম আমাদের সাথে দুশমনি শুরু করেছে এবং পুনরায় তাদেরই ধর্মে ফিরে যাবার জন্যে আমাদের ওপর ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে। আর এজন্যই এ লোকগুলো আপনার কাছ থেকে আমাদেরকে ফিরিয়ে নেবার জন্যে আবেদন জানাচ্ছে।’

নাজ্জাশী বললেনঃ ‘বেশ তোমাদের নবীর ওপর আল্লাহর যে কালাম নাযিল হয়েছে, তার কিছু অংশ আমাকে পড়ে শোনাও’। হযরত জাফর (রা) সূরা মরিয়ম থেকে কতিপয় আয়াত পড়ে শোনালেন। নাজ্জাশী তা শুনে অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। তাঁর চোখ দিয়ে দরদর বেগে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তিনি বললেন : ‘খোদার কসম! এই কালাম আর ইঞ্জিল কিতাব একই প্রদীপের আলোকরশ্মি।’ অতঃপর তিনি কুরাইশ প্রতিনিধিদের স্পষ্টত জানিয়ে দিলেন যে, তাদের হাতে মুসলমানদের সমর্পণ করা যাবে না।

নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণ

পরদিন কুরাইশরা আর একটি নতুন কৌশল উদ্ভাবন করলো। তারা বাদশাহর দরবারে গিয়ে বললো : ‘এই মুসলমানদের কাছে জিজ্ঞেস করুন তো, এরা হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে কি আকিদা পোষণ করে?’ কুরাইশরা জানতো যে. মুসলমানরা খ্রিস্টানদের আকিদার খেলাফ হযরত ঈসাকে ‘খোদার পুত্র’ এর পরিবর্তে ‘মরিয়ম পুত্র বলে বিশ্বাস করে আর এই কথাটি যখন নাজ্জাশীর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়বে, তখন তিনি অবশ্যই এদের প্রতি অসন্তষ্ট হবেন।

নাজ্জশী মুসলমানদের আবার দরবারে ডেকে পাঠালেন। পরিস্থিতিটা আঁচ করতে পেরে মুসলমানরাও কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু হযরত জাফর (রা) বললেন যে, ‘ব্যাপার যাই হোক না কেন, আমাদের সত্য কথাই বলতে হবে।’ অতঃপর তিনি ভরপুর দরবারে দাড়িঁয়ে ঘোষণা করলেনঃ ‘আমাদের পয়গম্বর (স) আমাদেরকে বলেছেন যে, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর বান্দাহ এবং তাঁর রাসূল ছিলেন।’ একথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে একটি সরু ঘাস হাতে তুলে নিয়ে বললেনঃ ‘খোদার কসম! তুমি যা কিছু বললে , ঈসা তার চেয়ে এই ঘাস পরিমাণও বেশি ছিলেন না।’ এভাবে কুরাইশদের শেষ চালবাজিও ব্যর্থ হলো। নাজ্জাশী হযরত জাফর ও তার সঙ্গীদেরকে সম্মানের সাথে তাঁর দেশে বাস করবার অনুমতি দিলেন এবং তিনি হযরত (স) এর নবুয়্যাতকে সত্য মেনে নিয়ে ইসলাম কবুল করলেন। এই নাজ্জাশীরই নাম ছিল আসমাহা। এর ইন্তিকাল হলে হযরত (স) এঁর গায়বানা জানাযা আদায় করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে ৮৩ জন মুসলমান আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন।

হযরত হামযা (র)-র ইসলাম গ্রহণ

মক্কায় একদিকে কুরাইশদের জুলুম-পীড়ন তীব্রতর হচ্ছিল, অন্যদিকে হযরত (স) এবং তার সঙ্গী-সাথীগণ ধৈর্য ও স্থৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখাতে লাগলেন। এই সংঘাতের মধ্যে মক্কার উত্তম ব্যক্তিগণ একে একে ইসলামী সংগঠনে শামিল হতে লাগলেন। হযরত হামযা হযরত (স)-এর পিতৃব্য ছিলেন। কিন্তু তখনো তিনি ইসলাম কবুল করেননি। হযরত (স)-এর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁর সঙ্গে যেরুপ নির্দয় ব্যবহার করছিলো, তা আপনজন তো দুরের কথা, কোনো অনাত্নীয় লোকও সহ্য করতে পারে না। একদিন আবু জেহেল হযরত (স)-এর সঙ্গে অত্যন্ত অবমাননাকর আচরণ করলো। হযরত হামযা তখন শিকারে গিয়েছিলেন। তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করলে জনৈক ক্রীতদাসী তাঁর কাছে সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলো। তিনি ক্রোধে ধৈর্যচ্যুত হলেন এবং তীর-ধনুকসহ সোজা কাবা গৃহে গিয়ে আবু জেহেলকে তীব্র ভাষায় ভৎর্সনা করলেন। এমন কি, সেখানেই তিনি ঘোষণা করলেনঃ ‘আমিও ইসলাম কবুল করলাম।’

হযরত (স)-এর প্রতি সহানুভূতির আবেগে মুখে তো ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করলেন; কিন্তু মন তার তখনো বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করার জন্যে তৈরি হয়নি। সমস্ত দিন তিনি ভাবতে লাগলেন। অবশেষে সত্যের আবেদনই বিজয়ী হলো। তিনি মনে-প্রাণে ইসলামের প্রতি ঈমান আনলেন। এ ঘটনাটি ঘটে নবুয়্যতের পঞ্চম বছরে। এর মাত্র কদিন পরেই হযরত উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে এ ঘটনাটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হযরত উমর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ

ইসলাম গ্রহণের আগে হযরত উমর (রাঃ) ছিলেন ইসলামের কঠোরতম দুশমনদের অন্যতম। কুরাইশরা একদিকে ইসলামী আন্দোলন ও তাঁর আহবায়কের বিরোধিতায় চরমপন্থা অবলম্বন করতে লাগলো, অন্যদিকে এদের সঠিক পথ নির্দেশনার জন্যে হযরত (স)-এর হৃদয়-মন প্রেমের আবেগে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। আবু জেহেল এবং উমর উভয়েই তাঁর দুশমনীতে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। দাওয়াত ও তাবলীগের কোনো প্রচেষ্টাই তাদের উপর কার্যকর হচ্ছিল না। তাই একদিন রাহমাতুল্লিল আলামীন সরাসরি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন : ‘প্রভূ হে! আবু জেহেল এবং উমর এ দু’জনের মধ্যে যে তোমার কাছে বেশি প্রিয়, তাকে তুমি ইসলামের দ্বারা সম্মানিত করো। এ দোয়ার কয়েকদিন পরই হযরত ওমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করার তওফীক লাভ করেন। এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরুপ :

খোদ হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, ‘একদা রাত্রে আমি হযরত (স)-কে উত্যক্ত করার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলাম। তখন তিনি কাবার মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি ত্রস্তপায়ে এগিয়ে গিয়ে নামাজ শুরু করলেন। আমি তা শুনবার জন্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনি সূরা আল-হাক্কাহ থেকে কিরআত পড়ছিলেন। আমি সে কালাম শুনে বিস্ময়ে মুগ্ধ হলাম। তার কবিত্বময় ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী মনে হলো। আমি মনে মনে ভাবলাম : খোদার কসম! লোকটি নিশ্চয়ই কবি। ঠিক এ মুহুর্তেই তিনি এ আয়াত পড়লেন :

 Ø¥ÙÙ†Ù‘َهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ{40} وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ قَلِيلاً مَا تُؤْمِنُونَ{41} 

অর্থ : এ এক সম্মানিত বার্তাবাহকের কালাম, এ কোনো কবির বাণী নয়, কিন্তু তোমাদের মধ্যে খুব কম লোকই ঈমান এনে থাকে। (আয়াতঃ ৪০-৪১)

একথা শোনামাত্রই আমার ধারণা : ‘ওহো, লোকটি তো আমার মনের কথা জেনে ফেলেছে। এ নিশ্চয়ই কোনো গণক হবে।’ এরপরই মুহাম্মদ (স)-এ আয়াত পাঠ করলেন :

 ÙˆÙŽÙ„َا بِقَوْلِ كَاهِنٍ قَلِيلاً مَا تَذَكَّرُونَ{42} تَنزِيلٌ مِّن رَّبِّ الْعَالَمِينَ{43}

অর্থঃ এ কোনো গণকের কালাম নয়; তোমরা খুব কমই নসিহত পেয়ে থাকো। এতো রাব্বুল ‘আলামীনের কাছ থেকে নাযিল হয়েছে। (আয়াতঃ ৪২-৪৩)

তিনি এ সূরা শেষ পর্যন্ত পড়লেন। আমি অনুভব করলাম, ইসলাম আমার হৃদয়ে তার আসন করে নিচ্ছে।’

কিন্তু যতদূর মনে হয়, হযরত উমর (রাঃ) অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির ও দৃঢ় চিত্ত লোক ছিলেন। এজন্যে এবারই তাঁর ভেতরকার পরিবর্তনটা পূর্ণ হলো না। তিনি তাঁর চিরাচরিত পথেই চলতে লাগলেন। এমনকি, একদিন তিনি দুশমনীর তাড়নায় উত্তেজিত হয়ে হযরত (স)-কে হত্যা (নাঊযুবিল্লহ) করার উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে ঘর থেকে বেরুলেন। পথিমধ্যে নয়ীম বিন আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হলো। সে জিজ্ঞেস করলো, ‘কোথায় যাচ্ছ ওমর?’ তিনি বললেন, ‘মুহাম্মদ (স)-কে হত্যা করতে যাচ্ছি।’ নয়ীম বললো, ‘আগে তোমার নিজের ঘরেরই খবর নিয়ে দেখো। তোমার নিজের বোন-ভগ্নিপতিই তো ইসলাম গ্রহণ করেছে।’ একথা শুনে ওমর মোড় ফিরলেন এবং সোজা বোনের বাড়ীতে গিয়ে হাযির হলেন। তাঁর বোন-ভগ্নিপতি উভয়েই তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। ওমরকে আসতে দেখেই তাঁরা চুপ করে গেলেন এবং কুরআনের অংশটি লুকিয়ে ফেললেন। কিন্তু তারা যে কিছু পড়ছেন, তা ওমর টের পেয়েছিলেনল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী পড়ছিলে? তোমরা নাকি বাপ-দাদার ধর্মকে ত্যাগ করেছ? একথা বলেই তিনি ভগ্নিপতিকে প্রহার করতে লাগলেন। স্বামীর সাহায্যের জন্যে বোন এগিয়ে এলে তাঁকেও তিনি মারতে লাগলেন। এমনকি উভয়ে রক্তাপ্লুত হয়ে গেলেন। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও তারা সুস্পষ্ট ভাষায় বললেন, : ‘আমরা সজ্ঞানে ইসলাম কবুল করেছি; সুতরাং তোমার কোনো কঠোরতাই আমাদেরকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।’ তাদের এই অটল সংকল্প দেখে হযরত ওমর (রাঃ) কিছুটা প্রভাবিত হলেন। তিনি বললেন,‘ আচ্ছা তোমরা কি পড়ছিলে আমাকে শোনাও দেখি।’ বোন ফাতিমা কুরআনের অংশটি এনে সামনে রাখলেন। সেটি ছিলো সূরা তা-হা। তিনি পড়তে শুরু করলেন এবং এই আয়াত পর্যন্ত এসে পৌঁছলেন :

 Ø¥ÙÙ†Ù‘َنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي{14} 

‘আমিই খোদা, আমি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই; সুতরাং আমারই বন্দেগি করো এবং আমায় স্মরণের জন্যে নামায পড়ো।’ এ পর্যন্ত আসতেই তিনি এতটা প্রভাবিত হলেন যে, হঠাৎ সজোরে বলে উঠলেন : লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হ। এরপর তিনি সেখান থেকে সোজা হযরত (স)-এর খেদমতে রওয়ানা হলেন। এ সময় হযরত (স) সাহাবী আরকামের গৃহে অবস্থান করছিলেন। ওমর দরজার কাছে পৌঁছলে তাঁর হাতে তরবারি দেখে উপস্থিত সাহাবীগণ ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু হযরত হামযা (রাঃ) বললেন, ‘আসুক না, তার নিয়্যত যদি ভাল হয় তো ভাল কথা। নচেৎ তার তরবারি দ্বরাই তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলবো।’ ওমর ঘরের মধ্যে পা বাড়াতেই হযরত (স) এগিয়ে এসে তাকে সজোরে আকঁড়ে ধরে জিজ্ঞেস করলেন :‘কি ওমর, কি উদ্দেশ্যে এসেছ?’ একথা শুনেই যেন ওমর ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি অত্যন- বিনয়ের সাথে জবাব দিলেন, ‘ঈমান আনার উদ্দেশ্যে।’ হযরত (স) স্বতস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন, ‘আল্লাহু আকবার’ সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সাহাবী তকবীর ধ্বনি উচ্চারণ করলেন।

হযরত ওমর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পর ইসলামী সংগঠনের শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেলো। এতদিন মুসলমানরা প্রকাশ্যে ধর্মীয় কর্তব্য পালন করতে পারছিল না; কাবা গৃহে জামাআতের সাথে নামায পড়াও ছিলো অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণের পর অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটলো। তিনি নিজেই প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করলেন। এ ব্যাপারে অনেক হাঙ্গামা হলো বটে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা কা’বা মসজিদে জা’মায়াতের সাথে নামায আদায় করার সুযোগ লাভ করলো; তাদের সংগঠনও আগের তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হলো। পরন্ত আল্লাহর দরবারে আখিরী নবী (স)-এর দো’আ কতোখানি মঞ্জুর হয়েছিল, তাও বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করতে পারলো। দীর্ঘ চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হবার পরও আজ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তা’আলা হযরত ওমর (রাঃ)-এর দ্বারা ইসলামকে যে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন, তার দ্বিতীয় কোনো নজীর নেই।

সামাজিক বয়কট গিরি-দুর্গে বন্দী

ইসলামী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতি দেখে কুরাইশ সর্দারগণ ক্রমাগত তেলে-বেগুনে জ্বলতে লাগলো। তারা এ আন্দোলনকে দমিয়ে দেবার জন্যে নিত্য নতুন ফন্দি আঁটলো। তারা সমস্ত গোত্রকে একত্র করে এই মর্মে একটা চুক্তি সম্পাদন করলো যে, যতক্ষন পর্যন্ত মুহাম্মদ (স) কে হত্যা করার জন্যে তাদের হাতে সমর্পণ না করা হবে, ততক্ষণ কেউ তার খান্দান বনী হাশিমের সংস্পর্শে যাবে না, কেউ তাদের সাথে বেচাকেনা করবে না, কেউ তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করবে না এবং কেউ তাদেরকে খাদ্য-দ্রব্য সরবরাহ করবে না। এই চুক্তি লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়া হলো।

এবার বনী হাসিমের সামনে মাত্র দুটি পথই খোলা রইলো : হয় হযরত (স)-কে কাফিরদের হাতে সমর্পণ করে দিতে হবে, নচেৎ এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের ফলে উদ্ভূত দুঃখ-মুসিবত বরদাশত করার জন্যে তৈরি হতে হবে। আবু তালিব বাধ্য হয়ে এই শেষোক্ত পন্থাটিই বেছে নিলেন এবং বনু হাসিমের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত খান্দান নিয়ে ‘শে'বে আবু তালিব’ নামক একটি গিরি-দুর্গে গিয়ে আশ্রয় নিলেন। জায়গাটি উত্তারাধিকার সূত্রে বনী হাসিমের মালিকানাভুক্ত ছিলো। এ গিরি-দুর্গের মধ্যে হযরত (স)-এর সাথে তাঁদের দীর্ঘ তিন বছরকাল অশেষ দুর্গতির মধ্যে জীবন কাটাতে হলো। এ সময়ে কখনো কখনো তাঁদের গাছের পাতা খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হতো॥ এমনকি ক্ষুধার তাড়নায় শুকনো চামড়া পর্যন্ত সিদ্ধ করে খেতে হতো। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যখন ক্ষুধার জ্বালায় চিৎকার করতো, তখন জালিমরা তা শুনে পৈশাচিক আনন্দ প্রকাশ করতো। কখনো কোনো হৃদয়বান ব্যক্তির মনে করুনার উদ্রেক হলে হয়তো লুকিয়ে তিনি কিছু খাবার পাঠিয়ে দিতেন।

এভাবে ক্রমাগত তিন বছরকাল বনী হাসিম গোত্র ধৈর্যের অগ্নি-পরীক্ষা প্রদান করলো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা জালিমদের হৃদয়েই করুণার সঞ্চার করলেন। একের পর এক কুরাইশদের মন নম্র হতে লাগলো এবং তাদের তরফ থেকেই চুক্তি ভঙ্গের আন্দোলন শুরু হলো। আবু জেহেল ও তার মতালম্বী কিছু লোক অবশ্য বেঁকে বসলো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের চক্রান- আর সফলকাম হলো না। প্রায় দশম নববী সালে হাসিম গোত্র গিরি-দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলো।

আন্দোলনের বিস্তৃতি

আগেই বলা হয়েছে যে, ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থগুলোতে মক্কী পর্যায়ের সংগ্রামের বিবরণ খুব কমই উল্লেখিত হয়েছে। তাই এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের মধ্যে দাওয়াত ও আন্দোলনের কাজ কিভাবে চালু ছিল এবং তা কতোটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল, এ সম্পর্কে কোনো বিস্তৃত বিবরণই পাওয়া যায় না। অবশ্য কুরআন শরীফ যথারীতিই নাযিল হতে থাকে। এ সময় যে সমস- সূরা নাযিল হয়, তার বিষয়বস্তু, নির্দেশাবলী ও শিক্ষাগুলো সামনে রাখলে এ পর্যায়ে আন্দোলনকে কোন্‌ কোন্‌ অবস্থার ভেতর দিয়ো এগোতে হয়েছে, তা অনেকটাই অনুমান করা যায়।

এই দীর্ঘ ও কঠিন সংঘাতকালে আল্লাহ তা’য়ালা যেসব কালাম নাযিল করেন, সে সবের বক্তব্য ও বর্ণনাভঙ্গি অত্যন্ত আবেগময় এবং প্রভাবশালী। এতে ঈমানদারগণকে তাদের কর্তব্য-কর্ম বাতলে দেয়া হয় এবং তার উপর অবিচল থাকার নির্দেশ দেয়া হয়; তাদের ব্যক্তি চরিত্রকে উচ্চ থেকে উচ্চতর মানে উন্নীত করার পদ্ধতি বলে দেয়া হয়; তাকওয়া ও পরহেজগারী রপ্ত করা এবং অধিক পরিমানে এ গুণটি অর্জন করার ওপর জোর দেয়া হয়; নৈতিক চরিত্রের সমুন্নতি এবং আদত-অভ্যাস সংশোধনের জন্যে তাগিদ দেয়া হয়। লোকদের মধ্যে সংগঠনী চেতনা উজ্জীবিত করে সমষ্টিগত চরিত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়; দ্বীন ইসলাম প্রচারে সঠিক পন্থা বাতলে দেয়া হয় এবং কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধারণ করার জন্যে তাকিদ দেয়া হয়; সাফল্যের ওয়াদা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে লোকদের মনোবল বৃদ্ধি করা হয়; দ্বীন ইসলামের বন্ধুর পথে অবিচল থাকা এবং হিম্মতের সঙ্গে আল্লাহর পথে অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়; সর্বোপরি লোকেরা যাতে দুঃখ-মসিবত ও নির্মমতা বরদাশত করতে সমর্থ হয়, সেজন্য তাদের মধ্যে আত্নত্যাগ ও আত্নোৎসর্গের উদ্দীপনার সঞ্চার করা হয়। পক্ষান্থরে বিরুদ্ধবাদী অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনের প্রতি বিরুপ লোকদেরকেও তাদের শোচনীয় পরিণতি সম্পর্কেও বারবার সতর্ক করে দেয়া হয়। এ ধরণের গাফিলতি অবিশ্বাসের কারণে ইতঃপূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের শিক্ষামূলক ঘটনাগুলো এদেরকে বারবার শুনানো হয়। (এ সমস্ত ঘটনার কথা খোদ আরবরাও কম-বেশি অবহিত ছিল। ) যে বিরাট জনপদের ওপর দিয়ে তারা দিনরাত যাতায়াত করতো, সেগুলির ধ্বংসাবশেষের দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। পরন্ত তারা জমিন ও আসমানে দিনরাত যেসব সুস্পষ্ট নিদর্শন প্রত্যক্ষ করছিলো, সেগুলির সাহায্যে তাওহিদ ও আখেরাতের দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়; শেরকের অনিষ্টকারিতা ও ভয়াবহ পরিণতি সুস্পষ্ট ভাষায় বিবৃত করা হয়; খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্নক ভুমিকা গ্রহণের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়। আখিরাতের প্রতি অবিস্বাসের ফলে জীবনে যে বিকৃতি ও বিপর্যয় দেখা দেয়, সে সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়। বাপ-দাদার অন্ধ অনুসৃতির ফলে মানবতার যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয় , তার প্রতিও অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়। আর এসব কথা এমন অকাট্য-দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে বিবৃত করা হয় যে, একটু তলিয়ে চিন্তা করলেই তা মনের গভীরে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হয়ে যায়।

পরন্ত বিরুদ্ধবাদী ও অবিশ্বাসীদের উত্থাপিত আপত্তিগুলোও যুক্তিসহ জবাব দান করা হয়। তারা যেসব সন্দেহ পেশ করতো, তারও নিরসন করা হয়। মোটকথা, যেসব বিভ্রান্তিতে তারা নিজেরা নিমজ্জিত ছিলো যা দ্বারা অন্যকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতো, তার সবই দূরীভুত করা হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এই গোটা সময়ে তাদের বিরুদ্ধতা ও বৈরুতা এতটুকু হ্রাস পায়নি, বরং তা ক্রমাগত বেড়েই চলছিলো।

চতুর্থ স্তরঃ জুলুম ও নির্যাতনের পরাকাষ্ঠা

হযরত (স) এবং তার সঙ্গী-সাথীগণ শে’ব গিরি-দুর্গ থেকে কেবল বেরিয়ে এসেছেন এবং কুরাইশদের জুলুম-পীড়ণ থেকে সাময়িকভাবে কিছুটা অব্যাহতি পেয়েছেন। এর মাত্র ক’দিন পরই তার চাচা আবু তালিব মৃত্যমুখে পতিত হলেন। এর কিছুদিন পর হযরত খাদিজা (রাঃ)ও পরলোক গমন করলেন। এই বছরটিকে হযরত (স) ‘শোকের বছর’ বলে অভিহিত করতেন। এই দুই ব্যক্তিত্বের তিরোধানের পর কুরাইশদের বিরুদ্ধতা ও জুলুম-পীড়নের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। এ যুগটি ছিল ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে সবচেয়ে কঠিন যুগ।এরপর থেকে কুরাইশরা মুসলমান ও হযরত (স)-এর প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও নির্দয়ভাবে উৎপীড়ন চালাতে শুরু করলো।

মক্কার বাইরে তাবলীগ

মক্কাবাসীদের মধ্যে যাঁরা উত্তম লোক ছিলেন, তাঁরা একে একে প্রায় সকলেই ইসলামী সংগঠনে যোগদান করলেন। তাই হযরত (স) এবার মক্কার বাইরে গিয়ে আল্লাহর বাণী প্রচার করার ফয়সালা করলেন। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রথমে তিনি তায়েফ গমন করলেন। তায়েফে ছিলো বড়ো বড়ো বিত্তবান ও প্রভাবশালী লোকদের বাস। হযবত (স) ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এইসব বড়ো লোকদের কাছে হাযির হলেন। কিন্তু দৌলত ও ক্ষমতা যেমন প্রয়শই সত্যের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, এখানেই ঠিক তাই হলো। হযরত (স)-এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে জনৈক তায়েফ সর্দার বিদ্রুপ করে বললো : ‘খোদা কি তাঁর রাসূল বানাবার জন্যে তোমাকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাননি?’ অপর একজন বললো :‘আমি তো তোমার সঙ্গে কথাই বলতে পারি না। কারণ তুমি যদি সত্যবাদী হও তো তোমার সঙ্গে কথা বলা আদবের খেলাফ। আর মিথ্যবাদী (নাউযুবিল্লাহ) হলে তো তুমি মুখ লাগানোরই যোগ্য নও।’

মোটকথা, এই বড়ো লোকেরা হযরত (স)-এর কথাকে এমনি হেসে উড়িয়ে দেয়। শুধু তাই-ই নয়, তারা শহরের গুন্ডা-বদমায়েশদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। তারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে পথে-প্রান্তরে সর্বত্র ঠাট্রা-বিদ্রুপ করে এবং তাঁর প্রতি অবিরাম পাথর নিক্ষেপ করে। এর ফলে তিনি অত্যন্ত গুরুতরভাবে আহত হন; তার পবিত্র দেহ থেকে অনর্গল রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে এবং তাতে তার পাদুকাদ্বয় পূর্ণ হয়ে যায়। তবুও জালিমরা অবিরাম তার প্রতি পাথর নিক্ষেপ ও গালি-গালাজ বর্ষণ করতে থাকে। এমনকি, তিনি একটি বাগানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

কোনো বিরোধী শহরে এভাবে একাকী গিয়ে তাবলীগের দায়িত্ব পালন করা এবং জীবন বিপন্ন করে খোদার বান্দাদের কাছে খোদার বাণী পৌঁছানো কতোখানি হিম্মত ও নির্ভীকতার পরিচায়ক, তা আন্দাজ করা মোটেই কষ্টকর নয়। খোদার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান ও তার ওপর চূড়ান্ত নির্ভরতার এ যেমন এক মহোত্তম উদাহরণ, তেমনি পরবর্তীকালের লোকদের জন্যেও এ এক অনুকরণীয় আদর্শ।

হযরত (স)-এর একটি নিয়ম ছিলো এই যে, প্রতি বছর হজ্জ উপলক্ষে যখন সারা দেশ থেকে নানান গোত্রের লোকেরা মক্কায় আগমন করতো, তখন তিনি প্রত্যেক গোত্রের কাছে গিয়ে লোকদেরকে ইসলামের আহবান জানাতেন। অনুরুপভাবে আরবের বিভিন্ন স্থানে যেসব মেলা বসতো, তাতেও তিনি যোগদান করতেন এবং এই জনসমাগমের সুযোগে লোকদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন। এই সব ক্ষেত্রে প্রায়শই কুরাইশ সর্দারগণ (বিশেষত আবু লাহাব) তার পেছন ধরতো এবং তিনি যেসব সমাবেশে বক্তৃতা করতেন, সেখানে গিয়ে লোকদের বলতো : ‘দেখ, এর কথা তোমরা শুনো না; এ আমারে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং লোকদের কাছে মিথ্যা কথা বলে।’ এসব ক্ষেত্রে হযরত (স) লোকদেরকে কুরআন পাকের এমন সব অংশ শোনাতেন, প্রভাব বিস্তারের দিক দিয়ে যা শাণিত তীরের ন্যায় কাজ করতো। কুরআনের এসব অংশ শুনে অধিকাংশ লোকের হৃদয়ে ইসলামের জন্যে আসন তৈরি হয়ে যেতো। মোটকথা, হযরত (স)-এর এইসব তাবলীগী সফর প্রভাব ও পরিণতির দিক দিয়ে অত্যন্ত সফলকাম বলে প্রমণিত হলো। এখন আর আরবে ইসলামী আন্দোলন কোনো অভিনব বস্তর পর্যায়ে রইলো না; বরং দূর-দূরাঞ্চল পর্যন্ত তার পরিধি বিস্তৃতি লাভ করলো। আর যারা ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গী হবার জন্যে আগেই মনস্ত করেছিলেন, তারাও নিজ নিজ এরাকায় দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ শুরু করে দিলেন।

জ্বিনদের প্রসঙ্গ

আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে জ্বিনও একটি বিশেষ সৃষ্টি। মানুষের ন্যায় জ্বিনদেরও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা আছে। এই কারণে তাদের প্রতিও খোদার দেয়া বিধান সমানভাবে প্রযোজ্য। তওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতের প্রতি ঈমান পোষণ এবং এক আল্লাহর তা’আলার হুকুম-আহকামের আনুগত্য করা তাদের জন্যেও বাধ্যতামূলক। আর এ কারণে তাদের মধ্যেও ভাল-মন্দ দুটি শ্রেণী আছে।

জ্বিনদের অস্বিত্ব সম্পর্কে প্রাচীনকাল থেকে মানব সমাজে আজগুবি ধারণা চলে আসছে। আরবেও জ্বিনদের সম্পর্কে একটি বিশেষ মতবাদ গড়ে উঠেছিলো। মূর্খ লোকেরা তাদের পূজা করতো, তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতো। সাধারণ ওঝা শ্রেণীর লোকেরা তাদের সাথে বন্ধুত্বের দাবি করতো। নানারূপ কিসসা-কাহিনী তাদের সম্পর্কে প্রচলিত ছিলো। মোটকথা, অসংখ্য দেব-দেবীর ন্যায় জ্বিনদেরকেও খোদায়ীর ব্যাপারে শরীকদার মনে করা হতো। ইসলাম এসে এসব আকিদা-বিশ্বাস সংশোধন করে দিলো। সে বললো : জ্বিন খোদার একটি সৃষ্টি বটে; কিন্তু খোদায়ীর ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্রও দখল নেই। সে আপন ক্ষমতাবলে না পারে কারো উপকার করতে আর না পারে কারো ক্ষতি করতে। মানুষের ন্যায় জ্বিনদের প্রতিও আল্লাহর বন্দেগী ফরয করা হয়েছে। তাদের মধ্যেও খোদার অনুগত ও অবাধ্য-এ দুটি শ্রেণী রয়েছে। তারাও মানুষের ন্যায় নিজ নিজ আমলের পুরস্কার ও শাস্তি লাভ করবে। খোদার কুদরতের সামনে তারাও একটি অক্ষম ও অসহায় জীবমাত্র।

হযরত (স)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার দ্বীন পরিপূর্ণ ও সর্বশেষ রূপ নিয়ে দুনিয়ায় এসেছে। এ দ্বীনের আনুগত্য যেমন মানুষের জন্যে, তেমনি জ্বিনের জন্যেও বাধ্যতামূলক ছিলো। একদা হযরত (স) এক তাবলীগী সফর উপলক্ষে ‘উকাজ’ নামক আরবের এক বিখ্যাত মেলায় গমন করছিলেন। পথে ‘নাখলা’ নামক স্থানে তাঁকে একটি রাত অবস্থান করতে হলো। ঘটনাক্রমে এমনি সময় জ্বিনদের একটি দল ঐদিক দিয়ে যাচ্ছিলো। তারা হযরত (স)-এর কিরআত শুনে থমকে দাঁড়ালো। এ ঘটনা কুরআনের সূরা আহকাফ-এ এভাবে বিবৃত হয়েছে : হে নবী! আমরা জ্বিনদের একটি দলের গতি তোমার দিকে ফিরিয়ে দিই, যেন তারা কুরআন শুনতে পায়। তারা এসে পরস্পরকে বললো :‘চুপ থাক।’ কুরআন পাঠ শেষ হলে তারা গিয়ে আপন জাতিকে সতর্ক করে বললো : ‘ভাই সব! আমরা একটি কিতাব শুনে এসেছি, যা মূসার পরে অবতীর্ণ হয়েছে এবং পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবের সত্যতা স্বীকার করে, যা সত্যের দিকে পরিচালিত করে এবং সোজা পথ প্রদর্শন করে। ভাইসব! আল্লাহর দিকে আহবানকারীদের কথা মানো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো, যেন তিনি তোমাদের গুনাসমূহ মাফ করে দেন এবং কঠিন ও যন্ত্রনাদায়ক আযাব থেকে তোমাদের নিস্কৃতি দান করেন। (আয়াতঃ২৯-৩১)।
এ ঘটনার কথা হযরত (স) ওহীর মারফতে জানতে পারেন। সূরা জ্বিনে এর বিস-ৃত বিবরণও উল্লেখ আছে।

মদিনায় ইসলামের আগমন

ইসলামের আওয়াজ যেমন আরবের বিভিন্ন দূর-দারাজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছলো, তেমনি সে আওয়াজ মদিনায় গিয়েও উপনীত হলো॥ মদিনায় তখন বেশ কিছু ইহুদী জনবসতি ছিলো। তারা বহু প্রাচীনকাল থেকে সেখানে এসে বাস করতো। তারা মদিনার আশেপাশে ছোট ছোট দুর্গ বানিয়ে নিয়েছিলো। এ ছাড়াও সেখানে ছিলো বড় বড় দু’টি অ-ইহুদী গোত্র।

একদা আওস ও খাযরাজ নামে মদিনায় দুই ভাই ছিলো। এদের আদি নিবাস ছিলো ইয়ামেন; কিন্তু কোনো এক সময় এরা মদিনায় এসে বসবাস শুরু করে। এদেরই সন্তান-সন্ততি থেকে সেখানে ‘আওস’ ও ‘খাজরাজ’ নামে দু’টি বড় বড় খান্দান গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এরাই ‘আনসার’ উপাধিতে ভূষিত হয়। এরা মদিনা এবং তার আশপাশে অনেক ছোট ছোট দুর্গ তৈরি করে রেখেছিলো। ধর্ম-বিশ্বাসের দিক দিয়ে এরাও মূর্তিপূজক ছিলো বটে, কিন্তু ইহুদীদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে ওহী, নবুয়্যত, আসমানী কিতাব এবং আখিরাত সম্পর্কিত আকিদা-বিস্বাসের সঙ্গেও অনেকটা পরিচিত ছিলো। কিন্তু এদের নিজেদের কাছেই যেহেতু এ ধরণের কোনো জিনিস বর্তমান ছিলো না, সে জন্যে ধর্মীয় ব্যাপারে এরা ইহুদীদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলো। তাদের কথার ওপর এরা যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করতো। এরা ইহুদী আলেমদের কাছ থেকে এ-ও জানতে পেরেছিলো যে, দুনিয়ায় আরো একজন পয়গম্বর আসবেন। যারা তার অনুগমন করবে, তারাই সফলকাম হবে। পরন্ত এই পয়গম্বরের অনুবর্তীরাই সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে। এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতেই মদিনাবাসী নবী করীম (স) এবং তার আন্দোলনের প্রতি উৎসুক হয়ে উঠেছিলো। আগেই বলা হয়েছে যে, হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আগত গোত্র প্রধানদের কাছে গমন করা এবং তাদেরকে ইসলামী আন্দোলনে শামিল হবার আহবান জানানো হযরত (স)-এর একটি নিয়ম ছিলো। দশম নববী সালের কোনো এক সময়ে হযরত (স) মক্কার অদূরবর্তী ‘আকাবা’ নামক স্থানে খাজরাজ বংশের কতিপয় লোকের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং তাদেরকে কুরআন মজীদের কিছু আয়াত পড়ে শোনান। সে কালাম শুনে তারা অত্যন্ত প্রভাবিত হলো এবং বুঝতে পারলো : ইহুদী আলেমরা যে নবী আসার কথা বলেন, ইনিই সেই নবী। তারা একে অপরের দিকে চেয়ে বললো : ‘না জানি এই নবীর ওপর ঈমান আনার ব্যাপারে ইহুদিরা শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবটুকু অর্জন করে বসে।’ একথা বলেই তারা ইসলাম কবুল করলো। এদের দলে মোট ছয়জন সদস্য ছিলো। এভাবে মদিনার আনসারদের মধ্যে ইসলামের সূচনা হলো এবং যে জনপদটি উত্তরকালে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়েছিলো, তাতে ইসলামের রোশনি প্রবেশ করলো।

বিরোধিতার তীব্রতা

যে কোনো আন্দোলনের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বিরোধিতা এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাতও স্বভাবত বাড়তে থাকে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের বিস্তৃতির সঙ্গে বিরোধিতা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের যে প্রচন্ডতা দেখা দেয়, তা তার অনুগামীদেরকে অধিকতর কঠিনতর পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করে। দশম নববী সাল নাগাদ ইসলামী আন্দোলন যেমন ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করছিল, তেমনি সত্যের আহবায়ক এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদেরকে কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছিলো। কুরাইশ প্রধানগণ চূড়ান্ত ভাবে স্থির করলো যে, তারা খোদ হযরত (স)-এর ওপর এতোটা উৎপীড়ন চালাবে, যাতে তিনি নিজেই বাধ্য হয়ে ইসলাম প্রচার থেকে বিরত হন। কুরাইশদের বড়ো বড়ো সর্দারগণ ছিলো তাঁর প্রতিবেশী এবং এরাই ছিলো তার সবচেয়ে বড় দুশমন। এরা হযরত (স)-এর পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো, নামায পড়ার সময় হাসি-ঠাট্টা করতো। তিনি সিজদায় থাকলে তাঁর ঘাড়ের ওপর নাড়িভুঁড়ি এনে ফেলতো এবং গলায় চাদর জড়িয়ে এমন নির্দয়ভাবে টানতো যে, তাঁর পবিত্র গর্দানে দাগ পড়ে যেতো। তার পেছনে দুষ্ট ছেলেদের লেলিয়ে হাততালি দিতো। কোথাও কখনো তিনি বক্তৃতা দান করলে সভার মাঝখানে তারা গোলযোগের সৃষ্টি করতো এবং বলতো, এ সবই মিথ্যা কথা। মোটকথা, হয়রানি ও উৎপীড়নের যতো ন্যক্কারজনক পন্থা ছিলো, তা সবই তারা অবলম্বন করেছিলো।

এ পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা তার নবীর প্রতি যে সব ওহী নাযিল করেছিলেন, তাতে এ সব অবস্থার মুকাবেলার জন্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বর্তমান ছিল। ইসলামী আন্দোলনের অগ্রসেনাদেরকে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেওয়া হলোঃ বর্তমানে সত্যের ওপর দৃশ্যত যে জুলুমের পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছে, তাকে কোন স্থায়ী ব্যাপার মনে করা উচিত নয়। দুনিয়ার জীবনের এ ধরনের তামাসা বারবারই ঘটে আসছে। তাছাড়া সফলতার আসর ক্ষেত্র এ দুনিয়ার জীবন নয় বরং পরকালীন জীবন। আর এ কথা সুনিশ্চিত যে ,যারা তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করে, পরকাল তাদের জন্যেই উত্তম।

রাসূলে আকরাম কে উদ্দেশ্য করে বলা হলোঃআমি জানি তোমার সাথে যা কিছু করা হচ্ছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু এই সব লোক সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করে শুধু তোমারই নয়, বরং আমারই প্রতি অসত্য আরোপ করছে। আর এটা কোন নতুন কথা নয়, এর আগেও আমার নবী-রাসূলদের সাথে এরুপ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তারা ধৈর্য ও সবরের সাথে এই পরিস্থিতি মুকাবেলা করেছেন এবং আমার সাহায্য না পৌঁছা পর্যন্ত সর্ববিধ দুঃখ-মসিবতকে হাসিমুখে সহ্য করেছেন। তুমিও এমনি পরিস্থিতি অতিক্রম করছো এবং এরুপ পরিস্থিতিই অতিক্রম করতে হবে।

সাহাবায়ে কেরামকে বারবার বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে, হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, যাকে বদলে দেয়ার সাধ্য কারো নেই।সে নিয়ম অনুসারে হকপন্থীদের কে এক সুদীর্ঘ কাল ব্যাপী যাচাই করা এবং তাদের ধৈর্য, সততা, আত্মত্যাগ, আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ঈমানী দৃঢ়তার পরীক্ষা নেওয়া একান্ত অপরিহার্য। সেই সঙ্গে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং তার প্রতি ঈমানের ব্যাপারে তারা কতখানি মজবুত,তা-ও নিরুপণ করা প্রয়োজন। কারণ, এইরুপ দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের মাধ্যমে তাদের মধ্যে এমন সব গুণাবলীর সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীকালে আল্লাহর দ্বীনের খাঁটি অনুবর্তী হবার পক্ষে অত্যন্ত সহায়ক হয়ে থাকে। আর লোকেরা যখন এরুপ পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রতিপন্ন হয়, কেবল তখনই আল্লাহর সাহায্য এসে হাজির হয়। এর আগে কখনো তা আসতে পারে না।

আকাবার প্রথম শপথ

পরবর্তী বছর মদিনার বারোজন অধিবাসী আকাবা নামক স্থানে হযরত(সা:)-এর খেদমতে উপস্থিত হলো। তারা হযরত(সা:)-এর হাতে হাত দিয়ে ছ’টি মৌল বিষয়ে আনুগত্যের শপথ(বাইয়াত) গ্রহণ করলো। হযরত(সা:) মাসয়াব বিন উমাইর(রা:)-কে তাদের সাথে মদিনায় প্রেরণ করলেন। তিনি মদিনার ঘরে ঘরে গিয়ে লোকদের কে কুরআন পড়ে শোনাতেন এবং ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন।এভাবে দু’একজন করে লোক ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো। ক্রমান্বয়ে মদিনার বাইরেও ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আওস গোত্রের প্রধান হযরত সা’দ বিন মা’আজও হযরত মাসয়াবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল গোটা আওস গোত্রেরই ইসলাম গ্রহণের শামিল।

আকাবার দ্বিতীয় শপথ

এর পরবর্তী বছর হজ্ব উপলক্ষ্যে মদীনা থেকে বাহাত্তর জন অধিবাসী মক্কায় এল। তারা অন্য সঙ্গীদের থেকে লুকিয়ে আকাবা গিয়ে হযরত (স) এর হাতে ইসলাম কবুল করলেন এবং যেকোন অবস্থায় ইসলামী আন্দোলনের সাথে সহযোগিতা করার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। হযরত (স) এর এই দলটির মধ্য থেকে বার ব্যাক্তিকে বেছে নিয়ে নকিব (নেতা) নিযুক্ত করলেন। এদের মধ্যে নয়জন ছিল খাযরাজ গোত্রের এবং বাকি তিনজন আওস গোত্রের। হযরত (স) পূর্বোক্তদের মতো এদের কাছ থেকে ও নিম্নোক্ত প্রতিজ্ঞাসমূহ গ্রহণ করলেনঃ
১. এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব করবো না।
২. চৌর্যবৃত্তির প্রশ্রয় দেবো না।
৩. ব্যভিচারে লিপ্ত হবো না।
৪. আপন সন্তানদের হত্যা করবো না।
৫. কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেবো না।
৬. রাসূলুল্লাহ (স) দেয়া সুকৃতির আদেশ কখনও অমান্য করবোনা।
শপথের পর হযরত (স) বললেন, ‘যদি তোমরা এই শর্তগুলি পালন করো, তাহলে তোমাদের জন্যে বেহেশতের সুসংবাদ। নচেত তোমাদের ব্যাপার সম্পূর্ণ খোদার হাতে নিবদ্ধ। তিনি ইচ্ছে করলে তোমাদের মাফ করেও দিতে পারেন অথবা শাস্তি দানও করতে পারেন।’

এ লোকগুলো যখন শপথ করছিলেন, তখন সাদ বিন জারারাহ দাড়িয়ে বললেনঃ “ভাই সব! তোমরা কি জানো, কি কথার উপর তোমরা শপথ গ্রহণ করছো? জেনে রাখো, এ হচ্ছে গোটা আরব ও আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। সকলে সমস্বরে বলল, হ্যাঁ, আমারা সবকিছু সবকিছু বুঝে শুনেই শপথ করছি। প্রতিনিধি দলের আরো কয়েকজন সদস্য এধরনের জোরালো বক্তৃতা প্রদান করেন। ঠিক এ সময়ে মদীনার এই সব নওমুসলিম এবং হযরত (স) এর মধ্যে স্থিরিকৃত হয় যে, কোনো সময় যদি হযরত (স) মদীনায় গমন করেন তো মদীনা বাসী সর্বতভাবে তার সাহায্য সহযোগীতা করবে। এসময় বারাআ (রা) বলেন যে, আমরা তরবারীর কোলে লালিত হচ্ছি।

মু’জিযা ও মি’রাজ

মু’জিযা কথাটির সাধারণ অর্থ কোন অলৌকিক বা অস্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু দ্বীন ইসলামের পরিভাষায় মু’জিযা হচ্ছে এক প্রকারের চূড়ান্ত দলীল। কোন পয়গম্বরের নবুয়্যাত প্রমাণ করার জন্যে আল্লাহ তাআলা চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসাবে বিশ্ববাসীর সামনে এই দলিল কে উপস্থাপন করেন। অবশ্য তার জন্যে শর্ত এই যে, দলিলের বিষয়বস্তুকে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হতে হবে। দৃষ্টান্ত স্বরুপ বলা যায়ঃ আগুনের কাজ হচ্ছে দাহ করা, কিন্তু এ ক্ষেত্রে দাহ করবে না;সমুদ্রের ধর্ম হচ্ছে প্রবাহিত হওয়া, কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রবাহ থেমে যাবে;বৃক্ষের স্বভাব হচ্ছে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, কিন্তু এক্ষেত্রে সে চলমান হবে। অনুরুপভাবে মৃত জীবিত হয়ে উঠবে , লাঠি সাপে পরিণত হবে ইত্যাদি। যেহেতু দুনিয়ার প্রত্যেকটি কাজের আসল কারন হচ্ছে আল্লাহর মহিমা এবং তার ইচ্ছা মাত্র , সেহেতু কোন কোন কাজ যেমন নির্ধারিত নিয়মে ক্রমাগত সম্পন্ন হতে থাকে, ঠিক তেমনি কোন কোন কাজ আল্লাহ তাআলার মহিমায় এই স্বাভাবিক নিয়ম থেকে বিচ্যুত হয়ে কোন অস্বাভাবিক নিয়মেও হতে পারে। আর যখন আল্লাহর ইচ্ছা হয় ,তখন তা হয়েও থাকে।

আল্লাহ তাআলা অধিকাংশ নবীকেই তাদের নবুয়্যাতের সত্যতা প্রমাণের জন্যে মু’জিযার ক্ষমতা দান করেছিলেন। কিন্তু সে মু’জিযা কাফিরদের ঈমান আনা ও বিশ্বাস পোষণের কারণ হিসাবে খুব কমই কাজ করেছে।আগেই বলা হয়েছে ম’জিযা হচ্ছে এক প্রকারের চূড়ান্ত দলিল।এজন্যে লোকেরা যখন মু’জিযা দেখার পরও নবীকে অস্বীকার করেছে, তখন তাদের ওপর আল্লাহ তাআলা গযব নাযিল করেছেন এবং দুনিয়া থেকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। মক্কার কুরাইশরাও হযরত (সা)-এর কাছে মু’জিযা দাবি করেছিল । তাদের এই দাবিকে বারবার এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল । কারণ আল্লাহ তাআলার নিয়মানুযায়ী কোন জনগোষ্ঠী কে তাদের দাবি অনুসারে যদি কোন মুজিযা দেখানো হয়,তাহলে তারপর তাদের সামনে শুধু দুটি পথই খোলা থাকেঃঈমান অথবা ধ্বংস। কুরাইশদেরকে এক্ষুনি ধ্বংস দেয়ার ইচ্ছা আল্লাহ তাআলা ছিল না। সে জন্য তাদের দাবিকেও বারবার এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে যখন দীর্ঘ দশ-এগারটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল এবং অন্যান্য মুমিনদের মনে মাঝে মাঝে আগ্রহ জাগতো লাগলো :হায়!আল্লাহর তরফ থেকে যদি কোন অলৌকিক নির্দশন প্রকাশ পেত, যা দেখে অবিশ্বাসী লোকেরা ঈমান আনতো ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতো! কিন্তু তাদের এই আগ্রহের জবাবে বলা হচ্ছিলঃ ‘দেখো, অধৈর্য হয়ো না। যে ধারা ও নিয়মে আমি আন্দোলন পরিচালনা করছি, ঠিক সেভাবে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে তুমি কাজ করতে থাকো। মুজিয়া দ্বারা কাজ হাসিল করতে চাইলে তা অনেক আগেই সম্পন্ন হয়ে যেত। আমি যদি ইচ্ছা করতাম তো এক একটি কাফিরের অন্তর মোমের মত নরম করে দিতাম এবং তাদেরকে জোরপূর্বক সুপথে চালিত করতাম। কিন্তু এ আমার নীতি নয়। এভাবে না মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও ক্ষমতার কোন পরীক্ষা হয়ে থাকে আর না তার চিন্তাধারা ও নৈতিক জীবনে আদর্শ সমাজ গড়ার উপযোগী কোন বিপ্লব আসতে পারে। তথাপি লোকদের বেপরোয়া আচরণ এবং তাদের অবিশ্বাসের ফলে যদি তুমি ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মুকাবেলা করতে না পারো তো তোমার যা ইচ্ছা হয় তা-ই করো। জমিনের মধ্যে ঢুকে অথবা আসমানে উঠে কোন মুজিযা নিয়ে এসো।

কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে, হযরত (সা:)-কে কোন মু’জিযায় দান করা হয়নি। তার সবচেয়ে বড় মু’জিযা তো খোদ কুরআন মজীদ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষে তার ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে অসংখ্য মু’জিযা প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণ এবং তার মহাকাশ ভ্রমণ (মিরাজ) অত্যন- গুরুত্বপূর্ণ । এতৎভিন্ন বহুতর ভবিষ্যৎ বাণীর সফল হওয়া, তার দু’আর ফলে পানি বর্ষিত হওয়া, লোকদের সুপথপ্রাপ্ত হওয়া, প্রয়োজনের সময় অল্প জিনিস বৃদ্ধি পাওয়া, রুগ্ন ব্যক্তির আরোগ্য লাভ করা, পানি প্রবাহিত হওয়া ইত্যাকার অসংখ্য মু’জিযা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে।

চন্দ্র দ্বিখন্ডিতকরণ

মক্কার কাফিরদের সামনে প্রমাণ পেশ করার জন্যে হযরত(সা:)-কে যে সব মু’জিযা দেখাতে হয়, তন্মধ্যে চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করণের ঘটনাটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা:) এই ঘটনাটি বিবৃত করেছেন এবং সহীহ বুখারী , মুসলিম প্রভৃতি হাদিস গ্রন্থে তা উল্লেখিত হয়েছে। তিনি এ ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এবং স্বচক্ষে চাঁদকে দু’টুকরা হতে দেখেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা হযরত(সা:)- এর সঙ্গে মিনায় ছিলাম , ঠিক এমনি সময় দেখলাম চন্দ্রটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং তার একটি খন্ড পাহাড়ের দিকে চলে গেল। হযরত(সা:) বললেন : ‘সাক্ষী থেকো।’ কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, মু’জিযা দেখার পরই কাফিররা ঈমান আনবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই ; বরং কার্যত দেখা যায় যে সব লোকের মন অবিশ্বাস ও হঠকারিতায় পরিপূর্ণ ,কেবল তারাই মু’জিযা দাবি করে। এভাবেই তারা নিজেদের অবিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকার জন্যে বাহানা তালাশ করে থাকে। নচেত যাদের অন্তরে ঈমান কববুল করার মত যোগ্যতা থাকে এবং যারা পার্থিব স্বার্থের জালেও জড়িত নয়, তাদের কাছে তো হযরত (সা:) এর মহান চরিত্র এবং তার শিক্ষাগুলোই সবচেয়ে বড়ো মু’জিযা। আর এই শ্রেণীর লোকেরাই যে সত্য ধর্ম গ্রহণে হামেশা অগ্রবর্তী হয়ে থাকে , তা বলাই বাহুল্য। তাই চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হবার পরও কাফিররা বলতে পারলো; ‘ওহো , এটা তো একটা জাদুর সাহায্যে চিরদিনই এরকম হয়ে আসছে।’ এভাবে তারা সুপথ প্রাপ্তির এক দুর্লভ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হলো। অবশ্য এমনি সুস্পষ্ট নিদর্শনের পরও তারা আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যা মনে করায় তাদের ব্যাধির তালিকায় আরো একটি গুরুতর ব্যাধি সংযোজিত হলো।

মি’রাজ

মি’রাজ অর্থ ঊর্ধে আরোহণ করা। যেহেতু হযরত (সা:) তার এক মহাকাশ ভ্রমণ সম্পর্কে এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন, এজন্যে তার এই ভ্রমণ কে মি’রাজ বলা হয়। এর অপর নাম হচ্ছে ইসরা অর্থাৎ রাতের পর রাত ভ্রমণ করা । এ ভ্রমণ যেহেতু রাতের পর রাত অব্যাহত ছিল , সে জন্যে একে ইসরাও বলা হয়। কুরআন পাকে এই শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে।

আল্লাহর নবীদেরকে দাওয়াত , তাবলীগ , ও ইকামতের দ্বীনের যে বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিতে হয়, সে জন্যে অত্যন্ত উচু দরের ঈমান ও সুদৃঢ় বিশ্বাসের প্রয়োজন। এ কারণেই তারা যে অদৃশ্য সত্যের প্রতি ঈমান আনার জন্যে আহ্বান জানিয়ে থাকেন , তা অন্তত তাদের নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করা দরকার। কারণ তাদেরকে সারা দুনিয়ার সামনে এ কথা দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করতে হয় যে, তোমরা শুধু আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে একটা জিনিসকে অস্বীকার করছো; অথচ আমরা নিজ চোখে দেখা সত্যকেই বিবৃত করছি। তোমাদের কাছে আছে শুধু আন্দাজ-অনুমান, আমাদের কাছে আছে ইলম ও জ্ঞান।এজন্যে অধিকাংশ নবীর কাছেই ফেরেশতা আত্মপ্রকাশ করেছে, তাদেরকে আসমান ও জমিনের বিশাল রাজত্ব প্রত্যক্ষ করানো হয়েছে, স্বচক্ষে বেহেশত ও দোযখ দেখানো হয়েছে এবং এ জীবনেই মৃত্যুর পরবর্তী অবস্হা সম্পর্কে অবহিত করানো হয়েছে মি’রাজ বা ইসরা এ ধরণেরই একটা ঘটনা মাত্র ।এতে একজন মুমিনকে যে সব অদৃশ্য সত্যের প্রতি ঈমান আনতে হয়, হযরত (সা:)-কে তা স্বচক্ষে দেখানো হয়েছে।

মিরাজের ঘটনা কোন তারিখে ঘটেছিল, এ সম্পর্কে হাদিসে বিভিন্ন রুপ বর্ণনা পাওয়া যায়। অবশ্য সমস্ত বর্ণনা সামনে রেখে ঐতিহাসিকগণ এ তথ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, এ ঘটনা হিজরতের প্রায় বছর দেড়েক আগে ঘটেছিল। এ সম্পর্কে বুখারী এবং মুসলিমের বর্ণনা সামনে রাখলে যে মোটামুটি বিবরণ পাওয়া যায়, তা নিম্নরূপঃ একদিন সকাল বেলা হযরত (সা:) প্রকাশ করেনঃ‘গত রাতে আমার প্রভু আমায় অত্যন্ত সম্মানিত করেন। আমি শুয়ে বিশ্রাম করছিলাম, এমন সময় জিবরাঈল এসে আমাকে জাগিয়ে কা’বা মসজিদে নিয়ে যান। সেখানে তিনি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং তা জমজমের পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলেন অত:পর তাকে ঈমান ও হিকমত দ্বারা পূর্ণ করে বিদীর্ণ স্থান পূর্বের ন্যায় জুড়ে দেন। এরপর তিনি আমার আরোহণের জন্যে খচ্চরের চেয়ে কিছু ছোট একটি সাদা জানোয়ার উপস্থিত করেন। তার নাম ছিল বুরাক। এটি অত্যন্ত দ্রুতগতি সম্পন্ন জানোয়ার ছিল। আমি তার ওপর আরোহণ করতেই বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে উপনীত হলাম। এখানে বুরাকটি মসজিদে আকসার দরজার সাথে বেঁধে রেখে আমি মসজিদে প্রবেশ করে দু’রাকায়াত নামাজ পড়লাম। এই সময় জিবরাঈল আমার সামনে দুটি পেয়ালা উপস্থিত করলেন। তার একটিতে শরাব এবং অপরটিতে দুধ ছিল। আমি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে শরাবেরটি ফেরত দিলাম। এটা দেখে জিবরাঈল বললেনঃ‘আপনি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে স্বভাব ধর্মকেই (দ্বীনে ফিতরাত) অবলম্বন করেছেন। ‘এর পর মহাকাশ ভ্রমণ শুরু হল। আমরা যখন পথম আকাশ পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন জিবরাঈল পাহারাদার ফেরেশতা কে দরজা খুলে দিতে বললেন। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমার সাথে কে আছেন?’ জিবরাঈল বললেন,‘মুহাম্মদ। ফেরেশতা আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘একে কি ডাকা হয়েছে ?’ জিবরাঈল বললেন, ‘হ্যাঁ ডাকা হয়েছে।’ একথা শুনে ফেরেশতা দরজা খুলতে খুলতে বললো, ‘এমন ব্যক্তিত্বের আগমন মুবারক হোক।’ আমরা ভেতরে ঢুকতেই হযরত আদম(আ:)-এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। জিবরাঈল আমায় বললেন, ‘ইনি আমার পিতা আদম। আপনি একে সালাম করুন। আমি সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাবদান প্রসঙ্গে বললেন, ‘ খোশ আমদেদ! হে নেক পুত্র , হে সত্য নবী! এর পর আমরা দ্বিতীয় আকাশে পৌঁছলাম এবং প্রথম আকাশের ন্যায় সওয়াল -জওয়াবের পর দরজা খুলে দেওয়া হলো। আমরা ভেতরে গেলাম হযরত ইয়াহইয়া ও হযরত ঈসা(আ:)- এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। জিবরাঈল তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খোশ আমদেদ, হে নেক ভ্রাতা, হে সত্য নবী! অত:পর আমরা তৃতীয় আকাশে পৌঁছলাম। এখানে হযরত ইউসুফ (আ:) এর সঙ্গে দেখা হলো। আগের মতই তার সঙ্গে সালাম কালাম হলো। অনুরুপভাবে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীস (আ:) এর সঙ্গে , পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ:) এর সঙ্গে এবং ষষ্ঠ আকাশে হযরত মূসা(আ:) এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। সর্বশেষ সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীম (আ:) এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো এবং তিনিও সালামের জবাব দান প্রসঙ্গে বললেন,‘খোশ আমদেদ ! হে নেক পুত্র,হে নেক নবী! এরপর আমাকে ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক একটি সমুন্নত বরই গাছ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। এর ওপর অগনিত ফেরেশতা জোনাকির মতো ঝিকমিক করছিল।

এখানে হযরত (সা:) অনেক গোপন রহস্য প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার সঙ্গেও কথাবার্তা বললেন। এ সময় আল্লাহ তাআলা তার উম্মতের জন্যে মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরয করে দিলেন। এ সব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পর তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন আবার হযরত মূসা(আ)এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ‘বলুন খোদার দরবার থেকে কি উপহার নিয়ে যাচ্ছেন ?’ হযরত (সা:) বললেন, ‘দিন-রাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ?’ মূসা(আ:) বললেন, ‘আপনার উম্মত এত বড় বোঝা বহন করতে পারবে না; কাজেই আপনি ফিরে যান এবং এটা কম করে আনুন।’ হযরত (সা:) আবার ফিরে গেলেন এবং নামাজের ওয়াক্ত কমানোর জন্যে আবেদন জানালেন। ফলে ওয়াক্তের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে দেয়া হলো।কিন্তু মূসা(আ:) হযরত (সা:) কে বারবার পাঠালেন এবং প্রত্যেক বারই সংখ্যা কমতে লাগলো। অবশেষে কমতে কমতে সংখ্যা মাত্র পাঁচটি রয়ে গেল। এতেও হযরত মূসা(আ:) নিশ্চিত হলেন না, বরং তিনি আরো কম করানোর কথা বললেন। কিন্তু হযরত (সা:) বললেন :‘আমার আর কিছু বলতে লজ্জা করছে।’ এ সময় আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে এই মর্মে ঘোষণা এলো :যদিও আমি নামাজের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে পাঁচ করে দিয়েছিম তবুও তোমার উম্মতের মধ্যে যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, তাদেরকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজেরই পুরস্কার দান করা হবে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়া এই উপলক্ষে আল্লাহর নিকট থেকে আরও দুটি উপহার পাওয়া গেল। একটি হচ্ছে সূরা বাকারার শেষ আয়াত সমষ্টি, যাতে ইসলামের মৌল আকিদাগুলো এবং ঈমানের পূর্ণতার বিষয় বিবৃত করার পর এই মর্মে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, মুসিবতের দিন এখন সমাপ্ত প্রায়। দ্বিতীয় হচ্ছে এই সুসংবাদ যে, উম্মতে মুহাম্মদীর যারা অন্তত শিরক থেকে বেঁচে থাকবে, তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে।’এই ভ্রমণকালে হযরত (সা:) স্বচক্ষে বেহেশত এবং দোযখও পরিদর্শন করেন। মৃত্যুর পর আপন কৃত কর্মের দৃষ্টিতে মানুষকে যে সমস্ত পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, তার কয়েকটি দৃশ্যও তার সামনে উপস্থাপন করা হয়।

মহাকাশ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি আবার বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে দেখেন যে, অন্যান্য নবীগণ সেখানে সমবেত হয়েছেন। তিনি নামাজ পড়লেন এবং সবাই তার পেছনে নামাজ আদায় করলেন। এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে আসেন এবং ভোর বেলা সেখান থেকে সজাগ হন ।

মি’রাজের গুরুত্ব ভবিষ্যতের জন্যে ইঙ্গিত

সকাল বেলা হযরত (স) মহাকাশ ভ্রমণের এই ঘটনার কথা জনসমক্ষে বিবৃত করলেন। বিরুদ্ধবাদী কাফের কুরাইশরা তাকে মিথ্যাবাদী (নাউযুবিল্লাহ) বলে অভিহিত করলো। পক্ষান্তরে যাদের হৃদয়ে তার সত্যতা ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে আস্থা ছিল, তারা এর প্রতিটি হরফকেই সত্য বলে মেনে নিল। তারা বললোঃ হযরত যখন নিজেই এ ঘটনার কথা বলেছেন,তখন এর সবটাই সত্য।’ এভাবে মিরাজের ঘটনা একদিকে ছিল ঈমান ও নবুয়্যাত স্বীকারের পরীক্ষাস্বরুপ, অন্যদিকে ছিল খোদ হযরত (সা:) এর পক্ষে অসংখ্য গায়েবী রহস্য প্রত্যক্ষ করার উপায়। সেই সঙ্গে এ ছিল সেই অনাগত বিপ্লবের প্রতিও এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত যা ইসলামী আন্দোলনকে অনতিকালের মধ্যেই সংঘটিত করতে হয়েছিল। এই ইঙ্গিতের বিস্তৃত বিবরণ কুরআন পাকের সূরা বনী ইসরাঈলে (মি’রাজ সম্পর্কিত আলোচনায়) বিবৃত হয়েছে। এই সূরার বিষয়বস্ততে যেসব সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে, তা নিম্নরুপঃ

নেতৃত্ব থেকে ইহুদীদের অপসারণ

বনী ইসরাঈল গণ এই পর্যন্ত আল্লাহর দ্বীনের উত্তরাধিকার আল্লাহর বাণীর সাথে বিশ্ববাসীকে পরিচিত করানোর মহান দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তারা এ খেদমত আঞ্জাম দেয়া তো দূরের কথা, বরং নিজেরাই অসংখ্য প্রকার পাপাচারে লিপ্ত হয়ে আল্লাহর দ্বীনের খেদমত করার অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। সুতরাং এ খেদমতের দায়িত্ব এবার বনী ইসমাঈলের ওপর ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এবং হযরত (সা:)- কে এই খান্দানের মধ্যেই প্রেরণ করা হলো। ইতঃপূর্বে বনী ইসরাঈলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হয় নি; কিন্তু এবার সূরা বনী ইসরাঈলে তাদের কে বলে দেয়া হলো যে, এ পর্যন্ত তোমরা যা ভুলভ্রান্তি করেছো তাতো করেছোই। এর আগে তোমাদেরকে দু’ দুবার যাচাই করা হয়েছে; কিন্তু তোমরা আপন দোষ-ত্রুটি সংশোধন করোনি। এবার বনী ইসমাঈলের এই নবীকে পাঠানোর পর তোমাদেরকে শেষ বারের মতো সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যদি তোমরা এর আনুগত্য করো, আবার তোমরা উন্নতির পথে চলতে পারবে।

বস্তত মক্কার চরম উৎপীড়ন ও পেরেশানীময় জীবনে এই ইঙ্গিত ছিল একটি মস্তবড় সুসংবাদ, যা পরবর্তীকালে হুবহু সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।

মক্কার কাফিরদের প্রতি সতর্কবাণী

মক্কার কাফিরদের জুলুম-পীড়ন এবং হঠকারিতা ইতোমধ্যে চরমে পৌঁছেছিল। তারা বারবার চ্যালেঞ্জ দিতে লাগলোঃ ‘মুহাম্মদ যদি আল্লাহর রাসূলই হবে তাহলে আমাদের অবিশ্বাসের কারণে আমাদের ওপর কেন আযাব নাযিল হয় না? তাহলে তো সে আমাদেরকে ভয় দেখাতে পারতো।’ এর জবাবে তাদেরকে বলা হলোঃ ‘আল্লাহ তাআলার শাশ্বত নীতি এই যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন জাতির মধ্যে আল্লাহর রাসূল আসেন, ততক্ষণ তার ওপর কোন আযাব নাযিল হয় না। যখন রাসূল আগমন করেন, তখন জাতির বিত্তবান ও প্রভাবশালী লোকেরা তার সত্য প্রচারের পথ রোধ করার জন্যে কোমর বেঁধে লেগে যায়। অন্যদিকে সাধারণ ও নির্যাতিত লোকেরা তার সহযোগিতা করার জন্যে এগিয়ে আসে। অবশ্য প্রথমোক্তদের মধ্যে সত্যকে গ্রহণ করার জন্যে যোগ্যতাসম্পন্ন কিছু লোকও বর্তমান থাকে এবং তারা এগিয়ে এসে সত্যকে গ্রহণও করে। এরপর এই দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায় এবং পরিণামে মজলুমের জন্যে আল্লাহর সাহায্য আসে।এই সাহায্যের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। কিন্তু মানুষ স্বভাবতই তাড়াহুড়া প্রবণ বলে কখনো কখনো সে অকল্যাণকর জিনিসকেও ভালো মনে করে দাবি করতে থাকে। তার এটা খেয়ালই হয় না যে,আল্লাহ তাআলার প্রত্যেকটি কাজই তার নিজস্ব সময়ের জন্য নির্ধারিত। দিন-রাতের আবর্তনের বিষয়টির প্রতিই লক্ষ করো :এর ভেতর আল্লাহ তাআলার কতবড় নিদর্শন রয়েছে এবং একটি বাঁধা-ধরা নিয়ম অনুযায়ী কিরুপ একের পর এক দিন-রাত ঘুরে আসছে। অতীত ইতিহাস লক্ষ করে দেখঃ নূহ(আ:) এর পর থেকে এ পর্যন্ত কত জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।বস্তত আল্লাহ তার বান্দাদের অবস্থা পুরাপুরি অবগত রয়েছেন।তিনি প্রত্যেকের কৃত কর্ম অনুযায়ী প্রতিফল দিয়ে থাকেন। সুতরাং মক্কার কাফিরদেরও জানা উচিত যে, তারা প্রথম আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতের মুকাবেলায় যে ভূমিকা গ্রহণ করবে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের সঙ্গে ব্যবহার করা হবে। আর চূড়ান্ত ফয়সালার সময় এখন খুবই নিকটবর্তী।

ইসলামী সমাজের বুনিয়াদ

এবার মুসলমানদের জীবন থেকে দুঃখ-রজনীর অবসান ঘটায় এবং ইসলামী নীতির ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ একটি সমাজ গঠিত হবার সময় ঘনিয়ে এলো। মি’রাজের ঘটনা থেকে এই ইসলামী সমাজের বুনিয়াদী নীতিসমূহও উপহার পাওয়া গেল। যে নীতিসমূহ ভবিষ্যতে ইসলামী জীবন পদ্ধতির জন্যে নির্দেশক নীতিমালা হিসেবে কাজ করবে, তার সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে :

১.আল্লাহর সাথে আর কাউকে প্রভু ও মাবুদ বানানো যাবেনা। ইবাদত-বন্দেগী, আনুগত্য ও আজ্ঞানুবর্তিতাও তার সাথে কাউকে শরীক করা চলবে না।

২.পিতামাতা কে সম্মান এবং তাদের আনুগত্য করে চলতে হবে। কোথাও তাদের আনুগত্য খোদার আনুগত্যের প্রতিকূল হলে সেখানে তাদের আনুগত্য বর্জন করতে হবে।

৩.আত্মীয়-কুটুম্ব,মিসকীন ও মুসাফিরদের হক আদায় করতে হবে। সমাজের নাগরিকদের পরস্পরের ওপর যে অধিকার রয়েছে, তার প্রতি উপেক্ষা বা ঔদাসিন্য দেখানো যাবে না। সমস্ত অধিকার সঠিক ভাবে আদায় করতে হবে। নচেত কোন সামাজিক ব্যবস্থা শোধরানো যেতে পারে না।

৪. অপব্যয় ও অপচয় করা যাবে না;কেননা খোদার দেয়া সম্পদকে অনর্থক ব্যয় করা শয়তানের কাজ যে সমাজের লোকেরা নির্বিচারে অর্থ ব্যয় করে অর্থের মায়ায় সম্পূর্ণরুপে হাত গুটিয়ে বসে ,তা কখনো সুস্থ বা সমৃদ্ধ হতে পারে না। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

৫.দারিদ্র্য ও অনটনের ভয়ে সন্তান হত্যা করো না; কেননা জীবিকার ব্যবস্থা করা খোদার কাজ এবং তিনি তার ইন্তেজাম করেই থাকেন। কাজেই খাদ্যাভাবের আশংকায় ভবিষ্যত বংশধর ধ্বংস করো না। এটা অত্যন্ত গুনাহর কাজ এবং সামাজিক আত্মহত্যার নামান্তর।

৬.ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। এই নোংরা কাজটি থেকে শুধু বেঁচে থাকাই নয় , বরং এই ঘৃন্য কাজে উৎসাহজনক প্রত্যেকটি তৎপরতায় খতম করে দাও। যে সমাজ এই লা’নত থেকে মুক্ত না হবে, সে নিজেই নিজের মূলোচ্ছেদ করবে এবং শীগগীরই ধ্বংসের মুখে নিক্ষিপ্ত হবে।

৭.অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যা করো না। যে সমাজে লোকদের জীবন-প্রাণ নিরাপদ নয়, তা কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। শান্তিপূর্ণ অবস্থা ছাড়া কোন সমাজেরই উন্নতি লাভ করা সম্ভব নয়। কাজেই সর্বপ্রথম জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করা আবশ্যক।

৮.ইয়াতিমের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। অক্ষম, দুর্বল, অসহায় লোকদের সাহায্য করো। যে সমাজে দুর্বল ও অক্ষম লোকদের অধিকার সংরক্ষণ না করা হবে, তা কখনো প্রগতি অর্জন করতে পারবে না।

৯.আপন অঙ্গিকার পূর্ণ করো। কারণ অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। অঙ্গীকার বলতে লোকদের পারস্পরিক চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যেমন বুঝায়, তেমনি ঈমান আনার সময় খোদার সাথে মুমিন বান্দাহর কৃত ওয়াদাকে বুঝায়।

১০. ওজন ও মাপ-জোখের সময় দাঁড়িপাল্লা ও মাপকাঠি ঠিক রেখো। লেন-দেনের ব্যাপারে সততা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা এবং পরের অধিকার সংরক্ষণ করা সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্যে অতীব প্রয়োজন।যেখানে লোকদের পরস্পরের প্রতি আস্থা না থাকবে এবং সাধারণভাবে লোকেরা পরের হক মেরে খাবার ফিকিরে থাকবে, সেখানে কোন সুস্থ সামাজিক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে না।

১১.যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পিছনে ছু্‌টো না। অজানা ও অজ্ঞাত বিষয়ের পেছনে ছুটা এবং আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলেই লোকদের পারস্পরিক অবনতি ঘটে। কাজেই এই সব দোষ-ত্রুটি থেকে প্রত্যেকটি উত্তম সমাজেরই মুক্ত হওয়া উচিত। লোকদের জেনে রাখা দরকার যে,তাদের কান, চোখ এবং মন সম্পকেই সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা হবে।

১২.জমিনের ওপর অহংকারের সাথে চলো না ; কেননা গর্ব ও অহংকার মানুষকে নিকৃষ্ট চরিত্রের দিকে ঠেলে দেয়।এই দোষের ফলেই মানুষ সমাজের পক্ষে অনিষ্ঠের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই নিজের মুকাবেলায় অন্য কাউকে হেয় মনে না করা এবং কারো সঙ্গে অমানুষিক আচরণ না করা পারস্পরিক সম্পর্কের সুস্থতা বিধানের জন্যে একান্ত অপরিহার্য।

হিজরতের জন্য ইঙ্গিত

আল্লাহ তাআলা যখন কোন জাতির মধ্যে তার রাসূল প্রেরণ করেন, তখন সেই জাতির লোকেরা যাতে সেই রাসূলের দাওয়াত শুনতে ,বুঝতে এবং গ্রহণ করতে পারে, তজ্জন্যে তিনি কিছুকাল সুযোগ প্রদান করেন। এই সুযোগের ফলে কিছু লোক তো আপনাতেই সেই দাওয়াত কবুল করে নেয়।, কিন্তু বেশির ভাগ লোকই পার্থিব স্বার্থ, বাপ-দাদার অন্ধ অনুসৃতি ও প্রবৃত্তির গোলামীতে লিপ্ত থাকে বলে সেই দাওয়াত কে বর্জন করে এবং তার বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। অবশেষে এমন এক সময় আসে, যখন স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, জাতির মধ্যেকার যোগ্য লোকেরা আন্দোলনকে কবুল করে নিয়েছে; এখন আর এ আন্দোলনের প্রতি কর্ণপাত করতে এ সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করতে আগ্রহী কোন লোক বাকী নেই।

বস্তত এমনই পর্যায়ে এসেই জাতির লোকেরা নবীর কাছে মু’জিযা দাবি করে বসে এবং প্রায়শই সে জাতির সামনে মু’জিযা উপস্থাপন করা হয়। তাই এ পর্যায়ে এসে হযরত(সা:) এর কাছেও মু’জিযা দাবি করা হলো এবং তিনি বিভিন্ন রূপ মু’জিযা প্রদর্শনও করলেন। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও যখন অবিশ্বাসীরা তাদের অবিশ্বাসের ওপর অটল হয়ে রইলো, তখন স্থির করা হলো যে, এখন এ জাতির মধ্যে থেকে এ নবীর চলে যাওয়াই উচিত। কেননা এখন যেকোন মুহূর্তে এদের ওপর আযাব আসতে পারে। এই আযাব কখনো আসমান বা জমিনের কোন প্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে আসে আবার তা কখনো মুমিনের দ্বারাও সংঘটিত হয়। তাই আল্লাহ তাআলা এই সূরা বনী ঈসরাইলেই তার এ নিয়মের কথা উল্লেখ করে নবীকে সুস্পষ্ট ভাষাই বলেন যে,‘এই লোকগুলো হঠকারিতার চরমে পৌঁছে খুব শিগগিরই তোমাকে এই জনপদ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে।যদি তা-ই হয়, তাহলে তোমার বিদায়ের পর এরা এখানে নিশ্চিত থাকতে পারবে না। তোমার পূর্বে আমি যতো রাসূল পাঠিয়েছি , সবার ক্ষেত্রেই এ নিয়ম চলে এসেছে। আর এখনো এতে কোন পরিবর্তন সূচিত হবে না।’

তাহাজ্জদ নামাজের গুরুত্ব

এই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি মুকাবেলায় আত্মিক প্রস্ততি গ্রহণের জন্যে ফরয নামাজ ফরজ নামাজ ছাড়াও তাহাজ্জদ নামাজের আয়োজন করার নির্দেশ দেয়া হলো। এ ছাড়াও হিজরতের জন্যে নবীকে নিম্নোক্ত দো’আ শিখিয়ে দেয়া হলোঃ‘হে প্রভু আমাকে ভালো জায়গা চিনে নেবার তওফীক দিও এবং এখান থেকে সহি-সালামতে বের করে নিও আর নিজের তরফ থেকে সাহায্য পাঠিয়ে দুশমনদের ওপর বিজয় দান করো।’ অতঃপর এই সুসংবাদও প্রদান করা হলো যে, সত্যের বিজয় এবং মিথ্যার পতন অবশ্যম্ভাবী ; কারণ পতনের জন্যেই মিথ্যার উত্থান। এর জন্যে শুধু শর্ত এই যে, সত্যকে ময়দানে উপস্থিত থাকতে হবে।

এরপর হঠকারিতার বশবর্তী হয়ে মক্কার কাফিররা যে সব প্রশ্ন ও আপত্তি উত্থাপন করেছিল, তারও জবাব দেয়া হলো। এভাবে যুক্তি-প্রমাণ কানায় কানায় পূর্ণ করে দেয়ার পর শিক্ষণীয় বিষয়ে হিসেবে হযরত মূসা(আ:)- এর ঘটনাবলীর উল্লেখ করা হলো।

এ যুগের আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য

এ পর্যায়ে কুরআনের যেসব অংশ নাযিল হচ্ছিলো, সমকালীন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপঃ

১.আল্লাহর ওপর নির্ভরতা

মানুষের প্রকৃতি এই যে, যখন সে কোনো কাজের জন্যে চেষ্টা-সাধনা করে এবং তার আশানুরূপ ফলাফল লাভে ব্যর্থ হয়, তখন তার ওপর একটা নৈরাশ্যের অন্ধকার নেমে আসতে থাকে। সত্যের আন্দোলনের নিশানবাহীদের জন্যে এই পর্যায়টিই সবচেয়ে বেশি কঠিন হয়ে থাকে। খোদা না করুন,তারা যদি এরূপ নৈরাশ্যের শিকারে পরিণত হয়,তাহলে তাদের এবং গোটা আন্দোলোনের পক্ষে তা এক বিরাট ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই এমনই পর্যায়ে সঠিক পথে থাকা এবং ফলাফলকে সম্পূর্ণ খোদার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য অত্যন্ত মজবুত ঈমানের প্রয়োজন । তাই এই কঠিন পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে এ সম্বন্ধেই পথনির্দেশ নাযিল করেন। দীর্ঘ বারো বছরের নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা সাধনার যে ফলাফল সামনে ছিল, তা একজন সাধারণ লোকের পক্ষে ছিল নিরুৎসাহ ব্যঞ্জক । তাছাড়া এত দীর্ঘদিন পরেও মুমিনদের যে সব উৎপীড়নের সম্মুখীন হতে হচ্ছিল, তাও নেহাত কম তিতিক্ষার ছিল না। এ জন্যে মুমিনদের হৃদয় কে মজবুত করা এবং তাদেরকে সঠিক পথে চালিত করার জন্যে এ পর্যায়ে বিশেষভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো।

এ ব্যাপারে সূরা আনকাবুতের প্রতিপাদ্য বিষয় একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত। এতে মুমিনদের সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেওয়া হলো যে, তোমরা যে পথে চলবার সিদ্ধান্ত নিয়েছো, যাচাই-পরীক্ষা হচ্ছে সে পথের অপরিহার্য মঞ্জিল। এই নিরিখ দ্বারা যাচাই করেই ঈমানের প্রশ্নে সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদীদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা হয়। কিন্তু মুমিনদের এই যাচাই-পরীক্ষা করার অর্থ এই নয় যে, কাফিররা প্রকৃতপক্ষে প্রাধান্য লাভ করেছে, বরং তাদেরও জেনে নেয়া উচিত যে, খোদার মুকাবেলায় তারা কখনোই বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত হতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সত্যের আওয়াজ বুলন্দ হবেই। এ জন্যে শুধু শর্ত এই যে, সত্যের অগ্রসেনাদেরকে ধৈর্য ও সহিঞ্চুতার দ্বারা আল্লাহর সাহায্যের যোগ্য প্রতিপন্ন হতে হবে। এ প্রসঙ্গে মুমিনদেরকে আরো বলা হলো :এ পথে তো স্বভাবতই বাধা-বিপত্তি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এসে থাকে,কিন্তু তাদের কিছুতেই নিরাশ হওয়া উচিত নয়। এর আগেও আল্লাহর যে সমস্ত বান্দাহ ইসলামের আওয়াজ বুলন্দ করেছেন, তাদেরকেও এমনি অবস্থাই অতিক্রম করতে হয়েছে। হযরত নূহ (আ:)-এর কথা উল্লেখ করে বলা হলো যে, তিনি দীর্ঘ সাড়ে ন’শ বছর পর্যন্ত কতো ধৈর্য ও সহিঞ্চুতার সাথে আপন জাতির বিরোধিতা সহ্য করেছেন। অনুরূপভাবে হযরত ইবরাহীম (আ:), হযরত লূত(আ:), হযরত শুআইব(আ:), হযরত সালেহ(আ:) প্রমুখকেও এমনি পরিস্থিতিরই মুকাবেলা করতে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যেরই বিজয় হয়েছে এবং মিথ্যাকে ময়দান ছেড়ে পালাতে হয়েছে।

এর আগে বলা হয়েছে যে, কাফিরদের মুজিযা দাবির ফলো হযরত(সা:) এবং অন্যান্য মুমিনদের হৃদয়ে কখনো কখনো এই মর্মে আগ্রহ জাগতোঃ হায়! এমন কোন মুজিযা যদি প্রকাশ পেত, যা দেখে এই লোকগুলো ঈমান আনতো।এই আগ্রহের জবাবে আল্লাহ তাআলা যে পথনির্দেশ পাঠিয়েছেন, তাও ইতঃপূর্বে আলোচিত হয়েছে। এই উপলক্ষে আল্লাহ তাআলা তার সর্বশেষ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জিযার প্রতি লোকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তোমরা তো মুজিযা দাবি করছো; কিন্তু তার পূর্বে যে মুজিযা দুনিয়ার শেষ পর্যন্ত মানব জাতির জন্যে এক স্থায়ী নিদর্শন রূপে বিরাজ করবে এবং যাতে রয়েছে প্রতিটি জ্ঞানী ও সমঝধার মানুষের জন্যে নির্ভুল পথনির্দেশ ,সেই কুরআন মজীদের ওপর সর্বপ্রথম তোমাদের দৃষ্টি নিক্ষেপ করা উচিত।

এই পর্যায়ে অবতীর্ণ সূরা আনকাবুতে বলা হয়েছেঃ ‘নবুয়্যাতের আগে হযরত(সা:) যে কোন প্রকার পুথিগত জ্ঞান অর্জন করেন নি এবং কোনরুপ লেখাপড়া পর্যন্ত শেখেন নি, তা ঐ বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে কে না জানে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার পেশকৃত কালাম এত উন্নত এবং জ্ঞানগর্ভ যে একজন উম্মী লোক যে এমন অপূর্ব কালাম পেশ করতে পারে , তাদের বড়ো বড়ো আলেমরা পর্যন্ত তার কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে না। এতৎসত্ত্বেও এই লোকগুলো অবিরত মু’জিযা দাবি করে চলেছে। এদেরকে বলে দিন,মু’জিযা প্রকাশ পাওয়া বা না পাওয়া তো আমার প্রভুর ইচ্ছাধীন বিষয়। আমি শুধু তোমাদের পরিণতি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শনকারী মাত্র। অবশ্য আমি তোমাদেরকে যে আল্লাহর বাণী শুনাই ,তা আমার নবুয়্যাতের দাবি প্রমাণের জন্যে যথেষ্ঠ কিনা তা তোমাদের একটু ভেবে দেখা দরকার। তোমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে যে, যে সব লোকের ভেতর হৃদয়কে ঈমানের সম্পদে সমৃদ্ধ করার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা রয়েছে, এ বাণীসমূহ কেবল তাদেরই জন্যে রহমত ও নসিহত স্বরুপ।

২.কুরআন শ্রেষ্ঠ মু’জিযা

বস'ত হযরত(সা:)- কে যতো মু’জিযাই দান করা হয়েছে তন্মধ্যে করআন নিসন্দেহ শ্রেষ্ঠ মু’জিযা।

হযরত(সা:)- নিজেও কুরআন পাককে তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মু’জিযা বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেনঃ ‘প্রত্যেক পয়গম্বরকেই আল্লাহ তাআলা প্রচুর মু’জিযা দান করেছেন তা দেখেই লোকেরা ঈমান এনেছে। কিন্তু আমাকে যে মু’জিযা দান করা হয়েছে, তা হচ্ছে আমার প্রতি অবতীর্ণ ওহী(কুরআন) এজন্যে আমি প্রত্যাশা করি, কিয়ামতের দিন আমার অনুগতের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি হবে। বস্তত কুরআন হচ্ছে এক স্থায়ী মু’জিযা এবং অন্যান্য মুজিযা হচ্ছে সাময়িক। সেসব মু’জিযা বিলীন হয়ে গেছে; কিন্তু এ মু’জিযা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষয় হয়ে থাকবে এবং লোকদেরকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে থাকবে। কুরআন পাকের ছন্দোময় ভাষা ,এর মাধুর্য ও লালিত্য এতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বহির্ভত অদৃশ্য খবরাখবর ও ভবিষ্যত বাণীর উল্লেখ ,এর অপূর্ব প্রভাব বিস্তারকারী ক্ষমতা , এর বিধি-বিধান ও শিক্ষাসমূহের অতুলনীয় কল্যাণকর ভূমিকা ,আজ পর্যন্ত কুরআন উপস্থাপিত জীবন পদ্ধতির মতো কার্যকর আর কোন জীবন পদ্ধতি উদ্ভাবনে মানব সমাজের ব্যর্থতা , এর বিষয়বস্ত বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা সত্ত্বেও সকল প্রকার অসংগতি ও বৈপরিত্য থেকে তার মুক্ত থাকা ,সর্বোপরি এক নিরক্ষর ব্যক্তির জবান থেকে এইসব বাণী নিসৃত হওয়া - এসব কিছুই কুরআন পাকের মু’জিযা হবার জন্যে অকাট্য প্রমাণ। এই সমস্ত দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে আজো হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নবয়্যাত সম্পর্কে মানুষের মন পুরোপরি নিশ্চিন্ত ও নিঃসন্দেহ হতে পারে এবং তা হয়েও থাকে।

৩.চূড়ান্ত কথা

এ পর্যায়ে অবতীর্ণ কালামের আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এবার থেকে কাফিরদের সাথে অত্যন্ত সস্পষ্ট ও চূড়ান্ত ভাবে কথা বলা শুরু হলো। এর ধরণটা ছিলো এই যে, এবার বুঝানো এবং বাতলানোর পর্যায় শেষ হয়ে গেছে। মানবার যদি ইচ্ছা থাকে তো এখনো সময় আছে, মেনে নাও। নচেত অবিশ্বাস ও হঠকারিতার পরিণাম ভোগ করার জন্যে তৈরি হও।

তাই হযরত(সা:)- তাদেরকে সস্পষ্টত বলে দিলেন : আমি আমার প্রভুর তরফ থেকে অবতীর্ণ একটি উজ্জ্বল প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আর তোমরা তাকে এই বলে অস্বীকার করছো যে, এই অবিশ্বাসের ফলে যে আযাব আসার তা আসুক। কিন্তু তোমাদেরকে আমি জানিয়ে দিচ্ছি, যে বস্তুটির জন্যে তোমরা তাড়াহুড়ো করছো, তা আমার হাতে নেই। এ সম্পর্কিত ফয়সলা সম্পূর্ণ খোদার হাতে। এটা যদি আমার এখতিয়ারের বিষয় হতো, তাহলে কবে এর মিমাংসা হয়ে যেত! গায়েবের খবর তো শুধু আল্লাহ তাআলাই জানেন। কোন কাজের জন্যে কোন সময় উপযুক্ত , তা তিনিই ভালো বুঝেন। তিনি যখন ইচ্ছা তখন তোমাদের ওপর আযাব নাযিল করতে পারেন। এ আরো কিছুটা অগ্রসর হয়ে নির্দেশ করা হলোঃ ‘যে সব লোক দ্বীনের ব্যাপারটিকে একটি খেল তামাসা মনে করে নিয়েছে এবং দুনিয়ার জীবনেই মোহগ্রস্থ হয়ে আছে, তাদেরকে নিজস্ব অবস্থার ওপরই ছেড়ে দাও। অবশ্য তাদেরকে যথারীতি কুরআন শুনাতে থাকো। এরপরও যদি তারা সত্যকে মেনে নিতে রাজি না হয়, তাহলে তাদেরকে বলে দাওঃ লোক সকল ! তোমরা যা করতে চাও তা নিজের জায়গায় করতে থাকো আর আমিও আমার জায়গায় কাজ করতে থাকি। এর পরিণামে কে সঠিক পথে আছে, তা শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে।

এই ধরনের কালামের এ একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। এ ছাড়াও এই পর্যায়ে ওহীতে এ ধরণটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে এবং প্রায় দ্ব্যর্থহীন ভাবে ঘোষণা করা হয় যে, এবার বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রত্যাসন্ন হয়ে উঠেছে।

৪.হিজরতের প্রস্তুতি

এতৎভিন্ন এ পর্যায়ের কালামে হিজরতের জন্যেও বারবার ইশারা আসতে লাগলো। এই সূরা আনকাবুতেই নির্দেশ করা হলোঃ ‘হে আমার বান্দাহ গণ!তোমরা শুধু আমারই বন্দেগী করতে থাকো। আমার বন্দেগীর কারণে যদি স্বদেশের জমিন তোমাদের জন্যে সংকীর্ণ হয়ে যায়, তাহলে সে জন্যে কোন পরোয়া করো না। আমার জমিন অত্যন্ত প্রসস্ত ; এজন্য যদি ঘরবাড়িও ও ছেড়ে দিতে হয় দাও, কিন্তু আমার বন্দেগীর সম্পর্ক ছিন্ন করো না।কোন জানদারের পক্ষে সবচেয়ে বড় ভয় যা হতে পারে, তাহলো মৃত্যুভয়। নিশ্চয় জেনে রেখ, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং তার পর সবাইকে আবার আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। কাজেই সেই মৃত্যু যদি আমার পথেই আসে, তাহলে আর চিন্তা কিসের ? যে কেউ ঈমান ও সৎকর্মের পুঁজি নিয়ে আসবে, তাকে এমন আরামদায়ক বাগিচায় স্থান দেয়া হবে, যার নিম্নদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। সেখানে চিরকাল সে অবস্থান করবে। যারা ঈমানদার ও সৎকর্মশীল , যারা কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও আল্লাহর দ্বীনের পথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং যারা নিজেদের প্রতিটি ক্রিয়াকর্মে শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ওপরই ভরসা রাখে, তাদের জন্যে এ কত উত্তম বিনিময়!এরপর বলা হলো যে, আল্লাহর পথে ঘর-বাড়ি ছাড়বার দ্বিতীয় ভয় হচ্ছে আর্থিক দুর্গতি। এ সম্পর্কে তাদের এই প্রত্যয়কে আরো মজবুত করা হলো যে, প্রকৃতপক্ষে রিযিক দেবার ক্ষমতা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ।দুনিয়ায় বিচরণশীল কত প্রাণী রয়েছে; তাদের কেউই আপন রিযিক সঙ্গে নিয়ে বেড়ায় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাদের রিযিক যুগিয়ে থাকেন। কাজেই রিযিক দাতা হিসেবে তার ক্ষমতা সম্পর্কে তোমরা কেন নিরাশ হও এবং তিনি তোমাদের রিযিকের ব্যবস্থা করবেন না বলে কেন ভয় পাও ?এছাড়া এ পর্যায়ের অপর সূরা বনী ইসরাঈলে হিজরতের জন্যে দু’আ ও শিক্ষাদান করা হলো। বলা হলোঃ দু’আ প্রার্থনা করোঃ ‘প্রভু হে! আমায় উত্তম জায়গায় পৌঁছিয়ে দাও , মক্কা থেকে ভালভাবে বের করে নাও এবং শত্রুর ওপর বিজয় ও সাহায্য দান করো।’ আর হে নবী !ঘোষণা করে দাওঃ সত্য এসে পড়েছে এবং মিথ্যা অপসৃত হয়েছে। মিথ্যাকে অপসৃত হতেই হয়েছে।’ মোটকথা, এ পর্যায়ের কালামে এগুলো ছাড়াও এ ধরনের আরো বহুতর ইঙ্গিত রয়েছে। এতে একদিকে যেমন সেই প্রত্যাসন্ন বিপ্লবের দিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছিল, অন্যদিকে তেমনি এরূপ পরিস্থিতির মুকাবেলায় যে প্রস্তুতির দরকার, তার প্রতিও বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছিল। আখিরাতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় স্থাপন করা, অন্তর থেকে পার্থিব সম্পদের বাসনা মুছে ফেলা, খালেস তওহীদ এবং তার দাবিগুলোকে মনের ভেতর বদ্ধমূল করে নেয়া, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো অবলম্বনকে মনের মধ্যে স্থান না দেয়া, কেবল তারই সত্ত্বার ওপর পুরোপুরি ভরসা করা, তার কাছ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশাবলীকে কিছুমাত্র হ্রাস-বৃদ্ধি না করে যথারীতি পেশ করতে থাকা এবং এসব কাজের জন্যে প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জনের নিমিত্ত নামাজ কায়েম করা ও তার প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ দেয়া ইত্যাকার উপায়-উপকরণের মাধ্যমে মুসলমানদের কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। সেই সঙ্গে এই কঠিনতর পরিস্থিতিতেও দ্বীনের প্রচার অব্যাহত রাখার জন্যে তাদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করা হচ্ছিল।

হিজরত

হিজরত শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে পরিত্যাগ কিংবা পরিবর্জন । কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় হিজরত বলতে বুঝায় : দ্বীন ইসলামের খাতিরে নিজের দেশ ছেড়ে এমন স্থানে গমন করা যেখানে প্রয়োজন সমূহ পূর্ণ হতে পারে। কারণ ইসলামী জীবন যাপন করার এবং আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহ্বান জানানোর আজাদী যে দেশে নেই, সে দেশকে শুধু আয়-উপার্জন ,ঘর-বাড়ি ,ধন-সম্পত্তি কিংবা আত্মীয়-স্বজনের খাতিরে আঁকড়ে থাকা মুসলমানদের পক্ষে আদৌ জায়েয নয়।

প্রসঙ্গত একটি কথা জেনে রাখা দরকার যে,আল্লাহর দ্বীনের প্রতি ঈমান পোষণকারীর পক্ষে কোনো কুফরী রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে জীবন যাপন করা কেবল দুটি অবস্থায়ই সঙ্গত হতে পারে। একঃ সংশ্লিষ্ট দেশে ইসলামের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং কুফরী ব্যবস্থাকে ইসলামী ব্যবস্থায় রুপান্তরিত করার জন্যে সে ক্রমাগত চেষ্টা-সাধনা করতে থাকবে - এ যাবত মক্কায় থেকে মুসলমানেরা যেরূপ চেষ্টা-সাধনা করে আসছিল এবং সে জন্যে সর্বপ্রকার দুঃখ-মুসিবত সহ্য করেছিল। দুই :সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে তার বেরোবার কোন পথ যদি সত্যই না থাকে কিংবা ইসলামী ধারায় জীবন যাপন ও ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত চেষ্টা-সাধনা করার উপযোগী কোন জায়গা যদি সে খুঁজে না পায়। কিন্তু দ্বীনের প্রয়োজন পূর্ণ হবার উপযোগী জায়গা যখনি পাওয়া যাবে - এবার মদিনা থেকে যেমন প্রত্যাশা করা গিয়েছিল - তখন অবশ্যই তাদের হিজরত করে সেখানে চলে যেতে হবে। তবে এক্ষেত্রে যারা নিতান্তই অক্ষম ও পঙ্গু এবং যারা অসুস্থতা কিংবা দারিদ্র্যের কারণে কোন প্রকারেই হিজরতের জন্যে সফর করতে সক্ষম নয়, কেবল তারাই ক্ষমা পাবার যোগ্য।

মদিনায় সাধারণ মুসলমানদের হিজরত

মদিনায় ইতোমধ্যেই ইসলাম বেশ কিছুটা প্রচারিত হয়েছিল। এই অবস্থায় মক্কায় যে সব মুসলমান কাফিরদের হাতে উৎপীড়িত হচ্ছিল, হযরত(সা:) তাদেরকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। এটা টের পেয়েই কাফিররা মুসলমানদেরকে বিরত রাখার জন্যে জুলুমের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল এবং যাতে মুঠো থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে জন্যে সর্বোত ভাবে চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু মুসলমানেরা তাদের ধন প্রাণ ও সন্তান-সন্ততির জীবন বিপন্ন করেও নিছক দ্বীনের খাতিরে দেশ ত্যাগ করাকেই পছন্দ করলো। কোন প্রলোভন বা ভয়-ভীতিই তাদেরকে এই সংকল্প থেকে বিরত রাখতে পারলো না। ক্রমান্বয়ে বহু সাহাবী মদিনায় চলে গেলেন। এখন হযরত(সা:)এর সঙ্গে থেকে গেলেন শুধু হযরত আবু বকর(রা:) এবং হযরত আলী(রা:)। আর থাকলো দারিদ্র্য ও শারীরিক অক্ষমতা হেতু সফর করতে অসমর্থ এমন কিছূ সংখ্যক মুসলমান।

হযরত (সা:) কে হত্যা করার সলা-পরামর্শ

এভাবে নবুয়্যাতের ত্রয়োদশ বছরের সুচনা পর্যন্ত বহূ সাহাবী মদীনায় হিজরত করলেন। কুরাইশরা দেখতে পেল মুসলমানরা একে একে মদীনায় গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং সেখানে ইসলাম ক্রমশ প্রসার লাভ করছে। এর ফলে তারা অত্যন্ত শংকিত হয়ে উঠলো এবং ইসলামকে চিরতরে খতম করে ফেলার পন্থা সর্ম্পকে চিন্তা-ভাবনা করলে লাগলো। সাধারন জাতীয় সমস্যাবলী সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও সলা-পরামর্শ করার জন্যে ‘দারুন্নদ্‌ওয়া’ নামে তাদের একটি জায়গা নির্দিষ্ট ছিলো। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের প্রধান ব্যক্তিগণ জমায়েত হলো এবং এই আন্দোলনকে পর্যুদস্ত করার জন্যে কি পন্থা অবলম্বন করা যায়, সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলো। কেউ কেউ পরামর্শ দিলো : মুহাম্মদ (সাঃ)-কে শৃংখলিত করে কোন ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখা উচিত। কিন্তু কেউ কেউ মত প্রকাশ করলো যে, মুহাম্মদ (সাঃ) - এর সঙ্গী-সাথীগণ হয়তো আমাদের কাছ থেকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে এবং তার ফলে আমাদের পরাজয়ও ঘটতে পারে; এজন্যে উক্ত পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করা হলো। কেউ কেউ আবার পরামর্শ দিলো যে, তাঁকে নির্বাসিত করা উচিত। কিন্তু মুহাম্মদ (সাঃ) যেখানে যাবেন সেখানেই তাঁর অনুগামী বাড়তে থাকবে এবং তাঁর আন্দোলনও যথারীতি সামনে অগ্রসর হবে; এ আশংকায় উক্ত পরামর্শও নাকচ করা হলো। অবশেষে আবু জেহেল পরামর্শ দিলো : ‘প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে যুবক মনোনীত করা হবে; এরা সবাই এক সঙ্গে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ওপর হামলা করবে এবং তাঁকে হত্যা করে ফেলবে। এর ফলে তাঁর রক্ত সকল গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর সমস্ত গোত্রের সঙ্গে একাকী লাড়াই করা হাশিমী খান্দানের পক্ষে কিছুতেই সম্ভবপর হবে না।’ এ অভিমতটি সবাই পছন্দ করলো এবং শেষ পর্যন্ত এ কাজের জন্যে একটি রাত ও নির্দিষ্ট করা হলো। সিদ্ধান্ত করা হলো যে নির্দিষ্ট রাতে মনোনীত ব্যক্তিগণ হযরত (সা:) এর বাসভবন ঘেরাও করে থাকবে। ভোরে তিনি যখন বাইরে বেরোবেন ,তখন তারা আপন কর্তব্য সমাধা করবে। এরুপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ এই যে, আরবরা রাতের বেলায় অন্য কারো ঘরে প্রবেশ করাকে পছন্দ করতো না।

কিন্তু আল্লাহ তাআলার কৃপায় দুশমনদের ঐসব গোপন অভিসন্ধির কথা হযরত (সা:) এর কাছে যথারীতি পৌঁছতে থাকে। অতঃপর সেই প্রতিক্ষিত সময়টি এলো,যখন তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় গমন করার জন্যে ওহী যোগে নির্দেশ পেলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে হিজরতের দুদিন আগে থেকেই তিনি আবু বকর সিদ্দিক (রা:) এর সঙ্গে এ সম্পর্কে পরামর্শ করেন এবং এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, তার সাথে হযরত আবু বকর(রা:) ও গমন করবেন। সফরের জন্যে দুটি উষ্ট্রী ঠিক করা হলো এবং কিছু পাথেয়ও তৈরি করা হলো।

মক্কা থেকে রওয়ানা

কাফির কুরাইশগণ হযরত(সা:) কে হত্যা করার জন্যে যে রাতটি নির্দিষ্ট করেছিল, সেই রাতেই তিনি আলী(রা:) কে ডেকে বললেন :‘আমি হিজরতের নির্দেশ পেয়েছি এবং আজ রাতেই মদিনা রওয়ানা হয়ে যাচ্ছি । আমার কাছে বহু লোকের আমানত জমা রয়েছে। এগুলো তুমি প্রত্যুষে লোকদের কাছে প্রত্যার্পণ করে দিয়ো। আর আজ রাতে তুমি আমার বিছানায় থেকো,যেন আমি ঘরে আছি ভেবে লোকেরা নিশ্চিন্ত থাকে।

কুরাইশরা ইসলাম বৈরিতার কারণে হযরত(সা:) এর রক্তের নেশায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল; কিন্তু এ অবস্থায়ও তারা হযরত(সা:) কে এতোখানি আমানতদার ও বিশ্বাসভাজন মনে করতো যে, তাদের নিজ নিজ আমানত ও মাল-মাত্তা এনে তার কাছে জমা রাখতো।

নির্দিষ্ট রাতে কাফিররা হযরত(সা:) এর গৃহ ঘেরাও করলো। রাত যখন গভীর হলো , হযরত(সা:) নিরবে ও নিশ্চিন্তে ঘর থেকে বের হলেন । সে সময় তিনি সূরা ইয়াছিনের একটি আয়াত (فَأَغْشَيْنَاهُمْ فَهُمْ لاَ يُبْصِرُونَ) à¦ªà¦¾à¦  করছিলেন। তিনি এক মুঠো মাটি হাতে নিয়ে ‘শাহাতিল ওজুহ ’(মুখমন্ডল আচ্ছন্ন হয়ে যাক) কথাটি বলে কাফিরদের দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং তাদের ব্যূহ ভেদ করে নিবিঘ্নে বেরিয়ে গেলেন। সে সময় আল্লাহর কুদরতে অবরোধকারি গণ যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো; ফলে তারা হযরত(সা:) কে বেরিয়ে যেতে দেখতে পেলো না।প্রথমে তিনি হযরত আবু বকর (রা:) এর গৃহে গমন করলেনএবং সেখান থেকে তাকে নিয়ে মক্কার বাইরে গিয়ে সওর পর্বত গুহায় আশ্রয় নিলেন।

ভোরবেলা কাফিরগণ দেখতে পেলো, হযরত (স) মক্কা ছেড়ে চলে গেছেন। তারা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লো এবং তাঁর সন্ধানে চারদিকে ছুটাছুটি শুরু করলো। একবার তারা খুঁজতে খুঁজতে‘ সওর’র্পবত তাদের পদধ্বনি শুনে হযরত আবু বকর (রা) কিছুটা বিচলিতও হয়ে উঠলেন। তার কারণ,তার নিজের জীবন সম্পর্কে তার কোন ভয় ছিল না;বরং হযরত(সা:)- এর ওপর না জানি কোন বিপদ এসে যায় এই ছিল তার আশংকা । তার এই অস্থিরতা লক্ষ্য করে হযরত(স)অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে বললেনঃ‘লা তাহযান ইন্নাল্লাহা মাআনা’ - ঘাবড়িও না,আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। কার্যত তা-ই হলো।

আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে গুহামুখে এমন কতকগুলো নিদর্শন ফুটে উঠলে যে, তা দেখে কাফিররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো। তাদের মনে ধারণা জন্মালো যে , এ গুহার ভেতরে কেউ প্রবেশ করে নি।

হযরত আবু বকর(রা:)-এর পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ তখন বয়সে নবীন। তিনি রাতের বেলায় হযরত(সা:) ও সিদ্দিক (রা:)-এর কাছে থাকতেন এবং ভোরে মক্কায় এসে কাফিরদের শলা-পরামর্শ সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে গুহায় ফিরে গিয়ে বুজর্গদ্বয়কে অবহিত করতেন। কয়েক রাত যাবত হযরত আবু বকর(রা:)-এর গোলাম বকরীর দুধ নিয়ে যেত, কখনো বা ঘর থেকে কিছু খাবার নিয়ে পৌঁছতো। এভাবে তিন রাত পর্যন্ত হযরত(সা:) ও সিদ্দিক(রা:) সেখানে অবস্থান করলেন।

চতুর্থ দিন হযরত(সা:) সওর পর্বত গুহা থেকে বেরোলেন এবং পুরো এক রাত এক দিন তারা সমানে পথ চললেন। সফরের জন্যে আবু বকর(রা:) আগে থেকেই দুটি উষ্ট্রী ঠিক করে রেখেছিলেন। পথ বাতলানোর জন্যে একশো জানাশোনা লোকও নির্দিষ্ট করে রেখেছিলেন। পরদিন দুপুর বেলা রোদের তেজ প্রখর হয়ে উঠলে বিশ্রামের জন্যে একটি বৃহদাকার পাথরের ছায়ায় তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করলেন। অদূরেই একটি গোয়ালা ছিল ; তার বকরী থেকে হযরত(সা:) দুধ পান করলেন।অতঃপর সেখান থেকে তিনি আবার যাত্রা শুরু করলেন। তিনি সামনে পা বাড়াতেই সোরাকা বিন জাশিম নামক জনৈক্য কুরাইশ হঠাৎ তাকে দেখে ফেললো।এই লোকটি পুরস্কারের লোভে হযরত(সা:) এর সন্ধানে বেরিয়েছিল। সে হযরত(সা:) কে দেখতে পেয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। কিন্তু ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সে আবার নিজেকে সামলে নিল এবং হযরত(সা:) এরওপর হামলাকরার জন্যে তৈরি হলো। কিন্তু এবারও সামনে এগুতেই তার ঘোড়া হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে বসে গেল। এবার সোরাকা শংকিত হয়ে উঠলো এবং বুঝতে পারলো। ব্যাপারটা মোটেই সুবিধাজনক নয়। তার পক্ষে মুহাম্মদ(সা:) এর ওপর হামলা করা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। সে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়লো এবং হযরত(সা:) এর কাছে আত্মসমার্পণ করে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলো। হযরত(সা:) তাকে ক্ষমা করে দিলেন। এও ছিল হযরত(সা:) এর একটি মু’জিযা।

মদিনায় শুভাগমন

হযরত(সা:) এর আগমন বার্তা পূর্বেই পৌঁছেছিল গোটা শহরই তার শুভাগমনের জন্যে প্রতিক্ষমান ছিল। ছোট-বড় সবাই প্রতিদিন সকালে শহরের বাইরে গিয়ে জমায়েত হতো এবং দুপুর পর্যন্ত ইন্তেজার করে ফিরে আসতো। অবশেষে একদিন তাদের সেই প্রতিক্ষিত শুভ মুহূর্তটি এসেই পড়লো। দূর থেকে হযরত (সা:) এর আসবার আলামত দেখে গোটা শহরটি তকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো। প্রতিটি প্রতিক্ষাকারী হৃদয় উজার করে তাকে স্বাগত জানালো। মদিনা থেকে তিন মাইল দূরে ‘কুবা’ নামক স্থানে আনসারদের অনেকগুলো খান্দান বসবাস করতো। এদের মধ্যে আমর ইবনে আওফের খান্দান টি ছিল সবচেয়ে শীর্ষস্থানীয়। কুলসুম বিন আল হাদাম ছিলেন এদের প্রধান ব্যক্তি। এর পরম সৌভাগ্য যে, দো-জাহানের নেতা সবার আগে এরই আতিথ্য কবুল করেন এবং কুবাই এর গৃহেই অবস্থান করেন। হযরত (সা:) এর রওয়ানার তিন দিন পর হযরত আলী(রা:) মক্কা থেকে যাত্রা করেছিলেন ; তিনিও এখানে এসে হযরত (সা:) এর সঙ্গে মিলিত হলেন।

কুবায় হযরত (সা:) শুভাগমন করেন নবুয়্যাতের ত্রয়োদশ বছরের ৮ রবিউল আওয়াল (মুতাবেক ২০সেপ্টেম্বর , ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ)।এখানে অবস্থানকালে তার পয়লা কাজ ছিল একটি মসজিদ নির্মাণ করা । তিনি তার পবিত্র হস্ত দ্বারা এইমসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং অন্যসাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে এর নির্মানকাজ সম্পূর্ণ করেন। কয়েকদিন অবস্থান করে তিনি শহরের দিকে রওয়ানা করলেন। দিনটি ছিল শুক্রবার । পথে বনী সালেমের মহল্লা পর্যন্ত পৌঁছলে জুহর নামাজের সময় হলো। এখানে তিনি সর্বপ্রথম জুম’আর খুতবা প্রদান করেন এবং প্রথম বার জুম’আর নামাজ পড়ালেন।

মদিনায় প্রবেশকালে প্রতিটি আত্মোৎসর্গী মুসলিমের হৃদয়েই তার মেহমানদারীর সৌভাগ্য লাভের আকাঙ্খা জাগলো। তাই প্রত্যেক গোত্রের লোকই তার সামনে এসে আবেদন জানাতে লাগলো :‘হুযুর, এই হচ্ছে আপনার ঘর, অনুগ্রহ করে এখানে আপনি অবস্থান করুন। লোকদের মধ্যে এতখানি আগ্রহ-উদ্দীপনার সঞ্চার হলো যে প্রতিটি হৃদয়ই যেন পথের ফরাশে পরিণত হলো; প্রতিটি হৃদয়ই উৎসর্গীকৃত হবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠলো। এমনকি মেয়েরা পর্যন্ত গৃহের ছাদে উঠে গাইতে লাগলোঃ চন্দ্র উদিত হয়েছে,
বিদা পর্বতের ঘাঁটি থেকে, খোদার শোকর আমাদের কর্তব্য, ,
যতক্ষণ প্রার্থনাকারীরা প্রার্থনা করে। ,
কিশোরী বালিকারা দফ বাজিয়ে বাজিয়ে গাইতে লাগলোঃ ,
আমরা নাজ্জার খান্দানের বালিকা ,
(আর) মুহাম্মদ(সা:) আমাদের কত উত্তম পড়োশী! ,
হযরত(সা:) বালিকাদের জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমরা কি আমায় ভালোবাস ?তারা বললো ,হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ ‘আমিও তোমাদের ভালোবাসি।’

মদিনায় অবস্থান

হযরত(সা:) এর মেহমানদারীর সৌভাগ্য কে লাভ করবে? এমন একটি প্রশ্ন যে এর মিমাংসা মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। হযরত বললেন যে, আমার উষ্ট্রী যার গৃহের সামনে দাঁড়াবে , এ খেদমত সেই আজ্ঞাম দিবে। ’ ঘটনাক্রমে এ সৌভাগ্য টুকু হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা) এর ভাগ্যে পড়লো। বর্তমানে যেখানে মসজিদে নববী অবস্থিত , তার নিকটেই ছিল তার গৃহ। গৃহটি ছিল দ্বিতল বিশিষ্ট । তিনি হযরত (সা:) এর থাকবার জন্যে ওপরের তলাটি পেশ করেন। কিন্তু লোকদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে হযরত (সা:) নিচের তলায় থাকা পছন্দ করলেন্‌ হযরত আবু আইয়ুব এবং তার স্ত্রী নিচের তলা ছেড়ে ওপরের তলায় চলে গেলেন। এখানে হযরত(সা:) সাত মাস কাল অবস্থান করলেন। এরপর তার বসবাসের জন্যে মসজিদে নববীর নিকটে একটি কোঠা নির্মিত হলো এবং সেখানেই তিনি স্থানান-রিত হলেন। কয়েক দিনের মধ্যে তার খান্দানের অন্যান্য লোকও মদিনায় চলে এলো ।

মসজিদে নববীর নির্মাণ

মদিনায় আগমনের পর সবচেয়ে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল একটি মসজিদ নির্মাণ করা। হযরত (সা:) যেখানে অবস্থান করছিলেন, তার নিকটেই দুই ইয়াতিমের কিছু অনাবাদী জমি ছিল। নগদ মূল্যে তাদের কাছ থেকে এই জমিটি খরিদ করা হলো। তারই ওপর মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হলো। এবারও হযরত(সা:) সাধারণ মজুরের ন্যায় সবার সাথে মিলে কাজ করলেন। স্বহস্থে তিনি ইট-পাথর বয়ে আনলেন। মসজিদটি অত্যন্ত সাদাসাদি ভাবে নির্মিত হলো। কাঁচা ইটের দেয়াল, খেজুর গাছের খুঁটি এবং খেজুর পাতার ছাদ - এই ছিল এর উপকরণ। মসজিদের কিবলা হলো বায়তুল মুকাদ্দিসের দিকে। কেননা, তখন পর্যন্ত মুসলমানদের কিবলা ছিল ‌ঐ দিকে। অতঃপর কিবলা কা’বামুখী হলে তদনুযায়ী মসজিদের সংস্কার করা হলো। মসজিদের একপাশে একটি উঁচু চত্বর নির্মিত হলো। এর নাম রাখা হলো ‘ সুফফা’। যে সব নও মুসলিমের কোন বাড়ি-ঘর ছিলো না। এটি ছিল তাদের থাকবার জায়গা।

মসজিদের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে তার নিকটেই হযরত (সা:) তার স্ত্রীদের জন্যে কয়েকটি কোঠা তৈরি করে নিলেন। এগুলো কাঁচা ইট এবং খেজুর গাছ দ্বারা নির্মিত হলো। এই ঘরগুলো ছয়-সাত হাত করে চওড়া এবং দশ হাত করে লম্বা ছিল। এর ছাদ এতোটা উঁচু ছিল যে, একজন লোক দাঁড়ালে তা স্পর্শ করতে পারতো। দরজায় ঝুলানো ছিল কম্বলের পর্দা।

হযরত(সা:) এর গৃহের নিকটে যে সব আনসার বাস করতো, তাদের ভিতরকার স্বচ্ছল লোকেরা তার খেদমতে কখনো তরকারী , কখনো বা অন্য কিছু পাঠাতো। এর দ্বারাই তার দিন গুজরান হতো; অর্থাৎ সংকটের ভেতর দিয়েই তার জীবন-যাত্রা নির্বাহ হতো।

ভাই ভাই সম্বন্ধ

মক্কা থেকে যে সব মুসলমান ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে মদিনায় চলে এসেছিল, তাদের প্রায় সবাই ছিল সহায় সম্বলহীন। তাদের মধ্যে যারা স্বচ্ছল ছিল, তারাও নিজেদের মাল-পত্র মক্কা থেকে আনতে পারেন নি। তাদের সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে একদম রিক্ত হস্তেই আসতে হয়েছিল। এই সব মুহাজির যদিও মুসলমানদের (আনসার) মেহমান ছিলো, তথাপি এদের স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল । তাছাড়া এরা নিজেরাও স্বহস্থে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে ভালবাসতো। তাই মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে একদিন হযরত (সা:) আনসারদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি এবং মুহাজিরদের ভেতর থেকে এক ব্যক্তিকে ডেকে বললেন, ‘আজ থেকে তোমরা পরস্পর ভাই ।’ এভাবে সমস- মুহাজিরকে তিনি আনসারদের ভাই বানিয়ে দিলেন। তার ফলেই আল্লাহর এই খাঁটি বান্দাগণ শুধু ভাই-ই নয়, পরস্পরে ভাইয়ের চেয়েও ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হলেন। আনসারগণ মুহাজিরদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে গেল এবং তাদের সামনে নিজেদের সমস্ত সম্পত্তি ও সামান-পত্রের হিসাব করে বললো : ‘এর অর্ধেক তোমাদের আর অর্ধেক আমাদের।’ এভাবে বাগানের ফল, ঘরের সামান, বাসগৃহ, সম্পত্তি - মোটকথা, প্রতিটি জিনিসই সহোদর ভাইদের মতো বিভক্ত হলো। ফলে আশ্রয়হীন মুহাজিরগণ সব দিক থেকে নিশ্চিন্ত হলো। তারা যথারীতি ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করলো, দোকান-পাট খুললো এবং অন্যান্য কাজে নিযুক্ত হলো। এভাবে মুহাজির পুনর্বাসনের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হলো এবং এদিক দিয়ে সবাই নিশ্চিন্ত হলো।

নবপর্যায়ে ইসলামী আন্দোলন

হিজরতের আগে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা হচ্ছিল মক্কার মুশরিকদের কাছে। তাদের কাছে এটা ছিল একটি অভিনব জিনিস। কিন্তু হিজরতের পর সমস্যা দেখা দিল মদিনার ইহুদীদের নিয়ে। এরা তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত, ফেরেশতা, ওহী ইত্যাদি বিশ্বাস করতো এবং একজন পয়গম্বরের (হযরত মূসার ) উম্মত হিসাবে খোদার তরফ থেকে আগত একটি শরীয়াতের অনুগামী হবারও দাবিদার ছিল। নীতিগত ভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা:) যে দ্বীন-ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, তাদেরও প্রকৃত দ্বীন ছিল তা-ই। কিন্তু শতাব্দী কালের অনাচার ও বেপরোয়া আচরণের ফলে তাদের ভেতর নানারকমের দোষ-ত্রুটি দেখা দিয়েছিল ।তাদের জীবন প্রকৃত খোদায়ী শরীয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল এবং তাদের ভেতর অসংখ্য কুসংস্কার , বিদয়াত ,ও কুপ্রথার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ।তাদের কাছে তওরাত কিতাব ছিল বটে, কিন্তু তার মধ্যে তারা বহু মানবীয় কালাম শামিল করে নিয়েছিল। তবুও তার মধ্যে খোদায়ী বিধি-বিধান যা কিছু বাকী ছিল , তাও মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ছাঁচে ফেলে তারা ওলট-পালট করে দিয়েছিল। এভাবে খোদার দ্বীনের সাথে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সামাজিক দিক দিয়ে তাদের ভেতর মারাত্মক সব দোষ-ত্রুটি শিকড় গেড়ে বসেছিল। আল্লাহর কোন বান্দাহ যদি তাদেরকে সঠিক পথ দেখাতে চাইতো, তার কোন কথা পর্যন্ত তারা শুনতে প্রস্তুত ছিল না। বরং তাকে তারা ঘোরতর দুশমন বলে মনে করতো এবং তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্যে সর্বোতভাবে চেষ্টা চালাতো। যদিও তারা মিলগতভাবে মুসলিমই ছিল, তবুও তাদের এতখানি পতন ঘটেছিল যে, তাদের আসল দ্বীন কি ছিল , তা তাদের নিজেদেরই স্মরণ ছিল না।

এদিক দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সামনে শুধু দ্বীন-ইসলামের মূলনীতি সংক্রান্ত বুনিয়াদী প্রচারের কাজই ছিলনা, বরং ঐসব বিভ্রান্ত মুসলমানের ভেতর পুনরায় দ্বীনি ভাবাদর্শ জাগ্রত করার দায়িত্বও বর্তমান ছিল। তাছাড়া হযরত (সা:) এর আগমনের পর মুসলমানেরা ক্রমান্বয়ে চারদিক থেকে এসে মদিনায় জমায়েত হচ্ছিল এবং এই সব মুহাজির ও মদিনার আনসার গণ মিলে একটি ক্ষুদ্রাকৃতির ইসলামী রাষ্ট্রেরও ভিত্তি পত্তন করেছিল। ৩৭ এ কারণে আন্দোলনকে এ যাবত শুধু আদর্শ প্রচার, আকীদা-বিশ্বাসের সংস্কারে এবং কিছু নৈতিক শিক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশ প্রদান করতে হলেও, এখন সামাজিক জবিনধারার সংস্কার, প্রশাসনিক আইন-কানুন প্রণয়ন এবং পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্বন্ধ বিষয়ক বিধি-ব্যবস্থা জারির প্রয়োজন দেখা দিলো। সুতরাং এবার এদিকে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়া হলো।

এ সময় আরো একটি বিরাট পরিবর্তন সাধিত হলো। এই পর্যন্ত কুফরী পরিবেশেই ইসলামী দাওয়াত পেশ করা হচ্চিলো এবং এরই ভেতর থেকে মুসলমানরা কাফিরদের জুলুম-পীড়ন বরদাশত করছিরো। কিন্তু এবার তারা ক্ষুদ্রাকৃতির হলেও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ করলো যা চারদিকে দিয়েই ছিলো কাফিরদের দুর্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত। তাই ব্যাপারটি এখন আর শুধু উৎপীড়ন আর হয়রানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইলো না, বরং গোটা আরব উপদ্বীপই এবার সংকল্পগ্রহণ করলো যে, এই নগন্য দলটিকে যতো শীঘ্র সম্ভব খতম করে দিতে হবে; নচেৎ ইসলামের এই কেন্দ্রটি শক্তি অর্জন করতে শুরু করলে তাদের জন্যে দাঁড়াবার স্থান পর্যন্ত থাকবে না। তাই নিজেদের এবং আন্দোলনের নিরাপত্তার তাগিদে এই নয়া ইসলামী দলের সামনে জরুরী কর্তব্য হয়ে দেখা দিলো :

১. পূর্ণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে জিদের আদর্শ প্রচার করা, দলিল প্রমাণ দ্বারা তার সত্যতা প্রতিপন্ন করা এবং যতো বেশি সম্ভব লোকদেরকে এর সমর্থক বানানোর চেষ্টা করা;

২. বিরুদ্ধবাদীগণ যে সব আকীদা-বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিলো, যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে তার অসারতা প্রমাণ করা, যেনো বিবেকের আলোয় কেউ কিছু বুঝতে চাইলে প্রকৃত সত্য পর্যন্ত পৌঁছতে তাকে কোনো বেগ পেতে না হয়:

৩. ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়-বাণিজ্য নষ্ট করে যারা এই নতুন রাষ্ট্রে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তাদের জন্যে শুধু বসবাসের ব্যবস্থাই নয়, বরং তাদেরকে উন্নত মানের নৈতিক ও ঈমানী শিক্ষা দান করা, যেনো চরম দুঃখ-দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা পূর্ণ ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে পারে এবং কোনো কঠিনতর অবস্থায়ও তাদের পা কেঁপে না ওঠে;

৪. মুসলমানদেরকে চরম প্রতিকূল অবস্থার মুকাবিলার জন্যে প্রস্তুত করা, যাতে করে তাদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে বিরুদ্ধবাদীগণ কোনো সশস্ত্র হামলা চালালে নিজেদের দুর্বলতা ও অস্ত্রপাতির দৈন্য সত্ত্বেও তারা পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে শত্রুর মুকাবিলা করতে পারে এবং আপন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সত্যতা সম্পর্কে গভীরতর প্রায় ও খোদার প্রতি ঐকান্তিক নির্ভরতার কারণে ময়দান থেকে কখনো পশ্চাদপসারণ না করে;

৫. যে সব লোক নানাভাবে বুঝানো সত্ত্বেও ইসলামের কাঙ্খিত জীবন পদ্ধতির প্রতিষ্ঠার পথে বাদ সাধবে, তাদেরকে প্রয়োজন হলে শক্তি প্রয়োগ করে ময়দান থেকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্যে আন্দোলনের অনুবর্র্তীদের মধ্যে পূর্ণ হিম্মত ও সৎ সাহস পয়দা করা।

ইহুদীদের সঙ্গে চুক্তি

মদীনার প্রায় চারদিকেই ইহুদীদের বসতি ছিলো।৩৮এদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করার সঙ্গে সঙ্গে একটা রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণেরও প্রয়োজন ছিলো। কারণ মুসলমানদের মক্কা ত্যাগের কথা জানতে পেরে কাফির কুরাইশগণ নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকেনি, বরং মুসলমানদের একটি সংঘবদ্ধ দলকে মদীনায় একত্রিত হতে দেখেই তারা ইসলামের এই নয়া কেন্দ্রকে আপন শক্তি ও প্রভাবে মিটিয়ে দেবার পন্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছিলো। এ কারণেই মদীনার চার দিককার ইহুদী বাসিন্দাদের সথে একটা স্পষ্টতর রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দিলো, যেনো মক্কার মুশরিকগণ কোনো হামলা চালালে ইহুদীদের ভূমিকাটা অনুমান করা যেতে পারে। তাই মদীনা ও লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইহুদী গোত্রগুলোর সঙ্গে হযরত (স) নিরপেক্ষতার চুক্তি সম্পাদন করলেন। অর্থাৎ কুরাইশ বা অন্য কেউ যদি মদীনার মুসলমানদের ওপর হামলা করে, তাহলে এরা না মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করবে আর না তাদের শত্রুপক্ষকে সমর্থন করবে; আর কারো সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি করা হলো যে, যদি মুসলমানদের ওপর কেউ হামলা করে, তাহলে তারা মুসলমানদেরকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করবে।

মুনাফিক

এ সময় মদীনায় ইসলামী আন্দোলনকে কতকগুলো নতুন সমস্যার মুকাবিলা করতে হলো। এর মধ্যে মুনাফিকদের সমস্যাটি ছিলো অতীব গুরুত্ব্‌পূর্ণ। মক্কায় শেষ পর্যায়ে এমন কিছু লোক ইসলামী সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো, যারা ইসলামী দাওয়াতকে সম্পূর্ণ সত্য বলে জানতো বটে, কিন্তু ঈমানের দুর্বলতাবশত ইসলামের খাতিরে পার্থিব স্বার্থত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলো না। চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্নীয়তা ইত্যাদি প্রায়শ ইসলামের দাবি পূরণের পথে তাদের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু মদীনায় আসার পর এমন কিছু লোকও ইসলামী সংগঠনে অনুপ্রবেশ করলো, যারা আদতেই ইসলামে বিশ্বাসী ছিলো না। এরা নিছক ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ইসলামী সংগঠনে শামিল হয়েছিল। আবার কিছু লোক অক্ষমতা হেতু নিজেদেরকে মুসলমান বলে জাহির করতো। এদের হৃদয় যদিও ইসলাম সম্পর্কে নিশ্চিন্ত ছিল না। কিন্তু নিজ গোত্র বা খান্দানের বহু লোক মুসলমান হবার ফলে এরা বাধ্য হয়ে মুসলমানের দলে শামিল হয়ে যায়। সেই সঙ্গে আরো কিছু সুযোগ সন্ধানী লোকও ইসলামী সংগঠনে ঢুকে পড়েছিল । এরা একদিকে মুসলমানদের সঙ্গী হয়ে পার্থিব ফায়াদা হাসিলের চিন্তা করতো, অন্যদিকে কাফিরদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো। এদের চেষ্টা ছিল ইসলাম ও কুফরের সংঘর্ষে যদি ইসলামী বিজয়ী হয়, তাহলে এরা যেন ইসলামের মধ্যে আশ্রয় পেতে পারে আর যদি কুফর জয়লাভ করে , তবুও যেন এদের স্বার্থ নিরাপদ থাকে।

ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে এই মিত্রবেশী শত্রুরাই ছিল সবচেয়ে বেশি অসুবিধার কারণ। এদের সঙ্গে কাজ-কারবার করা মোটেই সহজতর ছিল না। মদিনার গোটা জীবনে এই শ্রেণীর লোকদের সৃষ্ট ফিতনার কিভাবে মুকাবেলা করা হয়, যথাস্থানে তা আলোচিত হবে। এখানে শুধু ঐ শ্রেণীর মুনাফিক আর সাচ্চা মুমিনদের তুলনামূলক পরিচয়টা জেনে রাখারই প্রয়োজন বেশি। কারণ এইসময় ইসলামী আন্দোলন কে এক সংকটজনক পরিস্থিতির মুকাবেলা করতে হয় এবং এ কারণেই যেসব লোক পুরানো বিদ্বেষ এবং ইসলাম বিমুখ চিন্তাধারা আঁকড়ে ধরে ছিল অথবা যাদের ঈমান কোন দিক দিয়ে দুর্বল ছিল , আন্দোলন থেকে তাদের সরে পড়বার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল।

কিবলা পরিবর্তন

এ যাবত ইসলামের কিবলা ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। এদ্দিন ঐদিকে মুখ করেই মুসলমানরা নামায পড়তো। বায়তুল মুকাদ্দাসের সাথে ইহুদীদের সম্পর্ক ছিল খুব ঘনিষ্ঠতর । এরাও ঐদিকে মুখ করে উপাসনা করতো। দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে একদিন ঠিক নামাজের মধ্যে কিবলা পরিবর্তন করার নির্দেশ এলো এবং তখন থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের বদলে কা’বাকে মুসলমানদের কিবলা বলে ঘোষণা করা হলো। তাই হযরত (সা:) নামাজের মধ্যেই তার মুখ বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে কা’বার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । খোদ আল্লাহ তাআলা এর গুরুত্ব নিম্নোক্ত ভাষায় বর্ণনা করেছেনঃ

 

“আমরা কা’বাকে তোমাদের কিবলা নির্ধারণ করে দিয়েছি। এর কারণ হচ্ছে, কে পয়গম্বরের অনুবর্তী আর কে পশ্চাদপসরণকারী , তা যাচাই করে নেয়া”।

এর দ্বারা এ সত্য ঘোষিত হলো যে, এ যাবত দুনিয়ার নৈতিক এবং ঈমানী নেতৃত্বের যে দায়িত্ব ইহুদীদের ওপর ন্যস্ত ছিল , তা থেকে তাদেরকে অপসারণ করা হয়েছে। কারণ তারা এ দায়িত্ব পালন করেনি এবং এ নিয়ামতটির কদরও বুঝতে পারেনি। তাই তাদের বদলে এ খেদমতের দায়িত্ব এখন উম্মতে মুসলিমার ওপর ন্যস্ত করা হলো। তারা এই কর্তব্য পালন করে যাবে।

এই ঘটনার প্রভাবে বহু কপট মুসলমানেরই -যাদের হৃদয়ে ঈমানের আসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি - মুখোশ খসে পড়লো। তারা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর এই কার্যের তীব্র সমালোচনা করলো। এর ফলে ইসলামী আন্দোলনে এইসব লোকের ভূমিকা কি, তাও অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো। এভাবে বহু দো-দিল বান্দাহ ইসলামী সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল এবং এই শ্রেণীর মিত্ররুপী শত্রুদের দুষ্ট প্রভাব থেকে আন্দোলনও বহুলাংশে মুক্ত হলো।

ইসলামী আন্দোলনের প্রতিরক্ষা

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মক্কার অদূরবর্তী আকাবা নামক স্থানে মদিনার কিছু লোক হযরত (সা:) এর কাছে আনুগত্যে শপথ গ্রহণ করেছিল। তারা হযরত (সা:) এবং তার সঙ্গী-সাথীদের মদিনায় চলে আসবার জন্যে তার খেদমতে একটি প্রস্থাবও পেশ করেছিল। তখনই এ আশংকা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যে, এইশপথও প্রস্তাব প্রকৃতপক্ষে তামাম আরব উপদ্বীপের প্রতি মদিনাবাসীদের একটি চ্যালেঞ্জ স্বরুপ।এ ব্যাপারে শপথ গ্রহণকারীদের অন্যতম পুরোধা হযরত আব্বাস বিন উবাদাহ (রা:) তার সাথীদের উদ্দেশ্য করে যা বলেছিলেন, আজো তা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছেঃ ‘তোমরা কি জানো, এই ব্যক্তির কাছে তোমরা কি জিনিসের শপথ গ্রহণ করছো ? তোমরা এর কাছে শপথ গ্রহণ করে প্রকৃতপক্ষে সারা দুনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছো। সুতরাং তোমরা যদি ধারণা করে থাকো যে, তোমাদের জান-মাল ও সম্ভ্রান- ব্যক্তিগণ বিপন্ন হয়ে পড়লে একে একে দুশমনদের হাতে সোপর্দ করে দিবে, তাহলে আজই একে পরিত্যাগ করা তোমাদের পক্ষে উত্তম। কেননা খোদার কসম ,দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়ের পক্ষেই এটা চরম অবমাননাকর। পক্ষান্তরে তোমাদের উদ্দেশ্য যদি এ-ই হয় যে, তোমাদের জান-মাল ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ বিপন্ন হলেও তোমরা তাকে রক্ষা করবে,তাহলে নিসন্দেহ এর হাত তোমরা আঁকড়ে ধরো। খোদার কসম,এটা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়ের পক্ষেই কল্যাণকর।’ এ সময় গোটা প্রতিনিধিদলই সম্মিলিতভাবে বলেছিলেন : ‘আমরা একে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের জান-মাল ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতেও প্রস্তুত আছি। ’ এবার মদিনাবাসীদের সেই প্রতিশ্রুতিরই সত্যতা যাচাইয়ের সময় এলো।

কুরাইশদের বিপদ

মদিনায় মুসলমান এবং হযরত(সা:) এর স্থানান্তরিত হবার অর্থ ছিল এই যে, এবার ইসলাম অন্তত দাঁড়াবার মতো একটি জায়গা পেলো এবং মুসলমানরাও বারবার ধৈর্যের পরীক্ষা দেবার পরিবর্তে একটি সুসংহত সমাজ সংগঠনে পরিণত হলো। কুরাইশদের পক্ষে এ ছিল একটি কঠিন বিপদের ইঙ্গিত । তারা স্পষ্টভাবে দেখতে পেলো, এভাবে ইসলামী সংগঠনের শক্তি সঞ্চয় প্রকৃতপক্ষে তাদের জাহিলী ব্যবস্থারই মৃত্যু ঘটার শামিল। এ ছাড়া আরও একটি কঠিন আশংকা তাদেরকে অস্থির করে তুলেছিল । তাহলো এই যে, মক্কাবাসীদের জীবিকার একটি বড় উপায় ছিল ইয়েমেন ও সিরিয়ার বাণিজ্য। আর লোহিত সাগরের তীর দিয়ে সিরিয়া পর্যন্ত যে বানিজ্য-পথ ছিলো, মদিনা ঠিক তারই ওপর অবস্থিত। সুতরাং মদিনায় মুসলমানদের শক্তি অর্জনের অর্থ ছিলোঃ মুসলমানদের সঙ্গে সুষ্ঠু সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কুরাইশদেরকে সিরিয়ায় বানিজ্যিক সুবিধা ভোগ করতে হবে। নতুবা মুসলিম শক্তিকে চিরতরে খতম করে দিয়ে ঐ পথে তাদের ব্যবসায়ের পণ্য চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ কারণেই হিজরতের আগে মুসলমানরা যাতে মদিনায় গিয়ে জমায়েত হতে না পারে, সেজন্যে কুরাইশরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলো কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় তারা এই ক্রমবর্ধমান বিপদকে যেভাবে হোক, চিরতরে মিটিয়ে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

কুরাইশদের চক্রান্ত

আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিলো মদীনার একজন প্রভাবশালী ইয়াহূদী সর্দার। হিজরতের আগে মদীনাবাসীগণ তাকে নিজেদের বাদশা নিযুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মদিনাবাসীর ইসলাম গ্রহণ এবং মক্কা থেকে হযরত (সা:) এর মদিনায় আগমনের ফলে এই পরিকল্পনাটি বানচাল হয়ে যায়। সেই সঙ্গে আব্দুল্লাহ বিন উবাইর আশা আকাঙ্ক্ষাও পণ্ড হয়ে যায়। এমনি সময় মক্কাবাসীগণ তাকে এই মর্মে একটি চিঠি লিখলোঃ‘তোমরা আমাদের লোকদেরকে আশ্রয় দান করেছো। আমরা খোদার কসম করে বলছি, হয় তোমরা নিজেরা লড়াই করে ওখান থেকে তাদের তাড়িয়ে দাও , নচেত আমরা সবাই মিলে তোমাদের ওপর হামলা চালাবো; তোমাদের পুরুষদের কে হত্যা করবো এবং মেয়েদেরকে বাঁদি বানিয়ে রাখবো।’ এই চিঠিখানি আবদুল্লাহ বিন উবাইর হতাশ মনে কিছুটা আশার সঞ্চার করলো। কিন্তু হযরত (সা:) যথাসময়ে তার নষ্টামি প্রতিরোধ করার জন্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলেন। তিনি তাকে এই বলে বুঝালেন যে, ‘তুমি কি আপন পুত্র এবং ভাইদের সঙ্গে লড়াই করতে চাও ? যেহেতু মদিনাবাসীদের (আনসার) অধিকাংশই ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিল , এজন্যে আব্দুল্লাহ বিন উবাইর শেষ পর্যন্ত তার উচ্চাভিলাস থেকে বিরত হলো।

এসময়েই একবার মদিনার নেতা সা’দ বিন মা’আজ উমরা উপলক্ষে মক্কা গমন করলেন। কা’বার দরজায় আবু জেহেলের সঙ্গে তার সাক্ষাত হলো। আবু জেহেল তাকে বললোঃ ‘তোমরা আমাদের ধর্মত্যাগীদের আশ্রয় দান করেছো আর তোমাদেরকে নিশ্চিনে- কা’বা তাওয়াফ করতে দিবো?তুমি যদি উমাইয়া বিন খালাফের মেহমানই না হতে তাহলে এখান থেকে জিন্দা যেতে পারতে না। একথা শুনে সা’দ বললেনঃ খোদার কসম , তোমরা যদি আমায় এতে বাধা দান করো, তাহলে তোমাদের পক্ষে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে (অর্থাৎ মদিনার ওপর দিয়ে বাণিজ্য যাত্রায় ) আমি তোমাদেরকে বাধা দিবো। বস্তুত কুরাইশরা কোনরূপ নষ্টামি করলে মদিনার ওপর দিয়ে তাদের বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাবে, এ ছিল তারই সুস্পষ্ট ঘোষণা।

কুরাইশদের ওপর চাপ প্রদান

বস্তত এ সময় কুরাইশরা মুসলমান এবং ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার জন্যে যে পরিকল্পনা আঁটছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে জব্দ করতে হলে তাদের ঐ বাণিজ্য পথটি দখল করে সিরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য পথ বন্ধ করে দেওয়ার চেয়ে উত্তম পন্থা মুসলমানদের কাছে আর কিছুই ছিল না। একমাত্র এহেন চাপের দ্বারাই মক্কাবাসী কুরাইশদের জব্দ করা সম্ভব ছিল। তাই হযরত (সা:) এ বাণিজ্য পথটির নিকটবর্তী ইহুদী বাসিন্দাদের সঙ্গে বিভিন্নরুপ চুক্তি সম্পাদন করে যেমন নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, তেমনি কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাকে শাঁসানোর জন্যে মাঝে মাঝে মুসলমানদের ছোট ছোট প্রহরী দল ও পাঠানো শুরু করলেন। অবশ্য এইসব প্রহরী দলের দ্বারা না কখনো কোন খুন-খারাবী হয়েছে আর না কোন কাফেলার ওপর লুটতরাজ চলেছে। এদের প্রেরণ করে শুধু কুরাইশদের জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, তারা যে পদক্ষেপই গ্রহণ করুক না কেন, হাওয়ার গতি কোন দিকে তা বুঝে শুনেই যেনো গ্রহণ করে। তারা যদি এখনো মুসলমানদের উত্তক্ত করতে চায় , তাহলে তাদেরকেও আপন ব্যবসায় থেকে হাত গুটাতে হবে।

হাযরামীর হত্যা

এরই মধ্যে কুরাইশগণ কখন কি পরিকল্পনা গ্রহণ করে , তা জানবার জন্যে হযরত (সা:) সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যথারীতি অবহিত থাকার চেষ্টা করতে লাগলেন। দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে তিনি বারোজন লোক দিয়ে আব্দুল্লাহ বিন হাজারকে নাখলার দিকে পাঠালেন। জায়গাটি মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে অবস্থিত । হযরত (সা:) আব্দুল্লাহর হাতে একটি দিয়ে বললেনঃ এটি দু’দিন পরে খুলবে। ’আব্দুল্লাহ যথাসময়ে চিঠিখানা খুলে দেখলেন,‘নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করো কুরাইশদের অবস্থান জেনে নিয়ে খবর দাও ।’ ঘটনাক্রমে কুরাইশদের কতিপয় লোক সিরিয়া থেকে ব্যবসায়ের পণ্য নিয়ে ঐ পথ দিয়ে আসছিল । হযরত আব্দুল্লাহ তাদের মুকাবেলা করলেন। ফলে আমর বিন হাযরামী নামক এক ব্যক্তি নিহত হলো।এছাড়া আরো দুই ব্যক্তি কে বন্ধী করা হলো এবং গনীমতের মাল ও যুদ্ধের পরিত্যক্ত সম্পদ সংগ্রহ করা হলো। হযরত আবদুল্লাহ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে এই ঘটনার কথা বিবৃত করে হযরত (স) এর খেদমতে গণীমতের মাল উপস্থাপন করলেন। কিন্তু হযরত (স) এতে বেজায় অসন্তুষ্ট হয়ে বললেনঃ আমি তো তোমাকে এর অনুমতি দেয়নি। তিনি গণীমতের মাল গ্রহণেও অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন।

এই দুর্ঘটনায় নিহত ও ধৃত ব্যক্তিগণ অত্যন্ত উত্তেজিত হলো তারা মুসলমাদের কাছ থেকে রক্তের বদলা নেবারও একটি অজুহাত খুঁজে পেলো।

বদর যুদ্ধের পটভূমি

এমনি অবস্থায় দ্বিতীয় হিজরীর শা’বান মাসে (৬২৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রূয়ারী কিংবা মার্চ কুরাইশদের এক বিরাট কাফেলা সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মুসলিম অধিকৃত এলাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছলো। কাফেলার সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার আশরাফী মূল্যের ধন-মাল এবং ৩০/৪০জনের মতো তত্ত্বাবধায়ক (মুহাফেজ ) ছিল। তাদের ভয় ছিল, মদিনার নিকটে পৌঁছলে মুসলমানরা হয়ত তাদের ওপর হামলা করে বসতে পারে। কাফেলার নেতা ছিল আবু সুফিয়ান। সে এই বিপদাশংকা উপলব্ধি করেই এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্যে মক্কায় পাঠিয়ে দিল। ঐ লোকটি মক্কায় পৌঁছেই এই বলে শোরগোল শুরু করলো যে, ‘তাদের কাফেলার ওপর মুসলমানরা লুটতরাজ চালাচ্ছে। সুতরাং সাহায্যের জন্যে সবাই ছুটে চলো।’

কাফেলার সঙ্গে যে ধন-মাল ছিল, তার সাথে বহু লোকের স্বার্থ জড়িত ছিল। ফলে এ একটা জাতীয় সমস্যায় পরিণত হলো। তাই সাহায্যের ডাকে সাড়া দিয়ে কুরাইশদের সমস্ত বড় বড় সর্দারই যুদ্ধের জন্যে বেরিয়ে পড়লো। এভাবে প্রায় এক হাজার যোদ্ধার এক বিরাট বাহিনী তৈরি হয়ে গেল।এই বাহিনী অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা ও শান-শওকতের সঙ্গে মক্কা থেকে যাত্রা করলো। এদের হৃদয়ে একমাত্র সংকল্প :মুসলমানদের অস্তিত্ব এবার নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে, যেন নিত্যকার এই ঝঞ্ঝাট চিরতরে মিটে যায়। বস্তত ,একদিকে তাদের ধন-মাল রক্ষার আগ্রহ , অন্যদিকে পুরনো দুশমনি ও বিদ্বেষের তাড়না - এই দ্বিবিধ ক্রোধ ও উন্মাদনার সঙ্গে কুরাইশ বাহিনী মদিনা আক্রমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

কুরাইশদের হামলা

এদিকে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছেও এই পরিস্থিতি সম্পর্কে যথারীতি খবর পৌঁছতে লাগলো। তিনি বুঝতে পারলেন, এবার সত্যসত্যই মুসলমানদের সামনে এক কঠিন সংকটকাল উপস্থিত হয়েছে। এবার যদি কুরাইশরা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সফলকাম হয় এবং মুসলমানদের এই নয়া সমাজ-সংগঠনটিকে পরাজিত করতে পারে, তাহলে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে সামনে এগোনো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি, এর ফলে ইসলামের আওয়াজও হয়তো চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। মদিনায় হিজরতের এ যাবত দুটি বছর ও অতিক্রান্ত হয়নি। মুহাজিরগণ তাদের সবকিছুই মক্কায় ফেলে এসেছে এবং এখনো তারা রিক্তহস্ত । আনসার গণ যুদ্ধ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ। অন্যদিকে ইহুদীদেরও অনেকগুলো গোত্র বিরুদ্ধতার জন্যে প্রস্তত । খোদ মদিনায় মুনাফিক এবং মুশরিকদের অবস্থিতি এক বিরাট সমস্যার রুপ পরিগ্রহ করেছে। এমনি অবস্থায় কুরাইশরা যদি মদিনা আক্রমণ করে ,তাহলে মুসলমানদের এই মুষ্টিমেয় দলটি হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়েও যেতে পারে। আর হামলা যদি নাও করে বরং আপন শক্তি বলে ,শুধু কাফেলাকে মুক্ত করে নিয়ে যায়,তবুও মুসলমানরা নিবীর্য হয়ে পড়বে। অতঃপর তাদেরকে জব্দ করতে আশ-পাশের গোত্রগুলোকে আর কোন বেগ পেতে হবে না। কুরাইশদের ইঙ্গিতে তারা মুসলমানদের কে নানাভাবে উত্যক্ত করতে শুরু করবে। এদিকে মদিনার ইহুদী ,মুনাফিক এবং মুশরিকগণও মাথা তুলে দাঁড়াবে। ফলে মুসলমানদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। এসব কারণেই হযরত মুহাম্মদ (সা:) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, বর্তমানে যতটুকু শক্তিই সঞ্চয় করা সম্ভব ,তা নিয়েই ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং মুসলমানদের কে আপন বাহুবল দ্বারা টিকে থাকার অধিকার প্রমাণ করতে হবে।

মুসলমানদের প্রস্তুতি

এই সিদ্ধান্তের পর নবী করীম (সা:) মহাজির ও আনসার গণকে জমায়েত করে তাদের সামনে সমগ্র পরিসি'তি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরলেনঃ‘একদিকে মদিনার উত্তর প্রান্তে রয়েছে ব্যবসায়ী কাফেলা আর অন্য দিকে দক্ষিণ দিক থেকে আসছে কুরাইশদের সৈন্য-সামন্ত । আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, এর যেকোন একটি তোমরা লাভ করবে। বলো,তোমরা এর কোনটি মুকাবেলা করতে চাও? জবাবে বহু সাহাবী কাফেলার ওপর আক্রমণ চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু নবী করীম (সা:) এর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী । তাই তিনি তার প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করলেন। এরপর মুহাজির দের ভেতর থেকে মিকদাদ বিন আমর(রা:) নামক জনৈক্য সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেনঃ‘হে আল্লাহর রাসূল ! প্রভু আপনাকে যেদিকে আদেশ করেছেন সেদিকেই চলুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আমরা বনী ইসরাঈলের মতো বলতে চাইনা - যাও তুমি এবং তোমার খোদা গিয়ে লড়াই করো, আমরা এখানে বসে থাকবো। ৪০

কিন্তু এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আনসারদের থেকেও মতামত গ্রহণের প্রয়োজন ছিল । এজন্যে হযরত (সা:) তাদেরকে সরাসরি সম্বোধন করে উল্লিখিত প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তি করলেন । এরপর হযরত সা’দ বিন মা’আজ (রা:) দাঁড়িয়ে বললেন। হে আল্লাহর রাসূল ! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি এবং আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি। সর্বোপরি আমরা আপনার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছি। অতএব হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা-ই কার্যে পরিণত করুন। যে মহান সত্ত্বা আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, তার কসম , আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে গিয়ে ও ঝাঁপ দেন, তবুও আমরা আপনার সাথে থাকবো এবং এ ব্যাপারে আমাদের একটি লোকও পিছু হঠবে না । আমরা যে শপথ নিয়েছি , যুদ্ধকালে তা হরফে হরফে পালন করবো। সাচ্চা আত্মোৎসর্গীর ন্যায় আমরা শত্রুদের মুকাবেলা করবো। কাজেই আল্লাহ খুবই শিগগিরই আমাদের দ্বারা আপনাকে এমন জিনিস দেখাবেন, যা দেখে আপনার চক্ষু শীতল হয়ে যাবে। অতএব , আল্লাহর রহমত ও বরকতের ওপর ভরসা করে আপনি আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলুন।

এই বক্তৃতার পর স্থির করা হলো যে, কাফেলার পরিবর্তে সৈন্যদেরই মুকাবেলা করা হবে। কিন্তু এটা কোনো মামুলি সিদ্ধান্ত ছিল না। কারণ কুরাইশদের তুলনায় মুসলমানদের সংগঠন ছিল নেহাত দুর্বল । এর মধ্যে ঘোড়া ছিল মাত্র দু’-তিন জনের কাছে। উট ছিল মাত্র সত্তরটির মতো। যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম ও ছিল অপ্রতুল । মাত্র ষাট ব্যক্তির কাছে ছিল লৌহবর্ম । এ কারণে মাত্র কতিপয় মুসলমান ছাড়া বাদবাকী সবারই মনে ভীতির সঞ্চার হলো। তাদের অবস্থা দেখে মনে হতে লাগলো, যেনো জেনে-শুনে তারা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। সূরা আনফালের নিম্নোক্ত আয়াতে এই দৃশ্যই ফুটে উঠেছেঃ “ (হে নবী !) এই লোকগুলো তো আপন বাড়ি ঘর থেকে তেমনি বের হওয়া উচিত ছিল ,তোমার প্রভু যেমন তোমায় সত্য সহকারে তোমার গৃহ থেকে বের করে এনেছেন ; কিন্তু মুসলমানদের একটি দলের কাছে এ ছিল অত্যন্ত অপছন্দনীয় । তারা সত্য সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হওয়ার পরও সে সম্পর্কে তোমার সঙ্গে তর্ক করছিল; তাদেরকে যেন দৃশমান মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল । (সেই সময়ের কথা) স্মরণ করো ,যখন আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে ওয়াদা করেছিলেন,(আবু সুফিয়ান ও আবু জেহেলের ) দুই দলের মধ্যে থেকে যেকোন একটি তোমাদের করায়ত্ত হবে। আর তোমরা চেয়েছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল(অর্থাৎ নিরস্ত্র)দলটিকে বশীভূত করতে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল তিনি আপন বিধানের দ্বারা সত্যকে অজেয় করে রাখবেন এবং কাফিরদের মূলোচ্ছেদ করে দিবেন, যেন সত্য সত্য হয়েই থাকে এবং মিথ্যা মিথ্যাই থেকে যায় -অপরাধীদের কাছে এটা যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন।”

মদিনা থেকে মুসলমানদের যাত্রা

যুদ্ধ সম্ভার ও রসদ পত্রের এই দৈন্য সত্ত্বেও দ্বিতীয় হিজরীর ১২ রমজান নবী করীম (সা:) আল্লাহর ওপর ভরসা করে মাত্র তিনশ’র মতো মুসলমান নিয়ে মদিনা থেকে যাত্রা করেন। তারা সোজা দক্ষিণ কোণে পা বাড়ালেন; কারণ কুরাইশদের বাহিনীটি ঐ দিক থেকে আসছিল। ১৬ রমজান তারা বদরের নিকটে পৌঁছলেন। এটি মদিনা থেকে কিঞ্চিত দিক ৮০মাইল দক্ষিন -পশ্চিম অবস্থিত একটি প্রান্তর । এখানে পৌঁছার পর জানা গেল যে, কুরাইশ বাহিনী প্রান্তরের অপর সীমান্তে এসে পৌঁছেছে। তাই হযরত(সা:) এর নির্দেশে এখানে ছাউনি ফেলা হলো।

কুরাইশদের বাহিনীটি অত্যন্ত জাঁকালো সাজ-সজ্জা সহকারে বের হয়েছিল । এদের দলে এক সহস্রাধিক সৈন্য ছিলো,সর্দার ছিলো প্রায় একশোর মতো। সৈন্যদের জন্যে রসদ-পত্রেরও খুব উত্তম আয়োজন ছিল। উতবা বিন রাবিয়া ছিল সিপাহসালার ।

বদরের কাছে কাছে পৌঁছে কুরাইশ সৈন্যরা জানতে পারলো যে, তাদের বাণিজ্য কাফেলা মুসলমানদের আয়ত্ত্বের বাইরে রয়েছে ।এতে জাররাহ ও আদী গোত্রের প্রধানগণ বললো যে, এখন আর আমাদের যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই । কিন্তু আবু জেহেল তাতে সায় দিলেন না। ফলে জাররাহ ও আদী গোত্রের লোকেরা মক্কায় ফিরে গেল এবং বাকী সৈন্যরা সামনে অগ্রসর হলো।

যুদ্ধক্ষেত্রের যে অংশটি কুরাইশদের দখলে ছিল , উপযোগিতার দিক দিয়ে তা ছিল খুবই উত্তম তাদের জমিন ছিল অত্যন্তু মজবুত। পক্ষান্তরে মুসলমানরা যেখানে ছাউনি ফেলেছিল,তা ছিল লবণাক্ত ভূমি। সৈন্যদের পা তাতে দেবে যাচ্ছিল। অন্যান্য দিক দিয়েও তাদের অসুবিধা ছিল প্রচুর। এই পরিস্থিতিতে রাতভর সমস্ত সৈন্য বিশ্রাম গ্রহণ করলো;কিন্তু নবী করীম (সা:)সারারাত ইবাদাত -বন্দেগীতে মশগুল রইলেন। ১৭রমজান ফজরের পর তিনি মুসলিম সৈন্যদের সামনে জিহাদ সম্পর্কে এক উদ্দীপনাময় ভাষণ দিলেন। অতঃপর যুদ্ধের নিয়ম অনুসারে সৈন্যদের শ্রেণী বিন্যাস করা হলো। এ বছরই মুসলমানদের প্রতি রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় ,এই পয়লা রোজার মধ্যেই মুসলমানদের তিনগুন বেশি সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুত হতে হলো। কি কঠোর পরীক্ষা!

সে রাতে আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত স্বরুপ দুটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলো। প্রথমত ,মুসলিম সৈন্যগণ অত্যন্ত প্রশান্তি ও সুনিদ্রার ভেতর দিয়ে রাত যাপন করলো। প্রত্যুষে তারা সতেজ বল-বীর্য নিয়ে ঘুম থেকে জাগলো দ্বিতীয়ত, রাতে খুব বৃষ্টিপাত হলো। তার ফলে লবণাক্ত জমি শক্ত হয়ে গেলো। এবং মুসলমানদের পক্ষে ময়দান খুব উপযোগী হলো। পক্ষান্তরে এই বৃষ্টির ফলে কুরাইশদের অধিকৃত অংশ কর্দমাক্ত হয়ে গেল এবং তাতে সৈন্যদের পা দেবে যেতে লাগলো ।পরন্ত মুসলমানদের অধিকৃত অংশের নীচু ভূমিতে পানি জমে গেল এবং তাতে তাদের ওযু-গোসল ইত্যাদির প্রচুর সুযোগ হলো। এসব কারণে মুসলমানদের অন্তর থেকে ভয়-ভীতি ও শংকাবোধ দূর হয়ে গেল সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত মনে তারা শত্রু সৈন্যদের মুকাবেলার জন্যে প্রস্তত হলো।

ময়দানে যখন উভয় পক্ষের সৈন্যদল মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো, তখন এক অদ্ভূত দৃশ্যের অবতারণা হলো। একদিকে ছিল আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণকারী তার বন্দেগী ও আনুগত্য স্বীকারকারী মাত্র ৩১৩ জন মুসলমান, যাদের কাছে সাধারুণ যুদ্ধ সরঞ্জাম পর্যন্ত ছিল না। অন্যদিকে ছিল অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদ-পত্রে সুসজ্জিত এক সহস্রাধিক কাফির সৈন্য,যারা এসেছে তওহীদের আওয়াজকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার কঠিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে। যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে নবী কারীম(সা:) খোদার দরবারে হাত তুললেন এবং অতীব বিনয় নম্রতার সাথে বললেনঃ‘হে খোদা এই কুরাইশরা চরম ঔদ্ধত্য ও অহমিকা নিয়ে এসেছে তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে । অতএব আমায় যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি তুমি দিয়েছিলে ,এখন সে সাহায্য প্রেরণ করো। হে খোদা ! আজ এই মুষ্টিমেয় দলটি যদি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে দুনিয়ায় তোমার বন্দেগী করার আর কেউ থাকবে না। ’

এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল মুহাজিরদেরকে । এদের প্রতিপক্ষ ছিল আপন ভাই,পুত্র এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন। কারো বাপ , কারো চাচা, কারো মামা আর কারো ভাই ছিল তার তলোয়ারের লক্ষ্যবস্তু এবং নিজ হাতে তাদের হত্যা করতে হয়েছিল এইসব কলিজার টুকরা কে । এই কঠিন পরীক্ষায় কেবল তারাই টিকে থাকতে পেরেছিল , যারা সাচ্চা দিলে আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা করেছিলঃ যে সব সম্বন্ধকে তিনি বজায় রাখতে বলেছেন,তারা শুধু তাই বজায় রাখবে আর যেগুলোকে তিনি ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন - তা যতোই প্রিয় হোক না কেন - তারা ছিন্ন করে ফেলবে ।

কিন্তু সেই সঙ্গে আনসারদের পরীক্ষাও কোনো দিক দিয়ে সহজ ছিল না। এ যাবত আরবের কাফির এবং মক্কার মুশরিকদের চোখে তাদের ‘অপরাধ’ ছিল এটুকু যে, তারা তাদের দুশমন অর্থাৎ মুসলমানদের কে আশ্রয় দান করেছে। কিন্তু এবার তারা প্রকাশ্যভাবেই ইসলামের সমর্থনে কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, তারা তাদের জনপদটির (মদিনা) বিরুদ্ধে গোটা আরবদেরকেই দুশমন বানিয়ে নিয়েছে। অথচ মদিনার জনসংখ্যা তখন সাকুল্যে এক হাজারের বেশি ছিল না । এতো বড় দুঃসাহস তারা এজন্যেই করতে পেরেছিল যে, তাদের হৃদয় আল্লাহর ও রাসূলের মুহাব্বত এবং আখিরাতের প্রতি অবিচল ঈমানে পরিপূর্ণ হয়েছিল। নতুবা আপন ধন-দৌলত স্ত্রী-পুত্র-পরিবারকে এভাবে সমগ্র আরব ভূমির শত্রুতার ন্যায় কঠিন বিপদের মুখে কে নিক্ষেপ করতে পারে ?

কুরাইশদের পরাজয়

বস্তত ঈমানের এই স্তরে উন্নীত হবার পরই বান্দার জন্যে আল্লাহর সাহায্য অবতীর্ণ হয়ে থাকে । বদর যুদ্ধেও তাই আল্লাহ তাআলা এই সহায়-সম্বলহীন ৩১৩ জন মুসলমানকে সাহায্য দান করেন। এর ফলে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এক সহস্রাধিক সুসজ্জিত সৈন্য অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো এবং তাদের সমস্ত শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেল। এই যুদ্ধে কুরাইশ পক্ষের প্রায় ৭০ ব্যক্তি নিহত হলো এবং সম সংখ্যক লোক বন্দী হলো।নিহতদের মধ্যে তাদের বড় বড় নামজাদা সর্দারগণ প্রায় সবাই ছিল। এদের মধ্যে শায়বা, উতবা, আবু জেহেল, জামআহ , আস, উমাইয়া প্রমুখ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব নামজাদা সর্দারের মৃত্যুর ফলে কুরাইশদের মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙ্গে পড়লো। মুসলমানদের পক্ষে প্রায় ৬ জন মুহাজির এবং ৮ জন আনসার শহীদ হলেন।

যুদ্ধে যারা বন্দী হলো, তাদের কে দু’-দু’ চার জন করে সাহাবীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হলো এবং নবী করীম (সা:) তাদের কে সদাচরণ করার নির্দেশ দান করলেন। ফলে সাহাবীগণ তাদের কে এমনি আরামে রাখলেন যে, বহুতর ক্ষেত্রে তারা নিজেরা কষ্ট স্বীকার করলেও বন্দীদের কষ্ট দেন নি। এই সদাচরণের ফলে তাদের হৃদয়ে ইসলামের জন্যে অনেক নম্রতার সৃষ্টি হলো। আর এটাই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য । পরে এইসব বন্দীর অনেকেই ফিদয়ার(মুক্তিপণ) বিনিময়ে মুক্তি লাভ করে। যারা গরীব অথচ শিক্ষিত ছিল, তাদেরকে দশ-দশটি শিশুকে লেখাপড়া শেখানোর বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয়।

বদর যুদ্ধের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া

ফলাফল ও প্রতিক্রিয়ার দিক দিয়ে বদর যুদ্ধ ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ । প্রকৃতপক্ষে ইসলামের দাওয়াত অগ্রাহ্য করার দরুন মক্কার কাফের দের জন্যে যে খোদায়ী আযাব নির্ধারিত হয়েছিল , এ যুদ্ধ ছিল তারই প্রথম নিদর্শন। তাছাড়া ইসলাম ও কুফরের মধ্যে মূলত কার টিকে থাকবার অধিকার রয়েছে এবং ভবিষ্যতের হাওয়ার গতিই বা কোন দিকে মোড় নেবে, এ যুদ্ধ তা স্পষ্টত জানিয়ে দিল। এ কারণেই একে ইসলামী ইতিহাসের পয়লা যুদ্ধ বলা হয়। কুরআন পাকের সূরা আনফালে এই যুদ্ধ সম্পর্কে অনেক বিস্তৃত পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে দুনিয়ার রাজা- বাদশাহ বা জেনারেলগণ কোন যুদ্ধ জয়ের পর যে ধরণের পর্যালোচনা করে থাকে , এ পর্যালোচনা তা থেকে সম্পুর্ণ স্বতন্ত্র ।

এ পর্যালোচনার একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এর ওপর একটু বিস্তৃত ভাবে দৃষ্টিপাত করলে ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃতি এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অত্যন্ত সুস্পষ্ট উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।

বদর যুদ্ধের পর্যালোচনা এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ

১.পূবেই বলা হয়েছে যে, ইসলামের আগে যুদ্ধ ছিল আরবদের একটি প্রিয় ‘হবি’। যুদ্ধে যে মাল-পত্র (গনিমত) হস্তগত হতো, তার প্রতি ছিল তাদের দুর্নিবার মোহ। এমনকি কখনো কখনো ঐ মাল-পত্রের আকর্ষণই তাদের যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল ধন-সম্পদের চেয়ে অনেক উন্নত সে উদ্দেশ্যকে মুসলমানদের হৃদয়-মূলে বদ্ধমূল করে নেয়া অতীব প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এ দিক দিয়ে বদর যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্যে একটি পরীক্ষামূলক যুদ্ধ। মুসলমানদের হৃদয়-মূলে ইসলামী যুদ্ধের নিয়ম-নীতি ও নৈতিক আদর্শ পুুরোপুরি বদ্ধমূল হয়েছে, না অনৈসলামী যুদ্ধের ধ্যান-ধারণা তাদের হৃদয়ে এখনো প্রভাব বিস্তার করে আছে, এই যুদ্ধ ছিল তারই পরীক্ষামাত্র।

বদর যুদ্ধে কাফিরদের মালমাত্তা যাদের হস্তগত হয়েছিল , তারা পুরনো রীতি অনুযায়ী তাকে তাদের আপন সম্পত্তি বলেই মনে করে বসলো। ফলে যারা কাফিরদের পেছনে ধাওয়া করা কিংবা হযরত(সা:) এর নিরাপত্তার কাজে ব্যস্ত ছিল,তারা কিছুই পেল না। এভাবে তাদের পরস্পরের মধ্যে কিছুটা তিক্ততার সৃষ্টি হলো। ইসলামী আন্দোলনের ধারক ও বাহকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার এটাই ছিল উপযুক্ত সময়। তাই সর্ব প্রথম তাদেরকে স্পষ্টভাবে বলা হলো যে, গনীমতের মাল প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের কোন পারিশ্রমিক নয়। এ হচ্ছে আপন পারিশ্রমিকের বাইরে মালিকের তরফ থেকে দেয়া একটি বাড়তি অবদান বা পুরস্কার বিশেষ(আনফাল)। আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার যথার্থ প্রতিদান তো তিনি আখেরাতেই দান করবেন। এখানে যা কিছু পাওয়া যায়, তা কারো ব্যক্তিগত স্বত্ত্ব (হক) নয়, তা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার একটি বাড়তি অবদান মাত্র। কাজেই এই অবদান সম্পর্কে কারোর স্বত্ত্বাধিকার দাবির প্রশ্নই উঠে না। এর স্বত্ত্বাধিকার হচ্ছে আল্লাহ এবং তার রাসূলের। তারা যেভাবে চান, সেভাবেই এর বিলি-বণ্টন করা হবে। এর পর সামনে অগ্রসর হয়ে এই বিলি-বণ্টনের নীতিমালাও বাতলে দেয়া হলো। এভাবে যুদ্ধ সংক্রান্ত এক বিরাট প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা হলো। মুসলমানদের কে চূড়ান্ত ভাবে বলে দেয়া হলো যে, তারা দুনিয়ার ফায়দা হাসিলের জন্যে কখনো অস্ত্র ধারণ করতে পারে না,বরং দুনিয়ার নৈতিক বিকৃতিকে সংশোধন করা এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে গায়রুল্লাহর গোলামী থেকে মুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজনেই তাদের শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। তারা যখন দেখবে যে, বিরুদ্ধ শক্তি তাদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার উদ্দেশ্যে শক্তি প্রয়োগ করতে উদ্যত হয়েছে এবং দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে সংশোধন প্রচেষ্টাকে অসম্ভব করে তুলেছে ,ঠিক তখনি এরুপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে কাজেই তারা যে সংস্কার সংকল্প নিয়েছে, তাদের দৃষ্টি শুধু সেদিকেই নিবদ্ধ থাকা উচিত এবং এই লক্ষ্য অর্জনের পথে কোনরুপ অন্তরায় হতে পারে, এমন কোন পার্থিব স্বার্থের দিকেই তাদের ফিরে তাকানো উচিত নয়।

২.ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় আমীর বা নেতার আনুগত্য হচ্ছে দেহের ভেতর রুহের সমতুল্য। তাই নেতৃত আদর্শের পরিপূর্ণ ও নির্ভেজাল আনুগত্যের জন্যে মনকে প্রস'ত করার নিমিত্ত বারবার মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো। ৪১আলোচ্য যুদ্ধের গনীমতের মাল সম্পর্কেও তাই সর্বপ্রথম লোকদের কাছে পূর্ণাঙ্গ আনুগত্যের দাবি জানানো হলো এবং তাদেরকে বলে দেয়া হলো যে,এসব কিছুই আল্লাহ এবং তার রাসূলের স্বত্ত্বা। এ ব্যাপারে তারা যা ফয়সালা করেন, তাতেই সবার রাযী থাকতে হবে।

৩. সাধারণ আন্দোলনগুলোর প্রকৃতি এই যে, সেগুলো আপন কর্মী ও অনুবর্তীদের মনে উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্যে তাদের কৃতিত্বের কথা নানাভাবে উল্লেখ করে থাকে। এভাবে খ্যাতি-যশ লাভের আকাঙ্ক্ষাকে উস্কিয়ে দিয়ে লোকদের কে ত্যাগ তিতিক্ষার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়। বস্তত এ কারণেই বড় বড় যুদ্ধ বা বিজয় অভিযানের পর এইসব আন্দোলন তার আত্মোৎসর্গী কর্মীদের মধ্যে বড়ো বড়ো খেতাব পদক ইনাম ইত্যাদি বিতরণ এবং নানাভাবে তাদের পদোন্নতির ব্যবস্থা করে থাকে। ফলে একদিকে তারা আপন কৃতিত্বের বদলা পেয়ে সন্তোষ লাভ করে এবং ভবিষ্যতে আরো অধিক ত্যাগ স্বীকারের জন্যে উদ্বুদ্ধ হয়, অন্যদিকে অপর লোকদের মনেও তাদেরই মতো উন্নত মর্যাদা লাভের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত । মাত্র ৩১৩ জন মুসলিম সৈন্য কতৃক এক সহস্রাধিক কাফের সৈন্যকে পরাজিত করা এবং এক প্রকার বিনা সাজ-সরঞ্জামে কয়েকগুণ বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে নির্মূল করা সত্ত্বেও তাদের কে বলে দেয়া হলোঃতারা যেন এ ঘটনাকে নিজেদের বাহাদুরি বা কৃতিত্ব বলে মনে না করে। কারণ তাদের এ বিজয় শুধু আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহ মাত্র। কেবল তারই দয়া এবং করুণার ফলে এতো বড়ো শত্রু বাহিনীকে তারা পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই তাদের কখনো আপন শক্তি -সামর্থের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; বরং সর্বদা আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তারই করুণা ও অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে ময়দানে অবতরণ করার ভেতরে নিহিত রয়েছে তাদের আসল শক্তি। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে হযরত (সা:) এক মুঠো বালু হাতে নিয়ে ‘শাহাদাতুল ওজুহ’ (চেহারা আচ্ছন্ন হয়ে যাক) বলে কাফিরদের দিকে ছুঁড়ে মারেন। এরপরই মুসলমান সেনারা একযোগে কাফিরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের কে ধরাশয়ী করে। অন্য লোক হলে এই ঘটনাকে নিজের ‘কেরামত ’ বা অলৌকিক কীর্তি বলে ইচ্ছামত গর্ব করতে পারতো এবং একে ভিত্তি করে তার অনুগামীরা ও নানারুপ কিস্‌সা-কাহিনীর সৃষ্টি করতো। কিন্তু কুরআন পাকে খোদ আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে বলে দিলেনঃ ‘তাদেরকে (কাফিরদেরকে ) তোমরা হত্যা করো নি, বরং তাদের হত্যা করেছেন আল্লাহ। ’ এমনকি তিনি হযরত (সা:) কে পর্যন্ত বলে দিলেন যে, ‘(বালু) তুমি ছুঁড়োনি,বরং ছুঁড়েছেন আল্লাহ এবং মুমিনদের কে একটি উত্তম পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ করা হয়েছে।’(সূরা আনফাল ,আয়াতঃ১৮)। এভাবে মুসলমানদেরকে বলে দেয়া হলো যে,প্রকৃত পক্ষে সমস্ত কাজের চাবিকাঠি রয়েছে আল্লাহর হাতে এবং যা কিছু ঘটে তার নির্দেশ ও ইচ্ছানুক্রমেই ঘটে থাকে। মুমিনদের কাজ হচ্ছে আল্লাহর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ ও রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করা এর ভেতরই নিহিত রয়েছে তাদের জন্যে সাফল্য।

৪.ইসলামী আন্দোলনে জিহাদ হচ্ছে চূড়ান্ত পরীক্ষা , যার মাধ্যমে আন্দোলনের অনুবর্তীদের পূর্ণ যাচাই হয়ে যায়। যখন কুফর ও ইসলামের দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয় এবং মুমিনদের পক্ষে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ অব্যাহত রাখার জন্যে ময়দানে অবতরণ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না, তখন সেখান থেকে তাদের পশ্চাদপসরণ করা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে নেমে ময়দান থেকে পলায়ন করার অর্থ এ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না যে,

ক.মুমিন যে উদ্দেশ্য নিয়ে যুদ্ধ করতে নেমেছে, তার চেয়ে তার নিজের প্রাণ অধিকতর প্রিয় কিংবা

খ.জীবন ও মৃত্যু যে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ এবং তার হুকুম না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যু আসতেই পারে না আর হুকুম যখন এসে যায় ,তখন মৃত্যু এক মুহূর্ত ও বিলম্বিত হতে পারে না - তার এই ঈমানই অত্যন্ত দুর্বল অথবা

গ.তার হৃদয়ে আল্লাহর সন'ষ্টি এবং আখিরাতের সাফল্যে ছাড়াও অন্য কোন আকাঙ্ক্ষা লালিত হচ্ছে এবং প্রকৃত পক্ষে সে খোদার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করতে পারেনি। যে , ঈমানের ভেতর এর কোনো একটি জিনিসও ঠাঁই নিয়েছে , তাকে কিছুতেই পূর্ণাঙ্গ ঈমান বলা যায় না। এ কারণেই ইসলামের এই প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধোপলক্ষে মুসলমানদের কে সুস্পষ্ট ভাবে বলে দেয়া হলো যে, যুদ্ধ থেকে পশ্চাদপসরণ করা মুমিনদের কাজ নয়। এ প্রসঙ্গে হযরত (সা:) ইরশাদ করেন, তিনটি গুনাহের মুকাবেলায় মানুষের কোন নেকীই ফলপ্রসূ হতে পারে নাঃ এক ,খোদার সাথে শিরক,দুই ,পিতামাতার অধিকার হরণ এবং তিন ,আল্লাহর পথে চালিত যুদ্ধ থেকে পলায়ন করা।

৫. যখন পার্থিব সম্পর্ক -সম্বন্ধের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সঙ্গত সীমা অতিক্রম করে যায় ,তখন আল্লাহর পথে অগ্রসর হতেও তার শৈথিল্য এসে যায় । ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিই হচ্ছে এ পথের প্রধান প্রতিবন্ধক । তাই এই উপলক্ষে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও সন্তান -সন্ততির সঠিক মর্যাদা সম্পর্কে ও মুসলমানদের অবহিত করলেন। তিনি বললেনঃ “জেনে রাখো,তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদের পরীক্ষায় উপকরণ মাত্র ; আল্লাহর কাছে প্রতিফল দেবার জন্যে অনেক কিছুই রয়েছে।”

(সূরা আনফাল,আয়াতঃ২৮) বস্তত ,মুমিন তার ধন-সম্পদের সদ্ব্যবহার করে কিনা এবং সম্পদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণ হেতু আল্লাহর পথে জীবন পণ করতে তার হৃদয়ে কিছুমাত্র সংকীর্ণতা আসে কিনা অথবা সম্পদের মোহে সত্যের জিহাদে সে শৈথিল্য দেখায় কিনা, ধন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহ শুধু তা-ই পরীক্ষা করে থাকেন। অনুরুপ ভাবে সন্তান-সন্ততি হচ্ছে মানুষের পরীক্ষার দ্বিতীয় পত্র। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে -প্রথমত সন্তান-সন্ততিকে আল্লাহর বন্দেগী এবং তার আনুগত্যের পথে নিয়োজিত করার পূর্ণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুমিনকে তাদের প্রতি সঠিক কর্তব্য পালন করতে হবে। দ্বিতীয়ত ,মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ যে স্বাভাবিক মমত্ববোধ জাগিয়ে দিয়েছেন , তার আধিক্যহেতু আল্লাহর পথে পা বাড়াতে গিয়ে যাতে বাধার সৃষ্টি না হয়, তার প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে। ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির ব্যাপারে এই মহা পরীক্ষার জন্যে প্রতিটি মুমিনের তৈরি থাকা উচিত।

৬. ধৈর্য যে কোন আন্দোলনেরই প্রাণবস্ত । দেহের জন্যে আত্মা যতোখানি প্রয়োজনীয় ,ইসলামী আন্দোলনের জন্যে এই গুণটি ততোখানিই আবশ্যক। মক্কার মুসলমানরা যে দুরবস্থার মধ্যে কালাতিপাত করছিল ,সেখানেও এই গুণটি বেশি করে অর্জন করার জন্যে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে শুধু একতরফা জুলুম-পীড়ন সহ্য করা ছাড়া মুসলমানদের আর কিছুই করণীয় ছিল না। কিন্তু এখন আন্দোলন দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করার দরুণ খোদ মুসলমানদের দ্বারাই অন্যের প্রতি অন্যায় আচরণ হবার আশংকা দেখা দিল। কাজেই এই পরিবর্তিত অবস্থায়ও এ গুণটি বেশি পরিমাণে অর্জন করার জন্যে তাগিদ দেয়া হলো। বলা হলোঃ
“হে ঈমানদারগণ ! যখন কোন দলের সঙ্গে তোমাদের মুকাবেলা হয়,তখন তোমরা সঠিক পথে থেকো এবং আল্লাহ কে বেশি পরিমাণে স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমরা সাফল্য অর্জন করতে পারবে। আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর বিবাদ করো না। (বিবাদ করলে)তাহলে তোমাদের মধ্যে দুর্বলতার সৃষ্টি হবে এবং তোমাদের অবস্থার অবনতি ঘটবে। সবর বা ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করো; নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্য অবলম্বনকারীদের সাথে রয়েছেন। (সূরা আনফাল ,আয়াত ঃ৪৫ও৪৬)

এখানে ধৈর্যের (সবরের )তাৎপর্য হচ্ছে এইঃ ১.আপন প্রবৃত্তি ও ভাবাবেগকে সংযত রাখতে হবে।
২.তাড়াহুড়া,ভয়-ভীতি ও উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত হতে হবে।
৩.কোন প্রলোভন বা অসঙ্গত উৎসাহকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।
৪.শান্ত মন সুচিন্তিত ফয়সালার ভিত্তিতে সকল কাজ সম্পাদন করতে হবে।
৫.বিপদ-মুসিবত সামনে এলে দৃঢ় পদে তার মুকাবেলা করতে হবে।
৬.উত্তেজনা ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কোন অন্যায় কাজ করা যাবে না।
৭.বিপদ-মুসিবতের কারণে অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে আতঙ্ক বা অস্থিরতার কারণে মনোবল হারানো যাবে না।
৮.লক্ষ্য অর্জনের আগ্রহাতিশয্যে কোনো অসঙ্গত পন্থা অবলম্বন করা যাবে না।
৯.পার্থিব স্বার্থ ও প্রবৃত্তির তাড়নায় নিজের কামনা-বাসনাকে আচ্ছন্ন করা এবং সে সবের মুকাবেলায় দুর্বলতা প্রকাশ করে কোনো স্বার্থের হাতছানিতে আকৃষ্ট হওয়া যাবে না ।
এখন এই পরিবর্তিত অবস্থায় মুমিনদের আপন ধৈর্যের পরীক্ষা অন্যভাবেও দেয়ার প্রয়োজন ছিল। মানুষের ওপর উদ্দেশ্য-প্রীতির প্রাধান্য কখনো কখনো এতোটা চেপে বসে যে, তার মুকাবেলায় সে হক ও ইনসাফের প্রতি পুরোপুরি লক্ষ্য রাখতে পারে না। সে মনে করে যে, উদ্দেশ্যের খাতিরে এরুপ করায় কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন সর্বতো ভাবে একটি সত্য ভিত্তিক আন্দোলন বিধায় স্বীয় অনুগামীকে সে কখনো হক ও ইনসাফের সীমা অতিক্রম করতে অনুমতি দেয় না। তাই কুফর ও ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্বের সময় অন্যান্য নৈতিক ও শিক্ষামূলক নির্দেশাবলীর সঙ্গে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে রাজনৈতিক চুক্তির ব্যাপারেও মুসলমানদেরকে সম্পূর্ণ হক ইনসাফভিত্তিক নির্দেশাবলী প্রদান করা হলো। এইসব নির্দেশাবলীর সারমর্ম এই যে, মুসলমান যেন কখনো জয়-পরাজয় কিংবা পার্থিব স্বার্থের হাতছানিতে চুক্তিভঙ্গ না করে , বরং আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে যেনো চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করে । এর ফলে তার আপন মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য থেকেও যদি বঞ্চিত হতে হয়,তবুও যেনো সে পিছপা না হয়।

বদর যুদ্ধের পর কুরআন পাকে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে যে পর্যালোচনা করা হয়, এ হচ্ছে তার কয়েকটি উল্লেখ বৈশিষ্ট্য । দুনিয়ার অন্যান্য আন্দোলনের তুলনায় ইসলামী আন্দোলন যে কতোখানি উন্নত ও শ্রেষ্ট এবং অনুবর্তীদের কে সে কি ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে ,এ থেকে তা সহজেই অনুমান করা চলে।

ওহুদ যুদ্ধ

পটভূমি

বদর যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করলো বটে, কিন্তু যুদ্ধের মাধ্যমে তারা যেনো ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়লো। এই প্রথম যুদ্ধেই তারা দৃঢ়তার সঙ্গে কাফিরদের মুকাবেলা করেছিল এবং কাফিরদেরকেও শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে পিছু হটতে হয়েছিল। এ ঘটনা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমগ্র আরব জনগোষ্ঠীকে প্রচণ্ড ভাবে উত্তেজিত করে দিলো। যারা এই নয়া আন্দোলনের দুশমন ছিল , তারা এ ঘটনার পর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তদুপরি মক্কার যে সব কুরাইশ সর্দার এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল, তাদের রক্তের বদলা নেবার জন্যে অসংখ্য চিত্ত অস্থির হয়ে উঠলো। আরবে যেকোন এক ব্যক্তির রক্তই পুরুষানুক্রমে যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। আর এখানে তো এমন অনেক ব্যক্তিই নিহত হয়েছিল ,যাদের রক্তমূল্য অসংখ্য যুদ্ধে ও আদায় হতে পারতো না। তাই চারদিকে ঝড়ের আলামত দেখা যেতে লাগলো। ইহুদীদের যে সব গোত্র ইতঃপূর্বে মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছিলো, তারা চুক্তির কোন মর্যাদা রক্ষা করলো না। এমন কি তারা খোদা,নবুয়্যাত আখিরাত এবং কিতাবের প্রতি ঈমান পোষণের দাবি করার ফলে যেখানে মুসলমানদের সাথে অধিকতর নৈকট্য থাকা উচিত ছিলো,সেখানে মুশরিক কুরাইশদের প্রতিই তাদের সমস্ত সহানুভূতি উপচে পড়তে লাগলো। তারা খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে কুরাইশদে কে উত্তেজিত করতে শুরু করলো।বিশেষত কাব বিন আশরাফ নামক বনী নাযির গোত্রের জনৈক্য সরদার এ ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও অন্ধ শত্রুতায় লিপ্ত হলো। এ থেকে স্পষ্টত অনুমিত হলো যে, ইহুদীরা না পড়োশী হিসেবে কোন কর্তব্য পালন করবে আর না হযরত (সা:) এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করবে।

এর ফলে মদিনার এই ক্ষুদ্র জনপদটি চারদিক দিয়েই বিপদ পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লো। অভ্যন্তরীন দিক দিয়ে মুসলমানদের অবস্থা ছিল এমনিতেই দুর্বল ,তদুপরি যুদ্ধের ফলে তাদেরকে আরো বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো।

মক্কার মুশরিকদের অন্তরে এমনিতেই মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল । তাদের বড়ো বড়ো সর্দারগণ প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে ইতোমধ্যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিল। প্রত্যেক গোত্রের মনেই ক্রোধ ও উত্তেজনা কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছিল। এমনি অবস্থায় ইহুদীগণ কর্তৃক মক্কাবাসীকে যুদ্ধের জন্যে উদ্বুদ্ধ করারচেষ্টা আগুনে তেল ছিটানোর কাজ করলো। ফলে বদর যুদ্ধের পর একটি বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মদিনায় এই মর্মে খবর পোঁছলো যে, মক্কার মুশরিকগণ এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কুরাইশদের অগ্রগতি

এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের প্রথম সপ্তাহে হযরত (সা:) কয়েকজন লোককে সঠিক খবর খবর সংগ্রহের জন্যে মদিনার বাইরে প্রেরণ করলেন। তারা ফিরে এসে খবর দিল যে, কুরাইশ বাহিনী মদিনার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে। এমনকি তাদের ঘোড়গুলো মদিনার একটি চারণ ভূমি পর্যন্ত সাফ করে ফেলেছে। এবার নবী করীস (সা:) সাহাবীদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কুরাইশ বাহিনীর মুকাবেলা কি মদিনায় বসে করা হবে , না বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হবে ? কোন কোন সাহাবী এই অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, মুকাবেলা মদিনায় বসেই করতে হবে। কিন্তু বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পান নি অথচ শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত এমন কতিপয় যুবক দৃঢ়তার সাথে বললেনঃ ‘না, বাইরের ময়দানে গিয়েই তাদের মুকাবেলা করতে হবে। ’ অবশেষে তাদের এই দৃঢ়তা দেখে নবী করীম (সা:) মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

মুনাফিকদের ধোকাবাজি

কুরাইশগণ মদিনার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে তাদের ছাউনি ফেললো। তার একদিন পর হযরত (সা:) জুম’আর নামাজ বাদ এক হাজার সাহাবী নিয়ে মদিনা থেকে রওয়ানা করলেন। এদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক আবদুল্লাহ বিন উবাইও ছিল। এ লোকটি দৃশ্যত মুসলমান হলেও কার্যত ছিল মুনাফিক ।এর প্রভাবাধীন আরো বহু মুনাফিক মুসলমানদের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। কিছুদূর গিয়ে আবদুল্লাহ বিন উবাই তিন’শ লোক নিয়ে হঠাৎ ‘যুদ্ধ হবে না’ বলে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এখন শুধু সাত শ সাহাবী বাকী রইলেন। এমনি নাজুক অবস্থায় মুনাফিকদের এই আচরণ ছিল গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের শামিল । কিন্তু যে সব মুসলমানের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ‌ঈমান, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং সত্যের পথে শহীদ হবার আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ ছিল, এ ঘটনায় তাদের ওপর কোন বিরুপ প্রতিক্রিয়ারই সৃষ্টি হলো না। তাই তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে সামনে অগ্রসর হলেন।

যুব সমাজের উদ্দীপনা

এ সময় হযরত (সা:) তার সঙ্গী- সাথীদের অবস্থা একবার যাচাই করে নিলেন এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এদের মধ্যে রাফে ’ ও সামারাহ নামক দুটি কিশোর বালকও ছিল। কিশোরদের কে যখন সেনাবাহিনী থেকে আলাদা করে দেয়া হচ্ছিল , তখন রাফে তার পায়ের অগ্রভাগের ওপর ভর করে দাঁড়ালো। যেনো লম্বায় তাকে কিছু উঁচু দেখায় , এবং তাকে সঙ্গে নেয়া হয়। তার এই কৌশল ফলপ্রসূও প্রমাণিত হলো। কিন্তু সামারাহ সেনাবাহিনীতে থাকবার অনুমতি না পেয়ে বললোঃ ‘রাফেকে যখন রেখে দেয়া হয়েছে , তখন আমাকেও থাকবার অনুমতি দেয়া উচিত । কারণ আমি তাকে কুস্তি প্রতিযোগিতায়া পরাজিত করতে পারি । ’ তার এ দাবির যথার্থতা প্রমাণের জন্যে উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হলো। অবশেষে সে রাফেকে পরাজিত করলো এবং তাকেও সেনাবাহিনীতে নিয়ে নেয়া হলো। এ একটি সামান্য ঘটনামাত্র । কিন্তু এতেই আন্দাজ করা চলে যে, মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার কতখানি অদম্য আগ্রহ ছিল।

সৈন্যদের প্রশিক্ষণ

ওহুদ পাহাড় মদীনা থেকে প্রায় চার মাইল দূরে অবস্খিত। হযরত (স) এমনভাবে তার সৈন্যদের মোতায়েন করলেন যে, পাহাড় পিছন দিকে থাকলো আর কুরাইশ সৈন্যরা রইলো সামনের দিকে। পিছন দিকে পাহাড়ের মাঝ বরাবর একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিলো এবং সে দিক থেকেও হামলার কিছুটা আশাংকা ছিলো। হযরত (স) সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুবাইরকে পঞ্চাশ জন তীরন্দাজসহ মোতায়েন করলেন। তাকে এই র্মমে নির্দেশ দিলেন যে, এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে কাঊকে আসতে দেয়া যাবে না এবং তুমিও এখান থেকে কোন অবস্থায় নড়বে না। এমন কি যদি দেখো যে, পাখিরা আমাদের গোশ্‌ত ছিঁড়ে নিয়ে খাচ্ছে, তবুও তুমি নিজের স্থান ত্যাগ করবে না

কুরাইদের সাজ-সজ্জা

এবার কুরাইশরা অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ সাজ-সজ্জা করে এসেছিলো। প্রায় তিন হাজার সৈন্য ও প্রচুর সামান্তপত্র তাদের সঙ্গে ছিলো। তখনকার দিনে যে যুদ্ধে মেয়েরা যোগ দান করতো, তাতে আরবরা জীবনপণ করে লড়াই করতো। তারা মনে করতো, যুদ্ধে যদি পরাজয় হয় তো মেয়েদের বেইজ্জত হবে। এ যুদ্ধেও কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে অনেক মহিলা এসেছিল। এদের মধ্যে আপন পুত্র ও প্রিয়জন মারা গেছে, এমন অনেকেই ছিলো। এতে কেউ কেউ প্রিয়জনদের হত্যাকারীদের রক্তপান করে তবেই নিঃশ্বাস ফেলবে-এমন প্রতিজ্ঞা পর্যন্ত করেছিলো।

যুদ্ধের সূচনা

কুরাইশরা তাদের সৈন্যদেরকে খুব ভালোমতো প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো। যুদ্ধের সূচনা-পর্বে কুরাইশ মহিলারা দফ বাজিয়ে আবেগ ও উদ্দীপনাময় কবিতা আবৃতি করতে লাগলো। তারা যোদ্ধদেরকে বদর যুদ্ধে নিহতদের রক্তের বদলা নেবার জন্যে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় উৎসাহ যোগালো। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ। প্রথম পর্যায়ে মুসলমানদের দিকেই পাল্লা ভারী রইলো এবং কুরাইশ পক্ষের বহু সৈন্য নিহত হলো।তাদের সৈন্য দের মধ্যে হতাশা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল । এদিকে সুড়ঙ্গ পথের প্রহরায় নিযুক্ত সৈন্যরা যখন দেখলো যে, মুসলমানরা মাল সংগ্রহে লিপ্ত হয়েছে এবং দুশমনরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে.তখন তারাও গনীমতের মাল সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের নেতা হযরত আবদুল্লাহ বিন জুবাইর বারবার তাদেরকে বিরত রাখতে চাইলেনএবং হযরত (সা:) এর কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন।কিন্তু কতিপয় লোক ছাড়া কেউ তার কথা শুনলো না।

পশ্চাদিক থেকে কুরাইশদের হামলা

খালিদ বিন অলীদ তখন কাফির সৈন্যদের একজন অধিনায়ক। সে এই সুবর্ণ সুযোগ কে পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে সুড়ঙ্গ -পথে মুসলমানদের ওপর হামলা করলো।হযরত আবদুল্লাহ এবং তার ক’জন সঙ্গী শেষ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ পথের প্রহরায় ছিলেন,তাদের অধিকাংশই এই হামলার মুকাবেলা করলেন।কিন্তু কাফের দের এই প্রচণ্ড হামলাকে তারা প্রতিহত করতে পারলেন না। তারা শহীদ হয়ে গেলেন। অতঃপর দুশমনরা একে একে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওদিকে যে সব পলায়নপর কাফির দূর থেকে এই দৃশ্য দেখছিল , তারাও আবার ফিরে এলো।এবার দুদিক দিয়ে মুসলমানদের ওপর হামলা শুরু হলো।এই অভাবিত পরিস্থিতিতে মুসলমানদের মধ্যে এমন আতঙ্কের সঞ্চার হলো যে, যুদ্ধের মোড়ই সম্পূর্ণ ঘুরে গেলো। মুসলমানেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক পালাতে লাগলো। এমনকি আতঙ্কের মধ্যেই গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, নবী করীম(সা:) শহীদ হয়ে গেছেন। এই খবরে সাহাবীদের মধ্যে বাকী উদ্যমটুকুও নষ্ট হয়ে গেলো এবং অনেকে সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো।

আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয়

এ সময় দশ-বারো জন সাহাবী নবী করীম(সা:) কে ঘিরে রেখেছিলেন। তিনি অবশ্য আহত হয়েছিলেন। সাহাবীরা তাকে একটি পাহাড়ের ওপর নিয়ে এলেন। অতঃপর অন্য মুসলমানরা ও জানতে পারলেন যে, নবী করীম (সা:) সুস্থ ও নিরাপদ আছেন।তাই তারা আবার দলে দলে তার কাছে একত্রিত হতে লাগলেন। কিন্তু এ সময় কি কারণে যেন কাফিরদের মনোযোগ হঠাৎ অন্যদিকে নিবদ্ধ হলো এবং নিজেদের বিজয়কে পূর্ণ পরিণতি পর্যন্ত না পৌঁছিয়েই তারা ময়দান ছেড়ে চলে গেল।

তারা যখন কিছু্‌টা দূরে চলে গেল, তখন তাদের সম্ভিত ফিরে এলো। তারা পরস্পরকে বললোঃ এ আমরা কি ভুল করলাম ! মুসলমানদের সম্পূর্ণ খতম করে দেবার দুর্লভ সুযোগটিকে নষ্ট করে এমনিই চলে এলাম! এরপর তারা এক জায়গায় থেকে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এবার তাহলে মদিনার ওপর আর একবার হামলা করা উচিত । কিন্তু শেষ পর্যন- আর তাদের সাহস হলো না। তারা মক্কায় ফিরে গেলো।

এদিকে নবী করীম (সা:) চিন্তিত ছিলেন যে,শত্রুরা না জানি আবার ফিরে এসে আবার হামলা করে বসে । তাই তিনি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মুসলমানদের কে দুশমনদের পশ্চাদ্ধাবন করার নির্দেশ দিলেন। এটা ছিল অত্যন্ত নাজুক সময় । কিন্তু যারা সাচ্চা মুমিন ছিল , তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে পুনরায় জান কুরবান করার জন্যে তৈরি হয়ে গেল । নবী করীম(সা:) হামরা-উল-আসাদ নামক স্থান পর্যন্ত দুশমনদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। এ জায়গাটি মদিনা থেকে ৮ মাইল দূরে অবস্থিত । এখানে পৌঁছে জানা গেল যে, কুরাইশরা মক্কায় ফিরে গেছে। তাই তিনিও মুসলমানদের নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।

এ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হলেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন আনসার । তাই মদিনায় ঘরে ঘরে শোকের বন্যা নেমে এলো। এ সময় হযরত (সা:) মুসলমানদের শোক প্রকাশের নিয়মাবলী সম্পর্কে অবহিত করলেন।তিনি বললেনঃ ‘মাতম করা এবং ছাতি পিটিয়ে কান্না-কাটি করা মুসলমানদের পক্ষে মর্যাদা হানিকর । ’

বিপর্যয়ের কারণ এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ

ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যে বিপর্যয় ঘটে , তার পেছনে মুনাফিকদের চালবাজি ও কলা কৌশলের প্রভাব ছিল সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই সঙ্গে মুসলমানদের নিজস্ব দুর্বলতাও কম দায়ী ছিল না । অবশ্য ইসলামী আন্দোলন যে ধরণের মেজাজ তৈরি করে এবং তার কর্মীদের যে রুপ প্রশিক্ষণ দিতে ইচ্ছুক , তার জন্যে তখনও পুরোপুরি সুযোগ পাওয়া যায় নি। আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার এ ছিল দ্বিতীয় সুযোগ মাত্র । তাই এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই কিছু কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেলো। যেমনঃ সম্পদের মোহে কর্তব্য অবহেলা করা , নেতার হুকুম অমান্য করা ,দুশমনকে পুরোপুরি খতম করার আগে গনীমতের মালের দিকে মনোযোগ দেয়া ইত্যাদি। এ কারণেই যুদ্ধ শেষ হবার পর আল্লাহ তাআলা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অত্যন্ত বিস্তৃত ভাবে পর্যালোচনা করলেন। এ পর্যালোচনা ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মধ্যে যা কিছু দোষ-ত্রুটি বাকী ছিল , তার প্রতিটি দিককেই তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন এবং সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলীও প্রদান করলেন।সূরা আল ইমরানের শেষাংশে এই নির্দেশাবলীর কথা বিবৃত হয়েছে। এখানে তার কতিপয় অংশ উদ্ধৃত করা যাচ্ছে। এ থেকে ইসলামী আন্দোলনে যুদ্ধের স্থান কোথায় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধ সংক্রান্ত ঘটনাবলীর ওপর কিভাবে আলোকপাত করতে হয়, তা আর একবার উপলব্ধি করা যাবে।

খোদা-নির্ভরতা

মুসলমানরা যখন যুদ্ধের জন্যে যাত্রা করেছিল ,তখন তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজারের মতো। পক্ষান্তরে দুশমনদের সংখ্যা ছিল তিন হাজার। এরপরও কিছুদূর গিয়ে তিন শ’ মুনাফিক আলাদা হয়ে গেল। এবার বাকী থাকলো শুধু সাত শ’ মুসলমান। তদুপরি যুদ্ধের সামান্তপত্র ছিল কম এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্যও গেল বিচ্ছিন্ন হয়ে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে কিছু লোকের মনোবল ভেঙ্গে পড়তে লাগলো । এ সময় শুধু আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার সাহায্যের ওপর ভরসাই মুসলমানদেরকে দুশমনদের মুকাবেলায় এগিয়ে নিয়ে চললো। এ উপলক্ষে হযরত (সা:) মুসলমানদের কে যে সান্ত্বনা প্রদান করেন, আল্লাহ তা নিম্নোক্ত ভাষায় উল্লেখ করেছেনঃ “স্মরণ করো, যখ,তোমাদের মধ্যকার দুটি দল নির্বুদ্ধিতা প্রদর্শনের জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল, অথচ আল্লাহ তাদের সাহায্যের জন্যে বর্তমান ছিলেন। আর মুমিনদের তো আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত । এর আগে বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তোমাদের শোকরী থেকে তোমাদের বেঁচে থাকা উচিত। আশা করা যায়, এবার তোমরা কৃতজ্ঞ হবে। স্মরণ করো, যখন তুমি (হে নবী) মুমিনদের কে বলেছিলঃ তোমাদের জন্যে এটা কি যথেষ্ট নয় যে, আল্লাহ তিন হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করে তোমাদের সাহায্য করবেন। তোমরা যাতে খুশি হও এবং তোমাদের হৃদয় নিশ্চিন্ত হয়, সে জন্যেই আল্লাহ তোমাদের কাছে একথা প্রকাশ করলেন। বিজয় বা সাহায্য যা কিছুই হোক , আল্লাহর কাছ থেকেই আসে । তিনি অত্যন্ত শক্তিমান, বিচক্ষণ । (আলে ইমরান আয়াতঃ১২২-১২৬)

এখানে মুসলমানদের কে শেষ বারের মতো বুঝিয়ে দেয়া হলো যে, প্রকৃতপক্ষে বস্তগত শক্তির ওপর ভরসা করা মুসলমানদের কাজ নয়। তাদের শক্তির আসল উৎস হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার সাহায্যের ওপর ভরসা।

ধন-সম্পদের মোহ

ওহুদে মুসলমানদের বিপর্যয়ের আর একটি বড় কারণ হলো এই যে, মুসলমানরা যুদ্ধের ঠিক মাঝখানেই সম্পদের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল এবং দুশমনকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার আগেই সম্পদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল । এমনকি , যারা সুড়ঙ্গ-পথের প্রহরায় নিযুক্ত ছিল,তাদের মধ্যে পযর্ন্ত দুর্বলতা প্রকাশ পেল। এভাবে যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে গেল। তাই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের হৃদয় থেকে ধনের মোহ দূরীভূত করার জন্যে আ সময়ই মোহ সৃষ্টির একটি বড় কারণকে নিশ্চিহ্ন করে দিলেন। অর্থাৎ এ সময় সূদকে হারাম ঘোষণা করা হলো। যারা সূদী কারবার করে , তাদের হৃদয়ে ধনের মোহ এমনি বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, তা আর কোন মহৎ কাজের উপযোগী থাকে না।সূদের ফলেই এক শ্রেণীর মনে লালসা, কার্পণ্য , আত্মকেন্দ্রিকতা এবং ধনের মোহ সৃষ্টি হয়। আর এক শ্রেণীর মধ্যে জাগ্রত হয় হিংসা দ্বেষ ও ক্রোধ-বিক্ষোভ।

সাফল্যের চাবিকাঠি

যদি মনোবলকে সমুন্নত রাখার জন্যে কোন ক্রিয়াশীল শক্তি বর্তমান না থাকে , তাহলে পরাজয়ের পর তা হ্রাস পেতে থাকবেই । ওহুদে মুসলমানদের যে পরাজয় ঘটেছিল , তাতে কিছু লোকের মনোবল ভেঙ্গে পড়ার আশংকা ছিল। কিন্তু এ সময় মুসলমানদের কে এই বলে আশ্বাস দেয়া হলো যে, “ তোমাদের না নিরুৎসাহ হওয়া উচিত আর না দুঃখ প্রকাশ করা উচিত । তোমাদেরই হবে, যদি তোমরা খাঁটি মুমিন হও, ঈমানের ওপর অবিচল থাকো এবং তার দাবি সমূহ পূর্ণ করতে থাকো। তোমাদের কাজ শুধু এটুকুই ; এরপর তোমাদের সমুন্নত করা এবং দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব আল্লাহর । এরপর রইলো তোমাদের এই সাময়িক দুঃখ- ক্লেশ ও পরাজয়ের প্রশ্ন। এটা শুধু তোমাদেরই ব্যাপার নয়, তোমাদের বিরুদ্ধ দলের ওপরও এরকম দুঃখ-মুসিবত এসে থাকে । তারা যখন মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়েও নিরুৎসাহিত হয়না, তখন তোমরা কেন সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে চিন্তা-ভাবনা করো ?তোমরা তো জান্নাতের প্রত্যাশী । তোমরা কি মনে করো, এমনিই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে ? অথচ তোমাদের ভেতর কে আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করেছে আর কে তার জন্যে প্রতিকূল অবস্থায়ও ধৈর্য অবলম্বন করতে ইচ্ছুক, আল্লাহ তা এখন পর্যন্ত যাচাই-ই করেননি।(আল -ইমরানঃআয়াত১৩৯-১৪২)

ইসলামী আন্দোলনের প্রাণবস্ত

পৃথিবীর যেকোন আন্দোলনেই তার প্রাণবস্ত কিংবা চালিকা-শক্তিরুপে একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব বর্তমান থাকে। কিন্তু আদর্শবাদী আন্দোলনের উন্নতি বা স্থায়িত্ব কোন ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং যে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে এ আন্দোলন উত্থিত হয়, তার দৃঢ়তা ও সত্যতার ওপরই এর সবকিছু নির্ভর করে। ইসলামী আন্দোলনের জন্যে নবীদের ব্যক্তিত্ব কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ , তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও এটি একটি আদর্শবাদী আন্দোলন এবং এর উন্নতি ও স্থায়িত্ব সম্পূর্ণত ইসলামের উপস্থাপিত নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মুসলমানদের এ কথা জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন হলো যে, নবীর মহান ব্যক্তিত্ব তাদের ভেতর বর্তমান থাকলেই কেবল তারা আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডা সমুন্নত করবে এবং নবীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হলে অমনি তারা এ পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন পথ অবলম্বন করবে, এরুপ ধারণা যেনো তাদের মনের কোণেও ঠাঁই পায়। ইতঃপূর্বে ওহুদের ময়দানে যখন এই মর্মে গুজব প্রচারিত হলো যে, হযরত (সা:) শহীদ হয়ে গেছেন, তখন কিছু মুসলমানের মনোবল একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল : হযরতের ছায়াই যখন চলে গেল, তখন আর যুদ্ধ করে কি হবে! এই ভুল ধারণা দূর করার জন্যেই এই সময় মুসলমানদের বুঝিয়ে দেয়া হলোঃ “দেখো,মুহাম্মদ (সা:) একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার আগেও অনেক রাসূল চলে গেছেন। এখন তিনি যদি মরে যান কিংবা নিহত হন, তাহলে তোমরা কি পশ্চাদপসরণ করবে ? মনে রেখো, যে ব্যক্তি পশ্চাদপসরণ করবে সে আল্লাহর কোনই ক্ষতি করবে না । পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দাহ হিসেবে জীবন যাপন করবে, তাকে তিনি পুরস্কৃত করবেন।”(আল ইমরানঃআয়াত১৪৪)

আরো বলা হলোঃ ‘তোমরা যে দ্বীনকে বুঝে-শুনে গ্রহণ করেছো, তার ওপর অবিচল থাকার এবং তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে তোমাদের মধ্যে হামেশা নবীর উপস্থিত মাত্র ।এর ওপর অবিচল থাকলে তোমরা নিজেরাই সুফল পাবে। এ দ্বীনের আসল শক্তি হচ্ছে এর উপস্থাপিত সত্যতা। এর সমুন্নতি না তোমাদের শক্তি -সামর্থের ওপর আর না কোনো বিশেষ ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল।’

দুর্বলতার উৎস-১

মানুষের সমস্ত দুর্বলতার উৎস হচ্ছে মৃত্যু-ভয়।তাই এ সময় মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো যে, তোমাদের মৃত্যু-ভয়ে পলায়ন করা নিতান্তই অর্থহীন। কারণ মৃত্যুর জন্যে নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত কোন প্রাণীরই মৃত্যু হতে পারে না। অন্য কথায় , আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের আগে না কেউ মরতে পারে আর না তারপর এক মুহূর্তও কেউ বেঁচে থাকতে পারে। অতএব, তোমাদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবার চিন্তা করার প্রয়োজন নেই ; বরং জীবনের যেটুকু অবকাশ পাওয়া গেছে, তা কি দুনিয়াদারিতে ব্যয়িত হচ্ছে না আখিরাতের কাজে ,তা-ই শুধু চিন্তা করা উচিত। কারণ যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়াদারির জন্যে তার শ্রম-মেহনত নিয়োজিত করে, তার যা কিছু প্রাপ্য তা দুনিয়ায়ই পেয়ে থাকে।আর যে ব্যক্তি আখিরাতের কল্যাণের জন্যে কাজ করে ,আল্লাহ তাকে আখিরাতেই প্রতিফল দান করবেন।কাজেই যারা আল্লাহর দ্বীন কবুল করার ,এর ওপর কায়েম থাকার এবং একে হারাম করবার চেষ্টা-সাধনার সুযোগ পেয়েছে, তাদের পক্ষে এই মহা মূল্যবান নিয়ামতটিরই কদর করা এবং এর জন্যেই নিজেদের সবকিছু নিয়োজিত করা উচিত । এর ফলাফল অবশ্যই তাদের পক্ষে কল্যাণপ্রদ হবে; আখিরাতের স্থায়ী সাফল্য তারা অর্জন করবে। আর এই নিয়ামতের যারা শোকর আদায় করবে, আল্লাহ তাদেরকে সর্বোত্তম নিয়ামত দ্বারা কৃতার্থ করবেন। তারা আপন মালিকের কাছ থেকে সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত হবে।

ওহুদের বিপর্যয়ের পর

আগেই বলা হয়েছে যে, আরবের দু-একটি গোত্র ছাড়া বাদবাকী সমস্ত গোত্রই এই নবোত্থিত ইসলামী আন্দোলনের বিরোধী ছিলো। কারণ, এ আন্দোলন তাদের পৈত্রিক ধর্ম ও রসম-রেওয়াজের ওপর প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানছিলো। সেই সঙ্গে মানুষ নৈতিক দিক থেকে উন্নত হোক এবং জুয়া, ব্যভিচার, মদ্যপান, লুটতরাজ ইত্যাকার প্রচলিত দুষ্কৃতি পরিত্যাগ করুক, এ-ও ছিলো এ আন্দোলনের দাবি। তাই বদর যুদ্ধের আগে এই নয়া আন্দোলনকে ধ্বংস করার বিষয়ে অনেক গোত্রই চিন্তা-ভাবনা করছিলো। কিন্তু বদরে কুরাইরশরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবার ফলে তারা কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়লো এবং এর পরবর্তী কর্মপন্থা সম্পর্কে তাদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দিলো। কিন্তু ওহুদের যুদ্ধের পর পুনরায় অবস্থার পরিবর্তন ঘটলো। এবার আরবের বহু গোত্রই ইসলামের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ালো। এ ধরণের কয়েকটি গোত্রের ভূমিকা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে।

বিভিন্ন গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতা

১. চতুর্থ হিজরীর মুহাররম মাসে কাতান এলাকার জুফায়দ নামক একটি গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করলো। হযরত (স) এদের মুকাবিলার জন্যে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে হযরত আবু সালামাকে প্রেরণ করলেন। শেষ পর্যন্ত আক্রমণকারীরা পালিয়ে গেলো।

২. এরপর ঐ মাসেই লেহইয়ান নামক কুহিস্থান আ‘রনার একটি গোত্র মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত করলো। তাদের মুকাবিলার জন্যে হযরত আব্দুল্লাহ বিন্‌ আনীস (রা)-কে প্রেরণ করা হলো। অবশেষে তাদের সর্দার সুফিয়ান নিহত হলো এবং আক্রমণকারীরা ফিরে গেলো।

৩. একই বছর সফর মাসে কালাব গোত্রের প্রধান আবু বারাআ হযরত (স)-এর খেদমতে হাযির হয়ে বললোঃ ‘আমার সঙ্গে কতিপয় লোক পাঠিয়ে দিন; আমার কওমের লোকেরা ইসলামের দাওয়াত শুনতে চায়।’ হযরত (স) তার সঙ্গে সত্তর জন সাহাবী পাঠিয়ে দিলেন। এদের অনেকেই ছিলেন সুফ্‌ফার৪২ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু ঐ ২ গোত্রের শাসনকর্তা আ'মের বিন্‌ তুফাইল এদেরকে ঘেরাও করে হত্যা করলো। এই ঘটনায় হযরত (স) যারপরনাই মনোকষ্ট পেলেন। তিনি সমগ্র মাসব্যাপী ফজরের নামাযের পর ঐ জালিমদের জন্য বদদোয়া করলেন। এই সত্তর জন সাহাবীর মধ্যে মাত্র হযরত আ’মর বিন উমাইয়া নামক একজন সাহাবীকে আ'মের এই বলে মুক্তি দিলো যে, ‘আমার মা একটি গোলাম মুক্ত করার মান্নত করেছিলো; যা এই মান্নত হিসেবে তোকেই আমি মুক্তি দিলাম।’

হযরত আম’র বিন উমাইয়া যখন ফিরে আসছিলেন তখন আ'মের গোত্রের দুজন লোকের সঙ্গে তাঁর পথে দেখা হলো। তিনি তাদেরকে হত্যা করলেন। মনে মনে ভাবলেন, আ'মের গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতার কিছু প্রতিশোধ তো গ্রহণ করা হলো। কিন্তু হযরত (স) এ ঘটনার কথা জানতে পেরে খুব অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। কারণ এই গোত্রের লোকদের তিনি ইতোমধ্যে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং এ ঘটনা ছিল সেই প্রতিশ্রুতির খেলাফ। তাই হযরত (স) এ দু’জন লোকের হত্যার ক্ষতিপূরণ দানের কথা ঘোষণা করলেন।

এভাবে আরো দু’টি গোত্র বিশ্বসঘাতকতা করলো। হযরত (স) তাদের কথা অনুযায়ী দ্বীনী শিক্ষা বিস্তারের জন্যে দশজন সাহাবীকে প্রেরণ করলেন। কিন্তু ঐ জালিমরা বিশ্বাসঘাতকতা করলো। এর মধ্যে সাতজন সাহাবী কাফিরদের সঙ্গে লড়াই করে শহীদ হলেন। বাকী তিনজন বন্দী হলেন। এদের মধ্যে হযরত খুবাইব (র) এবং হযরত জায়েদ (রা) ও ছিলেন। দুশমনরা এদেরকে মক্কায় নিয়ে বিক্রি করে দিলো। হযরত খুবাইব (সা) ওহুদের যুদ্ধে হারেস বিন আ'মের নামক এক ব্যক্তিকে হত্য করেছিলেন। হারেসের পুত্রগণ পিতৃহত্যার বদলা নেবার জন্যে হযরত খুবাইব (রা)-কে কিনে নিলো। কয়েকদিন পর কাফিরদের হাতে তিনি শহীদ হলেন। অনুরূপভাবে সুফিয়ান বিন্‌ উমাইয়া নামক এক এক ব্যক্তি হযরত জায়ে (রা)-কে নিয়ে হত্যা করলো।

এভাবে আরবের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে মুসলমানদের নিয়মিত সংঘর্ষ চলছিলো। এতে বিরুদ্ধবাদীরাই একতরফাভাবে নির্মমতার পরিচয় দিচ্ছিলো আর মুসলমানরা তাদের উৎপীড়ন সয়ে যাচ্ছিলো। এই সময় ইহুদীদের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি মুসলমানদের জন্যে যথেষ্ট দুশ্চি্ন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ালো।

ইহুদী আলেম ও পীরদের বিরোধিতা

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মদীনায় আসার পর হযরত (স) ইহুদী গোত্রগুলোর সঙ্গে নানারূপ চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন এবং তাদের জান-মালের কোনো ক্ষতি না করার ও তাদেরকে সর্বপ্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। তথাপি ইসলামী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে ইহুদী আলেম ও পীরগণ বিশেষভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত চিলো। এর অবশ্য কতকগুলো কারণও ছিলো। নিম্নে তার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যাচ্ছে।

১. ধর্মীয় দিক থেকে এ পর্যন্ত ইহুদীদের এক প্রকার অহমিকা ছিলো। খোদাপরস্তি ও দ্বীনদারির দিক দিয়ে সবাই তাদেরকে শ্রদ্ধার পাত্র বলে গণ্য করতো। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের প্রসারের ফলে তাদের এই ভ্রান্ত ধার্মিকতা ও পেশাদারী খোদাপরস্তির মুখোশ খসে পড়লো। সত্যিকার ধার্মিকতা কাকে বলে এবং যথার্থ খোদাপরস্তির তাৎপর্য কি, হযরত (স) -এর বক্তব্য শুনে লোকেরা তা জানতে পরলো। ফলে ইহুদী আলেম ও পীরদের ‘ধর্ম ব্যবসায়ে’ মন্দাভাব দেখা দিলো।

২. কুরআন শরীফে ইহুদি জনগোষ্ঠী, বিশেষভাবে তাদের আলেম ও ধার্মিক শ্রেণীর লোকদের নৈতিকতা ও আচার-ব্যবহার সম্পর্কে খোলাখুলি সমালোচনামূলক আয়াত নাযিল হচ্ছিলো। যেমন : ‘তারা মিথ্যা কথা শ্রবণকারী এবং হারাম মাল ভক্ষণকারী’ (সূরা মায়েদা : ৪২), ‘তুমি এদের অধিকাংশকেই দেখবে পাপাচার ও সীমালংঘনের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলছে’ (সূরা মায়েদা : ৬২), ‘এরা সূদখোর, অথচ এদের জন্যে সূদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো’, ‘এরা লোকদের ধন-মাল খেয়ে ফেলে’ (সূরা নিসা : আয়াত ১৬১) ইত্যাদি। এছাড়া বাকারা, মায়েদা, আলে-ইমরান প্রভৃতি সূরায় এ ধরনের আরো বহু মন্তব্য বিধৃত হয়েছে। এসব মন্তব্য শুনে মাত্র কতিপয় সত্যসন্ধ লোক ছাড়া তাদের বেশির ভাগ লোকই অত্যন- ক্ষুদ্ধ হলো এবং অন্ধভাবে ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতায় লেগে গেলো।

৩. ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে তারা স্পষ্টত আশংকাবোধ করছিলো যে, একদিন না একদিন এর সামনে তাদের মাথা নত করতে হবেই।

এসব কারণেই ইহুদীরা ইসলামী আন্দোলনের ঘোরতর দুশমন বনে গেলো।

বনী কায়নুকার যুদ্ধ

বদরের মুসলমানদের জয়লাভের পরই ইহুদীদের সর্বপ্রথম চৈতন্যোদয় হলো। তারা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করলো যে, ইসলাম একটি অপরাজেয় শক্তির রূপ পরিগ্রহ করে চলেছে। তাই বদর যুদ্ধের অব্যবহিত পরই- দ্বিতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসে- ইহুদীদের বনী কায়নুকা গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো এবং হযরত (স) - এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভেঙে দিলো। এই যুদ্ধের একটি মুখ্য কারণ ছিলো এইঃ এক ইহুদী জনৈক মুসলিম মহিলার শ্লীলতাহানি করে। এ ঘটনায় উক্ত মহিলার স্বামী ক্রুদ্ধ হয়ে একজন ইহুদীকে মেরে ফেলে। এরপর ইহুদীরা একজন মুসলমানকে হত্যা করে। হযরত (স) বিষয়টির আপোষ-রফার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ইহুদীরা ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বললো : ‘আমরা বদরে পরাজিত কুরাইশ নই। আমাদের সঙ্গে যখন বেধে গেছেই, তখন যুদ্ধ কাকে বলে তা আমরা দেখিয়ে দেবো।’

এভাবে চুক্তির অমর্যাদা করে ইহুদীরা যখন যুদ্ধের হুংকার ছাড়লো, তখন হযরত (স)-ও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। ইহুদীরা একটি কিল্লার মধ্যে ঢুকে আত্নরক্ষার ব্যবস্থা করলো। কিল্লাটি পনেরো দিন অপরাধের পর স্থির করা হলো যে, ইহুদীদের নির্বাসিত করা হবে। ফলে সাত শ’ ইহুদীকে নির্বাসিত করা হলো।

কা’ব বিন আশরাফের হত্যা

কা’ব বিন আশরাফ ছিলো ইহুদীদের একজন খ্যাতনামা কবি। সে যুগে কবিদের অত্যন্ত প্রভাব ছিলো। তাই বদর যুদ্ধের পর এই লোকটি এমন উত্তেজনাপূর্ণ কবিতা রচনা করতে লাগলো যে, মক্কায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগুন জ্বলে উঠলো। বদর যুদ্ধে নিহতদের সম্পর্কে সে অত্যন্ত দরদপূর্ণ মার্সিয়া রচনা করলো এবং মক্কায় গিয়ে তা লোকদের শুনাতে লাগলো। অতঃপর সে মদীনায় এসে হযরত (স)-কে হত্যা করার নানারূপ আপত্তিকর কবিতা রচনা করলো এবং তাঁর বিরুদ্ধে লোকদেরকে উত্তেজিত করতে লাগলো। এমন কি, একবার একটি নিমন্ত্রণের ভাব করে সে হযরত (স)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করলো। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লোকটি সম্বন্ধে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সে সম্পর্কে হযরত (স) সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। অবশেষে তাঁর সম্মতিক্রমে তৃতীয় হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে মুহাম্মদ বিন মুসলিমা (রা) কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করেন।৪৩

বনু নযীরের নির্বাসন

বনু নযীর গোত্রের ইহুদীগণ কয়েকটি ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। তারাও হযরত (স)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে কয়েকবার গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। এ উদ্দেশ্যে মক্কার কুরাইশরাও তাদেরকে উস্কানি দিলো। তাদের এই আচরণ যখন সীমা অতিক্রম করে গেলো, তখন হযরত (স) তাদের কিল্লা অবরোধ করে ফেললেন। এই অবরোধ ১৫৫ দিন পর্যন্ত অব্যাহত রইলো। অবশেষে তারা এই মর্মে সন্ধি করলো যে, উটের পিঠে চাপিয়ে যতটুকু সম্ভব, ততোটুকু মাল-পত্র নিয়ে তারা মদীনা ছেড়ে চলে যাবে। এই সন্ধি অনুযায়ী তাদের বহু সর্দার খায়বর চলে গেলো। তারা নিজেদের সঙ্গে বহু সামান্তপত্র নিয়ে গেলো। যে সব সামান তারা নিতে পারেনি তা-ই শুধু ফেলে গেলো।

এবার মুসলমানদের উভয় দুশমন অর্থাৎ মুশরিক আরব (বিশেষত মক্কার কুরাইশ) এবং ইহুদীগণ মিলে ইসলামকে ধ্বংস করার বিষয়ে চিন্তা করতে লাগলো। অবশেষে তারা সবাই মিলে মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল এবং এর জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে দিলো। প্রথম দিকে হযরত (স) এই প্রস্তুতির কথা জানতে পেরে তাদের মুকাবিলার জন্যে মুসলমানদের একটি কাহিনী নিয়ে কিছু দূর অগ্রসরও হয়েছিলেন। কিন্তু দুশমানরা মুকাবিলা না করে পালিয়ে গেলো। এভাবে পঞ্চম হিজরীর মুহররম মাসে একবার তিনি ‘জাতুরাকা’ এবং রবিউল আউয়াল মাসে আর একবার ‘দমমাতুল জুনদাল’ পর্যন্ত অভিযান চালালেন।

১১

খন্দকের যুদ্ধ

মদীনা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বনু নযীর গোত্রের লোকেরা ইসলামের বিরুদ্ধে এক বিরাট ষড়যন্ত্রে লিপ